নির্মাতার হাতে হ্যান্ডকাফ

1
2118
টোকন ঠাকুর

লিখেছেন । টোকন ঠাকুর

বাসাটা ছাদে। অনেকেই ছাদ দেখতে চায়। ছাদে বসলে মাথার ওপরে আকাশ। উঠোনে বসেও আমরা আকাশ দেখতাম, সেটি পুরোনো ঢাকার নারিন্দায়, শরৎগুপ্ত রোডে। সে বাড়িতে বড়ো একটি উঠোন ছিল। সেই উঠোনের উপরেও ছিল আরও বড়ো আকাশ। সেই উঠোনে বসে আমরা পিরিয়ডিকাল ছবি কাঁটা‘র প্রপস্, কস্টিউম, সেট, দেড়শোর অধিক পাত্রপাত্রীর চূড়ান্ত নির্বাচন নিয়ে আলোচনা করেছি দিনের পর দিন, রাতের পর রাত।

বুঝতে চেয়েছি ৩৬ নং ভূতের গলির বাড়িটি আদতে কেমন ছিল? ১৯৬৪ সালে বাড়িটি কেমন ছিল? ১৯৭১ সালে বাড়িটি কেমন ছিল? ১৯৮৯-৯০ সালে বাড়িটি কেমন ছিল? সে বাড়িতে চিত্রনাট্য অনুযায়ী কাঁটার ষাট ভাগ শ্যুটিং সম্পন্ন করি। কাঁটার ব্যাকগ্রাউন্ড টিম নিয়ে আমি নয় মাস অবস্থান করি নারিন্দায়। শীত, বর্ষা ও গ্রীষ্ম– এই তিন ঋতু পরিক্রমায় চিত্রায়ণ চলে কাঁটা ছবির।

এ বাদে ফরাসগঞ্জ, সূত্রাপুর, শ্যামবাজার, গেণ্ডারিয়া, মিলব্যারাকের সামনে ও পেছনে, ধূপখোলা মাঠের আশেপাশে, ফরিদাবাদসহ পুরোনো ঢাকার পুরোনো পুরোনো অনেক গলিতে শ্যুটিং চলে কাঁটার। সব মিলিয়ে পঁচানব্বই ভাগ শ্যুটিং সম্পন্ন হয় পুরোনো ঢাকাতেই। বাকি শ্যুটিং করা হয় মুন্সিগঞ্জের লৌহজং বাজার সংলগ্ন ও মালির অংক বাজার সংলগ্ন পদ্মা নদীতে। কাঁটার সর্বশেষ শ্যুটিং হয় নরসিংদীর ঘোড়াশাল, পলাশ ও জিনারদী অঞ্চলে।

‘কাঁটা’র শুটিং

২০১৮ সাল বছরব্যাপি শুটিং করি আমরা। অবশ্য এর আগে আমি প্রায় সাত মাস ছিলাম ফরাসগঞ্জের ৪২ নম্বর বি, কে দাস রোডের বাড়িতে, যে-বাড়ির বয়স ২৭৮ বছর ছিল তখন। সে বাড়িতে থেকে আমি কাঁটার লোকেশন দেখে বেড়াতাম, কারণ, ছবিতে কিছু পুরোনো বাড়ি ও গলি দেখানোর শর্ত ছিল।

তিনটি আলাদা আলাদা গল্প নিয়ে এই ছবির পটভূমি গড়ে উঠেছে। তবু কাঁটা টিমের মনে আনন্দ আসে এ কারণে যে, অনেক কষ্ট, ধকল, অর্থ-ব্যয়, দুর্ভাবনা, ভাঙতে ভাঙতে না ভেঙে উঠে দাঁড়ানোর শেষে শহীদুল জহিরের গল্প নিয়ে সরকারের অনুদানপ্রাপ্ত ছবি কাঁটার শতভাগ শ্যুটিং শেষ হয়। প্রাথমিক লাইনআপের পাঁচ ঘণ্টার সেই ফুটেজ আমরা মন্ত্রণালয়ে জমা দিয়েছি। মন্ত্রণালয় থেকে অনুদানের প্রথম কিস্তি ১০ লাখ ৫০ হাজার টাকা পেয়েছি আমি। বাকি ৫০ হাজার টাকা চিত্রনাট্য ও কাহিনীকারের জন্য বরাদ্দ ছিল। কাঁটার চিত্রনাট্যকার হিসেবে আমার নামে ২৫ হাজার বরাদ্দ হয়। বাকি ২৫ হাজার টাকা প্রয়াত শহীদুল জহিরের নামে বরাদ্দ হয়।

২০১৩ সালে, অনুদান প্রাপ্তির পর আমি তথ্য মন্ত্রণালয়কে অবহিত করি, ‘শহীদুল জহির তো ২০০৮ সালে প্রয়াত হয়েছেন। মূল গল্পের লেখক হিসেবে বরাদ্দকৃত ২৫,০০০ টাকা আমি কাকে দেব?’

সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা আমাকে জানান, ‘ওনার পরিবার পেতে পারে।’

কাঁটা
ফিল্মমেকার । টোকন ঠাকুর

আমরা জানি শহীদুল জহির চিরকুমার ছিলেন। আমরা জানি মৃত্যুর আগের দিন পর্যন্ত কাঁটা গল্পের লেখক শহীদুল জহির বা সচিব শহীদুল হক বাংলাদেশ সরকারের পার্বত্য মন্ত্রণালয়ে কর্মরত ছিলেন। তথ্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আমার চুক্তিতে আমার পক্ষে গ্যারান্টার হিসেবে কবিতাপ্রাণ একজন সাংবাদিক বন্ধু আমাকে পরিচয় করিয়ে দেন সেই সময়ের অর্থ মন্ত্রণালয়ের একজন যুগ্ম সচিবের সঙ্গে। তিনি শহীদুল হকের ছোট ভাই, বর্তমানে সরকারের একজন অতিরিক্ত সচিব, জাহিদুল হক। আমরা জানি, সচিব শহীদুল হকই লেখক শহীদুল জহির। শহীদুল জহিরের নামে বরাদ্দকৃত ২৫,০০০ টাকা কিভাবে আপনাদের দিতে পারে তথ্য মন্ত্রণালয় জানতে চাইলে জাহিদুল হক বলেন, ‘বাসায় গিয়ে বড়ো ভাই ও পরিবারের অন্যদের সঙ্গে আলোচনা করে কাল আপনাকে জানাব।’

পরেরদিন জাহিদুল হককে ফোন করলে তিনি জানান, ‘ভাইয়ার (শহীদুল জহির) ব্যাপারে আমাদের পরিবারে গতকাল রাতে আলাপ করার পর সিদ্ধান্ত হয়েছে ২৫,০০০/- টাকার চেকটি আমাদের মায়ের নামে করতে পারে। মা-ও রাজি হয়েছেন।’

শহীদুল জহিরের মা জাহানারা বেগমের নামে সেই চেকটি ইস্যু হয়। তাঁদের মায়ের চেকপ্রাপ্তি আমাকে নিশ্চিত করেছেন জাহিদুল হক।

অনুদান প্রাপ্তির ১০ লাখ ৫০ হাজার টাকার বাইরে কিছু শুভাকাঙ্ক্ষী, স্বজন, সুহৃদ এবং কাঁটা ছবির সিনেমাটোগ্রাফার তাইজুল ইসলাম রোমানের মধ্য দিয়ে একটা বড়ো অংশের টাকা সুদসহ ঋণ গ্রহণ করতে হয় কাঁটার জন্যে। ঝিনাইদহে আমার পৈত্রিক বাড়ির লোকেদের সুদসহ একটি বড়ো ঋণ নিতে হয়েছে। দুটি ঋণেরই সুদ কিস্তি বেড়ে চলেছে। শতভাগ ফুটেজ মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়ার পরেও দ্বিতীয় কিস্তির টাকা আবেদন করেও ছাড় হয়নি, তৃতীয় কিস্তি বা শেষ কিস্তি তো পরের কথা। বরং আমার নামে ১০ লাখ ৫০ হাজার টাকা নিয়ে কোটি টাকার ছবির শতভাগ ফুটেজ দিতে দেরি হওয়ায় মামলা হয়েছে।


নিজেই
হাঁটছি এক
সুতোর ওপর দিয়ে

তারপর পৃথিবীতে এসেছে করোনা। মানুষের সঙ্গে মানুষের শারীরিক ও মানসিক দূরত্ব বেড়েছে। আমি যেতে পারছি না কাঁটার সম্পাদকের কাছে, সম্পাদক আসতে পারছেন না আমার কাছে। দুইশো লোকের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা কাঁটা টিম করোনাকালীন বাস্তবতায় যে যার মতো সারভাইব করার চেষ্টা করছে। আমি টিমের কারোর জন্যে কিছু করতে পারছি না। নিজেই হাঁটছি এক সুতোর ওপর দিয়ে।

