মার্টিন স্করসেজির শৈশবস্মৃতিতে জ্যঁ রেনোয়ার ‘দ্য রিভার’

0
87

সংকলন ও অনুবাদ । স্বজন মাঝি

‘এটা ছিল আমার প্রথম চুম্বন, আমি যা দিতে পারিনি’– এটি দ্য রিভার [১৯৫১] চলচ্চিত্রের প্রধান চরিত্র হ্যারিয়টের একটি স্বগতোক্তি। দ্য রিভার সম্পর্কে এক লাইনে বলতে গেলে বলতে হবে, এটি ১৩-১৪ বছর বয়সী এক কিশোরীর প্রথম প্রেম এবং বিরহের শাশ্বত ও সাবলীল চলচ্চিত্রিক কাব্য। ভারতবর্ষে এসে জ্যঁ রেনোয়ার [১৮৯৪-১৯৭৯] বানানো একমাত্র চলচ্চিত্র এটি। ইংরেজি ভাষার চলচ্চিত্র হলেও, এটি পুরোপুরি পূর্বভারতীয় আবহে, আরও সুনির্দিষ্ট করে বললে, মূলত বাংলা সংস্কৃতির রঙ ও গন্ধে ভরা। চলচ্চিত্রের শুরুর দৃশ্যেই নদী, নৌকা, মাঝিমাল্লা এবং পূর্ববঙ্গীয় গানের সুর। কলকাতার এক সাহেবী পরিবারের গল্প বলা হলেও, এখানে ভারতীয় চলচ্চিত্র ভাষার বৈশিষ্ট্যসূচক নিদর্শন বিদ্যমান। যদিও জ্যঁ রেনোয়ার সাথে আমার প্রথম পরিচয় ঘটে ‘দি রুলস অব দা গেম’ (১৯৩৯)-এর সূত্র ধরে। পরবর্তীকালে জানতে পারলাম দ্য রিভার-এর কথা। কোনো এক অগ্রজের কাছে শুনেছিলাম, রেনোয়া এই চলচ্চিত্রের লোকেশন খুঁজতে আমাদের নারায়ণগঞ্জের শীতলক্ষ্যা নদীতে ঘুরে গেছেন। তিনি শীতলক্ষ্যা নদী পছন্দও করেছিলেন, কিন্তু শুটিং ইউনিটের জন্য যথাযথ আবাসন ব্যবস্থার অভাবে এখানে দৃশ্যধারণ করা হয়নি। পরবর্তীকালে দৃশ্যধারণ করেছেন কলকাতার নিকটবর্তী গঙ্গায়।

জ্যঁ রেনোয়া দুনিয়ার সবচেয়ে প্রভাবশালী চলচ্চিত্র নির্মাতাদের একজন। বিশ্বব্যাপী সত্যজিৎ রায় থেকে মার্টিন স্করসেজি, অসংখ্য মহান নির্মাতা রেনোয়ার কাজে প্রভাবিত। ২০১৪ সালে প্রকাশিত, দ্য রিভার প্রসঙ্গে মার্টিন স্করসেজির এক সাক্ষাৎকারে চলচ্চিত্রটি সম্পর্কে দারুণ পাঠ উঠে এসেছে। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছিলেন রেনোয়ার আরেক ভক্ত মার্কিন নির্মাতা ওয়েস এন্ডারসন। এন্ডারসন নিজেও দ্য রিভার প্রভাবিত হয়ে ভারতে এসে দ্য দার্জেলিং লিমিটেড নির্মাণ করেছেন। অন্যদিকে নতুন করে মার্টিন স্করসেজির পরিচয় দেয়ার কিছু নাই; ট্যাক্সি ড্রাইভার (১৯৭৬) নির্মাণ করে কান চলচ্চিত্র উৎসব থেকে ‘পাম দি’অর’ অর্জন করেন। সিসিলিয়ান-আমেরিকান এই নির্মাতা ‘নব্য হলিউড তরঙ্গ’-এর অন্যতম প্রবক্তা।

