‘স্যাটানট্যাঙ্গো’ : তখন সেখানে ছিল আঁধার

0
133
বেলা তার

মূল । ডোনাটো টোট্যারো
অনুবাদ । রুদ্র আরিফ

বেলা তার

স্যাটানট্যাঙ্গো
[Sátántangó ]
ফিল্মমেকার । বেলা তার
স্ক্রিনরাইটার । বেলা তার; লাস্লো ক্রাস্নাহোর্কাই
উৎস-উপন্যাস । স্যাটানট্যাঙ্গো/ লাস্লো ক্রাস্নাহোর্কাই
প্রডিউসার । জিওর্জি ফেহেইর
সিনেমাটোগ্রাফি । গাবোর মেদভিগি
মিউজিক । মিহাইল ভিগ
এডিটর । আগ্নেস হ্রনিৎস্কি
কাস্ট [ক্যারেক্টার] । মিহাইল ভিগ [ইরিমিয়াস]; লাসলো লোগোসি [শ্যমিত]; পুতি হোবার্থ [পেত্রিনা]; ইভা আলমাসি অলবার্ত [মিসেস শ্যমিত]; ইয়ানোস দের্সি [ক্রেনার]; এরিকা বোক [এস্তিকা, ছোট্ট মেয়ে]; পিটার বের্লিং [ডাক্তার]
রানিংটাইম । ৪৩৯ মিনিট
ভাষা । হাঙ্গেরিয়ান
দেশ । হাঙ্গেরি, জার্মানি, সুইজারল্যান্ড


বেলা তারের স্যাটানট্যাঙ্গোর শেষ দৃশ্য হেঁয়ালিপূর্ণ ডাক্তার চরিত্রটি, যার জবুথবু শরীর ও নিদ্রাকাতর চালচলন যেন বেলা তারেরই ভের্কমাইস্টার হার্মোনিয়াক [Werckmeister Harmóniák] অতিপেটুক লোকটির মতোই অনেকটা, সে ধীরে ধীরে নিজের আবাসিক কোয়ার্টারের পুরো জানালাটি তক্তা দিয়ে বন্ধ করে দেয়। জানালাটির মুখোমুখি থাকা তার ডেস্কের পেছন থেকে এ কর্মকাণ্ড দৃশ্যবন্দি করে ক্যামেরা। সিনেমাটির শুরুর দিকে, যথেষ্ট শুরুর দিকে, প্রায় সাত ঘণ্টা আগের দৃশ্যে, ঠিক এই জায়গাই সিনেমাটির একটি গুরুত্বপূর্ণ টেম্পোরাল উদ্বোধন হিসেবে চিহ্নিত হয়েছিল। কিন্তু এখন আমরা বুঝতে পারি, শুধু ফ্রুট ব্র্যান্ডি [মদবিশেষ] ফুরিয়ে গেলেই কি না যে ডাক্তার নিজের ঘর থেকে বের হয়– তার এক সুদীর্ঘ জার্নির সমাপ্তি এসে দাঁড়িয়েছে।

এর আগের দৃশ্যেই আমরা তাকে নিজের জগদ্দল শরীরটা টেনে টেনে, দীর্ঘ এক রাস্তা ধরে হেঁটে যেতে দেখেছি, যে কি না এক পর্বত চূড়ায় দাঁড়িয়ে থাকা বিধ্বস্ত গির্জার সামনে গিয়ে থেমে, সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে, অবশেষে গির্জাটিতে ঢুকে পড়ে। যে শব্দ ধরে ডাক্তারটি হেঁটে যাচ্ছিল, সেই শব্দের উৎসের দিকে তারই সঙ্গে একটি এক্সট্রিম ক্লোজআপে ডলি ফরোয়ার্ড অব্যাহত রেখেছে ক্যামেরা : সেখানে এক বুড়ো লোক গির্জার পরিত্যক্ত ঘণ্টিতে একটি স্টিলের দণ্ডে তালে তালে বাড়ি মারছে আর চিৎকার করে একই কথার করছে পুনরাবৃত্তি : ‘তুর্কীরা আসছে…।’

বেলা তার
স্যাটানট্যাঙ্গো
ফিল্মমেকার । বেলা তার

কে এই বুড়ো? তুর্কী কারা? এই লোক কি স্বয়ং অতীতের এক পরিত্যক্ত ধ্বংসাবশেষ? মুহূর্তটির পরিষ্কার কোনো অর্থ নেই, তবে কোনো না কোনোভাবে এটি এমন এক অশুভ ও পূর্বলক্ষণমূলক পরিমণ্ডল উসকে দেয়, যেটি কি না সাত ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে চলা অভিন্ন রকমের চাপা উত্তেজনাপূর্ণ ‘সেন্সলেস’ মুহূর্তগুলোর এক নিখুঁত চরমসীমা।


‘…এবং
তখন সেখানে
আলো ছিল’– বাইবেলের
এমন প্রবাদতুল্য উক্তির দ্বারস্থ
হওয়ার বদলে বেলা তার বরং
আমাদের জন্য উল্টো
চিত্র হাজির
করেন

পরের শটটি সেই একই নোংরা রাস্তা ধরে ট্র্যাক ব্যাক করে– ডাক্তারের নিজ বাড়ি ফেরার। আমরা ফিরে আসি জানালাটির কাছে। ঘণ্টিবাদক লোকটি ডাক্তারের মনে নাড়া দিয়েছে বলে অনুভব করি আমরা। এবার সে শুধু নিজের বাড়ি ছাড়তে চায় না– তা নয়, বরং বাইরের বিকট পৃথিবী থেকেও নিজেকে পুরোপুরি সরিয়ে ফেলা দরকার বোধ করে। এক এক করে চারটি কাঠের তক্তা সে জানালায় সেঁটে দেয়; একটা একটা করে তক্তা লাগায়, বাইরের আলো একটু একটু করে কমতে থাকে। শেষ তক্তাটি আটকানো হলে ঘর ভরে যায় পুরো অন্ধকারে। ‘…এবং তখন সেখানে আলো ছিল’– বাইবেলের এমন প্রবাদতুল্য উক্তির দ্বারস্থ হওয়ার বদলে বেলা তার বরং আমাদের জন্য উল্টো চিত্র হাজির করেন। ইফেক্টটি মুহূর্তেই একইসঙ্গে আক্ষরিক ও রূপকধর্মী হয়ে ওঠে। চূড়ান্ত ইমেজটি আমাদের রেখে যায় এক মেটাফিজিক্যাল শূন্যগহ্বরে।

