আজকেও ‘ওকা ওরি কথা’ ও মৃণাল কতটা প্রাসঙ্গিক?

2
195
ওকা ওরি কথা

লিখেছেন । রণবীর পাঁজা

ওকা ওরি কথা
Oka Oori Katha
ফিল্মমেকার । মৃণাল সেন
উৎস-গল্প । কাফন/ মুন্সী প্রেমচাঁদ
স্ক্রিনরাইটার । মোহিত চট্টোপাধ্যায়
সিনেমাটোগ্রাফার । কে কে মহাজন
এডিটর । গদাধর নস্কর
কাস্ট [ক্যারেকটার] । প্রদীপ কুমার; জি. ভি. নারায়ণ রাও [কিস্তাইয়া]; এম. ভি. বাসুদেব রাও [ভেনকাইয়া]; মমতা শংকর [নিলাম্মা]
রানিংটাইম । ১১৬ মিনিট
ভাষা । তেলেগু
দেশ । ভারত
রিলিজ । ১৯৭৭


সভ্যতা যেদিন থেকে বিকাশ লাভ করতে শুরু করে, তবে থেকে পৃথিবীতে দুটি জাতের সৃষ্টি, যথা গরিব ও বড়োলোক। এটি একেবারেই অনাশ্চর্য, বলার অপেক্ষামাত্র রাখে না, ইতিহাস ওই গরিব লোকগুলোকে তার পাতায় ঠাঁই দেয়নি, যেভাবে স্বর্ণাক্ষরে রচিত হয়েছে ওই তথাকথিত সম্ভ্রান্ত বড়লোকগুলির গীতিকথা। উর্দু ও হিন্দি ভাষার একেবারে প্রথমদিককার বাস্তববাদী লেখক মুন্সী প্রেমচাঁদের উর্দু গল্প কাফন অবলম্বনে তেলেগুতে নির্মিত এই ফিল্মটি সমাজের সবথেকে গভীরের এবং সবচেয়ে আলোড়িত প্রশ্নটিকে বারেবার চোখের সামনে এনে দেয়।

শুরুতেই আমরা দেখতে পাই, জরাজীর্ণ একটি কুটিরের সামনের মাটির দুয়ারে বসে এক বৃদ্ধ ও তার যুবক পুত্র। পুত্র বাপকে জিজ্ঞাসা করে, আজকে কি তারা কাজে যাবে? বাবা মুখের উপরে ‘না’ বলায় সে বলে, আজকেও কীভাবে তাদের দিন কাটবে? বাপটি বলে, কেন, কালকের মতো অভুক্ত অবস্থায়!

শুধু এটুকু বলেই ক্ষান্ত হয় না, তার উপরে বলে, সে কি আবার কঠোর শ্রমে বিশ্বাসী হয়ে উঠছে? নাকি ক্ষিদে সহ্য করার ক্ষমতা হারিয়ে সেও আবার একটি খাদ্যপিপাসুতে পরিণত হচ্ছে কি না। সাথে সাথে উক্ত সিন নিমজ্জিত হয় এবং পরমুহূর্তেই সামনে এসে রাতের আঁধারে বাবা ও ছেলে কোনো জমিতে ফসল চুরি করছে এবং একে অপরের গায়ে গা ঠেকে যেতেই চমকে ওঠে ও পর্দার সামনে ভেসে আসে সিনেমাটির নাম– ওকা ওরি কথা। এ অবধি যেকোনো দর্শকেরই এটুকু মাথায় আসতে বাধ্য, বাপ ও ছেলে দুটোই কিছুটা হলেও কামচোর, যারা হয়তো কেবলমাত্র আলিস্যির দোহাই দিয়ে নিজেদের ক্ষুধার জ্বালাকে পরিত্যাগ করে।

পরের দৃশ্যে দেখানো হয়, বহু মানুষ জমিদারের তরে কাজ করছে এবং সম্ভাব্য দৃশ্যে কতকগুলি অবিস্মরণীয় ক্যামেরার টেক– যাতে শুধু মানুষের সংখ্যা দেখানো বেশি জরুরি হয়ে পড়ে, যেখানে মানুষের নিজসত্তা একেবারেই গৌণ উপাদান, কর্মরত শ্রমিকদের মুখের সম্মিলিত কোরাস– যা সুমিষ্ট কোকিলের ডাকও হার মানায়, যেখানে জমিদারের গুণকীর্তির নমুনাই মূলত বারে বারে উঠে আসে। দৌদর্ণ্ডপ্রতাপ রৌদ্রে কঠোর শারীরিক শ্রমের সঙ্গে অনবদ্য কোরাস এক প্রকার হাস্যকর শোনালেও এইসমস্ত উপাদানের মাধ্যমেই দৃশ্যটি সাবলীলভাবে ফুটে ওঠে পর্দায়।


