মহাপৃথিবী: অদর্শনের শিল্প

161
মৃণাল সেন
মৃণাল সেন

‘মৌলিকভাবে, স্বাভাবিক মানুষ সব সময়ই হয় পরনির্ভর, অথবা প্রতি-নির্ভর; সে নিজস্ব ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল (সেটা যেকোনো ব্যবস্থা হতে পারে: কার্যক্রমের ব্যবস্থা, সামাজিক অথবা কাল্পনিক ব্যবস্থা); কিন্তু একই সময়ে, সে অবিরত সেই ব্যবস্থাকেই চ্যালেঞ্জ জানাতে থাকে। কারণ সে সম্মতি ও অসম্মতি দুটো নিয়েই চলতে থাকে।’
জঁ বদ্রিলার্দ

‘সাম্যবাদের দুর্গ চুরমার? পূর্বপুরুষের বিশ্বাসঘাতকতা? পূর্ব ইওরোপ তোলপাড়?’ এ রকম গুচ্ছ প্রশ্ন দিয়ে শুরু হয় মৃণাল সেনের মহাপৃথিবী (১৯৯১)। যেদিন বার্লিনের দেয়াল ভাঙা হবে, ৯ নভেম্বর ১৯৮৯, তার চারদিন আগে কলকাতার এক মধ্যবিত্ত পরিবারে আত্মহত্যা করে সাধারণ এক বৃদ্ধ মা। আন্তর্জাতিক টালমাটাল পরিস্থিতিকে এভাবেই চকিতে আটপৌরে, ঘরোয়া সীমার ভেতর নিয়ে আসেন মৃণাল সেন। সমান্তরালে দেখাতে চান বিন্দুর ভেতরেই কি করে বিশ্ব ধরা পড়ে, অথবা বিশ্ব কেমন করে বিন্দুকে বিচ্যুত করে দেয় আপন স্থান থেকে। নির্মাতা দেখাতে চান, পৃথিবীর মানুষের স্বপ্ন দেখা ও স্বপ্ন ভাঙার পূর্বাপর, পরিবারের সদস্যদের ভেতর আশ্রয় ও নিরাশ্রয়ের অভিঘাত।


এই
সত্য দুই
কূলেই মরীচিকার
মতো ঝুলতে
থাকে

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর হিটলারের জার্মানিকে মিত্র শক্তি নিজেদের ভেতর ভাগবাটোয়ারা করে নেয়। পশ্চিম দিক নেয় যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্স। আর পুবদিক নেয় সোভিয়েত ইউনিয়ন। আদর্শিক বিভেদ নির্ধারণ করে দেয় ভৌগলিক সীমারেখা। উঠে যায় দেয়াল। একদিকে পুঁজিবাদ, অন্যদিকে সাম্যবাদ। কোনো ইজম বা ব্যবস্থা শেষ পর্যন্ত মানুষের শান্তিময় প্রস্থানের নিশ্চয়তা দিতে পারে না। তাই নদীর অপরদিকের ঘাসকে অধিক সবুজ মনে হয়। এই সত্য দুই কূলেই মরীচিকার মতো ঝুলতে থাকে।

মহাপৃথিবী। ফিল্মমেকার: মৃণাল সেন

মানবিক মর্যাদা ও সমান অধিকার আদায়ের ওয়াদা করে বিপ্লব সংগঠনের ভূমি সোভিয়েত ইউনিয়ন যখন অর্থনৈতিক সমস্যার ভেতর পড়ে, আশির দশকে, তখন থেকেই আসলে দুনিয়ার বাদবাকি দেশগুলোতেও সাম্যবাদী দুর্গে চিড় ধরতে থাকে। এ ক্ষেত্রে যে শুধু বিপ্লবে আস্থা রাখা মানুষদের দোষ ছিল তা নয়, উল্টো শিবিরের ষড়যন্ত্রও কম ছিল না। এ সকল দোষারোপের উর্ধ্বে উঠে শেষ পর্যন্ত যা পাওয়া যায়, তা হলো মানুষের আত্মত্যাগ ও স্বপ্নের প্রতি অবিচল থাকার প্রত্যয় এবং স্বপ্নভঙ্গের বেদনা ও নতুন করে স্বপ্ন দেখার সাহস।

