রাজমণির নিভে যাওয়া আলো এবং ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির ভূত-ভবিষ্যৎ

315
উৎস ছবি: প্রথম আলো

লিখেছেন । মোহাম্মদ নূরুজ্জামান

মিছিল করেই যেন একের পর এক বন্ধ হয়ে যাচ্ছে দেশের সব সিনেমাহল। অন্ধকার ঘরে অনেক মানুষ একসাথে বসে সিনেমা দেখার সংস্কৃতিও হয়তো রূপকথা হয়ে যাবে অচিরেই। সিনেমাহল থেকে যাবে কেবল কিছু পুরানো মানুষের স্মৃতিতে। মানতে কষ্ট হলেও এই সত্যটাই এখন আপাত বাস্তব। অথচ মাত্র বছর বিশেক আগেও কত প্রাণবন্তই না ছিল এই বিনোদন কেন্দ্রগুলো!

এ যাবৎ বন্ধ হয়ে যাওয়া আর নিকট ভবিষ্যতে বন্ধ হওয়ার তালিকায় থাকা সিনেমাহলগুলো টিকাতে না পারলেও অন্তত এগুলোর স্মৃতি বাঁচিয়ে রাখার একটা উপায় খুঁজছিলাম। কোনো বস্তুগত লাভ-লোকসান নয়, স্রেফ হারিয়ে যাওয়া কোন প্রিয়জনের স্মৃতি সংরক্ষণের মতো একটা আবেগের জায়গা থেকেই তাগিদটা পাচ্ছিলাম।

সিনেমাহল জাদুঘর

২০১৯-এর জুলাই মাস। আমাদের সীমিত আসনের সিনেমা থিয়েটার ‘সিনেস্কোপ, নারায়ণগঞ্জ’-এর নির্মাণকাজ প্রায় শেষের দিকে। খবর পেলাম নারায়ণগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী জোড়া সিনেমাহল ‘আশা-মাসার’ ভেঙে ফেলা হচ্ছে। ছুটে গেলাম সেখানে, সমানে হাতুড়ি শাবল চলছে। বেশিক্ষণ দাঁড়াতে পারলাম না, অনেক স্মৃতির আনাগোনা শুরু হলো মনের ভেতর।

সহকর্মী ইউসুফকে সেখানে পাঠালাম সংরক্ষণযোগ্য কিছু পেলে তা নিয়ে আসার জন্য। প্রথমে সে বুঝে উঠতে পারছিল না কী আনা যায়। ওকে বললাম সিনেমাহলে ব্যবহৃত যে যে জিনিস নিয়ে আসা সম্ভব, তার সবই সংগ্রহ করতে।

সে নিয়ে এলো কিছু পুরানো পোস্টার, সিনেমার টিকেট, হিসাবপত্রের কিছু ভাউচার, পরিত্যক্ত সেলুলয়েড, প্রজেক্টরের ল্যাম্প আর টুকিটাকি কিছু বাতিল যন্ত্রপাতি। আফসোস করে জানাল, কয়েকটা দিন আগে গেলে আরও অনেক কিছুই নাকি পাওয়া যেত। এমনকি ৩৫ মিলিমিটার সেলুলয়েড প্রজেক্টরটা নিয়ে আসাও অসম্ভব ছিল না।

কিছুটা মন খারাপ হলেও মোটের ওপর নিরাশ হলাম না।

এরপর অনেকটা দ্বিধা নিয়েই ইউসুফ একটা চটের বস্তা দেখাল। আমার তরুণ সহকর্মী নিশ্চিত হতে পারছিল না বস্তার ভেতরের জিনিসগুলো কী, আর আমি আদৌ তা পছন্দ করব কি না। বস্তা খুলতেই আমার আক্কেল গুড়ুম! বস্তাভর্তি কেবল স্লাইড আর স্লাইড! আমার শৈশবে খেলার ছলে পরিত্যক্ত এক্সরে শিটের ওপর হাতে আঁকা স্লাইড আর জুতার বাক্স দিয়ে একটা স্লাইড প্রোজেক্টর বানিয়েই যখন নিজেকে আস্ত একটা সিনেমাহলের মালিক মনে করতাম, তখন এরকম একটা স্লাইড হাতে পেলে তো নিজেকে দুনিয়ার সেরা ধনী মনে করতাম নিশ্চয়! এগুলো ছিল আসলে সিনেমাহলে স্থির বিজ্ঞাপন চিত্র প্রজেকশনের জন্য কাচের ওপর হাতে আঁকা স্লাইড।

অনেকের হয়তো মনে পড়ে যাবে সেই সেলুলয়েডের যুগে মূল সিনেমা শুরুর আগে আর বিরতির সময় অনেক স্থানীয় পণ্য বা প্রতিষ্ঠানের স্থির বিজ্ঞাপন দেখানো হতো, অনেক ক্ষেত্রে সরকারি প্রজ্ঞাপন বা নির্দেশনাও প্রচার করা হতো সিনেমাহলে। সবই করা হতো এ ধরনের স্লাইডের মাধ্যমে। এমনকি ‘শীঘ্রই শুভমুক্তি’– এমন সিনেমার স্থির বিজ্ঞাপনও থাকত স্লাইডেগুলোতে।


‘স্বর্পরাজ দুদু মিয়া’র জ্যান্ত
সাপ চিবিয়ে খাওয়ার
সদর্প ছবি আমাকে
আমার
শৈশব-কৈশোর
ঘুরিয়ে আনল এক চক্কর

হুমড়ি খেয়ে পড়লাম স্লাইডগুলোর ওপর। কত কত চেনা-অচেনা বিজ্ঞাপন যে চোখে পড়ল! নারায়ণগঞ্জ শহরের বিগত চল্লিশ-পঁয়তাল্লিশ বছরের ইতিহাস যেন স্লাইডের ছবি আর বার্তায় আমার সামনে জ্যান্ত হয়ে চলতে শুরু করল। সেই কবে উজবেক ভলিভল দল নারায়ণগঞ্জে খেলতে এসেছিল, সেই ম্যাচের টিকেটের বিজ্ঞাপন, একাধিক জাতীয় নির্বাচনের প্রজ্ঞাপন, পরবর্তীকালে বিখ্যাত হওয়া কিংবা কালের গর্ভে বিলীন হয়ে যাওয়া অনেক প্রতিষ্ঠান কিংবা আমার ছোটবেলায় দেখা ‘স্বর্পরাজ দুদু মিয়া’র জ্যান্ত সাপ চিবিয়ে খাওয়ার সদর্প ছবি আমাকে আমার শৈশব-কৈশোর ঘুরিয়ে আনল এক চক্কর।

