প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়ের ‘দেবী’ গল্পের চলচ্চিত্রায়ন: একটি বিশ্লেষণ

4014
সত্যজিৎ রায়

লিখেছেন: বিশ্বজিৎ মণ্ডল


দেবী
ফিল্মমেকার; স্ক্রিনরাইটার; প্রডিউসার: সত্যজিৎ রায়
মূল গল্প: প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়
সিনেমাটোগ্রাফার: সুব্রত মিত্র
মিউজিক: ওস্তাদ আলী আকবর খান
এডিটর: দুলাল দত্ত
কাস্ট [ক্যারেকটার]: শর্মিলা ঠাকুর [দয়াময়ী]; ছবি বিশ্বাস [কালীকিঙ্কর রায়]; সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় [উমাপ্রসাদ]; অনিল চট্টোপাধ্যায় [ভুদেব]; করুণা বন্দ্যোপাধ্যায় [হারাসুন্দরী]
রানিংটাইম: ৯৩ মিনিট
ভাষা: বাংলা
দেশ: ভারত
রিলিজ: ১৯ ফেব্রুয়ারি ১৯৬০


দেবী। ফিল্মমেকার: সত্যজিৎ রায়

সত্যজিৎ রায় ওনার চলচ্চিত্র জীবনে হিন্দু ধর্মের কুসংস্কারাচ্ছন্ন দিকটির রূপায়ন ঘটিয়েছেন দুটি চলচ্চিত্রের মাধ্যমে; প্রথমটি দেবী, দ্বিতীয়টি কাপুরুষ। একটিতে আছে হিন্দু অবতারবাদ, মানবত্বের ওপর দেবিত্ব আরোপের শোচনীয় এক আলেখ্য; অন্যটিতে ধর্ম ব্যবসায়ীর ভণ্ডবৃত্তির মুখোশ উন্মোচন। এই প্রবন্ধে মূলত প্রভাতকুমারের দেবী গল্পটির চলচ্চিত্রায়ন নিয়ে কথা বলব। মূল গল্পের সঙ্গে তুলনামূলক বিশ্লেষণ এবং সমকালীন কুসংস্কার-বিরুদ্ধ যে পরোক্ষ প্রতিবাদ আছে, তারই আলোকপাত এ প্রবন্ধে।

প্রথমেই আসি গল্পের মূল বিষয়বস্তু প্রসঙ্গে। গল্পের উপজীব্য বিষয় হলো হিন্দু অবতারবাদের ভেতরের অমানবিক ও অবৈজ্ঞানিক চেহারার উদ্ঘাটন এবং তার সর্বনাশা ভয়ঙ্কর দেওলিয়াপনার দিকটি খোলসা করা। চলচ্চিত্রে এই ভাবই অক্ষুণ্ণ। তবে অমিতাভ চট্টোপাধ্যায় মনে করেন, ধর্মীয় কুসংস্কারের সমকালীন রূপটির বিরুদ্ধে রচিত হয়নি এটি। গল্পের বিষয়বস্তু অবশ্যই প্রশংসাযোগ্য; কিন্তু এই অবতারবাদের যে চেহারা, তা ফেলে আসা সময়ের। বর্তমান সময়ে একজন মানুষ নিজেকে ঐশ্বরিক ক্ষমতাবান বলে প্রতিষ্ঠিত করছে, ধর্মের নামে ভন্ডামি করছে। মোহান্ধ ভক্ত নিজের আর্থিক সামর্থ্য নিয়ে তাদের কাছে ধরা দিচ্ছে এবং নিজের সঙ্গে পরিবারের এমনকি দেশেরও সর্বনাশ করছে। এটাই আজকের হিন্দু অবতারবাদ। অবশ্য মূল গল্পের বিষয়বস্তুর চলচ্চিত্রায়ন এই কথা ধরে নিলে কোনো মতভেদ থাকে না। আর সমকালীনতা সেই অর্থে না থাকলেও হিন্দু ধর্মের এই কুসংস্কারাচ্ছন্ন দিক নানাভাবে আজও সমাজে খুঁজে পাওয়া যাবে।