এই সময়টা আমি কাঁটা টিম থেকে বিচ্ছিন্ন, ঝিনাইদহের পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন থেকে মাথার মধ্যে শুধু জাল বুনছি, কবে ফের সম্পাদনা শুরু করতে পারব, কবে ডাবিং করাব, শব্দ-সঙ্গীত-গান ও অ্যানিমেশন করাবো, রঙ বিন্যাস করাবো– এবং সেটা কিভাবে করবো? মন্ত্রণালয় থেকে প্রাপ্য দ্বিতীয় ধাপের টাকা পেলেও অনেকটাই এগিয়ে যেতে পারতাম। কোথাও কোনো ছোটখাটো স্পন্সর পেলেও ছবিটা শেষ করতে পারি।

‘কাঁটা’র শুটিং

অনেকদিন বাদে সাংবাদিক শরিফ খিয়াম আহমেদ ঈয়ন ফোন দিয়ে বললো, ‘কোথায় আছেন?’
বললাম, ‘বাসায়।’
‘আসব?’
‘আসো।’

এরপর আমি ফোন করলাম কবি মিছিল খন্দকারকে। ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই ওদের আসার কথা। সেজন্য আমি দরজাটা খুলে ছাদে বসে আছি। নাগরিক সন্ধ্যা নামছে বাইরে। ছাদে বসে আমি নারিন্দার উঠোনের কথা ভাবছি। কাঁটার কথা ভাবছি। কিছুক্ষণ বাদে খোলা দরজার দিকে তাকিয়ে দেখি মুখে মাস্ক পরা একজন লোক। আমার দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। আমি তার কাছে গিয়ে বলি, ‘কাকে চাচ্ছেন?’

‘আপনিই তো টোকন ঠাকুর?’ তিনি জানতে চাইলেন। দেখলাম, অনতিদূরে আরও একজন লোক তার সঙ্গে। বললাম, ‘কিছু বলবেন?’
লোকটি বলল, ‘হ্যাঁ।’
‘বলেন।’
লোকটি বলল, ‘একটু বসে কথা বলতে হবে।’
বললাম, ‘আসেন।’

বাড়ির ছাদে টোকন ঠাকুর
ছবি: শাশ্বত

ছাদে, মুখোমুখি চেয়ারে বসে আমি তাদেরকে বলি, ‘মুখের মাস্কটা একটু খোলেন, আপনাদের কি নাম বলেন, কোথা থেকে এসেছেন?’

এরপর বিশ মিনিটের আলোচনা চলে আমাদের মধ্যে।

মিছিল খন্দকার, ঈয়ন, কবি সাইফ ইবনে রফিক ও এসএম তুষার– এই চারজনই জীবনানন্দের বরিশালের মানুষ। ওদের বললাম, ‘ঘরে বসে তোমরা আড্ডা দাও। দুজন গেস্ট এসেছেন, ওদের সঙ্গে কথা বলছি। তারপর তোমরা ছাদ দেখবা।’

আমার বন্ধুরা অনেকেই এই ছাদ দেখতে আসে। ছাদে বসে যাদের সঙ্গে আমার কথা চলছে, তারা নিউমার্কেট থানা থেকে এসেছেন। একজন সাব-ইন্সপেক্টর মিলন ও একজন কনস্টেবল। সাদা পোশাক। বিশ মিনিটের আলোচনায় আমাকে যা বলা হলো, ‘আপনার নামে তো একটা মামলা হয়েছে, আমার কাছে ওয়ারেন্টও আছে।’

আমি বললাম, ‘আমার করণীয়?’