অনেক স্লাইড নষ্ট হয়ে গেছে অযত্নে আর ব্যবহৃত না হতে হতে, অনেকগুলো অতি ব্যবহারে। পরিষ্কার আর মেরামত করার পর আমরা সর্বাধিক সংখ্যক স্লাইড একটা ব্যাকলিট টেবিলে সাজানোর পরিকল্পনা করলাম। সদ্য বিলুপ্ত আশা-মাসারের দ্রষ্টব্য অন্য জিনিসগুলো সাজিয়ে রাখলাম ‘সিনেস্কোপ’-এর দর্শক অপেক্ষা করার লাউঞ্জে। শৈশবে যে স্লাইড প্রজেক্টরটি সম্বল করে সিনেমাহল বানানোর খেলায় মেতে উঠেছিলাম, তার আদলে একটি প্রজেক্টরও বানিয়ে ফেললাম স্লাইড প্রদর্শনের টেবিলের অংশ হিসেবে, সেখান থেকে পাশের দেয়ালে প্রজেক্ট করে দিলাম একটি স্লাইড।

“বিজ্ঞপ্তি”
বৈদ্যুতিক গোলযোগ বা যান্ত্রিক গোলযোগের দরুন
হঠাৎ প্রদর্শনী বন্ধ হয়ে গেলে টিকেটের পয়সা
ফেরত দেওয়া হবে না।
–কর্তৃপক্ষ
আশা প্রেক্ষগৃহ

সিনেস্কোপ উদ্বোধনের দিনে নির্ধারিত আনুষ্ঠানিকতার পর আমন্ত্রিত অতিথিদের নিয়ে এলাম এই আয়োজন দেখাতে। সাধারণ মানুষও আগ্রহ নিয়ে ভীড় করে দেখতে থাকল এই প্রদর্শনী। টুকরো টুকরো অনেক কথা কানে এলো, অনেককেই নস্টালজিক হতে দেখলাম। আবার অনেক তরুণ, যাদের সিনেমাহলে যাওয়ার অভিজ্ঞতা পর্যন্ত নেই, তারাও দেখলাম বেশ উৎসাহ দেখাচ্ছেন ‘আশা-মাসার’ থেকে সংগ্রহ করা এই এক্সিবিটগুলোর প্রতি।

সব দেখে শুনে মনে হলো, বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া সিনেমাহলগুলোর ব্যবহৃত স্মারক নিয়ে একটা জাদুঘর তো তৈরি করাই যায়!

হরিষে বিষাদ!

‘সিনেস্কোপ’-এর অবস্থান যেই বিল্ডিংয়ে, আলী আহাম্মদ চুনকা নগর পাঠাগার ও মিলনায়তন, তার ঠিক একটা বিল্ডিং আগেই নারায়ণগঞ্জের আরেক ঐতিহ্যবাহী সিনেমাহল, ‘ডায়মন্ড টকিজ’। এটা এতটাই বিখ্যাত যে এলাকার নামই হয়ে গেছে ডায়মন্ড চত্বর।

সিনেমাহলটা বন্ধ হয়ে গেছে অনেকদিন আগেই, সেখানে তৈরি হবে হাইরাইজ শপিং কমপ্লেক্স। তবে কোনো একটা জটিলতার কারণে বিল্ডিংটা তখনো ভাঙা শুরু হয়নি। লতায়-পাতায় পরিচয়ের সূত্রে যোগাযোগ করলাম সম্পত্তি হাতবদল হওয়ার পর এখন যারা ডায়মন্ডের মালিক, তাদের সাথে। আশা করেছিলাম যেহেতু বিল্ডিংটা ভাঙা শুরু হয়ন্‌ এখানেও মণি-মাণিক্য কিছু পেয়েই যাব।

কিন্তু প্রচণ্ড হতাশ হতে হলো। ডায়মন্ডের জমির বর্তমান মালিকপক্ষের সিনেমার ব্যাপারে কোনো আগ্রহই নেই, আর পুরানো সব মেশিনপত্র তারা লোহা-লক্কড়ের ভাঙারি হিসেবে অনেক আগেই বিক্রি করে দিয়েছেন!

মনটা ভারি হয়ে গেল। প্রায় সত্তর বছর ধরে দাপটের সাথে চলল যে সিনেমাহল, তার কোনো চিহ্নমাত্র রাখতে পারলাম না। সিদ্ধান্ত নিলাম, এরপর থেকে কোনো সিনেমাহল বন্ধ হওয়ার খবর পেলে সাথে সাথেই সেখানে হাজির হব।

গুপ্তধনের সন্ধানে

প্রথম আলো পত্রিকার বিনোদন পাতায় একদিন দেখলাম, কাকরাইলের বিখ্যাত ‘রাজমণি’ সিনেমাহল ভেঙে ফেলা হচ্ছে। হলের কর্ণধার আহসান উল্লাহ মণির বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, প্রায় ৩৭ বছরের পুরানো এই হল ভেঙে তৈরি করা হবে ২২ তলা বাণিজ্যক ভবন; তবে সেখান সিনেপ্লেক্স জাতীয় কিছু থাকবে না।

কোথায় যেন একবার পড়েছিলাম এমন একটা নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়েছে যে, সিনেমাহল ভেঙে কোনো বাণিজ্যিক স্থাপনা করতে হলে সেখানে সিনেপ্লেক্স রাখা বাধ্যতামূলক। রাজমণি কর্তৃপক্ষ কি তা জানে না? কত কথাই তো হাওয়ায় ওড়ে, আর আমাদের বেশিরভাগ সিদ্ধান্তই তো বায়বীয়!

