গোদারের চলচ্চিত্র: নবতর চিত্রভাষার প্রস্তাবনা

345
জ্যঁ-লুক গোদার

লিখেছেন: শুভদীপ ঘোষ

‘সে আপনার অতীব শ্রীযুক্ত মুখমণ্ডলের খাসা সীম বীজ নাসার বেসর সেখানে ঝুটাপান্না– মনোলোভা পান্নার ইহকালের অচীন সুদীর্ঘতা বহু সন্তরণে অতিক্রম করত আসিয়া স্থির মূর্ত, উহাতেই দোমনা অঙ্গুলি প্রদান করে এবং অঙ্গুলিতেই নির্ঘাত, অবশ্যই, তাহার, সুহার….’, একজন প্রথিতযশা সাহিত্যিক বলেছিলেন, কমলকুমার মজুমদার বাংলাতে বিশুদ্ধ ফরাসি লেখেন! এদিকে এই ফরাসি দেশেই বিশুদ্ধ চলচ্চিত্রের কারিগর জ্যঁ-লুক গোদার [৩ ডিসেম্বর ১৯৩০–১৩ সেপ্টেম্বর ২০২২] সম্প্রতি বিদায় নিলেন চিরতরে।

বিশুদ্ধ যেকোনো কিছুই কি সাধারণ অর্থে দুর্বোধ্য হয়? সংগীতের প্রধান যেমন সুর, কথা নয়; সে হিসেবে ভারতীয় মার্গসংগীত বা ওয়েস্টার্ন ক্লাসিকালের কথা ভাবুন! বিশুদ্ধ সাহিত্যের উদাহরণ স্বরূপ জেমস জয়েস বা কমল মজুমদার বা স্যামুয়েল বেকেটের কথা ভাবুন! আর আধুনিক কবিতার চিরায়ত-ছন্দবিহীন নির্দিষ্ট-অর্থবিহীন অবয়বই তো তার সৌন্দর্য। অনেকে হয়তো ‘বিশুদ্ধ’ কথাটি একটু বেশি সাধারণ অর্থ বহন করছে মনে করে, পরিবর্তে ‘নিরীক্ষামূলক ও ব্যক্তিগত’– এরকম বলতে চাইবেন। সে যাই হোক। চলচ্চিত্রের ক্ষেত্রে গোদারও তাই।

লে ক্যারিবিনিয়ার্স। ফিল্মমেকার: জ্যঁ-লুক গোদার

‘গোদারের ছবি সহজবোধ্য নয়। কিন্তু সেটা গোদারের দোষ নয়। পঞ্চাশ বছর ধরে যে মনোভাব সিনেমাকে আর্থিক লোকসানের ভয় দেখিয়ে least resistance-এর পথে নিয়ে গেছে এবং দর্শককেও সেই পথে চলতে বাধ্য করেছে, এটা তার দোষ।’ —চলচ্চিত্রের ভাষা: সেকাল ও একাল প্রবন্ধে সত্যজিৎ রায় লিখেছিলেন এ কথা। ‘ফাইন আর্ট’ হিসেবে স্বীকৃত যে কটি শিল্পকলা আছে চলচ্চিত্রকে বলা হয়, তার মধ্যে নবতম এবং এ কথা অনস্বীকার্য যে সম্ভবত একমাত্র এই শিল্পকলাটিরই জন্ম পাশ্চাত্যের জরায়ুতে। শুধু জন্ম নয়, এর লালন-পালন, পুষ্টি-সাধন সবই কম-বেশি ওদেশেই এবং এটি উন্নত প্রযুক্তির হাত ধরে সৃষ্ট শিল্প।


গোদারের আগের ও তার সমসাময়িক
চলচ্চিত্রের এক বিরাট অংশের
সঙ্গে তার নিজের চলচ্চিত্রের
বিরোধের জায়গাটা নিয়ে
তার সময় থেকেই
আলোচনা হয়ে
চলেছে