গল্পের শুরুতেই দেখি দয়াময়ী ও উমাপ্রসাদের কথোপকথন। ভোরবেলা মিঠে সূর্যের আলোর স্পর্শে একে অপরে প্রেমালাপ জমেছে। প্রতিদিন খোকা ঠিক এই সময়ে চলে আসে; কিন্তু আজকে দেরি হচ্ছে। তাই দয়াময়ীর উদ্বেগ কম নয়। মূল গল্পে এই স্থলে খোকার পরিচিতি এবং কাকিমা খোকার মধুর সম্পর্কের বর্ণনা আছে।

খোকা এলো না, তাই দুজনে গল্প করতে করতে নিদ্রামগ্ন। হঠাৎ কালীকিঙ্কর ‘উমা…’ বলে কম্পিত কণ্ঠে ডেকে উঠল। দরজা খুলে উমাপ্রসাদ দেখল, ‘পিতার পরিধানে রক্তবরণ কৌষের বস্ত্র স্কন্ধে নামাবলি উত্তরীয় গলে রুদ্রাক্ষমাল্য লম্বমান।’ বৌমাকে দেখামাত্র পদতলে সাষ্টাঙ্গে প্রণিপত করলেন। মা জগন্ময়ী কৃপা করে ছোটবৌমার মূর্তিতে গৃহে আবির্ভূত হয়েছেন! দয়াময়ীর মানবী থেকে দেবিত্বে উত্তরণ ঘটল।

দেবী

চলচ্চিত্রের শুরুতে প্রতীকের ব্যবহার বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। একটি মাটির তৈরি প্রতিমার সাদা চক্ষুহীন মুখমন্ডল, তাতে ধীরে ধীরে চক্ষুদান করা হচ্ছে। মুখমণ্ডল সজ্জিত করে দেবিত্ব আরোপ করে আরাধনার জন্য তৈরি দেবী। শুরুতেই পরবর্তীকালে দেবীত্ব আরোপিত হওয়ার বিষয়টি স্পষ্ট করলেন এই প্রতীকী রূপায়নে।


ছাগশিশু
বলিদানে উদ্যত
খড়গের ঠিক পরেই
কোমল শিশুকণ্ঠের কান্না
ভবিষ্যতের অঘটনের ইঙ্গিত দেয়

কালীকিঙ্করের গ্রামের মন্দিরে পুজোর উৎসব। আকাশে আতশবাজি ফুটছে। সহসা শিশুকণ্ঠের কৌতূহলী প্রশ্ন। সে প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছে উমাপতি। পাশে দয়াময়ী দাঁড়িয়ে; কাকার কাঁধে চড়ে শিশুটি আতসবাজি খেলা দেখছে। এইভাবেই গল্পের তুলনায় একটু ভিন্নভাবে চারজন চরিত্রের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলেন সত্যজিৎ রায়। এখানেই আরেকটি প্রতীকের ব্যবহার রয়েছে। ছাগশিশু বলিদানে উদ্যত খড়গের ঠিক পরেই কোমল শিশুকণ্ঠের কান্না ভবিষ্যতের অঘটনের ইঙ্গিত দেয়। শিশুটিও যে একসময় ধর্মান্ধতার যূপকাষ্ঠে বলি হবে, এ তারই পূর্বাভাস।

এরপরেই গল্পের অঙ্কিত সেই ভোরবেলার দৃশ্য। তবে সেই ভোরেই কালীকিঙ্কর দয়াময়ীর কাছে আসে না। শুধু আছে সকালবেলা দয়াময়ী পুজোর ঘরে পুজো করছে আর কালীকিঙ্কর একতলা বারান্দায় পদচারণে ব্যস্ত। নেপথ্যে এক পথভিখারির কণ্ঠে শ্যামাসংগীত। কালী ভক্তির এক নিখুঁত পরিবেশের রূপদান চলচ্চিত্রের ভোরবেলাতে। কালীকিঙ্কর পুজোর ঘরে এসে পুজোতে মনোনিবেশ করে।

