ভাবনার ভেলায় চলচ্চিত্র

0
183
সৈয়দ সালাহউদ্দীন জাকী

লিখেছেন । সৈয়দ সালাহউদ্দীন জাকী

[ভাবনা : চলচ্চিত্র নির্মাণের কলা-কৌশল, কলকব্জা শেখাবার জন্য আমাদের এই লেখা নয়; বরং জাগতিক বাস্তবতায় চলচ্চিত্র মাধ্যমটির অবয়ব রচনা, প্রকাশ প্রক্রিয়ার অভ্যন্তরে কী ঘটে– তার কিঞ্চিৎ ধারণা এবং তারই কিছুটা আভাস তুলে ধরার প্রয়াস এই লেখায়। সৃষ্টিশীল শিল্পের প্রাথমিক মানসিক প্রস্তুতির জন্য ভেবে দেখা যেতে পারে। এই পৃথিবীতে এ যাবত যত শিল্পের জন্ম হয়েছে, তার সবক’টির সংমিশ্রণে চলচ্চিত্র আর চলচ্চিত্র ভাষার জন্ম। যেন সমবেত সংগীত, গণজাগরণের সংগীত। শক্তিশালী, দ্বিধাহীনভাবে বলা যায়। চলচ্চিত্র বাস্তব এবং শৈল্পিক যোগাযোগের সবচেয়ে সক্রিয় মাধ্যম। তাই নির্মাতার আদর্শের অবস্থান বা commitment অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।]


স্কেচ : শিল্পী কামরুল হাসান
সালাহউদ্দিন জাকী সম্পাদিত স্বপক্ষে, ১৯৭২

আঁকিবুকি স্কেচ

আগে, বহু আগে আঁকিবুকি অংকনের জন্য ছিল আরও অনেক উপকরণ। সেই আদিম যুগে, হাজার হাজার বছর আগে, পাথর খোদাই করে কিছু একটা সৃষ্টির যুগ।পাথুরে গুহামানবের সময়কার স্টোনহেঞ্জের কথা [Stonehenge] আমরা শুনেছি। আজন্তা ইলোরার কথা শুনেছি। রঙ-বেরঙের পাথর গুড়ো করে বা ফুল-লতা-পাতার নির্যাস দিয়ে রঙ তৈরির যুগ। ইংরেজিতে বলি VIBGYOR, Violet-Indigo-Blue-Green-Yellow-Red; বাংলায় বেগুনি-বেগুনি-নীল-নীলা্ভ-সবুজ-হলুদ-লাল– ৭-রঙ মিলে মিশে আরও কত কি! সব রঙ মিশিয়ে মনের মাধুরি দিয়ে ছবি আঁকা হতো, ছবির জগত তৈরি হতো! রঙের বাহার!! ছবি কথা বলত ছবির। এক সময় পাখির পালক দিয়েও কলম হতো! কালি আলাদা! ভেষজ কালি, herbal। আর রূপকথার কন্যা, রাজপুত্তুর-রা, প্রেমিক-প্রেমিকারা, তারা যে দেশেরই হোক না কেন, আঙুল কেটে লাল রক্ত দিয়ে পত্র লিখত আর পায়রার পাখায় দূরদেশে পাঠিয়ে দিত, অথবা মেঘের নাওয়ের ভেলায় ভাসিয়ে দিত! কালিদাসের মেঘদুত! আমরাও তো আঙুল কেটে নয়, আঙুলে ঠুকরে বা ইদানিং হাল্কা স্পর্শ করে বারতা আদান প্রদান করছি, সেলফোনে, ডিজিটাল যুগে।

মনের ভেতর কথার বাসা মিশিয়ে বানাই ছবির ‘ভাষা’

আমরা আজ ‘মনের সঙ্গে মনের’ যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে ‘ভাষা’ নিয়ে ভাষার নাওয়ে আমাদের লিখন ভাসাব। ভাষা প্রকৃতির মাধ্যমে জীবজগতের সবাইকে বিশ্বনিয়ন্ত্রার দেওয়া ‘সৃষ্টিকে’ জন্মদিনে্র অফুরন্ত আশ্চর্য উপহার, আর এই উপহার মানুষের অধিকার। মানুষের সঙ্গে প্রকৃতির, মানুষের সঙ্গে মানুষের, মানুষের সঙ্গে জীবজগতের সবার, এমনকি মহাকাশে অজানা অচেনা কেউ থেকে থাকলে তাদের সঙ্গেও যোগাযোগ বা ভাবের আদান প্রদানের অধিকার।

ইতিহাস : ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন ছিল সেই প্রকৃতির দেওয়া অধিকার আদায়ের আন্দোলন।সহজ।

‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি…’– বাংলা ভাষায় আপনার-আমার গাইবার অধিকার! অন্য কোনো ভাষার প্রতি ঘৃণা নয়! এই যে ফেব্রুয়ারি শব্দটি, ওটি ইংরেজি, কিন্তু ভাষার নৌকায় ভেসে আসা শব্দটি এখন বাংলার ঘরের! এই আসা-যাওয়ায় কোনো বাঁধ নেই, বাধা নেই; ভাষা ভেসে যা্‌য়, সাত সমুদ্দর হাজার নদী পাড়ি দেয়। কোনটা ঘরে নেব, কোনটা নেব না– তা আমাদের ইচ্ছে-অনিচ্ছের ওপর নির্ভরশীল নয়। সময় আর প্রকৃতির ইচ্ছে-অনিচ্ছের ওপর তা নির্ভরশীল। ভাষার ফুল ফোটে আপন ইচ্ছায়। ভাণ্ডার ভরে ওঠে। ইংরেরি হলেও অনেক শব্দই এখন ঘরের শব্দ।

প্রসঙ্গ চলচ্চিত্র। চলচ্চিত্রে চলচ্চিত্র ভাষার দ্বার খোলা, তাই বাছাই পর্ব গুরুত্বপূর্ণ, কাকে ঢুকতে দেব, কাকে দেব না!

যোগাযোগ? Communication? প্রক্রিয়া আদিকাল থেকে। সম্ভবত non communication glitch-এ বেহেস্ত থেকে বিতাড়িত আদম-হাওয়াকেও communicate করেই যাত্রা আরম্ভ করতে হয়েছিল। আকাশ থেকে স্রষ্টার দূত প্রেরণের মাধ্যমে যুগে যুগে মহাপুরুষদের কাছে পূণ্যবাণী communicate করার মূল কাজটি দূতরা করেছেন। একজন তো verbal local language ব্যাবহার করেছেন। ইকরা। পাঠ করুন!


