অন্তরঙ্গ সত্যজিৎ চর্চা বনাম দেয়ালে ঝোলানো সত্যজিতের পূজা-অর্চনা

4
774
সত্যজিৎ রায়

লিখেছেন । বেলায়াত হোসেন মামুন

সত্যজিৎ রায়
সত্যজিৎ রায়
২ মে ১৯২১–২৩ এপ্রিল ১৯৯২; ভারত

সত্যজিতের সাথে অন্তরঙ্গ হওয়া যায় না। সত্যজিতের সাথে রকে বসে বা কোনো চায়ের দোকানে বসে আড্ডা দেওয়া যায় না। কারণ তিনি সত্যজিৎ রায়। তিনি তিনিই। তাঁর মতো ব্যক্তিত্ব বাঙালির আছে আর একজনই। তিনি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। চায়ের দোকানে বসে আড্ডা দেওয়া যায় না রবীন্দ্রনাথের সাথেও; তাই সত্যজিতেরই শেষ ছবি আগন্তুক-এর একটি সংলাপ হলো, ‘রবীন্দ্রনাথ কি কখনও আড্ডা দিয়েছেন?’

আমরা জানি দুনিয়ার এমন কোনো চলচ্চিত্রিক সম্মাননা নেই যা সত্যজিৎ তাঁর জীবনকালে অর্জন করেননি। মৃত্যুশয্যায় শুয়ে যখন তিনি তাঁর আজীবনের চলচ্চিত্র স্রষ্টাবৃত্তির জন্য ‘অস্কার’ সম্মাননা অর্জন করলেন, তখন বাঙালি তাঁকে ঘরের দেয়ালে রবীন্দ্রনাথের পাশে ‘স্থান’ করে দিল।

সেই থেকে সত্যজিৎ অনেকটা রবীন্দ্রনাথের মতোই দূরের আইকন। পূজনীয়। তাই বিশেষ দিনে তাঁদের বন্দনা হয়। যদিও সত্যজিতের চলচ্চিত্র, সত্যজিতের সাহিত্য সত্যজিৎকে আমাদের প্রাত্যহিক চর্চার পরিসরে নিয়ে এসেছে। তবুও সত্যজিৎকে নিয়ে কথা বলতে বসলেই একটু সাবধান হতে হয়, যেন মুখ ফস্কে কোনো ‘ভুল’ কথা বের না হয়ে যায়। এই বিশেষ সতর্কতার ফাঁদে সত্যজিৎ-বিষয়ক আলাপ-আলোচনাগুলো বিরোধিতাহীন হয়ে পড়ে; ফলে তা আদতে ‘নাম বন্দনার’ বিশেষ একটি জ্যামিতিক ছকে আটকে যায়।

অরণ্যের দিনরাত্রি
অরণ্যের দিনরাত্রি

শিল্পী ও স্রষ্টা হিসেবে সত্যজিতের প্রভাব বিপুল হলেও ‘আইকন’ হওয়ার ‘অপরাধে’ সত্যজিৎ আজও একাই রয়ে গেলেন। সত্যজিতের স্রষ্টাবৃত্তি উপমহাদেশের চলচ্চিত্রে তাঁর গুণমুগ্ধ অনেক নকলবাজকে জন্ম দিলেও সত্যজিতের প্রতিভার বিচারে তারা অপাঙতেয় আর তাই সত্যজিৎ এই চরাচরে অধরাই হয়ে আছেন। এ কথা বলতে গিয়ে আমি মোটেও ভুলে যাইনি যে, বাংলায় ঋত্বিক কুমার ঘটক এবং মৃণাল সেনও আছেন। আমার মতে ঋত্বিক ও মৃণালের অবস্থানও বড্ড একা একা। এরা কেউ কারও মতো নন। এরা পরস্পরের প্রতিপক্ষও নন, আবার নন পরিপূরক। ফলে সত্যজিৎ যে দিকে একা, সে দিকে নেই ঋত্বিক। আর সত্যজিৎ এবং ঋত্বিকের থেকে সম্পূর্ণ পৃথক এক পথের স্রষ্টা ও দ্রষ্টা হলেন মৃণাল।


দুনিয়ার কাছে
ভারতীয় চলচ্চিত্রে সত্যজিতের
এই যে ‘একক’ হয়ে থাকা, এ এককত্ব
সত্যজিতের জন্য গৌরবের নাকি বেদনার?

তবে বাংলার বাইরে পৃথিবীতে পরিচিতি ও প্রভাবের দিক থেকে ঋত্বিক ও মৃণালের থেকে অনেক অনেক বেশি বিচরণশীল সত্যজিৎ রায়। হয়তো এ কারণেই দুনিয়ায় আলোড়ন ফেলা বর্তমানের চলচ্চিত্রকার ক্রিস্টোফার নোলান গত বছর ভারতে এসে তাঁর দেখা ‘ভারতীয় চলচ্চিত্র’ বলতে কেবল পথের পাঁচালীকেই স্মরণ করতে পারলেন। যেন, ভারতীয় চলচ্চিত্র আজও সেই ১৯৫৫ সালেই ‘আটকে’ আছে!
পথের পাঁচালীকে বাদ দিয়ে নোলান আর কোনো চলচ্চিত্রকে স্মরণ পর্যন্ত করতে পারলেন না! তো, দুনিয়ার কাছে ভারতীয় চলচ্চিত্রে সত্যজিতের এই যে ‘একক’ হয়ে থাকা, এ এককত্ব সত্যজিতের জন্য গৌরবের নাকি বেদনার?

সরদার ফজলুল করিম
সরদার ফজলুল করিম

১.

চলুন একটু ফ্ল্যাশব্যাকে যাই।

আজ থেকে বহুদিন আগে, মানে কমপক্ষে একযুগ আগে, শিল্পী সব্যসাচী হাজরা এবং আমি বাংলাদেশের শিক্ষাবিদ ও লেখক অধ্যাপক সরদার ফজলুল করিমের ওপর একটি প্রামাণ্যচলচ্চিত্র নির্মাণের পরিকল্পনা ও প্রস্তুতি গ্রহণ করেছিলাম। জাতীয় অধ্যাপক সরদার ফজলুল করিম সর্বজনশ্রদ্ধেয় একজন অতুলনীয় মানুষ। তিনি এ ভূ-ভাগে বামপন্থি চিন্তা ও রাজনীতির একজন অগ্রগামী কমরেড।

মনে আছে সেই সময় আমরা সরদার ভাইয়ের ঢাকার ইন্দিরা রোডের বাড়িতে নিয়মিত যেতাম। সরদার ভাইয়ের সাথে বেশ কিছু বৈঠক ও আলাপ-আলোচনায় আমাদের প্রামাণ্যচলচ্চিত্র নির্মাণের বেশ অগ্রগতি হয়েছিল। কিন্তু পরে সে কাজটি অসমাপ্ত রয়ে যায়। যাহোক, বলি কেন এই কথা তুললাম।

প্রথম যে দিন আমরা সরদার ভাইয়ের ইন্দিরা রোডের বাড়িতে গেলাম, যথারীতি সরদার ভাই নিজেই দরজা খুলে আমাদের বসার ঘরে বসালেন। আলাপের ফাঁকে আমি লক্ষ্য করলাম সরদার ভাইয়ের ঘরে সত্যজিৎ রায়ের একটি বেশ বড় পোর্ট্রেট আছে এবং তা দেয়ালে ঝোলানো। আমি একটু অবাক ও কৌতূহলি হলাম। কারণ বাংলাদেশে বামপন্থি রাজনীতি ও আন্দোলনের একজন পুরোধা ব্যক্তির বসার ঘরে লেনিন বা কার্ল মার্ক্স থাকাটা স্বাভাবিক। কিন্তু সরদার ভাইয়ের বসার ঘরে পাশাপাশি রবীন্দ্রনাথ ও সত্যজিতের পোর্ট্রেট। আর তা সরদার ভাই যেখানটায় বসেন সেখানটায় ঝোলানো, ঠিক তার মাথার উপরে!

তো আমি অন্য আলোচনার ফাঁকে সরদার ভাইকে বললাম, সত্যজিৎ রায়ের পোর্ট্রেট কেন? তিনি সহজভাবে হেসে বললেন, শিল্পীদের মাথার উপরে রাখতে হয়!

ব্যস, এটুকু কথাই বললেন আর স্মিত হাসলেন। কিন্তু সেদিন সরদার ভাইয়ের ওই সহজ হাসিতে আমি আমার জিজ্ঞাসার প্রকৃত উত্তর খুঁজে পাইনি অথবা বলতে পারি তাতে আমার কৌতূহলের মীমাংসা হয়নি। আমার তর্কপ্রবণ মন আমাকে খুঁচিয়ে জানতে চাইছিল, কেন সত্যজিৎ? কেন মৃণাল বা ঋত্বিক নন? কেন নন লেনিন বা কার্ল মার্ক্স?

একজন বামপন্থি রাজনৈতিক ও তাত্ত্বিক হিসেবে সরদার ভাইয়ের বসার ঘরে মৃণাল সেনের পোর্ট্রেট থাকলে আমি অতটা অবাক হতাম না। কারণ, সেটা স্বাভাবিক মনে হতো। মৃণাল সেনের চলচ্চিত্র এবং মৃণালের রাজনৈতিক মতাদর্শ আমার প্রশ্নের যথাযথ উত্তর হতো। কিন্তু সারাজীবন যিনি ‘পলায়নবাদী’ হিসেবে বামপন্থী মানুষের গালমন্দ এবং হাজারও কড়া সমালোচনায় বিদ্ধ হলেন, সেই সত্যজিৎ রায়ের পোর্ট্রেট একজন নিষ্ঠাবান বামপন্থির বসার ঘরে ঠিক তাঁর মাথার উপরে ঠাঁই পাওয়াটা তর্কসাপেক্ষ ব্যাপার মনে হয়েছিল।

গণশত্রূ
গণশত্রূ

২.

বর্তমানে ফেরা যাক।

এ বছর সত্যজিতের প্রয়াণ দিবস উপলক্ষে কয়েকদিন আগে একটি ওয়েবভিত্তিক আলোচনায় অংশগ্রহণ করেছিলাম। সে আলোচনায় বলছিলাম, ‘সত্যজিৎ’ ওনার কাজে এই করেছেন, সত্যজিৎ ওভাবে দেখিয়েছেন ইত্যাদি। মানে হলো, আমি বারবার বলছিলাম, ‘সত্যজিৎ’।

একজন শ্রোতা সে আলোচনা চলার মাঝেই আমার উদ্দেশ্যে মন্তব্য লিখেছেন, “বেলায়াত সাহেব, আপনি সত্যজিৎ ‘বাবু’ বলুন অথবা সত্যজিৎ ‘স্যার’ বলুন, ওঁনাকে নাম ধরে বলছেন কেন?”

আলোচনা চলার সময়ে এ মন্তব্য দেখতে পাইনি। পরে দেখেছি। দেখে অবাক হয়েছি। অবাক হওয়ার কারণটা খুব স্পষ্ট। প্রশ্ন হলো, আপনি যাঁকে ভালোবাসেন তাঁকে কি আপনি অন্তরঙ্গভাবে অনুভব করেন নাকি করেন না? যদি করেন তবে তাঁকে কেমন করে স্মরণ করেন অথবা কেমন করে উচ্চারণ করেন তাঁর নাম ও কাজ?