তো সোভিয়েত ইউনিয়নে যখন অর্থনৈতিক মন্দা চলছে, তখন ১৯৮৬ সালে ইউক্রেনের চেরনোবিলে পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। এর এক বছর আগেই সোভিয়েত ইউনিয়নে ক্ষমতায় আসীন হন মিখাইল গর্বাচফ। তিনি সরকার পরিচালনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা অর্থাৎ ‘গ্লাসনস্ত’ আনতে চাইলেন। কমিউনিস্ট পার্টিকে পুনর্গঠন করতে চাইলেন, যা পেরস্ত্রইকা নামে পরিচিত। আশির সেই দশকেই আসলে অনুমেয় হয়ে উঠছিল কোনদিকে যাচ্ছে সোভিয়েত ইউনিয়ন আর তাদের সমাজতন্ত্র। তার প্রভাব পড়তে শুরু করে পূর্ব ইউরোপেও।


ভাঙা-গড়ার ভেতর
দিয়েই সে বেঁচে
থাকার নতুন
নতুন
তরিকা আবিষ্কার করে

পূর্ব জার্মানিতে তো বটেই, পোল্যান্ড, হাঙ্গেরি, এস্তেনিয়া, লাটভিয়া, লিথুয়ানিয়া টগবগ করে ফুটছে সমাজতন্ত্র থেকে বেরিয়ে আসার জন্য। মানুষের সম্মিলিত এই চাওয়ার ধাক্কা এসে সজোরে লাগে বার্লিনের দেয়ালে। ভেঙে চুরমার হয়ে যায় সেটি। যেন নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ। স্বপ্নভঙ্গের ভেতর দিয়েই মানুষ আবার স্বপ্ন দেখতে শুরু করে। দুঃস্বপ্নও কিন্তু স্বপ্ন। মানুষ আশায় বুক বাঁধতে চায়। মন্দের অবসান চায়। ভাঙা-গড়ার ভেতর দিয়েই সে বেঁচে থাকার নতুন নতুন তরিকা আবিষ্কার করে। সাম্যবাদ তাই কখনো হাঁটা শুরু করে পুঁজিবাদের দিকে, পুঁজিবাদ কখনো রূপ পাল্টে হয়ে উঠতে চায় সমাজতন্ত্রী। সমাজে এসব ঘটতে থাকে, সামাজিক মানুষের সম্মতি ও অসম্মতির ওপর ভিত্তি করেই।

মহাপৃথিবী। ফিল্মমেকার: মৃণাল সেন

মৃণাল সেনের ছবিতেও আমরা দেখি দ্বন্দ্ব। সমতা বিধানের সংগ্রাম উবে যাওয়ায় এক মায়ের দ্বান্দ্বিক প্রশ্ন ও অসম্মতি: ‘তোরা সব মিথ্যে হয়ে গেলি? সব মিথ্যে? এ আমি কি করে মানব? না কিছুতেই না, কখনো না।’ এ যেন মায়ের আর্তি নয়, গোটা প্রজন্মের আর্তচিৎকার। ছেলের সংগ্রাম দেখে যে সমাজব্যবস্থার ওপর আস্থা রেখেছিল মা, ছেলের মৃত্যুর পর সেই সমাজব্যবস্থা কায়েমের সম্ভাবনা দূরীভূত হয়, আর চলমান সমাজ ব্যবস্থার প্রতি অনাস্থা এবং নির্ভরতার জায়গা সন্তানের চলে যাওয়ায়, মা মরেই গিয়েছিল মানসিকভাবে। ফাঁসিতে ঝুলে সে শারীরিক মৃত্যু নিশ্চিত করে মাত্র।