দূর থেকে ট্রেন আসার দৃশ্য বা একটি মানুষের মুখ– প্রাথমিক এইসব সেক্ট্যাক্যাল কাটিয়ে চলচ্চিত্র ক্রমেই হয়ে ওঠে গল্প নামক শ্রুতি-বিদ্যার দৃশ্যগত প্রতিরূপ। চলচ্চিত্রর এই রূপটিই শুরুর অবস্থা থেকে আজ পর্যন্ত বিরাজমান মূল রূপ। গোদার সেই হিসেবে বৈপ্লবিক। গোদারের আগের ও তার সমসাময়িক চলচ্চিত্রের এক বিরাট অংশের সঙ্গে তার নিজের চলচ্চিত্রের বিরোধের জায়গাটা নিয়ে তার সময় থেকেই আলোচনা হয়ে চলেছে।

আপনার সন্তানকে আপনি কী আদবকায়দা শেখাবেন, কী ভাষায় কথা বলাবেন– এর সঙ্গে যুক্ত থাকে অর্থনৈতিক-সামাজিক পরিসর। প্রতিবাদী স্বর অবশ্যই কাম্য; কিন্তু সেই করতে গিয়ে অকালমৃত্যু কাম্য নয়– চলচ্চিত্রের মতো ব্যয়বহুল মাধ্যমে এটা সম্ভব খরচ কমানোর বিভিন্ন উপায়ের কথা চিন্তা করে। পেশাদারী অভিনেতাদের দিয়ে অভিনয় করানো এবং ট্র্যাকিং-জুম-ডিসল্ভ যথাসম্ভব কমিয়ে দৃশ্যাবলীকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য জাম্প-কাট ব্যবহার– প্রারম্ভিক গোদারের ছিল এই দুটি উপায়! দ্বিতীয় উপায়টিই ছিল গোদারীয় বিপ্লবের মূল উদ্ভাস। এই জন্য অনেক তাত্ত্বিক আজও মনে করেন তিনি বাস্তবিকই চলচ্চিত্রের সনাতন নির্মাণশৈলীকে সম্পূর্ণ ধ্বস্ত করে দিয়েছিলেন। তিনি প্রথাবিরোধী এবং আপসহীন চলচ্চিত্রকার!


চলচ্চিত্রকে
সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র হিসেবে
না ভেবে গোদার বরং কম্পোসিট
আর্টের যাবতীয় সম্ভাবনার দ্বার উন্মুক্ত
করে খুঁজে পেতে চেয়েছিলেন
চলচ্চিত্রের একান্ত নিজস্ব
কোনো অভিব্যক্তি

চলচ্চিত্রের ভাষা তার কাছে বিশেষ এক অভিব্যক্তি হিসেবে প্রতিভাত হয় শুরু থেকেই। প্রচলিত ভাষা-ব্যবস্থা বা চিহ্নতত্ত্ব অর্থাৎ চিহ্ন = চিহ্নক/চিহ্নিত, এই অর্থে চলচ্চিত্র ভাষা কিনা, এই নিয়ে আজও বিতর্কের শেষ নেই। চলচ্চিত্রকে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র হিসেবে না ভেবে গোদার বরং কম্পোসিট আর্টের যাবতীয় সম্ভাবনার দ্বার উন্মুক্ত করে খুঁজে পেতে চেয়েছিলেন চলচ্চিত্রের একান্ত নিজস্ব কোনো অভিব্যক্তি। চলচ্চিত্র-নির্মাণকালে তার প্রস্তাব ছিল– একটি সাহিত্যকর্মকে (উপন্যাস,গল্প,নাটক,কবিতা) ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করতে যেমন আরেকটি সাহিত্যকর্মের (প্রবন্ধ) আশ্রয় নেওয়া হয়, একইভাবে একটি চলচ্চিত্রকে ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করতে আরেকটি চলচ্চিত্র নির্মিত হবে না কেন? অর্থাৎ এখান থেকেই, চলচ্চিত্রের কাজ একমাত্র গল্প বলা এই স্বতঃসিদ্ধটি তিনি পরিত্যাগ করতে শুরু করেন।

