আলমগীর কবিরের গদ্য । চলচ্চিত্র, প্রাসঙ্গিক কথা

0
299

লিখেছেন আলমগীর কবির 
রচনাকাল । ঢাকা, ২০ জুন ১৯৭৯


আলমগীর কবির [২৬ ডিসেম্বর ১৯৩৮-২০ জানুআরি ১৯৮৯]। আমাদের সিনেমার এই মাস্টার ফিল্মমেকারের তিনটি মাস্টারপিস সিনেমার পূর্ণাঙ্গ চিত্রনাট্য নিয়ে, চিত্রনাট্য শিরোনামেই যে মহাগ্রন্থটি প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৭৯ সালে, প্রাসঙ্গিক কথা শিরোনামে সেখানে যে ভূমিকাটি তিনি লিখেছিলেন, তা কেবল ‘ভূমিকা’ হয়েই থাকেনি, অমূল্য এক সিনে-গদ্যের আবেদন ধারণ করে আছে। সেটি অবিকল পুনঃমুদ্রণ করা হলো এখানে…  

আলমগীর কবির

তগুলো যুক্তিসিদ্ধ অর্থনৈতিক তথা ঐতিহাসিক কারণেই অন্যান্য শিল্পমাধ্যমগুলোর মধ্যে চলচ্চিত্রই সর্বাধিক প্রাতিচ্যিক। তাই যখন screenplay আক্ষরিকভাবে অনূদিত হয়ে চিত্রনাট্য নামে আধুনিক বাংলা ভাষায় সংযোজিত হয়, তখন খুব একটা ক্ষিপ্ত হবার কারণ বোধহয় থাকে না। কিন্তু যখন দেখা যায় বাঙালী চিত্রনির্মাতাদের অধিকাংশই চিত্রনাট্যকে নিছক চলমানচিত্রের নাটক হিসেবেই গণ্য এবং ব্যবহার করতে সদা তৎপর, তখন সত্যিকারের চলচ্চিত্র অনুরাগীদের ক্ষোভ অনুভব করা অযৌক্তিক নয়। চলচ্চিত্রের ভাষার প্রতি এই আপাত অবজ্ঞার মূল কারণ হয়তো এই শিল্পমাধ্যমের প্রতি শ্রদ্ধাবোধের অভাব [বাণিজ্যিক কারণে] বা নিছক অজ্ঞতা অথবা উভয়ের সংমিশ্রণ।

প্ল্যাস্টিক আর্ট, সংলাপ, সঙ্গীত

আধুনিক চলচ্চিত্রের অন্যতম আদিগুরু পুদভকিনের মতে আদর্শ scenario [বর্তমানের screenplay] হচ্ছে সেটিই, যার প্রতিটি শব্দকেই চলচ্চিত্রে রূপান্তর করা সম্ভব। কেননা চলচ্চিত্র হচ্ছে plastic art। পুদভকিনের এই সংজ্ঞার পর আজ প্রায় ষাট বছর অতিবাহিত। চলচ্চিত্রের ভাষা এখন অনেক জটিল এবং সমৃদ্ধ। কিন্তু সেই সনাতন সংজ্ঞাটি অদ্যাবধি পুরোপুরি স্বতঃসিদ্ধ।

চলচ্চিত্রের মূল উপাদান চিত্র, তবে নিছক মেকানিক্যাল অর্থে নয়। যেমন শিল্পোত্তীর্ণ সাহিত্যের মূল চরিত্র ভাষার রূপ-রস-গন্ধ আহরণে লেখকের বিদগ্ধ মুন্সীয়ানায়, নিছক ব্যাকরণসিদ্ধ বাক্যশ্রেণীর সমষ্টিতে নয়। চিত্রনাট্য চিত্রিত হলে দৃশ্যকে মূলত নিজ শক্তি বা আবেদনেই স্বতঃস্ফূর্তভাবে মূর্ত হতে হবে। শব্দ অর্থাৎ সংলাপ, সঙ্গীত বা effects-এর কাঁধে ভর করে নয়। সংলাপের প্রয়োজন হবে তখনই, যখন চিত্র একক শক্তিতে দর্শক মনোযোগকে সুষ্ঠুভাবে ধরে রাখতে পারবে না; অথবা সংলাপের সমন্বয়ে কোনো বিশেষ দৃশ্যের আবেদনকে আরো জোরালো করার জন্যে। এই কারণেই চিত্রনাট্যের সংলাপ বাস্তবের মতোই অপরিশীলিত। এর রূপ মোটামুটি সাদামাটা। কিন্তু বিশেষ বিশেষ স্থানে এগিয়ে এসে এক ধরনের বিস্ফোরণ ঘটিয়ে মিইয়ে পড়া দৃশ্যকে চাঙা করে তোলা এর প্রধান দায়িত্ব। চিত্রনাট্যে সংলাপের এই বিশেষ naturalist চরিত্র এবং নভেল থেকে স্বাতন্ত্র নির্দেশ করার জন্যেই এই গ্রন্থের চিত্রনাট্যের সংলাপে punctuation-এর সাধারণ রীতি মানা হয়নি।