ফরাসি দার্শনিক জঁ বদ্রিলার্দকে স্মরণ করে বলা যায়, মায়ের শারীরিক অনুপস্থিতি আদতে ওই প্রশ্নটিকে স্থাপন করে যায় সন্তানদের মাঝে, প্রজন্মের মাঝে: সব কি মিথ্যে হয়ে গেল? আর এই প্রস্থানপূর্বক প্রশ্নই মৃত মাকে আরও জীবিত করে তোলে। মৃণাল সেনের গোটা ছবিতে তাই মৃত মায়ের উপস্থিতি এত জোরালভাবে অনুভব করা যায়। বদ্রিলার্দ যেমনটা বলেন, আধুনিক সময়ে শিল্প বেঁচে থাকে তার অন্তর্ধানের ওপর ভিত্তি করে।

মহাপৃথিবীর মায়ের প্রশ্ন আদতে নির্মাতা মৃণাল সেনেরও প্রশ্ন: সবটাই কি তবে মিথ্যে হয়ে গেল? এত আত্মদান? মৃণাল সেনের মনের কোনে থাকা এই প্রশ্নের হদিস দেন পুত্র কুনাল সেন। বন্ধু নামের বইটিতে কুনাল সেন লিখছেন: ‘মার্ক্সবাদী প্রাসাদ যখন সর্বত্র ভেঙে পড়ছে, মা তখন একটি সাধারণ প্রশ্ন করে (মহাপৃথিবী চলচ্চিত্রে): তার সকল সন্তানের মৃত্যু ও ত্যাগ কি তবে বিফলে যাবে? এই প্রশ্নটিই, আমার বাবার যত বয়স বেড়েছে, ততোই তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।’

মহাপৃথিবী। ফিল্মমেকার: মৃণাল সেন

মৃণাল সেনের জবানিতে যদি শুনি: “নানা চড়াই-উতরাই ডিঙিয়ে বিশেষ এক সময়ে সোভিয়েত রাশিয়ার প্রধান মিখাইল গর্বাচেভ লিখলেন: ‘…the world slid into a systematic crisis’ (The August Coup)। কত ঘটনাই না ঘটল, কত সংকট সৃষ্টি হল পৃথিবীতে, আশা আর বিশ্বাসের কিছুই থাকল না, দেউলে হয়ে গেল, আদর্শ-মূল্যবোধ-নীতি-বিপ্লব– সবই প্রচণ্ড ঝাঁকুনি খেল। দেখা গেল লেনিনের মূর্তি উপড়ে ফেলা হল, ভেঙে ফেলা হল পূর্ব আর পশ্চিম জার্মানির মধ্যবর্তী দেওয়াল। পূর্ব ইউরোপের তথাকথিত গণতন্ত্র ধরাশায়ী হয়ে পড়ল। চারিদিকে অশান্তি, চারিদিক উত্তপ্ত।”