অবক্ষয়ের মন্ত্রণা যারা
দেয়, তারা
শিল্পী
নয়

কবি-শিল্পী, চলচ্চিত্রকাররা, এক কথায় ‘moving’ image creators-রা পূণ্যবানীর ধারক, বাহক, প্রেরক! অবক্ষয়ের মন্ত্রণা যারা দেয়, তারা শিল্পী নয়। বাস্তবে পায়রার পাখায়, মেঘের নৌকায়, ম্যারাথন দৌড়ে বা রিলে রেসে, ডাকহরকরা বা পিয়নের ঝুলিতে, রানার ছুটত খবরের বোঝা নিয়ে রাতের অন্ধকারে হাতে তার লণ্ঠন [আজ হয়তো চিনবেন না, গানেই সীমাবদ্ধ]।আরও আছে, দ্রুত ধাবমান ঘোড়ার পিঠে [শের শাহ]– সবই ‘যোগাযোগ’ আর চিঠিপত্রের মাধ্যমে মনের ভাব, সংবাদ, তথ্য আদান-প্রদানের প্রক্রিয়া। ক্লাসে পেছন থেকে চিরকুট ছুড়ে দেওয়া চলচ্চিত্রে বহুল ব্যবহৃত!

অবাক হবেন: এক সময়কার হাজার নদী, খাল-বিলের দেশে, ধীর লয়ের বা ধীর গতির এই দেশেও খালি গলাতেও ‘দূরে কোথাও দূরে দূরে’ বারতা পাঠানো হতো, নদী বয়ে নিয়ে যেত সেই বারতা। নদী? কেমন করে? যেমন ধরুন, নদীর ধারে পানি নিতে এসেছে নতুন বউ, দূর গ্রাম থেকে বউ এসেছে এই গ্রামে বিয়ের পর। একজন মাঝি মাঝ নদী দিয়ে বেয়ে যাচ্ছে, নতুন বৌ কণ্ঠ উঁচিয়ে জানতে চাইছে: ‘ও মাঝি ভাই, কোন গেরামে যাও?’

হারানো পাতায় প্রেম/জাকী

হাল-ধরা মাঝি, বা বৈঠা বাওয়া মাঝি বাইতে বাইতে উঁচু গলায় বলছে গাঁয়ের নাম: কুসুমপুর। মেয়েটি খুশিতে নেচে ওঠে: কসুমপুর? আমার গেরাম, মা’র কাছে পৌঁছে দিও, আমার ‘বারতা’, আমি ভালো আছি। আমাকে কবে নিয়ে যাবে?

মাঝি পৌঁছে দিত সেই বার্তা। তার-ও তো মেয়ে আছে, একদিন বিয়ে হবে কোন সুদূরে, কে জানে!

মুক্তিযুদ্ধের সময় আমাদের নদী-নালা-খাল বিলের বেঁচে থাকা মাঝিরা জীবনের ঝুঁকি নিয়েও ‘খবর’ আদান-প্রদান করেছে মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে! আর নদী ছিল আমাদের প্রতিরক্ষার সবচেয়ে বড় অস্ত্র ! ভুলবেন না ওদের কথা। জেনে রাখুন: ন্যায় আর সত্যের যুদ্ধে, বিশেষ করে গেরিলা যুদ্ধে ‘যোগাযোগ’ গুরুত্বপূর্ণ।

চলচ্চিত্রের communicating power, infinite! Selection of images, juxtaposition of images অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, না হলে wrong signal, miscommunication and dusater।

তারপর সময়ের প্রবাহে, প্রযুক্তির অগ্রগতিতে technology’র হাত ধরে এক সময় এসেছে Morse Code, টরে টক্কা, টক্কা টরে টেলিগ্রাফ, ক্রিং ক্রিং টেলিফোন– তারে তারে সংবাদ, সন্দেশ। সুখবর ছিল ‘সন্দেশ’! দূর থেকে কেউ বাড়িতে এলে ‘সন্দেশ’ নিয়ে আসত। বেতার এলো শব্দ তরঙ্গের মাধ্যমে, এলো শক্তিশালী শর্টওয়েভ– যা আকাশের Ionosphere থেকে ধাক্কা খেয়ে ‘বেতা্রে’ চলে আসত মুহূর্তে।এখনো আসে। এলো টেলিভিশন– শব্দ আর ছবির তরঙ্গ এই সেদিনও মাইক্রোওয়েভ দিয়ে আমাদের ঘরের বন্ধু ঘরে আসত! এলো ‘স্যাটিলাইট’। যেমন, বঙ্গবন্ধু স্যাটিলাইট! আমরা আকশের বা প্রকৃতির কোনো Sphere-এর ওপর আর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল নই, ‘স্যাটিলাইট’ বা ভূ-উপগ্রহ আমাদের সহায়!

হাতের মুঠোয় সেলুলার ফোন, নিছক ফোন নয়। আমাদের হাতের মুঠোয় এখন গ্রহ-তারা-রবি-শশী, ছায়াপথ, মহাকাশ, জ্ঞানের ভাণ্ডার, সব কিছু। এক কথায় বিশ্ব-ব্রহ্মাণ্ড! ‘স্যাটিলাইট’ এখানেও ভূমিকা রাখছে। বারতা গঠন প্রেরণ আর পাঠের জন্য ‘ডিজিটাল’ একটি আধুনিক প্রযুক্তিগত প্রক্রিয়া, যা বিজ্ঞানের অগ্রগতির সঙ্গে ধাপে ধাপে এসেছে। চলচ্চিত্র নির্মাণে সহজ সহায়ক পদ্ধতি, প্রক্রিয়া এখন ‘ডিজিটাল’। হয়তো সামনে নতুন কিছু আসবে।তখন হয়তো মাওলানা ভাসানীর মতো বলব: ‘ওয়ালাইকুম আসসালাম!’ ইতিহাসই তো এ কথা বলে! আসবেই। মানুষের ‘ইচ্ছা’ শক্তির শেষ নেই– infinite! অসীম! চলচ্চিত্রেরও তাই।

চলচ্চিত্রে অনুভূতির জগৎ

‘বৃদ্ধি’ আর ‘বিকাশ’ দুটি শব্দ, বৃদ্ধি চোখে দেখা যায়, পরিমাপ করা যায় সহজে; কিন্তু বিকাশ, বিকশিত হওয়া, মনের ভেতরের ব্যাপার, পরিমাপ সহজ নয়। ‘ইচ্ছা শক্তি’ মানুষের বিকশিত মনের ব্যাপার! মায়ের পেটে বেড়ে উঠছি, বড় হচ্ছি, পরিমাপ করা যাচ্ছে! ইট দিয়ে বা কংক্রিট ঢেলে বিল্ডিং বানাচ্ছি, চোখে সহজেই পরিমাপ করতে পারছি মহল কতটুকু উঠল। পদ্মা সেতুর স্প্যান একটার পর একটা জুড়ে দেওয়া হচ্ছে, ‘বৃদ্ধি’ দেখতে পারছি, খবরের পাতা চলচ্চিত্রের প্রামাণ্য চিত্রে, টেলিভিশনের পর্দার যোগাযোগের মাধ্যমে। কিন্তু বিকশিত মনের অনুভূতি বা জ্ঞানের পরিমাপ? পদ্মা সেতু স্বপ্নের সেতুর স্বপ্নের পরিমাপ? অসীম! ফুল ফোটে, কিন্তু বিকশিত ফুলের গন্ধ নিঃশব্দে ছড়ায়। পরিমাপ? অনুভূতির ব্যাপার!