জ্যঁ রেনোয়া
জ্যঁ রেনোয়া
দ্য রিভার-এর শুটিংয়ে

প্রসঙ্গ ‘দ্য রিভার’ : মার্টিন স্করসেজির বয়ান

তখন আমার নয় বছর বয়স। এই গল্প আমি অনেকবার করে ফেলেছি : শৈশবে আমার মারাত্মক এজমার সমস্যা ছিল; তাই বাবা-মা সিনেমা দেখতে গেলে, আমাকে বাড়িতে একা না রেখে সঙ্গে নিয়ে যেতেন। এমনই শৈশবে মাত্র নয় বছর বয়সে, একদিন বাবা আমাকে দ্য রিভার দেখাতে নিয়ে গেলেন। তিনি বেশির ভাগ সময় আমাকে ওয়েস্টার্ন, ওয়ার কিংবা মিউজিক্যাল ঘরনার চলচ্চিত্র দেখাতেন, এমনকি মাঝেমধ্যে কিংবদন্তিতুল্য চলচ্চিত্রও দেখতেন। এখন তো ভাবতেই অবাক লাগে, আমার বাবা, যিনি প্রায় চল্লিশ বৎসর ধরে বস্ত্রপল্লীতে কাজ করছেন, এমন একজন সাধারণ মানুষ, আমাকে দ্য রিভার-এর মতো মহান চলচ্চিত্র দেখতে নিয়ে গেলেন।

দ্য রিভার ছিল আমার জীবনে প্রথম কোনো গঠনমূলক চলচ্চিত্র দেখার অভিজ্ঞতা। আমি সবসময় আপনাদের কাছে কিছু ভালো চলচ্চিত্রের নাম জপে থাকি, কিন্তু এই চলচ্চিত্রটি সেসব থেকে সম্পূর্ণ আলাদা এবং অনন্য। বিশেষ করে এর রঙের ব্যবহার নিয়ে কথা না বললেই নয়। আমি তো বলব এটি এবং দ্য রেড সুজ [১৯৪৮] এযাবৎ নির্মিত সবচেয়ে সুন্দর দুটি রঙিন চলচ্চিত্র। তবে আমি মনে করি এই ভালোলাগার মধ্যে অন্য কোনো ব্যাপার রয়েছে। কেননা, কোনো ভিনদেশি জীবন-সংস্কৃতি দেখার ক্ষেত্রে দ্য রিভার ছিল আমার জন্য প্রথম অভিজ্ঞতা। আমি বলতে চাইছি, তখন পর্যন্ত আমার দৌড় ছিল ইতালিয়ান সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে, বা তার অধিক ইতালিয়ান-আমেরিকান অথবা সিসিলিয়ান-আমেরিকান সংস্কৃতির চলচ্চিত্র পর্যন্ত সীমিত। সে সময় ইতালিয়ান নব্যবাস্তবতাবাদের চলচ্চিত্রও দেখেছি। এসবের বাইরে ভিন্ন কোনো জীবন-সংস্কৃতি জানা ছিল না।