লোকটি বললেন, ‘আপনাকে একটু আমাদের থানায় যেতে হবে, ওসি স্যারকে একটা সালাম দেবেন, এখানে যে রকম বিশ মিনিটের আলোচনা হলো, আপনি থানায় পাঁচ মিনিটের আলোচনা করে বাসায় চলে আসবেন।’

‘কাঁটা’র শুটিং

বললাম, ‘কাল গেলে হয় না? ওই যে দ্যাখেন আমার বাসায় লোক এসেছে। ওদের সঙ্গে আমার পূর্বনির্ধারিত শিডিউল।’

লোকটি বললেন, ‘না, এখনই চলেন। আপনি যাবেন আর আসবেন।’

দু’মিনিট এভাবেই গেল। তারপর বললাম, ‘চলেন।’

সাইফ, মিছিল, ঈয়ন ও তুষারকে বলি, ‘আমার তো একটু নিউমার্কেট থানায় যাওয়া লাগবে। মনে হচ্ছে আজ আর কোনো আড্ডা হবে না।’

বাসা থেকে নেমে আমি সেই লোকটির সঙ্গে রিকশায় উঠি। রিকশার পেছনে পেছনে আসে পুলিশ পিকআপ। আসে সাইফ, তুষার‌, ঈয়ন ও মিছিল।


প্রশস্ত এবং আবদ্ধ
একটি জায়গায়
আমি একা

নিউমার্কেট থানায় ওসি (তদন্ত) আমাকে কিছু মামলা সংক্রান্ত প্রশ্ন করলেন। তারপর আরেক রুমে নিয়ে গিয়ে মামলার লেখালেখির কাজ শুরু হলো। আমাকে বলা হলো, ‘বাম হাতের পাঁচ আঙ্গুলের ছাপ দেন।’ ফ্রন্টাল ও প্রোফাইল মিলিয়ে তিনটি ছবি তোলা হলো, নাম-ঠিকানা লেখা হলো। তখন থেকেই আমার মোবাইল ফোনটি আমার কাছে আর রাখতে পারলাম না। আমাকে রাখা হলো কাস্টডিতে। প্রশস্ত এবং আবদ্ধ একটি জায়গায় আমি একা। অবশ্য রাতে আরও এগারজনকে ঢোকানো হলো সেখানে।

কাঁটা

আমরা ফ্লোরে শুয়ে থাকলেও মশা ও দুর্গন্ধের জন্যে আমার ঘুম হয়নি। দুর্গন্ধের কারণ, কাস্টডি রুমের এক কোণায় খোলা প্রসাব-পায়খানার ব্যবস্থা। মনে হচ্ছিল পুরো পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছি। একজন মাদক বিক্রেতা, চারজন মটর সাইকেলজনিত মামলা ও একজন পারিবারিক মামলার মানুষ– এরা যে যার মতো শুয়ে আছে মেঝেতে, আমিও শুয়ে আছি। ঘুম তো আসছেই না। প্রচুর মশা কামড়াচ্ছে। কি হতে যাচ্ছে আমি কিছুই জানি না। একজন পাহারার পুলিশের কাছে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বললেন, ‘আপনাদের কাল সকালে কোর্টে চালান করা হবে।’

কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তা এসে উৎসাহ নিয়ে বললেন, ‘কোথায় সেই ওয়ারেন্ট?’

তারা দেখলেন আমাকে। কেউ কেউ তাকাচ্ছিলেন এমনভাবে যে, বাংলাদেশ পুলিশের এক নাম্বার ওয়ান্টেড আসামি আজ ধরা পড়েছে।

‘কাঁটা’র শুটিং

একজন পুলিশের সিনিয়র কর্মকর্তা এসেই বললেন, ‘কোথায় সেই শুয়োরের বাচ্চা?’

‘তুই
সরকারের
কি পরিমাণ টাকা
আত্মসাৎ করছিস, তোরে
আজকে পাইছি, শুয়োরের বাচ্চা’

পাহারা-পুলিশ আমাকে ডাকলে আমি মেঝে থেকে উঠে শিকের কাছে গিয়ে দাঁড়াই। পুলিশ কর্মকর্তা প্রশ্ন করেন, ‘তুই সরকারের কি পরিমাণ টাকা আত্মসাৎ করছিস, তোরে আজকে পাইছি, শুয়োরের বাচ্চা।’

আমি জানতে চাইলাম, ‘আপনি আমাকে গালিগালাজ করছেন কেন?’