কবিতা, গানে, ছবিতে, শিল্পের সব প্রাঙ্গণে, চলচ্চিত্র বা টেলিভিশনের পর্দায়, এমনকি সেলফোনের মিনি স্ক্রিনে চলমান চিত্রে বিভিন্নভাবে এই অনুভূতির জগত তৈরি করা হয়। বিকশিত মনের ‘ইচ্ছা’ দিয়ে গড়া অনুভূতির জগত। চলচ্চিত্রের মূল কাজ এটি। মূলশক্তি ঐখানে।

পঠন, গঠন, প্রেরণ

পৃথিবীর সব ধর্মই আমাদের কল্যাণের জন্য, জীবজগতের কল্যাণের জন্য, মহাবিশ্বের কল্যাণের জন্য, এটা প্রথমে মানতে হবে।

অতি ধর্মের বিষ-বাস্প শয়তানের তৈরি! সময়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রক্রিয়ার রূপ বদলেছে, প্রকাশের রূপটাও হয়তো বদলেছে, কিন্তু শৈল্পিক মনের বিকশিত হওয়ার ‘ইচ্ছে’ বদলায়নি। যোগাযগের সহজ, সুলভ প্রক্রিয়ার কারণে, দ্রুততার কারণে মন আর মানসিকতার দূরত্ব কমেছে– মানুষে মানুষে, মানুষের সঙ্গে অন্যান্য প্রণীর বা বস্তুজগতের। করোনাভাইরাসের খবর মুহূর্তেই ছড়িয়ে গেছে সবখানে; ভাইরাসের চেয়ে দ্রুত, ছড়িয়ে গেছে রোহিঙ্গা নির্যাতনের কথা। কিন্তু ছড়িয়ে দেওয়ার দুর্বল ‘প্রেরণ’ব্যবস্থার কারণে আর হানাদারদের প্রচণ্ড বাধার কারণে ’৭১-এর নির্মম হত্যাযজ্ঞের খবর পৃথিবীর কাছে পৌঁছুতে বেগ পেতে হয়েছে, সময় লেগেছে, এমনকি লুকিয়ে পাঠাতে হয়েছে [যেমন ঢকায় অবস্থানরত সাংবাদিক সায়মন ড্রিং বা এন্থনি ম্যাস্কারেনহাস পাঠিয়েছিলেন লুকিয়ে]। জানাতে পারলে রক্তপাত কম হতো।

তবে পরবর্তীকালে গোপন বেতার ‘স্বাধীন বাংলা বেতার’ সীমিত ক্ষমতায় অনেক খবর জানিয়ে, অনেক অনুষ্ঠান প্রচার করে কণ্ঠযুদ্ধ করেছিলেন কণ্ঠযোদ্ধারা। ‘বেতার অস্ত্রের’ সাহায্যে, some of them are still alive, all of them are my friends! সৈয়দ হাসান ইমাম , আশরাফুল আলম… এ মূহূর্তে মনে পড়ছে। গানে শাহীন সামাদ…! বন্দুক-রাইফেল-কামানের গোলার চেয়েও শক্তিশালী এই অস্ত্র!প্রমাণিত এই সত্য। চলচ্চিত্রকার জহির রায়হানের স্টপ জেনসাইড তার প্রমাণ বহন করে। এই ডকুমেন্টারি বিশ্ববলয়ে বিশ্ব বিবেককে নাড়া দিয়েছিল, হাজার বক্তৃতা যা পারেনি। চলচ্চিত্রের শক্তি বা চলচ্চিত্র-ভাষার শক্তি অপরিসীম। স্বাধিকারের জন্য প্রকাশিত ‘আবেগ’ ব্যক্তিগত ব্যপার নয়, চলচ্চিত্রে বা Visual moving Language-এর সাহায্যে তৈরি Moving Image প্রবল আবেগ সৃষ্টি করতে পারে; সেই আবেগ পৌঁছে দিতে পারে বিশ্ব বিবেকের কাছে। প্রামাণ্য চলচ্চিত্রটি তাই করেছিল।

ভাষা

ভাষার কথায় আসা যাক। ভাষা? জীবজগতের সবারই নিজস্ব ভাষা আছে। ভাষার প্রকাশ কেবলমাত্র কলম দিয়ে লিখেই নয়, শুধু কণ্ঠ আর ঠোঁট দিয়ে কথা বলেও নয়। ভাব প্রকাশের জন্য ‘ভাষা’ আকারে-ইঙ্গিতে হতে পারে, আর সত্যি কথা বলতে কি, ‘আকারে-ইঙ্গিতে’ই মানব ভাষার জন্ম হয়েছিল বললেও ভুল হবে না। যেমন ধরা যাক জীবজগতের কেউ ব্যাথা পেল, মুখ বা শরীরে তা প্রকাশ পেলে গোত্র বা দলের আরেকজন তা দেখে বডি ‘ল্যাংগুয়েজ’ ‘পাঠ’ করে বুঝে ফেলল– ওর কী হয়েছে। মনের ভেতরের অভিজ্ঞতার ভাণ্ডারের সঙ্গে সচেতন, অবচেতনভাবে মিলিয়ে সে ‘পাঠ’ করে ফেলল! সে বুঝে ফেলল, একজন ব্যাথা পেয়েছে! গা গরম হলে মা আলতো করে ছুঁয়ে বলে ওঠেন: ইশ, জ্বর! জ্বরের ভাষা মা কিন্তু হাতে ছুঁয়ে বঝে ফেলেন!আজও!! চলচ্চিত্রের ভাষায় Index তৈরিতে ব্যবহার করা যায় এ ধরনের ইমেজ!

তারপর কালক্রমে আকার-ইঙ্গিতের সঙ্গে যোগ হলো কণ্ঠের ‘এক্সপ্রেশন’! ক্যামেরার লেন্সের সামনে, ফেসবুকের ছবিতে/ফটো সেশনে/প্রেমের আর্শিতে, চুম্বকে বা যোগাযোগের glitch-এ এক্সপ্রেশন দিতে দিতে নাওয়া-খাওয়া ভুলে যাচ্ছি! ফেসবুকে ‘স্ট্যটাস’ কিন্তু মনের এক্সপ্রেশন! খুব ভালো! আর মুখের? হাসলে এক ধরনের, কাঁদলে আরেক ধরনের, রেগে গেলে অন্য ধরনের– কাছের মানুষ ‘কিল’ দেখিয়ে দৌড় দিলে? ‘বুড়ো’ আঙুল দেখানোর ভাষা ইদানিং একটু অন্যরকমভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে! ‘কাঁচকলা’ বা ‘ঘোড়ার ডিম’ হয়ে গেছে OK, নয়তো ‘লাইক’ বা ‘গুড’। আজকাল দিব্যি মুরুব্বিদেরো দেখানো যায়। কিন্তু আমাদের সময়? মুরুব্বিদের কাঁচকলা দেখালে? খবর ছিল; দৌড়ে পালালেও বাঁচব না।