জ্যঁ রেনোয়া
দ্য রিভার
ফিল্মমেকার । জ্যঁ রেনোয়া

এখানে জানিয়ে রাখা ভালো, দ্য রিভার ছিল ভারতবর্ষে ধারণকৃত প্রথম রঙিন চলচ্চিত্র। নির্মাতা জ্যঁ রেনোয়ার জীবনেও টেকনিকালার ফিল্মে প্রথম রঙিন চলচ্চিত্র এটি। তখন আমি রেনোয়ার নাম জানতাম না, এমনকি সেসময় আমার পরিবারের কেউ তাকে চেনার কথা না। তবে যেহেতু নয় বছর বয়সে তখন সেন্ট প্যাট্রিক্স চার্চ স্কুলে লেখাপড়া করি, আমার স্পষ্ট মনে আছে, পোস্টকার্ডে প্রথমবারের মতো কিছু চিত্রকর্ম দেখেছিলাম। এরমধ্যে ভ্যান গগের বিখ্যাত চিত্রকর্ম স্ট্যারি নাইট এবং আরেকটা চিত্রকর্ম, যেখানে উনবিংশ শতকের শেষদিকের প্রেক্ষাপটে বনভোজনের পোশাকে একজন সুন্দরী নারী ও বাচ্চা মেয়ের ছবি ছিল। খুবই ঐশ্বর্য ভরা সে ছবি এবং চিত্রকরের দরদী কাজ! সেখানে আমি রেনোয়ার নাম দেখি। কিন্তু চলচ্চিত্রটি দেখার পরেও ওই চিত্রকর্মের সাথে রেনোয়ার সম্পর্ক আমার কাছে স্পষ্ট হতো না, যদি না এর কিছুদিনের মধ্যে, আমি মিউজিয়ামে গিয়ে রেনোয়ার পেইন্টিং দেখার সুযোগ না পেতাম। সেখানে জ্যঁ রেনোয়ার বাবা পিয়ের অগাস্ট রেনোয়ার [১৮৪১-১৯১৯] চিত্রকর্ম দেখেছিলাম। আমার মনে হয়, দ্য রিভার-এর রঙ আমাকে এই চিত্রকর্মগুলোর প্রতি আকৃষ্ট হতে উস্কানি দিয়েছিল এবং চলচ্চিত্রের চরিত্রগুলোর জীবনসংস্কৃতিও আমাকে আকৃষ্ট করেছিল।


শেষ পর্যন্ত
চলচ্চিত্রটি ঔপনিবেশিক
দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখানো হোক
বা না-হোক, এর মোদ্দাকথা হলো :
এখানে এক ধরনের সার্বজনীন
মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি
প্রকাশ পেয়েছে

একজন পশ্চিমা মানুষ হওয়া সত্ত্বেও আমার কিন্তু এই চলচ্চিত্রের কোনো কিছু বুঝতে অসুবিধা হয়নি। রেনোয়ার আত্মজীবনীতে রয়েছে, ভারতীয়রা ভেবেছিল, এটি ভারতীয় চলচ্চিত্র হওয়ার চেয়ে পশ্চিমা চলচ্চিত্র হওয়া ভালো, কারণ তারা ভেবেছিল পশিমারা ভারতের হয়ে কাজটা করতে পারবে না। এখনও অনেকেই চলচ্চিত্রটি দেখে বলে, এটি এর ঔপন্যাসিক রুমের গডিনের [১৯০৭-১৯৯৮] ঔপনিবেশিক দৃষ্টিভঙ্গি। শেষ পর্যন্ত চলচ্চিত্রটি ঔপনিবেশিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখানো হোক বা না-হোক, এর মোদ্দাকথা হলো : এখানে এক ধরনের সার্বজনীন মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ পেয়েছে। এখানে মূলত একজন কিশোরীর বয়ঃসন্ধিকালের গল্প বলা হয়েছে, যা অনেক বেশি সার্বজনীন ব্যাপার। নিউইয়র্ক সিটির অনগ্রসর এলাকার নয় বছরের শিশু হিসেবে আমি যদি দ্য রিভার-এর সঙ্গে একাত্ম হতে পারি এবং এর চরিত্রদের অনুভব করতে পারি, তবে আমার ধারণা এটির ভিনদেশি সাংস্কৃতিক আচরণ কারও কাছে সাবলীল মনে হওয়াটা অস্বাভাবিক হবে না। যদিও এটাতে দুর্বোধ্য অনেক ব্যাপারস্যাপার রয়েছে।