আমরা
সত্যজিৎ রায়কে
ভালোবাসি ঠিকই, তবে
তা যেন অনেক দূরের নক্ষত্রকে
ভালোবাসার
মতো

দৃশ্যত আমার মনে হয়, আমরা সত্যজিৎ রায়কে ভালোবাসি ঠিকই, তবে তা যেন অনেক দূরের নক্ষত্রকে ভালোবাসার মতো। ওকে অতটা ঘরের করে তুলতে পারি না। ওঁর চলচ্চিত্রগুলোকে চুলচেরা বিশ্লেষণ করে ওঁর শক্তিমত্তাকে আত্মস্থ করি না বা করতে পারি না। আমরা ওঁকে পবিত্র কোনো ধর্মগ্রন্থের মতো বিশেষভাবে খুলি, পড়ি বা দেখি। এরপর আবার সুন্দর করে কাপড়ে মুড়ে ঘরের সবচেয়ে উঁচু স্থানে তুলে রাখি। যেন ওঁ সবসময় আমাদের মাথার উপরেই থাকে।

জনচিত্তে যখন কোনো আইকন এমন উচ্চতায় চলে যান– যে উচ্চতায় আমরা তাঁকে আর ঘরে নিত্য করে তুলতে পারি না, সে ‘আইকন’ বা কিংবদন্তি দূরত্ব এবং নামজপের কবলে পড়ে কিছুদিনের মধ্যেই মিথ হয়ে ওঠেন। সেই মিথের শক্ত আবরণ ভেঙ্গে এরপর তাঁকে আর কেউ ‘জয়’ করতে যায় না। কারণ তাতে অনেক ঝুঁকি আর শত বিতর্কে প্রাণ অতিষ্ঠ হবার আশঙ্কা থাকে।

আর স্বভাবসুলভ আরামপ্রিয়তার কারণে বাঙালি এ বিষয়ে আরও বেশি রক্ষণশীল বা প্রটেক্টটিভ হয়। মিথের দেয়াল ধ্বসানোকে বাঙালি মনেপ্রাণে ভয় পায়। সে নিজে এ কাজে অপারগ তো বটেই, অপর কেউ এ কাজটি করতে প্রবৃত্ত হলে বাঙালি তাঁর হাড়-মজ্জা এক করে ফেলে। বাঙালির এ রকম প্রচ্ছন্ন রক্ষণশীলতায় বা প্রটেক্টটিভ কেয়ারের মধ্যে আছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং সে তালিকায় ধীরে ধীরে ‘স্থান’ করে নিচ্ছেন সত্যজিৎ রায়।

গুপী গায়েন বাঘা বায়েন
গুপী গায়েন বাঘা বায়েন

৩.

কথা হলো সত্যজিৎ কি নিজে মিথ হতে চেয়েছেন? ওনার অমন ভারী কন্ঠস্বর আর সাধারণ বাঙালির গড় উচ্চতার চেয়ে বিরাট উচ্চতার অবয়ব এবং আচরণে স্বভাবসুলভ ভারিক্কি মেজাজ কি ওনাকে ওঁনার জীবিতকালেই মিথ করে তুলেছিল?

হয়তো তাই। কিন্তু জানতে ইচ্ছে হয়, সত্যজিতের সমকালে ওঁকে পাঠ করার, ওর কাজের বিচার-বিশ্লেষণের জন্য ওঁর কাছাকাছি যাওয়ার চেষ্টাগুলো কি ফলপ্রসু ছিল?

সত্যজিৎ ওর কাজের সমালোচকদের প্রতি খুব কোমল ছিলেন না। সে উদাহরণ আছে। তিনি সমালোচকদের সমালোচনার কড়া জবাব দিতেন এবং এ বিষয়ে তৎকালিন পত্রিকার পাতায় একাধিক পত্র-যুদ্ধের আলামতও আছে। কিন্তু সত্যজিতের প্রয়াণের পর কী হলো? ঘরে ঘরে সত্যজিৎ বন্দনার বিপরীতে সত্যজিতের স্রষ্টাবৃত্তির চুলচেরা বিশ্লেষণ কি হচ্ছে বা হয়েছে?

যদিও এ কথা সর্বজনবিদিত যে বাংলাভাষা ও ইংরেজি ভাষা মিলিয়ে সত্যজিৎ রায়ের ওপর যত বই লেখা হয়েছে এবং এখনও হচ্ছে, শুধুমাত্র এসব বই দিয়েই একটি ছোটখাটো গ্রন্থাগার গড়ে তোলা সম্ভব। কিন্তু এত এত বইয়ের মাঝেও সত্যজিৎ কেন আজও দূরের নক্ষত্র হয়ে আছেন? কেন তিনি আজ সোস্যাল মিডিয়ায় বন্দিত হচ্ছেন তাঁরই লেখা সংলাপ, ‘মহারাজা, তোমাকে সেলাম’ বলে?

যে সংলাপ তিনি লিখেছিলেন গুপী গায়েন বাঘা বায়েন চলচ্চিত্রের জন্য, লিখেছিলেন এক সামন্ত রাজার মনোরঞ্জন ও তাকে পরিহাস করবার অভিপ্রায়ে; আজ সেই সংলাপ তাঁর নাম বন্দনায় প্রয়োগ হওয়াটা বিস্ময়কর নয়?

প্রতিদ্বন্দ্বী
প্রতিদ্বন্দ্বী

৪.

সামন্তপ্রথা আমাদের এই ভূ-ভারতে অতি প্রাচীনকাল ধরেই আছে। আর সে কারণেই আমরা আমাদের কাছে ‘সম্মানিত’ ব্যক্তিকে অতি আদরের সাথে ‘রাজা-মহারাজা-সম্রাট’ না বলা পর্যন্ত সন্তুষ্ট হতে পারি না। যার প্রতি ভালোবাসা যত বেশি, তাকে তত বড় সামন্তের কল্পনায় আমরা দেখতে চাই। আমার দৃষ্টিতে এর সবচেয়ে বড় এবং করুণ উদাহরণ হলেন লালন ফকির।

লালন ফকির যে ‘ফকির’; ‘বাউল’ নন– তা বোঝে না আমাদের জনতা, বোঝার চেষ্টা করে না আমাদের সরকার ও রাষ্ট্র ব্যবস্থা। ফকির লালনকে তারা বলে লালন ‘শাহ’; বলে ‘বাউল সম্রাট’ লালন! যে ব্যক্তি ‘ফকিরি’ গ্রহণ করেছেন, তিনি যে দুনিয়ার বাদশাহীর মোহ ছেড়ে এসেছেন, তা এদের কে বোঝাবে!
এরা অবুঝ হয়ে গেয়েই যাচ্ছেন ‘বাউল সম্রাট’ লালনের ‘গান’! যদিও লালন কোনো গান রচনা করেননি। লালন ফকিরের সাধকগণ লালনের এসব পদকে বলেন ‘সাঁইজির কালাম’। তো দেশ ও দেশের মানুষকে ‘কালাম’ আর ‘গানের’ মাঝের বিস্তর তফাৎটুকু বোঝাবে সে সাধ্য কার! আর বোঝালেই যে বুঝবে, তারই-বা কি নিশ্চয়তা? বাঙালি যে নিজের অজ্ঞানতাকে নিজের গর্বের ‘ধন’ মনে করেন তা তো কারও অজানা নয়।

যে লালন সেকালে স্থানীয় সামন্তদের বিরুদ্ধে লড়েছেন লাঠি হাতে, সে লালনকে যদি সামন্তপ্রথার শীর্ষ আসনখানা বরাদ্দ করা হয়, তবে ফকির লালনের মুখ লুকানোর আর জায়গা কোথায়?

সেই একই ভুল দেখতে পাই সত্যজিৎকে ‘মহারাজা’র উপাধীতে ডাকায়। সত্যজিতের চলচ্চিত্রিক সৃষ্টি গুপী গায়েন বাঘা বায়েন-এর একটি জনপ্রিয় গান বা ছন্দোবদ্ধ সংলাপ হতে এই উপাধী জনপ্রিয় হলেও তা সত্যজিতের নামের সাথে যুক্ত করার যে আবেগ, এই আবেগের ভেতর আমি ওই ‘মাথার উপরে’ রাখার অতি অবেগীয় অনুভূতিই দেখতে পাই। ‘মহারাজা’ বলে তাঁকে পৃথক করে দিয়ে তাঁর জন্য বরাদ্দ করা হয় সর্বোচ্চ আসন। এ আসন অপ্রতিদ্বন্দ্বী।

যদিও আমার বিচার বলে, সত্যজিৎ লড়তে ভালোবাসতেন। তাঁর ব্যক্তিগত লড়াই তিনি লড়ে গেছেন প্রতিক্ষণ। ব্যক্তিগত সর্বোচ্চ আসনের চেয়ে তাঁর কাছে আত্মশুদ্ধি হয়তো অধিক জরুরি ছিল; আর সেই কারণেই তিনি নির্মাণ করেছিলেন প্রতিদ্বন্দ্বী [১৯৭০]। আর ব্যক্তিগত লাভালাভের চেয়ে সমাজ ও মানুষের মুক্তি যে তাঁর কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল তা বোঝা যায় তাঁর শেষ সিগনেচার আগন্তুক [১৯৯১] দেখে। অতএব, ‘মহারাজা’ বলে সত্যজিৎ বন্দনায় খোদ সত্যজিৎ নারাজ হতেন বলেই মনে করি।

আগন্তুক
আগন্তুক

৫.