‘বডি ল্যাংগুয়েজ’ আর ‘এক্সপ্রেশনের’ শেষ নেই, শক্তিও অনেক। চলচ্চিত্রের প্রয়োজনীয় উপাদান। সময়ের সঙ্গে পাল্টাতেও পারে। জীবজগতের মাঝে মানুষ সবচেয়ে ধীমান। স্রষ্টার তৈরি, শ্রেষ্ঠ সে! আল্লাহ, ভগবান, গড, প্রকৃতি, যেই সৃষ্টি করে থাকুক না কেন, ব্রেনের RAM, ROM [Random Access Memory, Read Only Memory] মানে, সহজ কথায় স্টোরেজ ক্ষমতা অনেক বেশি।তাই তারা অবলীলায় মগজে স্টোর করে রাখতে পারে। হাজার হাজার বছর ধরে সংকেতগুলো স্তরে স্তরে সুসংহত করে গেঁথে রাখা হচ্ছে, যা প্রয়োজনে মুহূর্তেই search আর recall করে ভিন্ন মাত্রা তৈরি করে চলেছি আমরা চলচ্চিত্রেও। এই প্রক্রিয়া প্রকৃতি প্রদত্ত মনের ‘ইচ্ছা’র ফসল, ‘ইচ্ছাশক্তি’ মানবজাতির, মানে আমাদের, অগ্রযাত্রার দুরন্ত গতির একটি অদৃশ্য বাহন। চলচ্চিত্রের ভাষা ভূমিতে, আকাশে, পাতালে আমাদের ‘অস্তিত্ব’ খুঁজে পাওয়ার গান গায়।


চলচ্চিত্রে
বহু মাত্রার
জগত তৈরি করা
প্রবলভাবে
সম্ভব

French মনিষী Andre Malraux, যিনি আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সময় গণহত্যার বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছিলেন, তিনি একসময় শিল্পীর ইমেজ তৈরির শক্তি নিয়ে অবিস্মরণীয় উক্তি করেছিলেন: ‘We can create images sufficiently powerful to deny our nothingness’। অসাধারণ dictum। এটি আমার লোগো-তে ব্যাবহার করি। চলচ্চিত্র আমাদের অস্তিত্বের অবয়ব তৈরি করতে পারে। অস্তিত্বহীনতার বিরুদ্ধে লড়াই করতে পারে, করেও! চলচ্চিত্রে বহু মাত্রার জগত তৈরি করা প্রবলভাবে সম্ভব। ইচ্ছের ফসল ধাপে ধাপে এগিয়েছে, মনের ইচ্ছের সঙ্গে প্রযুক্তির [Technology] মহামিলন ঘটাতে হয়েছে, যা চাইতে ইচ্ছা করছে, তা পেতে কখনো কখনো প্রযুক্তির এগিয়ে আসার জন্য অপেক্ষা করতে হয়েছে। ইচ্ছের গতিবেগ, আগেই বলেছি, আলোর গতির চেয়েও অনেক অনেক বেশি । আর বাস্তবের হাতে তৈরি ‘প্রযুক্তি’ পাকাপোক্ত হয়ে একসময় হাত মিলিয়েছে স্বপ্নের ইচ্ছার সঙ্গে। জয় মানুষেরই, যেমন: জয়বাংলা! আমাদের স্বপ্ন আর ইচ্ছার জয়!

আর দুঃসময়ে চলচ্চিত্রের অবদান?

চলচ্চিত্র : চিত্রকথা

যেমন ধরা যাক চলচ্চিত্রের ‘জন্মের’ কথা। ১৮৯৫ সালের দিকে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রথম প্রদর্শিত হয়, বলা হয়ে থাকে, আমরা জানি। কিন্তু আমরা নিশ্চয়ই ভেবে বসে নেই যে ফ্রান্সের লুমিয়ের ভাই দুজন, [Auguste Lumiere, Louis Lumiere] ১৮৯৫ সালের ঐ দিনে আলাদীনের আশ্চর্য প্রদীপ হাতে নিয়ে জাদুর আংটি ঘঁষে চলচ্চিত্র বা চলচ্চিত্রের ভাষার জন্ম দিয়েছিলেন? না। ‘নড়েচড়ে’ এই ‘ইমেজ’গুলো [ছবির খণ্ড টুকরো] পর্দায় প্রক্ষেপিত হওয়ার আগে প্রযুক্তিকে ধাপে ধাপে এগুতে হয়েছে মানুষের ইচ্ছের পাখার সঙ্গে তাল মিলিয়ে। হুট করে আকাশ থেকে নাজিল হয়নি আলাদীনের দৈত্যের হাতে। রসায়নের প্রক্রিয়া, পদার্থবিদ্যার অগ্রযাত্রায় সেলুলয়েড, লেন্স, স্থিরচিত্র, সিনেমার মুভি ক্যামেরা, প্রজেক্টর, স্ক্রিন, এমনকি চোখের ভিতরের কলকব্জার বিজ্ঞানভিত্তিক তথ্য জানতে হয়েছে। ইত্যাকার অনেক রকম প্রযুক্তির উপকরণ আমাদের ভাণ্ডারে আসতে হয়েছে। বুঝতে হয়েছে আলোকরশ্মির মতি-গতি [অপটিকস] সময়ের তাগিদে। মেধা আর মননে প্রযুক্তি এগিয়ে এসেছে সৃষ্টির মোহনায় মিলিত হতে! জন্মলগ্নে চলচ্চিত্র কিন্তু জীবনের খণ্ডচিত্র তুলে ধরেছে, আমরা জানি!

চলচ্চিত্র ভাষার রসায়ন

এবার চলচ্চিত্রের ভাষার রসায়ন বিদ্যায় আসা যাক, কী বলেন? এই যে আমি বাংলায় লিখছি ফিল্মফ্রি’র জন্য, আমরা যারা বাংলা ভাষার অক্ষরগুলোর সংকেত চিনি [যেমন অ, আ, ক, খ ইত্যাদি], তারা অনায়াসে ‘পাঠ’ করে ফেলছি প্রতিটি অক্ষর। আর প্রতিটি অক্ষরের সঙ্গে আছে ‘ধ্বনি’, যেমন স্বরে ‘অ’র সঙ্গে অ-ধ্বনি, স্বরে আ’র সঙ্গে আ-ধ্বনি…! স্বর থেকে কণ্ঠস্বর! যেমন লিখলাম ‘ফ’, তার সঙ্গে যোগ করলাম উকার, হল ‘ফু’! লিখলাম ‘ল’! ফু আর ল পাশাপাশি বসিয়ে জুড়ে দিলাম, বন্ধু বানিয়ে দিলাম! কি আশ্চর্য! বন্ধুত্বের ফলে দুয়ে মিলে [আসলে তিন, উ-কার ফ-এর কাঁধে] ফুটে উঠল ‘ফুল’– ধ্বনি দিয়েও বলতে পারবেন ‘ফুল’। অক্ষর দুটো মিলে একটি বাংলা ‘শব্দ’ হলো! ফুল! ইংরেজি ‘ফুল’ [fool] নয় কিন্তু, বোকা বনে যেন না যাই! গলার স্বরেও, মানে কণ্ঠ দিয়েও আমি, বাঙালি, তাই উচ্চারণ করতে পারব– ‘ফুল’।