নিমিষেই
বৃদ্ধের বুকের
মধ্যে দ্রোহের জ্বলন্ত
আগুনে ঘৃতাহুতির বদলে জল পড়ে

দুর্ভাগ্যবশত যুবকটি উক্ত কাজের ফাঁকে একটু বিড়ি খাবার জন্য জমিদারের এক পোষাপাত্রের কাছে ধরা পড়ে তার অর্ধেক পরিশ্রমের টাকা কাটা যায়। বাবার কথা অনুযায়ী কোষাধ্যক্ষের হাতে পায়ে ধরেও আখেরে কোনো লাভ হয় না। তারপর রাতে শুড়িঁখানায় উপস্থিত পিতা-পুত্র থেকে সকালের জমিদারের হয়ে কর্মরত গ্রামবাসী। শুড়িঁখানার বাতাসে সুতীব্র মাদকতার নেশায় ম-ম, বৃদ্ধ চিৎকার সমেত গর্জে উঠে জমিদারের অন্যায়ের বিরুদ্ধে উপস্থিত সকলকে আহ্বান জানায় সম্মিলিত প্রতিবাদের এবং তার কাজ হতে বিরত থাকার। বৃদ্ধের পেশ করা প্রস্তাবে উপস্থিত প্রতিটা নেশারু সকালের একস্বরে গান গাওয়ার মতো সম্মতিসূচক ঘাড় নাড়ে। বৃদ্ধ বুকের মধ্যে এক রকম বল পায়, যা ভাষায় প্রকাশ করা প্রকৃতার্থেই অসম্ভব; কিন্তু নিমিষেই বৃদ্ধের বুকের মধ্যে দ্রোহের জ্বলন্ত আগুনে ঘৃতাহুতির বদলে জল পড়ে– যখনই মনে পড়ে যায়, এই লোকগুলোই কাল আবার ভিড় জমাবে জমিদারের প্রাঙ্গণে কাজের চাহিদায়; কারণ তারা আসলে অভুক্ত, তারা কেউ ক্ষুধার জ্বলনের ঢেউ সহ্য করতে পারবে না।

খাদ্য পৃথিবীর প্রতিটা মানুষের কাছে সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ অংশ জীবনধারণের জন্য। কিন্তু যেহেতু সমাজ আড়াআড়িভাবে গরিব ও ধনী সম্প্রদায়ের মধ্যে বিভক্ত এবং ধনী কিংবা বিত্তশালীদের ধর্মই শুধু এই গরিব মানুষগুলোর মুখ থেকে উচ্ছিষ্ট সামান্য খাদ্যই কেড়ে নিয়ে ক্ষান্ত হওয়া না, তার সঙ্গে বছরের পর বছর ধরে চলে শোষণ অথবা চালাকির মতন হাজার বছর ধরে চলে আসা গাঁড়াকল সিস্টেম বানানো– যেখানে নিমিত্তমাত্র খাবার দিয়ে চলে যায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা গাধার মতন অমানবিক নির্যাতন– শ্রমের নামে।

চলচ্চিত্রের একাংশে বৃদ্ধ বাবাটি তার ছেলের এবং কঠোর শ্রমের উদ্দেশ্যে বলে, তার ঠাকুরদা একদা কঠোর পরিশ্রম করেও হারিয়েছে সমস্ত জমিজমা, পিতা আরও কঠোর শ্রমের দরুণ হারিয়েছে জন্মভিটা; তাই সেও এক প্রকার হাল ছেড়ে দিয়েছে। এখানেই এসে মিলে যায় সেই আদিকাল থেকে শুরু হওয়া সভ্যতা। বছরের পর বছর শ্রমিকরা তাদের শ্রম দিয়ে বানায় সভ্যতার বিকাশ নগর, অট্টালিকা, প্রাসাদ; আর বদলে তাদের ঠাঁই হয় নগরের বাহিরের পরিত্যক্ত স্থানে– যেভাবেই গড়ে উঠেছে আজকের শহরের চারিধারে বস্তি।