এরপরের দৃশ্যেই গল্পের বর্ণিত খোকা-কাকিমার স্নেহ সম্পর্কের চিত্রায়ন পাই। গল্পে আছে, ‘কাকীমা গা না মুছাইয়া দিলে খোকা গা মুছে না, কাকীমা কাজল পরাইয়া না দিলে খোকা কাজল পরে না, কাকীমার কোলে ভিন্ন অন্য কোথাও শুইয়া খোকা দুধ খায় না।’ এর পরিচিতি চলচ্চিত্রেও পাই। তা ছাড়া খোকা ঘুম থেকে উঠে ভোরবেলাতে কাকিমার কাছে যায়, তারও দৃশ্যায়ন দেখি।

দেবী

পরের দৃশ্য কালীকিঙ্কর আরামকেদারায় শয়ান; দয়াময়ী পায়ে তেল মালিশ করছে। কালীকিঙ্কর পাঁচ বছর আগেকার তার স্ত্রীর কথা, স্ত্রীর মৃত্যুর পর সংসার ত্যাগ করতে চাওয়া, তারপর ছোট বউয়ের সেবা শুশ্রূষায় আটকা পড়ে আবার সংসারমুখি হওয়া ইত্যাদি কথাগুলো শোনায়। এগুলো কিন্তু মূল গল্পে নেই। এখনো কিন্তু চলচ্চিত্রে দয়াময়ীর প্রতি দেবিত্ব আরোপ হয়নি।

এর পরের আরেকটি রাত্রি বেলার দৃশ্য, খোকাকে গল্প বলে দয়াময়ী ঘুম পাড়াচ্ছে; অন্যদিকে কালীকিঙ্কর নিদ্রা যাবার আয়োজন করছে। এই রাত্রি শেষের ভোরবেলাতেই দয়াময়ীর প্রতি কালীকিঙ্করের দেবিত্ব আরোপ হবে। কালীকিঙ্কর দয়াময়ীকে প্রণাম করে এবং উমাপতিকে প্রণাম করতে বলে। এই স্থলটি চলচ্চিত্রে একটু অন্য রকম। কালীকিঙ্করের পাশে উমাপতির দাদা তারাপ্রসাদ ছিল, নেপথ্যে তারাপ্রসাদের স্ত্রীর বিস্ময় এবং ভয়। এখানে উমা নেই; কেননা গল্পে পাচ্ছি প্রথম ভোরে উমাপ্রসাদ বলে, সে পশ্চিমে চাকরি করতে যাবে।


সত্যজিৎ
রায় হাতের
পাঁচ আঙুলে
দেয়ালে আঁচড়
কাটার মাধ্যমেই
দয়াময়ীর কষ্টকে
ফুটিয়ে তুললেন

যেহেতু ঘটনাকে দুটি রাত্রির পরে এনেছেন সত্যজিৎ রায়, তাই তাকে এখানে অনুপস্থিত করে দাদা তারাপ্রসাদকে আনলেন। গল্পে পাই, ‘দয়াময়ী শ্বশুরের অদ্ভুতাচরণ দেখিয়া নিস্পন্দ ভাবে দাঁড়াইয়া রহিল।’ কিন্তু সত্যজিৎ রায় দয়াময়ীর চেহারায় একটা ভীতি, একটা গ্লানির ভাব ফুটিয়ে তুললেন। নিজেকে ছোট ও অপরাধী মনে হলো দয়াময়ীর। অসহায় এ অবস্থার কোনো অবলম্বন সে পাচ্ছে না। সত্যজিৎ রায় হাতের পাঁচ আঙুলে দেয়ালে আঁচড় কাটার মাধ্যমেই দয়াময়ীর কষ্টকে ফুটিয়ে তুললেন।