দৃশ্য : আকাশ কুসুম/ জাকী, ১৯৯৭
কে যেন রেখে গেছে আফজাল, শাবনাজের জন্য

এবার গাই আমাদের প্রিয় গান: ‘ফুলে ফুলে ঢলে ঢলে বহে কিবা মৃদু বায়’! বাতাস! এবার ঘটবে আসল ব্যাপার। কী? ফুল শব্দটি দেখা বা শোনার সঙ্গে সঙ্গে মনের পর্দায় কী ভেসে উঠছে? অবচেতন, সচেতনভাবে? সহজ উত্তর। ফুলের ছবি। নয় কি? এমনকি নাকে সুগন্ধ ভেসে আসতে পারে। অদৃশ্য, কিন্তু মনের ভিতর দিয়ে অনুভূতির প্রক্রিয়ায় সুগন্ধ পৌঁছে যেতে পারে নাসারন্ধ্রে, মানে মনের অনুভূতিতে!

প্রশ্ন এবার: কোন ফুল? সেটা আমাদের অবচেতন, সচেতন মনের ব্যাপার! ‘ফুলে ফুলে’ গানটায় রবি ঠাকুর কি কোনো বিশেষ ফুলের নাম বলেছেন? না। যারা পাঠ করছি বা শুনছি তাদের ওপর ছেড়ে দেওয়া। কোন ফুলটি ‘বেছে’ [selection] নেব মনের ইচ্ছায়, হয়তো কোনো গল্প উঁকি দেবে! কোন ফুল দিয়ে বিনি সুতোয় সহজেই মালা গাঁথা যায়? ‘কবি’ রবি ঠাকুরের লিখন তোমার বিনি সুতোর… ফুলের মালা…?? কোন ফুল?


চলচ্চিত্র গাঁথার ব্যপারটিও
বিনি সুতোয় মালা
গাঁথার
মতো

একটি বাংলা শব্দ বছাই আর কাছাকাছি ইংরেজি একটি শব্দ selection-কে হাইলাইট করছি! আসলে আঁকিবুকি করে অক্ষর তৈরি করে বিনা সুতোয় গেঁথেই হয় ‘শব্দ’ আর বিনা সুতোয় আবার শব্দ গেঁথে গেঁথে ‘বাক্য’। আবার বাক্য গেঁথে মনের ভেতরের ভাবের প্রকাশ কথায়, ছড়ায়, কবিতায়, গানে, আমরাই করে থাকি। যেমন: আমার — সোনার — বাংলা — আমি — তোমায় — ভালোবসি! ৬টি শব্দ গেঁথে দেশের প্রতি ‘ভালোবাসা’! চিরন্তন। চলচ্চিত্র গাঁথার ব্যপারটিও বিনি সুতোয় মালা গাঁথার মতো।একদম! Building block ‘ইট’ শট গেঁথেই হয়ে থাকে, একটু ভিন্নভাবে।

একটু দম নেওয়ার জন্য মজার একটা গল্প বলি :

রাজ কাপুরের সঙ্গে…

রাজ কাপুর! নিশ্চয়ই বলে দিতে হবে না! ভারতের কাপুর পরিবারের অনেকের নাম আমরা জানি। শশি কাপুর, সম্প্রতি প্রয়াত ঋষি কাপুর [আমার এ লেখনীর সময় অসুস্থ]। কারিনা কাপুর। কাপুরের অন্ত নেই। আমি যখন আমাদের স্বাধীনতার পর ভারতের পুনা [এখন পুনে] ফিল্ম ইনস্টিটিউটে [FTII] চলচ্চিত্রের উপর ‘পাঠ’ নিতে গেলাম, তখন কিংবদন্তি রাজ কাপুর আমাদের গভর্নিং কাউন্সিলের প্রধান। আমি প্রথম বর্ষে, তাই অনুমতি নিয়ে বোম্বে [এখন মুম্বাই] গেলাম সিনিয়রদের নিয়ে তাঁর সঙ্গে মুলাকাত করতে। সৌভাগ্য। এ কথা, সে কথা, কত কথা!

এক সময়, একজন সিনিয়র প্রশ্ন করলেন: “রাজ, তোমার ছবির প্রায় সব গান এমন ‘হিট’ হয় কেমন করে?” তখন ববি ছবিটি মুক্তি পেয়েছে, এবং একটি গান ‘সুপারহিট’! ঐ যে ‘হাম তোম এক কামরে মে বন্ধ… আওর চাবি খো যায়ে’! কি সর্বনাশ! চাবি হারিয়ে গেছে? না, গান গানই!

হেসে রাজ বললেন : “আমি গল্প আর চিত্রনাট্যকারের চিত্রনাট্যের প্রয়োজনে সিচুয়েশন বলে দিলে গীতিকার গানের কথা বা লিরিক [lyric] লেখেন, সুরকার আমাকে সুর শোনান। আমি ঘটা করে বসে বা আয়েসে চোখ বুঁজে সেই সুর শুনি না; এ কাজ সে কাজ করতে করতে শুনি। তারপর যদি একবার শুনেই গুন গুন করে গাইতে পারি, তাহলে বলি : ‘ওকে’ [OK]! নয়তো ‘এনজি’ [NG]! ‘না, হয়নি, হয়নি, ফেল’।”

আমরা তাঁর রসাল কথায় হাসছিলাম। তিনিও হাসছিলেন। কিন্তু তারপর যা করলেন, মনে পড়লে আজও বিস্মিত হই: আস্ফূট কণ্ঠে বললেন : ‘হিট?? এই বাঙাল, শোনো!’ হারমোনিয়াম টেনে নিয়ে বাজিয়ে গাইলেন, ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি…!’ চোখ বুজে বললেন : “এটা থাকবে, ওটা থাকবে না, চাবি হারিয়ে যাবে, খো যায়ে গি, যতই বলিস ‘হিট’!!”

আমরা স্তব্ধ! বিনয়ী মানুষের নিছক বিনয়ের কথা নয়, গুণী মানুষের অনেক গভীরের কথা। সব সৃষ্টি কালজয়ী হয় না। তাতে কী? আমাদের মাঝ থেকে একজন কালজয়ী শিল্পী, কুশলী, চলচ্চিত্রকার হবে, হবেই একদিন! সোনার বাংলায় বাংলা লিখবে, ছবি আঁকবে, গান গাইবে, অভিনয় করবে, চলচ্চিত্র সৃষ্টি করবে– যা হারাবে না!