এই যে দুর্বোধ্য হওয়া সত্ত্বেও এর ভিন্ন সংস্কৃতি আপনার বোধগম্য হচ্ছে, এর কারণ আপনি ধরতে পারছেন পৃথিবীর এক এক জায়গার মানুষ একেকভাবে একই রকম জীবনযাপন করে। দ্য রিভার এই সার্বজনীন বোধগম্যতা তৈরি করতে পেরেছে বলেই আমার কাছে সেই বয়সে চলচ্চিত্রটি ভালো লেগেছিল। এই ধরনের একটা চলচ্চিত্র আমি আগে কখনো দেখি নাই। এটি এমন একটি চলচ্চিত্র, যা কি-না একটা নদী নিয়ে। যেখানে গঙ্গার বহতা চিত্রসমূহ এর কাহিনিকে প্রবাহিত করে চলে– যা জীবনের মধ্যে আটকে যায়, যা বয়:সন্ধিকালের জীবন্ত কথা বলে, ১৩-১৪ বছর বয়সী একটি মেয়ের উৎকণ্ঠার কথা বলে। যে উৎকণ্ঠার মধ্যে আবার এক ধরনের সৌন্দর্য থাকে। থাকে নানা রকম জটিলতা। যাকে বলে ১৩-১৪ বছ বয়সের বালাই। আমার মনে হচ্ছিল আমি চলচ্চিত্রের চরিত্রদের সঙ্গে বসবাস করছি।

জ্যঁ রেনোয়া
দ্য রিভার
ফিল্মমেকার । জ্যঁ রেনোয়া

চলচ্চিত্রটি আমার কাছে এতোটা ভালো লাগার আরেকটা কারণ, এর কাহিনিরীতি প্রথাগত নয়, একদম অন্যরকম। এই চলচ্চিত্রে বাস্তবিকতার প্রামাণ্যকরণ, যা আমার দেখা অন্য সব চলচ্চিত্রের চেয়ে আলাদা। চল্লিশের দশকের শেষে এবং পঞ্চাশের দশকের শুরুতে টেলিভিশনে আমি ভারতবর্ষের প্রেক্ষাপটে আরও চলচ্চিত্র দেখেছি, যেমন ভারতভাগের [১৯৪৭] ওপর প্রামাণ্যচিত্র বা রবার্ট ফ্লাহার্টির [১৮৮৪-১৯৫১] এলিফেন্ট বয় [১৯৩৭]। দ্য রিভার-এর শুরুর দৃশ্যে যখন বহতা নদী, নদীতে বহমান নৌকা, নৌকায় কর্মরত মাঝিদের দেখি এবং মাঝিদের গান শুনি, তখন এই চলচ্চিত্রে বাস্তবিকতার প্রামাণ্যকরণের দিকটা টের পাই। এখানে সমগ্র চলচ্চিত্রজুড়ে প্রামাণ্যদৃশ্যের সঙ্গে কাহিনিদৃশ্যের সংমিশ্রণ লক্ষনীয়। এর সঙ্গে যুক্ত করে বলতে চাই, দ্য রিভার আমার কাছে এ বিশেষ হওয়ার মূল কারণ, এর টেকনিকালার উপস্থাপনা। আপনারা জেনে থাকবেন, টেকিনিকালারের ক্ষেত্রে অগুরুত্বপূর্ণ ক্ষুদ্র-ক্ষুদ্র অনেক রঙ হারিয়ে যায়, শুধু লাল, সবুজ ও নীল রঙ প্রাধান্য পায়; ফলে এই চলচ্চিত্রে ভূচিত্র ধারণের বেলায় বাংলার গাছগাছালির সবুজ রঙ অনেক বেশি গুরুত্ব পেয়েছে। সুতরাং আমি বলতে চাইছি, প্রথমবারের মতো রঙিন চলচ্চিত্র নির্মাণ করতে গিয়ে রেনোয়া রঙকে একটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র হিসেবে ব্যবহার করেছেন। সন্দেহ নেই, ভূচিত্র ধারণ করতে গিয়ে নির্মাতা চিত্রকলার ছাপ রেখেছেন। একটু লক্ষ্য করলে বুঝতে পারবেন, এই চলচ্চিত্রের বেশ কিছু বিশেষ দৃশ্য ধারণ করতে গিয়ে রেনোয়া তার বাবার চিত্রকলাকে অনুসরণ করেছেন। বিশেষ করে ঘুমন্ত বাচ্চা মেয়ে দুটির দৃশ্য ধারণ করতে গিয়ে তিনি না-কি তার বাবার একটি চিত্রকর্মের হুবুহু অনুসরণ করতে শুটিংয়ে অনেক সময় নিয়েছিলেন।

