জেনেসিস: আসল শত্রু চেনানোর অডিও-ভিজ্যুয়াল বয়ান

154
মৃণাল সেন
জেনেসিস। ফিল্মমেকার: মৃণাল সেন

‘ইতিহাস বারবার নিজেকে ফিরিয়ে আনে– প্রথমে ট্র্যাজেডি, পরে প্রহসন হিসাবে’
–কার্ল মার্কস

মানুষ একই ঘটনা বিভিন্ন সময়ে, বিভিন্ন জায়গায় একইভাবে ঘটাতে থাকে যা তাদের জীবনে দুঃখজনক ঘটনায় পরিণত হয়। তারপর পরিণত হয় প্রহসনে। মানুষ নিজেই নিজেকে প্রহসনের পাত্রে পরিণত করে। সে মনে করে, বাইরের কেউ তার সঙ্গে এই খেলা খেলছে; অথচ ভুলে যায় নিজের ভূমিকা। সে ভুলে যায়– তার নিজের অজ্ঞতা, অহংকার, লোভ-লালসা, মালিকানার ধান্দা তাকে শেষ পর্যন্ত ব্যবসায়ীর শিকারে পরিণত করে। তার নিজেকে শক্তিশালী করার প্রক্রিয়া নিজের কারণেই ধ্বংস হয়ে যায়, আর এই ব্যাপারটা বারবার, এতবার ঘটে যে, শিকারি অপেক্ষা করে– কবে শিকারগুলো নিজেরাই মারামারি শুরু করবে। যাতে তাদের শিকারকে অপেক্ষাকৃত জরুরি মনে হয়। শিকারের প্রতিরোধের ক্ষমতা হারিয়ে যায়। শিকারির শিকার করাটা সহজ হয়।

জেনেসিস, ১৯৮৬ সালে নির্মিত একটি হিন্দি ভাষার চলচ্চিত্র। প্রখ্যাত বাঙালি চলচ্চিত্র নির্মাতা মৃণাল সেনের জরুরি একটি কাজ, যা সব সময়ের, সব মানুষের বোঝার জন্য জরুরি, বিশেষ করে যাদের সব কিছু লুট হয়ে যায়, যাদের সব কিছু চোখের সামনে নাই হয়ে যায় । এই মানুষগুলো কেন, কীভাবে যতবার উঠে দাঁড়াতে চাইবে, ততবার আবার পড়ে যাবে, পরাজিত হবে– সেই কথা দৃশ্যের মাধ্যমে, চরিত্রগুলোর বয়ানে পরিষ্কার এবং সহজ ভাষায় বলা হয়েছে। মানুষ যেন জেনেশুনে অথবা না বুঝেও বারবার একই ফাঁদে পা দিচ্ছে। শত্রু ভাবছে বাইরে কোথাও; আসলে তো শত্রু সে নিজে। নিজেই নিজের বড় শত্রু। কিন্তু সে সেটা উপলব্ধি করতে পারে না। আর যারা পারে, তারা অনেক দেরি করে ফেলে।

উপমহাদেশের শক্তিশালী অভিনেতা নাসিরুদ্দিন শাহ, ওম পুরি, শাবানা আজমী এবং এম. কে. রাইনা সিনেমাটিতে অভিনয় করেছেন। বাংলার বিখ্যাত লেখক সমরেশ মজুমদার গল্পটি লিখেছেন। হিন্দিতে ডায়ালগ লিখেছেন পথিক ভাটস। ১৯৮৬ সালে ফ্রান্সের কান চলচ্চিত্র উৎসবে মূল প্রতিযোগিতায় পাম দি’অরের জন্য মনোনীত হয়েছিল চলচ্চিত্রটি। এই চলচ্চিত্রের সংগীত পরিচালক ছিলেন পন্ডিত রবিশংকর। চলচ্চিত্রটির দৈর্ঘ্য ১০৫ মিনিট ।

জেনেসিস। ফিল্মমেকার: মৃণাল সেন

গল্পটিতে চার জন মূল চরিত্র। একজন কৃষক। একজন তাঁতী। একজন ব্যবসায়ী, যে আসা যাওয়ার পথে এই দুইজনের সঙ্গে বাণিজ্য বা লেনদেন করে। এর মধ্যে হঠাৎ একজন নারী উপস্থিত হয়। সে তাদেরকে অবাক করে; তবু তাকে তারা আশ্রয় দেয়। সেই নারীও বন্যায় সব হারিয়ে ঘুরতে ঘুরতে ভেসে আসা একজন। এই নারী তার জায়গা খুঁজে নেয় তাদের মধ্যে। সবাই সবার কাজ করে। তিন জন তিন জনের মতো, সহজাতভাবে, যেটা যেন হবারই ছিল। কিন্তু ধীরে ধীরে এই নারীর কারণে তাদের মানসিকতায় পরিবর্তন আসে। আরও বেশি কিছু পাওয়ার ইচ্ছা জাগে, বা সেই নারী নিজেই আরও বেশি কিছুর জন্য তাদেরকে আগ্রহী করে তোলে।