নিতান্ত বিপদে না পড়লে আমি সাধারণত ঢাকায় আসি না। ভাঙতে শুরু করা ‘রাজমণি’ আমাকে বিপদের বার্তা দিল, অন্য কাজ ফেলে তাই রওয়ানা হলাম কাকরাইলের উদ্দেশ্যে। সিনেমাহল জাদুঘরের জন্য এখান থেকে ভালো কিছু এক্সিবিট সংগ্রহ করার এটাই মোক্ষম সময়, পরে গেলে আবার না সব ভাঙারির দোকানে চলে যায়!


‘রাজিয়া’
ছিল কেবল
মহিলা দর্শকদের জন্য

আসা যাওয়ার পথে বহুবার এই সিনেমাহলটি চোখে পড়েছে, সিনেমাপাড়া হিসাবে খ্যাত এই এলাকায়ও গিয়েছি কয়েকবার; কিন্তু রাজমণি বিল্ডিংয়ে ঢোকা হয়নি কখনো। আর তাই খেয়ালও করিনি একই বিল্ডিংয়ে ‘রাজিয়া’ নামে আরেকটি কম আসনের ছোট সিনেমাহলও ছিল। জেনে আরও অবাক হলাম, ‘রাজিয়া’ ছিল কেবল মহিলা দর্শকদের জন্য। দেখলাম ‘রাজিয়া’র অংশটাতেই ভাঙা-ভাঙির কাজ শুরু হয়েছে প্রথমে।

‘রাজমণি’র গেটে যেতেই দারোয়ান পথ আটকালেন। কাকে চাই, কী উদ্দেশ্য… ইত্যাদি প্রশ্ন শুরু করার চেষ্টা করতেই তাকে সুযোগ দিলাম না। আমার একটা ভিজিটিং কার্ড তার হাতে দিয়ে বললাম, ‘মণি ভাইকে এটা দিয়ে বলেন, নারায়ণগঞ্জ থেকে নূরুজ্জামান সাহেব এসেছেন।’

মণি সাহেবকে চেনা তো দূরের কথা, ভদ্রলোকের নামই জেনেছি আজকের পত্রিকা মারফৎ! এই ভিজিটিং কার্ড থেরাপিতে কাজ হলো। সালাম দিয়ে দারোয়ান আমাকে ওপরের সিঁড়ি দেখিয়ে দিল।

বিষণ্ন যক্ষ!

দোতলায় সুপরিসর লবি, একদিকে টিকেট কাউন্টার, ক্যান্টিন, টয়লেট আর ওয়েটিং লাউঞ্জ বরাবর একটা রিসিপশন ডেস্ক মতো টেবিলে বসে আছেন হলের ম্যানেজার। তাকে গিয়ে বললাম, মণি সাহেবের সাথে দেখা করতে চাই। আবারও ভিজিটিং কার্ড দিলাম, উনি সেটাতে একবার চোখ বুলিয়েই একজনকে দিয়ে কার্ডটা ভেতরে পাঠিয়ে দিলেন। নারায়ণগঞ্জ থেকে এসেছি জেনে বললেন, ‘আপনি কি স্যারের গ্রামের লোক?’

আমি কিছু বুঝতে পারলাম না। উনি আমার অবস্থা বুঝলেন।

‘স্যারের বাড়ি নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়। নারায়ণগঞ্জ থেকে যারা আসেন, তারা সবাই মোটামুটি তার আত্মীয়-স্বজন, না হয় বন্ধু-বান্ধব।’

কারও সাথে সম্পর্ক তৈরির আগে একটা রেপোর্ট তৈরি করে ফেলতে পারলে অনেক ক্ষেত্রেই কাজ সহজ হয়ে যায়। পরিচিত হতে যাওয়া ব্যাক্তির সাথে নিজের কোনো একটা মিল খুঁজে বের করে সেটাকে কার্যকর উপায়ে ব্যবহার করতে পারার এই বিশেষ গুণটি আমার নেই। তারপরেও কাকতালীয়ভাবে ‘রাজমণি’র মালিকের দেশি লোক হয়ে যাওয়ায় একটা অ্যাডভান্টেজ পাওয়ার ব্যাপারে আশা জাগল। এই ফাঁকে ম্যানেজার সাহেবের নাম জানা গেল, জিয়াউল ইসলাম।

জানলাম, আজ সকাল থেকেই একের পর এক বিভিন্ন পত্র-পত্রিকার সাংবাদিকরা আসছেন, কয়েকটা টিভি চ্যানেলের ক্যামেরা হলের জায়গায় জায়গায় ঘুরে বেড়াচ্ছে এখনো, দুটা চ্যানেলের লোক বসে আছে ইন্টারভিউর জন্য। মণি সাহেব ঠিকমতো লাঞ্চও করতে পারেননি দুপুরে।


মনে
হলো লাশ
দাফন হওয়ার
আগেই আমি যেন
কোনো মৃত ব্যক্তির
ব্যবহৃত একটা জামা
চাইতে এসেছি তার
পরিবারের
কাছে

ম্যানেজার সাহেব এবার আমার আগমনের উদ্দেশ্য জানতে চাইলেন। লোকটাকে ধুরন্ধর মনে হলো না; তাই তার সাথে কথা চালাতে কোনো রাখঢাক করলাম না। সোজা বলে দিলাম, আমি বিলীন হতে যাওয়া এই সিনেমাহলের স্মৃতি বহন করে– এমন কিছু জিনিস সংগ্রহ করতে এসেছি। বুঝে উঠতে পারলাম না, ভদ্রলোকের চেহারা কেমন যেন শোকাচ্ছন্ন হয়ে উঠল নিমিষেই। মনে হলো লাশ দাফন হওয়ার আগেই আমি যেন কোনো মৃত ব্যক্তির ব্যবহৃত একটা জামা চাইতে এসেছি তার পরিবারের কাছে!

‘ভাই, আপনি করেন কী?’