সত্যজিৎকে অনুভব করতে হলে সত্যজিতের সৃষ্টিকে অন্তরঙ্গভাবে পেতে হবে। গভীর জানায় সত্যজিৎকে ভালো না-বাসাটা কঠিন। কিন্তু গভীর জানায় যে অন্তরঙ্গ হবার শর্ত, তা পূরণ সহজ কাজ নয়। কেননা অন্তরঙ্গ হতে চাওয়া আর হতে পারার ব্যবধান বিস্তর। এই ব্যবধানের পথটুকু পাড়ি দিতে হলে পথের শ্রম-সময় ও ক্লান্তির কথা বিবেচনায় রাখা জরুরি। এ সব জেনে বুঝেই চলুন সত্যজিতের ঘরে প্রবেশ করার চেষ্টা করি।

সকলেই জানেন প্রতিভার স্বভাব বহুমুখী। এ কথাও সর্বজনবিদিত যে প্রতিভাবান ব্যক্তির সহজাত সৃজনী সক্ষমতা হয় বিস্ময়কর। আর যে কোনো চিরায়ত প্রতিভা নিজ স্রষ্টাবৃত্তিতে সময়কেই আমূল নাড়া দিয়ে যায়। আমরা দেখি সত্যজিৎ রায়ও এমন বহুমুখী কীর্তিগাথার জন্ম দিয়েছেন। যা একদিকে যেমন বিপুল, অন্যদিকে তেমনি বৈচিত্রময়। কিন্তু আমার বিচার ও ভালোবাসার লক্ষ্য বিশেষভাবে তাঁর চলচ্চিত্র। তাঁর জীবনের আরও বহু পথঘাট আপাতত এ আলোচনার বিষয় হবে না।

আমি সত্যজিতের চলচ্চিত্রিক জীবনকালকে দুটো ভাগে ভাগ করতে চাই। তাঁর প্রথম পর্যায় হলো ১৯৫৫ থেকে ১৯৭৫ এবং দ্বিতীয় পর্যায় হলো ১৯৭৫ থেকে ১৯৯১। ১৯৯২-তে তিনি প্রয়াত হন। যদিও তাঁর শেষ চলচ্চিত্রিক কর্মময় বছর আমি ধরি ১৯৯০-কে। কিন্তু ১৯৯১-তে যেহেতু আগন্তুক মুক্তি পায়, তাই তাঁর চলচ্চিত্রিক কর্মময়তার দ্বিতীয় পর্যায়ের সময়টাকে ১৯৭৫ থেকে ১৯৯১-ই ধরব।

আমি দেখি চলচ্চিত্র স্রষ্টাবৃত্তিতে সত্যজিৎ ১৯৫৫ থেকে ১৯৭৫– এই ২০ বছর প্রবলভাবে নিরীক্ষাপ্রবণ। তাঁর জীবনের প্রায় সকল মাস্টারপিস এই সময়কালে নির্মিত। যা বিশ্বচলচ্চিত্রের ঐতিহ্যকে সমৃদ্ধ করেছে এবং যা বাংলাভাষা ও ভারতীয় চলচ্চিত্রকে গৌরবান্বিত করেছে।

আর দ্বিতীয় পর্যায়ের ১৯৭৫ থেকে ১৯৯১ পর্যন্ত সময়ে তাঁর প্রামাণ্যচলচ্চিত্র বালা, সুকুমার ও স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র পিকু এবং টেলিভিশন প্রযোজনা সদগতি ভীষণভাবে সত্যজিতের নিরীক্ষাপ্রবণ পারফেকশনের উদাহরণ হলেও এসব নির্মাণ তাঁর এ পর্বের অপরাপর নির্মাণের প্রেক্ষিতে উজ্জ্বল ব্যতিক্রম। এই পর্বের ২টি প্রামাণ্যচলচ্চিত্র ও ২টি স্বল্পদৈর্ঘ্য কাহিনীচিত্র তাঁর জীবনের প্রথম পর্যায়ের গ্রেটনেসের উজ্জ্বল স্বাক্ষর হয়ে দেখা দেয়। কিন্তু ১৯৭৫ থেকে ১৯৯১-এর মধ্যবর্তী ১৬ বছরে সত্যজিৎ যে সাতটি কাহিনীচিত্র [শতরঞ্জ কি খিলাড়ি, জয় বাবা ফেলুনাথ, হীরক রাজার দেশে, ঘরে বাইরে, গণশত্রু, শাখা প্রশাখা এবং আগন্তুক] নির্মাণ করেছেন, সেখানে সত্যজিতের অসাধারণ গল্প বলাটাই প্রধান। এসব চলচ্চিত্রে সত্যজিৎ প্রায় সরাসরি নিজের বক্তব্য প্রকাশে যতটা ব্যাকুল, ততটা ব্যাকুলতা তাঁর প্রথম পর্বের চলচ্চিত্রে দেখা যায় না। যে বিস্ময়কর চলচ্চিত্রিক নির্মাণশৈলির উচ্চমান সত্যজিতের বৈশিষ্ট্য তা এ পর্বের ছবিগুলোতে তেমন পাই কি?

১৯৫৫-তে পথের পাঁচালী থেকে ১৯৭৫-এ জন অরণ্য এবং এর মাঝের ২০টি কাহিনীচিত্র, ৩টি প্রামাণ্যচলচ্চিত্র ও ১টি স্বল্পদৈর্ঘ্য নির্বাক চলচ্চিত্রে প্রধানত সত্যজিতের শ্রেষ্ঠত্ব গড়ে ওঠে। এই সময়কালটাকে সত্যজিতের নির্মাণসত্তার স্বর্ণকাল বা বসন্ত বলা যায়। যদিও এই কালের সব চলচ্চিত্রই একই রকম উচ্চমান ও নিরীক্ষাপ্রবণতার স্বাক্ষর বহন করে না।

জানি, এ ধরনের আলোচনা অস্বস্তিকর। কারণ এ আলোচনা করতে গিয়ে বেশ কয়েকবার অস্বস্তিকর অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হয়েছি। প্রশ্ন হলো, কেন এমন আলোচনা স্বস্তিকর নয়?

কারণ আমরা আমাদের আইকনদের কোনো সীমাবদ্ধতা থাকতে পারে তা বিশ্বাসই করতে চাই না। যদিও জানি তিনি মানুষই ছিলেন, কিন্তু আমাদের ভালোবাসা কখন যে ‘আরাধনায়’ রূপান্তরিত হয়ে যায় তার সচেতন হদিশ রাখতে ভুলে যাই। আর তাই আমাদের আইকনগণ আরাধনা পেতে পেতে আমাদের ধরা-ছোঁয়ার উর্ধ্বে উঠে যান। আমরা তাদের নিয়ে আকাশচারি হতে পারি কিন্তু তাতে আমাদের আর ‘গড়ে’ ওঠা হয় না। আমরা আমাদের বামনত্ব নিয়ে হাপিত্যেশ করতে করতে ভুলেই যাই যে একজন লালন, রবীন্দ্রনাথ, সুভাষচন্দ্র বসু অথবা শেখ মুজিবুর রহমান অথবা অতীশ দিপঙ্কর অথবা সত্যজিৎ রায় মানুষই ছিলেন, ছিলেন বাঙালি এবং তাঁরাও আমাদের মতোই ভাত-ডাল খেয়েছেন আর নিজ নিজ স্রষ্টাবৃত্তির ঐশ্বর্যে দুনিয়ায় অমর হয়ে গেছেন।

পথের পাঁচালী
পথের পাঁচালী

৬.

কোথায় সত্যজিতের স্রষ্টাবৃত্তির শ্রেষ্ঠত্ব? কেন উপমহাদেশের চলচ্চিত্র আজও তাঁর মানের নির্মিতির আশেপাশে পৌঁছাতে পারে না। এসব প্রশ্নের গুণগত আলোচনা জরুরি নয়?

সত্যজিৎ কেমন করে একটি পুরোনো ক্যামেরা দিয়েই পথের পাঁচালীর মতো বিশ্বজনীন মাস্টারপিস তৈরি করে ফেলতে পারেন তা খুঁজতে যদি একটু ঘাঁটাঘাঁটি নাই-ই করবেন, তবে আর চলচ্চিত্র ভালোবাসবেন কী উপায়ে?


শিল্পে
গন্তব্যে
পৌঁছানো মুখ্য
নয়। পথটাই আসল

আসুন আমরা কথা বলতে বলতে এগিয়ে যাই। গ্রামের পায়ে চলার মেঠোপথের মতো পথ চলতে চলতে কখনও সংশয়ে বাঁক খাই, আবার নিজেই উত্তর খুঁজে সোজা পথ হাঁটি। সংশয়পূর্ণ দৃষ্টিতে তাকাই সামনে, আবার দেই উত্তর। এই চাপান-উতোর চলুক ততক্ষণ যতক্ষণ না আমরা হাঁটায় ক্লান্ত হই। কারণ আমাদের এ হাঁটায় গন্তব্য নেই। শিল্পে গন্তব্যে পৌঁছানো মুখ্য নয়। পথটাই আসল। পথটাকেই বুঝতে হয়। আমরাও সত্যজিতের সৃষ্টির পথ ও পথের রহস্য বুঝতে চাই।

চলুন সত্যজিতকে নিয়ে এ আলাপ করতে করতে আমরা হেঁটে আসি বিভূতিভূষণের নিশ্চিন্তিপুর বা সত্যজিতের ১৯৫২ সালের বোড়াল গ্রামে। যে গ্রামে হাঁটতে হাঁটতে একজন সৌখিন চলচ্চিত্রকর্মী সৃষ্টি করেছিলেন দুনিয়ার অন্যতম মাস্টারপিস চলচ্চিত্র পথের পাঁচালী

চারুলতা
চারুলতা

৭.

আরও অনেকের মতো আমারও দৃঢ় ধারণা সত্যজিতের স্রষ্টাবৃত্তির সবচেয়ে গভীর যে গুণ, তা হলো সত্যজিতের স্থির মনোযোগ। ঋষিতুল্য ধ্যানে তিনি গল্প বলেন। সে গল্পে কিছুই বাদ যায় না। যতটা বাস্তব আমরা দেখি, সত্যজিৎ দেখেন তার থেকে শতগুণ বেশি। সত্যজিতের দেখার সক্ষমতার তুলনায় কার্যত আমরা দেখি না কিছুই। সত্যজিতের চলচ্চিত্রে এমনই নিখুঁত ডিটেইল থাকে যা দেখতে হলে শুধু চলমান ফ্রেমকে ফ্রিজ করলে চলে না, ফ্রেমটিকে আতস কাঁচের নিচে ফেলে বড় করে দেখতে হয় সত্যজিৎ কতটা নিখুঁত এবং আশ্চর্য হয়ে লক্ষ্য করা যায় সত্যজিতের মতো ডিটেইলসে কাজ করা আর কোনো চলচ্চিত্রকারের জন্ম আজও ভূ-ভারতে হয়নি।

সত্যজিতের চলচ্চিত্রে ডিটেইলসের একটি নমুনা নিয়ে আলোচনা করা যাক। চলচ্চিত্র চারুলতার শুরুর সিকোয়েন্সেই আমরা দেখি চারু ঘড়ির ঘন্টা বাজার শব্দে চাকর ব্রজকে ডেকে স্বামীকে চা দিতে বলে, ‘ব্রজ! কানে শুনতে পাও না নাকি! চারটা বেজে গেছে, অফিসে চা দিয়ে এসো।’

এরপর বাড়ির টানা বারন্দায় চারুলতার দ্রুত চলে যাওয়ার পাসিং শটে আংশিকভাবে দেখা যায় দেয়াল ঘড়িতে চারটাই বাজে! এই পাসিং শটে দেয়াল ঘড়িটিকে দেখা খুব কঠিন। একটি দ্রুত শটে সেকেন্ডেরও কম সময় ঘড়িটি দেখা যায়। এই যে সিনেমার সময় আর দেয়াল ঘড়ির সময়কে এক করে দেওয়া, চলচ্চিত্রে এ অনেক অর্থবহ মেটাফর তৈরি করে।

কথা হলো সিনেমা-হলে কে সে শট ফ্রিজ করে দেখবে যে সত্যজিৎ ওমন নিখুঁত থাকার প্রয়োজনবোধ করেন। এই প্রয়োজনটা বুঝতে হলে চারুলতা [১৯৬৪] মনোযোগ দিয়ে বহুবার দেখতে হয়। এবং বহুবার দেখায় যে ডিটেইল চোখে পড়ে তা বিস্ময়কর।

