বার্গম্যান অথবা বারিমনের আত্মজীবনী [কিস্তি-২]

3
293

ইংমার বারিমন। ইংরেজি উচ্চারণ ইঙ্গমার বার্গম্যান নামে অধিক পরিচিত সুইডিস মাস্টার ফিল্মমেকার। দ্য ম্যাজিক লেন্টার্ন শিরোনামে প্রকাশিত তার আত্মজৈবনিক গ্রন্থটি সিনেবিশ্বের একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ টেক্সটবুকও বটে। সেই গ্রন্থের এই ধারাবাহিক অনুবাদ…

 আগের কিস্তি । আমার শৈশব… 


মা যেদিন মারা গেলেন

৯৬৫ সালের শুরুর দিকের ঝড়ো-হাওয়াময় এক দিনে, থিয়েটারে ফোন করে মা আমাকে জানালেন, বাবাকে হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে; তার কণ্ঠনালীতে হওয়া একটা ম্যালিগন্যান্ট টিউমারের অপারেশন করানোর জন্য। মা চাইলেন, বাবাকে যেন আমি দেখতে যাই। আমি বললাম, দেখতে যাওয়ার মতো সময় কিংবা দেখার কোনো ইচ্ছে আমার নেই; কেননা, পরস্পরকে বলার মতো কোনো কথা আমার কিংবা বাবার মধ্যে নেই; কেননা, এই মানুষটির ব্যাপারে আমি উদাসীন, এবং তার মৃত্যুসয্যায় আমি তাকে দেখতে গেলে তিনি সম্ভবত কেবল আতঙ্কিত আর বিব্রতই হবেন। [শুনে] মা রেগে গেলেন। গোঁ ধরলেন। আমার মন খারাপ হলো। তবু ইমোশনাল ব্ল্যাকমেইলিংকে আমি আমি পাত্তা দিলাম না। এ এক চিরন্তন ব্ল্যাকমেইল : ‘আমার জন্যও কি এটা করতে পারবি না তুই?’ মা বেশ ক্ষেপে গেলেন। কাঁদতে লাগলেন। আমি জেনে গেছি, কান্না কখনোই আমার মনে কোনো ছাপ ফেলতে পারে না। ঠাস করে রেখে দিলাম ফোনটা।

সেদিনকার সন্ধ্যাটা থিয়েটারে নিজের দায়িত্ব পালনে কাটল আমার। ব্যাকস্টেজে গেলাম। অভিনেতাদের সঙ্গে কথা বললাম। ভয়ানক তুষারঝড়ের কারণে যে দর্শকেরা আসতে দেরি করে ফেলেছে, তাদেরকে তাগাদা দিলাম। নিজের রুমে বসে পিটার ওয়েজের দ্য ইনভেস্টিগেশন-এর [Die Ermittlung] সিনারি নিয়ে কাজ করছি, এমন সময় বেজে ওঠল টেলিফোন। সুইচবোর্ডে থাকা মেয়েটি জানাল, থিয়েটার ম্যানেজারের সঙ্গে কথা বলতে চাইছেন মিসেস বারিমন। যেহেতু মিসেস বারিমন বলতে অনেকের কথাই বোঝা সম্ভব, তাই আমি ঝাড়ি দিয়ে জানতে চাইলাম– কোন মিসেস বারিমনের কথা বলা হচ্ছে। সুইচবোর্ড গার্ল খানিকটা ভীত-স্বরে জবাব দিল, ইনি থিয়েটার ডিরেক্টরের মা; ইনি তার ছেলের সাথে এক্ষুনি কথা বলতে চাইছেন।

মায়ের সঙ্গে বারিমন । রাগে তার চোখ কালসিটে আর নাক লাল হয়ে আছে...
মায়ের সঙ্গে বারিমন রাগে তার চোখ কালসিটে আর নাক লাল হয়ে আছে…

উঠে গেলাম মাকে রিসিভ করতে। হার্টের রোগ আর ভীষণ রাগ নিয়ে এই তুষারঝড়ের ভেতর থিয়েটারে চলে আসায় নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে তার। মাকে আমি বসতে বললাম। বললাম এক কাপ চা খেতে। তিনি জবাব দিলেন, বসার কিংবা চা খাওয়ার কোনো ইচ্ছে তার একেবারেই নেই। সকাল বেলা টেলিফোনে আমি তার সঙ্গে যে নিষ্ঠুর ও নৃশংস দুর্ব্যবহার করেছি, সেটি আরেকবার শোনার জন্যই তার এই আগমন! তিনি দেখতে চান– বাবা-মাকে প্রত্যাখ্যান ও অপমান করার সময় আমার চেহারা কেমন দেখায়