ধূপধুনো দিয়ে দয়াময়ীর পুজো আরম্ভ হলো। পুরোহিত তাকে আরতি করছে, কালীকিঙ্কর কাছে দাঁড়িয়ে। দয়াময়ী গ্রামের মন্দিরের বেদিতে নিষ্পলক ভাবলেশহীন বসে। মন্দিরে ভিড়টাও কম নয়। গল্পে বর্ণনা পাই, দূরদূরান্তের গ্রাম থেকে বহুজন দয়াময়ীরূপিণী আদ্যাশক্তিকে দর্শন করতে এসেছে। এর চিত্রায়নও পাই। এই ঘটনার পরে দয়াময়ী শুধু কাঁদে। নিদ্রা-আহার বন্ধ। সে অভিভূত, বিপর্যস্ত। দয়াময়ীর সেই চঞ্চল ষোড়শী প্রাণে হঠাৎ যেন ধ্বংসাত্বক ঝড় এসে তাকে বিমূঢ় করে দিল।

গল্পে কিন্তু উমাপতি দয়াময়ীর সঙ্গেই আছে। সে পশ্চিমে যায়নি। চারিদিকের এই অত্যাচার দয়ার সহ্য হয় না। সে জ্ঞান হারায়। চোখে-মুখে ভাঙা মনের কালিমা প্রকাশ পাচ্ছে। এই সমস্ত ঘটনার পর থেকে খোকা আর দয়াময়ীর কাছে আসে না! দয়াময়ী নিজের শয়ন কক্ষেও থাকে না। তার থাকার আলাদা ব্যবস্থা করা হয়েছে। দয়াময়ী দিদিকে অনুরোধ করে, উমাপতিকে একটা চিঠি লিখে দেবার জন্য।

দেবী

এরপর কলকাতার প্রেক্ষাপটে উমাপতিকে দেখানো হয়। সেখানে উনিশ শতকের কলকাতার সামাজিক-সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটে ঘটনাবস্তু যুক্ত হয়। উমাপ্রসাদের বন্ধু এক বিধবাকে ভালোবাসে এবং ভালোবাসার স্বীকৃতির জন্য বিদ্যাসাগরকে অস্ত্র করে তার বাবার সঙ্গে ‘ফাইট’ করবে। একখণ্ড উনিশ শতক এখানে আমরা চলচ্চিত্রে পেলাম। এই অংশ মূল কাহিনিতে নেই।

বউদির পাঠানো চিঠি পাঠপূর্বক উমাপতি ফিরে আসে। ঘটনার অনেক পরে উমাপতিকে সে খবর জানান হলো। এতে পরিসরটি যেমন বাড়ল, গল্পটাও একটু যেন গোছাল হলো। এরপর দেখা যায়, একজন তার মৃতপ্রায় ছেলেকে নিয়ে দয়াময়ীর কাছে এসেছে। দয়াময়ীর চরণামৃত খেয়ে সে সুস্থ হলো। উমাপতি সরাসরি মন্দিরে এসে সবই দেখল। দয়াময়ী অশ্রুসজল নয়নে উমাপতির দিকে চাইল।

ক্ষোভের সঙ্গে উমাপতি ভেতরবাড়ি গেল। সে বাবার কাছে এই সমস্ত বিষয়ের প্রতিবাদ করল। এই প্রতিবাদ গল্পের শুরুতেই পাই। কালীকিঙ্করের কাছে যখন শুনল, দয়াময়ী আদ্যাশক্তি রূপে আবির্ভূত হয়েছে, তখন সে কিছুই মানতে চায়নি। বিস্ময় ও রাগে কেবল বলে ওঠল, ‘আপনি পাগল হয়ে গিয়েছেন বাবা।’ কালীকিঙ্কর ক্ষণিক ভাবল। তারপর উন্মাদ যে সে নয়, তার প্রমাণস্বরূপ ছেলেবেলার কণ্ঠস্থ স্তুতি করা আবৃত্তি করতে চাইল।

