চলচ্চিত্রের দুই কিং লিয়ার: ধ্রুপদী ও সমকালীন

341
কিং লিয়ার। ফিল্মমেকার: গ্রিগরি কোজিনৎসেভ

লিখেছেন: শুভদীপ ঘোষ

শেক্সপিয়ার [১৫৬৪-১৬১৬] পড়ার ঢের আগে সৌভাগ্য হয়েছিল শেক্সপিয়ার দেখার। এরিস্টটল প্রকল্পিত ট্র্যাজেডি বা গ্রিক ট্র্যাজেডি সম্পর্কে সুস্পষ্ট কোনো ধারণা তখনো ছিল না। সাধারণ ট্র্যাজিক বা বিয়োগান্তক ছবি দেখা বা লেখা হয়তো পড়া ছিল, কিন্তু এই কিং লিয়ার দেখার পর প্রথম অনুভব করি, এ একেবারে অন্য জাতের ব্যাপার। বলতে গেলে এই শতাব্দীর শুরুর দশকের মাঝামাঝি কোনো সময়ে প্রথম কিং লিয়ার দেখি এবং তাই থেকেই শেক্সপিয়ারের ট্র্যাজিডি সম্পর্কে আগ্রহ তৈরি হয়। শেক্সপিয়ার পড়তে উদ্বুদ্ধ হই এবং সর্বোপরি গ্রিক অলংকারশাস্ত্র সম্পর্কে আগ্রহ তৈরি হয়।

এরিস্টটলকে [৩৮৪-৩২২] মাইকেল মধুসূদন দত্ত [১৮২৪-১৮৭৩] বলেছিলেন ‘উরূপাখণ্ডের অলংকারশাস্ত্রগুরু’ [উরূপা-ইউরোপ]। এরিস্টটল প্রদত্ত ট্র্যাজিডির বিশ্ব বিখ্যাত সংজ্ঞাটি হলো– ‘ট্র্যাজিডি একটি ক্রিয়ার অনুকরণ; ক্রিয়াটি গম্ভীর, সম্পূর্ণ; তার একটি বিশেষ আয়তন আছে; তার প্রতিটি অঙ্গ স্বতন্ত্রভাবে ভাষার সৌন্দর্যে মনোরম; ক্রিয়াটির প্রকাশরীতি বর্ণনাত্মম নয়, নাটকীয়; আর এই ক্রিয়া ভীতি ও করুণার উদ্রেকের মধ্যে দিয়ে অনুরূপ অনুভূতিগুলির পরিশুদ্ধি ঘটায়।’

বোঝাই যাচ্ছে লিখিত বা অভিনীত নাটক সম্পর্কে কথাগুলো বলা হয়েছে। শেক্সপিয়ারের ট্র্যাজিডিগুলির শরীর এই ‘ভাব’ মণ্ডিত, এই ‘রস’-এ সিঞ্চিত। এর রূপ-রস-গাম্ভীর্যকে অক্ষুণ্ণ রেখে প্রকরণগত দিক থেকে চলচ্চিত্র নামক সম্পূর্ণ অন্য ধারার একটি শিল্প মাধ্যমের ভাষায় একে প্রকাশ করা কতটা কঠিন কাজ, বোঝাই যাচ্ছে!

