অবেরহাউসেন মেনিফেস্টো : নিউ জার্মান সিনেমার সূচনাবিন্দু

2
287
মূল : গৌতম । অনুবাদ : রুদ্র আরিফ

গতানুগতিক জার্মান সিনেমার পতন শেষ পর্যন্ত সেই ফিল্মমেকিংয়ের প্রথার অর্থনৈতিক বুনিয়াদকে সরিয়ে দিয়েছে– যেটির প্রকাশভঙ্গি ও চর্চাকে আমরা প্রত্যাখ্যান করেছিলাম। এর মধ্য দিয়ে নতুন সিনেমা [আমাদের] জীবনে একটি পরিবর্তন নিয়ে এসেছে।

–১৯৬২ সালে প্রকাশিত দ্য অবেরহাউসেন মেনিফেস্টোতে লেখা আছে এ কথা। এ বছরটির আগেই সিনেমা-বিশ্ব ইতোমধ্যে এমন কিছু পুনমূর্লায়ণ প্রত্যক্ষ করে ফেলেছে– যেগুলোকে এখন বৈপ্লবিক হিসেবে গণ্য করা হয়। জ্যঁ-লুক গোদার ও ফ্রাঁসোয়া ত্রুফোর মতো ফরাসি সহযোদ্ধাদের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে, ব্রিটিশ ফিল্মমেকারেরা ততদিনে তাদের দ্বিতীয় নিউ ওয়েভ-এর তৃতীয় বছরে পা রেখেছেন। অ্যাটলান্টিকের অপর পাড়ে, আমেরিকাতে ইনডেপেনডেন্ট ফিল্ম মুভমেন্টের বীজ বপন করে ফেলেছেন জন ক্যাসাভেটস তার অসাধারণ সিনেমা শ্যাডোজ-এর [১৯৫৯] মধ্য দিয়ে; আর ১৯৬২ সালটির ৭ বছরের মধ্যেই পিটার ফোন্ডার প্রডিউস, ডেনিস হোপারের মেকিং আর জ্যাক নিকলসনের অভিনয়ে সৃষ্ট হয়েছিল নিউ হলিউড মুভমেন্টের অগ্রগণ্য সিনেমা ইজি রাইডার [১৯৬৯]। জার্মানরা তাতে বেশ ভালোই নড়েচড়ে বসেছিল, মনে হয়।

নিউ জার্মান সিনেমা টার্মটি বছরের পর বছর ধরে জার্মান নিউ ওয়েভ, নিউ জার্মান স্কুল ইত্যাদি সমার্থক টার্মের মধ্যে অর্থ বদল করে ব্যবহৃত হয়ে, ১৯৬০ দশকের শেষভাগে যাত্রা শুরু করে ১৯৮০ দশকের প্রথমভাগ পর্যন্ত জার্মান সিনেমায় ঘটে যাওয়া একটি তুখোড় ফিল্মি-আন্দোলনের ডাকনাম হিসেবে বর্ণিত হয়েছে। ফ্রেঞ্চ নিউ ওয়েভ ও ব্রিটিশ নিউ ওয়েভ মুভমেন্টগুলোর আয়ুকাল যেখানে ছিল কম-বেশি ৭ বছর করে, সেখানে নিউ জার্মান সিনেমা মুভমেন্টটি অধিকতর সময় ধরে টিকে থেকে সিনে-ইতিহাস গ্রন্থগুলোতে জার্মানির নাম বেশ শক্তভাবে অন্তর্ভুক্ত করে গেছে।

তরুণ স্ক্রিপ্টরাইটার, ফিল্মমেকার ও প্রডিউসারদের সৃষ্ট জার্মান শর্টফিল্মগুলো সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আন্তর্জাতিক ফেস্টিভ্যালগুলোকে অনেকগুলো পুরস্কার জিতে নিয়েছে, এবং আন্তর্জাতিক সমালোচকদের গ্রহণযোগ্য অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে। এইসব কাজ [ফিল্ম] ও এইসব সাফল্যই জানিয়ে দেয়, জার্মান সিনেমার ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে তাদের হাতে– যারা একটি নতুন ফিল্মিভাষায় কথা বলতে সক্ষম। 