কাঁটা

পুলিশ কর্মকর্তা ক্ষেপে গিয়ে থানার অন্যান্য পুলিশের উদ্দেশ্যে বললেন, ‘এই শুয়োরের বাচ্চার নামে আরও চার পাঁচটা মামলা দিয়ে তারপর কোর্টে চালান দেন, দেখে মনে হচ্ছে শালা আন্ডারওয়ার্ল্ডের মাল।’

এরপর আমি চুপ হয়ে গেলাম। বুঝতে পারলাম, আর কথা বললেই এসি আমাকে পেটানোর ব্যবস্থা করবেন।

একজন সাব-ইন্সপেক্টর চুপিচুপি আমাকে বললেন, ‘পত্রপত্রিকায় যে কবিতা পড়ি, সে কি আপনি?’ আমি কোনো উত্তর করিনি। তিনি চলে যেতে যেতে বললেন, ‘আমি নির্মলেন্দু গুণের দেশের লোক, নেত্রকোণা।’

তার কাছে একটি প্যারাসিটামল চাইলাম। প্রচণ্ড মাথাব্যথা করছিল। কিন্তু প্যারাসিটামল আর আসেনি। রাতে হুমায়ুন এসেছিল। হুমায়ুন বাল্যবন্ধু, এখন পুলিশ ইন্সপেক্টর। ওর কারণেই পরদিন সকালে আমাকে প্রিজন ভ্যানে কোর্টে নেয়নি, পুলিশের পিকআপে নিয়েছে। রেজা ঘটক, অভি জ্যানেট, লেখক-প্রকাশক নীল সাধু, সরকারি কলেজের শিক্ষক আমাদের ছোটবেলার অগ্রজ-বন্ধু মুকুলকে দেখলাম। আর্টিস্ট পুলক এসে কিছু খাদ্যখাবার দিয়ে গেল।

‘কাঁটা’র শুটিং

হুমায়ুনের বদান্নতায় আমাকে কাস্টডি থেকে পুনরায় কিছুক্ষণের জন্যে ওসির (তদন্ত) রুমে আনা হয় এবং হুমায়ুনের মোবাইল ফোনে আমি উকিল প্রকাশ রঞ্জন বিশ্বাসের সঙ্গে যোগাযোগ করি। ঠিক সেই মুহূর্তেই টিভি নিউজের স্ক্রলে আমার গ্রেফতার সংবাদ দেখানো হচ্ছিল। হুমায়ুনের ফোনে ঝিনাইদহ থেকে আমার ভাগ্নি বর্ষা বিভাবরীকে আমি বললাম, ‘শোন, বাড়িতে কাউকে কিছু বলার দরকার নেই।’ কারণ, আমার মা-বাবার বয়স হয়েছে। অসুখও আছে। কেউ কিছু না জানলেই ভালো হবে।

কিন্তু বর্ষা বলল, ‘ব্যাপারটা এখন সবাই জানে মামা। টিভিতে খবরে দেখাচ্ছে। ফেসবুকেও এটা এখন সবাই স্ট্যাটাস দিচ্ছে।’

তারপর আমাকে ফের কাস্টডিতে নিয়ে যাওয়া হয়।

রাতে ঘুম তো হলোই না, স্বপ্ন-দুঃস্বপ্নের ভেতর ভোর হয়ে গেল। এক মিনিট সময়কে তখন মনে হচ্ছিল কত কাল। মেঝেতে শুয়ে আছি। মেঝেতে কান পেতে ধরতে চেষ্টা করছিলাম বাইরে থেকে আসা কোনো মানুষের পদশব্দ আমার পরিচিত কি না!

কাঁটা

সকালে এলো বন্ধু আলফ্রেড খোকন ও রেজা ঘটক। দুইটা পরাটা, ডাল ও এক বোতল মিনারেল পানি নিয়ে। গ্রেপ্তারের রাত থেকে জামিন পাওয়া পর্যন্ত রেজা ঘটক নিরলস যে পরিশ্রম করেছে, আমার পক্ষে সেই ঋণ কোনোভাবেই শোধ করা সম্ভব নয়।

যাইহোক, সকালে পুলিশের একটি গাড়িতে নিউমার্কেট থানা থেকে আমাকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে জনসন রোডের সিএমএম কোর্টের কাস্টডিতে। সামনে ও পেছনে দুটো গাড়িতে টেলিভিশনের ক্যামেরা তাক করা। আমার বাম হাতে হ্যান্ডকাফ। হ্যান্ডকাফ ধরে আছে আরেকজন পুলিশ। নীলক্ষেত, পলাশী, গুলিস্তান হয়ে সিএমএম কোর্টের সামনে গিয়ে পাঁচটি জায়গায় আমাকে গচ্ছিত করার চেষ্টা নিলেও তারা জানালো এ আমাদের কেইস নয়। পুলিশ ভ্যান দাঁড়াল আজাদ ম্যানসন সিনেমা হলের উল্টোদিকে। এই সিনেমা হলেও কাঁটার শুটিং হয়েছে শেষ লটে।