কিং লিয়ার। ফিল্মমেকার: গ্রিগরি কোজিনৎসেভ

১৯৭১ সালে নির্মিত রাশিয়ান ছবি কিং লিয়ার সেই কাজই করেছিল চূড়ান্ত সার্থকভাবে! পরিচালকের নাম গ্রিগরি কোজিনৎসেভ [১৯০৫-১৯৭৩]। কিং লিয়ার রুশ ভাষায় অনুবাদ করেছিলেন রাশিয়ার প্রখ্যাত সাহিত্যিক বরিস পাস্তেরনাক [১৮৯০-১৯৬০]। কোজিনৎসেভ সেখান থেকে ছবিটি করেন, পিরিয়ড ড্রামা । গ্রিক ট্র্যাজিডিতে ট্র্যাজিডির নায়ক চরিত্রের ‘হামারতিয়া’র কথা আছে। নায়ক চরিত্রের ভাগ্য বিপর্যয় ট্র্যাজিডির অবশ্যম্ভাবী পরিণাম। নায়ক হবে সৎ, কিন্তু সম্পূর্ণ দোষমুক্ত নয়। কারণ সম্পূর্ণ নির্দোষ ব্যক্তির পতনে আমরা পীড়িত হই, কিন্তু তা আমাদের আনন্দ দেয় না । আবার সম্পূর্ণ অসৎ ব্যক্তির পতনে আমরা বেদনাবোধ করি না। অর্থাৎ ট্র্যাজিডি আমাদের বেদনার্ত করবে, আবার বুদ্ধিগ্রাহ্যও হবে। নায়কের পতনের মূলে থাকবে কোনো ত্রুটি বা প্রমাদ।

এই ত্রুটি চারিত্রিক ত্রুটি নাও হতে পারে। পরিপার্শ্ব অবধারিতভাবে তাকে কোনো কিছু সর্বনাশা কাজ করতে বাধ্য করতে পারে, কিংবা কোনো ভুল সিদ্ধান্ত তার পতন ডেকে আনতে পারে। এর অর্থ নিশ্চয়ই এই নয় যে মানুষ সর্বদা নিয়তিচালিত, তার কর্মের স্বাধীনতা নেই। অবশ্যই আছে। তবু সে অবস্থার শিকার। কোনো ভুল সে করবেই। এরিস্টটল নায়কের এই ভাগ্যবিপর্যয়ের কারণের নাম দিয়েছিলেন ‘হামারতিয়া’ বা ত্রুটি।

লিয়ারের ‘হামারতিয়া’ কী? ছোট মেয়ে কর্দেলিয়ার প্রতি নেওয়া সিদ্ধান্ত নাকি বাকি দুই মেয়ের ভালোবাসার ছলনায় ভোলা? নাকি ক্ষমতার চিরন্তন সংঘাতের ব্যাপারে অবগত থেকেও তার পরিণামের ব্যাপারে অদূরদর্শিতা? এই নিয়ে আজও নানা মুনির নানা মত। এখানেই শেক্সপিয়ারের মতো মহাশিল্পীরা কাল অতিক্রম করে যান।

কিং লিয়ারের চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন রাশিয়ার প্রখ্যাত অভিনেতা ইউরি ইয়ার্ভেত [১৯১৯-১৯৯৫]। ইউরি ইয়ার্ভেতকে মূল চরিত্রে নির্বাচন করে ছবির পরিচালক বিশেষ বিচক্ষণতার পরিচয় দিয়েছেন। এই নির্বাচনই অর্ধেক কাজ করে দেয়। ইয়ার্ভেতের মুখের মধ্যে এমন একটা প্যাথোস আছে যা লিয়ারের চরিত্রের সঙ্গে অভাবনীয়ভাবে মানিয়ে যায়। সঠিক কাস্টিং কতটা গুরুত্বপূর্ণ তা একবার ইন্দির ঠাকরুণের চরিত্রে চুনিবালা দেবী ছাড়া অন্য কাউকে কিংবা জটায়ুর চরিত্রে সন্তোষ দত্ত ছাড়া অন্য কাউকে কল্পনা করার চেষ্টা করলেই বুঝতে পারা যায়।

এই ইয়ার্ভেত এক বছর পরে ১৯৭২ সালে রাশিয়ার আরেক প্রখ্যাত পরিচালক আন্দ্রেই তারকোভস্কির [১৯৩২-১৯৮৬] অসামান্য আধিভৌতিক কল্পবিজ্ঞান চলচ্চিত্র সোলারিস-এ অভিনয় করেছিলেন। সোলারিস-এর মূল চরিত্রে যিনি অভিনয় করেন, সেই দোনাতাস বানিওনিস [১৯২৪-২০১৪] আবার কিং লিয়ার-এ লিয়ারের বড় জামাইয়ের চরিত্রে অভিনয় করেছেন।