বেলা তার

বস্তুত, মেটাফিজিকসকের কোনো ইমেজ আমাদের সামনে জাহির করা যেকোনো সিনেমার মধ্যেই সবচেয়ে নিবিড়তম এটি। মেটাফিজিকসের বিখ্যাত বিদ্রূপপূর্ণ ‘পজিটিভিস্ট’ সংজ্ঞাটিকে যেকেউ চাইলে স্মরণ করতে পারেন : এক অন্ধকারাচ্ছন্ন ঘরে একটি কালো বিড়ালের অস্তিত্বহীনতার ভেতর। আজব ব্যাপার হলো, সিনেমাটির শুরুর দিকে একটি বিড়াল ঠিকই গুরুত্বপূর্ণ এক ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে– একজন বিষাদময় বেদনাবিধ্বস্ত ছোট্ট বালিকার এক অসহায় শিকার হিসেবে।

আলেক্সান্দার সকুরভের [১৯৯৭] মাদার অ্যান্ড সান-এর পর আমার দেখা সবচেয়ে আবেগাত্মক বিহ্বলকারী ফিল্মি অভিজ্ঞতা– স্যাটানট্যাঙ্গো। এ দুটির প্রকৃত আবেগের জায়গাগুলো হয়তো আলাদা; তবে শরীর ও মন– উভয়কেই সমানভাবে ছুঁয়ে গেছে এর সংবেদন। [দর্শক হিসেবে] অভিজ্ঞতার প্রশ্নে আমার কাছে স্যাটানট্যাঙ্গো তুলনামূলক সাম্প্রতিক হলেও, দুটি সিনেমাকেই সময়ের একটি একক ব্লক হিসেবে মনে হয়েছে; যদিও একটির সময়ব্যাপ্তি ৪৫০ [আরেক ভার্সন ৪৩৯] মিনিট, অন্যটির ৭২ মিনিট। উভয় সিনেমার বেলায়ই নিজের পা থেকে মাথা পর্যন্ত শরীরে যে সংবেদন আমি অনুভব করেছি, সেটি অভিন্ন : এক উল্লাসমুখর ও টেকসই মুহূর্তের পর একটি শান্ত ও অসাড় অনুভূতিতে আচ্ছন্ন হওয়া।

আজব ব্যাপার হলো, সময়ব্যাপ্তির এত ফারাক সত্ত্বেও, একটি সিনেমাকে আরেকটির চেয়ে ‘দীর্ঘ’ মনে হয়নি আমার। তবে এই মন্তব্যের বেলায় অসত্য হলো, স্যাটানট্যাঙ্গোর প্রকাণ্ড সময়ব্যাপ্তি নিঃসন্দেহে এটির নন্দনতাত্ত্বিক বিজয়ের একটি অখণ্ড অংশ : একটি জার্নির বোধ জেগে ওঠা ও সেটিতে পর্যবসিত হওয়া। যে কারণে এটির চেয়ে প্রায় ৩৮০ মিনিট কম সময়ব্যাপ্তির সিনেমাটির পক্ষেও একই ধরনের ইফেক্ট তৈরি করা সক্ষম, তা হলো– স্টাইলের প্রশ্নে অভিন্ন সুতোয় বাঁধা পড়া। উভয় সিনেমাই স্লো কিংবা পুনরাবৃত্তিমূলক অ্যাকশন, সাউন্ডস্কেপের টেক্সচার এবং প্রাকৃতিক ল্যান্ডস্কেপের সুতীব্র ব্যবহারের মধ্য দিয়ে সুবিস্তৃত লং-টেকের মাধ্যমে একটি ভাবাবিষ্ট মিজ-আন-সিন জাহির করেছে। তারপরও সময়ব্যাপ্তির প্রশ্নটি অনস্বীকার্য। স্যাটানট্যাঙ্গো সেইসব বিরল সিনেমার অংশ, যেটি নিজের নন্দনতাত্ত্বিক শক্তিকে সেটির সময়দৈর্ঘ্যের ওপর প্রভূত্ব করার মাধ্যমে ব্যাপকভাবে অর্জন করেছে।


স্ববিরোধিতা হলো সময়ের স্বভাবের
ভেতর অস্তিত্বমান একটি
প্যারাডক্সেরই
ফল

কথাটি শুনতে নিশ্চয়ই আমার আগের মন্তব্যের স্ববিরোধিতা মনে হচ্ছে; তবে স্ববিরোধিতা হলো সময়ের স্বভাবের ভেতর অস্তিত্বমান একটি প্যারাডক্সেরই ফল। যখন এটি সাবজেক্টিভ সময় হয়ে ওঠে, সেখানে ঘড়ির কোনো বালাই থাকে না। অন্তহীন সময়ব্যাপ্তির ঘটনা হয়তো সাময়িকভাবে এমন হৃদয়ঙ্গম নয়। সময়ের দর্শন বিষয়ে দুনিয়ার সবচেয়ে বিশিষ্ট পণ্ডিতদের অন্যতম, জে.টি. ফ্রস্টার এই প্যারাডক্স প্রসঙ্গে লিখেছেন, ‘সময়ের কোনো বালাই নেই কিংবা কখনো কখনো সময় এক অনন্ত বিষয় হয়ে ওঠে– এমন কোনো অতি সুতীব্র অভিজ্ঞতার মুখোমুখি আমরা সাধারণত হই, সেই ঘটনা আসলে সাবজেক্টিভ সময়ের প্যারাডক্সগুলোর অন্যতম।’

‘কম তীব্র’ ঘটনার ক্ষেত্রেও একই সত্য প্রযোজ্য হওয়া সম্ভব। ঘটনা হলো, সময় সম্পর্কে ধারণার প্রতি আমাদের অভিজ্ঞতা অনেক বেশি রূপ লাভ করে, যখন আমরা স্যাটানট্যাঙ্গোর মতো কোনো সিনেমার শেষ প্রান্তে এসে পৌঁছি; আমাদের খেয়ালই থাকে না, সিনেমাটি (দেখা) শুরু হয়েছিল দুপুর ২টায়, আর শেষ হলো রাত ১০টা ১০ মিনিটে [যেহেতু, ব্যক্তিগতভাবে আমি মাঝখানে দুটি ছোট ছোট বিরতি নিয়েছিলাম]; তবু এটি স্রেফ একটি একক সময়দৈর্ঘ্যের ঘটনা হয়ে রয়।