কিন্তু দয়াময়ীর দেবিত্ব স্বীকার উমাপতি করে না। তবে মৃতপ্রায় ছেলেটি বেঁচে উঠলে উমাপতিরও বাকরুদ্ধ অবস্থা। দয়াময়ীও বিস্মৃত; তার মনেও দেবিত্ব স্বীকারের বীজ যেন অঙ্কুরিত হলো। উমাপতির কাসর-ঘণ্ঠার আওয়াজ আর সহ্য হচ্ছে না। সে পাগলের মতো ছুটে এসে মাঠ পেরিয়ে নদীর ধারে এলো। এখানে একটা বিষয় বলে রাখি, মৃতপ্রায় যে শিশু সুস্থ হলো উপন্যাসে, তার মা দয়াময়ীর সখি। চলচ্চিত্রে শুধু ছেলেটির বাবাকে পাই। আর কাঁসর ঘণ্টা শুনে উমাপতির পালিয়ে আসা মূল গল্পেও আছে।

দেবী

নদীর ধারে এসে সে কী করবে, কিছুই বুঝে উঠতে পারে না। এমন সময় নদীতে একটা নৌকো দেখে আশার আলো পাই। রাত্রি বেলা সে স্ত্রীর কাছে লুকিয়ে আসে; কেননা সে অন্য ঘরে থাকে। গল্পে পাই, সে পুজোর ঘরেই থাকে। দয়াময়ীকে ঘুম থেকে জাগিয়ে নৌকো করে কলকাতা পালানোর কথা বলে। দয়া শেষ পর্যন্ত রাজি হয়। সে নৌকোর উদ্দেশ্যে যায়।

গল্পে কিন্তু দেখি, উমাপতি যাবার জন্য যখন দয়াময়ীর হাত ধরল, তখন দয়ার অভিব্যক্তি, ‘তুমি আর এভাবে আমাকে স্পর্শ কোরো না। আমি যে দেবী নই, আমি যে তোমার স্ত্রী, তা আমি আর নিশ্চয় করে বলতে পারিনে।’ আসলে ওই ছেলেটির সুস্থতা এবং পারিপার্শ্বিক পরিবেশ তাকে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছিয়েছে। এই কথাগুলো অবশ্য দয়াময়ী ঘরের ভেতরে বলে। চলচ্চিত্রে নৌকো ঘাটে যাওয়ার পথে নদীর ধারে প্রতিমার কাঠামো দেখে দয়াময়ী থমকে যায়। সে বারবার বলতে থাকে, যদি ‘দেবী হই।’ সুতরাং স্থান-কালের পরিবর্তন হয়েছে শুধু। দয়াময়ী মধ্যে নিজের দেবিত্বের বিশ্বাস এসেছে ছেলেটির সুস্থ হওয়াতে।

সে আরও বলে, ‘তোমার যদি অমঙ্গল হয়’ [চলচ্চিত্র]। এসবের আড়ালে এটিই প্রকাশ পাচ্ছে, নিজের প্রতি দয়াময়ী বিশ্বাস হারিয়েছে; নিজের মানবীয় অস্তিত্বের প্রতি তার গভীর শঙ্কা। সুতরাং যাওয়া হলো না। দয়াময়ী আর উমাপ্রসাদের সঙ্গে দীর্ঘ কথোপকথন, যুক্তির মাধ্যমে উমাপতির স্ত্রী মানুষ না দেবী তার একটা তর্ক তুলে ধরেছেন প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়। সেই দীর্ঘ কথোপকথন অবশ্য চলচ্চিত্রে নেই।

গল্পে দয়াময়ী যেতে চায় না। উমাপতির অনেক অনুনয়-বিনয়, সাধ্য-সাধনা শেষে দয়াময়ী বলল, ‘আমি যদি দেবী, তুমি আমার স্বামী মহেশ্বর, তবে দুজনেই এখানে থাকি, দুজনেই পূজা গ্রহণ করিব; পালাব কেন? এত জনের ভক্তিতে আঘাত দেব কেন?’