‘অনুভূতিগুলোর পরিশুদ্ধি’র কথা এরিস্টটল বর্ণিত ট্র্যাজিডির সংজ্ঞায় আছে, যেটা উপরে বলা হয়েছে; তাতে ‘পরিশুদ্ধি’ প্রতিশব্দটির মূল শব্দ হলো ‘কাথারসিস’। এই গ্রিক শব্দের অর্থ– পরিশুদ্ধি, মোক্ষণ, পবিত্রীকরণ। এটি নৈতিক বা ধর্মীয় অর্থ। শব্দটির অন্য অর্থটি চিকিৎসাশাস্ত্রগত– দেহের পরিশোধন।

কিং লিয়ার। ফিল্মমেকার: গ্রিগরি কোজিনৎসেভ

‘কাথারসিস’ নিয়ে এরিস্টটলের বক্তব্য ছিল– করুণা ও ভীতির আবেগ মানুষের মধ্যে আছে এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে অস্বস্তিকরভাবেই আছে। সেজন্য ট্র্যাজেডির উত্তেজনা মানুষের পক্ষে প্রয়োজনীয় ও ভালো। পুঞ্জীভূত আবেগের মোক্ষণ হলে চিত্ত স্বস্তি পায়, লঘু হয়। সেইজন্য এই স্বস্তিলাভের মধ্যে আছে এক হিতকারী আনন্দ।

এরিস্টটল চিকিৎসকের পুত্র ছিলেন। লুকাস এরিস্টটলের তত্ত্বকে ধিক্কার দিয়ে বলেছিলেন, ‘নাট্যশালা হাসপাতাল নয়।’ আবেগকে যে স্তরে ও যে গাম্ভীর্যে পৌঁছে দেওয়ার ইঙ্গিত এরিস্টটল করেছেন, বোঝা যায় ‘লার্জার দেন লাইফ’ চরিত্র ছাড়া সেটা একপ্রকার অসম্ভব। শেক্সপিয়ারের যুগে এ রকম চরিত্র ভাবতে গেলে রাজাদের ছাড়া ভাবা সম্ভব ছিল না। তাই তার ট্র্যাজিক চরিত্ররা প্রায় সবাই রাজা-রাজড়া বা সম্ভ্রান্তবংশীয়!


রাজার
পতনের সঙ্গে
অনেকটা যেন বীর্যপাতের
তীব্রতায় ঘটবে আমাদেরও
মননগত
মোক্ষণ

শুধু তাই নয়, এরিস্টটলের সূত্র ধরেই বোঝা যায়, ঐ স্তরে ও ঐ গাম্ভীর্যের আবেগের মোক্ষণের জন্য রাজারই ত্রুটিজনিত পতন প্রদর্শন প্রয়োজন; প্রজার নয়। নাহলে আমার-আপনার কী করে মনে হবে এত ক্ষমতার এত শৌর্য-বীর্যের রাজারই যদি এ দশা হয়, তাহলে আমরা তো কোন ছাড়! কিংবা আরেকভাবে দেখলে, নাট্যকারের মুনশিয়ানায় রাজার সঙ্গে আমাদের ঘটবে চরম একাত্মতা, নাটকের রাজার সঙ্গে আমরাও যেন শিকার হবো অমোঘ নিয়তির, রাজার পতনের সঙ্গে অনেকটা যেন বীর্যপাতের তীব্রতায় ঘটবে আমাদেরও মননগত মোক্ষণ, চোখ থেকে নিঃসৃত অশ্রু যেন মনে হবে নাভি থেকে উঠে এলো! আজকে যারা শেক্সপিয়ারের অভিযোজন করছেন, তারা এগুলো মাথায় রাখেন কি? মাছুরে কিংবা গ্যাং-লর্ড নিয়ে ভালো সিনেমা হতেই পারে। তাকে শেক্সপিয়ারের অভিযোজনও বলা যেতে পারে। কিন্তু তাকে শেক্সপিয়ারিও ট্র্যাজিডি বলা যাবে কি না, ভাবা প্রয়োজন!