‘গল্পদাদুর দেশে এলেম আমি ভেসে’
লিরিক : জাকী; সুর : আলাউদ্দীন আলী; কন্ঠ, অভিনয় : শিমূল বিল্লাহ; অভিনয় : পিয়াল; ১৯৭৬

সম্পাদনা : space and time

হ্যাঁ, আমরা কিন্তু কথাচ্ছলে OK, ঠিক আছে, NG! না, ঠিক নেই– জেনেছি। OK শটটি ব্যবহার হবে চলচ্চিত্র সম্পাদনার [Editing] সময়! শট বাছাই বা Select করা এবং গল্পের প্রয়োজনে re-arrange করা বা জুড়ে দিয়ে সাজানো! OK? আমরা যখন বাক্য দিয়ে, সে যে ভাষাতেই হোক না কেন, ছড়া, কবিতা গান লিখি, চিঠি লিখি, ফেসবুকে ‘স্টেটাস’ বা মন্তব্য দিই, মনের ইচ্ছে অনুসারে শব্দ বাছাই করি, মনের ইচ্ছে অনুসারে সাজাই, মনের কথাই বলি! খুব সহজ। এটিই চলচ্চিত্র সম্পাদনার প্রাথমিক প্রক্রিয়া, সব শিল্পের ব্যাপারে, চলচ্চিত্রের ব্যাপারে তো বটেই।

সম্পাদনার জন্ম স্রষ্টার মনের অংকুর থেকে from day one! ঐ যে গল্প বা চিত্রনাট্য অনুসারে পরিচালক আর সম্পাদক [তাঁরা কিন্তু আধুনিক মনের কারিগরি জ্ঞান সম্পন্ন দক্ষ শিল্পী] টুকরো টুকরো বা বাছাই করে শট নেবেন, পুনরায় সেই শট গুলো থেকে বাছাই করে সাজাবেন ‘শট’ আর ‘অ্যাকশনের’ ধারাবাহিকতায় [continuity] গল্পের প্রয়োজনে। ‘জলবৎ তরলং’– জল বা পানির মতো সহজ।

NO!


সময়কে
নিয়ে অদৃশ্য
সৃষ্টি, খেলা চলচ্চিত্রকারের সবচেয়ে
শক্তিশালী
হাতিয়ার

TIME বা shot duration চলচ্চিত্র ভাষার প্রকাশে অত্যন্ত, অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার। Time and Space। সময়কে নিয়ে অদৃশ্য সৃষ্টি, খেলা চলচ্চিত্রকারের সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার। সময় নির্মাতার হাতে কুমোরের মাটি, গড়া যায় ভিন্ন ‘মাত্রার’ জন্ম দিয়ে। চলচ্চিত্রে TIME is PLASTIC, not ABSOLUTE। তবে একটু গভীরে গেলে অনুভব করা যাবে কোনো শিল্প প্রকাশ মাধ্যমে ‘সময়’ ABSOLUTE নয়। ভেবে দেখবেন?

শব্দ বাছাই বা শট বাছাই, সময়কে ভাঙা-গড়া স্রষ্টার ইচ্ছা, প্রয়োজন, দৃষ্টিভঙ্গি, জ্ঞান আর অনুভূতির গভীরতা ইত্যাদি অনেক কিছুর ওপর নির্ভর করছে। ফিল্মফ্রি সম্পাদক কিন্তু এই কাজটি করেছেন, এই সংখ্যা প্রকাশের আগে। ‘বাছাই’ আর সাজানো মন আর মননশীলতার ব্যাপার।

দম নেওয়ার জন্য আরেকটা গল্প :

সেই আদ্যিকালের চন্দ্রগুপ্ত ২-এর আমলে [সম্ভাব্য] মহাকবি কালিদাসের কথাই ধরা যাক! জেনেছি, তখন তলোয়ার যুদ্ধের বাইরে রাজসভায় কবিতা যুদ্ধ হতো, ঘটা করে। কালিদাস রাজসভার সভাকবি। তখন রেওয়াজ ছিল। মহারাজ রাজবাগানের একটি প্রায়-মরা ‘গাছ’ দেখিয়ে কবিতার একটি ছত্র সৃষ্টি করতে আজ্ঞা দিলেন। এ আর কি কঠিন কাজ? মহা আনন্দে একজন এগিয়ে এসে আবৃত্তি করলেন : ‘শুষ্কং কাষ্ঠং তিষ্ঠতি অগ্রে’। নিজেই হাততালি দিলেন। সবাই কেমন মন খারাপ করে ফেলল! আহারে, বেচারা সবুজ পাতার গাছ! আজ শুষ্ক কাঠ বৈ কিছু নয়।

কালিদাস চোখ বুঁজে টলটলে পাহাড়ি ঝরনার মতো অস্ফূট উচ্চারণ করলেন, তাঁর কবিতার পঙক্তি : ‘নীরস তরুরাজ বিরাজিছে সম্মখে’। কথিত আছে, মৃতপ্রায় গাছটি সেই কবিতার পরশে হঠাৎ জেগে উঠেছিল, পল্লবিত হয়েছিল।

ম্যাজিক?

হ্যাঁ, ঐ শব্দ বাছাইয়ের ম্যাজিক তাঁর মনের ভেতর হয়েছে আর তাঁর সম্পাদনাও মনের ভেতর হয়েছে! প্রায়মৃত বৃক্ষের প্রতি ভালোবাসায়, আদরের গ্রন্থনায় সৃষ্ট হয়েছিল অবিস্মরণীয় ছত্রটি। গাছটি জেগে উঠেছিল সবুজ পাতায় আর হাজার বছর পর রবি ঠাকুর গেয়েছিলেন– ‘সহসা ডালপালা তোর উতলা যে ও চাঁপা, ও করবী– কারে তুই দেখতে পেলি আকাশ-মাঝে জানি না যে! কোন রঙের মাতন উঠল দুলে, ফুলে ফুলে ও চাঁপা ও করবী!” ওই মাপের কবিদের মাঝে একটা আত্মিক যোগাযোগ থাকে অনন্তকাল ধরে।

এবার একটা গাছের ছবি দেখাই :

কাঠপেন্সিল, স্লেট পেন্সিল, তুলিতে, জল রঙ-এ, ক্রেয়ন, চক, তেল রঙ-এ– যা দিয়েই আঁকা হোক না কেন, দেখেই বলতে পারব; দেশ-বিদেশের ভাষা বা অক্ষরজ্ঞানের প্রয়োজন নেই! ছবির ভাষাই চিনিয়ে দিয়েছে ওটা তালগাছ, বাবুই পাখি যে ঢ্যাংগা গাছে তার শিল্পের ঠোঁট দিয়ে অপূর্ব বাসা বানায়! আর গাছটার আশপাশ দেখে চেনা অন্য কোনো গাছ পেলে কবি নজরুলের মতো বলে উঠতে পারব, ‘পুকুরের ওই পাশে না, লিচুর এক গাছ আছে না…!’ –না, না, লিচু চুরি করতে যেতে বলছি না, করোনাকালে দুষ্টু কিশোর পাঠকদের! হুঁশিয়ার!!