আমার পেশাগত পরিচয় দিলাম। একটু ইতস্তত করেই বললাম, এর বাইরে সিনেমা নির্মাণ আর প্রযোজনা শুরু করেছি। সেই সাথে এটাও জানালাম যে, মাসখানেক আগে আমি ‘সিনেস্কোপ’ নামে একটা সীমিত আসনের সিনেমাহল চালু করেছি নারায়ণগঞ্জে।

আগেও বহুবার বহুজনের কাছ থেকে যা শুনেছি, জিয়াউল ইসলামও একই কথা বললেন, সম্মানজনক আর অর্থসম্ভাবনাময় একটা পেশায় থেকেও কেন সিনেমার লাইনে নামলাম! আমি লক্ষ্য করেছি, সিনেমায় আগ্রহ আছে শুনলে সবাই ‘সিনেমায় নামা’ শব্দবন্ধটা ব্যবহার করে। তাহলে কি সিনেমায় জড়ানো মানেই নেমে যাওয়া? অবনমন? একশো পচিঁশ বছর পেরুনো এই গণমাধ্যম আমজনতার কাছে এখনো কেবল বিনোদনই রয়ে গেল; শিল্প আর হয়ে উঠল না! আবার সেই বিনোদনও কেমন এক নিষিদ্ধ গন্ধযুক্ত বিনোদন, যা থেকে মজা নেওয়া যায়; কিন্তু তার গন্ধ নিজের গায়ে মাখা যায় না!

তার সাথে আমার এত ভাববাদী বিষয়ে আলোচনার প্রশ্নই আসে না, আর উনিও সব বাদ দিয়ে চলে গেলেন মূল প্রশ্নে: ‘হল না হয় বানাইলেন, চালাইবেন কী?’

কথা সত্য, এই প্রশ্নের কোনো ভালো জবাব আমার কাছে নেই। তাই মনোযোগ দিয়ে দেয়ালে লাগানো কিছু পুরানো সিনেমার পোস্টার আর ব্যানার দেখতে লাগলাম। ভালোবাসার তাজমহল নামে সিনেমার একটা বড় ব্যানারে দেখলাম; প্রযোজক হিসেবে ‘রাজমণি’র মালিক আহসানউল্লাহ মণির নাম।


‘এই যে
এখন যেই
সিনেমা হইতেসে,
এগুলা কোনো সিনেমা?
না আছে কাহিনি, না
আছে ডায়লগ,
না গান,
না
নায়ক-নায়িকা!’

ভেতর থেকে ডাক আসতে দেরি হচ্ছে দেখে ম্যানেজার সাহেব একজনকে চা আনতে বললেন। তখনও তিনি পুরানো প্রসঙ্গ ভোলেননি: ‘এই যে এখন যেই সিনেমা হইতেসে, এগুলা কোনো সিনেমা? না আছে কাহিনি, না আছে ডায়লগ, না গান, না নায়ক-নায়িকা!’

সদ্য মুক্তিপ্রাপ্ত একটা সিনেমার পোস্টারের দিকে ইঙ্গিত করে বললেন, “দেখেন, সিনেমার নাম সাপলুডু, আমি পুরা সিনেমাটা দেখলাম। না পাইলাম সাপ, না পাইলাম লুডু! খালি একটা ডায়লগ আছে, ‘তুই আমারে নিয়া সাপলুডু খেলতে চাস?’ ব্যস, এই কারণেই সিনেমার নাম হইয়া গেল সাপলুডু!’

পকেট থেকে সিগারেটের প্যাকেট বের করে সিগারেট জ্বালাতে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন জিয়াউল ইসলাম। দুটা খালি কাপ আর ভেজা কাগজে ঢাকা দেওয়া একটা টিনের কৌটায় চা চলে এসেছে। কৌটা থেকে চা ঢেলে একটা কাপ আমার দিকে বাড়িয়ে আরেক কাপে নিজে চুমুক দিলেন ম্যানেজার: ‘পাব্লিক কি ভোদাই, পকেটের টাকা খরচ কইরা এই ছবি দেখতে আসব! এখন মোবাইলেই সারা দুনিয়ার সব হিট ছবি দেখা যায়।’

আমি এবারেও চুপ, দেখি উনি আর কী কী বলেন! সিনেমা নিয়ে জীবন পার করে দেওয়া এই মানুষগুলোর সিনেমা সম্পর্কে ধারণাটা জানা দরকার।

‘এই ছবিটা কে বানাইসে জানেন? আমজাদ হোসেনের ছেলে। বাপে কত হিট হিট ছবি বানাইসে, আর পোলায় কি বানায়! আসলে এইটা তো আর পৈত্রিক সম্পত্তি না যে বাপের গুণ ছেলেও পাইব!’

আমি মন দিয়ে জিয়াউল ইসলামের কথা শুনে যাচ্ছি।

‘কত সুন্দর সুন্দর সব সিনেমা হইত আগে, টিকেটের জন্য লাইন পইড়া থাকত সারাদিন। এই হলে আসার আগে আরও কয়েকটা হলে কাজ করসি গত ৩৫ বছর। বলতে লজ্জা লাগলেও স্বীকার করি, টিকেট ব্ল্যাকিংও করসি একসময়। দ্বিগুণ-তিনগুণ দাম দিয়া মানুষ ছবি দেখসে, এক ছবি পাঁচবার-দশবার দেখসে, খালি একটা গান দেখার জন্য টিকেট কাটসে! আর অহন মাগনা দিলেও কেউ টিকেট নিতে চায় না! এই দোষ কার?’

আমি উত্তর দেই না।

‘এই যে আমজাদ হোসেনের কথা বললাম, উনি কি জীবনে কম কামাইসে? তাইলে কেন মরণের আগে প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকা চিকিৎসার জন্য সাহায্য চাইতে হইল? টাকা কামাইসে আর উড়াইসে, রাখতে পারে নাই। ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিটাই এমন। কোনো কিছু ধইরা রাখতে পারে না।’

মনযোগী শ্রোতা পেয়ে ভদ্রলোক হয়তো আরও কিছু বলতেন, কিন্তু অর্ধেক চা খাওয়া অবস্থাতেই ভেতর থেকে আমার ডাক এলো। আবার কে ঢুকে পড়ে সেই আশঙ্কায় চা শেষ না করেই উঠে গেলাম।

ভ্রান্তি বিলাস

ভেতরে একটা খোলা লবি মতো জায়গায় দাঁড়িয়ে আছেন অনেক আগেই মাঝবয়স পার করে ফেলা মণি সাহেব। চোখে চশমা, কলপ করা মাথার চুলও বেশ পাতলা হয়ে এসেছে ভদ্রলোকের।