শেক্সপিয়ারের ট্র্যাজিডির নান্দনিক অভিঘাতের ফলে দর্শকের মধ্যে যে মোক্ষণ বা কাথারসিস ঘটে– যার কথা এইমাত্র বলা হলো, তা ব্যক্তিগতভাবে নাটকগুলো পাঠ করার অনেক আগে টের পেয়েছিলাম এই গ্রিগরি কোজিনৎসেভের কিং লিয়ার দেখার সময়। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ছবির পরতে পরতে লেগে আছে ট্র্যাজিডির গম্ভীর ধ্বনি।


কোজিনৎসেভ
অনবদ্য ভঙ্গিমায়
ঝড় ওঠার পূর্বের গুমোট
পরিবেশের সঙ্গে লিয়ারের
মুখের অন্তরালের
হৃদয়কে মিলিয়ে
দিয়েছেন

দুটি ভাগে বিভক্ত ছবিটি। প্রথম পর্ব শেষ হয় বড়-মেজ দুই মেয়ের কাছ থেকেই প্রত্যাখ্যাত অর্ধোন্মাদ লিয়ারের ঊষর প্রান্তরে প্রবেশের পূর্বে। সারা আকাশজুড়ে মেঘের ঘনঘটা। কালো মেঘে ছেয়ে থাকা আকাশের প্রেক্ষাপটে লিয়ারের মুখ, কোজিনৎসেভ অনবদ্য ভঙ্গিমায় ঝড় ওঠার পূর্বের গুমোট পরিবেশের সঙ্গে লিয়ারের মুখের অন্তরালের হৃদয়কে মিলিয়ে দিয়েছেন। অতঃপর দিব্যন্মাদের পদচারণায় লিয়ারের সঙ্গী তার বিখ্যাত ভাঁড় বা বোকা, রেগান-কর্নওয়ালের প্রাসাদের দরজা বন্ধ হয়ে যাওয়ার পূর্বে লিয়ারের উক্তি– ‘ও ফুল, আই উইল গো ম্যাড!’

কোজিনৎসভের প্রাথমিক ও চিরকালীন প্রেম ছিল থিয়েটার। ফলত কোজিনৎসভের কিং লিয়ার চলচ্চিত্রে নাটকের প্রকরণ বা শৈলীর মিশ্রণ দেখতে পাওয়া যায়। দ্বিতীয় পর্বের সূচনায় গর্ভবতী কালো মেঘের গর্ভপাতে ঊষর প্রান্তর প্রবল ঝড়-বৃষ্টির কবলে পড়ে, সেই দুর্যোগের রাত্রে কায়-ক্লিষ্ট লিয়ারের সুতীব্র স্বগতোক্তি– ‘নো রেইন, উইন্ড, থান্ডার, ফায়ার আর মাই ডটার্স’– নাটকের দোর ভেঙ্গে অতি-নাটকে উপনীত হয়। কিন্তু একে অতি-নাটকের দোষে দুষ্ট বলে মনে হয় না, যেহেতু এর ঠিক পরের আশ্রয় পর্বটিকে [কেন্ট প্রদর্শিত] কোজিনৎসভ রূপ দিয়েছেন শান্ত-সমাহিত ভঙ্গিমায়। মেলোড্রামা ও ট্র্যঙ্কুইলিটিকে পাশাপাশি নিয়ে এসে চিত্রের ভাষাকে করেছেন সুগভীর।