এমন সময়েই মৃণাল সেনের কাছে একটি নাটক লিখে নিয়ে এলেন অঞ্জন দত্ত। যেখানে একটি মধ্যবিত্ত পরিবার অন্ধগলিতে আটকে পড়েছে। একটা অস্বস্তি, দমবন্ধ করা পরিবেশে দেখা যায় পরিবারের সদস্যরা একে অন্যকে দোষারোপ করছে পরিস্থিতির জন্য। সন্তান ও সন্তানদের ভবিষ্যৎ ও পরিবারের ভগ্নদশা দেখে হতাশায় আত্মহত্যা করে বৃদ্ধ মা। তার দ্বিতীয় ছেলে বুলু, নকশাল আন্দোলনের সক্রিয়কর্মী ছিল, আঠার বছর আগে পুলিশের গুলিতে নিহত হয়, তাদেরই বাড়ির লাগোয়া গলিতে। এই মৃত্যুর দশ বছর পর বড় ছেলে রঞ্জু মারা যায় রোগাক্রান্ত হয়ে, তার স্ত্রী সুতপা হয় বিধবা আর ছেলে টিংগা হয় পিতৃহারা। এর পরপরই তৃতীয় ছেলে সমু পাড়ি জমায় পশ্চিম জার্মানিতে। বৌদি সুতপার সঙ্গে গোপন আলগা একটা সম্পর্ককে এগিয়ে নিতে চায়নি বলেই দাদার মৃত্যুর পর ঘর ছাড়ে সমু। আর ছোট ছেলে অণি, বেকার, নিজেকে নিয়ে, পরিবারের সদস্যদের নিয়ে, সমাজ ও রাজনীতি নিয়ে হতাশ ও বিরক্ত। চার ভাইয়ের এক বোন নন্দা, সে মানসিক রোগী। তাদের বাবা অবসর জীবনযাপন করছে। একমাত্র উপার্জন করে সংসার চালায় বউমা সুতপা। এখন হুট করে মায়ের মৃত্যুতে পরিবারের সকলেই হতবিহ্বল হয়ে পড়ে। জার্মানি থেকে ফিরে এসে সমুও হয়ে পড়ে কিংকর্তব্যবিমূঢ়। আত্মহত্যার কারণ নিশ্চয় লেখা রয়েছে মায়ের দিনলিপিতে। কিন্তু শেষতক আমরা দেখি সেই দিনলিপিতে আগুন দেয় নন্দা। আর দিনলিপির বাকি পাতাগুলোও আগুনে বিসর্জন দিতে থাকে সমু। এখানেই শেষ হয় ছবি।


সময়ের কষাঘাতে আদর্শ
পাল্টাতে থাকে,
পাল্টাতে থাকে
মানুষও

মহাপৃথিবীতে যে মা আত্মহত্যা করে, এই আত্মহত্যা আদতে কার আত্মহত্যা? প্রজন্ম যে স্বপ্ন দেখেছিল, সেটার? যে প্রজন্ম দিন বদলের ডাক শুনে, পতঙ্গের মতো ঝাঁপিয়ে পড়েছিল বিপ্লবের আগুনে? আস্থা রেখেছিল একটি আদর্শের ওপর? কিন্তু তারা বুঝে উঠতে পারেনি, যখনই তারা আস্থা রাখতে শুরু করেছিল একটি নির্দিষ্ট আদর্শের ওপর, তখন থেকেই ওই আদর্শের ক্ষয় শুরু হয়ে গেছে। একই কথা খাটে পুঁজিবাদের বেলাতেও। কারণ যখনই আপনি যাপিত জীবনের ভেতর দিয়ে আদর্শকে ধারণ করতে শুরু করবেন, ঠিক তখনই সেই আদর্শ আর আগের আদর্শ আকারে বিরাজ করবে না। সময়ের কষাঘাতে আদর্শ পাল্টাতে থাকে, পাল্টাতে থাকে মানুষও। এক নদীতে কি দুবার পা ডোবান যায়?

মহাপৃথিবীতে স্বাধীনতা-উত্তর ভারতের যে অর্থনৈতিক অবস্থা ছিল, কলকাতা যে ঝড়ঝঞ্ঝার ভেতর দিয়ে যাচ্ছিল, তাতে বুলুর মতো ছেলেরা ঝাঁপিয়ে পড়েছিল নতুন সমাজ গঠনের জন্য। সেই লড়াইয়ে বুলুর মা-বাবার মতো অনেকে আস্থাও রাখতে শুরু করে। এই আস্থা রাখার ভেতর দিয়ে সমাজে যে পরিবর্তন সাধিত হয়, সেটা বিদ্যমান সমাজ ও তাকে বদলে দেওয়ার আকাঙ্ক্ষার এক অবধারিত সংঘর্ষের ফল। এতে করে পূর্বের সমাজটিও পাল্টে যায়, আর প্রত্যাশিত সমাজের কাছাকাছিও যাওয়া যায় না। ফলে নতুন এক সমাজ এসে হাজির হয়, হারিয়ে যায় আগের সমাজ। দার্শনিক বদ্রিলার্দ বলেন: মানবজাতি নিঃসন্দেহে একমাত্র জাতি যে বিশেষ ধরনের অদর্শন বা অন্তর্ধানের প্রক্রিয়া (স্পেসিফিক মোড অব ডিসএপিয়ারেন্স) আবিষ্কার করেছে, যার সাথে প্রকৃতির নিয়মের কোনো যোগ নেই: একে বলা যেতে পারে অদর্শনের শিল্প।