একটি চলচ্চিত্রের জন্য আরেকটি চলচ্চিত্র প্রকৃত অর্থে চলচ্চিত্রের প্রবন্ধ হয়ে ওঠা! শুধুমাত্র ‘শুরু-মধ্য-শেষ’ওয়ালা একটা গল্প থাকবে না, তিনি একসাথে সব চেয়েছিলেন তার ছবিতে– ধর্ম, দর্শন, মনস্তত্ত্ব, সাহিত্য, সংগীত, চিত্রকলা, স্থাপত্য, ভাস্কর্য, প্রযুক্তি, পপআর্ট, খবরের কাগজের কাটিং, চিঠিপত্র… সব! এই ধরনের মতামত কেবল পোষণ করতে গেলেই প্রয়োজন তীক্ষ্ণ মেধার। আর একে রূপ দিতে গেলে প্রয়োজন সনাতন নির্মাণশৈলী সম্পর্কে প্রগাঢ় ধারণা না হলে এই নবতর প্রস্তাবনার অনুরূপ কোনো ধাঁচা দাঁড়াবেই না।

পিয়ের লো ফ্যু। ফিল্মমেকার: জ্যঁ-লুক গোদার

চিত্রনাট্যের পাণ্ডুলিপি বা চিত্রনাট্যের খাতা ব্যাপারটা তার কাছে আসা না করাই ভালো। ইমেজারিগুলো গিজগিজ করত মাথার মধ্যে, একটি ছোট্ট লাল বা নীল নোটবুকে কখনও দু-এক কথায় লেখা থাকত সেই ইমেজগুলির চুম্বক। বাকিটা ইম্প্রভাইড হতো শুটিং লোকেশনে। অনেক চিত্রপ্রতিমার পেছনেই থাকত তাৎক্ষণিক কোনো ভাবনা বা উপলব্ধি। ঋত্বিক ঘটকও এই প্রক্রিয়ায় বহু দৃশ্য সংযোজন করতেন তার চলচ্চিত্রে।

গোদার যে সময় তার ভাঙচুর শুরু করেন, তখন তাবড় সমস্ত তথাকথিত ‘আর্ট-হাউস’ চলচ্চিত্রকার বিরাজ করছেন ইউরোপে ও অন্যত্র। দা ভ্যাঙ্কুইজদ, ইল গ্রিডো হয়ে লাভেন্তুরার কৃষ্টি-পথে মিকেলাঞ্জেলো আন্তোনিওনি ততদিনে খুঁজে পেয়েছেন আধুনিক নগরের ভেতর যুদ্ধোত্তর ইতিহাসের সূক্ষ্ম-স্মারক, যা মনোপরিসরে বিচ্ছিন্নতার আড়ালে পরিত্যাজ্য পুরাতনের চাইতেও অনেক বেশি করে আগ্রহী সমকাল ও ভাবীকালকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে। রলা বার্থ তার ডিয়ার আন্তনিওনি প্রবন্ধে লিখেছেন, ‘For you, contents and forms are equally historical; dramas, you have said, are plastic as much as psychological.’।

অন্যদিকে রোবের ব্রেসোঁ আরেক প্রতিভা, যিনি মনে করছেন ও সেইমত তার ছবিতে প্রকাশ করছেন ‘না-অভিনয়’কে! সিনেমাটোগ্রাফি ও সিনেমার মধ্যে স্পষ্ট বিভাজনের পক্ষপাতী তিনি। অভিনেতা ও দর্শক শুধুমাত্র সশরীরে উপস্থিত থাকে না, এ ছাড়া সিনেমার সঙ্গে নাটকের আর কোনো তফাৎ নেই– তার মতে। কিন্তু সিনেমাটোগ্রাফি সিনেমার মতো আলোকচিত্রিত নাট্যাভিনয় নয়, সিনেমাটোগ্রাফি হলো ভাব-প্রবাহের এমনতরও দৃশ্য-শ্রাব্যগত বাস্তবতা, যা অর্জন করা অন্য শিল্পমাধ্যমগুলির সাধ্যাতীত। লাভেন্তুরা বা পিক পকেট অব্ধি তাই, ব্যক্তিজীবন ও চলচ্চিত্রের মধ্যেকার ব্যবধান কখনো বেড়েছে, কখনো কমেছে এবং এইসব চলচ্চিত্রকারের মাধ্যমের উপর অবিশ্বাস্য দখল চলচ্চিত্রের এই শৈল্পিক চেহারাটাকেই সবচেয়ে নান্দনিক হিসেবে স্বীকৃতি দিতে শুরু করেছে।