প্লে-ব্যাক গীতি
চলচ্চিত্রের
ভাষার
অন্যতম শত্রু
 

সঙ্গীত বা অন্যান্য শব্দের ভূমিকাও সংলাপের মতোই। আবহসঙ্গীত যদি দৃশ্য বিবর্জিত হয়, তাও হয়তো সংলাপের মতোই অপূর্ণ এবং অপরিশীলিত বলে প্রতীয়মান হবে। কারণ সঙ্গীতের নিজস্ব ভাষায় পরিপূর্ণতা পাবার সুযোগ সত্যিকারের প্ল্যাস্টিক চলচ্চিত্রে অত্যন্ত সীমিত। প্লে-ব্যাক গীতি চলচ্চিত্রের ভাষার অন্যতম শত্রু। কারণ গান চলাকালে চলচ্চিত্রকে স্থবির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। অবশ্য মিউজিক্যাল ধরনের চিত্রের কথা আলাদা। তাতে গানের পূর্ণ রূপের স্থান সঙ্কুলান করতে naturalism-কে ইচ্ছে করেই নেপথ্যে রাখা হয়। চলচ্চিত্রে অভিনেতৃর মুখে অন্যের গলায় গান গাওয়ানোর মতো উদ্ভট ব্যাপার আর কী হতে পারে? কিন্তু এই দেশের চলচ্চিত্রাঙ্গনের অন্তর্নিহিত কয়েকটি অন্তর্বিরোধের ফলে যদিও এই গান লাগিয়ে এখনও চলচ্চিত্রের ভাষাকে আংশিকভাবে পঙ্গু করতে বাধ্য হচ্ছি, তবু ভবিষ্যতে এই প্রবণতা ত্যাগ করার ইচ্ছা পোষণ করি।