এই নারী তাদেরকে তাদের পরিচিত ব্যবসায়ীর কাছ থেকে আরও বেশি প্রাপ্য আদায় করার ব্যাপারে কথা বলে। এর মধ্যে একদিন কৃষকের গামছা ছিড়ে যায়, তখন সেই নারী তাকে বলে, আশেপাশের কোনো মেলা থেকে গামছা নিয়ে আসতে। এতদিন তারা আসলে যা পেত বা যা আসত, তার সবই ব্যবসায়ীর মাধ্যমেই আসত। এবার তারা নিজেরাই কাছের গ্রামের মেলাতে যায়; আর গামছার সঙ্গে আরও অনেক কিছু কিনে আনে। যেমন আলতা, নূপুর ইত্যাদি। দুই জন আবার এই জায়গাতে আলাদা আলাদা ভাবতে শুরু করে। যার যার মতো। নিজের মতো করে।


এই
ঈর্ষার
কারণ হলো
মালিকানা

ঘটনাচক্রে মেয়েটি গর্ভবতী হলে তাকে নিয়ে ঈর্ষা ছড়ায় দুই বন্ধুর মধ্যে। এই ঈর্ষার কারণ হলো মালিকানা। বাচ্চার মালিক কে? কার সম্পত্তি, কার অধিকার বেশি? যেন মানুষ নয়, কোনো পণ্যের মালিকানা।

তারা শত্রু হয়ে ওঠে। মেয়েটি তাদের ছেড়ে চলে যায়। আর প্রাক্তন বন্ধু এবং বর্তমান শত্রু দুই জন নিজেদের মধ্যে ভয়াবহ মারামারি শুরু করে দেয়। ব্যবসায়ী, যে কি না আগে শুধু একাই আসত, এবার দলবল নিয়ে আসে এবং তাদেরকে আক্রমণ করে বন্দি, ক্রিতদাসে পরিণত করে। ব্যবসায়ী যেন সেই সুযোগেই ছিল, কবে এরা নিজেদের মধ্যে মারামারি করবে, সেটাই এদের ঘায়েল করার মোক্ষম সুযোগ। মোটামুটি এই হলো গল্প।


সব
সময়ের,
সব জায়গার
দর্শকের কাছে
এই গল্প পৌঁছানো সম্ভব

সহজ ও বোধগম্য উপায়ে গভীর কথাকে বলার কারণে জেনেসিস হয়ে উঠেছে একটি মৃণালের একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্মাণ। আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি তো ছিলই, ইউরোপিয়ান অর্থায়ন এবং কলাকুশলীকে সঙ্গে নিয়ে সফলতার সাথে চলচ্চিত্রটি চিত্রায়িত করেছেন মৃণাল সেন। তারপরও সাধারণ দর্শক খুব সহজেই মানবচরিত্র, সমাজ, লোভ, ব্যবসা, ঈর্ষা কীভাবে, কোথা থেকে তৈরি হয়– সেই ভাবনাগুলোতে ফিরে আসে। যেকোনো সময়ের, প্রায় সব মানুষের গল্প জেনেসিস। ধর্মীয়, রাজনৈতিক, পুঁজিবাদি দৃষ্টিকোণ থেকে সিনেমাটাকে পড়া সম্ভব। আসল কথা হলো, একেবারে কম কথায় বড় একটা ব্যাপারকে অডিও-ভিজ্যুয়াল দিয়ে বোঝানো হয়েছে। সব সময়ের, সব জায়গার দর্শকের কাছে এই গল্প পৌঁছানো সম্ভব।

মরুভূমিতে গল্পটি এগোতে থাকে। সময়টা ঠিক বোঝা যায় না। কিন্তু আকাশে যখন বিমান উড়ে যায় আর সিনেমার শেষে বুলডোজার ইন্ডাস্ট্রিয়ালাইজেশন শুরু করে, তখনই আমরা আসলে একটি বিশাল সময়ের পরিবর্তন অনুভব করি।