‘আপনি আসছেন নারায়ণগঞ্জ থেকে?’
আমি মাথা নাড়লাম।
‘চলেন।’

ডানদিকের করিডোরে আমাকে পথ দেখিয়ে মণি সাহেব একটা রুমের দরজা খুললেন। ভেতরে ঢুকে আলো জ্বালালেন। একটা চেয়ারে আমাকে বসতে বলে টেবিলের ওপারের রিভলভিং চেয়ারটাতে আরাম করে বসলেন তিনি। তার পেছনের দেয়ালে কাচে বাঁধাই করা এক যুবকের ছবি, নিচে নাম লেখা ‘আহসান উল্লাহ মণি’।

আমি চেয়ারে হেলান দেয়া প্রৌঢ় মণি সাহেবের চেহারার সাথে দেয়ালের ছবির যুবককে মেলাতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছি। বয়সের সাথে মানুষ এতটাই বদলে যায়! ঘরটা সিগারেটের ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন, ঝাঁজালো একটা গন্ধও আছে সাথে। আমি ধাতস্ত হতে না হতেই ভদ্রলোক সিগারেটের প্যাকেট খুলে আমার দিকে বাড়িয়ে দিলেন। আমি এতে অভ্যস্ত না জানালে নিজেই একটা সিগারেট ধরালেন।

‘সারাদিন ধইরা সাংবাদিকরা মাথা খারাপ কইরা ফেলতাসে। বলেন ভাই, আপনে আমার দেশের লোক, কী করতে পারি আপ্নের জন্য?’

আমি খুব সংক্ষেপে এবং যথাসম্ভব টু দ্য পয়েন্টে আমার অভিপ্রায় জানালাম। উনি কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলেন আমার দিকে।

‘কী করেন আপ্নে?’

আমি আমার পেশার কথা বললাম, সিনেমায় সংশ্লিষ্টতার কথা বললাম, ‘সিনেস্কোপে’র কথাও বললাম।

‘আমগো তো দেওয়ার মতো কিছু নাই, আর এগুলি নিয়া কি করবেন? যেইখানে সিনেমাহলই থাকব না, সেইখানে এইসব সাজায়া রাইখা কী লাভ?’

আমি নাছোড়বান্দা। সিনেমাহলের স্মৃতি সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে ছোট-খাটো একটা বক্তৃতা দিয়ে বললাম যে, আমি তার হলটা ভালো করে ঘুরে দেখতে চাই; আর নিশ্চয় এমনকিছু চেয়ে ফেলব না, যেটা আবদার করা যায় না বা যার দাম আমি দিতে পারব না!

আমার কথায় আশ্বস্ত হলেন কি না বুঝলাম না, উনি ড্রয়ার থেকে একটা ভিজিটিং কার্ড বের করে আমার দিকে বাড়িয়ে দিলেন: ‘আজকে তো ঝামেলায় আছি, আগামী সোম-মঙ্গলবার আমারে একটা ফোন দিয়া চইলা আইসেন, দেখি আপনার জন্য কী কী রাখা যায়!’

ভিজিটিং কার্ডে চোখ রাখতেই আমি চমকে উঠলাম, এ তো আহসান উল্লাহ মণি নয়! উনি শহীদুল্লাহ, পদবী লেখা এক্সিকিউটিভ। মিনমিন করে বললাম, ‘মণি সাহেবকে পাওয়া যাবে না?’

‘এই ব্যাপারেই কথা বলবেন, না অন্য কিছু আছে?’

‘অন্য কিছু না, এই ব্যাপারেই।’

‘দরকার নাই! আর হলের সব বিষয় আমিই দেখাশোনা করি। আগামী সপ্তায় আসেন।’

আমি উঠতে চাইলে আমাকে হাত ইশারায় বসালেন, বেল টিপে একজনকে চা আনতে বললেন। নারায়ণগঞ্জে কোথায় থাকি, কোন স্কুলে পড়েছি ইত্যাদি জিজ্ঞেস করতে করতে বেরিয়ে এলো আমরা পাশাপাশি মহল্লায় বড় হয়েছি। যদিও উনি আমার চাইতে অন্তত বছর বিশেকের বড়; তারপরেও দেখা গেল দুজনেরই ঘনিষ্ঠতা আছে এমন মানুষের সংখ্যাও নেহাৎ কম নয়!

অবশেষে প্রাপ্তিযোগ

কথায় কথায় গল্প জমে যায় শহীদুল্লাহ সাহেবের সাথে। ১৯৮৩ সালে কাকরাইলের এই ২৪ কাঠার প্লটটিতে স্ত্রী রাজিয়ার নামের প্রথম অংশ আর নিজের নামের শেষ অংশ মিলিয়ে মণি সাহেব ‘রাজমণি’ নামে চালু করেছিলেন এই সিনেমাহল। জানলাম মণি সাহেব সম্পর্কে ওনার চাচা হন, তবে হলের সব দায়িত্ব শহীদুল্লাহই সামলান। নিজে আরও একটা সিনেমাহল চালান, টুকটাক রিয়েল এস্টেট ব্যবসাও করেন। এই ‘রাজমণি’ সিনেমাহল দিয়েই তাদের ব্যাবসা-বাণিজ্যের উত্থান।

আরও জানলাম, তার চাচা ‘রাজমণি’কে শুধু একটা সিনেমাহলই বানাতে চাননি, চেয়েছিলেন কেবল শুটিং বাদে চলচ্চিত্রের আর বাকিসব কর্মকাণ্ডকে একই ছাতার নিচে নিয়ে আসতে।

শুরুর দিকে বাংলাদেশের চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্ট সব অফিস ছিল গুলিস্তান ও তার আশেপাশের এলাকায়। ‘রাজমণি’ চালু হওয়ার পর মণি সাহেব এখানে নিয়ে আসেন প্রযোজক আর পরিবেশকদের অফিস, রেকর্ডিং স্টুডিও, এডিটিং ল্যাব। এই বিল্ডিংয়ে জায়গার সঙ্কুলান না হলে পাশের বিল্ডিংগুলোতেও চলে আসতে থাকে চলচ্চিত্রের অফিসগুলো। জমজমাট হয়ে ওঠে এলাকা, আর কাকরাইল হয়ে যায় চলচ্চিত্রপাড়া। শুধু তাই নয়, মানুষের মুখে মুখে এলাকার নামই হয়ে যায় রাজমণির মোড়।