কাঞ্চন, অঞ্জু , আয়না বিবির পালা, ১৯৯০/ অনুভূতির ছোঁয়া

অনুভূতির জগত

ঐ যে তালগাছ আর লিচুর স্থিরচিত্র দেখে মনের ভেতর অনেক ছবি, অনেক কথা, অনেক কবিতা, গান ভেসে উঠল, সেটি আরেকটি জগত : আমরা বলে থাকি ‘অনুভূতির’ জগত। ঠিক একইভাবে বা আরও গভীরভাবে চলচ্চিত্র বা নড়েচড়ে moving image-এর অসীম জগত তৈরি হতে পারে।

চলচ্চিত্র গভীর অনুভূতির জগত তৈরি করার ক্ষমতা রাখে!

আমাদের সবচেয়ে বড় কিন্তু অদৃশ্য শক্তি অনুভব করা। প্রকৃতি দিয়েছে। Built-in! কম আর বেশি!কবি, শিল্পী, কুশলীদের দিয়েছে অনেক বেশি! তাঁরা শুধু মনের পর্দায় নয়, কাগজ-কলম, ক্যানভাসে, পিয়ানোর রিডে, হারমোনিয়াম, সেতারে, একতারা-দোতারায়, স্টিল ক্যামেরার স্থিরচিত্রে, মুভি ক্যামেরায়, চলচ্চিত্রের পর্দায় বা টেলিভিশনে ইমেজ গেঁথে পর্দায় প্রক্ষেপণ করে গল্প, কাহিনি, ডকুমেন্টারি বা মনের ভেতর থেকে প্রকাশ করার জন্য মননশীল যা আছে বা তথ্য দিয়ে আরেকটি জগত তৈরি করতে পারেন। [Information খণ্ড খণ্ড তথ্য-উপাত্ত দিয়ে IT, বা Information Technology, যা বিশ্বজুড়ে তথ্য প্রবাহের নতুন ধারা তৈরি করেছে, আজকের আলোচ্য বিষয় নয় যদিও।] তাঁরা ছড়া, কবিতা, গানের সুর, ‘নড়েচড়ে’ ছবি সব দিয়ে আমাদের সামনে ‘অনুভুতির’ ভিন্ন একটি জগত তৈরি করে দিতে পারেন।

অদৃশ্য, কিন্তু ইমেজের এই টুকরো। খেয়াল করবেন ‘টুকরো’ শব্দটির দিকে।এই টুকরোগুলো শিল্পী-কুশলীরা আবার গাঁথেন তাঁদের প্রকৃতি প্রদত্ত মেধা দিয়ে, শিল্পীর নিজস্ব ক্ষমতা দিয়ে। কেউ পারেন, অনেকেই পারেন না! তাই সবাই শিল্পী নয়, কেউ কেউ শিল্পী, আর খুবই কম কালজয়ী শিল্পী আছেন এই দুনিয়ায়!

দম নেওয়ার জন্য একটা গল্প বলি ছোট্ট করে : Ludwig van Beethoven, বিথোফেন, বিশ্বসংগীতের জগতে কালজয়ী নাম। আমাদের যেমন ওস্তাদ বিসমিল্লাহ খান [সানাই] বা সেতার সরোদে রবিশংকর, তবলায় জাকির হোসেন বা পশ্চিমা জগতের আরেক কিংবদন্তি Wolfgang Amadeus Mozart সংক্ষেপে মোৎযার্ট, গল্পটি বিথোফেনকে নিয়ে : তিনি সকাল থেকে জানালার পাশে বসে আছেন, পিয়ানোর পাশে নয়; আকাশ দেখছেন, মেঘের আনাগোনা দেখছেন, ফুল-লতা-পাতা-পাখি দেখছেন, চলন্ত সাত-ঘোড়ার গাড়ি দেখছেন, ঘোড়ার ছন্দবদ্ধ অশ্বখুরের শব্দ শুনতে পারছেন ঠকা ঠক, ঠকা ঠক– যেন কোনো রিদম-বাদ্য [rhythm instrument] বেজে চলেছে , পাখির ডাক শুনছেন– বাকুম বাকুম পায়রা কি সব বলছে, কিচিরমিচির চড়ুই পাখির ঝগড়া লেগেই আছে, তিনি শুনছেন, আর মানুষ দেখছেন, নারী-পুরুষ, মাথা নুইয়ে অভিবাদন করে চলে যাচ্ছেন সবাই। মাঝে মাঝে বাতাসের শব্দ!

বিথোফেন নিশ্চুপ, মগ্ন কোনো এক গভীর সাগরে বা নিঃসীম শূন্যে। মন তার কখনো যেন মেঘের সঙ্গী– ‘মন মোর মেঘের সঙ্গী, উড়ে চলে দিগ্-দিগন্তের পানে নিঃসীম শূন্যে’… পড়ন্ত বিকেলে সন্ধ্যার আবীরে ‘কনে দেখা’ মায়াবী আলোয় একজন প্রশ্ন করে বসলেন তাঁকে : “বিথ, সেই সক্কাল থেকে তুমি জানালার ধারে বসে আছো! নাওয়া-খাওয়া ভুলে, তুমি কি নতুন কিছু ‘কম্পোজ’ করছ? অসাধারণ কিছু?”

তিনি একটু হেসে বললেন : ‘জানি না, তবে নিঃসন্দেহে বলতে পারি কম্পোজ [compose] করছি না, ডিকম্পোজ [decompose] করছি!’

কেউ বুঝল, কেউ হয়তো না! তাঁর কথাগুলো পুরোপুরি বুঝতে হয়তো সময় লাগবে, কিন্তু আমাদের কথা দিয়ে সহজ করে বলা যায়। ঐ যে বলেছিলাম টুকরো টুকরো করে ইমেজ সংগ্রহ করার কথা, তারপর বাছাই করে জুড়ে দিয়ে নবতরঙ্গের নবসৃষ্টি করা, মনে আছে? সারাদিন ধরে বিথোফেন সংগ্রহ করেছেন সুরের অফুরন্ত ভাণ্ডার থেকে একটি বা একাধিক সারগাম কড়ি-কোমলসহ বা পশ্চিমের নোটেশন ডো রে মি, ফা, ইত্যাদি এক বা একাধিক! এক কথায়, প্রকৃতির ‘সারগাম’ সপ্তসুর থেকে সুরের টুকরো বাছাই করে মনের ভেতরে গেঁথেছেন, রাতে পিয়ানোর রিডে নেচে উঠবে আঙুলের স্পর্শে আদি-অনাদিকালের জন্য কালজয়ী সুর। সারগাম তখন নিছক সারগাম থাকবে না! শৈল্পিক গ্রন্থনায় হয়ে যাবে শিল্পীর ম্যাজিক পরশে মিলে-মিশে একটি কালজয়ী সুর; হয়েছেও অনেক। স্বরগ্রামের বিন্দু থেকে মহাসাগরের সৈকতে আছড়ে পড়া ঢেউ, বা মহাকাশের অশ্রুত সঙ্গীত।কালজয়ী সোনাটা, সিম্ফনি! কালজয়ী চলচ্চিত্র একইভাবে রচিত হয়।