সীমানা পেরিয়ে

চিত্রগ্রহণ, কম্পোজিশন, শট ডিভিশন

কেবল বাংলাদেশ নয়, এই উপমহাদেশের অধিকাংশ ছবির যে কোনো দৃশ্যের চিত্রায়ণ পদ্ধতি একটু লক্ষ্য করলেই মনে হবে ক্যামেরা যেন কোনো থিয়েটার হলের দর্শকের আসনে উপবিষ্ট। একটি উদাহরণ। কোনো দৃশ্যে নায়ক শয্যাশায়ী। বাবা, মা, প্রেমিকা, বন্ধু-বান্ধব সবাই হাসপাতাল বা বাড়িতে দেখতে এসেছে। কিন্তু তারা বাস্তবানুগভাবে বিছানার চারদিকে জড়ো না হয়ে, ক্যামেরার দিকটি ছেড়ে বাকি তিন দিকে ক্যামেরায় মুখ দেখিয়ে ভীড় করেছে। অনেকটা গ্রুপ ফটো তোলার ঢংয়ে। এই কম্পোজিশনটি নিঃসন্দেহে বিগত যুগের থিয়েটার উদ্ভুত। শুনেছি, মহাপরাক্রান্ত নটসম্রাট শিশির ভাদুরীর নির্দেশে দর্শকের দিকে পেছন ফিরে মঞ্চে দাঁড়ানো, যে কারণেই হোক, সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ ছিল। বলাবাহুল্য রীতিটি স্বভাবতই তৎকালীন চলচ্চিত্রেও প্রবেশ করে এবং আজ পর্যন্ত নিশ্চিন্তে রাজত্ব করে যাচ্ছে। এরচেয়েও হাস্যকর উদাহরণ হলো নায়ক এবং নায়িকার আলিঙ্গনের দৃশ্য। বাস্তবে দুটি মানুষ আলিঙ্গন করলে কোনো দিক থেকেই একইসঙ্গে দুজনের মুখ দেখতে পাওয়া অসম্ভব। কিন্তু আমাদের ক্যামেরা-থিয়েটারের গুণে তাও সম্ভব হচ্ছে। কেন জানি না, এই পরিচালক বা চিত্রগ্রাহকদের ধারণা হয়েছে যে, একই শটে দুজনেরই মুখ দেখাতে না পারলে বোধহয় আলিঙ্গনের উষ্ণতায় ঘাটতি দেখা দেবে। ফলে এই acrobatic জড়াজড়ি। নায়কের পিঠের দিকে ক্যামেরা। তাই ঘাড় যতদূর সম্ভব সে বেঁকিয়ে ক্যামেরার দিকে মুখ দেবে। আর নায়িকা নায়কের গলার ওপর দিয়ে গলা বাড়িয়ে ক্যামেরায় প্রেমের শট দেবে। ব্যাপারটা শিল্পীদের জন্য সুখপ্রদ হওয়া দূরে থাকুক, অত্যন্ত অস্বস্তিকরও বটে। উভয় ক্ষেত্রেই যে কোনো সচেতন দর্শক বিরক্ত হতে বাধ্য। অথচ চালচ্চিত্রিক কম্পোজিশন এবং চিত্রগ্রহণের দ্বারা এই উভয় দৃশ্যকেই কেবল বিশ্বাসযোগ্যই নয়, নিবিড়তর এবং অর্থবহ করা যায়। সত্যিকারের চলচ্চিত্রে ক্যামেরাকে একটি উড়ন্ত lens-এর সাথে তুলনা করা যেতে পারে। চরিত্রগুলো ক্যামেরার অস্তিত্ব ভুলে বাস্তবানুগভাবে চলাফেরা ও কথোপকথন করে যাবে। ক্যামেরা উড়ন্ত লেন্স হয়ে বিভিন্ন চরিত্রের অর্থপূর্ণ প্রকাশভঙ্গী, সংলাপ এবং গতিবিধিকে সর্বাপেক্ষা আকর্ষণীয়ভাবে দৃশ্যায়িত করে যাবে যাতে করে গ্রন্থনার পরে sceneটি বিশ্বাসযোগ্যভাবে বাস্তবানুগ হয়, অথচ ক্যামেরার উপস্থিতি সরাসরি প্রতীয়মান হবে না। অর্থাৎ shot-division এবং চিত্রগ্রহণের পদ্ধতি এমনভাবে হবে যাতে করে ক্যামেরার position, angle elevation, movement ইত্যাদির সুষম ব্যবহার দৃশ্যটিকে সাফল্যজনকভাবে দর্শকের কাছে উপস্থাপন করবে।


কেবল বাংলাদেশ নয়,
এই উপমহাদেশের অধিকাংশ ছবির
যে কোনো দৃশ্যের চিত্রায়ণ পদ্ধতি
একটু লক্ষ্য করলেই মনে হবে
ক্যামেরা যেন কোনো থিয়েটার হলের
দর্শকের আসনে উপবিষ্ট 

অধিকাংশ চলচ্চিত্রে চিত্রগ্রহণের রীতি দ্বিবিধ। (১) mise-en-scene [মিজ-অঁ-সীন] পদ্ধতি; (২) স্থির, বা চলমান ক্যামেরা দিয়ে বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে কেটে কেটে চিত্রগ্রহণ করার পদ্ধতি। মিজ-অঁ-সীন পদ্ধতিতে ক্যামেরা সচল। দৃশ্যানুযায়ী গতিময়-স্থির-গতিময় পদ্ধতিতে ক্যামেরা একটি পূর্বপরিকল্পিত পথ ধরে, এক বা একাধিক গতিতে, শিল্পীদের চলাফেরা, সংলাপ, মুখ ও দেহভঙ্গীর সাথে সমন্বয় [orchestrated] রেখে সদাপরিবর্তিত কম্পোজিশনের মাধ্যমে পুরো দৃশ্যটি এক বা একাধিক শটে চিত্রায়িত করবে। মিজ-অঁ-সীনকে অনেকে master shot বলে ভুল করে থাকেন। এরপর দৃশ্যের কোনো বিশেষ অংশের ওপরে যদি চলচ্চিত্রকার আরো নিবিড়তর কাজ করতে চান তাহলে কেটে কেটে স্থির, চলমান বা zoom শট নিয়ে সম্পাদনা পর্যায়ে মিজ-অঁ-সীনের সেই বিশেষ বিশেষ স্থানে সংযোগ করতে পারেন। এখানে বলে রাখা ভালো যে, মিজ-অঁ-সীন পদ্ধতির জনক ফরাসী চিত্রনির্মাতারা। এটি কুলেশভ-পুদভকিন-আইজেনস্টাইন উদ্ভুত বিখ্যাত Intellectual Montage থিয়োরীর প্রতিবাদ স্বরূপ। এই মন্তাজ-এর মূল বক্তব্য ছিল বিভিন্ন স্থানে চিত্রগ্রহণ করেও সুষম সম্পাদনার মাধ্যমে কোনো বিশেষ বক্তব্য সম্বলিত দৃশ্য সৃষ্টি করা সম্ভব এবং তা-ই হচ্ছে চলচ্চিত্র মাধ্যমের মূল চরিত্র ও শক্তি। বলা বাহুল্য এই দুই থিয়োরীর সংঘাত, সমন্বয় ও সংমিশ্রণের বিবর্তনেই আধুনিক চলচ্চিত্রের ভাষার উদ্ভব হয়েছে।