স্যাটানট্যাঙ্গো ঘটনাটি ছোট্ট এক প্রান্তিক শহরের আট সদস্যের কিংবা ছোট্ট এক দল মানুষদের পরস্পর-সংযুক্ত জীবনযাপনের ওপর একটি এপিক। স্থানীয় পাবে মদ খেয়ে সময় কাটায় এই লোকগুলো [বেলা তার নিজেও এইসব প্রান্তিক, ঘরোয়া পরিবেশের পাবগুলোতে সময় কাটাতে ভালোবাসেন]; আর অপেক্ষা করতে থাকে কোনো এক মিথ্যে মেসিয়াহ বা ত্রাণকর্তার, এক যিশুখ্রিস্টতুল্য লোকের– যার নাম ইরিমিয়াস, যে নিজের দুই সাঙ্গপাঙ্গকে [‘তিন বিজ্ঞলোক’] সঙ্গে নিয়ে শহর থেকে শহরে ঘুরে বেড়াচ্ছে এই গরিব লোকগুলোকে ধোকা দিয়ে, এবং তাদের তাৎক্ষণিক মুক্তি ও পরিত্রাণ এনে দেওয়ার কথা বলে তাদের এক বছরের বেতন হাতিয়ে নিয়েছে।

সে টাকা নিজের দখলে নেয় এবং তাদেরকে তাদের বাড়িঘর ছেড়ে পরের দিন সকালে তার সঙ্গে একটি পরিত্যক্ত উদ্যানবাড়িতে দেখা করতে বলে– যেটি কি না হয়ে ওঠবে তাদের পরিত্রাণের নিবাস। পরের দিন সকালে তারা যখন সেখানে হাজির হয়, গিয়ে দেখে তাদের সেই ত্রাণকর্তার খোঁজ নেই; তখন তারা একে অন্যের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে যায়। যখনই তারা মারমুখো অবস্থায় পর্যবসিত, তখনই সেই ত্রাণকর্তা জাহির; আর দীর্ঘ বয়ানে তাদের সঙ্গে প্রতারণা করতে থাকে এই বলে– সঠিক সময় আসার আগ পর্যন্ত তাদের স্বর্গীয় যৌথবসবাস স্থগিত করতে হবে; এবং তাদের জীবনযাপনের জন্য পাঠিয়ে দেয় ভিন্ন ভিন্ন শহরে।


যদিও
সে নিশ্চিতভাবেই
প্রতারক, তবু তার কাজ-কারবারের
মধ্যে যৎসামান্য
হলেও সত্য
রয়েছে

এই ত্রাণকর্তা চরিত্রটির ইন্টারেস্টিং ব্যাপার হলো, যদিও সে নিশ্চিতভাবেই প্রতারক, তবু তার কাজ-কারবারের মধ্যে যৎসামান্য হলেও সত্য রয়েছে। তার ভূমিকাটি প্রতিটি মানুষের নিজ নিজ আত্মবিরাগ কিংবা আত্মচেতনার অনুঘটক হয়ে ওঠে। একইসঙ্গে সে একজন কাল্ট লিডার এবং একইসঙ্গে একজন প্রেরণাদায়ী নেতা– যে কি না প্রতিটি মানুষের নিজ নিজ অন্তস্তলীয় শক্তিকে শনাক্ত করতে সক্ষম।

বেলা তার

দলটির বেশিরভাগ চরিত্রগুলোর মধ্যেই পারস্পরিক আলাপচারিতার দেখা আমরা পাই। আর এটি সিনেমাটির সবচেয়ে কৌতুকপূর্ণ দৃশ্যটিকে কমিকধর্মীতায় ফুটে ওঠেছে– পাবে চলা একটি সুদীর্ঘ নৃত্যে। ক্যামেরা এক উদ্ভটত্বের ভেতর দিয়ে এই নৃত্যকে ধারণ করেছে, মূলত একটি কিঞ্চিৎ হাই অ্যাঙ্গেল থেকে এক স্ট্যাটিক লং-টেকের মাধ্যমে। সেখানে প্রতিজনই পাড় মাতাল তখন। ঘটনাটির কেন্দ্রে এক যুগল, বছর চল্লিশেক বয়সের এক বিবাহিত নারী ও এক প্রণয়প্রার্থী– যে কি না যতটা নাচে, ততটাই অন্যদের সঙ্গে ধস্তাধস্তি ও অন্যদের ঠেলে সরিয়ে দেওয়ায় ব্যস্ত। নারীটির অনাগ্রহী স্বামী নিজের কপালে একটা বিশাল চিজ বান নিয়ে, সেটির ব্যালেন্স করতে করতে, ড্যান্স ফ্লোরের এ-মাথা থেকে ও-মাথায় হেঁটে বেড়ায়। ফ্রেমের একদম বাম কোণায় বসে থাকে এক একলা নারী। দাড়িঅলা এক লোক একই স্বগতোক্তি বারবার করতেই থাকে– সেদিকে কারওই মনোযোগ নেই; এক পর্যায়ে সে শুয়ে পড়ে বেঞ্চের ওপর, আর তালে তালে নিজের পা ঠুকতে থাকে মেঝেতে। [এই লোকটির স্বগতোক্তির এই বিরক্তিকর পুনরাবৃত্তির সঙ্গে সুবিশাল লং-টেক নেওয়ার ক্ষেত্রে বেলা তারের প্রবণতার একটি কমিকধর্মী আত্মবাচক ইঙ্গিত কেউ খুঁজে পেতেই পারেন; বিশেষ করে, যখন মাতাল লোকটি বারবার বলতে থাকে, ‘আমি চলছি তো চলছিই, চলছি তো চলছিই, চলছি তো চলছিই শুধু!’]


বিড়ালটিকে ইঁদুর মারার
যে বিষ খাইয়েছিল,
সেই একই বিষ
খেয়ে ফেলে
সে

খেয়াল রাখা দরকার, বেশিরভাগ চরিত্রকেই গ্রুপটিতে একসঙ্গে দেখা গেলেও দুটি চরিত্র– আগেই উল্লেখ করা ডাক্তার এবং সেই দশ বছর বয়সী মেয়েটি– যে প্রথমে বিড়ালটিকে মেরে ফেলে, তারপর আত্মহত্যা করে– তাদের দুজনকে সবসময় অনেকটা নিঃসঙ্গ অবস্থায়ই দেখা গেছে। তাদের সঙ্গে অন্য মানুষের দেখা-সাক্ষাৎ খুবই অল্প কয়েকবার ঘটেছে; এরমধ্যে তাদের দুজন পরস্পর একই রাস্তায় পরস্পরকে ক্রস করে গেছে পাবটির বাইরে। কেননা, এই দুটি চরিত্রের নিঃসঙ্গতা একদিক থেকে হয়ে উঠেছে সবচেয়ে মর্মবিদারক। ওই মেয়ে, যে কি না মাতাল ও ব্যভিচারীতে ভরা ওই শহরে আমাদের দেখা একমাত্র শিশু, সে তার নিজের আয়ত্বে থাকা একমাত্র ‘সম্পদ’কে মেরে ফেলে : প্রথমে মেরে ফেলে নিজের বিড়ালকে, তারপর নিজেকেই [বিড়ালটিকে ইঁদুর মারার যে বিষ খাইয়েছিল, সেই একই বিষ খেয়ে ফেলে সে]।