অশনি সংকেত। অ্যাকট্রেস: ববিতা। ফিল্মমেকার: সত্যজিৎ রায়

‘কত নামি-দামি স্টার আর প্রডিউসাররা যে প্রতিদিন আসত এই বিল্ডিংয়ে! এই যে আমরা এখন যেই রুমে বইসা কথা বলতাসি, এইখানে ঢুকতেই তো আপ্নের কয় মাস আগে থেকা সিরিয়াল দিতে হইত! এইটা ছিল ববিতা ম্যাডামের অফিস। সত্যজিৎ রায়ের অশনি সংকেত ছবি কইরা পুরস্কার পাওনের পর আমরা ওনার কাছ থেকা অফিসের ভাড়া নেই নাই, বাইশ বছর! আমরা গুণীর কদর করি।’

নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ এলাকার আঞ্চলিক টানে কথা বলা লোকটাকে অকপট বলেই মনে হতে থাকে আমার কাছে। সিনেমাহলের ব্যবসায় আয়-উন্নতির টাকাতেই যে তারা কাকরাইলের থ্রি স্টার হোটেল ‘রাজমণি ঈশা খাঁ’ বানিয়েছেন, তাও বলে ফেলেন সহজ-স্বাভাবিকভাবেই।

‘আমরা আরো কাজ করসি, সোনারগাঁয় বাংলার তাজমহলের নাম শুনসেন না? ঐটাও কিন্তু আমগই।’

উনি আরও কিছু বলতে যাচ্ছিলেন, একটা ফোনকল আসাতে থেমে গেলেন, ‘একটা মিনিট, সাংবাদিক ফোন করসে, খুব ইনফ্লুয়েন্সিয়াল পত্রিকার, একটু ধরি।’


কোনো
একটা সিনেমার
টিকেট না পেয়ে একবার
‘রাজমণি’ হলের গেট
ভেঙে ফেলেছিল
দর্শকরা

ফোনের অপরপ্রান্ত থেকে কী প্রশ্ন করা হচ্ছে তা শোনার উপায় নেই, তবে শহীদুল্লাহ সাহেবের জবাব শুনে ধারণা করতে পারছি, সেই ইনফ্লুয়েন্সিয়াল পত্রিকা বেশ গুরুত্বের সাথেই ‘রাজমণি’র বিলুপ্ত হওয়ার খবর ছাপতে যাচ্ছে। লম্বা সময় ধরে চলল তাদের কথোপকথন। সেই সূত্রে জানতে পারলাম, ‘রাজমণি’র জমিতে কোনো সিনেপ্লেক্স না হলেও সোনারগাঁয়ে তাদের একটা পর্যটন ও অবকাশ যাপন কেন্দ্র তৈরি হচ্ছে, সেখানে একটা আধুনিক প্রেক্ষাগৃহের পরিকল্পনা আছে। জানলাম, কোনো একটা সিনেমার টিকেট না পেয়ে একবার ‘রাজমণি’ হলের গেট ভেঙে ফেলেছিল দর্শকরা; যার প্রেক্ষিতে নতুন করে কলাপসিবল গেট বানাতে হয়েছিল, অতিরিক্ত নিরাপত্তা কর্মী নিয়োগ দিতে হয়েছিল দর্শক ঠেকাতে। আবার, পরিবারসহ কোনো একটা ছবি দেখতে এসে স্বয়ং বিচারপতিও টিকেট পাননি, তাদের জন্য তখন স্পেশাল বক্সের ব্যবস্থা করতে হয়েছিল।

এগুলো সবই সুখস্মৃতি। আবার বেদনাদায়ক স্মৃতি হচ্ছে, গত কয়েক বছরে অনেকবারই মাত্র চার-পাঁচজন দর্শক নিয়ে, এমনকি দর্শক ছাড়াও শো চালাতে হয়েছে তাদের।

পত্রিকার প্রতিবেদক বোধ করি এরপরে জিজ্ঞেস করেছিলেন একটা জমজমাট ব্যবসার এই করুণ পরিণতির কারণ সম্পর্কে। শহীদুল্লাহ সাহেব এর জবাব দিলেন আর দশজন হল-মালিকের মতোই, সারা বছর হল চালানোর জন্য যে পরিমাণ নতুন ছবি দরকার তা নেই, আর হিট ছবিরও প্রচণ্ড আকাল। কেবল ঈদের সময়কার ব্যবসা দিয়ে তো আর সারা বছর টিকে থাকা যায় না! এতগুলো স্টাফের বেতন, বিদ্যুৎ বিল, ভ্যাট সবকিছুই চলে মালিকের ভর্তুকির টাকায়। ঢাকা শহরের এমন হীরার টুকরা লোকেশনে ২৪ কাঠা জমি থাকতেও লাভ না করে স্রেফ সিনেমার প্রতি মায়া দেখিয়ে খামোখা লাখ লাখ টাকা ভর্তুকি দেওয়া যায় কতদিন!

ফোন রাখার পর আমি আর কৌতুহল দমিয়ে রাখতে পারলাম না: ‘চাহিদার চেয়ে নতুন সিনেমার সংখ্যা কম বললেন, ছবি নির্মাণ কমে যাচ্ছে কেন?’

‘আমি ক্যাম্নে কমু?’

উনি এড়িয়ে যেতে চাইলেও আমি মরিয়া হয়েই জবাবটা জানতে চাই, ‘এই ব্যাবসায় তো অনেকদিন আছেন, আবার দেখলাম মণি সাহেব প্রডিউসারও ছিলেন। আপনার অভিজ্ঞতাটাই বলেন।’

শহীদুল্লাহ সাহেব আরেকটা সিগারেট ধরালেন, ‘আপ্নেও তো বললেন, আপ্নে প্রডিউসার। ছবি বানাইতাসেন। টাকা ফিরত না আসলে আপ্নে কি পরের ছবিতে টাকা ঢালবেন?’