আমাকে নিয়ে পুলিশের এ সমস্ত ঘোরাফেরা টেলিভিশন ক্যামেরা রেকর্ড করছিল। ষষ্ঠবারের মতো একটি বিল্ডিংয়ের দোতলায় আমাকে একটি রুমে রেখে হ্যান্ডকাফ খোলা হলো। ঘণ্টাখানেক পর আমাকে দেওয়া হলো কোর্ট কাস্টডিতে।

প্রায় দেড়শো লোক কাস্টডির মধ্যে। গায়ে গায়ে লেগে আছে সবাই। কীসের করোনা, কীসের ডিসটেন্স! পাঁচ ঘণ্টা কাস্টডিতে থাকার সেই অভিজ্ঞতা আমি হয়তো লিখতেই পারব না। কোর্টে ওঠার দিন আমি কোনোভাবেই আমার উকিলের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারিনি। এক কামরার কাস্টডিতে দেড়শো জনের মধ্যে আমার পরিচিত বলতে নিউমার্কেট থানা থেকে আসা দুই হাজতি।

কোর্ট কাস্টডি এক অন্যরকম জায়গা। বীভৎস জায়গা।

কাঁটা

বিকেলের দিকে কাস্টডি থেকে নাম ধরে ডেকে ডেকে দলে দলে লোক বের করা হচ্ছিল। কেউ বলছে ওদেরকে কেরানিগঞ্জ জেলে চালান হচ্ছে, কেউ জানাল ওদের ম্যাজিস্ট্রেট কোর্টে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। একজন জানাল, কেউ কিছু জানে না কি হচ্ছে! কাস্টডিতে দাঁড়ানো গেলেও বসার মতো জায়গা থাকে না, এতো মানুষ!

রাতে যেহেতু ঘুম হয়নি, আমার শরীর ক্লান্তিতে ভেঙে আসছিল। ঠেলেঠুলে কোনোভাবে বসলাম। মেঝেতে ছড়িয়ে থাকা পাউরুটির টুকরো, কলার খোসা, ডিমের খোসা, খাবার দাবারের টুকরো পড়ে থাকা। তার মধ্যে অর্ধবৃত্তের মতো করে শোয়ার চেষ্টা করলাম। ঘুম পাচ্ছিল। এখন শুয়ে মাথাটা রাখব কোথায়, জায়গা নেই। পাশে পা ছড়িয়ে বসে থাকা হাজতিকে বললাম, ‘আপনার পায়ের উপর একটুখানি মাথাটা রাখি?’ লোকটি সম্মত হলেন। আমি তার পায়ের উপর মাথা রেখে শোয়ামাত্রই ঘুমিয়ে পড়লাম। আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারছিলাম না।

পৃথিবীর সব প্রিয়জন থেকে বিচ্ছিন্ন সেই সময়টায় ভাবছিলাম, সাড়ে দশ লাখ টাকা গ্রহণ করে বাকি পঁচিশ লাখ টাকা তো আমি এখনও পাইনি। যদিও গতবছরেই আমি কাঁটার শতভাগ ফুটেজ জমা দিয়েছি মন্ত্রণালয়ে। তার প্রেক্ষিতে মন্ত্রণালয় থেকে পাওয়া চিঠিও আছে আমার কাছে। অনেক টাকা সুদসহ ও সুদ ছাড়াও ঋণ আছে আমার। এ অবস্থায় আমি সিএমএম কোর্টের কাস্টডিতে বন্দি। এটা কি কেউ ভাববে না? কারোরই ভাবনার বিষয় নই আমি?