অন্যদিকে, নিজের ডেস্কে বসে, জানালা দিয়ে বাইরের, চারপাশের পৃথিবী দেখেই দিন কাটে ডাক্তারের; আর সেসব ঘটনা ছোট্ট একটি নোটবুকে সে পর্যাপ্তভাবে লিখে রাখে, প্রতিটি মানুষকে ঘিরেই। এই ডাক্তারই সিনেমাটির সবচেয়ে মনোমুগ্ধকর চরিত্র; থিমেটিক অনুরণনে ঋদ্ধ। তার এই পরিস্থিতি আমাদের মনে প্লাতোর [ওরফে, প্ল্যাটো] বিখ্যাত অ্যালেগরি অব দ্য কেভ বইটির কথা মনে করিয়ে দেয়। নিজের জানালার পরিমাপের ভেতরই বাস্তবতা সীমাবদ্ধ– এ সত্য বুঝতে পারে ডাক্তার। বাস্তব পৃথিবীর জন্য যখন নিজের ‘ছায়া’ ছেড়ে যায়, তখন সে ফিরে এসে ‘বাস্তব পৃথিবী’কেই আক্ষরিক অর্থে আটকে দেয় জানালায় তক্তা সেঁটে। সত্যের অন্ধত্বই তার কাছে শ্রেয় হয়ে ওঠে।

ডাক্তারের অবস্থানকে স্বয়ং ফিল্মমেকারের মধ্যেও চাইলে কেউ খুঁজে নিতে পারেন। বেলা তারের বিলাপী লং-টেকগুলোর মতোই, পৃথিবীটাকে ডাক্তারও দেখেন– সেটির পরিণামের ওপর কোনো মন্তব্য কিংবা সেটিকে বদলে দেওয়ার কোনো চেষ্টা চালানোর বদলে বরং প্রতিটি মিনিটের বর্ণনা একটি দূরত্ব বজায় রেখে দিতে। জোনাথন রোজেনবামকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বেলা তার নিজের অভিনেতা ও লং-টেক স্টাইল সম্পর্কে একই মনোভাব প্রকাশ করেছেন : ‘যদি ৬ মিনিটের কোনো লং টেক নিই আমি, অভিনেতাদের খুব বেশি কিছু বলে দিই না। তাদের স্রেফ পরিস্থিতিটি বলে দিই। তারপর বলি, আচ্ছা, শুট করা যাক! তারা স্রেফ নিজ নিজ ব্যক্তিত্ব থেকে, অন্তরের গভীরতা থেকে কর্মকাণ্ডের বিকাশ ঘটান। কেননা, তাদের তো আমি কোনো নির্দেশনা দিই না; তারা স্রেফ পরিস্থিতির ভেতর ঢুকে পড়েন। তারা কতটা ঢুকে পড়েন, সেটি তাদের চোখ দেখলেই বুঝতে পারবেন।… সেই পরিস্থিতি থেকে পালানোর কোনো উপায় থাকে না তাদের।’

বেলা তারের অবিশ্বাস্য রকমের লং-টেকগুলোর সঙ্গে, টেম্পোরালিটির দৃষ্টিকোণ থেকে আরেকটি ইন্টারেস্টিং ব্যাপার হলো, সিনেমাটির ন্যারেটিভ স্ট্রাকচার; এটিকে আমি ‘সারপ্রাইজ নন-লিনিয়ারিটি’ বলে ডাকি। সিনেমাটি শুরু হতেই আমরা ঘটনাগুলোকে সামনে বাড়তে দেখি, একটা লিনিয়ার টেম্পোরালিটি ধরে [নির্দিষ্ট শটগুলোর মধ্যে ছোটখাট এলিপসিস ঘটার মাধ্যমে]। একটি নির্দিষ্ট পয়েন্টে আমরা এক ধরনের দেজা ভ্যুর অভিজ্ঞতা পাই, যেটি এই টেম্পোরাল ফাউন্ডেশন নাড়িয়ে দেয় : আমাদের দেখা একটি দৃশ্যের পুনরাবৃত্তি ঘটতে দেখি, তবে এ বেলা একেবারেই ভিন্ন একটি দূরত্বগত ও ন্যারেশনাল দৃষ্টিকোণ থেকে। এ বেলা মুহূর্তটির আবির্ভাব ঘটে, যেটির উল্লেখ শুরুতেই করেছি, ডাক্তারের ডেস্কের পজিশন থেকে।

সিনেমাটির দ্বিতীয় দৃশ্যে আমরা এক পুরুষের দেখা পাই, যে এক বিবাহিত নারীর সঙ্গে রাত কাটিয়েছে, সে বাড়িটি থেকে লুকিয়ে বেরিয়ে আসে– ওই নারীর স্বামী বাড়ি ফিরেছে বলে। ক্যামেরা এরপর ‘কাট’ করে চলে আসে বাইরে, দেখায় স্বামীটির দৃষ্টির আড়ালে, বাড়ির এক কোণায় সেই ব্যভিচারীর লুকিয়ে থাকার একটি চিত্র; আর স্বামীটির দেখা পাই মিডল ব্যাকগ্রাউন্ড শটে– বিস্তৃত পরিসরে।

সিনেমাটির প্রায় ৪০ মিনিটের সময় আমরা স্বামীটির কাছ থেকে এই লোকটির লুকিয়ে থাকার সেই একই মিজ-আন-সিনের দেখা পাই, তবে এবার ডাক্তারের দৃষ্টিকোণ থেকে– সে নিজের নোটবুকে ঘটনাটি লিখে রাখে। এই পুনরাবৃত্তিমূলক টেম্পোরালিটির আবির্ভাব ঘটে বেশ কয়েকবার । সিনে-সমালোচক র‌্যান্ডলফ জর্ডান আমাকে বলেছেন, ভ্যানকুভারে [শহর, কানাডা] বেলা তার যখন সিনেমাটি দেখিয়েছেন, তখন এটির টেম্পোরাল স্ট্রাকচারের ব্যাখ্যা তিনি ট্যাঙ্গো ব্যবহারের মাধ্যমে দিয়েছেন : দুই স্টেপ সামনে, এক স্টেপ পেছনে। সিনেমাটিতে রূপক হিসেবে মাকড়সার ব্যবহারের মধ্যেই এই টেম্পোরাল স্ট্রাকচারের একটি অনুরণন যে কেউ চাইলে খুঁজে নিতে পারেন।