–ইশতেহারে লেখা ছিল এ কথাও। আসলে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তিলগ্নে, পশ্চিম ও পূর্ব– দুইভাগে বিভক্ত হয়ে গিয়েছিল জার্মানি; এবং দেশটির ‘অক্ষত’ ভাবমূর্তিকে ফুটিয়ে তোলার দায় চেপেছিল এর শিল্প ও সাহিত্য গোষ্ঠীর উপর। পশ্চিম জার্মানি বিশেষভাবে সচেষ্ট ছিল পূর্বাঞ্চলে গেড়ে বসতে থাকা সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রভাবের বিরুদ্ধে নিজেদের একটি আধুনিক পশ্চিমা রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তুলতে। জার্মান জনতার মধ্যে আশাবাদকে জাগিয়ে তোলার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার এবং যুদ্ধ থেকে পাওয়া সব ক্ষতকে মুছে দিয়ে জার্মানিকে সারা বিশ্বের সামনে সদম্ভে হাজির করার আত্মবিশ্বাস ছিল সিনেমার; যদিও সেগুলো নির্মিত হয়েছিল স্বল্প বাজেটেই।

অন্যদিকে, ইউরোপে প্রভাব ফেলতে শুরু করা হলিউড সিনেমার সঙ্গে একটু মানিয়ে নেওয়ারও প্রয়োজন ছিল জার্মান ফিল্মমেকারদের। ১৯৬২ সাল নাগাদ, ইউরোপের বেশির ভাগ দেশই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ধকল সামলে ওঠতে পেরেছিল, এবং ইউরোপিয়ান ফিল্ম প্রোডাকশনগুলোর বাজেট ঘাটতির সুবিধা নিয়ে হলিউডের সিনেমা আমদানি করে একই সঙ্গে নিজ দেশের জনগণকে ‘আমেরিকার স্বপ্নের’ সঙ্গে পরিচিত করা ও সম্ভাব্য অভিবাসনকে উৎসাহিত করার জন্য এটিকেই ভালো সময় হিসেবে ধরে নিয়েছিল। জমকালো টেকনিকালারে নির্মিত লরেন্স অব অ্যারাবিয়া [১৯৬২] ও তারকা-বহুল হাউ দ্য ওয়েস্ট ওয়ান ওন [১৯৬২] কিংবা বিশ্ববিখ্যাত জেমস বন্ড সিরিজের ড. নোর [১৯৬২] মতো হলিউডের সিনেমার সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সামর্থ জার্মান সিনেমার ছিল না; এমনকি ছিল না তাদের দ্য ম্যানচুরিয়ান ক্যান্ডিডেট, টু কিল অ্যা মকিংবার্ড ও দ্য ম্যান হু শট লিবার্টি ভ্যালেন্স-এর মতো অসাধারণ প্লট সমৃদ্ধ সিনেমা বানানোরও ক্ষমতা। ফলে নতুন কিছু একটা করারই ছিল। ইশতেহারে রয়েছে তারই উল্লেখ,

ভবিষ্যতের নতুন জার্মান সিনেমা সৃষ্টির উদ্দেশ্য আমরা ঘোষণা করছি। এই নতুন সিনেমার প্রয়োজন নতুন স্বাধীনতা। প্রতিষ্ঠিত ইন্ডাস্ট্রির প্রচলিত ধারা-উপধারার কাছ থেকে স্বাধীনতা। বাণিজ্যিক পার্টনারদের বাহ্যিক প্রভাব থেকে স্বাধীনতা। নির্দিষ্ট ভাবাদর্শের গ্রুপগুলোর নিয়ন্ত্রণ থেকে স্বাধীনতা। 

১৯৬২। অবেরহাউসেন মেনুফেস্টো। বক্তব্য রাখছেন আলেক্সান্ডার ক্লুজ
১৯৬২। অবেরহাউসেন মেনুফেস্টো। বক্তব্য রাখছেন আলেক্সান্ডার ক্লুজ

