সত্যজিৎ রায়ের শিল্পভাবনায় শংকরের সীমাবদ্ধ উপন্যাসের নবনির্মাণ

104
সত্যজিৎ রায়

লিখেছেন: বিশ্বজিৎ মণ্ডল


নিবেদন অংশে শংকর সীমাবদ্ধ উপন্যাসের লেখা প্রসঙ্গে বলেছেন, ‘স্বাধীনতা পরবর্তী ভারতবর্ষের শিল্পবিপ্লবের কল্যাণে যে নতুন অভিজাত সম্প্রদায়ের সৃষ্টি হয়েছে তার সম্বন্ধে কিছু লেখবার বাসনা অনেকদিনের।’ এই বাসনা শিল্পবিপ্লবের অনিবার্য ফলে গড়ে ওঠা একটি কোম্পানি এবং তার অধীন কিছু কর্মচারির নিজ কৌশলে অবস্থার উন্নতির চেষ্টার মাধ্যমে ফুটে উঠেছে। অভিজাত শ্রেণির মানবিকতাহীন মেকি দিকগুলোর মাধ্যমেও যথার্থভাবে তা পরিপূর্ণতা পেয়েছে।

এই উপন্যাসই পরিচালক সত্যজিৎ রায় আপন কৌশলে চলচ্চিত্রে উপস্থাপন করেছেন। উপন্যাস ভিন্ন কিছু নতুন দিকও তিনি যুক্ত করেছেন নিজ গুণে।

শংকরের সীমাবদ্ধ উপন্যাসটি ১৯৭১ সালে চলচ্চিত্রায়িত হয়। উপন্যাস এবং চলচ্চিত্রের প্রধান চরিত্র শ্যামলেন্দু চ্যাটার্জি। সময়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বেকার সমস্যার একটি টুকরো প্রস্তাবনা চ্যাটার্জির মুখ দিয়ে বলিয়ে নেওয়া হচ্ছে শুরুতেই। প্রস্তাবনাটি সত্যজিৎ রায়ের একেবারেই নিজস্ব। আত্মকথনের মাধ্যমে চ্যাটার্জিই তার দীর্ঘ সাফল্যের পঞ্চনামা বলছেন আর একের পর এক চলমান চিত্রের মাধ্যমে সেগুলোই দর্শিত হচ্ছে। রাস্তায় অফিসের বাইরে দিশাহীন যুবকেরা সার্টিফিকেট হাতে বসে আছে। জটলা করছে, দরখাস্ত করছে, তাতে বেকার সমস্যার সেই সময়ের দিকটি প্রকাশ পেয়েছে।

শুরুতেই একটি পূর্ণ দৃশ্যায়নের মাধ্যমে পিটার কোম্পানিই যে চ্যাটার্জির ধ্যান-ধর্ম-ভবিষ্যৎ– এই চরম সত্যটি প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেল। চ্যাটার্জি ওরফে শ্যামলেন্দু, সান্ন্যাল ওরফে রুনু দুজনেই দীর্ঘ বেশ কয়েক বছরের পরিশ্রমে নিজেদের বুদ্ধি ও কৌশলে ফ্যান এবং ল্যাম্প ডিভিশনে সার্ভিস ম্যানেজার। দুজনেরই বর্তমান লক্ষ্য একটাই, সেটা হলো ডিরেক্টর পদ দখল। সুতরাং একে অপরের রেষারেষি কম নয়। এটি তাদের মধ্যে কতটা পরিমাণ, তা বোর্ড মিটিং হলের বাইরে একে অপরের প্রতি ধোঁয়ার রিং ছাড়ার মাধ্যমেই স্পষ্ট।