বেলা তার

সিনেমাটির বেশ কিছু ইন্টারটাইটেলে মাকড়সার উল্লেখ করা হয়েছে; এবং পাবের সেই সুদীর্ঘ নৃত্যদৃশ্যের শেষদিকেও সশরীরেই উপস্থিতি ঘটেছে মাকড়সার। মাতাল ফূর্তিবাজদের একটি লং-লেটারাল-ট্র্যাকিং শটে একটি মাকড়সা তুলনামূলক ছোট্ট একটি দৃশ্যে, একটি শটের ফোরগ্রাউন্ডে দুটি গ্লাসের মধ্যে জাল বুনতে থাকে। ভয়েসওভার আমাদের জানিয়ে দেয়, অবজেক্টগুলোকে ঘিরে, পাবের এই লোকগুলোকে ঘিরে একটি জাল বুনে যাবে মাকড়সাটি, আর সেটি সেই ত্রাণকর্তা লোকটির ফাঁদের অনুরণন। মাকড়সার জালটির ও-রকম সর্পিল রূপকটি সিনেমাটির ন্যারেটিভ টেম্পোরালিটির একটি যথার্থ সমান্তরাল রূপ যেন। এ ধরনের ‘সারপ্রাইজ নন-লিনিয়ারিটি’ সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সিনেমায় খুবই সুপরিচিত একটি বিষয় হয়ে উঠেছে। মাত্রা ও সমাপ্তিতে অসামঞ্জস্য এনে দিতে এ রকম স্ট্রাকচারের ব্যবহার ঘটেছে বেশ কিছু সিনেমায়। এর মধ্যে রয়েছে কোরিয়ান ফিল্মমেকার হং স্যাং-জুর দ্য পাওয়ার অব কাংয়ুন প্রোভিন্স [Kangwondo Eui Him; ১৯৯৮] ও ভার্জিন স্ট্রাইপড বেয়ার বাই হার নেকেড ব্যাচেলরস [২০০০]; মিস্টেরি ট্রেন [জিম জারমুশ; ১৯৮৯], পাল্প ফিকশন [কুয়েন্টিন ট্যারান্টিনো; ১৯৯৫], হেভেন [স্কট রেনল্ড’, ১৯৯৮], বিফোর দ্য রেইন [মিল্চো মাঞ্চেভ্স্কি; ১৯৯৪] এবং অ্যা মোমেন্ট অব ইনোসেন্স [মোহসেন মাখমালবাফ; ১৯৯৬]।

একটি সিঙ্গুলার ডিউরেশনের এই উপরোক্ত প্রবণতার পোষকতা ও উৎসাহটি ব্যাপকবিস্তৃত লং-টেকে বেলা তারের শুটিংয়ের মেথড। বলতে পারি, সিনেমাটির প্রায় ৯০ শতাংশ শটই অন্তত এক মিনিট দৈর্ঘ্যের; এবং সিকুয়েন্স শটগুলোর অনেকগুলোকেই একটি ক্যামেরা ম্যাগাজিনের [আনুমানিক ৯ থেকে ১১ মিনিট] পূর্ণ দৈর্ঘ্যের সমান। আসলে, এই অবাধ ক্যামেরা স্টেয়ার থেকেই স্যাটানট্যাঙ্গো নিজের বেশিরভাগ শক্তি জড়ো করেছে। পরাবাস্তববাদী যুক্তি সহকারে আপনি যদি কোনোকিছুর প্রতি স্থিরদৃষ্টিতে যথেষ্ট দীর্ঘ সময় ধরে তাকান, তাহলে সেটিকে অনাসৃষ্টি মনে হবে। বহুবারই বেলা তারের অবাধ ক্যামেরা স্টেয়ার এমনই একটি ইফেক্ট অর্জন করেছে। খোলা ময়দানে এক পাল গরুর এলোমেলো হেঁটে বেড়ানোর সেই সুদীর্ঘ আট মিনিট দৈর্ঘ্যের লং-টেকের অবিশ্বাস্য রকমের ওপেনিং শট দিয়েই [এই সিনেমায়] এর যাত্রা শুরু।

প্রথম কয়েকটি মিনিট ক্যামেরা একদম স্ট্যাটিক রয়ে গেছে– গরুগুলোর কাছ থেকে একটু দূরবর্তী অবস্থানে। গরুগুলো হাঁটাচলা করেছে ঠিকই, তবু সেগুলোকে দেখতে লেগেছে যেন স্টিল ক্যামেরার বর্ডারে ধরা পড়া দৃশ্যের মতো। ক্ষণে ক্ষণে একটা ষাড় একটা গাভীর ওপর চড়ে বসতে চেয়েছে। এরপর কী হবে? আমাদের ধৈর্যশক্তি রেহাই পায় তখন, যখন একটা একা ষাড় পাল থেকে বেরিয়ে, ক্যামেরাটিকে যেন ভয় দেখিয়ে এগিয়ে আসতে থাকে। আর এটিকে যেন একটি সূত্র হিসেবে ধরে, বাকি গরুগুলো স্ক্রিনের বাম দিকে সরে যেতে থাকে; আর ক্যামেরাটি বামে ট্র্যাক করে সেগুলোকে অনুসরণ করতে শুরু করে।

এই লং-টেকজুড়ে এক ধরনের পূর্বলক্ষণসূচক বোধ, অদেখা কোনো কিছুর উপস্থিতি কিংবা শক্তির বোধ তৈরি হয়েছে। এই মুড পুরো সিনেমাজুড়ে বহমান থেকেছে। আর তা থাকার ক্ষেত্রে, এই মুড বজায় রাখার ক্ষেত্রে অপরিমেয় সাহায্য করেছে সাউন্ডট্র্যাক। স্মৃতি যদি আমার সঙ্গে বেইমানি না করে, তাহলে বলতে পারি, এই সিনেমায় কোনো জেনেরিক মিউজিক নেই। তার চেয়ে বরং বেলা তার ড্রামসের এক পুনরাবৃত্তিমূলক দূরবর্তী গুঞ্জনধ্বনি, একটি ঘণ্টি ও এক ট্রেনের হুঁইসেল প্রয়োগ করেছেন। ওপেনিং শটটির ক্ষেত্রে এই পারলৌকিক ‘মিউজিক’কে সঙ্গ দিয়েছে গরুগুলোর প্রাকৃতিক শব্দ।