১৯৬২ সালের অবেরহাউসেন শর্ট ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে একটি বৈপ্লবিক সমাগম আবশ্যক ছিলই। ফেব্রুয়ারির ২৮ তারিখে ২৬ জন ফিল্মমেকার, আর্টিস্ট ও রাইটারের একটি গ্রুপ একত্রিত হয়ে পুরনো জার্মান সিনেমা, যেটি পাপা’স সিনেমা নামেও পরিচিত, সেটির ‘মৃত্যু’ ঘোষণা করেন। তারা নিউ জার্মান সিনেমার তাগিদ দেন এবং জার্মান শর্টফিল্মগুলোর সাম্প্রতিক সাফল্যকে সামনে রেখে, ‘নয়া’ জার্মান সিনেমা সৃষ্টির উদ্দেশ্যে একটি ইশতেহার প্রকাশ করেন দুনিয়ার সামনে। এই ইশতেহারটিই ইতিহাসে অবেরহাউসেন মেনিফেস্টো নামে জায়গা করে নেয়। ইশতেহারে যে ২৬ জনের নাম ছিল, তারা হলেন–

বোডো ব্রুথনার, বরিস ফন বোরেসম, ক্রিস্টিয়ার ডোয়ের্মের, বের্নহার্ড ডোরিয়েস, হেইঞ্জ ফুর্খনার, রব হাউভের, ফের্ডিনান্ড খিল, আলেক্সান্ডার ক্লুজ, পিট কোচ, ভাল্টার ক্রুটনার, ডিয়েটার লেমেল, হ্যান্স লোয়েপার, রোনাল্ড মার্টিনি, হ্যান্সজুর্গেন পোল্যান্ড, রেইমনড রুয়েল, এডগার রিৎসে, পিটার শামোনি, ডেটেন শলেইয়েরমাশের, ফ্রিৎস শভেনিক, হ্যারো সেনফ্ট, ফ্যাঞ্জ-জোসেফ স্পাইকার, হ্যান্স রোল্ফ স্ট্রবেল, হেইঞ্জ টিকাওয়াসকি, ভোল্ফগ্যাং আর্চস, হারবার্ট ভেসেলি ও ভোল্ফ ভার্থ।

পৃথিবীর সেরা ফিল্মগুলোর কাতারে জার্মান সিনেমাকে দাঁড় করিয়ে দিতে পারে– এমন একটি অর্থনৈতিক স্বাধীনতা অর্জন করতে নিবেদিতপ্রাণ ছিলেন এই ছাব্বিশজন স্বপ্নবাজ। ন্যারেটিভ স্ট্রাকচার নিয়ে এক্সপেরিমেন্ট করে, নতুন নতুন শুটিং টেকনিক আবিষ্কারের মাধ্যমে রিয়ালিজমের একটি বোধকে জাহির করতে এবং কাহিনিকে একটি শক্তিধর নান্দনিকতার সঙ্গে সমন্বয় ঘটাতে বদ্ধপরিকর ছিলেন তারা। ইশতেহারে উল্লেখ আছে,

নয়া জার্মান সিনেমার প্রোডাকশনের ক্ষেত্রে আমাদের বুদ্ধিবৃত্তিক, নিয়মনিষ্ঠ ও অর্থনৈতিক ধারণা সুস্পষ্টভাবেই রয়েছে। আমরা সম্বলিতভাবে অর্থনৈতিক ঝুঁকিটি নেওয়ার প্রস্তুতি নিতে ইচ্ছুক। পুরনো সিনেমা মরে গেছে। নতুন সিনেমার প্রতি আস্থাশীল আমরা।

১৯৬২ সালের এপ্রিলে জার্মান সরকার ঘোষণা দেয়, এই ইশতেহারটিতে যে ধরনের সিনেমার উল্লেখ করা হয়েছে, সেটি বাস্তবায়ন করার জন্য একটি বোর্ড গঠনের পরিকল্পনা রয়েছে তাদের। এর পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৬৫ সালের অক্টোবরে প্রতিষ্ঠা করা হয় বোর্ড ফর দ্য ইয়ং জার্মান ফিল্ম। এই নতুন ফান্ড সাপোর্টিং ও ফান্ডিংয়ের ফলে জার্মান ফিল্মমেকারদের নতুন প্রজন্মটি তাদের প্রতিশ্রুতি পূরণের পথে এক ধাপ এগিয়ে যেতে থাকেন। এই ‘নয়া’ জার্মান সিনেমা খুব দ্রুতই বিশ্বজুড়ে নানা ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে সাড়া ফেলতে থাকে, এবং একটি গুরুত্বপূর্ণ ফিল্ম মুভমেন্ট হয়ে ওঠে। কিন্তু শুরুর ধাক্কার পর এই ফিল্মমেকারদের নাম ধীরে ধীরে হারিয়ে যেতে থাকে। তাই বলে মুভমেন্টটি মুখ থুবড়ে পড়েনি। ১৯৭০ দশকের শুরুতে, ভের্নার হারজোগ, রাইনার ভের্নার ফাসবিন্ডার, ভিম ভেন্ডার্স ও ভের্নার শরোয়েটারের মতো জার্মান ফিল্মমেকারেরা ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল সার্কিটে বিখ্যাত হয়ে ওঠতে থাকেন। এই ফিল্মমেকারেরা নিজেদের সিনেমা চলার সময় যতটা সম্ভব স্বশরীরে সিনেমা হলে উপস্থিত থেকে সরাসরি দর্শকদের প্রশ্নের জবাব দিতে থাকেন। দর্শকদের চাহিদা জানার প্রতি তাদের এই উদ্যম ও প্রচেষ্টা ১৯৭০ দশকের মাঝামাঝি সময়ে মুভমেন্টটিকে আরও জোরদার করে তোলে।