দয়াময়ী ফিরলেও উমাপ্রসাদ ফেরে না। সে দু-সপ্তাহ নিরুদ্দেশ ছিল। তৃতীয় সপ্তাহেই খোকার জ্বর হয়। বৈদ্য আসে; কিন্তু কালীকিঙ্কর চিকিৎসা করতে দেয় না। খোকার মা বিশ্বস্ত ঝি’কে কবিরাজের কাছে পাঠায়; কিন্তু কবিরাজও আসে না। কেননা, স্বয়ং শক্তি বলেছে, খোকাকে সুস্থ করে দেবে! কিন্তু খোকা আর সুস্থ হলো না। এ আঘাত সহ্য করতে না পেরে দয়াময়ী গলায় দড়ি দেয়। এই হলো মূল গল্পের কথা।

সত্যজিৎ রায়
দেবী

চলচ্চিত্রে দেখি, সেদিন উমাপ্রসাদ ফিরে এসে একজনের বাড়ি যায়। তার কাছে নিজের সমস্ত কথা বলে। তার কাছেই এই সমস্তের বিরোধিতা করার রসদ পায়। যে শক্তিতে ওই ব্যক্তি তার বাবার বিরুদ্ধতা করে ধর্মত্যাগ করেছিল, কুসংস্কারকে ত্যাগ করেছিল, সেই শক্তিতেই উমাপ্রসাদ লড়বে। তবে এখানে পাশাপাশি দুজন মানুষ একজন পশ্চিমি শিক্ষায় শিক্ষিত হয়েও সেভাবে কুসংস্কারান্ধ বাবার বিরুদ্ধতা করতে পারে না; অন্যজন কুসংস্কারসহ ধর্মকেই ত্যাগ করে।

ঝি’কে দিয়ে কবিরাজের ডাক পড়লে কবিরাজ বাড়িতে এসে খোকাকে দেখে; তবে আদ্যাশক্তির কাছে নিয়ে যাবার পরামর্শও দেয়। খোকা যখন জ্বরের বিকারে কাকিমাকে ডাকছে, তখন মায়ের মনেও আশা জাগে, হয়তো দয়াময়ীর কাছে গেলে সুস্থ হবে। তবে গল্পে দয়াময়ী নিজেই বলে তাকে সুস্থ কর দেবে! খোকার মৃত্যু হলে এত বড় আঘাত দয়াময়ী নিতে না পেরে উন্মাদ হয়ে যায়। উমাপতি তার সমস্ত ক্ষোভ, প্রতিবাদ উগরে দেয় বাবার ওপর। এবং বলে, সমস্ত কিছুর জন্য দায়ী তার কুসংস্কারাচ্ছন্ন মনোভাব। সে-ই খোকাকে হত্যা করেছে।

শেষ পর্যন্ত এই কুসংস্কার থেকে যখন কালীকিঙ্কর বেরিয়ে এলো, সংসার ততদিনে শ্মশান হয়ে উঠেছিল।


তথ্যসূত্র:
১। চট্টোপাধ্যায় অমিতাভ, চলচ্চিত্র সমাজ ও সত্যজিৎ রায়, ধর্মের বর্বর মুখচ্ছবি দেবী, প্রতিভাস, প্রথম প্রকাশ জুলাই ২০১২, পৃ: ১৭০
২। প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়ের শ্রেষ্ঠ গল্প, প্রকাশ ভবন, প্রথম সংস্করণ, বৈশাখ ১৩৬০, কলকাতা
Print Friendly, PDF & Email