সত্যজিৎ রায়
সীমাবদ্ধ। ফিল্মমেকার: সত্যজিৎ রায়

চলচ্চিত্রে যেটুকু জানতে পারি, শ্যামলেন্দু এক্সপোর্টের দায়িত্বে আছে। কারখানায় ফ্যান প্যাকেজিং হচ্ছে ইরাকে যাবে বলে। তারই প্রস্তুতি চলছে জোর কদমে। সমস্তয় সূত্রাকারে ভালোমতোই চলছে, হঠাৎ জানতে পারা গেল, ফ্যানে একটা সমস্যা আছে। ফলে নির্দিষ্ট ১৫ তারিখে ইরাকে ফ্যান পাঠানো হচ্ছে না।

কিন্তু এই এক্সপোর্ট যদি আটকে যায়, তাহলে বাজারে কোম্পানির দুর্নাম অবশ্যম্ভাবী। ক্ষতিপূরণ বাবদ অনেকগুলো টাকা শর্ত অনুযায়ী কোম্পানিকে দিতে হবে।

পরে এই সমস্যা থেকে বেরবার নানা কৌশল খোঁজা। একটা সময় কদর্য রাস্তা দিয়ে সেই সমস্যা থেকে বেরিয়ে আসা এবং শ্যামলেন্দুর ডিরেক্টর হওয়া। এই কাহিনিটুকুই উপন্যাসের জিস্ট হিসেবে নিয়ে সত্যজিৎ রায় চলচ্চিত্রায়ন করেছেন।

সীমাবদ্ধ

চলচ্চিত্রের খুঁটিনাটি প্রসঙ্গে সত্যজিৎ রায় একটু বেশিই সজাগ। উপন্যাসে শ্যামলেন্দু চ্যাটার্জির বর্ণনা– অফিস গাড়ির দরজা খোলার পর চ্যাটার্জি সাহেব নেমে এলেন, ‘আহা, কতই বা বয়স। চোখে মোটা কালো ফ্রেমের চশমা। মাথার চুলগুলো শুকনো অথচ কেমন শাসনে রয়েছে। ফেরিস সাহেবের মতো ফর্সা না হলেও চ্যাটার্জি সাহেবকে কালো বলা চলে না। চ্যাটার্জি সাহেবের নাকটাও কেমন ছুঁচলো। মোটা চশমার কাঁচের মধ্য দিয়ে চ্যাটার্জি সাহেবের চোখ দুটো কেমন উদাস মনে হয়।’


উপন্যাস আর চলচ্চিত্র–
এই দুই স্থানের
শ্যামলেন্দুর
অনেকটাই
পার্থক্য
ঘটিয়েছেন চলচ্চিত্রকার

এই বর্ণনার সঙ্গে শ্যামলেন্দুর কোনো পার্থক্য পায় না চলচ্চিত্রে। অবশ্য এ ম্যানেজার শ্যামলেন্দু। কোম্পানিতে দায়িত্ব নেবার পরের শ্যামলেন্দু আবার একটু অন্যরকম। সার্বিকভাবে দেখতে গেলে বলা চলে, উপন্যাস আর চলচ্চিত্র– এই দুই স্থানের শ্যামলেন্দুর অনেকটাই পার্থক্য ঘটিয়েছেন চলচ্চিত্রকার।

শ্যামলেন্দুর ব্যক্তিগত এবং ব্যবসাগত কূটনৈতিক দিকগুলোকে আরও ধারাল করার জন্য যা যা করণীয়, সেগুলো সত্যজিৎ রায় করেছেন। শ্যামলেন্দু অফিস বিল্ডিংয়ে লিফটে উঠবে, তাই গাড়ি থেকে নেমেই দ্রুত পদক্ষেপে ভেতরে গেলে তালুকদার, অর্থাৎ লেবার ম্যানেজার দায়িত্বশীল আহ্বানে লিফটে তাকে ডেকে নেয়। এই তালুকদারকে আমরা উপন্যাসে অনেক পরে পাই। অফিসের সেই গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা সমাধানে বিশেষ দায়িত্বও ছিল তার। তালুকদার উপন্যাসে পার্সোনাল অফিসার।