Decompose, Compose, ভাঙা-গড়ার খেলাকে সহজ করা যায়। পানি। যে নামেই ডাকি না কেন, বিশুদ্ধ তরল পদার্থটি = H2O = Water, পানি। বাংলাদেশের বর্ডার পার হয়ে ঐ বঙ্গে ঢুকলে পানি বিগলিত হয়ে জল হয়ে যায় বটে, কিন্তু বঙ্গ পার হয়েই আরও পশ্চিমে গেলে জল গলে আবার হয়ে যায় পানি! কিন্তু জল আর পানি পাশাপাশি বসিয়ে দিলে হয় ‘জলপানি’! ভাষার সহ-অবস্থান কি মজার, কি সুন্দর! চলচ্চিত্রের মূল কাজ decomposed খণ্ডচিত্র compose করার মাধ্যমে ভিন্ন মাত্রা তৈরি করা, সংযোগ স্থাপন করা।

কবি জসিমউদদীনের আমার বাড়ি কবিতাটিতে আরেকটি সুন্দর শব্দ আছে : জলপান! জলপান নিছক পানি পান নয়, সঙ্গে অবশ্যই চিড়া-মুড়ি, মোয়া-মুড়কি! এই আদরের শব্দগুলো হারিয়ে যাচ্ছে, তাই ‘আদর’ও হারিয়ে যাচ্ছে। চলচ্চিত্রে আনতে হবে– ‘আদর’।

আমাদের আদরের শিল্পী, কিংবদন্তি; ২০১৯/২২ ফেব্রুয়ারি, জাকী

চিত্রনাট্য

গল্প, কাহিনি, উপন্যাস, কবিতা বা সরাসরি প্রতিষ্ঠিত নাটক থেকে চলচ্চিত্র তৈরির ব্লু-প্রিন্ট, নকশা, কাঠামো তৈরি হয়। চিত্রনাট্য, স্ক্রিনপ্লে, স্ক্রিপ্ট যাই বলি না কেন, তৈরি করতে হয় পরিচালককে চলচ্চিত্রের ভাষায় পরবর্তীকালে রূপান্তর করার জন্য! পরিচালক নিজেই তা করতে পারেন বা অন্য কোনো চিত্রনাট্যকার তা করে দিতে পারেন। গল্প নতুন করে লেখা হতে পারে, অথবা অন্য কোনো প্রকাশিত, অপ্রকাশিত প্রতিষ্ঠিত গল্প-উপন্যাস, বা লেখা থেকে হতে পারে। কবিতা থেকেও হতে পারে। সংবাদপত্রের কোনো একটি সংবাদ থেকে হতে পারে। নাটক থেকে হতে পারে। বিভূতিভূষণের পথের পাঁচালী থেকে সত্যজিৎ রায়ের পথের পাঁচালী, অদ্বৈত মল্ল বর্মনের তিতাস একটি নদীর নাম থেকে ঋত্বিক ঘটকের ছবি, আবু ইসহাকের সূর্য দীঘল বাড়ী থেকে সেই নামে ছবি, জহির রায়হানও করেছেন তাঁর গল্প, উপন্যাস থেকে চিত্রায়ন। নির্মলেন্দু গুণের হুলিয়া কবিতা থেকে শর্টফিল্ম হয়েছে। মোরশেদ [মোরশেদুল ইসলাম] হুমায়ুন আহমদের রচনা থেকে সার্থক ছবি করেছে।

তিতাস একটি নদীর নাম

এখানে একটু ভিন্ন মাত্রায় মন্তব্য করব : ‘সাহিত্যের দাসত্ব করা চলচ্চিত্রের কাজ নয়’ শুনেছি রবি ঠাকুর নাকি এ ধরনের মন্তব্য করেছিলেন। I am not sure, can any one throw some light?? কথা একদম খাঁটি। চলচ্চিত্র সাহিত্যের নিছক ভিসুয়াল অনুবাদ নয়, শৈল্পীক রূপান্তর, আলাদা সত্তা।পথের পাঁচালী বিভূতিভূষণের, আবার সত্যজিৎ রায়ের ও বটে। তিতাসও তাই। আমার বন্ধু অধ্যাপক সোমেশ্বর চক্রবর্তীর প্রশ্ন ছিল আমার কাছে : পদ্মা নদীর মাঝি কার কাছে? মেলেনি উত্তর নদীর কাছেও। আলোচনা-সমালোচনা extensions of চলচ্চিত্র; আলোচক, সমালোচক চলচ্চিত্রের বন্ধু, শক্তি।

প্রস্তুতি

‘ফু’ দিয়ে ছবি হয় না, কোনো শিল্পই নয়! চায়ের কাপেও নয়। বিশ্বখ্যাত পরিচালক Roman Polanski ঢাকায় এসেছিলেন, আমার সৌভাগ্য হয়েছিল তাঁর সাথে আলাপচারিতার, একান্তে আর ক্যামেরার সামনেও। তিনি খুব জোর দিয়ে বলেছিলেন কথা প্রসঙ্গে : ‘Listen to me young man, you can not make films over cups of tea or merely sipping coffee, relaxing casually! Prepare, and engage yourself, as if you are fighting a war.’। শিল্পের জন্য যুদ্ধ, মুক্তির জন্য যুদ্ধ– মুক্তিযুদ্ধ!

Roman Polanski making a firm point to Zaki

“The greatest mystery is not that we have been flung at random between the galaxies of stars of the Universe, but that in this prison we can ‘fashion’ images sufficiently powerful to deny our nothingness.” Andre Malraux।

অগ্নিফসল : মুক্তির জন্য যুদ্ধের ছবি/ মার্চ, ২০২০/ জাকী

চলচ্চিত্র আমাদের অস্তিত্বের অহংকার।

পুরস্কার তিরস্কার হয়ে এই অবস্থা হতে পারে, মানসিক প্রস্তুতি থাকতে হবে!!! [হাসি]

Print Friendly, PDF & Email
শেয়ার
প্রখ্যাত ফিল্মমেকার; সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব। বাংলাদেশ ।। জন্ম : ২৬ আগস্ট ১৯৪৬ ।। ফিচার ফিল্ম : ঘুড্ডি ; লাল বেনারসী; আয়না বিবির পালা ।। শর্টফিল্ম : দেয়াল, তামাশা, গল্পদাদুর গল্পকথা, অংকুর ইত্যাদি ।। মহাপরিচালক, বাংলাদেশ টেলিভিশন [১৯৯৬-২০০১] ।। অপারেশন ডিরেক্টর, বাংলাদেশ ফিল্ম ডেভেলপমেন্ট করপোরেশন [১৯৮১-১৯৯৪] ।। শিক্ষার্থী, ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন ইনস্টিটিউট অব ইন্ডিয়া [(পুনে ফিল্ম ইনস্টিটিউট); ১৯৭২-১৯৭৭]

মন্তব্য লিখুন