আমার প্রথম সিনেমা ও প্রথম টেলিফিল্ম

75
ঋতুপর্ণ ঘোষ

মূল । ঋতুপর্ণ ঘোষ
গ্রন্থনা, ভূমিকা ও শ্রুতিলিখন । আবদুল্লাহ আল দুররানী সনি

ভূমিকা
ঋতুপর্ণ ঘোষ সিনেমাকে দেখিয়েছেন কবিতার মতো। তার প্রতিটা ফ্রেমে ফ্রেমেই যেন ছন্দের ব্যঞ্জনা। মানুষের অন্তর জগতের রসায়ন উঠে এসেছে তার সিনেমার প্রতিটা দৃশ্যে। তিনি এমন অনেক বিষয়ে আওয়াজ তুলেছেন, যা তার আগে বাংলাভাষী কোনো পরিচালক করেননি।
ঋতুপর্ণ ঘোষের প্রথম চলচ্চিত্র মুক্তি পায় ১৯৯২ সালে। তার ঠিক সতের বছর পর, ২০০৮ সালে ‘খেলা’ চলচ্চিত্রের কাজের সময় তিনি তার প্রথম চলচ্চিত্র নিয়ে নিজের অব্যক্ত কথাগুলোর একটা পডকাস্ট করেন। তার বানানো প্রথম টেলিফিল্ম ‘অভিনয়’ নিয়েও তিনি তার নতুন অভিজ্ঞতার গল্প বলেন। তারই বুনে যাওয়া কথা স্মৃতির পডকাস্ট ও সাক্ষাৎকারের এই সংকলন…


হীরের আংটি। ফিল্মমেকার: ঋতুপর্ণ ঘোষ

আমার প্রথম সিনেমা

সব কিছুরই যেমন একটি ইতিহাস থাকে, আমার প্রথম ছবি হীরের আংটিরও তেমন একটা ইতিহাস আছে। বড় করুণ এক ইতিহাস। সে আজ প্রায় সতের বছর আগের কথা। তখন আমার বয়সও অনেক কম, মনটাও অনেক কাঁচা, আর হাজার হোক প্রথম ছবি বলে কথা। কত খেটে, কত যত্ন করে, কত খসড়া পাল্টে স্ক্রিপ্ট লিখেছিলাম, কেউ যাতে ভুল ধরতে না পারে।

চিলড্রেন ফিল্ম সোসাইটির কাছে নিয়মিত সপ্তাহ দুই পড়ে থেকে, রাশি রাশি কাগজ জমা দিয়ে, রীতিমতো পরীক্ষা ইন্টারভিউ দিয়ে, তারপর তারা ছবিটার প্রডিউসার হতে রাজি হয়েছিল। এক-এক করে অভিনেতা নির্বাচন, আমার তো ছবির জগতে কোনো পূর্ব পরিচয় নেই। তবু কেউ দ্বিধা করেননি। তাদের মধ্যে বসন্ত চৌধুরী, জ্ঞানেশ মুখোপাধ্যায়, বঙ্কিম ঘোষ আজ আর নেই। সুনীল মুখোপাধ্যায়, শকুন্তলা বড়ুয়া, মুনমুন সেন, অয়ন বন্দ্যোপাধ্যায় প্রায় কাজ করেন না বললেই চলে।


অনেক
ইচ্ছেপূরণের
গোলকধাঁধায় ঘুরতে
ঘুরতে শুরু হয়েছিল
আমার প্রথম
ছবি

অনেক দিনের স্বপ্ন, অনেক বিনিদ্র রাত, অনেক ইচ্ছেপূরণের গোলকধাঁধায় ঘুরতে ঘুরতে শুরু হয়েছিল আমার প্রথম ছবি। সেই ছবিতে তিনজন শিশু শিল্পী থেকে ইউনিটের বাকি সবাই ছিলেন আমার থেকে বয়সে বড়। ডিরেক্টর হলে কী হবে, আসলে আমি ছিলাম ইউনিটের চার নম্বর বাচ্চা।