কিং লিয়ার। ফিল্মমেকার: গ্রিগরি কোজিনৎসেভ

প্রাসাদের রাজা নেমে এসেছে সাধারণ খেটে খাওয়া গরিব মানুষের মাঝে! ব্যক্তিগত ক্ষয়ক্ষতি না হলে যা সে কোনোদিনও জানতে পারত না এবং জানতেও চাইত না সেই কথা ভেবে চারপাশের ঘুমন্ত মানুষগুলোর দিকে চেয়ে লিয়ারের উপলব্ধি, ‘ও, আই হ্যাভ টেকেন টু লিটল কেয়ার অফ দিস!’ কালের কৌতুক এমনই যে, সর্বেশ্বর রাজা আজ প্রজাদেরই মাঝে নেমে এসেছে, অথচ তাকে প্রজারা কেউ চেনেই না। রাজা ও প্রজাতে আজ প্রভেদ গেছে টুটে। কর্দেলিয়ার ফিরে আসা থেকে কর্দেলিয়ার আত্মহনন– ছবি এগিয়েছে বজ্রনিনাদে। ভাঙ্গা দেওয়ালের ফাঁক দিয়ে দূরে সমুদ্রের প্রেক্ষাপটে দড়িতে অনন্তের মধ্যে ঝুলতে থাকা কর্ডেলিয়ার মৃতদেহ ও তার সঙ্গে লিয়ারের ভুবনভেদী আর্তনাদ আজও বর্শার ফলার মতো বুকে বিঁধে আছে। অনন্ত শূন্যতার এ রকম দৃশ্য-ব্যঞ্জনা সিনেমার ইতিহাসে আর তৈরি হয়েছে কি?

সাদা-কালো মনোক্রোম ছাড়া এ ছবি স্রেফ ভাবা যায় না। এ ছবির সংগীত করেছিলেন স্বনামধন্য দিমিত্রি শোস্তাকোভিচ [১৯০৬-১৯৭৫] । ভাবুন এসব সেই যুগের ব্যাপার, যখন সিনেমায় সংগীত পরিচালনা করছেন জীবন্ত শোস্তাকোভিচ!

ধ্রুপদী নাটক-উপন্যাস থেকে অভিযোজনের কথা উঠলে স্বভাবতই একটা প্রশ্ন ওঠে, অভিযোজন মূলানুগ না হলে সেক্ষেত্রে নিজস্ব গল্প চিত্রনাট্যের আশ্রয় নেওয়া হলো না কেন? আবার আরেক ধরনের মতামত এই যে, কিং লিয়ার, হ্যামলেট, ওথেলোর মতো ধ্রুপদী নাটকের আজ আর কি মূল্য থাকে যদি না তার আত্মাকে সমকালীনতার শরীরে প্রকাশ করা যায়? আর সেটা করা যায় বলেই তো এগুলো ধ্রুপদী।

কিং লিয়ার। ফিল্মমেকার: জ্যঁ-লুক গোদার

মতামত যাই হোক, কিং লিয়ার-এর পথ ভাঙা অভিযোজনের কথা বললে যে ছবির কথা সর্বাগ্রে মনে পড়ে, তা হলো জ্যঁ-লুক গোদারের [১৯৩০-] কিং লিয়ার [১৯৮৭] । হীরকখণ্ড থেকে ঠিকরে বেরোনো বহু-কৌণিক আলোই আসলে হীরে, হীরকখণ্ডটির কথা কে আর জানতে চায়– সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় [১৯৩৩-২০০৫] বলেছিলেন! প্রখ্যাত ফরাসি পরিচালক জ্যঁ-লুক গোদারের চলচ্চিত্রও তাই!