চারুর জীবনে অমলের আবির্ভাবের যে ঝড়, সে ঝড়ে চারুর মনের স্থিরতা ও কর্তব্য কাজ বিনষ্ট হয়। মনের চাপা উৎকন্ঠার বাষ্পে চারু ছবির মধ্যবর্তী সময়ে ভুলে যায় চারটে বাজলে কর্তাকে চা পাঠাতে হয়। সেই উদাসীন চারুর মনের ছাপ পড়ে কর্তব্য কাজে। চলচ্চিত্র চারুলতার মধ্যবর্তী সময়ে বিকেলে উদাসীন চারু হেঁটে যায় টানা বারান্দা দিয়ে যথারীতি। যদি মনোযোগ দিয়ে দেখা যায় তবে চোখে পড়ে তার হেঁটে যাওয়ার ক্ষণে দেয়াল ঘড়িতে বাজে চারটে ১০ মিনিট; কর্তা ভূপতির জন্য চা পাঠানোর কথা চারুর আর মনে পড়ে না।

এ এমন এক ডিটেইল যা ভীষণভাবে নিখুঁত এবং চলচ্চিত্রিক। অন্য কেউ হলে হয়তো সামান্য সংলাপে কাজ সেরে নিতেন। সত্যজিৎ তা করেননি। তিনি নীরবতায় দেখিয়ে যান। এক চারুলতায় শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত প্রতি ফ্রেমে সত্যজিৎ যে ডিটেইলসের ডিনামাইট পেতে রাখেন তাতে মনোযোগী চলচ্চিত্রপ্রেমীরা সে ডিনামাইটে পা দিয়ে আনন্দে বিস্ফোরিত হন। কারণ চলচ্চিত্র নির্মাণ করতে হয়। আর এ নির্মাণে যে নির্মাতা যত নিখুঁত হন, যত সূক্ষ্ণ হন অনুভূতি প্রকাশে, চলচ্চিত্রে তাঁর মহিমা তত গভীর হয়।


সত্যজিৎ
দৃষ্টিবানদের
জন্য তাঁর চলচ্চিত্রে
হাজারও মনি-মুক্তা লুকিয়ে রাখেন

নিখুঁত ডিটেইলসের বিচারে সত্যজিতের মত এমন ক্ষুরধার দৃষ্টি উপমহাদেশের আর কারও চলচ্চিত্রে খুঁজে পাই না। কার্যত সত্যজিৎ দৃষ্টিবানদের জন্য তাঁর চলচ্চিত্রে হাজারও মনি-মুক্তা লুকিয়ে রাখেন। যা তাঁর চলচ্চিত্রকে দৃশ্যের পর দৃশ্যে সমৃদ্ধ করে তোলে।

ভাববার বিষয় হলো, আজও ভারতের চলচ্চিত্রকারগণ এভাবে কাজ করেন না। আর করেন না বলেই হয়তো তাদের কারও চলচ্চিত্র সত্যজিতের ধারে কাছে পৌঁছায় না।

স্বভাবসুলভ পারফেকশনিস্ট হিসেবে যে সত্যজিৎ তুলনাহীন। তিনি কি কার্যত সম্পূর্ণ নিখুঁত? তাঁর চলচ্চিত্রে কি কখনও কোনো খুঁত রয়ে যায়নি?

চিড়িয়াখানা
চিড়িয়াখানা

যদি বলি তাঁর চিড়িয়াখানা [১৯৬৭] চলচ্চিত্রে মুশকিল মিয়ার চরিত্রটির কথা। শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাস আমার পড়া নেই। উপন্যাসে এই চরিত্রটির এমন বর্ণনা আছে কি-না তা বলতে পারব না। তবে প্রশ্ন হলো, পূর্ববাংলার গ্রামীণ মানুষের মুখের কথার টানে কথাবলা ওই মুসলিম চরিত্রটি কি সত্যজিতের চলচ্চিত্রে পূর্ববাংলার প্রতিনিধিত্বকারী একমাত্র ‘মুসলিম চরিত্র’?

হতে পারে। তবে যে বস্তুটি চোখে পড়ে তা ওই মুশকিল মিয়ার কস্টিউম বা সাজ পোশাকটিতে। মুসলিম চরিত্র মানেই তার গলায় একটি কালো কাইতন আর মাদুলি বা তাবিজ থাকবে– এ কেমন ক্যারিকেচার? বিস্ময় লাগে না একটু!

আমার চোখে লাগে ব্যাপারটি। কেননা, আজ পর্যন্ত অধিকাংশ ভারতীয় চলচ্চিত্রে মুসলিম চরিত্র মানেই চোখে সুরমা, গলায় মাদুলি বা তাবিজ! আর হ্যাঁ, মাথায় কখনও কখনও একটি টুপি থাকতেও দেখা যায়। যেমনটি আছে চিড়িয়াখানাতে মুশকিল মিয়ার মাথাতেও। কস্টিউমের এই সাধারণীকরণ কি সত্যজিতের চলচ্চিত্রেও কাম্য?

১৯৬৭ সালের চিড়িয়াখানায় এ দৃশ্য থেকে ভারতের অদ্যাবধি নির্মিত সিনেমাগুলো ‘মুসলমান চরিত্রের’ অমন কস্টিউম সেন্স অনুপ্রাণিত কি-না তা ভাবা যেতে পারে। কারণ এই মুসলিম চরিত্রের ‘টাইপ’টি এরপর থেকে বা আরও আগে থেকেই [যদিও এখনও ১৯৬৭-এর আগের কোনো ছবিতে দেখিনি] হাজির দেখতে পাই। এমনকি ২০১৬ সালে চিড়িয়াখানার কাহিনি নিয়ে নতুন নির্মাণ বোমকেশ ও চিড়িয়াখানায় নির্মাতা অঞ্জন দত্ত ঠিক সেই একই কায়দায় মুশকিল মিয়ার কস্টিউম তৈরি করেছেন।

কিন্তু কস্টিউমের এই ‘টাইপ’টুকু ছাড়া সত্যজিতের চিড়িয়াখানার ওই চরিত্রটির মুখের কথ্যভাষার জবানিতে কোনো সমস্যা খুঁজে পাইনি। পূর্ববাংলার গ্রামীণ মানুষের আঞ্চলিক কথ্যভাষার টানটায় সত্যজিতের পারফেকশন খুঁজে পেতে কোনো সমস্যা হয়নি। যদিও পশ্চিমবাংলার অন্যসব নির্মাতার ছবিতে পূর্ববাংলার গ্রামীণ মানুষের আঞ্চলিক কথ্যভাষার টানের ‘খিচুড়ি’ উপস্থাপনা এখন পর্যন্ত চলছে, আর তা বড্ড বেমানান এবং অবমাননাকর। ২০১৬ সালে এই খিচুড়ি অঞ্জন দত্তকেও পরিবেশন করতে দেখলাম। আমার অবাক লাগে ভাবতে যে পশ্চিম বাংলার চলচ্চিত্রকারদের পূর্ববাংলার গ্রামীণ মানুষের কথ্যভাষার বৈচিত্র বিষয়ে কোনো ধারণাই নাই। তাদের যে শুধু ধারণা নেই তা নয়; তাদের বেশিরভাগের চলচ্চিত্রে পূর্ববাংলার গ্রামীণ মানুষের রিপ্রেজেন্টেশনের ক্ষেত্রে আঞ্চলিক কথ্যভাষার ব্যবহার দেখে তাদের ভাষাগত মূর্খতা যথেষ্ট পীড়া দেয়।

আনন্দের বিষয় হলো, এ দোষ সত্যজিতের চলচ্চিত্রে দেখা যায়নি। দেখিনি ঋত্বিক বা মৃণালের চলচ্চিত্রেও।

অপরাজিত
অপরাজিত

৮.

সত্যজিতের চলচ্চিত্রের প্রকৃত রসাস্বাদনের কথা ভাবতে গিয়ে আমার কেবলি যষ্টিমধুর রূপকটি মাথায় আসে। আমার মনে হয়, সত্যজিৎকে বুঝতে হলে যষ্টিমধুর স্বাদ নিতে জানতে হবে। সত্যজিতের চলচ্চিত্র হলো তেমন এক বিশেষ ভেষজ। এই ভেষজ উপাদান চলচ্চিত্রপ্রেমীদের জন্য রহস্যস্বরূপ।

যার রসাস্বাদনে প্রয়োজন হবে ফেলুদার বিশেষ তৎপরতার পাশাপাশি তাঁর বিশেষ মগজাস্ত্র এবং প্রয়োজন হবে অধ্যাপক শঙ্কুর বিশেষ শিল্পজাত ‘বৈজ্ঞানিক’ দৃষ্টির। তবেই সত্যজিতের চলচ্চিত্রের ফ্রেম বাই ফ্রেম থামিয়ে ওঁর স্রষ্টাবৃত্তির পাঠোদ্ধার সম্ভব। না হলে কেবল বৃথা ‘আরাধনা’ আর ‘বন্দনা’ই হবে। সত্যজিতের মনন ও মধুর খোঁজ পাওয়া হবে না।

অপুর সংসার
অপুর সংসার

৯.

পথের পাঁচালী [১৯৫৫], অপরাজিত [১৯৫৬] ও অপুর সংসারকে [১৯৫৯] যদি সত্যজিতের স্রষ্টাবৃত্তির ম্যাগনাম ওপাস ধরি, তবে সত্যজিতের পলিটিক্যাল ‘ইশতেহার’ হলো প্রতিদ্বন্দ্বী [১৯৭০], সীমাবদ্ধ [১৯৭১] এবং জন অরণ্য [১৯৭৫]। এর মাঝে মহানগরকে [১৯৬৩] ধরতে হবে তাঁর ম্যাগনাম ওপাস টু পলিটিক্যাল ইশতেহারের ট্রানজিশন হিসেবে। যেখানে সত্যজিৎ ‘মহানগর’ কলকাতার নাগরিক জীবনে পুরোনো সমাজ কাঠামোর ধ্যান-ধারনা ভেঙ্গে নারীদের বেরিয়ে আসার সন্ধিক্ষণের এক বিশ্লেষণ তুলে ধরেন। এ চলচ্চিত্রকে এই উপমহাদেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক রূপান্তরের এক আশ্চর্য উপাদান হিসেবে আজ পাঠ করা যায়।

এছাড়া সত্যজিতের অসম্ভব কাব্যময় ধ্রপদ হলো চারুলতা (১৯৬৪), টু [১৯৬৪] আর পিকু [১৯৮০]।

আমি সত্যজিতের নায়ক [১৯৬৬] এবং কাঞ্চনজঙ্ঘার [১৯৬২] বিশেষ অনুরক্ত। ভালোবাসি ওঁর অরণ্যের দিনরাত্রি [১৯৭০], অশনি সংকেত [১৯৭৩] আর দেবী’কে [১৯৬০]। তিন কন্যা’র [১৯৬১] প্রতি আমার শ্রদ্ধা আছে। আর কুর্ণিশ করি ওঁর দার্শনিক প্রবন্ধ আগন্তুক’কে [১৯৯১]।

আগন্তুক নিয়ে আমার প্রবল বিস্ময় জাগে যখন দেখি আগন্তুক মামা মনমোহন মিত্র ১৯৫৫ সালে নিরুদ্দেশ হয়ে ১৯৯০-তে ফিরে আসেন নিজ জন্ম শহরে। এবং আমি আবিষ্কার করি সত্যজিতের পথের পাঁচালী ১৯৫৫-তে মুক্তি পায় এবং ১৯৯০-তে তিনি আগন্তুক-এর চিত্রনাট্য লিখতে শুরু করেন। নিজের চলচ্চিত্রকার জীবনের ৩৫ বছরের বিশ্বভ্রমণকে সত্যজিৎ গল্পে রূপান্তর করে নির্মাণ করেন চলচ্চিত্র আগন্তুক। নিজেকে মনমোহন মিত্রের আবরণে লুকিয়ে তিনি বলে গেলেন ‘সভ্যতার’ সঙ্কটের কথা। যা তাঁর অন্তিম বাণীর মতো আমাদের প্রাণে বাজে।

অভিযান
অভিযান

কিন্তু খটকা লাগে যখন প্রবাদপ্রতিম চলচ্চিত্রকার ঋত্বিক কুমার ঘটকের অযান্ত্রিক [১৯৫৮] দেখে সত্যজিতের অভিযান [১৯৬২] দেখতে বসি। অভিযান-এর বহু দৃশ্যের গঠনশৈলী এবং অভিযান-এর প্রটাগনিস্ট নারা সিংয়ের ভূমিকায় অভিনয় করা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়কে কেবলি অযান্ত্রিক-এর ‘বিমল’ রূপী কালি ব্যানার্জির সাথে গুলিয়ে ফেলি। ভাবতে বসি, প্রায় একই রকম করে চরিত্র রূপায়ণের এই প্রেরণার কারণ কী?