ছবির শুটিং শুরু হয়েছিল পূজোর আগে, ছবিটা সেন্সর হয়েছিল পরের বছরের এপ্রিলে। আর তার ঠিক এক সপ্তাহ পর সত্যজিৎ রায় আমাদের ছেড়ে চলে যান। তার জীবদ্দশায় ছবিটা বানিয়েও তাকে দেখাতে পারিনি, এ ক্ষোভ আজীবন আমার পিছু ছাড়বে না।

যতই আমি সিরিয়াস ফিল্মমেকার হওয়ার চেষ্টা করি না কেন, হীরের আংটি কিন্তু বানানো হয়েছিল দেদার ফুর্তিতে। তার আগে ফিল্মমেকিং সম্পর্কে অনেক ভারি ভারি বই পড়ে নিজেকে তৈরি করে ছিলাম। হীরের আংটি আমাকে শিখিয়ে দিল যে, চাইলে ছবি বানানোর থেকে বড় আনন্দের পিকনিক আর কিচ্ছু নেই। সবাই মিলে আনন্দ করে ইন্দ্রপুরির ক্যান্টিনে বসে পাত পেড়ে খাওয়া, তারকেশ্বরে আউটডোরে হরতালের দিন গেস্টহাউজের উঠোনে সবাই মিলে ক্রিকেট খেলা, মহিষাদলের আউটডোরে কোনো স্নানের জায়গা নেই বলে রাজবাড়ীর প্রসস্ত কুয়োতলা…

আমার তখনকার ঝা চকচকে বিজ্ঞাপন জীবন থেকে এ যেন এক বড় সাধের মুক্তি। এক অন্য জগত, এক খেলতে যাওয়া ছুটি।

অভিনয়। ফিল্মমেকার: ঋতুপর্ণ ঘোষ

অভিনয়: গোড়ার কথা

২২শে আগস্ট বুধবার, কলকাতা থেকে রওনা দিয়ে ৬৭ জনের একটা ইউনিট গিয়ে পৌঁছল শান্তিনিকেতনে, প্রান্তিকে। আমরা, আমরা এই ৬৭ জন এসেছি হাতে একট স্ক্রিপ্ট, সেই চিত্রনাট্য দিয়ে একটা ছবি তৈরি হবে আলফা বাংলা ৩য় জন্মদিনের জন্য। আমার, মানে ঋতুপর্ণ ঘোষের প্রথম টেলিফিল্ম।

আলফা বাংলার কাছে ছবিটার নাম ‘অভিনয়’, আমি চিত্রনাট্য লিখেছিলাম ‘বাস্তবিক’ বলে। অতএব, এখনো ক্ল্যাপে কী নাম লেখা হবে ঠিক হয়নি।

শেষ পর্যন্ত ‘অভিনয়’ নামটাই দাঁড়িয়ে গেল। ক্যামেলিয়া হোটেলের একটা ইমপোর্টেন্ট ভূমিকা আছে এই ছবিতে। কারণ এই ছবির অনেকটা অংশই ঘটিত হয় ক্যামেলিয়া হোটেলের অভ্যন্তরে কয়েকটি ঘরে। তাছাড়া ক্যামেলিয়া হোটেল অত্যন্ত সৌজন্যমূলকভাবে তাদের সহৃদয়তার হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন আমাদের এই ৫ দিনের ট্রিপটা স্পন্সর করে। আমরা সবাই ক্যামেলিয়া হোটেলে ছিলাম।

২২, ২৩, ২৪, ২৫, ২৬– এই ৫ দিন। তাও আমরা পৌঁছেছি দুপুর বেলায়, শুটিং শুরু হয়েছে এই চারটে-টারটে নাগাদ। আখেরে এই সাড়ে ৪ দিনে শুটিংয়ে আমাকে একটা ৭০ মিনিটের ছবি শুট করে ফিরে যেতে হবে। এটা ছিল আমার একটা প্রধান এনজাইটি। কী করে করব? এটা কি আদতে সম্ভব! এবং যারা রেগুলার টেলিভিশনে কাজ করেন, যারা টেলিছবি এরমধ্যে অনেক করেছেন বা টেলিফিল্ম বানাচ্ছেন, তাদের কাছে হয়তো কাজটা এতো ভয়ের নয়। কিন্তু আমি তো এই প্রথম টেলিফিল্ম করছি সেই অর্থে, এবং তাও আবার ডিরেক্ট সাউন্ড, সেটা সম্পর্কে একটা ভয় আছে।