হাঙ্গেরিয়ান বিরান সমতটে বেলা তারের লং-টেকের বিষয়টি বহুবারই হাঙ্গেরির আরেকজন অসাধারণ লং-টেক স্টাইলিস্ট– মিকলোস ইয়াঞ্চোর কথা মনে করিয়ে দেয়। এই অবাধ ক্যামেরা স্টেয়ার যখন স্রেফ কর্দমাক্ত বিরানভূমিকেও অনুসরণ করে, তখনো ক্রমবর্ধমান নাটকীয়তার ইফেক্ট তৈরি করতে সক্ষম। স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি ‘ধীরগতি’র ক্যামেরা ওয়ার্ক ও টেম্পোরালিটির বোধ জাহির করা ফিল্মমেকারদের নামের দীর্ঘ একটি তালিকা আমার পক্ষে করা সম্ভব [আমি শুধু অল্প কয়েকজনের নাম নিতে চাই : কেঞ্জি মিজোগুচি, কার্ল ড্রায়ার, আন্দ্রেই তারকোভস্কি, আলেক্সান্দার সকুরভ, হৌ সিয়াও-সিয়েন, সিং মিং-লিয়াং ও থিও আঙ্গেলোপুলোস]।

স্যাটানট্যাঙ্গোতে কোনো প্রচলিত বোধের প্রশ্নে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই যৎসামান্য অ্যাকশন, মুভমেন্ট কিংবা ন্যারেটিভ ডেভেলপমেন্ট সহকারে এই সুবিস্তৃত লং-টেকগুলো কেন মনোমুগ্ধকর ও তুমুল হয়ে উঠেছে [ব্যক্তিগত রুচির বিষয়টি যদি বাদও দিই]? এর উত্তর খুঁজতে চলুন ন্যারেটিভ ড্রামার নাটকীয়তা ও ড্রামা অব দ্য মোমেন্টের বা মুহূর্তের নাটকীয়তার মধ্যে পার্থক্য টানা যাক। জনপ্রিয় ও আর্ট ফিল্ম– উভয় ধরনেরই বেশিরভাগ সিনেমাতে সেগুলোর ড্রামার আবির্ভাব ঘটে প্রেক্ষাপট এবং/কিংবা চরিত্রগুলোর নিয়তির সঙ্গে আমাদের [দর্শক] সম্পৃক্ততার ভেতর থেকে। ড্রামা এমন কিছুর সৃষ্টি, যেটিকে নোয়েল ক্যারোল [আমেরিকান দার্শনিক] অভিহীত করেছেন ‘ইরেটেটিক ন্যারেটিভ’ হিসেবে : কোনো একটি দৃশ্যে প্রশ্নের উত্থাপন ঘটে, তারপর পরবর্তী [হয় একদম পরের, নয়তো খানিকটা পরের] শট ও দৃশ্যগুলোতে সেটির উত্তর আসে। মর্মপীড়া থেকে কুমারীকে উদ্ধার করতে নায়ক কি আসবে? খুনি কে? অপহৃত শিশুটির ভাগ্যে কী ঘটবে? নতুন ভূমিকায় মানিয়ে নিতে পারবে তো নায়িকা? প্লট ও কাহিনির মুভমেন্টের ভেতর থেকে ড্রামার আবির্ভাব ঘটে।

এর বিপরীতে, স্যাটানট্যাঙ্গোতে (মূলত) লং-টেকগুলোর ভেতর থেকে এটির আবির্ভাব ঘটেছে, যেখানে প্লট কিংবা কাহিনির সঙ্গে ড্রামা অর্জনের বড় ধরনের সম্পর্ক নেই; বরং দর্শকই স্রেফ অধীর হয়ে ওঠে– এর ঠিক পর মুহূর্তে কী ঘটবে? কিংবা, আরও স্পষ্ট করে বললে, কিছু একটা ঘটবে কখন? কিংবা, কখন ভিন্ন কিছু ঘটবে? যেমন ধরুন, ছোট্ট বালিকাটি যখন নিজের বিকলাঙ্গ পোষা বিড়ালটিকে নির্যাতন করছিল, দুধের বাটিতে বিড়ালটির মুখ নিরন্তর চেপে ধরছিল সে। এরপর বিড়ালটিকে সেখানে রেখে সে পেছাতে থাকে– যতক্ষণ না তার পিঠ দেয়ালে গিয়ে ঠেকে। দেয়ালে ছোট্ট মেয়েটির সেই ইমেজ তার নিজেরই মর্মান্তিক অন্ধগলি জীবনের এক দুর্দান্ত রূপক হয়ে উঠেছে।

যৎসামান্য ‘অ্যাকশন’ সহকারে ক্যামেরাটি তখন স্ট্যাটিকই রয়ে যায়। মেয়েটি একটুও নড়ে না; বিড়ালটিও নিজের বিকলাঙ্গ শরীর বলতে গেলে নাড়াতে অক্ষম। কিন্তু এরপর কী হবে– (দর্শকের) এই ভাবনার ভেতর থেকেই ড্রামার আবির্ভাব ঘটে। পা নাড়াতে অক্ষম বেচারা বিড়ালটি বাটি থেকে নিজের মাথা সরানোর খানিকটা চেষ্টা করে। বিড়ালটি কি বেঁচে যাবে? নাকি মারা যাবে দুধে ডুবে? অতীতের মতো আবারও কি মেয়েটি বিড়ালটিকে আরও আছাড় মারবে? সে কি ছুটে কি বলের মতো লাথি মারবে বিড়ালটিকে [ব্যক্তিগতভাবে আমার এমনটাই মনে হয়েছিল]? এইসব ছোটখাট বহুমাত্রিক সম্ভাবনাগুলো এই ড্রামাটিক মোমেন্টকে তৈরি করেছে।

বেলা তার

‘ড্রামা অব দ্য মোমেন্ট’-এর আরও কিছু উদাহরণ দেওয়া যাক। নিজেদের ওই ত্রাণকর্তার পুনরুত্থানের প্রথম রাতে তার অনুসারীরা একসঙ্গে একটি বিশাল কক্ষে ঘুমিয়ে পড়ে। ব্যালকনিতে বসে থাকা এক প্যাঁচার দিকে একটি স্লো ডলি ফরোয়ার্ড শটের মাধ্যমে দৃশ্যটির শেষ টানা হয়। প্যাঁচার ওই উপস্থিতির কী অর্থ? ভ্রুণের ভঙ্গিমায় শুয়ে থাকা একটি চরিত্রের মাথার ওপর দিয়ে ‘সিলিং’-এ গিয়ে ‘কাট’ হয় শটটি। তারপর ক্যামেরা স্লো ডলিতে ঘুমন্ত অন্যদের পেরিয়ে যেতে থাকে, আর পরিণামে সেই প্রথমে দেখা ঘুমন্ত লোকটির কাছে ৩৬০ ডিগ্রিতে ফিরে আসে।