মহাপৃথিবী। ফিল্মমেকার: মৃণাল সেন

মৃণাল সেনের মহাপৃথিবী মূলত অদর্শনেরই শিল্প। গোটা ছবিতে মা নেই, কিন্তু কি প্রবল শক্তিতে মা পরিবারের সদস্যদের তাড়িত করে নিয়ে যেতে থাকে। পরিবারের সাধারণ এই গল্পের সমান্তরালে আমরা দেখি পূর্ব ও পশ্চিম জার্মানির একত্রীকরণ, শুনি সোভিয়েতযুগের সমাজতন্ত্রের মৃত্যুঘণ্টা। শতশত মাইল দূরের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন কি প্রবলভাবে নাড়িয়ে দেয় কলকাতার মধ্যবিত্ত ওই পরিবারটিকে। কারণ আদর্শিকভাবে তারা সাম্যবাদের নৈকট্যবোধ করে। আদর্শের বিলীন হয়ে যাওয়া যেন মাতৃছায়া সরে যাওয়ার মতোই। তাই পরিবারে একদিকে মায়ের জন্য শোক, অপরদিকে সাম্যবাদের জন্য ক্ষোভ। অনির সংলাপগুলো যদি দেখি, সেই শোক ও ক্ষোভ প্রতীয়মান হয়। জার্মানি ফেরত ভাই সমুকে অণি বলছে: ক্যাপিটালিজম, সোস্যালিজম– সব এক হয়ে গেল। কেউ ভাবতে পেরেছিল? বল না? সোস্যালিজম খতম?

দুই ভাইয়ের ভেতর যখন পড়ন্ত বিকেলে এই বাহাস চলছিল, তখন তাদের বাবা পাশে বসে শুনছে। তার হাতে ধরা টাইম ম্যাগাজিন। যে ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে রয়েছেন মিখাইল গর্বাচফ। ১৯৯০ সালের ৪ জুনের সংখ্যা এটি। সমু হাতে করে নিয়ে এসেছে জার্মানি থেকে। সংখ্যাটিতে রয়েছে গর্বাচফের দীর্ঘ সাক্ষাৎকার। টাইম ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদটিতে লেখা– ‘ইন দ্য আই অব দ্য স্টোর্ম: উইদ হিজ কান্ট্রি ইন আ পেরিলাজ প্যাসেজ, গর্বাচফ ডিফাইনস হিজ কোর্স অ্যান্ড অ্যানসার্স হিজ ক্রিটিকস’। এই শিরোনাম দেখেই অনুমান করা সম্ভব সোভিয়েত ইউনিয়নের সমাজতন্ত্র তখন কোন অবস্থায় ছিল? এরপর কয়েক মাসের ভেতর সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে রাশিয়া হয়ে যাওয়ার ইতিহাস সকলেরই জানা।


মায়ের
মৃত্যু কি তবে
সমাজতন্ত্রের মৃত্যুর
রূপক
?