ছোটখাট কোট পরিহিত এই মানুষটির শরীর থেকে তুষার গলে পড়ে কার্পেটটিকে গাঢ় করে তুলছে। ভীষণ নিষ্প্রাণ দেখাচ্ছে তাকে। রাগে তার চোখ কালসিটে আর নাক লাল হয়ে আছে। তাকে জড়িয়ে ধরার আর চুমু খাওয়ার চেষ্টা করলাম আমি; কিন্তু ঠেলে সরিয়ে দিলেন আমাকে; আর সপাটে চড় মারলেন মুখে। [মামণির চড় মারার টেকনিক ছিল অতুলনীয়। এক পলকেই আঘাতটা নেমে আসত, আর দুটি ওজনদার বিয়ের আংটি পরা বাম হাতটি শাস্তির যন্ত্রণাকে জোরালো করে তুলত।] আমি হেসে ওঠলাম, আর কান্নায় ভেঙ্গে পড়লেন মা। টেবিলের পাশে থাকা একটি চেয়ারে যথাযোগ্য দক্ষতায় নিজেকে ডুবিয়ে দিলেন তিনি। ডান হাতে মুখ ঢেকে, বাম হাত দিয়ে নিজের ব্যাগের মধ্যে হাতড়িয়ে খুঁজলেন রুমাল। তার পাশে বসে পড়লাম আমি। তাকে আশ্বস্ত করলাম, বাবাকে নিশ্চয়ই দেখতে যাব; কেননা, আমি যা বলেছিলাম, তার জন্য অনুশোচনা হচ্ছে আমার, আর সেজন্য মার কাছে অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে ক্ষমা চাইলাম। হাত বাড়িয়ে আমাকে জড়িয়ে নিলেন তিনি। বললেন, আমাকে আর এক মিনিটের জন্যও জ্বালাতে চান না। এরপর আমরা চা খেলাম, আর শান্তভাবে আলাপ করলাম রাত দুটো পর্যন্ত।

সেই মঙ্গলবারটিতে এ সবই ঘটেছে। এর পরের রোববার, আমাদের পরিবারের একজন পরিচিত মানুষ, যিনি বাবা হাসপাতালে থাকার দিনগুলোতে মায়ের সঙ্গে থেকেছেন, তিনি ফোন করে জানালেন, মা অসুস্থ হয়ে পড়েছেন, আমি যেন একবার দেখতে আসি। মার ডাক্তার, প্রফেসর ন্যান্না সভার্জ সেখানে পৌঁছানোর আগেই হার্ট-অ্যাটাকটি হয়ে গেছে। একছুটে স্টর্গ্যাটান ৭-এ গিয়ে পৌঁছলাম। প্রফেসর দরজা খুলে দিলেন; আর জানালেন, কয়েক মিনিট আগেই মারা গেছেন মা

আমি হতভম্ব হয়ে, চিৎকার করে কাঁদতে লাগলাম। কিছুতেই সামলাতে পারলাম না নিজেকে। বুড়ি ডাক্তার নিশ্চুপভাবে, আমার হাত ধরে দাঁড়িয়ে থাকলেন পুরোটা সময়। যখন শান্ত হলাম, তখন জানালেন, ভীষণ দ্রুত ঘটে গেছে সবকিছু; বিশ মিনিট করে দুটি প্রবাহে।

এর অল্প কিছুক্ষণ পর, নিশ্চুপ সেই অ্যাপার্টমেন্টে মায়ের সঙ্গে একা রইলাম আমি। তিনি শুয়ে আছেন তার বিছানায়; পরনে একটা ফ্লানেল নাইটগাউন, আর একটা নিটেড ব্লু বেড-জ্যাকেট। তার মাথা খানিকটা কাত হয়ে আছে। আর ঠোঁট দুটো হয়ে আছে ফাঁক। চোখের নিচে কালি নিয়ে নিস্তেজ পড়ে আছেন তিনি। তার কালো চুলগুলো পরিপাটি আঁচড়ানো; না, তার চুল আর কালো নেই, বরং ধূসর হয়ে গেছে। ইদানিংকালে চুল ছোট রাখতেন তিনি। তবে আমার স্মৃতিতে তার যে ছবি, তা আমাকে জানান দেয়, তার চুল ছিল কালো, আর তা সম্ভবত ধূসররঙের আভা-সহকারেই। তার হাত দুটো জিরোচ্ছে বুকের উপর। আর বামহাতের তর্জনীতে ছোট্ট একটা ব্যান্ড-এইড লাগানো।