ঋত্বিক অযান্ত্রিক নির্মাণ করেছেন সুবোধ ঘোষের গল্প অবলম্বনে আর সত্যজিৎ অভিযান নির্মাণ করেছেন তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের গল্প অবলম্বনে। কিন্তু নির্মাণশৈলির এই আশ্চর্য সাদৃশ্যকে কাকতাল বলে মানতে মন সায় দেয় না। কেননা ঋত্বিক অযান্ত্রিক নির্মাণ করেছেন ১৯৫৮ সালে আর সত্যজিৎ অভিযান নির্মাণ করেছেন ১৯৬২ সালে। কার্যত এই দুই চলচ্চিত্রের অর্ন্তগত দর্শনের অভিমুখ ভিন্ন ভিন্ন গন্তব্যে গমন করলেও এদের নির্মাণশৈলির মিলগুলো সত্যজিতের দিকে প্রশ্নের আঙ্গুল তোলে।

এ প্রসঙ্গে মনে পড়ছে একটি জনপ্রিয় ‘শোনা গল্প’। যা বিভিন্ন সময়ে ঋত্বিক ও সত্যজিতের ব্যক্তিগত সম্পর্কের দিকে ইঙ্গিত করে বলা হয়। গল্পটা হলো, ভরপুর বাংলা মদ খেয়ে রাতে ঋত্বিক ঘটক ট্যাক্সি করে বাড়ি ফেরার সময় ভাড়া না মিটিয়েই গাড়ি থেকে নেমে চলে যাচ্ছিলেন। এমন সময় ট্যাক্সি ড্রাইভার বলেন, স্যার ভাড়া!

জবাবে ঋত্বিক বলেন, টাকা নেই। এক কাজ করো, এখান থেকে সোজা ১/১, বিশপ লেফ্রয় রোডে চলে যাও। সেখানে গিয়ে দেখবে, একটা ঢ্যাঙা লোক দরজা খুলবে। তাকে বোলো ঋত্বিক ঘটক ট্যাক্সি করে ফিরেছে, সঙ্গে টাকা ছিল না। ও টাকা দিয়ে দেবে।

গল্পের সেই ‘ঢ্যাঙা লোকটি’ মানে সত্যজিৎ রায় ভাড়া মিটিয়ে দিতেন বলেন শোনা যায়।

কথা হলো এ ‘শোনা গল্পের’ কতটুকু সত্য? আমার জানা নেই। এ কথা ঠিক যে ঋত্বিকের বহু ‘পাগলামি’ ছিল। কিন্তু এ গল্পের নির্ভরযোগ্য কোনো সূত্রের হদিশ আমি এখনও পাইনি। এ কথা ঋত্বিকের জবানিতে জানা যায়নি, জানা যায়নি সত্যজিতের জবানিতেও। তবে এ গল্পের উৎস কী? নাকি এ গল্পটি অযান্ত্রিক আর অভিযান-এর প্রটাগনিস্ট ‘ট্যাক্সি ড্রাইভার’ কেন্দ্রিক কোনো রসিকতা? কারও মস্তিষ্কে গড়ে ওঠা গল্পে সত্যজিৎ দায় শোধ করেন ঋত্বিকের অযান্ত্রিকের সাদৃশ্য রচনায়! অর্থাৎ ঋত্বিক ‘ট্যাক্সি’তে চড়েন ঠিক কিন্তু ভাড়া দেন সত্যজিৎ!

অভিযান-এর বিষয়ে আপত্তিই সত্যজিতের বিরুদ্ধে একমাত্র অঙ্গুলি নির্দেশ নয়।

নায়ক
নায়ক

অযান্ত্রিক এবং অভিযান-এর মতই সঙ্কট হয়েছে যখন ইতালির মাস্টার চলচ্চিত্রকার ফেদেরিকো ফেলিনিএইট অ্যান্ড হাফ চলচ্চিত্রটি দেখার পর সত্যজিতের নায়ক দেখেছিলাম। আশ্চর্য হয়েছিলাম ছবি দুটোর নির্মাণশৈলির অদ্ভুত সাদৃশ্য দেখে।

ফেলিনির এইট অ্যান্ড হাফ ১৯৬৩ সালের চলচ্চিত্র আর সত্যজিৎ রায় নায়ক নির্মাণ করেন ১৯৬৬ সালে। নায়ক সত্যজিতের নিজের লেখা কাহিনী ও চিত্রনাট্যে নির্মিত চলচ্চিত্র। ফলে ধরে নিতে হবে নায়ক-এর সাথে এইট অ্যান্ড হাফ-এর নির্মাণশৈলির সাদৃশ্য সত্যজিতের মর্জিতেই হয়েছে। যদিও এইট অ্যান্ড হাফ-এর গল্পটি একজন চলচ্চিত্র নির্মাতার জীবনের একটি সময়কে ধারন করে আর নায়ক-এ একজন চলচ্চিত্র অভিনেতার জীবনের একটি সময়কে ধারণ করে। এইট অ্যান্ড হাফ এবং নায়ক-এর গল্প-অভিনয় ও চলচ্চিত্রের প্রধান অন্তর্গত সুর পৃথক হলেও নির্মাণশৈলির মিলটুকু কখনোই কাকতাল নয়।
নিশ্চিতভাবেই বলা যায় সত্যজিৎ প্রভাবিত হয়েছেন এইট অ্যান্ড হাফ দেখে। এও বলতে এতটুকু দ্বিধা নেই যে, এইট অ্যান্ড হাফ-এর অনুপ্রেরণায় তিনি নায়ক-এর গল্প ও দৃশ্যায়নের কিছু ট্রিটমেন্ট তৈরি করেছেন। কিন্তু এতে চলচ্চিত্র নায়কের মৌলিকত্ব নষ্ট হয়েছে বলে মনে হয়নি। শেষ পর্যন্ত নায়ক সত্যজিতের চলচ্চিত্রই হয়েছে এবং এইট অ্যান্ড হাফ-এর মতো নায়কও আমার অন্যতম প্রিয় চলচ্চিত্রই। বহুবার এইট অ্যান্ড হাফ যেমন দেখেছি, তেমনি দেখেছি নায়ক

প্রশ্ন হলো, আমরা কি এ সব আলোচনা মন খুলে করব না? নাকি এসব ভয়ে ভয়ে অস্ফুট স্বরে বলব যেন কেউ শুনতে না পায়? প্রজন্মের পর প্রজন্ম সত্যজিতের চলচ্চিত্র দেখবে বা দেখছে। তাদের দেখাটাকে ‘মুক্ত’ রাখতে না পারলে সত্যজিৎ কি ঘরের আটপৌরে জীবনের সাথে থাকবেন নাকি মন্দিরে ঠাঁই নিবেন?

এসব প্রশ্ন মনে রেখেই সত্যজিতের কথা ভাবি। আর ভাবতে ভাবতে আমি বিস্মিত হই যখন দেখি ওঁর প্রামাণ্যচলচ্চিত্র রবীন্দ্রনাথ [১৯৬১], দ্য ইনার আই [১৯৭২] ও বালা [১৯৭৬]। ভাবি কেমন করে সত্যজিৎ তাঁর জিনিয়াস পিতা সুুকুমার রায়ের জীবন ও কর্মকে সুকুমার রায়-এ [১৯৮৭] প্রামাণ্যরূপে উপস্থাপনের এই মুন্সিয়ানা অর্জন করলেন!

চিন্তা করি বালকপুত্র সন্দীপ রায়ের অনুরোধে যখন সত্যজিৎ তাঁর দাদা উপেন্দ্রকিশোরের গুপী গায়েন বাঘা বায়েন [১৯৬৮] নির্মাণ করলেন তখন কি তিনি কেবল পুত্র সন্দীপের মন রক্ষা করলেন? নাকি, তখন সত্যজিৎ জিতে নিলেন দাদা উপেন্দ্রকিশোরকে, স্মরণ করলেন তাঁর পিতৃভূমি পূর্ববাংলাকে, জিতে নিলেন অগণন আগত ও অনাগত বালক-কিশোর প্রজন্মকে। যারা হয়ত সত্যজিতের ধ্রুপদী চলচ্চিত্রের সমঝদার হবেন তারুণ্যে, কিন্তু গুপী গায়েন বাঘা বায়েন-তে তাদের সে সমঝদারির হাতেখড়ি হলো শৈশবে এবং বাল্যকালেই।


আমরা
যদি তাঁকে
ঘরের দেয়াল
থেকে নামিয়ে আমাদের
বন্ধুতে রূপান্তরিত করতে
না পারি, তবে তিনি
আরও দূরের মিথে
পরিণত
হবেন

একজন সৃজনশীল মানুষ হিসেবে এভাবেই সত্যজিৎ চলমান সমাজের সকল বয়সের মানুষের কাছে পৌঁছে যেতে থাকলেন তাঁর ভিন্ন ভিন্ন অবতাররূপে। একজন মানুষের স্রষ্টাবৃত্তির এমন উজ্জ্বল বিচরণ বাঙালির জীবনে বারবার আসেনি।

প্রশ্ন হলো সত্যজিৎ কি নির্দিষ্ট শ্রেণীর দর্শক-পাঠকে আবদ্ধ হয়ে রইলেন?

উত্তর হলো, কিছুটা তো রইলেনই। তবে যে কোনো সমাজের বিভিন্ন বয়সের মানুষের জীবনের স্বাভাবিক বিকাশে যা যা অনুসঙ্গ দরকার হয়, সমাজের বিভিন্ন স্তরে সত্যজিৎ নিজেকে সেভাবেই প্রাসঙ্গিক রাখতে ও করতে পেরেছেন। এ অর্জন তাঁকে বাঙালির কাছে আরও বেশি করে আরাধনার স্তরে নিয়ে গেছে।
রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গকে বাদ দিলে বাঙালির জীবনে এ অর্জন সত্যজিৎ ছাড়া আর কেবলমাত্র রবীন্দ্রনাথেরই আছে। আর এ কারণেই সত্যজিৎ ধীরে ধীরে কিংবদন্তী থেকে ‘মিথ’ হয়ে উঠেছেন। এখনও হচ্ছেন। আমরা যদি তাঁকে ঘরের দেয়াল থেকে নামিয়ে আমাদের বন্ধুতে রূপান্তরিত করতে না পারি, তবে তিনি আরও দূরের মিথে পরিণত হবেন। তখন তিনি আমাদের জন্য ‘ট্যাবু’ হয়ে উঠবেন। সেক্ষেত্রে হয়তো তাঁর নাম নিতে হলে প্রথমেই তাঁর নামের প্রতি আমাদের সালাম বা আদাব বিনিময় করে নিতে হতে পারে।

মহানগর
মহানগর

১০.