আমি উত্তর না দিয়ে বরং আরও একটা প্রশ্ন চাপিয়ে দেই তার ওপর, ‘তাইলে এখন যারা ছবি বানাচ্ছেন, তারা কেন ইনভেস্ট করতেসেন?’


‘এখন যারা ইনভেস্ট করতাসে,
তারা বেশিরভাগই
সিনেমার
লোক
না’

সিগারেটে একটা লম্বা টান দেন ভদ্রলোক: ‘এখন যারা ইনভেস্ট করতাসে, তারা বেশিরভাগই সিনেমার লোক না।’

চা চলে এসেছে, এই চায়ের চেহারা আগেরটার চেয়ে ভালো। আমি চায়ের কাপে চুমুক দেই, শহীদুল্লাহ সাহেবও চুমুক দেন: ‘কিছু নাম সর্বস্ব পরিচালক আছে, সিনেমার জ্ঞান নাই, কাজের প্রতি দরদ তো নাই-ই। কোনোদিন হয়তো কোনো পরিচালকের সেকেন্ড বা থার্ড অ্যাসিস্টেন্ট ছিল। এরা মনে করে ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিটা হইল চুইষ্যা খাওয়ার জায়গা। মনে করেন, সেই লোক কোনোভাবে হয়তো জানতে পারল বাদামতলীর অমুক চাউল ব্যবসায়ীর হাতে নগদ কিছু টাকা আছে, আর ফিল্মের প্রতি একটু মহব্বতও আছে, ধান্দা করল ঐ ব্যবসায়ীর ওপর দিয়া বছর খানেক মৌজমাস্তি কইরা কাটায়া দেওয়া যায় কি না! দুই-তিনটা হিন্দি আর তামিল ছবি জোড়াতালি মাইরা কোনোরকম একটা গল্প দাঁড়া করায়া সেকেন্ড গ্রেডের একটা নায়িকা নিয়া সোজা হাজির হইল চাউলের আড়তে। চা-নাস্তা খাইতে খাইতে ঐ ব্যবসায়ীরে পাম্প-পট্টি মাইরা আর লগের নায়িকারে দিয়া রিকোয়েস্ট করায়া তারে পটায়া ফালাইল সিনেমায় টাকা ঢালতে। হিসাব-টিসাব কইরা দেখায়া দিল, একদম টপ নায়ক-নায়িকা নিয়াও ক্যাম্নে দুই কোটি টাকায় ছবি বানায়া চার কোটি ফিরত আসে। চাউল ব্যবসায়ী এত টাকার রিস্ক নিতে রাজি হয় না, তখন খরচ কমানের জন্য হিরোর গ্রেড নামায়, শুটিং লোকেশন থাইল্যান্ড থেকা কক্সবাজারে আনে আর লগে কইরা আনা মেয়েটারে বানায় নবাগতা নায়িকা। ব্যবসায়ী চিন্তা করে, এক বছরে তার এক কোটি টাকা দ্বিগুণ হয়া যাইব আর পুরা বছরটাই নায়িকার সাথে ঘেঁষাঘেঁষিটা হইল ফাও। মূলত এই ফাওয়ের লোভেই ব্যাটা ছবি প্রোডিউস করে। ছবি হয় ছবির মতন, হল পায় না, পাইলেও টাকা ফিরত আসে না। আম-ছালা দুইটাই খোয়াইয়া প্রডিউসার আবার ব্যাক টু দ্য চাউলের আড়ত।’

‘হল পায় না কেন? আর পেলেও কেন টাকা ফেরত আসে না?’

‘দেখেন আমাগো রাজমণি হলটা হইল চলচ্চিত্র পাড়ার মইধ্যে, আমাগো হিসাব আলাদা। প্রডিউসার-ডিস্ট্রিবিউটর ঠাস কইরা আইসা দেখতে পারে কোন শোতে দর্শক কত, আমরাও চাওয়ার আগেই কখন কোন ছবি রিলিজ হইতাসে সেই নিউজ পাইয়া যাই, ছবির লাভের ভাগাভাগি লইয়া সরাসরি দেনদরবার করতে পারি। দুই পক্ষের জন্যই কাজটা সহজ। কিন্তু মনে করেন পঞ্চগড়ের একটা হলের কথা, ঐ লোকেরও ছবি নিতে কাকরাইল আসতে হইব আর প্রডিউসারেরও হিসাব নিতে লোক পাঠাইতে হইব পঞ্চগড়। এই ঝামেলা সহজ করার জন্য আছে বুকিং এজেন্ট, এরা ঠিক করে কোন ছবি কোন হলে চলব আবার কত টাকা বিক্রি হইল সেই হিসাবও তারা দেয় প্রডিউসাররে, বিনিময়ে কিছু কমিশন নেয়। এই পর্যন্ত ঠিকঠাক ছিল। কিন্তু ব্যবসা যখন খারাপ হইতে শুরু করল, তখন তো আর এই কমিশনের টাকায় তার পেট ভরে না! এদিকে দর্শক কম হইলেও হল মালিকের কিছু ফিক্সড খরচাপাতি আছে, আবার রিপ্রেজেন্টেটিভরে দিতে হয় সপ্তায় ১০৫০ টাকা। এই পরিস্থিতিতে একটা আপস রফা হয়া যায়, হলে ১০০ জন দর্শক হইলে রিপোর্ট পাঠায় ৫০ জনের, টিকেট ৫০ টাকা কইরা বেচলেও কাগজে কলমে দেখায় ৩০ টাকা। দিনশেষে এই রিপোর্টের উপ্রেই প্রডিউসার তার শেয়ার পায়, এর বাইরে হলের প্রজেক্টর ভাড়া বাবদ আট হাজার টাকাও দেয় প্রডিউসার। তাইলে বোঝেন, কত টাকা ফেরত আসতে পারে কোটি টাকা ইনভেস্ট কইরা? কোনো স্বচ্ছতা নাই, কোনো জবাবদিহিতা নাই। মুখে মুখে ছবি সুপারহিট কইলেও প্রডিউসার লোকসানে থাকে!’

‘প্রযোজক সমিতি কি বিষয়টাকে একটা শৃংখলার মধ্যে নিয়ে আসতে পারে না?’