‘কাঁটা’র শুটিং

কবি কামাল চৌধুরী যে ভূমিকা রেখেছেন, তার জন্যে আমি সারাজীবন কৃতজ্ঞ থাকব তার কাছে। কবি আসাদ মান্নান ভূমিকা রেখেছেন। পাঠক সমাবেশ-এর প্রকাশক সাহিদুল ইসলাম বিজুর ভূমিকা আমি কোনোদিন ভুলতে পারব না। আমার জামিনের জন্যে তাদের এই ভূমিকার বাইরে, অনলাইন দুনিয়ায় কী হচ্ছে, আমার জানা ছিল না। পরে জেনেছি, বন্ধু মোস্তফা সরয়ার ফারুকী, মারজুক রাসেল, অনিমেষ আইচ, মাসুদ হাসান উজ্জ্বল, সরকার আমিন বা আমি বিশেষ করে বলতে পারি স্বকৃত নোমানের কথা। ঢাকার বাইরে থেকেও খন্দকার সুমন সবসময় এই ঘটনার মধ্যে থেকেছে আমার প্রতি বা কাঁটার প্রতি ভালোবাসায়। কিম্বা কারা কী ভূমিকায় কি কাজ করছেন, সব আমার জানার কোনো সুযোগ ছিলই না। কাস্টডিতে থাকা অবস্থায় বাইরের দুনিয়া সম্পর্কে কিছু জানা যায় না।

কৃতজ্ঞতার শেষ নেই আনোয়ারা সৈয়দ হকের প্রতি। কৃতজ্ঞ আমি কচি খন্দকার, পিয়াস মজিদ, আলতাফ শাহনেওয়াজ, তাহুয়া লাভিব তুরা, ধ্রুব এষের প্রতি। ব্যক্তিবিশেষের নাম, যাদের নাম লেখা জরুরি, তাৎক্ষণিক ট্রমার কারণে অনেকের নামই হয়তো এই মুহূর্তে লেখা হলো না।

আস্তে আস্তে অন্যান্য হাজতিদের পাশে নিজেকে খাপ খাওয়ানোর চেষ্টা করছিলাম। বাকি বন্দীদের কথা ভাবছিলাম। অনেকের সঙ্গে কথা বললাম। সবার মুখেই দুশ্চিন্তা, অসহায়ত্ব।

হঠাৎ জানালা দিয়ে নাম ধরে ডেকে প্রকাশ দা বললেন, ‘শোন, তোর জামিন হয়ে গেছে। ঘণ্টাখানেকের মধ্যের কাগজপত্র রেডি হয়ে গেলে তুই বেরুতে পারবি।’

অ্যাডভোকেট প্রকাশ রঞ্জন বিশ্বাস, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালীন আমরা খুব ঘনিষ্ঠ ছিলাম। কবিতা-সিনেমা-গল্প-উপন্যাস নিয়ে বিকাল সন্ধ্যা কাটিয়ে দিতাম হাকিম চত্বর, ফুলার রোড, জগন্নাথ হলের মাঠে। গভীর রাতে হলে ফিরতাম।

কাঁটা

বাইরে তখন সন্ধ্যা। দেয়ালের বাইরে অপর জগৎ, চলমান মানুষের পৃথিবী। গেইট দিয়ে বেরুতেই দেখি অসংখ্য টেলিভিশন ক্যামেরা, সাংবাদিক, ফটোগ্রাফার, আমার কেসের দুজন অ্যাডভোকেট ও কাঁটা টিমের কয়েকজন, কয়েকজন বন্ধু, আমার ভাগনি বর্ষা– ঘিরে ধরলো আমাকে। প্রশ্ন-উত্তর-অভিজ্ঞতা-কাঁটা-মামলা-ওয়ারেন্ট-কাস্টডি-জামিন। সে সময় আমি ঠিক বুঝতেই পারছিলাম না, এত ক্যামেরা, সংবাদিক কেন? আবার আমি হয়তো খুঁজছি কাউকে, দেখি নেই, সে হয়তো আসেইনি। কেউ হয়তো জানেই না– যাদের আমি প্রিয়জন ভাবি। যাদের আমার প্রিয়জন ভাবতে ভাল্লাগে। কাঁটা করতে গিয়েই কত অভিজ্ঞতা। অপরিচিত কেউ এসে খুব পাশে দাঁড়িয়েছে। কেউ কিছুটা বিপত্তিও করতে চেয়েছে। কাউকে খুব বিশ্বাস করেছি, সেই বিশ্বাস ঘুণপোকার মতো কাটা পড়েছে। কাউকে খুব নৈকট্যে জেনেছি, রক্তক্ষরণের মতো আঘাত হয়তো সেই দিয়েছে। এত্ত বড় টিম এ ছবির, কিন্তু সম্পূর্ণ একা হয়েও আমাকে মাসের পর মাস থাকতে হয়েছে, সেও কাঁটারই জন্যেই।