সীমাবদ্ধ

লিফট থেকে শ্যামলেন্দু সোজা আপন কেবিনে একটু বসে হাতের কাছে শার্টের ভেতরে রাখা চিরকুট খুঁজে একটা বিশেষ কাজ সেরে নেয়। উপন্যাসে আছে, এটি সে শিখেছে কোম্পানি ম্যানেজিং ডিরেক্টর ফেরিস সাহেবের কাছে। তাছাড়া কোম্পানির অফিসে চাকরি সূত্রে পার্টিতে যোগদান করলে এই ধরনের চিরকুট খুব প্রয়োজনীয়। বিশেষত স্ট্যাটাস সুলভ আচরণ ধরে রাখতে গেলে। যেমন– একই খাবার না খাওয়া, একই পোশাক না পরা, অন্য একদিনের পার্টির সঙ্গে পার্থক্য বজায় রাখার জন্য অবশ্যই প্রয়োজনীয় এই চিরকুট! অবশ্য সত্যজিৎ রায় শুধুমাত্র গৃহস্থালির টুকিটাকির ক্ষেত্রেই চিরকুট ব্যবহার সীমাবদ্ধ রেখেছেন।

শ্যামলেন্দুর কেবিনে এসে কোম্পানির সেক্রেটারি শ্যামসুন্দর সেনগুপ্তের বোর্ড মিটিং সংক্রান্ত কথোপকথন প্রায় একই আছে চলচ্চিত্রে। কোম্পানির আর এক ডিরেক্টর বরেন রায় সারাক্ষণ ঘুমোন বটে, কিন্তু চেহারা আর শরীর জুড়ে এক প্রকার অন্য ভাষাভঙ্গি, যেটা তার নিজের প্রতি অবান্তর গর্ববোধকেও প্রকাশ করে। বরেন রায় ও সেক্রেটারির বাক্যালাপের ও রসিকতার অংশগুলোও বাদ পড়েনি চলচ্চিত্রে।

ব্যক্তি পদে পদে তার আদর্শকে লালন করে, আবার সে আদর্শে স্থিতু হয়ে থাকা সময়ের প্রেক্ষিতে অনেকটা কঠিনও হয়ে পড়ে। কিংবা ব্যক্তিস্বার্থও সে আদর্শকে চুরমার করে দেয় অনেক সময়। নিজেকে নিজেরই মতের বিরুদ্ধ হয়ে উঠতে হয়। নিজের সঙ্গে যুদ্ধ করতে হয় প্রতি পদক্ষেপে। নিজের ভালো না লাগা জিনিসগুলো অনিচ্ছা সত্ত্বেও ভালো লাগাতে হয়।


‘আসমুদ্র
হিমাচলের
কোটি কোটি
মানুষ জানতে
চাইবে কেন আমাদের
অন্ন নেই, বস্ত্র নেই, স্বাস্থ্য
নেই, সুখ নেই, স্বাচ্ছন্দ নেই’

ঠিক এই রকমই শ্যামলেন্দুকে উপন্যাসে পাওয়া যায়, যার মুখ থেকে এক সময় শোনা যেত– ‘আসমুদ্র হিমাচলের কোটি কোটি মানুষ জানতে চাইবে কেন আমাদের অন্ন নেই, বস্ত্র নেই, স্বাস্থ্য নেই, সুখ নেই, স্বাচ্ছন্দ নেই।’

শ্যামলেন্দুর শ্যালিকা টুটুলের মাধ্যমে এই শ্যামলেন্দুর আগের শ্যমলেন্দুকে আমরা পাই। যে শেকসপিয়র খুব সুন্দর আবৃত্তি করত। তাই এক অন্য আদর্শ লালনকারী এই শ্যামলেন্দু সহজেই উচ্চাসার স্বার্থকতার পিচ্ছিল পথে পদচারণ করতে দ্বিধাগ্রস্ত। তবু সে সেগুলো করে, তবে দ্বিধা থেকে বের হতে পারে না।