জীবন যেমন
বাছা বাছা ঘটনার
সমন্বয় নয়,
তেমনি চলচ্চিত্রও
বাছা বাছা শটের
গ্রন্থনা হতে পারে না 

এই পর্যায়ে কম্পোজিশন সংক্রান্ত আলোচনা বোধহয় প্রাসঙ্গিক হবে। শট কম্পোজ করতে গিয়ে পরিচালক এবং চিত্রগ্রাহকের কাঁধে painting এবং still photography-র ভূত চেপে বসার দৃষ্টান্ত প্রচুর। ফলে, অনেক ছবিতে স্থিরচিত্র বা চারুকলার মাধ্যমগত discipline-এর প্রভাব এতই প্রকট যে, চলচ্চিত্রের ভাষার নিজস্ব discipline নির্বীর্য হতে বাধ্য। চলচ্চিত্র জীবনকে সততার সাথে প্রতিফলিত করতে চায়। কিন্তু জীবন যেমন বাছা বাছা ঘটনার সমন্বয় নয়, তেমনি চলচ্চিত্রও বাছা বাছা শটের গ্রন্থনা হতে পারে না। তাই প্রকৃত চলচ্চিত্রে আরোপিত এবং প্রণোদিত কম্পোজিশনের ব্যবহার স্বল্প এবং সংহত হওয়া অপরিহার্য। বাস্তবে রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে আমরা হাজারো দৃশ্য দেখি। কিন্তু কেবল সেই দৃশ্যগুলোই মনে রাখি, যেগুলো মনে রাখার মতো। উদাহরণ স্বরূপ সত্যজিৎ রায়ের পথের পাঁচালি বা ফ্লাহার্টীর লুইজিয়ানা স্টোরী-এর শট-কম্পোজিশন অনুধাবনযোগ্য। পথের পাঁচালির শেওলা পুকুরে প্রতিবিম্বিত সাঁকোর ওপরে চলমান মিষ্টিওয়ালা, গুটিকয়েক শিশু এবং একটি কুকুরের মিছিলের শটটির কম্পোজিশন আরোপিত। কিন্তু প্রয়োগশৈলীর গুণে এবং ছবিতে অনুরূপ শট-এর ইচ্ছাকৃত অপ্রতুলতার জন্যেই কম্পোজিশনটি চিরস্মরণীয়। অনুরূপভাবে স্মরণীয় লুইজিয়ানা স্টোরীর কুমীর, সাপ ও অন্যান্য জলজন্তুর আবাস– শান্ত, সৌম্য হ্রদটির ওপর বালকটির একাত্ম হয়ে নৌকো বেয়ে যাওয়ার দৃশ্যের কয়েকটি কম্পোজিশন। অপ্রয়োজনীয়ভাবে composed-শটের ছড়াছড়ি চলচ্চিত্রের ভাষাকে কেবল এক ধরনের straightjacket-এ বন্দী করে রাখে না, আখ্যানের organic unity-কেও চরমভাবে বিপর্যস্ত করে। কথাটি চলচ্চিত্রকার এবং চিত্রগ্রাহক– উভয়কেই মনে রাখতে হবে।