এই যে মানবজাতি এক আদর্শ থেকে আরেক আদর্শে ছুটে বেড়ায়, এক দর্শনকে অদর্শনে পাঠিয়ে দিয়ে ভিন্ন দর্শনে দীক্ষিত হতে চায়, এতে করে কেবল দেয়ালই ভেঙে পড়ে না, সম্পর্কগুলোও কেমন আলগা হয়ে যায়। মায়ের মৃত্যু কি তবে সমাজতন্ত্রের মৃত্যুর রূপক? হতে পারে। এই মৃত্যুর পরই তো পিতা ও পুত্রের সম্পর্ক আলগা হয়ে যায়। বাবা তাই ছেলের কাছে মদ চায় খাওয়ার জন্য। দুই ভাইয়ের ভেতর তাই জমাট বাঁধা ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটে, বেড়ে যায় দূরত্ব। বউদি দোষারোপ করে দেবরকে। দেবর বিদেশে চলে যাওয়ার পেছনে দোহাই দেয় থিয়েটার শেখার সুযোগের। সবাই যেন দুর্বিপাকের কারণ খোঁজার চেষ্টা করে অন্যের ভুলত্রুটির ভেতর। নিজের অবস্থান, আত্মসমালোচনাও যেন অদর্শনে চলে যায় এই চরিত্রদের।

মহাপৃথিবী। ফিল্মমেকার: মৃণাল সেন

চলচ্চিত্রের শেষে মায়ের দিনলিপি পুড়িয়ে অদর্শনের শিল্পকে যেন আরও দৃঢ় করা হয়। সমু, অণি কিংবা সুতপা কেউই আর জানতে পারবে না, আসল কারণটা কি ছিল মায়ের মৃত্যুর। অবশ্য মৃত্যুর কারণ মা আদৌ লিখেছিলেন কি না দিনলিপিতে সেটাও স্পষ্ট নয়। তারপরও জানার যে সম্ভাবনা ছিল, সেটাও আর থাকল না। রহস্য নিয়ে ভস্ম হয়ে গেল ডায়েরিটা। যেমন করে ধোঁয়াশায় থেকে গেছে রাশিয়ায় সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব ও পরবর্তী সময়ে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন, নকশাল বাড়ি আন্দোলনের সাড়া জাগানো ও আন্দোলন ব্যর্থ হওয়ার কারণ। মানুষই আন্দোলন সফল করে তোলে, মানুষই আবার সেটাকে ব্যর্থ করে দেয়। মানুষই গল্পের সৃষ্টি করে, এই মানুষই আবার গল্পটা গোপন করে, অগোচরে মরে যায়। কেউ জানতেই পারে না গল্পটা আসলে কি ছিল?

মৃণাল সেনের গল্পটাও আসলে এটাই– দুনিয়ার কোনো কিছুই স্থায়ী নয়: মানুষ, সম্পর্ক, আদর্শ, রাষ্ট্র ইতি ও আদি। সকলই একদিন অদর্শনে যাবে, নতুন দর্শনের দৌলতে।


দোহাই
১. মৃণাল সেন, তৃতীয় ভুবন, (কলকাতা: আনন্দ পাবলিশার্স, ২০১১)
২. কুনাল সেন, বন্ধু, (কলকাতা: সিগাল বুকস, ২০২৩)
৩. রথীন চক্রবর্তী সম্পাদিত ‘নাট্যচিন্তা’ (বালাম ৩৯, সংখ্যা ১-৬, ২০১৯-২০২০), চিত্রনাট্য: মহাপৃথিবী (কলকাতা)
৪. জঁ বদ্রিলার্দ, হোয়াই হ্যাজ নট এভরিথিং অলরেডি ডিসএপিয়ার্ড?, (ক্রিস টার্নার অনূদিত), (কলকাতা: সিগাল বুকস, ২০০৯)
Print Friendly, PDF & Email
লেখক, সাংবাদিক, সিনে-সমালোচক। ঢাকা, বাংলাদেশ। সিনে-গ্রন্থ : চলচ্চিত্র পাঠ সহায়িকা; চলচ্চিত্র বিচার; বলিউড বাহাস; উসমান সেমবেনের চলচ্চিত্র হালা