জেনেসিস। ফিল্মমেকার: মৃণাল সেন

সমাজের বাস্তবতা এবং প্রাসঙ্গিক অথচ অস্বস্তিকর বিষয়গুলো নিয়ে মৃণাল সেন যখন কাজ শুরু করেছিলেন, তখন আশেপাশে কেউ ছিলেন না। বাঙালির প্রিয় চলচ্চিত্র নির্মাতা সত্যজিৎ রায় তখন শৈল্পিক, সুন্দর, গোছানো ব্যাপারগুলো নিয়ে, একটু বেশি মধ্যবিত্তকেন্দ্রিক সিনেমাই বেশি তৈরি করছিলেন; তখন মৃণাল সেন এলেন উপমহাদেশের বাস্তব চিত্রকে চিত্রায়িত করতে পর্দায়, তার সময়ের, আশেপাশের সাধারণ মানুষের, নিম্নমধ্যবিত্ত ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর কথা বলতে। মার্কসবাদের জায়গা থেকে নিজের ভাবনায় তিনি যেটাকে জরুরি মনে করেছেন, সেটাকে সামনে নিয়ে এসেছেন; তা ঘিরে চলচ্চিত্র নির্মাণ ও প্রদর্শন করেছেন। ব্যবসার জন্য নয় শুধু, দায়িত্ববোধ থেকে, মানুষকে সত্যিটা জানানোর জন্য। জেনেসিস সেরকমই একটি চলচ্চিত্র। গল্পটি উপমহাদেশের হলেও সারা পৃথিবীর জন্যই প্রযোজ্য।

মৃণাল সেন সবাইকেই সামলেছেন। বিরক্ত প্রযোজক, অনিচ্ছুক পরিবেশক আর অবশ্যই অনুমোদন না দেওয়ার জন্য সব সময় সদাপ্রস্তুত– ভারতের সেন্সর বোর্ড। কিন্তু সবকিছু সামলে তিনি ঠিকই তার অনেক জরুরি কাজ করেছেন, যেগুলো বাংলায় আর কেউ করেননি কিংবা তিনিই প্রথম করেছেন বা পথ দেখিয়েছেন; তার নিজের মতো করে। জনপ্রিয় ব্যবসাসফল সিনেমা করার লোভ দেখানো পথে তিনি হাঁটেননি। পরিবারের পূর্ণ সমর্থন নিয়ে সেই কাজগুলো করে গেছেন। তার স্ত্রী গীতা ও ছেলে সব সময় পাশে ছিলেন। এ যেকোনো শিল্পীর জন্যই একটি বড় পাওয়া এবং শিল্পীর নিজেরও অর্জন।


সেই
শূন্যতা
পরিচালক
দর্শককে উপলব্ধি
করাতে পেরেছিলেন

ভারতের সমসাময়িক রাজনৈতিক বিষয় নিয়ে তিনি চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছেন। কলকাতা ৭১, পদাতিক, কোরাসআকালের সন্ধানেতে তিনি মানুষকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন অনেক কিছু আগের মতোই আছে। অতীতের হায়েনারা সব সময়ই হামলা করার জন্য, ক্ষতি করার জন্য বসে থাকে। সুযোগের অপেক্ষায় থাকে। ভুবন সোম-এ নিয়ে আসেন একজন বাঙালি আমলার গল্প, যে খুবই নীতিপরায়ণ এবং নিয়মকানুন মানা মানুষ, তারপরও কোথায় যেন একটা শূন্যতা। সেই শূন্যতা পরিচালক দর্শককে উপলব্ধি করাতে পেরেছিলেন। এই সত্যি অনুভূতিকে অনুভব করাটাই তো শিল্পের সেরা অর্জন। আরেকজনের দুঃখ-কষ্ট, হাসি-কান্নাকে নিজের মধ্যে একইভাবে অনুভব করা। মৃণাল সেন এই জায়গাতে একজন গুরু। একজন পথপ্রদর্শক।