সূর্যকন্যা 

ম্পানা

চিত্রায়িত শটগুলিকে shooting-script তথা চিত্রনাট্য অনুযায়ী সাজিয়ে match-cutting করে জোড়া দেয়াতেই সম্পাদকের দায়িত্ব যে সীমাবদ্ধ নয়– তা বোধহয় দীর্ঘ ভূমিকা দিয়ে বোঝাবার প্রয়োজন আজ আর নেই। চিত্রনাট্যের মূল বক্তব্য এবং শিল্পশৈলীকে আরো পরিশীলিত করে দর্শক-মনে পূর্ণতর প্রতিক্রিয়া সৃষ্টিই হবে সম্পাদকের সফলতার মাপকাঠি। কোনো কোনো সম্পাদক আবার চিত্রনাট্যকে অবজ্ঞা করে নিজের ইচ্ছামতো শট সাজিয়ে ছবিতে একজন সম্পাদকও যে আছেন, সেটা দর্শককে বোঝাতে তৎপর হন। যেমন কোনো কোনো সঙ্গীত পরিচালক, সংলাপ এমনকি চিত্রকেও হত্যা করে পঞ্চাশ, সত্তর বা নব্বই যন্ত্রের অর্কেস্ট্রার ভয়াবহ চিৎকারকে আবহসঙ্গীতের নামে দর্শকের কানকে ঝালাপালা করে দেবার প্রবণতা দেখান। পরিচালকের যেমন সুন্দরভাবে চিত্রায়িত দৃশ্যের প্রেমে পড়লে চলবে না, সম্পাদকেরও তেমনি আপাতদৃষ্টিতে সরল দৃশ্যে অবান্তরভাবে এলোপাথাড়ি কাটাকুটি করে সম্পাদকীয় প্রকৃষ্টতাকে দেখাবার প্রলোভন সম্বরণ করতে হবে


চিত্রনাট্যের মূল বক্তব্য
এবং
শিল্পশৈলীকে আরো পরিশীলিত করে
দর্শক-মনে
পূর্ণতর প্রতিক্রিয়া সৃষ্টিই হবে
সম্পাদকের সফলতার
মাপকাঠি

সুসম্পাদিত চলচ্চিত্রের গতি এমনই আপাত সরল এবং স্বাচ্ছন্দ যে, সম্পাদকের উপস্থিতি বুদ্ধিমান চলচ্চিত্রকার বা চিত্রগ্রাহকের উপস্থিতির মতোই অদৃশ্য মনে হবে। অবশ্য কোনো কোনো বিশেষ ক্ষেত্রে এর ব্যতিক্রম যে হতে পারে না, তা নয়। সম্পাদককে অবশ্যই চলচ্চিত্রের নিজস্ব time-sense এবং speed-senseসম্পর্কে সচেতন হতে হবে। অনেক সময় দেখা যায়, একটি শট থেকে মাত্র কয়েকটি ফ্রেম [অর্থাৎ এক সেকেণ্ডেরও এক দশমাংশ] বাড়ানো বা কমানোর জন্যে সমগ্র দৃশ্যের শৈল্পিক প্রতিফলনে গুণগত পরিবর্তন সাধিত হচ্ছে। এ ধরনের সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম adjustment অনেক সময় চলচ্চিত্রকারের নিজের দৃষ্টিকেও এড়িয়ে যায়। কিন্তু একজন অভিজ্ঞ, চলচ্চিত্র সচেতন সম্পাদকের দৃষ্টি তা এড়াবে না। এজন্যেই প্রয়োজন একজন ধীমান চলচ্চিত্র সম্পাদকের। সীমানা পেরিয়ে সম্পাদনাকালে বশীর হোসেনের মধ্যে গুণটি লক্ষ্য করে উৎসাহিত হয়েছিলাম।