‘প্রযোজক সমিতি বইলা তো কিছু ছিলই না অনেক বছর। নির্বাচন হইতাসিল না, প্রশাসক দিয়া চলতাসিল।’

‘কিছুদিন আগেই তো নির্বাচন হলো, নতুন কমিটি হলো।’

‘যারা ক্ষমতায় আসছে, তারাও তো নিয়মিত প্রডিউসার না। সমিতির নিয়ম হইল ইলেকশনের আগের দুই বছরের মধ্যে কোনো ছবি প্রডিউস না করলে কেউ নির্বাচনের প্রার্থী হইতে পারব না। নির্বাচিত দুইজন গত দুই বছরের মধ্যে প্রডিউস করে নাই। উপবিধির ফাঁক-ফোঁকর বাইর কইরা নিয়মিত প্রযোজকদের কাছ থেকা পাওয়ার লইয়া তারা নির্বাচন করসে। প্রশাসকের আমলে কিছু টাকা জমছিল, ঐটা ভাগবাটোয়ারার একটা রাস্তা হইসে আরকি! ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি গোল্লায় গেলেও ওনাগো কিছু আসে যায় না।’

‘এই অবস্থা চলতে থাকলে তো দেশে সিনেমা বানানোই বন্ধ হয়ে যাবে, আর নতুন সিনেমাহল তৈরির তো প্রশ্নই আসে না!’

‘আমরা হইলাম হুজুগের দেশের মানুষ। কেউ যদি খালি কয়, অমুক ছবি ২০ কোটি টাকা ব্যবসা করসে, তাইলে আবারও কিছুদিনের জন্য ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি খাড়ায়া যাইতে পারে। কিন্তু টিকব কি না, গ্যারান্টি নাই। শেয়ার বাজারের অবস্থা দেইখা বোঝেন না আমাগো চরিত্র! এক বেদের মেয়ে জোসনা হিট করার পর গ্রামে গ্রামে বাঁশের বেড়া দেওয়া সিনেমাহল তৈরির হিড়িক পইড়া গেল। সেগুলা বইসা যাইতেও কিন্তু টাইম লাগে নাই!’

‘তবে সিনেপ্লেক্সের সংখ্যা কিন্তু বাড়ছে।’

‘সিনেপ্লেক্সে যায় কারা? বড়লোকের ইয়াং পোলাপান। এরা তো আর সিনেমার আসল দর্শক না। এরা যায় আমোদ-ফূর্তি করতে, টাইম পাস করতে। খাইতে যায়, শপিং করতে যায়, ফাঁকে এক শো সিনেমা দেখে পপকর্ন চাবাইতে চাবাইতে। আমার ধারণা, এদের অনেকেই এসিঅলা অন্ধকার ঘর পাইলে বান্ধবী লইয়া এমনি এমনি টিকেট কাইটা দুই ঘণ্টা কাটায়া আসত, সিনেমা না চললেও আফসোস করত না। এদের দেইখা সিনেমার উন্নতি-অবনতি বিচার করতে যাইয়েন না।’

আমি আরও কিছু বলতে যাচ্ছিলাম, শহীদুল্লাহ সাহেব সিসি টিভির মনিটরে আঙুল নির্দেশ করলেন, ‘যেই রকম ডিরেক্টরের কথা বলসিলাম, ওই রকম একজন আসতাসে, দেখেন।’

আমি মনিটরে তাকাতেই একজনের নাম ধরে তাকে রুমে ঢুকতে বললেন তিনি। সাথে সাথেই গাল বসে যাওয়া মধ্য ত্রিশের এক যুবক রুমে ঢুকে আমার পাশের চেয়ারে বসে পড়লেন: ‘না দেইখাই আপ্নে ক্যাম্নে বুঝলেন, আমি আসছি?’

শহীদুল্লাহ সাহেব মনিটরের দিকে তাকান, যুবকও ঘাড় ঘুরিয়ে মনিটর দেখে: ‘আপ্নের চৌখও ভাই, মাশাল্লাহ!’

যুবক কেমন যেন একটু ছটফট করছে বলে মনে হয় আমার কাছে: ‘একটা সিগ্রেট দেন তো!’

শহীদুল্লাহ সাহেব সিগারেটের প্যাকেট দেন, যুবক একটা সিগারেট বের করে বেশ কায়দা কসরত করে সেটা ধরায়: ‘ভাই, আপ্নে যেই গল্পটার কথা বলসিলেন, আমার কিন্তু ফাটাফাটি লাগসিল। খামাখা ডরায়া পিছায়া গেলেন। ঠিকঠাক মতো বানাইলে নিশ্চিত সুপারহিট!’


‘ফিল্ম
ইন্ডাস্ট্রি
যখন ছাইড়াই
দিতাসেন, একটা
ভালো ছবি উপহার দিয়া যান!’

শহীদুল্লাহ সাহেব একবার আমার দিকে আর একবার সেই পরিচালকের দিকে তাকান। যুবক খুব কনফিডেন্ট, কে কার দিকে তাকাচ্ছে সেদিকে তার চোখ নেই: ‘আপ্নে খালি বললেই কিন্তু আমি প্রডিউসার ম্যানেজ কইরা ফেলতে পারি। ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি যখন ছাইড়াই দিতাসেন, একটা ভালো ছবি উপহার দিয়া যান!’

সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত হয়ে গেছে অনেক আগেই। আমার নারায়ণগঞ্জ ফিরতে হবে। নতুন স্বপ্নের ইতিবৃত্ত শুনতে বসলে শেষ বাসটাও মিস করে ফেলতে পারি! পরের সপ্তাহে আবার দেখা হচ্ছে বলে শহীদুল্লাহ সাহেবের রুম থেকে বেরিয়ে আসি।


নভেম্বর, ২০১৯ 
Print Friendly, PDF & Email
ফিল্মমেকার; আর্কিটেক্ট । বাংলাদেশ ।। ফিচার ফিল্ম : আম কাঁঠালের ছুটি [সম্পন্ন, মুক্তির অপেক্ষায়]; মাস্তুল [নির্মিতব্য] ।। শর্ট ফিল্ম : জংশন; যাত্রা ।। প্রতিষ্ঠাতা : সিনেস্কোপ [সিঙ্গেল স্ক্রিন সিনেমা থিয়েটার, নারায়ণগঞ্জ]