যেন
ধীরে ধীরে
ঘুরতে থাকা কোনো
সিলিং ফ্যানের দৃষ্টিকোণ
থেকে দেখানো
হচ্ছে

কিন্তু শটটি আবারও চলতে শুরু করে সেই একই মুখের দিকে; বারবার, বারবার। মুভমেন্ট আর গ্রাউন্ড কাভার এতটাই অবিচল যে, যেন ধীরে ধীরে ঘুরতে থাকা কোনো সিলিং ফ্যানের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখানো হচ্ছে এটি। একইসঙ্গে (দর্শক হিসেবে) অবাক হয়ে ভাবতে থাকি, তাদের মধ্যে কেউ জেগে যাবে না তো? ক্যামেরার এই অর্ধবৃত্তিমূলক বিচরণ কি থামবে কখনো? এটি কি ঘুমিয়ে স্বপ্ন দেখতে থাকা কারও দৃষ্টিকোণ [ভয়েসওভার আমাদের জানিয়ে দেয়, ঘুমন্তদের মধ্যে স্বপ্নে ভেসে বেড়ায় মিসেস শ্যমিত]?

একটু আগে উল্লেখ করা, বিধ্বস্ত গির্জা থেকে ডাক্তারের ফিরে আসা অনুসরণ করা ডলি শটটি– ডাক্তারকে ছেড়ে, নিজের অস্থায়ী ঘণ্টি বাজাতে থাকা বিপর্যস্ত চেহারার বুড়ো লোকটির মুখের ওপর একটি ক্লোজআপ শট হয়ে থেমেছিল। সেই মুখের ওপর ক্যামেরা কয়েক মিনিট ধরে থিতু ছিল। আমরা তখন অবাক হয়ে ভাবতে শুরু করেছিলাম, এই ঘণ্টি বাজানো কি কখনো থামাবে সে? কেন সে এটা করছে? কতক্ষণ ধরে করবে?

অন্যদিকে, পাবে নাচের দৃশ্যেও একই রকম ইফেক্টের দেখা পাই– অ্যাকশনটির পুনরাবৃত্তিমূলক ধরনের মাধ্যমে। সেই একই কথা বিরক্তিকরভাবে দাঁড়িওয়ালা লোকটি যে বলেই যাবে, সে কি কখনোই চুপ করবে না? কেন কেউ তাকে একটু চুপ করতে বলছে না? একবার নাচ শুরু হয়ে গেলে, তারা একইরকমভাবে নাচতেই থাকে। আর অ্যাকোর্ডিন বাদকটিও একই মিউজিক বারবার, বারবার বাজায়। এই উদ্ভটত্বের শেষ হবে কখন? কখন ওই অ্যাকোর্ডিয়নিস্ট বাজাবে কোনো ভিন্ন মিউজিক? এ রকম লং-টেকে ভরা এই সিনেমা মূলত সিঙ্গুলারের ওপর মনোযোগ দেওয়ার মাধ্যমে মুহূর্তকে জোরাল করে তুলেছে।

এই ‘ড্রামা অব দ্য মোমেন্ট’ অর্জনের পথে লং-টেকগুলোর সঙ্গে আরেকটি ফরমাল বৈশিষ্ট্য সঙ্গী হয়, তা হলো– পরিবর্তনশীল রিদমিক্যাল প্যাটার্ন, যেটি একটি সুস্থিরতাকে প্রতিষ্ঠা করে আমাদেরকে আচ্ছাদিত রাখার ও আমাদের সংবেদনশীলতার পরিবর্তন ঘটানোর জন্য। এই রিদমিক্যাল প্যাটার্নের বেশিরভাগ অংশই ধ্বনিত : একটি টিক টিক করতে থাকা ঘড়ি, একটি শোঁ শোঁ আওয়াজ করা ফ্যান, একটি রিফিজারেটর মটরের গুঞ্জরণ, কিংবা বৃষ্টির একটানা টুপটাপ শব্দ। ওপরে উল্লেখিত, ৩৬০ ডিগ্রিতে ওভারহেড ট্র্যাকিং শটের দৃশ্যটিতে, ক্যামেরা মুভমেন্ট নিজেই একটি রিদমিক্যাল প্যাটার্ন হয়ে উঠেছে। ইফেক্টটি এমনই, প্রতিটি লং-টেকই একটি সুনির্দিষ্ট ম্যাটেরিয়ালিটি, একটি টেম্পোরাল ঘনত্ব অর্জন করে– যা কি না ‘ড্রামা অব দ্য মোমেন্ট’কে ক্রমোন্নতিতে পৌঁছতে সাহায্য করে।

যদিও সমালোচকরা বেলা তারের সিনেমাগুলোতে রূপকধর্মী ও রাজনৈতিক ব্যাখ্যা খুঁজে পেতে উদগ্রীব, তবু তিনি নিজেই কঠোরভাবে এ ধরনের আলোচনার বিরোধিতা করেন [ঠিক যেমনটা করতেন তারকোভস্কি]। স্যাটানট্যাঙ্গো এতটাই কুহেলিকাপূর্ণ যে, হাঙ্গেরিয়ান কিংবা পূর্ব ইউরোপীয় রাজনীতির কোনো রাজনৈতিক রূপকধর্মী ফর্মে এই সিনেমাকে ভাবার যেকোনো প্রচেষ্টা এটিকে শুধু জোর করে জেনারালাইজেশনে নিয়ে যেতে পারে। অবশ্য যে দৃশ্যে ইরিমিয়াস এক পুলিশ অফিসারকে বলে, কখনো কোনো ধরনের কোনো কাজ করার উদ্দেশ্য তার নেই, সেটি নিশ্চিতভাবেই কমিউনিস্ট-পূর্ব অর্থনৈতিক অস্থিরতার ইঙ্গিত দেয়। তারচেয়ে বরং, মানব দুর্দশার এক দাপুটে ‘মুহূর্তগুলো’র জন্যই স্যাটানট্যাঙ্গোকে উপভোগ করা শ্রেয়।