এ চলচ্চিত্রের অভিনয় শৈলীতে নতুনত্ব লক্ষ করা যায়, যা অন্যান্য চলচ্চিত্র থেকে আলাদা। এখানে অভিনয় শিল্পীদের অনেকেই অপেশাদার। নোরা সোইনবার্ন [১৯০২-২০০০] ও আর্থার শিল্ডের [১৮৯৬-১৯৭০] মতো পেশাদার শিল্পীদের সঙ্গে অপেশাদার অভিনয় শিল্পীদের অসাধারণ সংমিশ্রণ ঘটানো হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ টমাস ব্রেনের [১৯২৪-২০০০] কথা বলব, যিনি ক্যাপ্টেন চরিত্রে অভিনয় করেছেন, তিনি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে একটা পা হারানো লোক। এই চলচ্চিত্রে অভিনেতা হিসেবে তার উপস্থিতি খুবই লক্ষনীয়; কারণ চলচ্চিত্রে তাকে যেমন পা হারানো ক্যাপ্টেন হিসেবে দেখানো হচ্ছে, বাস্তবিক জীবনেও তিনি যুদ্ধে পা হারিয়েছেন। সুতরাং চলচ্চিত্রে তার উপস্থিতিটা অনেক বেশি বাস্তবিক; সাধারণ পেশাদার অভিনেতার মতো নয়।

জ্যঁ রেনোয়া
দ্য রিভার
ফিল্মমেকার । জ্যঁ রেনোয়া

এখানে হ্যারিয়টের শেষের দিককার পাগলপনা ছাড়াও দুটি সাংঘাতিক দৃশ্য রয়েছে। প্রথমটি হচ্ছে, ক্যাপ্টেনকে ঘিরে হ্যারিয়ট এবং ভ্যালেরির বিবাদপূর্ণ একটি দৃশ্য, যেখানে দুজন বসা থেকে উঠছে। দ্বিতীয়টি ভ্যালেরির সঙ্গে রিং খেলার সময় ক্যাপ্টেনের পা পিছলে পড়ে যাওয়ার দৃশ্য। অনেক দিন ধরে এটা ছিল আমার দেখা সবচেয়ে ধাক্কা দেওয়ার মতো চলচ্চিত্র দৃশ্য। এখানে হ্যারিয়ট ও ভ্যালরির দ্বন্দ্ব ক্যাপ্টেনকে ঘিরে, সেই অন্তর্গত বিবাদ আপনি অনুভব করতে পারবেন। একজন নয় বছরের বালক হওয়া সত্ত্বেও আমি সব বুঝতে পেরেছিলাম। আমি দুই তরুণীর উত্তেজনাটা টের পাচ্ছিলাম। আমি জানতে চাইছিলাম এই প্রণয়ঘটিত বিবাদে কে হারবে আর কে জিতবে। এটুকু বোঝার মধ্যে আমার সমস্ত রোমাঞ্চ কাজ করছিল। কিন্তু শেষে এর সমাধান হয়েছিল একটা মনোকষ্টের মধ্য দিয়ে– লোকটার একটা পা নেই। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আপনি আরও জানতে এবং সবকিছু উপলব্ধি করতে থাকবেন।

এই চলচ্চিত্রের সবচেয়ে হৃদয়-বিদারক জিনিস হচ্ছে ক্যাপ্টেনের সঙ্গে ভ্যালেরির চুম্বন দৃশ্যটি! এটা বুঝতে পারলাম যখন হ্যারিয়েট বলল, ‘এটা ছিল আমার প্রথম চুম্বন, আমি যা দিতে পারিনি’। নয় বছর বয়সে আমি এটা যৌনগতভাবে না বুঝলেও হৃদয়গতভাবে বুঝতে পেরেছিলাম।