একটি
দৃশ্যের নির্দিষ্ট
অর্থকে বৌদ্ধিক
জায়গা থেকে প্রশ্ন
করা এসব তার ছবিতে
আকছার দেখতে
পাওয়া
যায়

এর নিরিখে গোদারের নির্মাণ অগোছালো, বিষয় অসমঁজস এবং বিষয় ও নির্মাণ একযোগে অবিন্যস্ত! প্রতীকী দৃশ্য-নির্মাণ, অর্থাৎ একটি দৃশ্যের নির্দিষ্ট অর্থকে বৌদ্ধিক জায়গা থেকে প্রশ্ন করা এসব তার ছবিতে আকছার দেখতে পাওয়া যায়। এভরি ম্যান ফর হিমসেলফ ছবির সেই বিখ্যাত ঝাঁপ দেওয়ার দৃশ্যটির কথাই ভাবুন, যেখানে খাবার টেবিলে বসা পল [জ্যাক ডুট্রঙ্ক অভিনীত] উল্টো দিকে বসা ডেনিশের [নাথালি বে অভিনীত] উপর কথা বলতে বলতে ঝাঁপিয়ে পড়ছে। গোদার এই দৃশ্যটি তোলেন স্লো-মোশনে! মার্কিন টেলিভিশনের ডিক ক্যাভেট শোয়ের সাক্ষাৎকারে ১৯৮০ সালে গোদার জানান, “whether it would be too sentimental or whether too violent and it had to be both togather”। দৃশ্য রচনাটি স্লো-মোশনে হওয়ার দরুন প্রেমিক-প্রেমিকার লাভ অ্যান্ড হেট সম্পর্কের রহস্যটি প্রাণ পেয়েছে নিখুঁত চিত্রভাষায়। এরা একে অপরকে ঠিক কতটা ভালবাসে ও একে অপরকে ঠিক কতটা ঘৃণা করে– এই প্রশ্নের সুস্পষ্ট জবাব যেমন বাস্তবজীবনে দেওয়া দুষ্কর তারই চিত্র-ব্যঞ্জনা এই দৃশ্যকল্পটি!

এভরি ম্যান ফর হিমসেলফ। ফিল্মমেকার: জ্যঁ-লুক গোদার

আরেকটি উল্লেখযোগ্য ব্যাপার হলো, তার ছবিগুলিতে একাধিক ক্ষণস্থায়ী চরিত্রের বেলাগাম অনুপ্রবেশ ও প্রস্থান। তাদের আচরণও বেনিয়মে ভরা। যখন-তখন বিচিত্র সংখ্যাধিক আগন্তুকের সমাবেশ ঘটাতে তার জুড়ি মেলা ভার। প্রাত্যহিক জীবনে আমাদের চারপাশ দিয়ে অজস্র মানুষ চলে যায় তাদের কারোর সাথে কখনো অকিঞ্চিৎকর কিছু যোগসাজশ হয়, বেশির ভাগ ক্ষেত্রে কিছুই হয় না। কিন্তু গোদার তার নির্মাণ প্রক্রিয়ায় এদের বাদ দেন না। যদিও চিত্রনাট্যের দাবিতে আসা চরিত্র হিসেবে এদের ভাবা মুশকিল; কিন্তু গোদারের ভাবনা ও নির্মাণরীতির মুনশিয়ানায় এদের মেনে নিতে আমরা ক্রমশ অভ্যস্ত হয়ে উঠি।

চলচ্চিত্রে যেহেতু কালে স্থান নির্মিত হয়, তাই কালের মধ্যে দিয়ে বয়ে যেতে যেতে এর একটা নির্দিষ্ট মেজাজ দর্শকের মনে গড়ে ওঠে; কিন্তু তিনি এই ব্যাপারটাও নস্যাৎ করে দিতে চান। অর্থাৎ নাটকের মঞ্চমায়ার মতো চলচ্চিত্রে কোনো একাগ্র লয় নির্মাণেরও তিনি বিরোধী। বোঝাই যাচ্ছে চলচ্চিত্রের সনাতনী ধাঁচার কতটা বাইরে তিনি অবস্থান নিতে চাইছেন। ফলত তার ছবির চেহারা কালে কালে এমন রূপ নেয় যে ইঙ্গমার বার্গম্যান পর্যন্ত যৎপরোনাস্তি বিরক্তি নিয়ে মন্তব্য করেছিলেন, “I’ve never gotten anything out of his movies. They have felt constructed, faux intellectual and completely dead. Cinematographically uninteresting and infinitely boring.”!