চুরি আসলে কারা করে? চুরি করা কি ঠিক? শুধু আলিস্যি কিংবা কাজ না করার প্রবণতা কি ডেকে আনে চুরির মতো অসাধু উপায়? ফিল্মের প্রথম থেকে শেষ অবধি বারেবার হানা দিতে থাকে চুরির বিভিন্ন দৃশ্য: কখনো-বা ঝড়ে ভেঙে পড়া বাড়ির খোলা চালা নিবারণের জন্য, কখনো-বা আহারাদি মেটাতে তারা চুরি করে, আবার কয়েকবার হাতে-নাতে ধরা পড়ে পরিবারের দুই সদস্যের কনিষ্ঠজন। সারাদিন টো-টো কোম্পানির মতো ঘোরা, ঘণ্টার পর ঘণ্টা শুয়ে অলসতা কিংবা মাঝে মাঝে ইচ্ছের দরুণ কাজে যাওয়া, আবার চুরি করা– পিতা-পুত্রের এই দাম্ভিক আচরণে তিতিবিরক্ত গ্রাম, একেবারেই সহ্য করতে পারে না কেউ।

যখনই যুবকটি ধরা পড়ে চুরির দায়ে, গ্রামের মোড়ল হতে আশপাশের বিদ্বজন সবাই এসে শুনিয়ে যায় কাজের মাহাত্ম্য; কেউ-বা সদুপদেশ দেয় কাজ করার এই বয়স থেকে আলসেমি বিপজ্জনক। কিন্তু কে শোনে কার কথা? ঠিক যেমন চোরা না শুনে ধর্মের কাহিনি। তার সঙ্গে সঙ্গেই যখন জমিদার লেঠেল পাঠায় গ্রামে, অতিথি আপ্যায়নের জন্য কেড়েই নিয়ে চলে যায় গরিবের পোষা গবাধি পশু, সেই মানুষগুলি নিষ্কর্মের মতো থাঁট হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে।

চলচ্চিত্রকার মৃণাল সেন স্পষ্ট দেখিয়েছেন– যা মার্কসীয় দর্শনের পরিপন্থী; সমাজে কীভাবে শোষক ও শাসকদের প্রতিপদের বিভেদ– যা আজকের করোনাভাইরাস পরবর্তী এই [ভারতীয়] রাষ্ট্রব্যবস্থায় আরও বেশি করে চোখে আঙুল দিয়ে দেখা যায়, যেখানে পরিযায়ী শ্রমিক যখন ফিরছে পায়ে হেঁটে তার বাড়ি, কিন্তু তার ওপর দিয়ে কখনো যাচ্ছে ট্রেন, কখনো লরি চাপা পড়ছে, আবার কখনো ক্লান্ত অবসন্ন হয়ে মারা যাচ্ছে– যে ভয়ংকরভাবে তাদের মৃত্যুমিছিল বেরিয়েছে; আর তারই উল্টোপ্রান্তে সংখ্যাগরিষ্ঠ বুর্জোয়া মানুষ বাড়িতে লকডাউন থেকে শ্রমিকদের মৃত্যুর চেয়ে বেশি ভাবিত তাদের দ্বারা ছড়ানো ভাইরাস নিয়ে।

শেষ দৃশ্যের ঠিক আগের মুহূর্তে দেখা যায়, কুটিরের সামনে বাবা ও ছেলে উবু হয়ে বসে আছে। ভেতরে ছেলেটির পোয়াতি বউ প্রসববেদনায় পাল্লা দিয়ে চেঁচাচ্ছে। কিন্তু দুজন অথর্ব হয়ে বসে। কারণ তাদের টাকা নেই যে দাইমাকে ডাকবে। ছুরি পর্যন্ত নেই– বাচ্চা হলে তার নাড়ীটি বিচ্ছিন্ন করবে মায়ের থেকে। ছেলেটি বিষণ্ন মুখে বাপকে বলে, তারা কি এতদিনে কিছুই করেনি? বাপটি তাকে বলে, এইভাবে তার স্ত্রী আটবার প্রসববেদনায় ছটপট করেছে। আটটি মৃত সন্তান দেবার পর তার জন্ম। গরিব হবার প্রথম শর্তই এই অসম লড়াইয়ে সামিল হওয়া; উৎরোতে পারলে তবেই পৃথিবীতে টিকবে।


মৃত্যুর
পর কেন
চাই নতুন কাপড়?