জীবনে
যেমন সবকিছু
শেষ হয়ে যাওয়ার
পরও আবার কিছু একটা
শুরু হয়, এই চলচ্চিত্রের পালাবদলও
জীবনের মতো
বয়ে চলে

এই চলচ্চিত্র এত আগ্রহোদ্দীপক হওয়ার কারণ এটি অনেকটা নদীর মতো বহতা, জীবন যেভাবে নিরন্তর বয়ে চলে। এটা জীবনের মতো সরল এবং সুন্দর; জীবনে যেমন সবকিছু শেষ হয়ে যাওয়ার পরও আবার কিছু একটা শুরু হয়, এই চলচ্চিত্রের পালাবদলও জীবনের মতো বয়ে চলে। এই চলচ্চিত্র দেখে আমি সবচেয়ে বড় ধাক্কা খেলাম, যখন দেখলাম বাচ্চা ছেলেটি সাপ নিয়ে খেলা করছে! নিষ্পাপ শিশুটি গাছের আড়াল থেকে একটা সাপকে বের হতে দেখছে। এখানে সাপটা অশুভ সত্তার প্রতীক; যেমন আমাদের চারপাশে নানা অশুভ মানুষ রয়েছে, সাপটা তাদেরই মতোন। এই অব্দি আমার ভালোই লাগছিল। কিন্তু যখন বাচ্চা ছেলেটার মৃতদেহ পড়ে থাকতে দেখলাম, ওই মৃত্যুটা মেনে নিতে পারিনি। আমি ভাবতেই পারিনি এমন কিছু ঘটবে। দ্য রিভার চলচ্চিত্রে রেনোয়া গঙ্গার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য এবং একটি সুন্দর পারিবারিক আবহ উপস্থাপনের পাশাপাশি এরকম একটি অপ্রীতিকর মৃত্যু দৃশ্য উপস্থান করে বৈপরীত্য পয়দার ক্ষেত্রে দুর্দান্ত মুন্সিয়ানা দেখিয়েছেন। সুন্দর এবং অসুন্দরের এই সংমিশ্রিণ আসলেই অসাধারণ, প্রশংসনীয়।

জ্যঁ রেনোয়া
দ্য রিভার
ফিল্মমেকার । জ্যঁ রেনোয়া

মেলেনি যে চরিত্রটা, যাকে রাধার ভূমিকাতেও দেখা গেছে এখানে, তার কথা বলা ও চলাফেরা খুবই মানসই। আমার কাছে বা আমেরিকান দর্শক, এমনকি ইংল্যান্ডের দর্শকদের কাছেও এসব ভারতীয় সংস্কৃতি অদেখা ছিল। এই মেলেনি আধা-আমেরিকান, আধা-ভারতীয়। তার দ্বিধা এবং দ্বন্দ্বের অনুভূতির মধ্যে দিয়ে আপনি এক ধরনের আবেগঘন ও নাটকীয় সমাধন অনুভব করতে পারবেন। আসলে এর ভিতর দিয়ে জীবনের কোনো একটা জায়গায় আপনি নিস্তার অনুভব করবেন। যেমন, একজন সিসিলিয়ান-আমেরিকান হিসেবে আমি নিজের সাথে মিল খুঁজে পাই। কৃষ্ণ অবতারের সেই স্বপ্নদৃশ্যটি, সেই গীত-নৃত্য আমার কাছে একদম নতুন, খুব মনোমুগ্ধকর ছিল। যেভাবে এই নৃত্যদৃশ্য সম্পাদনা করা হয়েছে, সেসময়ের প্রেক্ষিতে সেটি সত্যিই খুব অগ্রসরমান। এমনকি যেভাবে লাগাতার দৃশ্যধারণ [লং-টেক] কৌশল ব্যবহার করে দৃশ্যটি একই জায়গায় দাঁড়িয়ে নিরবিচ্ছিন্নভাবে ধারণ করা হয়েছে, এটিও সে সময়েরই তুলনায় ভীষণ আধুনিক চলচ্চিত্র প্রচেষ্টা। যদি ভালোভাবে লক্ষ্য করেন, দেখবেন, এই লাগাতার দৃশ্যে কোনো ডলি ব্যবহার না করে শুধু সামান্য প্যা্নিংয়ের মাধ্যমে রাধাকে নাচের মধ্য দিয়ে আগপিছ করে অদ্ভুত মিজঁসিন তৈরি করা হয়েছে। এখানে প্রায় সমগ্র সময়টা জুড়ে রাধাকে আপাদমস্তক দেখা গেছে, যদিও মাঝে কৃষ্ণকে বারদুয়েক সুপারইম্পোজ করা হয়েছে। তবে রাধার সমগ্র নাচটা একটানা ধারণকৃত। সবকিছু মিলিয়ে অসাধারণ জাদুকরী একটি দৃশ্য।