উপন্যাসে এই শামলেন্দুকেই আমরা পেয়েছি। বিদেশে রপ্তানি করতে চাওয়া ফ্যানগুলো নিখুঁত না হওয়ায় সেগুলো পাঠানো সম্ভব নয়। তাই হাতে সামান্য একটু সময় পেলেই সংশোধনোত্তর সেগুলো পাঠানো হবে। কিন্তু এসব করতে গেলে একটু সময় দরকার, আর সেটি যে করেই হোক, বের করতে হবে।

শ্যামলেন্দু রপ্তানির শর্তের কাগজ বার করে দেখে লকআউট, স্ট্রাইক ইত্যাদি কারণে রপ্তানি সম্ভব না হলে কোনো ক্ষতিপূরণ দিতে হবে না। একটা কৌশলে হরিপদের সঙ্গে কারখানার বর্তমান অবস্থা জানতে চায়। সেখানে ক্যান্টিনের খাবারে মাছের টুকরোর একটা সমস্যার আঁচ পায় শ্যামলেন্দু। এইটুকু শুনেই ভেতরে পরিকল্পনা চলতে থাকে। চলচ্চিত্রে দেখি– ফেরিস, শ্যামলেন্দু, হরিপদ– এই তিনজনের কাছেই পরিকল্পনার খবর সীমাবদ্ধ। তবে উপন্যাসে শুধু ফেরিস ও শ্যামলেন্দু বিষয়টি জানে। অভ্যন্তরে আর সকলে যারা পরোক্ষভাবে কাজ করছে, তারা বাহ্যত অনুল্লেখ থাকে।

চলচ্চিত্রে দেখি, সমস্ত কাজেরই পেছনে হরিপদ– অর্থাৎ ক্যান্টিনে ইচ্ছে করে সমস্যার বীজ বোপন করা, বোমা ফেলা, হরি সিংয়ের আহত হওয়া– সবেতেই হরিপদের উপস্থিতি। দীর্ঘ কাজের ইতিহাসে হরিপদের পদন্নতি হয়নি, তাই সে ফেরিস সাহেবকে বিষয়টি বিবেচনা করতে বলার জন্য শ্যামলেন্দুকে অনুরোধও করে। কোম্পানির প্রয়োজনের কাজটি কতটা দুর্ঘটনাপ্রবণ এবং অঘটন ঘটার সম্ভবনা কতটা ছিল– সেটি বোঝাবার জন্য হরিপদ একটা কৃত্রিম আঘাতের চিহ্ন তৈরি করে নেয় ফেরিসের সহানুভূতি এবং কাম্য কর্তব্যকে মনে করিয়ে দেবার জন্য। এ সমস্ত কিছুই কিন্তু উপন্যাসে অনুপস্থিত।

আবার দেখি, অফিসের সমস্যা টুটুলকে বললে টুটুল শ্যামলেন্দুকে ঠাট্টাচ্ছলে কারখানা বন্ধ করতে একটা ঝামেলা বাঁধানোর কথা বলে। শ্যামলেন্দু যে এখান থেকেই প্ল্যানটা নিলো, সেটা বোঝা যায়।

আরও একটি বিষয়, এই টুটুল কিন্তু উপন্যাসে একেবারে বিপরীত। চলচ্চিত্রে টুটুলকে একজন সমাজ সচেতন, বাস্তব সমস্যায় ব্যথিত এক নারী হিসেবে এঁকেছেন সত্যজিৎ রায়। মাঝে মাঝেই তার বক্তব্যের আঁচে সেই তাপের আভাস পাওয়া যায়। তাই ডিরেক্টর হবার খবরের পর তার বুঝে উঠতে কোনো অসুবিধে হয়নি, শ্যামলেন্দু আসলে কী করেছে, কীভাবে এই পদ পেয়েছে। এবং এই বিষয়টি একজন সমাজ সচেতন মানুষ কোনোভাবেই মেনে নিতে পারে না। তাই সমস্ত কিছুর ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ মুখ নিঃসৃত কথায় না হয়ে শ্যামলেন্দুর এক সময়ে দেওয়া ঘড়ি ফেরত দেবার দৃশ্যায়নের মাধ্যমে ঘটেছে। এতে টুটুল যে আর থাকবে না, সেটিও স্পষ্ট হলো।