এখন ভাদ্র মাস, শান্তিনিকেতন যেকোনো সময় গোমট হয়ে আছে, আকাশে মেঘ উঁকি মারছে এখানে সেখানে, বৃষ্টি হতে পারে। আমার আউটডোর-ইনডোর মিলিয়ে কাজ। তার উপর একটা অসহ্য গরম। এই গরমের মধ্যে, এই কষ্টের মধ্যে আবহাওয়ার সাথে যুদ্ধ করে কী করে সাড়ে চার দিনে একটা ৭০ মিনিটের ছবি শেষ করব, এটা নিয়ে হিমশিম খাচ্ছি ইউনিটের সবাই। এবং আমার মনে হলো এটার একটা কোনো রকমের পোয়াটিক জাস্টিস আছে।

আমরা এর আগের ছবিটা– ‘তিতলি’ করেছি গরমের হাত থেকে পালাব বলে হিল স্টেশনে গিয়ে লাভায়, যেখানে আবহাওয়া অত্যন্ত মনোরম। মে মাসের গরম আমরা বুঝতেই পারিনি। প্রায় এক মাসের একটা ঠাণ্ডার দেশে ছুটি কাটানোর মতোন করে বেড়িয়ে এসেছি। সেটা একদম প্রায় যেন সুদে-আসলে উশুল করে নেয়া হচ্ছে এই ছবির গরমের মধ্যে।

আমার বন্ধু ক্যামেরাম্যান অভিক সে সমস্ত হোটেলের পাখা বেঁধে দিয়ে, সেগুলোকে অচল করে সেখান থেকে আলো বেঁধেছে যাতে হোটেলের রুমে শুটিং করা যায়। হোটেলের এসি বন্ধ। ডিরেক্ট সাউন্ডের অসুবিধে হবে। এবং কয়েকটা স্ট্যান্ড ফ্যান… সেগুলোকে বন্ধ করে দিতে হচ্ছে টেকের জন্য। অতএব কুলকুল করে ঘামছেন শিল্পীরা। শিল্পীরা যাতে না ঘামেন তার জন্য যদিওবা পাখার ব্যবস্থা আছে। আমরা যারা টেকনিশিয়ান, যাদের চেহারাটা ছবিতে ইমপোর্টেন্ট নয়, তাদের ঘাম বা তাদের গরম থেকে রেহাই দেবার জন্য তেমন একটা ব্যবস্থা করা যায়নি। অতএব, সকাল সাতটা থেকে প্রায় রাত্রি দশটা অব্দি পর্যন্ত যখন শুটিং চলছে হোটেলের বন্ধ ঘরের মধ্যে তখন অত্যন্ত নাজেহাল অবস্থা সবার।

অভিক কিন্তু প্রথম থেকেই ছবিটা সম্পর্কে একটু নিমরাজি ছিল। কারণ ও ফিল্মে শুট করতে চায়। সুমন্ত মুখোপাধ্যায়– মন্টু দা। সুমন্ত আমার অন্যান্য সব ছবির, সেই ঊনিশে এপ্রিল থেকে শুরু করে দহন, অসুখ, বাড়িওয়ালি, উৎসব— সব ছবির নেপথ্যের নায়ক। ক্যামেরার পিছনে থেকে আমার সহযোগী পরিচালক হয়ে কাজ করেছেন। সুমন্ত কেবল মাত্র ক্যামেরার সামনে এসেছেন আমার সেই প্রথম ছবি হীরের আংটিতে বা আমার টেলিভিশনের কাজে। সেইজন্যই হয়তোবা এই টেলিফিল্ম করতে গিয়ে সুমন্ত দা আবার সেই নিয়মেই প্রায় সেই যেন অলিখিত নিয়মে ফিরে এলেন ক্যামেরার সামনে।