সত্যজিৎ সমকাল থেকে ‘পলায়নবাদী’ ছিলেন বলে একসময় তাঁর বিরুদ্ধে বহু চিৎকার করা হয়েছে। সত্যজিৎ সমকালের নানা রাজনৈতিক স্লোগানে কান দিলেও কখনও তাতে মন দেননি। তিনি চোখ খোলা রেখে নিজের মতো করে নিজের বয়ান নির্মাণ করে গেছেন। সে কারণেই মহানগর, প্রতিদ্বন্দ্বী, সীমাবদ্ধ, জন অরণ্য সৃষ্টি হয়েছে।

সত্যজিতের কলকাতা-ত্রয়ী নামে খ্যাত প্রতিদ্বন্দ্বী [১৯৭০], সীমাবদ্ধ [১৯৭১] ও জন অরণ্য [১৯৭৫] স্লোগানমুখি চলচ্চিত্র নয়। সময়ের আগুন ও চিৎকার এই ছবিগুলোতে থাকলেও সে আগুন ও চিৎকারের সাময়িক উত্তেজনার চেয়ে এসব চলচ্চিত্র সত্যজিতের রাজনৈতিক ভাবনার দূরদৃষ্টির স্বাক্ষর বহন করে। চলচ্চিত্র তিনটির মূল কাহিনি সত্যজিতের নয়। তবে এ কাহিনিগুলোকে চলচ্চিত্র নির্মাণের জন্য বেছে নেওয়ার মধ্য দিয়ে সত্যজিৎ নিজের বক্তব্যকে জীবন্ত করে গেছেন।

প্রতিদ্বন্দ্বীর প্রটাগনিস্ট সিদ্ধার্থ তার চারপাশের জনজীবনের সাথে লড়াইয়ে বিপর্যস্ত হয়ে গ্রামে নিজের ‘অপর’ এক অস্তিত্ব খুঁজে পায়। সিদ্ধার্থ তার এ নতুন অস্তিত্বের জন্য বিসর্জন দেয় তার ‘নাগরিক’ বিপর্যস্ত অস্তিত্বকে। যে নাগরিক অস্তিত্ব তাকে তার নীতির প্রশ্নে আপস করতে বাধ্য করাতে চায়। সিদ্ধার্থ নিজের নীতির কাছে আপসমুখি নগরকেই বিসর্জন দিয়ে দেয়। সে বেছে নেয় তুলনামূলক সাধারণ জীবন। আপস না করে সে নিজের ব্যক্তিগত শান্তিটুকু খুঁজে নিতে চায়।

এ সিদ্ধার্থ গত শতাব্দীর সত্তরের দশকের কলকাতায় জীবন কাটালেও এর পরিণতি ইতিহাসের প্রখ্যাত সিদ্ধার্থরূপী শাক্যমুনি বুদ্ধকে স্মরণ করায়। কপিলাবস্তুর যুবরাজ সিদ্ধার্থ শাক্যমুনি ‘বুদ্ধ’ হওয়ার আগে তাঁর রাজকীয় নাগরিক জীবনের সাথে সাথে ‘সিদ্ধার্থ’ নামটিকেও বিসর্জন দিয়েছিলেন। প্রতিদ্বন্দ্বীতে প্রটাগনিস্টের ‘সিদ্ধার্থ’ নামের এ মেটাফর চলচ্চিত্রটির অন্তিম পরিণতিকে আরও উজ্জ্বল ব্যাখ্যা এবং অর্থ প্রদান করে।

সীমাবদ্ধ
সীমাবদ্ধ

চলচ্চিত্র সীমাবদ্ধ-এর প্রটাগনিস্ট মধ্যবিত্ত শ্যামলেন্দু ক্রমাগত নিজের নৈতিক অবস্থানকে বিসর্জন দিতে দিতে আরও একটু ‘নাগরিক এলিট’ হয়ে ওঠার পথ খুঁজে নেয়। ‘নাগরিক এলিট’ হওয়ার পিচ্ছিল পথে সে নিজের ব্যক্তিসত্তা হারালেও বেঁচে থাকে তার নাগরিক খোলস। আর থাকে তার পদ ও পদবীর জৌলুশ। সে বিমর্ষ হয় বটে তবে আপস থেকে বের হয়ে আসে না। নাগরিক জীবনের কর্পোরেট সংস্কৃতির এই মানসিকচিত্রটি সত্যজিৎ যখন তুলে ধরছেন তখন সেকালের কলকাতা অথবা আজকের ঢাকা কতটুকু তা গ্রহণে প্রস্তুত?

‘উন্নতি চাই’ এর রেসে মানুষ কখন যে মানুষ থেকে পশুতে নেমে যাচ্ছে তা রাজনৈতিক বক্তৃতাবাজি করে বোঝানো যতটা সহজ, ততটা সহজ নয় সীমাবদ্ধের মতো চলচ্চিত্র নির্মাণ করে। কারণ এমন নিখুঁত নির্মাণের জন্য পরিমিতিবোধ হলেই হয় না, হতে হয় নির্মোহ। কেন যেন মনে হয় প্রথম জীবনের চাকরিসূত্রে সত্যজিতের কর্পোরেট সংস্কৃতির সাথে যে পরিচয় তাতে এই সীমাবদ্ধ ছবিটি নির্মাণে সত্যজিৎ আরও বেশি পরিমাণে অন্তরদৃষ্টি সম্পন্ন হতে পেরেছেন।

ছবিটিতে প্রটাগনিস্ট শ্যামলের যে ‘উন্নতি’ অন্তিমে তাকে ‘উপরের দিকে পতন’ বলে আখ্যায়িত করতে চাই। এই উন্নতি উপরের ওঠায় বলে মনে হলেও তা আদতে মানুষকে ভেতর থেকে শূন্য করে দেয়। এক ফাঁপা আর শূন্য জীবনের ভেতর অভিজাত ক্লাব-রেসের মাঠ আর পরিপাটি ফ্ল্যাট-বৈঠকখানা গড়ে ওঠে কিন্তু তাতে উন্নতির নামে পতিত মানুষটির একান্ত শান্তি থাকে না। কারণ একমাত্র সেই জানে সে কতটুকু ফাঁপা আর শূন্য। সীমাবদ্ধ ছবিতে এ জানাটুকু অবশ্য শ্যামলের শালিকা টুটুলও জানতে পারে। আর সে কারণেই শ্যামলের এই ‘উপরের দিকে পতনে’ অন্তিমে কোনো আনন্দ থাকে না।

ছবিটি দেখতে বসে এসব মনে আসে। সত্যজিতের এই নৈতিক অবস্থানকে ভালো লাগে, শান্তি লাগে। শ্যামলের পরিপাটি জীবনের ভেতরের শূন্যতাকে প্রকাশ করতে সত্যজিৎ শ্যামলের শালিকা টুটুলের দৃষ্টি ও অভিব্যক্তির তিক্ষ্ণ বাণের অসাধারণ প্রয়োগ ঘটিয়েছেন। আর এ চরিত্রে শর্মিলী ঠাকুর অনবদ্য অভিনয় করেছেন।

জন অরণ্য
জন অরণ্য

সত্যজিতের কলকাতা-ত্রয়ীর শেষ এবং সবচেয়ে নির্দয় চলচ্চিত্র জন অরণ্য। মহানগর কলকাতাকে সত্যজিৎ জনতার ‘অরণ্য’ বলার মধ্য দিয়ে এই চলচ্চিত্রের প্রটাগনিস্ট সোমনাথের গল্প বলতে শুরু করেন। ব্রাক্ষণের ছেলে সোমনাথ ব্যবসায় নেমে পড়েন উপায় অন্তর না পেয়ে। মহানগর কলকাতায় নাগরিক জীবনের যাঁতাকলে জাতপাতের শ্রেণীগত কাঠামো ভেঙ্গে গিয়ে জাতের একমাত্র উপাদান হয়ে দাঁড়ায় অর্থ বা টাকা। এ ছবিতে স্বরসতীর বন্দনা নেই, চারপাশে আছে কেবল লক্ষীর আরাধনা। লক্ষীর কৃপাদৃষ্টি পেতে মরিয়া এ ছবির সময় ও মানুষ। আর তাই সোমনাথ পিতার বিষণ্নতার কারণ হয়। সোমনাথের পিতাও একসময় বোঝেন এই-ই সময়। মেনে নেন। না নিয়েই বা উপায় কী?

টাকা রোজগারের পথে সোমনাথ বহু কিছু করতে করতে শেষে বন্ধুর ছোট বোনকে ‘অর্ডার’ পাওয়ার উপায় হিসেবে ভেটরূপে হোটেল কক্ষে পৌঁছে দেয়। এতে বন্ধুর ছোট বোনের পরিচয় দাঁড়ায় পতিতা, সোমনাথ হয় দালাল আর মহানগর কলকাতায় টিঁকে থাকার লড়াইয়ে লড়তে থাকা মানুষগুলোর নৈতিক পাটাতন খসে পড়ে। বেঁচে থাকার উপায় খুঁজতে গিয়ে মূল্যবোধের চর্চিত সকল শর্তগুলো ভেসে যায়, মানুষগুলো ভেতর থেকে শূন্য হয়ে যায়।

সোমনাথ তো শিবেরই আরেক নাম। চলচ্চিত্র জন অরণ্য’র সোমনাথও উপায়ন্তর না পেয়ে আত্মবিসর্জনের বিষ পান করে নীলকণ্ঠ হয়। শিব তো সমুদ্র মন্থনের বিষ পান করে সমগ্র সৃষ্টিকে রক্ষা করেছিলেন। কিন্তু গত শতাব্দীর সত্তরের দশকের কলকাতায়, জন অরণ্য চলচ্চিত্রে সত্যজিতের সোমনাথ কেবল নিজেকে রক্ষার জন্যই ‘দালালিপনার’ বিষ পান করেন।

প্রতিদ্বন্দ্বীর সিদ্ধার্থ নগরকে ত্যাগ করে, নীতির প্রশ্নে আপস না করে গ্রামে চলে যায়, সীমাবদ্ধ’র শ্যামলেন্দু আপস করে তবুও সামজিক স্ট্যাটাসের মালিক হয়; কিন্তু জন অরণ্য‘র সোমনাথের আপসে কিছুই অর্জিত হয় না, কেবল নিজের আপাত অস্তিত্বটুকু টিকে থাকার আশ্বাসে সে নর্দমায় নিক্ষিপ্ত হয়। ১৯৭০ থেকে ১৯৭৫-এর মাঝে নাগরিক জীবনে টিকে থাকার লড়াই এবং পথ ও গন্তব্যের গোলকধাঁধাঁয় এভাবে সত্যজিৎ তাঁর বক্তব্যের থিসিস পূর্ণ করেন।