চেরনোবিল পরমাণুচুল্লি বিপর্যয়ের পরবর্তী পৃথিবী [২৬ এপ্রিল ১৯৮৬] এ ছবির প্রেক্ষাপট। ফরাসি ন্যুভেল ভাগ বা নিউ ওয়েভের প্রতিনিধিমূলক এ ছবির প্রাথমিক চিত্রনাট্য লিখেছিলেন পিটার সেলার [১৯৫৭-], টম লুডি [১৯৪৩-] ও নরমান ম্যাইলার [১৯২৩-২০০৭]। সর্বাত্মক অভিযোজন তো নয়ই, নাটকটির স্বল্প কিছু সংলাপ ছবিতে রাখা হয়েছে মাত্র।

ছবিটি নির্মিত হয়েছে সুইজারল্যান্ডের ইয়ন, ভদ অঞ্চলে। গদার এখানেই প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করতেন। ফ্রান্স ও জার্মানির মধ্যবর্তী এই স্থান সমুদ্র ও জঙ্গলে ঘেরা। মূল তিনটি চরিত্র লিয়ার, কর্দেলিয়া ও এডগার। নাটকটির প্রথম অঙ্কের প্রথম দৃশ্যের চলচ্চিত্রীয় প্রতিরূপ হিসেবে এই তিন চরিত্রকে নিজেদের মধ্যে কিছু অর্থবহ [প্রথাগত অর্থে] কথা বলতে দেখা যায়। এছাড়া গোটা ছবিতে নাটক থেকে ব্যবহৃত অংশগুলো হলো– প্রথম অঙ্ক: দৃশ্য তিন ও পাঁচ; দ্বিতীয় অঙ্ক: দৃশ্য দুই, চার ও ছয়; চতুর্থ অঙ্ক: দৃশ্য ছয় ও সাত এবং পঞ্চম অঙ্ক: দৃশ্য তিন। তিন নম্বর অঙ্ক থেকে কিছুই নেই!

কিং লিয়ার এখানে ডন লিয়েরোর অনুকল্পে নির্মিত! এছাড়া ছবিতে আছেন উইলিয়াম শেক্সপিয়ার জুনিয়ার– যিনি তার পূর্বপুরুষের নাটকগুলো সংরক্ষণের দায়িত্ব নিয়েছেন ও আরও অনেক সাংস্কৃতিক সংরক্ষণও তার দায়িত্বে, কারণ চেরনোবিল বিপর্যয়ের পর মানুষের সাংস্কৃতিক সব কিছুই প্রায় বিনষ্ট হয়ে গেছে। এই রিটার্ন টু জিরো গোদারের প্রিয় থিম। আর আছেন জ্যঁ-লুক গোদার [স্ব-অভিনীত] নামের একজন রহস্যময় প্রফেসর, যিনি কোনো এক অজ্ঞাত কারণে ক্রমাগত নিজের হাতের জেরক্স করে চলেছেন! আর্টের রিপ্রডাকশন সম্পর্কে পরিচালকের এটা একটা কৌতুক।

কিং লিয়ার। অ্যাকটর ও ফিল্মমেকার: জ্যঁ-লুক গোদার

ছবির শুরুতে ইন্টারটাইটেলে আমরা দেখতে পাই ‘অ্যান অ্যাপ্রোচ’ লেখাটি! এক পর্যায়ে ঐ প্রফেসরের ছদ্মবেশে গোদার বলেন, ‘অ্যান ইমেজ ইস নট স্ট্রং বিকস ইট ইস ব্রুটাল ওর ফ্যান্টাস্টিক, বাট বিকস ইট ইস ডিসট্যান্ট এন্ড ট্রু।’ শুরুর দিকের গোদার ও পরের দিকের গোদারে অনেক পরিবর্তন আমরা দেখতে পাই, কিন্তু একটা ব্যাপারে তিনি চিরকাল অবিচল– কোনো টেক্সট বা পাঠ্যবস্তুকে নিয়ে কাজ করার সময় তাকে তার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে সম্ভাব্য সমস্ত অনুমানের ভেতর দিয়ে টেক্সটটির কাছ থেকে সরে এসে তাকে বিনির্মাণ করা। তাই, এই ‘অ্যান অ্যাপ্রোচ’!