আর এ কারণেই (আমেরিকান সিনে সমালোচক) জিম হবারম্যান স্যাটানট্যাঙ্গোকে অভিহীত করেছেন, ‘দূরদর্শী দুর্দশাবাদের একটি মাস্টারপিস’ সিনেমা হিসেবে। ভের্কমাইস্টার হার্মোনিয়াক-এ যেমনটা দেখি, সে রকমভাবেই, দুর্দশাবোধের আবির্ভাব ঘটে মনুষ্যস্বভাব থেকে : বানোয়াট ত্রাণকর্তাদের কাছে নিজেদের সব আশা সঁপে দেয় যেসব মানুষ, পরিণামে তারা ক্রোধ, নৈরাশ্য, বিষণ্নতা, উন্মত্ততা, ব্যভিচার ও আত্মহনন ছাড়া কিছুই পায় না।

তবে মনুষ্যত্বের অবস্থার আরও ভালো ও পরবর্তী ব্যাখ্যা জাহির হয়েছে স্যাটানট্যাঙ্গোতে [এবং ড্যামনেশনভের্কমাইস্টার হার্মোনিয়াক-এ], তাতে প্রচলিত সৌন্দর্য ও প্রতিভার বৈপরীত্য ফুটিয়ে তুলেছেন বেলা তার। এবং, দুর্দশার ভেতরে তিনি জুড়ে দিয়েছেন তার নিজের সবিশেষ নিষ্ঠুর রসিকতা ও ঘৃণাবাদের চিহ্ন। ত্রাণকর্তাতুল্য চরিত্র ইরিমিয়াস ও তার দুই সাঙ্গপাঙ্গের ব্যাক-টু-ব্যাক ট্রাভেলিং দৃশ্যগুলো এর দারুণ উদাহরণ। ইরিমিয়াসকে একজন বাগাড়ম্বরকারী চরিত্র হিসেবে বেলা তার যেভাবে পরিষ্কার করে দিয়েছেন তার নিজের ও তার দুই সাঙ্গপাঙ্গের আসা-যাওয়ার দৃশ্যটির মধ্য দিয়ে। এই তিন লোকের একটি ফ্রন্টাল শটে ক্যামেরা ‘কাট’ করেছে। নিজেদের সামনে যা-ই রয়েছে, সেটিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রয়েছে এই তিনজন। যা দেখতে পেয়েছে, তাকে বিশেষত শিহরিত হয়ে উঠেছে বলে মনে হয় ইরিমিয়াসকে; যেন তার পা অবশ হয়ে এসেছে। বেলা তার এখানে এমন এক ধরনের মিউজিক ব্যবহার করেছেন, তা হয়ে উঠেছে যেন ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের সঙ্গে মানানসই।

তারা যে জিনিসের দিকে তাকিয়ে রয়েছে, আমরা অবশেষে সেটির একটি দলবদ্ধ দৃষ্টিকোণের শটের দেখা পাই : ধীরে ধীরে সরে যাওয়া কুয়াশার ভেতর একটি জমকালো বিনাশের আভা। ক্যামেরার দিকে পেছন ফিরে থাকা এই লোক তিনটি যেন হাঁটতে শুরু করবে– এমন অবস্থায় ‘কাট’ করা হয় শটটি। আমাদের কানে ভেসে আসে ইরিমিয়াসকে তার এক সঙ্গীর করা হিমশীতল জিজ্ঞাসা : ‘এ রকম কুয়াশা জীবনেও কোনোদিন দেখনি তুমি?’

পরের শটেই ক্যামেরা হাই-পজিশনে রেখে একটি অতিকায় শূন্য চত্বরের দেখা মেলায়, যেটির মাঝখানে রয়েছে একটি ফোয়ারা, এবং ব্যাকগ্রাউন্ডে, দু’পাশে রয়েছে দুটি অতিকায় ইমপেরিয়াল স্টাইলের বিল্ডিং। শটটির মধ্যে কয়েক সেকেন্ডের জন্য গোটা বিশেক ঘোড়া ঢুকে পড়ে এগিয়ে যেতে থাকে চত্বরের দিকে– দুই বিল্ডিংয়ের মাঝখানের সরু রাস্তাটি ধরে। ওরা ময়দানের মাঝ বরাবর এগিয়ে যায় আর ফোয়ারাটি ঘিরে কদম ফেলতে থাকে। ক্যামেরা তখন ক্রেন-ডাউন করে পেছন থেকে দেখিয়ে দেয়, ঘোড়াগুলোর এমন অপ্রত্যাশিত আবির্ভাবে ওদের দিকে কীভাবে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রয়েছে ওই তিন ভ্রমণকারী।

ঠিক আগের মতোই, এই সম্ভাব্য জাদুকরি মুহূর্তটিকে আন্ডারকাট করে একটি নিরস সংলাপ : ‘মনে হচ্ছে ঘোড়াগুলো আবার কসাইখানা থেকে পালিয়ে এসেছে!’ যা দেখছে, তাতে যেন সন্তুষ্ট নয় বেলা তারের এই অবিশ্বাসী চরিত্রগুলো; তবে এটি যে বেলা তারেরই সিনেমা, সে ব্যাপারে তার দর্শকদের এক ভিন্ন ধরনের অনুপম অভিজ্ঞতা হয় ঠিকই।


ডোনাটো টোট্যারো
সম্পাদক, অফস্ক্রিন, অনলাইন ফিল্ম জার্নাল, কানাডা
Print Friendly, PDF & Email
শেয়ার
সম্পাদক : ফিল্মফ্রি । ঢাকা, বাংলাদেশ।। সিনেমার বই [সম্পাদনা/অনুবাদ] : ফিল্মমেকারের ভাষা [৪ খণ্ড : ইরান, লাতিন, আফ্রিকা, কোরিয়া]; ফ্রাঁসোয়া ত্রুফো : প্রেম ও দেহগ্রস্ত ফিল্মমেকার; তারকোভস্কির ডায়েরি; স্মৃতির তারকোভস্কি; হিচকক-ত্রুফো কথোপকথন; কুরোসাওয়ার আত্মজীবনী; আন্তোনিওনির সিনে-জগত; কিয়ারোস্তামির সিনে-রাস্তা; সিনেঅলা [৩ খণ্ড]; বার্গম্যান/বারিমন; ডেভিড লিঞ্চের নোটবুক; ফেদেরিকো ফেল্লিনি; সাক্ষাৎ ফিল্মমেকার ফেদেরিকো ফেল্লিনি ।। কবিতার বই : ওপেন এয়ার কনসার্টের কবিতা; র‍্যাম্পমডেলের বাথটাবে অন্ধ কচ্ছপ; হাড়ের গ্যারেজ; মেনিকিনের লাল ইতিহাস ।। মিউজিকের বই [অনুবাদ] : আমার জন লেনন [মূল : সিনথিয়া লেনন]

মন্তব্য লিখুন