মৃণালের অধিকাংশ সিনেমার মতোই জেনেসিস-এও ইতালিয়ান নিওরিয়েলিজম এবং ফ্রেঞ্চ নিউ ওয়েভের প্রভাব আছে, যেটা তার নতুন ধরনের সিনেমা তৈরির সহায়ক। সিনেমাকে নিছক বিনোদনের, টাইম-পাসের জায়গাতে তিনি দেখেননি। দর্শকের বিবেককে নাড়া দেওয়া ছিল তার লক্ষ্য। তাদের মধ্যে প্রশ্ন তৈরি করা, তাদের জাগিয়ে তোলাই তার কাছে সার্থকতা। আর সেটা শুধু কোনো নির্দিষ্ট এলাকা বা কিছু সংখ্যক মানুষের জন্য নয়, দুনিয়ার সব প্রান্তের মানুষের ক্ষেত্রেই এইসব সিনেমার এই প্রভাব আছে। জেনেসিস সিনেমাতেও।


‘বাইরের শত্রু খোঁজার
বদলে আমাদের
ভেতরের শত্রু
খুঁজে বের
করতে
হবে’

জেনেসিস ১৯৮৬ সালের সিনেমা আর আকালের সন্ধানে তারও ছয় বছর আগের, ১৯৮০ সালের। কিন্তু সিনেমা দুটির এক জায়গাতে জরুরি মিল। তা হলো, নিজেদের দিকে তাকানো।নিজেদের সীমাবদ্ধতাগুলোকে চিহ্নিত করা। অন্যের দিকে আঙুল তোলার আগে নিজেদের ভেতরের দুর্বলতা, ছলচাতুরিকে শনাক্ত করা। নইলে আগানো যাবে না। ইতালো স্পিনেলির সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে অনেকটা সেরকমই বলেছিলেন মৃণাল সেন। আকালের সন্ধানে প্রসঙ্গে বলেছিলেন, ‘সেটা এমন এক সময় ছিল, যখন আমি ভাবছি, বাইরের শত্রু খোঁজার বদলে আমাদের ভেতরের শত্রু খুঁজে বের করতে হবে। বামফ্রন্টের ১৯৭৭-এ ক্ষমতায় আসার পর, আমরা ভেবেছিলাম অনেক কিছু হবে, কিন্তু কিছুই হয়নি। আমার বামফ্রন্টের প্রতি দুর্বলতা ছিল ঠিকই , কিন্তু আমি তাদের সমালোচনাও করেছি। মহত্তর সমাজ সৃষ্টি করতে হলে, আমাদের নিজেদেরকে সংশোধন করতে হবে।’

জেনেসিস। ফিল্মমেকার: মৃণাল সেন

জেনেসিস সিনেমাতেও নারীটির শেষ সংলাপ ছিল সেরকমই। কৃষক আর তাতীকে সে বলছে, ‘আমি জানি না এর [অনাগত সন্তানের] ওপর কার অধিকার। শুধু এটাই জানি, তোমরা দুজনই ভালো লোক ছিলে। আমার ভালো খেয়াল রেখেছ। আমি দুজনকেই কাছে টেনে নিয়েছি; কারণ আমার দুজনকেই দরকার ছিল। আমরা তিনজন মিলে একটি একক সত্তা হয়ে উঠেছিলাম। কিছু এখন তোমরা অধিকার ফলাতে এসেছ। আমার মালিক হয়ে উঠেছ। [আমাকে সম্পত্তি ভাবছ।] তাই আমি বুঝে গেছি, তোমাদের শত্রু বাইরে কোথাও নয়; তোমাদের ভেতরেই বাস করে। তা তোমরা আমাকে কিংবা একে অপরকে– যাকেই দোষী ভাব না কেন।’

উৎপল দত্ত জেনেসিস নিয়ে নিজের লেখায় সেটা আরও স্পষ্ট করে উল্লেখ করেন: ‘অনাগত শিশুটির ওপর পিতৃত্বের অধিকার কায়েম করাটা যাদের কাছে এত গুরুত্বপূর্ণ, তাদের মনের মধ্যে প্রভুত্বের বিষ রয়ে গেছে। তারা সর্বহারা চরিত্র হারাতে বসেছে মনের কন্দরে সঞ্চিত সামন্ততান্ত্রিক কুসংস্কারের চাপে।’ [উৎপল দত্ত: ১৯৮৭]

এই নিজের দোষ, নিজের দলের দোষ, নিজের কাজের মধ্যে ভুল দেখানোর কথাই মৃণাল সেন বলতে চেয়েছেন বারবার তার বিভিন্ন সিনেমার মাধ্যমে। আমাদের শত্রু আমরা নিজেরাই। যদি নিজেরা একতাবদ্ধ থাকি, তাহলে বাইরের শত্রু কখনোই সুযোগ পেত না আমাদেরকে নিয়ে খেলার; আমাদের ওপর কর্তৃত্ব করার। সেই সুযোগ আমরা দিয়ে থাকি। আমরা যখন একসঙ্গে, মিলেমিশে থাকার বদলে, একে অপরের ওপর কর্তৃত্ব ফলাতে চাই, একে অপরের মালিক হয়ে মাথার ওপর বসতে চাই, তখনই সমস্যার শুরু হয়। সেই সুযোগে বাইরের শত্রু আমাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। শেষে আমরা বুঝতে পারলেও অনেক দেরি হয়ে যায়। এইভাবেও বলা যায়, জেনেসিস সিনেমাটার গল্পের মূল কথাকে।