সীমাবদ্ধ

আসলে শামলেন্দু ভেবেছিল, টুটুলও হয়তো তাকে প্রশংসায় ভরিয়ে তুলবে। কিন্তু একটা শ্রেণির প্রতি অন্যায় খেলার বিজয়ী হিসেবে পাওয়া ওই ডিরেক্টর পদের কোনো মূল্যই নেই টুটুলের কাছে। এই টুটুলকে উপন্যাসে পাই না। সে একজন যোগ্য শ্যালিকা রূপেই সেখানে উপস্থিত। চলচ্চিত্রের শ্যামলেন্দুর মধ্যে সেই প্রত্যাশিত না পাওয়ার আঘাতটুকু দিয়ে তার ভেতরের সত্তাকেও ফুটিয়ে তুললেন সত্যজিৎ রায়।

উপন্যাসে শ্যামলেন্দুকে কাঙ্ক্ষিত পদটি পেয়ে খুব একটা খুশি হতে দেখিনি। অন্তর্বেদনাতে ক্ষত-বিক্ষত হয়ে চুপসে যেতে দেখি। সমস্ত কাজটি সে নিজেই পরিকল্পনা মতো করল, কিন্তু সেই ঘৃণ্য কাজের প্রতি স্মরণে কাঁটা বিধতে থাকল প্রতি ক্ষণে। একটি সময় স্ববিরোধিতায় আবদ্ধ হতে দেখি শ্যামলেন্দুকে। সে নিজেকেই নিজে মেনে নিতে পারছে না, আবার সম্পূর্ণ বাতিলও করতে পারছে না।

চলচ্চিত্রের শ্যামলেন্দুর এই দিকগুলোর কোনো কিছুরই আভাস পাওয়া যায় না। সে হাসপাতালে হরি সিংকে দেখতে আসতে কোনো দ্বিধা করে না। অবশ্য হরিপদ তাদেরই আদেশে এ সমস্ত কাজ করছে– এটা ভেবে মাঝে মধ্যে চেহারায় একটু চিন্তারেখা দেখতে পেয়েছি।


‘বমডিলায় যে লোকটা খোঁড়া
হয়ে এসেছিল, এই
কলকাতায়
আমরা
তার
বাকিটা শেষ করে দিলাম’

উপন্যাসে শ্যামলেন্দুকে দেখি হরিপদের কাছ থেকে একের পর এক রিপোর্ট জানছে, শ্রমিকের আহতের খবর, মেশিনের ক্ষয়ক্ষতির সংবাদ নিচ্ছে। এর মাধ্যমেই শ্যামলেন্দু নিজেদের উদ্দেশ্যের কাছে আসার সীমাটি মাপতে চেয়েছে বারবার। কিন্তু যখনই জানতে পারল ওয়াচম্যান হরি সিং আহত হয়েছে, তখন ‘হঠাৎ যেন মাথাটা ঘুরে গেল।’ এরপর হরি সিংয়ের মারা যাবার খবরে ‘সর্বশরীরে কে যেন বরফের গুড়ো ছড়িয়ে দিল।’ সে মনে মনে বলল, ‘বমডিলায় যে লোকটা খোঁড়া হয়ে এসেছিল, এই কলকাতায় আমরা তার বাকিটা শেষ করে দিলাম।’ চলচ্চিত্রে এই হরি সিং মারা যায়নি।