জ্যঁ রেনোয়ার জীবনী থেকে জানা যায়, তিনি রুমের গডেনের দ্য রিভার উপন্যাসের ওপর একটি সমালোচনামূলক লেখা পড়বার পর এই চলচ্চিত্র নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেন। জীবনী থেকে আরও জানা যায়, হলিউডফেরৎ সেই সময়ে রেনোয়া রিভার বানানোর জন্য প্রযোজকদের কাছে ধর্ণা দিয়ে বেড়াচ্ছেন। পিটার বগদানোভিচ না পড়লে আমি জানতাম না, রেনোয়া তখন হলিউডে কাজ পাচ্ছিলেন না এবং হলিউড তার কাজের ধরন পছন্দ করছিল না। এমন একটা সময়ে রেনোয়া ভারতবর্ষে গিয়ে একটি চলচ্চিত্র বানাতে চাইছেন, যা হবে রঙিন। এক বয়ঃসন্ধির মেয়েকে নিয়ে চলচ্চিত্র এবং এই চরিত্রে নামকরা যেকোনো অভিনেত্রী, এবং ক্যাপ্টেন জন চরিত্রের জন্য মার্লন ব্র‍্যান্ডোর মতো বিরাট তারকা অভিনেতাকে পাওয়া যেত। কিন্তু এসবের কিছুই ঘটেনি। প্রযোজক কেনেথ ম্যাকেলডোনি দ্য রিভার-এর প্রেমে পরার আগ পর্যন্ত রেনোয়া ভেবেছিলেন, এই চলচ্চিত্রটি বোধহয় আর করা হবে না। পরে রেনোয়াকে এটি বানানোর জন্য কেনেথ টাকা যোগাড় করে দিয়েছিলেন, যদিও হলিউড তারকা পোষবার মতোন তাদের হাতে অত অর্থ ছিল না। এরপরের ঘটনা সবার জানা, তারা একটা নিরীক্ষামূলক চলচ্চিত্র বানালেন, প্রথমবারের মতোন কোনো নিরীক্ষামূলক চলচ্চিত্র বাণিজ্যিক সফলতাও পেল।

 জ্যঁ রেনোয়া
দ্য রিভার
ফিল্মমেকার । জ্যঁ রেনোয়া

আমার শৈশব অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, দুনিয়াব্যাপি যেকোনো শিশু-কিশোর-তরুণ দ্য রিভার পছন্দ করবে। যেহেতু আমি বাবার সঙ্গে বসে চলচ্চিত্রটি দেখেছিলাম, এটির পারিবারিক বন্ধন আমাকে খুব সুখকর অনুভুতি দিয়েছিল। এরপর পঞ্চাশের দশকে সেই অসাধারণ ঘটনাটি ঘটল, দ্য গ্রান্ড ইলুশন-এর [১৯৩৭] ডিউপ নেগেটিভ উদ্ধার হলো, যার মূল নেগেটিভটি অনেক আগেই নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। এ সময় রেনোয়ার এই চলচ্চিত্রটি বিশ্বব্যাপি নতুনভাবে মুক্তি পেয়েছিল। আমি বলব ওই সময় দ্য গ্র‍্যান্ড ইলুশন চল্লিশ-পঞ্চাবার দেখেও আমি কিছুই বুঝতাম না, যদি-না রেনোয়ার দ্য রিভার দেখতাম। তবে দ্য গ্রান্ড ইলুশন-এ কিছু বিষয়, যেমন : পিয়েরে ফ্রেসনে [১৮৯৭-১৯৭৫] ও ভন স্ট্রহাইমের [১৮৮৫-১৯৫৭] মতো মহান মানুষের উপস্থিতি এবং চলচ্চিত্রটির প্রগাঢ় বিষণ্নতার দিকটি আমার জন্য গুরুত্বপূর্ণ এবং স্মরণীয়।