এবার আরেক ধরনের শ্রমের আলাপে আসা যাক। যারা মনে করেন তারা শ্রমিক নন। তারা সাহেব মানুষ। তাদের কম্পিউটার আছে। প্যান্ট-শার্ট পরে অফিসে যান। চা-কফি-সিগারেট খান। সঙ্গে আরও অনেকগুলো নিজের বানানো ন্যারেটিভে নিজেকে নিমজ্জিত রেখে স্বস্তি পান। অথচ শ্রমিক মানে যিনি শ্রমের বিনিময় করে। শ্রম কায়িক হতে পারে, আবার মেধাশ্রমও। মেধার, বুদ্ধির বিনিময়ে, অর্জিত অভিজ্ঞতার বিনিময়ে যে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা, মেধা, বুদ্ধি তৈরি হয়, সেটাকে কাজে লাগিয়ে অর্জিত হয়ে বেতন। এটাও শ্রম। এই শ্রমকে ব্যবহার করেই আরেকদল তৈরি করে পুঁজির পাহাড়। মেধাভিত্তিক শ্রম দিয়ে সে হয় ক্লান্ত। আর এদের টাকায় কেউ কেউ পুঁজির বিনিময়ে গড়ে তোলে আরও বড় পুঁজি। উদ্বৃত্ত এই পুঁজিতে সেই মেধাশ্রমিকেরও হক ছিল। কিন্তু সেটা সে হয় বোঝে না, অথবা নিজেদের মধ্যে তাদের মারামারিকে নিয়ে খেলে মালিক, যে জেনেসিস-এর মতোই সুযোগের অপেক্ষায় থাকে। জানে যে শ্রমিকেরা যখন নিজেরাই মারামারি করবেন, তখন সুযোগ তাদের ওপর মোক্ষম আঘাতের। এই মেধাশ্রমিকও মালিকের মতো মালিকানার আকাঙ্ক্ষা করতে শুরু করেন। যখন তিনি এটা শুরু করেন, তখনই নিজেই নিজের শত্রু হয়ে ওঠেন। আমার কাছে মনে হলো, জেনেসিস চলচ্চিত্রের গল্পটা তো সব জায়গায় খাটে, যেখানে পুঁজির মাত্রাতিরিক্ত শাসন আছে, যেখানে মানুষ সফটওয়ার কোম্পানির কাছে শুধুই একটা লাভ করার মেশিন, যাকে ১ লাখ ডলারের খাটুনি খাটিয়ে ২০ হাজার ডলার বেতন দিয়ে ব্যবহার করা যায়।

আসলে কিছু অপ্রিয় সত্য আছে, যেগুলো অনেকেই জানেন, কিন্তু এড়ানো কঠিন বলে মানতে চান না অথবা মানেন না। সিনেমা বানাতে পুঁজি লাগে। তাহলে দিনশেষে ব্যবসায়ীরাই আসেন পুঁজি নিয়ে। তারা চান সেখান থেকে তাদের টাকা উঠে আসুক। যিনি যত বেশি টাকা চান, তিনি তত বেশি মশলা চান, যা দিয়ে দর্শক আফিমের মতো সিনেমাটা দেখতে থাকবে আর টাকা ঢালবে। পরিচালকের টাকা প্রাপ্তি তাকে আরাম দেয়। তাকে ভালো সিনেমা বানানোর বদলে টাকা কামানোর সিনেমা বানাতে প্রলুব্ধ করে। এর মধ্যে খুব কম জনই শেষ পর্যন্ত নিজের চাওয়া সিনেমা নিয়ে চলতে পারেন। মৃণাল সেন সেটা জানতেন এবং তার সঙ্গে যারা কাজ করতেন, তারাও সেরকম কেউ হলেই কাজটি নতুন মাত্রা পেত। জেনেসিস তো সবাই বানাবে না!