অবশ্য সুমন্তর একটা খুব ইমপোর্টেন্ট চরিত্র এই ছবিতে আছে এবং আমার মনে হয়েছিল অনেকদিন আগে যখন চিত্রনাট্যটা লেখা হয়েছিল, তখন থেকেই সুমন্ত মাথার মধ্যে ছিলেন এই চরিত্রটার জন্য। আমার ছবিতে আমার পরিচালনা সহায়তা করতে যিনি অভ্যস্ত, তাকে একজন ইমপোর্টেন্ট চরিত্রে অভিনয় করার কতগুলো বাড়তি ঝক্কি রয়েছে। কারণ তার নিজের কস্টিউম সামলানোর দায়িত্ব তার, সেটা যেন ঘেমে না যায় এই গরমে, সেটাকে বারবার খুলে রাখা, সেটাকে ঠিকমতো করে পরা– এই দায়িত্বগুলো তিনি প্রায় একাধারে সহযোগী, একাধারে অভিনেতার মতোন করে পালন করছেন।

শুটিং চলল ঐ সাড়ে চারদিন ধরে। ইতিমধ্যে এসে পৌঁছে গেছে টুম্পা, মানে সুদিপ্তা। টুম্পার বাড়িওয়ালির পর বেশ নাম হয়েছে। আমরা আউটডোর শুটিংয়ে দেখলাম বেশ কয়েকজন এসে অটোগ্রাফ নিচ্ছেন ওর থেকে। রজতভ রনি… রনি আমার সাথে আগে (তেমন) কাজ করেনি, কিন্তু পারমিতার একদিন-এ চমৎকার অভিনয় করেছে; তাছাড়া রনি খুব চমৎকার বন্ধু। ফলে এই চরিত্রটাতে, আর যেহেতু সবাই মিলে বাইরে একটা আউটডোর পিকনিকের মতো একটা মেজাজ সেখানে রনিও রয়েছে ইউনিটের মধ্যে। ইউনিটের সাথে একাত্ম হয়ে বেশ ভালো লাগছিল।

ছবির শিল্পীরা প্রায় আগে সবাই আমার সাথে কাজ করেছেন। রুপা বাড়িওয়ালিতে অভিনেত্রীরই একটি চরিত্রে অভিনয় করেছে। এখানেও সে অভিনেত্রী; এবং রুপা বোধহয় আমার সঙ্গে অভিনেত্রীর চরিত্র বেশ স্পেশালাই করে গেল। শিলাজিৎ অসুখ-এ আমার সাথে কাজ করেছিলেন একজন নায়িকার প্রেমিক হিসেবে। এখানে তিনি একজন আগন্তুক। ফিল্মমেকিং ইউনিটটার সাথে তার সরাসরি কোনো সম্পর্ক নেই। তবে কে এই আগন্তুক– এটাই গল্পের মূল জায়গা। অতএব এই রহস্যটা ভাঙছি না।

এরমধ্যে একটি ইউনিট এসে পৌঁছে গেছে অভিনয়-এর ছবি তোলবার জন্য, মানে অভিনয় কীভাবে নির্মিত হচ্ছে। স্বাভাবিকভাবেই একটা ফিল্মমেকিং যদি রেকর্ডেড হয়, সেটা সম্পর্কে যারা ফিল্ম টেকনেশিয়ান বা ফিল্ম ইউনিট তার সম্পর্কে একটা বাড়তি আগ্রহ বোধ করে। এবং আমার কাছে এটা এইজন্য বেশি কৌতূহলের বা আগ্রহের, যেই ছবিটার মধ্যেই একটা ছবির জগতকে এক্সপ্লোর করা হচ্ছে। এইটা আবার সেই ছবিটা বানানোর ছবিটাকে রেকর্ড করা হচ্ছে এই অভিনয়-এর গোড়ার কথায়। ফলে এটা যেন একটা বৃত্তের মধ্যে বৃত্ত, বৃত্তের মধ্যে বৃত্ত…।