বহু
চরিত্রের
সমাবেশে সত্যজিতের
কলকাতা-ত্রয়ী একাধারে
রাজনৈতিক, দার্শনিক ও মানবিক

ম্যাগাসিটি কলকাতা নিয়ে সত্যজিতের এই যে থিসিস তা প্রতিদ্বন্দ্বী থেকে সীমাবদ্ধ হয়ে জন অরণ্য পর্যন্ত এসে অসহনীয় হয়ে ওঠে। সত্যজিতের থিসিস মতে নিজের আত্মা বাঁচিয়ে, মর্যাদা না হারিয়ে, নিজের মূল্যবোধ টিকিয়ে রেখে বাঁচবার কোনো পথ শেষ পর্যন্ত আর থাকে না। সত্যজিতের এই থিসিসকে কেবল ‘রাজনৈতিক’ বলার মতো মূর্খতা আমার নেই। এই থিসিস বহুমাত্রিক, বহু চরিত্রের সমাবেশে সত্যজিতের কলকাতা-ত্রয়ী একাধারে রাজনৈতিক, দার্শনিক ও মানবিক।

আদতে এ থিসিস মানবিক বিপর্যয়ের গল্পই বলে। নগর আর নাগরিক জীবনের গতি মানুষের জীবনকে নিঃশেষ করে দেয়। মনে আছে নিশ্চয়ই, পূর্বেই বলেছিলাম, সত্যজিৎ রাজনৈতিক স্লোগানমুখি চলচ্চিত্রকার নন, তাঁর সৃষ্টিসমূহ যষ্টিমধুর মতো। সত্যজিতের কলকাতা-ত্রয়ীর এই থিসিস গভীরভাবে অনুধাবনে আগ্রহী হলে আপনাকে জানতে হবে যষ্টিমধুর রসাস্বাদন প্রণালী। না হলে এর গল্পটুকুই বুঝবেন, আর তা বোঝার জন্য চলচ্চিত্র দেখার কি খুব প্রয়োজন আছে?

সত্যজিতের চলচ্চিত্র বারবার দেখায়, গভীর থেকে গভীরতর মনোযোগে আপনি পেতে পারেন সে অনাস্বাদিত রস। যা কার্যত চলচ্চিত্র শিল্পের রস। আর তা মাস্টার ফিল্মমেকারদের নির্মিতিতেই মেলে।

হীরক রাজার দেশে
হীরক রাজার দেশে

১১.

সত্যজিৎ রায় ছেঁদো বিপ্লবী নন। আর দশটা বাঙালির মতো নন আবেগপ্রবণ। অবাক করবার মতো বিষয় হলো, বাঙালির যত রকম দোষ তা থেকে তিনি অদ্ভূতভাবে মুক্ত ছিলেন। তাঁর ‘মুক্ততা’কে তাঁর সামাজিক বিচ্ছিন্নতা বলা যায় কি?

কলকাতার পথে-ঘাটে যখন ১৯৪৩ এর মহাদূর্ভিক্ষের লাশ পড়ে ছিল তখন সত্যজিতের কোনো তৎপরতার কথা জানা যায় না। শুধু জানা যায় তখন তিনি একটি বিজ্ঞাপনী সংস্থায় চাকরি করতেন।
এ কথা সকলেই জানেন সত্যজিৎ কখনও কোনো রাজনীতি করেননি এবং যতটুকু জানতে পারি তাতে দেখি যে সে মহা-দুর্ভিক্ষের ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ে কোনো জনকল্যানমূলক কাজেও তিনি যোগ দেননি।

একইভাবে ১৯৪৭-এর দেশভাগ। কলকাতায় ভয়ঙ্কর দাঙ্গার সময়ে সত্যজিৎ কি করছেন তা জানা যায় না। কিন্তু আমরা সবাই জানি ১৯৪৭ ও ১৯৪৮-এর মধ্যবর্তী সময়ে তিনি এবং বংশী চন্দ্রগুপ্তসহ আরও কয়েকজন ক্যালকাটা ফিল্ম সোসাইটির গোড়াপত্তন করছেন।

হ্যাঁ, এই ঘটনা ঘটছে ১৯৪৭/১৯৪৮-এ। যখন পশ্চিম বাংলা ও কলকাতা শরণার্থীতে ভরে গেছে। দাঙ্গার ভয়াবহ স্মৃতি তখনও জাগ্রত এবং কলকাতার পথেঘাটে বিপুল বাস্তুহারা মানুষের কষ্ট ও কান্নায় বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে। এ এমন এক সময় যখন ঋত্বিক কুমার ঘটক, মৃণাল সেনসহ বহু সৃজনশীল মানুষ গণনাট্য সংঘের হয়ে মানুষের জন্য লড়ছেন। নতুন দেশ, নতুন সমাজ গঠনের রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক লড়াই করছেন।

ঠিক ওই সময়ে সত্যজিৎ ক্যালকাটা ফিল্ম সোসাইটি গঠন করে চলচ্চিত্রের গুণগতচর্চায় মনোনিবেশ করছেন। যখন ঋত্বিক কুমার ঘটক গণমুখি নাট্য রচনা ও নাটক দিয়ে মানুষ বাঁচানো, মানুষকে জাগানোর আহবানে দিনরাত একাকার করছেন। ঠিক সেই সময় সত্যজিৎ রায় স্টেটসম্যান পত্রিকায় লিখছেন Whats wrong with Indian films শিরোনামে তাঁর বিখ্যাত চলচ্চিত্র প্রবন্ধ। এবং হ্যাঁ, এই ঘটনাগুলোর প্রতিটি ১৯৪৭-১৯৪৮ সালে ঘটছে।

তাই বলছি, সত্যজিতকে আর দশটা বাঙালির সাথে মিলিয়ে পাঠ করা অসম্ভব। কারণ তিনি শারীরিকভাবে বাঙালির গড় উচ্চতা থেকে যেমন পৃথক ছিলেন, ঠিক তেমনি পৃথক ছিল তাঁর সমকালে ঘটমান পরিস্থিতির সাথে তাঁর ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া।

এসব বুঝতে ও বিচার করতে গভীর মনোযোগ দিতে হয়। দুনিয়ায় বহু শিল্পী আছেন যাঁরা যে কোনো মানবিক বিপর্যয়ে আক্রান্তবোধ করেন এবং নিজের যতটুকু সক্ষমতা তাই দিয়ে এর প্রতিকার করার উপায় খোঁজেন। কিন্তু সত্যজিতকে এর থেকে পৃথক দেখতে পাই। দেখি তিনি এ সব মানবিক বিপর্যয়ে সামাজিকভাবে সাড়া দেন না। কিন্তু তাঁর চলচ্চিত্রকর্মগুলোর মাঝে সবচেয়ে প্রধান যে সুরটি প্রবলভাবে বাজে তা হলো মানবিকবোধ। তিনি সরাসরি সামাজিক-রাজনৈতিক বিষয়ে সাড়া দেন না। তিনি তাঁর চলচ্চিত্রের মানবিকবোধের সর্বোচ্চ অভিঘাত যেমন ঘটান, তেমনি দেন রাজনৈতিক বক্তব্য।
সত্যজিতের চলচ্চিত্রে রাজনৈতিক মেটাফরের দৃষ্টান্ত দেখা কঠিন কিছু নয়। তাঁর হীরক রাজার দেশের [১৯৮০] নির্মাণে রাজনৈতিক মেটাফর প্রবলভাবে উপস্থিত দেখতে পাই। কথা হলো, হীরক রাজার দেশে কি কেবল ভারতের স্বৈরশাসনের প্রতীকী উপস্থাপন?

নিশ্চয়ই না। সে রকম হলে সত্যজিৎ কেবল একটি সমকালীন গল্পই বেছে নিতেন। কিন্তু তিনি তা করেননি। তিনি কল্পকাহিনীর বাতাবরণে দুনিয়ার সর্বকালের সকল স্বৈরশাসনের চেহারা উন্মোচন করেছেন। এ কারণে এ চলচ্চিত্র যেমন তখনকার ভারতের রাজনৈতিক অবস্থার শৈল্পিক জবার ছিল, ঠিক তেমনি তা বর্তমানে পৃথিবীর দেশে দেশে যেসব স্বৈরশাসক তাদের মোসাহেব বেষ্টিত হয়ে জনগণকে দমন-পীড়ন করছেন, তাদেরও মুখ ও মুখোশের রাজনীতি উন্মোচন করছে।

কিন্তু কথা হলো লোকজ মেটাফরের আশ্রয় না নিয়ে সত্যজিৎ কি আরও সরাসরি, আরও তীব্র কোনো রাজনৈতিক বক্তব্যধর্মী চলচ্চিত্র নির্মাণ করতে পারতেন না? এ আলাপ আমরা সত্যজিতের সাথে চালাতেই পারি। এর জবাব সত্যজিৎ যাই দিন না কেন, তাঁর প্রতি আমাদের প্রত্যাশার পারদের উর্ধ্বচাপ ছাড়তে যাব কেন?

অশনি সংকেত
অশনি সংকেত

১৯৪৩-এর মহা-দূর্ভিক্ষে সত্যজিতের নীরবতার জবাব কি সত্যজিৎ দিলেন ১৯৭৩-এ অশনি সংকেত-এ। ১৯৪৩ এর প্রায় পঞ্চাশ লক্ষ বাঙালির মৃত্যুর সে করুণ চিত্র শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের রেখাচিত্রের গভীর কালো আঁচড়ে ইতিহাস হয়ে আছে।


ক্ষুধা
কিভাবে
মানুষের জীবন
ও সমাজকে চুরমার করে,
তার নিখুঁত দরদী নির্মাণ অশনি সংকেত

আমরা কি বলব ইতিহাসের সে ধূসর দিনের রঙিন জবাব দিলেন সত্যজিৎ দূর্ভিক্ষের ৩০ বছর পর?

জবাব হোক আর মনোবেদনার মনোস্তাপ, সত্যজিতের স্রষ্টাবৃত্তিতে অশনি সংকেত-এ গভীরভাবে ফুটে উঠেছে ১৯৪০-এর বাংলার গ্রামীণ মানুষের প্রাত্যহিক জীবনাচরণের রূপ-রস-গন্ধ। মানবিক বিপর্যয়ের গভীর ও বিচিত্র সঙ্কট তুলে ধরে অশনি সংকেত। ক্ষুধা কিভাবে মানুষের জীবন ও সমাজকে চুরমার করে, তার নিখুঁত দরদী নির্মাণ অশনি সংকেত

প্রশ্ন করতে ইচ্ছে হয় স্বয়ং সত্যজিৎকে। অশনি সংকেত-এর এই দৃশ্যমালা কিভাবে সৃষ্টি হলো যদি না তাঁর মন ৩০ বছর আগের দূর্ভিক্ষের যন্ত্রণায় পীড়িত না হয়ে থাকে?