ধীরে বহে মেঘনা

চলচ্চিত্রাভিনয়

মানব-সংস্কৃতির গত দু’হাজার বছরের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে, সব performing arts-এর অভিনয়রীতির মধ্যে দুটি মূল, সনাতনী ধারা সদা বিদ্যমান। প্রথমটি protean অভিনয়রীতি। দ্বিতীয়টি romantic অভিনয়রীতি। প্রোটিয়ান অভিনেতৃ নিজের জীবনদর্শন, মানস, ব্যক্তিসত্তাকে সম্পূর্ণ ভুলে গিয়ে লেখক বা নির্দেশকের পছন্দ মাফিক চরিত্রসৃষ্টি করে থাকেন। রোমান্টিক অভিনয়পদ্ধতির অনুসারীরা করে থাকেন ঠিক উল্টোটা। অর্থাৎ এরা অভিনয়সৃষ্ট চরিত্রের মানস সত্তা থেকে নিজের ব্যক্তিগত সত্তাকে বিচ্ছিন্ন করতে কেবল অনিচ্ছুকই নন, বরং নিজ অভিজ্ঞতা, স্মৃতি এবং জীবনবোধের দ্বারা অন্যের লিখিত চরিত্রের মানস, অভিব্যক্তিকে প্রভাবান্বিত করে যতদূর সম্ভব বাস্তবানুগ করার চেষ্টা করে থাকেন। চলচ্চিত্রে এই উভয় রীতিরই প্রচলন আছে, তবে Stanislavski system তথা Method অভিনয় ফর্মে রোমান্টিক রীতিরই প্রাধান্য সোচ্চার। চলচ্চিত্র প্রধানত বাস্তবতা প্রতিফলনের মাধ্যম। তাই, স্বাভাবিক কারণেই, এই মাধ্যমে রোমান্টিক পদ্ধতিই আপেক্ষিকভাবে উপযুক্ততর। যে রীতিতেই হোক না কেন, আসল কথা হচ্ছে চরিত্রের গভীরে প্রবেশ করে, চলচ্চিত্রের plasticity এবং খণ্ডিত চিত্রগ্রহণ পদ্ধতিতে emotiona এবং physical continuity বজায় রাখার অপরিহার্যতাকে মনে রেখে চরিত্রটিকে দর্শকের জন্যে জীবন্ত এবং বাস্তবানুগ করে তোলাই হচ্ছে চলচ্চিত্র অভিনেতৃর মুখ্য দায়িত্ব। এজন্যে প্রয়োজন অভিনেতৃর পূর্ণ মনোযোগিতা। শুটিং-এর সময়ে মনকে যতদূর সম্ভব বিশ্রাম দেয়া প্রয়োজন। অনেক সময়ে শট-এর মাঝে বেশ খানিকটা ফাঁকা সময় থাকে। ইউনিটে শিল্পী এবং কুশলীরা এই সুযোগে গল্পগুজবে মত্ত হন। এতে করে উভয় দলেরই মানসিক একাগ্রতা ব্যাহত হয়। ফলে চলচ্চিত্রের শৈল্পিক এবং কারিগরী– উভয় মানই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এই অবসর সময়ে যদি ঐ ছবি বা ভূমিকা নিয়ে ভাবতে ইচ্ছে নাও করে, তবুও চোখ বুজে মনকে বিশ্রাম দেয়া শিল্পিত কর্মের জন্যে অপরিহার্য। হাসি-ঠাট্টা, গল্পগুজব, গল্পের বই পড়া ইত্যাদি শুটিং শেডিউলের আট ঘণ্টা পরে করাটাই শ্রেয়। একাগ্রতা [concentration] অনুশীলন করার অন্যতম পরীক্ষিত পন্থা হচ্ছে প্রতিদিন সকালে অন্ততঃ ১০ মিনিট যোগাভ্যাস এবং কাজের সময়ে সুযোগ পেলেই দু মিনিট ‘শব-আসন’ করে নেয়া।


শুটিং-এর সময়ে

মনকে
 যতদূর সম্ভব
বিশ্রাম দেয়া প্রয়োজন

আমাদের অভিনেতৃদের অন্যতম প্রধান দুর্বলতা হচ্ছে চরিত্রের environmental colouration সৃষ্টিতে অপারগতা বা অক্ষমতা। এর কারণ হয়তো অতিরিক্ত ছবিতে কাজ করতে হয় বলে চরিত্র স্টাডিতে ব্যয় করার মতো সময়ের অভাব অথবা অজ্ঞতাপ্রসূত অনীহা। তাই তাদের পক্ষে ছবিতে কোনো বিশ্বাসযোগ্য ডাক্তার বা মোটর মেকানিক বা সাংবাদিক, এমনকি একজন চাষীর চরিত্রেরও সঠিক চিত্রণ করা সম্ভব হচ্ছে না। অবশ্য এর জন্যে চিত্রনাট্যকার এবং পরিচালকের অমনোযোগিতা বা অজ্ঞতাও আংশিকভাবে দায়ী। এ প্রসঙ্গে অধুনা অস্কার বিজয়ী মার্কিন অভিনেতা রবার্ট ডি নিরোর উদাহরণ স্মর্তব্য। একটি ছবিতে ট্রাম্পেটবাদকের ভূমিকায় অভিনয় করার আগে যাতে যন্ত্রের ওপর অঙ্গুলী-সঞ্চালন সঠিক হয়, তার জন্যে তিনি শুটিং শুরু হবার বেশ আগে থেকেই একজন পেশাদারী বাদকের কাছে শিক্ষাগ্রহণ করতে থাকেন। ফলে সে ছবির চরিত্রটি কেবল আশ্চর্যরকম জীবন্তই হয়নি, সেই অনুশীলনের ফলস্বরূপ রবার্ট ডি নিরো আজ একজন গুণী ট্রাম্পেটবাদকও বটে। হয়তো উদাহরণটি আমাদের দেশের শিল্পীদের আয়ের পরিমাপে একটু অবান্তর। কিন্তু তাই বলে পিয়ানোতে গান গাওয়ার শটে তারা রীডে আঙুল ঠিকমতো নামাতে পারবেন না– এর কোনো অজুহাত গ্রহণযোগ্য নয়। তাছাড়া আয় বাড়লেও যে কোনো অভিনেতৃ চরিত্র স্টাডিতে অতিরিক্ত সময় দেবেন– এমন কোনো চিহ্ন আজও লক্ষ্যগোচর নয়।