জেনেসিস সবাই বানাতে পারবে না। জেনেসিস বানাতে চাইলেও সবাই সেটা বানাতে দেবে না। চলচ্চিত্র লেখক, শিক্ষক ও গবেষক জাকির হোসেন রাজু তার ‘চলচ্চিত্রে শ্রমজীবী মানুষ: প্রেক্ষাপট বাংলাদেশ’ প্রবন্ধে লিখেছেন: “মূলত আমাদের জনপ্রিয় ধারার চলচ্চিত্র তৈরির প্রক্রিয়া দু’পাঁচ জন পুঁজিপতির ইচ্ছায় কিংবা চার-ছয়জন অর্ধশিক্ষিত পরিচালকের আগ্রহে গড়ে ওঠেনি। এই প্রক্রিয়ার পেছনে আরও গভীর রাজনৈতিক স্বার্থ জড়িত রয়েছে। পর্দায় শ্রমজীবী মানুষকে বিভ্রান্তিকরভাবে দেখালে শুধুমাত্র বাণিজ্যিক ছবির নির্মাতাদেরই লাভ হয় না; লাভ হয় তৃতীয় বিশ্বের নিয়ন্ত্রক দেশি-বিদেশি আমলা-পুঁজিপতিসহ এস্টাবলিশমেন্টের পক্ষের সকলের।”


সিনেমাগুলো শেষ পর্যন্ত
দেশ-সীমানা পেরিয়ে,
দুনিয়ার সম্পদে
পরিণত
হয়েছে

আমরা যদি মৃণালের মৃগয়া দেখি, আকালের সন্ধানে দেখি, সেখানে তো সব সত্য কথা। অপ্রিয়, অজনপ্রিয় সত্য কথা। যে সত্য কথা শুনতে আমরা টাকা দিয়ে সিনেমা-হলে ঢুকতে চাই না। আমরা বিনোদনে ভুলে থাকতে চাই। কারণ তাদেরকে মানুষ হিসাবে দেখতে আমাদেরকে বাধ্য করে এই সিনেমাগুলো। মৃণাল সেন সব সময় সেটা ধরে রাখতে চেষ্টা করেছেন, আর তাই তো আমরা এই সিনেমাগুলো পেয়েছি। আর সিনেমাগুলো শেষ পর্যন্ত দেশ-সীমানা পেরিয়ে, দুনিয়ার সম্পদে পরিণত হয়েছে। মানবজাতির রিপ্রেজেন্টেটিভ হিসাবে থেকে গেছে।

জেনেসিস চলচ্চিত্র তাই আমার কাছে সর্বকালের শোষিত আর শাসকের পৌরাণিক গল্প, সেটাকে সময় আর স্থান দিয়ে আটকানো যায় না। এটি একটি জরুরি সিনেমা। মৃণাল সেনের শক্তিশালী সিনেমা। হিন্দি সর্বকালের সেরা সিনেমাগুলোর একটি, অবশ্যই।

জেনেসিস। ফিল্মমেকার: মৃণাল সেন
কৃতজ্ঞতা স্বীকার:
১। উইকিপিডিয়া, https://en.wikipedia.org/wiki/Genesis_(1986_film)
২। Introducing Mrinal Sen
by Udayan Gupta, from Jump Cut, no. 12-13, 1976, pp. 9-10
copyright Jump Cut: A Review of Contemporary Media, 1976, 2004
লিঙ্ক: https://www.ejumpcut.org/archive/onlinessays/jc12-13folder/MrinalSen.html
৩। পদাতিক মৃণাল সেন , সম্পাদনা চন্ডী মুখোপাধ্যায়, সাক্ষাতকার-১ ইতালো স্পিনেলি , পৃষ্ঠা-২০২, খড়ি প্রকাশনী
৪। মৃণাল সেনের জেনেসিস, উতপল দত্ত, ১৯৮৭ সালের লেখা, পুনরায় প্রকাশিত হয় চলচ্চিত্র সমালোচনা, চলচ্চিত্র চর্চা থেকে ২০১৭ তে।
৫। Karl Marx Quotes. (n.d.). BrainyQuote.com. Retrieved May 7, 2023, from BrainyQuote.com Web site: https://www.brainyquote.com/quotes/karl_marx_382655
৬। জাকির হোসেন রাজু, চলচ্চিত্রে শ্রমজীবি মানুষঃ প্রেক্ষাপট বাংলাদেশ , চলচ্চিত্রের চালচিত্র, জাগৃতি প্রকাশনী , ১৯৮৮ সালে লেখা প্রবন্ধ
Print Friendly, PDF & Email