আরও একটি প্রশ্ন মনে দাঁনা বাঁধে, আর তা হলো, ১৯৪৩-এর দূর্ভিক্ষে সত্যজিৎ ছিলেন কলকাতায়। তিনি কলকাতার দূর্ভিক্ষকালীন বাস্তবতা তুলে না ধরে গ্রামের প্রেক্ষাপটে কেন এলেন? কলকাতার চিত্র তো আমাদের জানা হলো না। জানা হলো না সত্যজিৎ কেমন দেখেছেন সেই কালের মানুষ-সমাজ-পথঘাট। তাই প্রশ্ন জাগে, অশনি সংকেত কি এক সৃষ্টিশীল আড়াল?

জানি এ নিয়ে বহু তর্ক হতে পারে। তা হোক। আমার গন্তব্য সত্যজিতের স্রষ্টাবৃত্তির গভীরে যাওয়া। সেখানে যেতে হলে এমন হাজারও প্রশ্নের মীমাংসা তো করতেই হবে।

অশনি সংকেত-এ নগর কলকাতাকে বাদ দিয়ে গ্রামের প্রেক্ষিত খুঁজে নেয়ার কারণে এ দূর্ভিক্ষ ঘটার প্রধান কারণের দিকে সত্যজিৎকে বড্ড উদাসীন লাগে। আর তাই এ প্রশ্নও ওঠে, ব্রিটিশ শাসকদের পরিকল্পিতভাবে বানানো এই দূর্ভিক্ষের রাজনৈতিক চরিত্র সত্যজিৎ কি আরও সরাসরি প্রকাশ করতে পারতেন না? হয়তো পারতেন। হয়তো কেন? অবশ্যই পারতেন। কিন্তু সত্যজিৎ কখনও তেমন পথে হাঁটেননি। পূর্বেই বলেছি, তিনি রাজনৈতিক বক্তব্য সরাসরি দেওয়ার বদলে খুঁজে নিতেন কোনো মানবিক কোণ। যে কোণ থেকে ব্যক্তির ব্যক্তিগত আবেগের পাশপাশি ব্যক্তির নৈতিক অবস্থানের মানবিক চ্যুতি-বিচ্যুতি পৃথক ভাষা ও ভঙ্গিতে উজ্জ্বল হয়ে উঠবে। কিন্তু তাই বলে আমাদের তর্ককে আমরা পরিত্যাগ করতে পারি না। আর এ কারণে আমাদের প্রশ্নগুলোকেও আমরা ছাড় দিতে নারাজ।

সদগতি
সদগতি

মুন্সি প্রেমচাঁদের গল্প অবলম্বনে হিন্দি ভাষায় ১৯৮১ সালে ভারতীয় টেলিভিশন দূরদর্শনের জন্য সত্যজিৎ নির্মাণ করলেন সদগতিসদগতির আগে প্রাচীন ভারতের জাত-পাতের শ্রেণিশোষণ সত্যজিতের কোনো চলচ্চিত্রেই গভীরভাবে উপস্থিত হয়নি। সদগতি ধর্মীয় শ্রেণিশোষণের যে ভয়াবহ দৃশ্যমালা তুলে আনে তাও কি ধর্মীয় জাতপাতের ক্ষমতাকেন্দ্রিক সমাজ কাঠামোর বিরুদ্ধে সত্যজিতের জবাব নয়?

খেয়াল করুন, এখানেও সত্যজিৎ স্লোগানমুখি নন। সত্যজিতের নির্মিতি এমনই গভীর, এমনই স্থির যে তা অর্জুনের বাণের মতো নিখুঁতভাবে দর্শকের বোধ ও মননকে এফোঁড়-ওফোঁড় করার সক্ষমতা রাখে। সত্যজিতের চলচ্চিত্রের এ অভিঘাত অন্তরআত্মায় কাঁপুনি ধরায়।

আমি জানি এ অভিঘাত মানুষের মনে শত ঘণ্টার রাজনৈতিক বক্তৃতার চেয়েও শক্তিশালী। রাজনৈতিক বক্তৃতার আবেদন একসময় ফুরিয়ে যায়, কিন্তু সদগতির মতো এমন একটি চলচ্চিত্রের অভিঘাত কারও অন্তর থেকে কখনও মুছে যাওয়ার নয়।

কার্যত, প্রকৃত শিল্পীর কাজই এমন। হাজার হাজার বছর আগে কোনো এক গুহার দেয়ালে অজানা কোনো শিল্পীর আঁকা বাইসনের নিখুঁত এক চিত্র যেমন ‘Wanderlust’ করে তুলতে পারে কলকাতার একজন তরুণকে; যে তরুণ এরপর তার জীবনের ৩৫টি বছর দুনিয়ার বিভিন্ন দিকে মানুষের জীবন ও সংস্কৃতির অভিজ্ঞতায় পূর্ণ হয়ে ফিরবে নিজের জন্ম শহরে, আগন্তুক হয়ে। দেখিয়ে দেবে মানুষের ‘আধুনিক’ জীবন কতটা ফাঁপা ও শূন্যতায় পূর্ণ এবং সে অর্থাৎ মনমোহন মিত্র ওরফে সত্যজিৎ রায় আমাদের চোখে ও মনে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেবেন বর্তমান সভ্যতার অসুখ।

ঠিক তেমনি সত্যজিতের সৃষ্টি পথের পাঁচালীর দূর্গার ইমেজ পৃথিবীর সব ভাইদের অন্তরে সর্বকালিন এক দিদির ইমেজ ফুটিয়ে তুলতে পারে। সে ইমেজ চিরকালিন। অক্ষয় ও শ্বাশত। ‘দূর্গা’ নামের দিদি ভাই অপুর শৈশবেই হারিয়ে যায়। ফলে অপুদের সারাটা জীবন কাটে ‘দূর্গা’ নামের এক দিদির অন্বেষণে। সেই খোঁজে শারদীয় দূর্গোৎসব কি প্রতিবছর বাংলার ভাই-বোনদের মিলিয়ে দেয় না? এই ইমেজের কারিগর আদতে কে? বিভূতিভূষণ নাকি সত্যজিৎ অথবা উভয়ই!

দেবী
দেবী

হয়তো এই সর্বকালিন ও সর্বগ্রাসী নিখুঁত ইমেজ তৈরির স্রষ্টাবৃত্তিই সত্যজিতকে অতুলনীয় করে তোলে। হয়তো জীবনভর এক সামগ্রিক মানবিকবোধে আস্থাশীল সত্যজিতের চলচ্চিত্র স্রাষ্টাবৃত্তিই তাঁকে ক্রমাগত উর্ধ্বে তুলে ধরে। যা বাংলাদেশের একজন শ্রদ্ধেয় জ্ঞানপিপাসু বামপন্থি চিন্তাবিদের মাথার উপরে তাঁকে তর্কাতীতভাবে ঠাঁই করে দেয়। আর কোনো এক সন্ধ্যায় সেই ঘরে উপস্থিত হয়ে আপাত এই ঘটনায় চমকে গিয়ে এক চলচ্চিত্রপ্রেমী তরুণ খুঁজতে শুরু করে এর ব্যাখ্যা।

সেই খোঁজাখুঁজির বিভিন্ন পর্যায়ে যখনই সত্যজিতকে অন্তরঙ্গভাবে পাওয়ার চেষ্টা করেছি, তখনই দেয়ালে ঝোলানো ‘আইকন’ এবং কিংবদন্তি থেকে প্রায় মিথলজিক্যাল চরিত্র হয়ে ওঠা সত্যজিতের পূজারীদের সাথে বাহাস শুরু হয়েছে। অথচ এই বোঝাবুঝির খোঁজাখুঁজিতেই চলচ্চিত্রস্রষ্টা সত্যজিতের বেঁচে থাকা। সত্যজিতের চলচ্চিত্রের স্রষ্টাবৃত্তির এমন শত শত প্রশ্ন আর প্রশ্নের উত্তরের খোঁজেই সত্যজিৎ অন্তরঙ্গ হয়ে উঠবেন। দেয়াল থেকে উঠে আসবেন মনন ও হৃদয়ের উষ্ণ অলিন্দে।


ঢাকা, ১ মে ২০২০
Print Friendly, PDF & Email
শেয়ার
লেখক; চলচ্চিত্র নির্মাতা; চলচ্চিত্র সংগঠক। ঢাকা, বাংলাদেশ। সাধারণ সম্পাদক, ফেডারেশন অব ফিল্ম সোসাইটিজ অব বাংলাদেশ। সভাপতি, ম্যুভিয়ানা ফিল্ম সোসাইটি। নির্মিত প্রামাণ্যচিত্র : অনিবার্য [ পোশাক শ্রমিক আন্দোলন; ২০১১]; পথিকৃৎ [চলচ্চিত্রকার বাদল রহমানের জীবন ও কর্মভিত্তিক; ২০১২ (যৌথ নির্মাণ)]; সময়ের মুখ [জাতীয় অধ্যাপক মুস্তাফা নূরউল ইসলামের জীবন অবলম্বনে; ২০১৮]। সম্পাদিত ফিল্ম-ম্যাগাজিন : ম্যুভিয়ানা; চিত্ররূপ। সিনে-গ্রান্থ : চলচ্চিত্রপাঠ [সম্পাদনা]; চলচ্চিত্রের সাথে বোঝাপড়া; স্বাধীন চলচ্চিত্র আন্দোলনের ইশতেহার : বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ; চলচ্চিত্রকথা [তারেক মাসুদের বক্তৃতা ও সাক্ষাৎকার; সম্পাদনা]। পরিকল্পক ও উৎসব পরিচালক : নতুন চলচ্চিত্র নতুন নির্মাতা চলচ্চিত্র উৎসব

4 মন্তব্যগুলো

  1. লেখাটি সত্যজিৎ এর একটা আস্তছবি হাজির করেছে একজন চলচ্চিত্র সত্যান্বেষীর জাগ্রত প্রশ্ন ও উত্তরের আলাপে। লেখাটি সাহসী এবং বেশ কিছু নতুন ভাবনায় সমৃদ্ধ।

  2. বেলায়েত চমৎকার লিখেছে।চাটুকার হিসেবে নয়।শিল্পের চাটুকার রা দূরত্ব তৈরি করে।ফ্রেমে আবদ্ধ করে এক ধরণের মৃত্যুর বারতা দেয়।ঘটকও তাই বলতেন। ফ্রেম ভাংগার দলের তিনি।অপারাজিত সত্যজিৎ -এর শ্রেষ্ঠ ছবি,তিনি বলতেন জীবন বোধের পাল্লায়।তোমার লেখা সাম্প্রতিক সময়ের উল্লেখ্য সংযোজন।ঠাকুর শেল্ফে ঢুকে গেছেন। মুক্তচিন্তার বাতাসে শ্বাস নিতে পারছেননা।হায়! সত্যজিৎ, তুমি সময়ের মুখো মুখি হও,বেচে যাবে। নয়তো কালি ঝুলি মেখে দেয়ালের ফ্রেমে ঝুলবে। শুষ্ক বকুল মালাও ঝুলবেনা,

  3. অত্যন্ত যুক্তিযুক্ত বিশ্লেষণ। ভালো লাগলো। সবকটি বিষয়ে সম্পূর্ণ একমত না হলেও বেশ ভালো। তবে দু-একটি জায়গায় “আগন্তুক”-এর মনমোহন মিত্র-কে মনমোহন গাঙ্গুলি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

মন্তব্য লিখুন