এই
নিরন্তর
বৃত্তর মধ্য
দিয়ে চালনা
করতে করতে
কোথায় আমরা
গিয়ে পৌঁছব, কোন
সত্যের সামনে– আমরা
জানি
না

এই বৃত্তর, এই নিরন্তর বৃত্তর মধ্য দিয়ে চালনা করতে করতে কোথায় আমরা গিয়ে পৌঁছব, কোন সত্যের সামনে– আমরা জানি না। কিন্তু হয়তো বেরিয়ে আসবে টুকরো টুকরো কিছু কথা, এমন কিছু অবজারভেশনের অংশ বিশেষ যেগুলো হয়তো আমাদের এই ছবি অভিনয়-এর নির্মাণের পিছনকার গল্পটা অনেক সমৃদ্ধ করে অভিনয় দেখবার বা অভিনয় উপভোগ করবার অভিজ্ঞতাটাকে অনেক বেশি ঐশ্বর্যশালী করে তুলবে।

আপাতত মনে হবে একটা আউটডোরের ছবি, পুরোটা একটা হোটেলে তৈরি হয়েছে, বা হয়েছে একটা নেচারাল স্পটে, সেখানে আর্ট ডিরেকশনের কী ভূমিকা থাকতে পারে? কিন্তু এ ছবির মধ্যে লুকোনো ছিল দৃশ্যশয্যার অনেক উপকরণ। যেটা একেবারে অমোঘভাবে পালন করেছেন দুজন মানুষ। একজনের নাম দিলিপ পাত্র, আরেকজনের নাম সুদেশ নারায়ণ।

ক্যামেলিয়া হোটেলটা আমরা যে অবস্থায় পেয়েছিলাম, সেটা এমনিতে হয়তো থাকবার জন্য মনোরম, কিন্তু ছবি তোলার জন্য সবসময় ঠিক সঠিক নয়। সেটাকে সাজিয়ে-গুছিয়ে একটু ছবি তুলবার মতোন করে আমাদের তৈরি করে নিতে হলো। অতএব, তারজন্য কলকাতা থেকে ফার্নিচার গেল, পর্দা গেল, টেবিল ল্যাম্প গেল। অনেকগুলো জিনিস গেল দৃশ্যত জিনিসটাকে ক্যামেরা ফেন্ড্রলি করবার জন্য।

কংকালিতলার সেই বটগাছ তলায় ছবিতে যেটা অশ্বত্থ গাছতলা, সেখানে গিয়ে যখন পৌঁছলাম, সেখানে দেখলাম একটা সাধারণ বাঁধানো একটা ঝুড়িওয়ালা বড় বট গাছ। সেটাকে একটা তীর্থস্থানের পরিণত করার কাজটা কিন্তু কিছুটা শিল্প নির্দেশকের। এবং সেখানে আমাদের শিল্প নির্দেশক সেই অর্থে কেউ নেই। দিলিপ পাত্র, যিনি শিল্প নির্দেশনার সহায়তা করে থাকেন এবং আমার সব ছবির ব্যাপারে একটা অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ বলা যায়, তিনি এবং তার সহকারীরা মিলে মুহূর্তের মধ্যে সে কংকালিতলাকে রূপান্তর করলেন একটা তীর্থস্থানে। সিঁদুর লেপে, গাছে ডিল বেঁধে এবং এই ডিটেলগুলো অন্যান্য কিছু আমরা ততক্ষণে হয় উৎকর্ণ হয়ে দেখছি কখন মেঘ ডাকে বা আলো পড়ে আসছে কি না।

এই সময়ে মধ্যে চট করে তৈরি হয়ে গেল একটি তীর্থস্থান। আমি জানি না আমরা ফিরে চলে আসবার পর গাছে বাঁধা ডিল এবং গাছের গুঁড়িতে বাঁধা সিঁদুর হয়তো কোনো অন্যমনস্ক পথচারী বা কোনো তীর্থযাত্রীর দুয়েকটা প্রণাম টেনে আনবে কি না।