নিঃশব্দে
নিজের মধ্যে
সব অনুভব গুম
করে দিয়েছি

সবারই মঙ্গল হোক। আস্থার সাঁকো ভেঙে কেউ যেতেই পারে, সেই যাওয়া তার প্রয়োজন মনে করেছে সে। আমি নিঃশব্দে নিজের মধ্যে সব অনুভব গুম করে দিয়েছি। অনুদান পেয়েছি চিত্রনাট্যের মেরিটে। শুটিং করার আগে কত চাপে ছিলাম টাকা জোগাড়ের। শুটিং শেষ করেছি। কাঁটার দর্শকের মুখোমুখি হবে, আর একটু অপেক্ষা করতেই হবে।

অনেকের অনেক ধরনের লাভ হলেও এ ছবি করতে গিয়ে আমার চেয়ে তো আর কারো বেশি ক্ষতি হয়নি। মানুষ চেনা যায় একটা ছবি করতে গেলে। পরিচালক হিসেবে সবচেয়ে বেশি জানা যায়, কে কিভাবে তার ছবিতে কী রোল প্লে করছে! কী ব্যাকগ্রাউন্ডে, কী ফোরগ্রাউন্ডে!

পরের দিন বিচারিক আদালতে শুনানি। শুনানি শেষে জামিন। সিনেমাটা শেষ করতে হবে। মাসে মাসে কোর্টে হাজিরা যেমন আছে, আমার এ সিনেমা শেষ করারও আছে।

যারা পাশে ছিলেন, তাদের প্রতি ভালোবাসা। যারা পাশে থাকতে পারেননি, থাকতে চাননি, সত্যি সত্যিই আমাকে অভিযুক্ত মনে করে নিন্দে করেছেন– তাদের জন্যেও ভালোবাসা। তারাও তো চান কাঁটা সিনেমা শেষ হোক, শহীদুল জহির মুক্তি পান, আমি মুক্তি পাই। খাঁচা খুলে উড়ে যাক পাখি…

২৯ অক্টোবর, ২০২০
ঢাকা
Print Friendly, PDF & Email
শেয়ার
কবি; আর্টিস্ট; ফিল্মমেকার।। ঢাকা, বাংলাদেশ।। ফিল্ম : ব্ল্যাকআউট [২০০৬]; রাজপুত্তুর [২০১৫]; কাঁটা [নির্মাণরত]।। কাব্যগ্রন্থ : অন্তরনগর ট্রেন ও অন্তরঙ্গ স্টেশন; দূরসম্পর্কের মেঘ; আয়ুর সিংহাসন; কবিতা কুটিরশিল্প; দুপুর আর দুপুর রইল না; নার্স, আমি ঘুমোইনি; কুরঙ্গগঞ্জন; টোকন ঠাকুরের কবিতা; তা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না; আমি রিলেটিভ, মেসো; ভার্মিলিয়িন রেড; প্রেমের কবিতা; রাক্ষস@gmail.com; শিহরণসমগ্র; আমি পুরুষ মৌমাছি; ১ ফর্মা ভালোবাসা; নির্বাচিত ১০০ কবিতা।। গল্পগ্রন্থ : খশ্যেদ ও অন্যান্য চরিত্র; লিবিয়ান ভিসা; জ্যোতি চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় এসেছিল; সুঁই ও ব্লেড।। উপন্যাস : চরৈবেতি; মধুযামিনী রে।। শিশুতোষ-গ্রন্থ : ফড়িঙের বোন; সব পাখিরাই পাখি না; মেঘলা দুপুর শীতের পুকুর; মি. টি. মি. অ অ্যান্ড মিসেস মেঘের গল্প; নিলডাউন; মমি।। ফিল্ম-প্রোডাকশন হাউস : ভার্মিলিয়ন রেড

১টি কমেন্ট

  1. রাষ্ট্রযন্ত্রের কাছ থেকে পাওয়া এই দুঃসহ স্মৃতি সময়ের সাথে মুছে যাক। ‘কাঁটা’ হয়ে উঠুক সকল অপমানের প্রকৃষ্ট জবাব।

    ‘কাঁটা’র সর্বাঙ্গীণ সাফল্য কামনা করছি।
    অনেক অনেক শুভকামনা।
    🥰

মন্তব্য লিখুন