ছবিতে আরেকজন মহোদয় আছেন যার বান্ধবী ভ্যালেরিয়াকে সবসময় দেখা যায় না। ছবিটিকে পরিশেষে সম্পাদনা করার জন্য নিউইয়র্কে মি. এলিয়্যানের কাছে পাঠানো হয়। এই এলিয়্যানের চরিত্রে অভিনয় করেছেন উডি অ্যালান [১৯৩৫-]! ছবিতে গ্রেগ্ররি কোজিনৎসেভও আছেন [বিখ্যাত সুইস জার্নালিস্ট, চলচ্চিত্র তাত্ত্বিক ও চলচ্চিত্র ইতিহাসবিদ ফ্রেডি বুয়াচি (১৯২৪-২০১৯) অভিনীত]। সাউন্ড ট্র্যাকে কোজিনৎসেভের কিং লিয়ার থেকে একটা অংশ শুনতেও পাই আমরা ছবির এক জায়গায়, পাশে কোজিনৎসেভ বসে আছেন।

ডন লিয়েরো ও তার মেয়ে কর্দেলিয়ার সম্পর্কের মধ্যে পূর্বে আলোচিত হামারশিয়ার প্রভাব দেখতে পাওয়া যায়। কর্দেলিয়া বাবার প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ করতে ব্যর্থ! এই টানাপড়েন শেক্সপিয়ারের অন্তর্বয়ানের সূত্র ধরে ক্ষমতা ও নৈতিকতার দ্বন্দ্বে সংস্থাপিত। মেয়ের এই ব্যর্থতা বাবাকে প্রবলভাবে যন্ত্রণা দেয়, সে কর্দেলিয়ার নীরবতাকেও নীরব করে দিতে চায়!

কিং লিয়ার। ফিল্মমেকার: জ্যঁ-লুক গোদার

ছবিতে এক জায়গায় আমরা দেখতে পাই উইলিয়াম শেক্সপিয়ার জুনিয়ার একটা রেস্টুরেন্টে বসে সুপ খাচ্ছেন। পাশের টেবিলে একজন বাবা ও মেয়ের মধ্যে কথোপকথন চলছে। উইলিয়াম শেক্সপিয়ার জুনিয়ার তৎক্ষণাৎ সেই কথোপকথন খাতায় লিখে নিতে শুরু করেন, সংলাপগুলো মূল কিং লিয়ার-এর! পূর্বে উল্লেখিত বিনির্মাণের সূত্র ধরে এভাবেই নতুন পরিবেশে কিং লিয়ার পুনর্নির্মিত হয়। ব্রেখটীয় ডিসিলিউসানমেন্টের এ এক দুর্দান্ত উদাহরণ।

গোদার শেক্সপিয়ারের অলৌকিক উপাদানকে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য চারটি ছায়াময় মানব-সদৃশ ব্যক্তিত্বকে দেখিয়েছেন! তারা সর্বত্র কেন্দ্রীয় চরিত্রগুলোকে অনুকরণ করে, কর্দেলিয়া এদের দ্বারা বিশেষ করে ভীত! যেমন প্রথমার্ধে দেখানো হয়েছে উইলিয়াম শেক্সপিয়ার জুনিয়ার যখন অনুপ্রেরণার সন্ধানে বনের চারপাশে হাঁটছেন, তখন মানব গবলিনগুলো তাকে অনুসরণ করছে। সারা মাথায় ইলেকট্রিক তার জড়ানো গোদার ইঙ্গিতবহুলভাবে কিং লিয়ার-এর ভাঁড় বা বোকার ভূমিকায় অবতীর্ণ।


প্রকৃত
প্রস্তাবে গোদার
বামপন্থী তাত্ত্বিক বার্টল্ট
ব্রেখটের ডিসিলিউসানমেন্টের
তাত্ত্বিক ভুবনের
অনুসারী