১৯৭৯ সালের হামবুর্গ ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে উপস্থাপিত হয় আরেকটি ঘোষণা। ১৭ বছর আগে যে প্রতিশ্রুতি দিয়ে ‘নয়া’ জার্মান সিনেমা সৃষ্টির লক্ষ্যে যে দ্য অবেরহাউসেন মেনিফেস্টোর ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল, সেটির সাফল্যকে সেলিব্রেট করার জন্য যখন সবাই জড়ো হয়েছেন, সেই মুহূর্তেই ঘোষিত হয় দ্য হামবুর্গ ডিক্ল্যারেশন নামে পরিচিত এই ঘোষণাটি। তারা যে পেশাদারিত্ব ও আত্মনিবেদন দেখিয়েছেন এবং দর্শকরাই যে তাদের একমাত্র বন্ধনের জায়গা– সেই বিষয়টিকে এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে যায় এই ঘোষণা; তাতে উল্লেখ ছিল,

যে মানুষেরা কাজ করে, যাদের ইচ্ছে, স্বপ্ন ও আকাঙ্ক্ষা আছে– এটি তাদের কাছে অর্থবহ। যারা সিনেমা হলে যায় অথচ সিনেমা বানায় না, তারা একটা সিনেমাকে একেবারেই ভিন্ন কোনো চোখে কল্পনা করতে সক্ষম; আর এটি তাদের জন্যই।


সূত্র : ইন্ডিয়ান অথর । ফিল্ম জার্নাল; ভারত

Print Friendly, PDF & Email
শেয়ার
সম্পাদক : ফিল্মফ্রি । ঢাকা, বাংলাদেশ।। সিনেমার বই [সম্পাদনা/অনুবাদ] : ফিল্মমেকারের ভাষা [৪ খণ্ড : ইরান, লাতিন, আফ্রিকা, কোরিয়া]; ফ্রাঁসোয়া ত্রুফো : প্রেম ও দেহগ্রস্ত ফিল্মমেকার; তারকোভস্কির ডায়েরি; স্মৃতির তারকোভস্কি; হিচকক-ত্রুফো কথোপকথন; কুরোসাওয়ার আত্মজীবনী; আন্তোনিওনির সিনে-জগত; কিয়ারোস্তামির সিনে-রাস্তা; সিনেঅলা [৩ খণ্ড]; বার্গম্যান/বারিমন; ডেভিড লিঞ্চের নোটবুক; ফেদেরিকো ফেল্লিনি; সাক্ষাৎ ফিল্মমেকার ফেদেরিকো ফেল্লিনি ।। কবিতার বই : ওপেন এয়ার কনসার্টের কবিতা; র‍্যাম্পমডেলের বাথটাবে অন্ধ কচ্ছপ; হাড়ের গ্যারেজ; মেনিকিনের লাল ইতিহাস ।। মিউজিকের বই [অনুবাদ] : আমার জন লেনন [মূল : সিনথিয়া লেনন]

2 মন্তব্যগুলো

  1. […] ফিল্ম এডিটর, প্রাবন্ধিক। ‘নিউ জার্মান সিনেমা‘ সিনে-আন্দোলনের অন্যতম অগ্রসেনা। […]

মন্তব্য লিখুন