রূপালী সৈকতে

চলচ্চিত্রকার

এক কথায় তিনি জাহাজের ক্যাপ্টেন, যাকে ইঞ্জিনঘর থেকে আরম্ভ করে মাস্তুল অবদি সব কিছুর ওপরই অভিজ্ঞান সম্পন্ন দৃষ্টি রাখতে হয়। কোনো বিভাগে তার অজ্ঞতা প্রকাশ পেলেই সেই বিভাগ প্রধান তার পুরো সুবিধা লুটে নেবে। চলচ্চিত্রে এ কথা আরও প্রকটভাবে প্রযোজ্য। ‘ক্যামেরা’ আর ‘কাট’ চেঁচিয়ে, রম্য কাগজে ইন্টারভিউ ছাপিয়ে, বিজ্ঞাপনে নিজনাম প্রচার করে এক ধরনের পরিচালক হওয়া খুবই সম্ভব। কারণ, প্রযোজকের অর্থানুকূল্যে লেখক লেখার কাজ, সঙ্গীত পরিচালক সঙ্গীতের কাজ, ক্যামেরাম্যান চিত্রগ্রহণের কাজ; সম্পাদক, শব্দগ্রাহক এবং পরিস্ফূটক তাদের নিজস্ব কাজ করে দিলেই তো পরিচালকের নামে একটা ছবি তৈরী হয়ে যাচ্ছে– তা সে যে ঘোষের গোয়ালের গরুই হোক না কেন। সত্যিকারের পরিচালক অর্থাৎ চলচ্চিত্রকারের ভূমিকা এবং দায়িত্ব সম্পূর্ণ আলাদা। চলচ্চিত্র নির্মাণের এতগুলো বিভাগের কাজের সমন্বয় সাধন করে গোটা ছবির ওপরে স্বকীয়তার ছাপ রাখাই হচ্ছে পরিচালকের সনাতনী সংজ্ঞা। আধুনিক চলচ্চিত্রে এই সংজ্ঞাটি জটিলতর রূপ নিয়েছে। তাই বাংলা ভাষায় পরিচালক এবং চলচ্চিত্রকার শব্দ দুটোর ব্যবহারে কেন এতটা সাবধানতা অবলম্বন করছি– তা সহজে অনুমেয়।

ওতর সিনেমা

চলচ্চিত্রের ছাত্র হিসেবে গোড়া থেকেই সৃজনশীল চলচ্চিত্রের শ্রেণী বিভাগে আস্থা রাখতে পারিনি। শিল্পোত্তীর্ণ চলচ্চিত্রের অধিকাংশই auteur [ওতর] রীতির, অর্থাৎ চলচ্চিত্রকারের ব্যক্তিগত সর্ববিধমতবাদবিধৃত। ফলে আদিযুগ থেকে fiction এবং non-fiction চলচ্চিত্রের সৃজনরীতিতে যে আপাত-পার্থক্য নির্দেশিত হয়ে আসছে তা উত্তরোত্তর অর্থহীন হয়ে দাঁড়াচ্ছে। দু’ধরনের চলচ্চিত্রই চলচ্চিত্রকারের ব্যক্তিগত মানসের, মতবাদের ধারক ও বাহক। কেবল দৃশ্য সংগ্রহের রীতিটা আলাদা। উভয় কর্মেই realism, naturalism এবং ইচ্ছাকৃত construction কমবেশী বিদ্যমান। কাজেই সব চলচ্চিত্রই মূলত একাধারে fiction এবং non-fiction, অর্থাৎ Complete Cinema।