এ যাবৎ বর্ণনা থেকে এটা সুস্পষ্ট যে, কিং লিয়ার-এর প্রচলিত বয়ান থেকে এ ছবির ব্যবধান দুস্তর। প্রকৃত প্রস্তাবে গোদার বামপন্থী তাত্ত্বিক বার্টল্ট ব্রেখটের ডিসিলিউসানমেন্টের তাত্ত্বিক ভুবনের অনুসারী। ব্রেখটের নাটকে বা ব্রেখটীয় রীতির নাটকে ধীরে ধীরে তৈরি হওয়া মঞ্চ-মায়াকে হঠাৎ ভেঙ্গে দিয়ে রঙ্গমঞ্চের কুশীলবরা দর্শকদের সঙ্গে আলাপচারিতায় মেতে ওঠেন। যেন মনে করিয়ে দেন– ‘আপনারা যা দেখছেন তা বাস্তব নয়, বাস্তবের নকল নির্মিতি, এর মজা নিন কিন্তু এতে মজে যাবেন না, সর্বদা নিজের বাস্তব সম্পর্কে সজাগ থাকবেন।’ গোদারও এই ব্রেখটীয় রীতিকে নিয়ে এসেছেন নিজে স্ব-ভূমিকায় অভিনয় করে, বারবার ‘অ্যান অ্যাপ্রোচ’-এর অবতারণা করে এবং পরিশেষে গোটা ছবিটিকে সম্পাদনার জন্য পাঠিয়ে।

কিং লিয়ার। ফিল্মমেকার: জ্যঁ-লুক গোদার

বস্তুত কিং লিয়ার-এর সনাতন প্রতিরূপ নির্মাণের চাইতেও লিয়ারের বয়ানের অন্তর্বয়ান হিসেবে ক্ষমতা ও নৈতিকতার দ্বন্দ্বকে এবং তার সঙ্গে মৌলিক উপাদান হিসেবে শব্দ ও দৃশ্যের চিরাচরিত সম্পর্কে ভেঙ্গে দিয়ে গোদার হেঁটেছেন সম্পূর্ণ অন্য এক পথে। এখানেই নিজের লেখা কোনো গল্প নয়, কিং লিয়ার-এর প্রয়োজন। কারণ তা না হলে ক্ষমতা ও নৈতিকতার দ্বন্দ্বকে ইতিহাসের ঘূর্ণাবর্ত থেকে ছেঁকে এনে কীভাবে দেখানো যাবে ‘আজও চমৎকার’ভাবে কাজ করে চলেছে সত্যিকারের সমাজ ও রাজনীতির শরীরের ভেতরে পুরানো জীবাণুরই মিউটেটেড ফর্ম।

আজকের লেখা গল্পের মধ্যে তো ইতিহাস নামক সময়প্রবাহের কষ্টিপাথরের ঘষা থাকে না। এর জন্য শুধু গড়তে জানলে হয় না, জানতে হয় কীভাবে সম্পূর্ণভাবে ভেঙ্গে ফেলতে হবে। এবং ভাঙা থেকে গড়ার সময় ধ্রুপদী কালের সমকালীন পাঠের মধ্যেও যেন থাকে নতুন কিছু। গোদারের চেয়ে ভালো এই ব্যাপারটা আর কে পারতেন!

শেক্সপিয়ারের বিশ্বজোড়া অভিযোজনের যুগে সনাতনী কোজিনৎসেভ ও সমকালীন গোদার– এই দুই শেক্সপিয়ারের কথা আজ খুবই জরুরি বলে মনে হয়।

Print Friendly, PDF & Email
লেখক, সম্পাদক; কলকাতা, ভারত । আগ্রহের কেন্দ্রে রয়েছে প্রাচ্য-প্রতীচ্যের চলচ্চিত্র, সাহিত্য, দর্শন ও মনস্তত্ত্ব