পরের দিন সকালে দেখা যায়, বউটি মারা গেছে প্রসবযন্ত্রনা সহ্য না করতে পেরে এবং তারা আবার ফিরে যায় জমিদারের কাছে। সেখানে হাত পেতে নেয় টাকা। কবিতার মতো খুবই সুন্দর মন্তাজের ব্যবহারে দৃশ্যগুলি বাস্তবতা পায়। সেখানে প্রশ্ন করা হয়, যে সমাজে জীবিতকালে মানুষকে নতুন কাপড় দেওয়া যায় না, মৃত্যুর পর কেন চাই নতুন কাপড়?

বুঝতে সামান্য অসুবিধা হয় না– গরিব, নিঃস্ব মানুষ, যে এতদিন অবধি তাদের গ্রামের এক প্রতিবাদী দৃষ্টান্ত হিসেবে নিজেদের আলাদা রেখেছিল, কোনোদিন মাথা নোয়ায়নি সমস্ত প্রতিকূল অবস্থার মাঝেও, শেষ পর্যন্ত সেই জমিদার কিংবা ক্ষমতার কাছে এসেই হাত পাতে, আর জমিদার গোঁফ উঁচিয়ে ভিক্ষা প্রদান করে– ঠিক যেমনটি দেখা যায় কিছুদিন পূর্বেই ঘটে যাওয়া আমফান কিংবা বিভিন্ন প্রাকৃতিক অথবা মানবকর্তৃক বিপর্যয়ের চলাকালীন কোনোরূপ পদক্ষেপ না নেবার কারণে লক্ষ লক্ষ মানুষ ভিটেহীন হয়, তারপর আবার কাতারে কাতারে মানুষ মরার পর ক্ষতে মলম লাগানোর ন্যায় সামনে আসে সরকারের বুক ফোলানো ক্ষতিপূরণের মতো নির্জীব ঘোষণা।

বাস্তব আসলে কী?

বাস্তব কি সত্যই গরিব মানুষের জীবনে মধুরেন সমাপয়েৎ আনে? নাকি আদতেই তাদের জীবন ওই বুর্জোয়া শ্রেণির সৃষ্ট সমাজের নিষ্ঠুর ঠাট্টায় জর্জরিত। সেখানে দাঁড়িয়ে তাদের বিমূর্ত প্রতীক হিসেবে, তাদের হয়ে আজন্মকালব্যাপি কথা বলে যান মৃণাল সেনের মতো ক্ষণজন্মা কালজয়ী প্রতিভা– যিনি বিখ্যাত ষাঁড়ের দৌড়ের [পূর্ব অন্ধ্রপ্রদেশ কিংবা বর্তমান তেলেঙ্গানার অন্যতম জনপ্রিয় খেলা] মধ্য দিয়ে দেখান– সংস্কৃতি কীভাবে মানবজীবনের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে যোগসূত্র স্থাপন করে। আবার শেষাংশের দৃশ্য দেখে বোঝা যায়, সংস্কৃতি কীভাবে নিষ্ঠুর পরিহাসে পরিণত হয় পরিস্থিতির বিচারে।

পুরো চলচ্চিত্রজুড়ে এই ভাঙা-গড়ার খেলার মধ্য দিয়েই এমন অনেক প্রশ্নের উত্তর তিনি দিতে চান, যা আজকের দিনেও দাঁড়িয়েও– যেখানে জমিদারি প্রথা এক প্রকার অস্তাচলে, সেখানেও ওকা ওরি কথা অমাবস্যার আকাশে ঘুটঘুটে অন্ধকারের মাঝে ধ্রুবতারার মতো উজ্জ্বল হয়ে থাকে।

Print Friendly, PDF & Email
শেয়ার
কবি; সাহিত্য ও চলচ্চিত্র প্রেমিক । শিক্ষার্থী, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় ।। পশ্চিমবঙ্গ, ভারত

2 মন্তব্যগুলো

মন্তব্য লিখুন