ঋতুপর্ণ ঘোষ
ঋতুপর্ণ ঘোষ

এক্ষেত্রে আমি কিছুটা ইনপেক্টিকেল হয়েছি বলব কারণ আমি উৎসব-এর মতোন একটা ছবি করি সেটা ঘরের মধ্যে একটা ছবি করলাম সেটা টেলিভিশনেই প্রিমিয়ার হয়েছিল। এই ছবিটা আমি আউটডোরে এসে করলাম। আমার মনে হয়েছিল একটা বিশেষ দৈর্ঘ্যর বেশী টেলিফিল্মটা আনা উচিত নয়। হতো চ্যানেলের একটা নিজস্ব স্লট থাকতে পারে৷ এবং সেইটা অনার করার দ্বায়িত্ব সে জনের যদি আমরা সেই স্লটে কাজ করতে রাজি হই সেটা। কিন্তু আমাকে এক্ষেত্রে আলফা বাংলা অনেকটা ফ্রি হ্যান্ড দিয়েছিলেন। তুমি তোমার মনের মতোন করে আজকের দিনের জন্য বিশেষ করে একটা ছবি বানিয়ে দিবে। এবং আমি এমনি একটা টেলিফিল্ম বেছে ছিলাম যেটা আমার করা অন্যছবি গুলো থেকে একটু অন্যরকম দেখতে অথচ তার মধ্যে আমাকে মেকার হিসেবে খুঁজে পাওয়া যাবে। সেটা করতে গিয়েইতো প্যারাইভ করলাম। আমার মনে হয় এটার একটা নিজস্ব সিডাকশন আছে এই মিডিয়ামটার।

এই মিডিয়ামটায় যারা কাজ করে, তাদের বন্ধুবান্ধব এই প্রফেশন থেকেই হয়। একজন ব্যাংকারের বন্ধু একজন উকিল হতে পারেন। কিন্তু নরমালি দেখা যায় যে ছবিতে যারা কাজ করেন তাদের বন্ধুর ছবির লোকেরাই। নাটকে যারা কাজ করেন তারা নাটকের লোকেদের সাথেই আড্ডা মারছেন। এইভাবে একটা নিজস্ব ফেটার্নিটি তৈরি হয়ে যায়। এবং তাদের যে ইনসাইড স্টোরিগুলো, সেগুলো কিন্তু ভীষণ ইন্টিমেট একটা ওয়ার্ল্ডের মধ্যে আটকে থাকে। তাকে এক্সপ্লোর করা এবং সেটাকে পরের পর ছবিতে করা যায় না। তাহলে তো আমাকে খালি সিনেমার দুনিয়া নিয়ে সিনেমা বানিয়ে যেতে হয়!

এটা যে আমার ছবিতে আসেনি, তা নয়; বাড়িওয়ালিতে খুব প্রত্যক্ষভাবে আছে এটা । কিন্তু সেটা একটা অস্ত্র হিসেবে আমি অন্তর জগতে প্রবেশ করেছি। তিতলিতে একজন ফিল্মস্টারকে নিয়ে আছে, আমার অসুখ-এ নায়িকা একজন ফিল্মস্টার। এখানেও একটা ফিল্ম ইউনিটের মধ্যে এবং ওই ফিল্ম লাইফ রিয়েল লাইফ এটার মিলেমিশে এক হয়ে যাওয়া, আলাদা, পার্থক্য করা– এই পুরো জিনিসটাই আমার কাছে প্রায় অবসেশনের মতো লাগে। এই ওয়ার্ল্ডটাকে আরও এক্সপ্লোর করা, আরও এক্সপ্লোর করা…। এবং টেলিভিশন একটা কন্টিনিউয়াস প্রসেস।

ফিল্মে তো আমরা একটা ফিল্ম থেকে আরেকটা ফিল্মে বিষয়গত বৈচিত্র্য খুঁজি। বাহান্ন যখন করেছিলাম আমি, প্রথমে একটা টেলি সিরিয়াল নিয়ে একটা সিরিয়াল করেছিলাম। এবং এখানে আমার মনে হয়েছিল এটা একটা ভালো বিষয়। তবে এটা মূল বিষয় ছিল না।

Print Friendly, PDF & Email