পরে আমি যখন ফরাসি চলচ্চিত্র নিয়মিত দেখা শুরু করি, সে সময় রেনোয়ার আরেক বিখ্যাত চলচ্চিত্র রুলস অব দ্য গেম [১৯৩৯] দেখি, যা প্রথমে আমার মাথার ওপর দিয়ে গেছে! ফরাসি মধ্যবিত্ত পরিবারের চাকরদের আচার-আচরণ বুঝতে আমাকে বেশ বেগ পেতে হয়েছিল। আমি চলচ্চিত্রটি দেখে মজা পেয়েছিলাম, কিন্তু বুঝে উঠতে পারিনি– কেন এটা এত বিখ্যাত। এর চরিত্রদের সঙ্গে আমি মোটেও পরিচিত ছিলাম না। এই চলচ্চিত্রের প্রেক্ষাপটে আমি পুরোপুরি আগুন্তুক ছিলাম, তাই বুঝতে অসুবিধা হচ্ছিল। কিন্তু ওই জগৎটা বুঝবার চেষ্টা করেছি, যা ছিল প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অন্তর্বর্তীকালীন একটা প্রেক্ষাপট। পরে বুঝেছি, এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ চলচ্চিত্র।

মার্টিন স্করসেজি

রেনোয়া আমাকে অনুপ্রাণিত করেছেন। তিনি যে ধরনের কাজ করতেন, সেগুলো আমাকে চলচ্চিত্র নির্মাতা হতে উৎসাহিত করেছে। আমি বলতে চাইছি, গুডফেলাস-এ [১৯৯০] কুইন্সের পানশালায় গোলাগুলি হচ্ছে– এমন কিছু নির্মাণে আমাকে আগ্রহী করেনি, বরং জীবনব্যাপি প্রতিনিয়ত প্রেরণা জুগিয়েছে বারবার উঠে দাঁড়াতে, এভাবে তার কাজ আমাকে চলচ্চিত্র নির্মাণের তাগাদা দিয়েছে। তার কাজের যে বিশুদ্ধতা এবং যে বোধ দিয়ে তিনি মানুষকে বুঝতেন, বোঝাপড়ার ভেতর দিয়ে বোধের আদান প্রদান করতেন, যেভাবে মানুষজনের সান্নিধ্যে যেতেন, যেভাবে অভিনেতা-অভিনেত্রীদের পরিচালনা করতেন, সেই জায়গা থেকে আমি অনুপ্রেরণা পেয়েছি।

একটা কথাই বলতে পারি, জ্যঁ রেনোয়ার চলচ্চিত্রের মরণ নাই, তিনি অনন্তকাল বেঁচে থাকবেন।

Print Friendly, PDF & Email
শেয়ার
ইনডিপেনডেন্ট ফিল্মমেকার; বাংলাদেশ ।। শর্টফিল্ম : অঙ্কুরোদগম [২০১৫]; গল্প-সংক্ষেপ [২০১৮]; জীবাশ্মজন [২০১৯] ।। ডকুফিল্ম : উজান যাত্রা [২০১৩]; ঘোড়ার অঙ্গে ময়ূরপাখা ও মানুষের মুখ [২০১৮]; প্রত্যর্পণ [২০১৯]।। প্রথম ফিচার ফিল্মের কাজ করছেন

মন্তব্য লিখুন