চলচ্চিত্রে শ্যামলেন্দুর জীবনের অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যতের একটা পরিপূর্ণ ছবি পায়। বাবা পাটনা স্কুলের রিটায়ার্ড শিক্ষক, মা হাউস ওয়াইফ। ইংরেজিতে এমএ করে সেও বাবার পদাঙ্ক অনুসরণ করে কলেজ প্রফেসারি করে। পিটার্স লিমিটেডে চাকরি সূত্রে প্রথমে দিল্লি, তারপর দীর্ঘ কয়েক বছর পর কলকাতায় পোস্টিং। তার বাবা মা’র জন্য ফ্ল্যাটের ব্যবস্থা। কোম্পানির ফ্ল্যাটে শুধু শ্যামলেন্দু ও তার স্ত্রী।

সীমাবদ্ধ

উপন্যাসে আছে, ওই কোম্পানির এক অফিসার (শ্যামলেন্দু নয়) তার বাবা মা’কে চাকর বলে পরিচয় দেয় এবং সেটি জানাজানিও হয়। সত্যজিৎ রায় কিন্তু নৈতিকতা বর্জিত শ্যামলেন্দুকে আঁকেননি। পার্টি চলাকালীন তার বাবা-মা বাড়িতে এলে শ্যামলেন্দুর চেহারায় কোনো অপ্রীতি লক্ষ্য করিনি। শুধু কিছুক্ষণ পার্টির হই-হুল্লোড়ে হঠাৎ স্তব্ধতার দেওয়াল, কলিগদের মিচকি হাসি। উপন্যাসে অবশ্য শ্যামলেন্দুর বাবা-মা দুজনেই মৃত।

টুটুল হাতঘড়ি খুলতে থাকলে শ্যামলেন্দুর চোখে ফোটে অস্পষ্ট ব্যথা। অন্যায় প্রকাশিত হবার গ্লানি মিশ্রিত চেহারা দু-হাত দিয়ে ঢাকে সে। এখানেই চলচ্চিত্রের সমাপ্তি ঘোষিত হয়।

উপন্যাসে টুটুলের যাওয়াটা বেশ খুশি খুশিই যাওয়া। আইএস পরীক্ষায় পাশ করেছে, তাই সে দিল্লি যাবে। উপন্যাসে বোঝা যায়, শ্যামলেন্দু শেকসপিয়রীয় আদর্শকে অবলম্বন করেই পিটার্স কোম্পনিতে চাকরি নিয়েছিল; কিন্তু শেষের ওই কাজটিই সেই সকল আদর্শের চরম বিরুদ্ধাচারণ হয়ে ওঠে। তাই শ্যামলেন্দুর মনের কোণে সেই সমস্ত মোরালিটি তাকে শাসন করছে অনবরত। সে কারণেই যেন এত কিছুর পরেও ব্যথিত মন মানতে পারে না সমস্তটাকে।

শ্যামলেন্দু যখন টুটুলকে এয়ারপোর্টে পৌঁছে দিয়ে ফিরছে, তখন ‘রাতের অন্ধকারে দমদম ভিআইপি রোড ধরে বেশ জোরে গাড়ি চালাতে চালাতে সৃষ্টিধর দেখল তার সায়েব ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছেন।’ আসলে শ্যামলেন্দুকে সত্যজিৎ রায় ব্যক্তিস্বার্থ মর্যাদা প্রতিষ্ঠার নেশায় মেতে ওঠা মোরালিটিহীন এক কঠোর ব্যক্তি হিসেবে এঁকেছেন। শ্যামলেন্দু সমস্ত কাজই একপ্রকার জোর করেই করে, তারই কথায় ভূগোলকে সিলেবাসের সঙ্গে পড়ার মতো।

সীমাবদ্ধ। লেখক: শংকর
তথ্যসূত্র:
শংকর, সীমাবদ্ধ, মিত্র ও ঘোষ প্রকাশনী, প্রথম প্রকাশ ফাল্গুন ১৩৭৭, পৃ: ১২
Print Friendly, PDF & Email