সব চলচ্চিত্রই মূলত
একাধারে
fiction এবং non-fiction,

অর্থাৎ
Complete Cinema

ধীরে বহে মেঘনা এই উপলব্ধিরই প্রথম প্রচেষ্টা। এর অধিকাংশ ঘটনা সত্য এবং সমকালীন রূঢ় বাস্তব থেকে সংগ্রহ করা। সেই recreated reality-র সাথে সমন্বিত হয়েছে সমকালীন প্রামাণ্যচিত্র– যা কোনো স্টক-শট নয়। গল্পের কাঠামোটি constructed। সূর্যকন্যাও একই আদলের, যদিও treatment আলাদা পর্যায়ের। সীমানা পেরিয়ের আখ্যানের মূল ঘটনাও বাস্তব উদ্ভূত। ১৯৭০-এর ভয়াবহ জলোচ্ছ্বাসের ধ্বংসলীলার প্রায় তিন মাস পরে একজোড়া মানব-মানবীকে বরিশালের দক্ষিণের একটি সামুদ্রিক চরে আদিম পরিস্থিতিতে কোনো রকমে বেঁচে থাকতে দেখা গিয়েছিল। ঢাকার তৎকালীন সংবাদপত্রে ঘটনাটির বিবরণ আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করে। তবে ছবিটির treatment ইচ্ছাকৃতভাবে contrived। যৌন আকর্ষণ বা ভায়োলেনস ছাড়াও সমাজের ওপর এবং নীচতলার দুটি মানুষের মধ্যে, শ্রেণীগত পর্যায়ে নয়, ব্যক্তিগত পর্যায়ে কোনো আন্তরিক সম্পর্ক সম্ভব কিনা– এটা পর্যালোচনা করাই এই কার্যত fantasy চলচ্চিত্রের মুখ্য উদ্দেশ্য ছিল। আমার মতে এই সম্পর্ক সম্ভব, তবে অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী শ্রেণীটি তা সহ্য করতে চাইবে না। ব্যবসায়ী পুঁজির চাপে ছবিটির বক্তব্য এবং গতি কিঞ্চিৎ ছিন্নভিন্ন। কিন্তু এর মূল ভার্সনও আছে। এই গ্রন্থে মুদ্রিত চিত্রনাট্যটি তারই।

বাংলাদেশে বোধহয় এই প্রথম চিত্রনাট্য বিষয়ক গ্রন্থ প্রকাশিত হলো। এর কারণ এ জাতীয় কর্মের ব্যবসায়িক প্রত্যাশা সম্পর্কে সাধারণ প্রকাশকদের নৈরাশ্য। বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমীকে আন্তরিক অভিনন্দন ও ধন্যবাদ এ গ্রন্থটি প্রকাশ করার উদ্যোগ নেবার জন্যে। আমি বিশেষভাবে কৃতজ্ঞ একাডেমীর মহাপরিচালক সৈয়দ জিল্লুর রহমান এবং বিভাগীয় পরিচালক ও নাট্যকার মমতাজউদদীন আহমদ, কবি আল মাহমুদ, সৈয়দ আলি কাযেম ও শিল্পী কাইইয়ুম চৌধুরীর কাছে তাঁদের অকৃত্রিম উৎসাহ, উপদেশ ও সহযোগিতার জন্যে। মুদ্রণের ক্ষেত্রে বিশেষ যত্ন নেবার জন্যে এশিয়াটিক প্রেসের কর্তৃপক্ষকে আন্তরিক শুভেচ্ছা।

আমাদের সবারই শ্রম সার্থক হবে যদি গ্রন্থটি এদেশের চলচ্চিত্রাঙ্গনে মাধ্যমগত শুদ্ধতা আনয়নে সহায়তা করে এবং আমাদের কথাশিল্পীদের উৎসাহিত করে চলচ্চিত্রশিল্পে চিত্রনাট্যকারের অভাব পূরণ করতে।


গ্রন্থসূত্র
চিত্রনাট্য/ আলমগীর কবির
প্রকাশক । বাংলাদেশ শিল্প একাডেমী; ঢাকা, বাংলাদেশ
প্রথম প্রকাশ । জুন ১৯৭৯
Print Friendly, PDF & Email
শেয়ার
কিংবদন্তি ফিল্মমেকার; বাংলাদেশ ।। জন্ম : ২৬ ডিসেম্বর ১৯৩৮। মৃত্যু : ২০ জানুয়ারি ১৯৮৯ ।। ফিচার ফিল্ম : ধীরে বহে মেঘনা; সূর্যকন্যা; সীমানা পেরিয়ে; রূপালী সৈকতে; মোহনা; মহানায়ক; পরিণীতা ।। অ্যাওয়ার্ড : স্বাধীনতা পদক [সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় পদক, বাংলাদেশ]

মন্তব্য লিখুন