বারিমনের বাবা-মা
বারিমনের বাবা-মা

রুমটা হঠাৎ করেই আসন্ন বসন্তের আলোয় ভরে ওঠল। টেবিলের পাশে রাখা ছোট্ট অ্যালার্ম-ঘড়িটা ব্যস্ততায় টিকটিক করছে। আমার মনে হলো, মা নিঃশ্বাস নিচ্ছেন; কেননা, তার বুক ওঠা-নামা করছে; কেননা, একটা নিশ্চুপ নিঃশ্বাসের শব্দ আমি শুনতে পাচ্ছি। আমার মনে হলো, তার চোখের পাতা পিটপিট করছে। আমার মনে হলো, তিনি ঘুমিয়ে আছেন, এখনই জেগে উঠবেন– বাস্তবতার সঙ্গে এ আমার অভ্যাসগত হেয়ালিপনা।

কয়েক ঘন্টা ধরে বসে রইলাম সেখানে। সকালের প্রার্থনার নোটিশ দিতে বেজে ওঠল হেডভিগ এলিওনোরার গির্জার ঘণ্টা। আলোর ঘটল পালা-বদল। কোত্থেকে যেন পিয়ানোর সুর ভেসে এলো কানে। আমার মনে হয় না, আমি শোকার্ত ছিলাম, কিংবা ভাবছিলাম কিছু, কিংবা নিজেকে পর্যবেক্ষণ করছিলাম কিংবা করছিলাম কোনো চরিত্রে অভিনয়– যে পেশাদারী রোগটি আমাকে সারাজীবন ধরে নির্দয়ভাবে অনুসরণ করে গেছে এবং আমার সবচেয়ে সুগভীর অভিজ্ঞতাসমূহকে প্রায়শই করেছে লুণ্ঠন কিংবা অবমূল্যায়ন।

মায়ের রুমে কাটানো সেই ঘণ্টাগুলোর কথা খুব একটা স্মরণ করি না আমি। সবচেয়ে বেশি মনে পড়ে, তার বামহাতের তর্জনীতে থাকা ব্যান্ড-এইডটির কথা।

সেদিন বিকেলেই বাবাকে দেখার জন্য হাসপাতালে গেলাম। তাকে জানালাম মায়ের মৃত্যুর কথা। অপারেশন ও তার পরপরই হওয়া নিউমোনিয়া থেকে সেরে উঠেছেন তিনি; আর ওয়ার্ডের নীলরঙা আর্মচেয়ারে বসে আছেন নিজের পুরনো ড্রেসিং গাউন গায়ে। দাড়ি-গোঁফ কামানো, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন। লম্বাটে হাতে তিনি সামলাচ্ছেন ছড়ি। সরাসরি তাকালেন আমার দিকে। তার চোখ– পরিষ্কার, শান্ত ও বিস্তৃতভাবে খোলা। খবরটা তাকে জানাতেই স্রেফ মাথা নাড়লেন; আর বললেন, যেন তাকে একটু একা থাকতে দিই।

অনুবাদ রুদ্র আরিফ

পরের কিস্তি আমার পাপ, আমার প্রতারণা

Print Friendly, PDF & Email
শেয়ার
সম্পাদক : ফিল্মফ্রি । ঢাকা, বাংলাদেশ।। সিনেমার বই [সম্পাদনা/অনুবাদ] : ফিল্মমেকারের ভাষা [৪ খণ্ড : ইরান, লাতিন, আফ্রিকা, কোরিয়া]; ফ্রাঁসোয়া ত্রুফো : প্রেম ও দেহগ্রস্ত ফিল্মমেকার; তারকোভস্কির ডায়েরি; স্মৃতির তারকোভস্কি; হিচকক-ত্রুফো কথোপকথন; কুরোসাওয়ার আত্মজীবনী; আন্তোনিওনির সিনে-জগত; কিয়ারোস্তামির সিনে-রাস্তা; সিনেঅলা [৩ খণ্ড]; বার্গম্যান/বারিমন; ডেভিড লিঞ্চের নোটবুক; ফেদেরিকো ফেল্লিনি; সাক্ষাৎ ফিল্মমেকার ফেদেরিকো ফেল্লিনি ।। কবিতার বই : ওপেন এয়ার কনসার্টের কবিতা; র‍্যাম্পমডেলের বাথটাবে অন্ধ কচ্ছপ; হাড়ের গ্যারেজ; মেনিকিনের লাল ইতিহাস ।। মিউজিকের বই [অনুবাদ] : আমার জন লেনন [মূল : সিনথিয়া লেনন]

3 মন্তব্যগুলো

মন্তব্য লিখুন