অনেকে মনে করতেন তার ছবি কোলাজের মতো। অসংলগ্ন ও অর্থহীন অজস্র দৃশ্যকে বিশৃঙ্খলভাবে জুড়ে দিয়ে তার মধ্যে তিনি নিয়ে আসতে চাইতেন এক ধরনের নান্দনিক শৃঙ্খলা ও সৌন্দর্য– order out of chaose যেন! সে কারণেই হয়তোবা তার ছবির বহু অংশকে আধুনিক কবিতার মতো লাগে আমাদের।

তার শুরুর ছবি ব্রেথলেসই আমরা টের পেয়েছি মানুষের হাতের কম্পন। ট্রলি-শটে উদ্দিষ্ট চরিত্রের দিকে ক্যামেরা যান্ত্রিকভাবে এগিয়ে যাচ্ছে না, ক্যামেরা হাতে ধরে একজন মানুষই চরিত্রের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। মানুষের হাতের দোলা শটের শরীরে যেন নিয়ে আসছে বার্টল্ড ব্রেখটের অধ্যাস! ‘art is not a mirror held up to reality but a hammer with which to shape it’– এই হলো ব্রেখটীয় মনোভাব।

কনটেম্পট। ফিল্মমেকার: জ্যঁ-লুক গোদার

কনটেম্পট বা লা মেপরি [১৯৬৩] ছবির ঐ দৃশ্যটির কথা ভাবুন, যেখানে পল [মিশেল পিকলি অভিনীত] ক্যামিলিকে [ব্রিজিত বর্দো অভিনীত] বলে, “you look at me as if you are analyzing my expression to find out what attitude to adopt”। সামনে কাঠের ফ্রেমের মধ্যে কাঁচ বসানো দরজা দেখতে পাওয়া যায় এবং পল পাশের ঘরে যাওয়ার জন্য দরজার লকে হাত দিয়ে ঠেলে; কিন্তু যায় কাঁচ ভেদ করে! আমরা বুঝতে পারি, ওখানে কাঁচ নেই! জায়গাটা ফাঁকা, ওটা আসলে কাঁচের বিভ্রম। ব্রেখটের ‘এলিয়ানেশান এফেক্ট’র প্রথম শ্রেণীর নিবেদন এটি। বাস্তব, কল্পনা ও স্বপ্ন– এই ত্রিবিধ বৈপরীত্য নিয়ে তার মুখ্য চরিত্রগুলির চারপাশে মাঝে মাঝেই অযুত সম্ভাবনা এসে উপস্থিত হয়।

তার সামাজিক-দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গি জুড়ে আছে মার্ক্সের ডায়ালেকটিক্সের ভাবনা। অর্থাৎ চিন্তা, ভাবনা, চৈতন্যে, উপরিকাঠামোর ভিত্তি হলো বস্তু ও তার কার্যকলাপ। সবকিছুই বিষয়গত, বিষয়ীগত নয়। এই বিষয়গত ভিত্তির উপর খাড়া হয়েই বিপরীতধর্মী এক সংঘাতের ভেতর দিয়ে সবকিছু এগোতে থাকে।

এই থিসিস-অ্যান্টিথিসিস তার ছবির কুশীলবদের সাধারণত নেতিবাচক পরিণতির দিকে নিয়ে যায়। বাস্তব ও কল্পনা ক্রমাগত স্থানপরিবর্তন করতে থাকে। ফলস্বরূপ গোদারের নায়ক-নায়িকারা উপমান ও উপমেয়ের ধর্মে বর্ণিত হয়ে নিজেরাই নিজেদের উপমা হয়ে ওঠে। বিখ্যাত ছবি পিয়ের লো ফ্যুর ফার্দিনান্দ [জাঁ পল বেলমন্দ অভিনীত] ও মারিয়েনের [আনা কারিনা অভিনীত] রসায়নের কথা ভাবুন। মারিয়েন ছবির শুরু থেকে নেই। ফার্দিনান্দের শিশুর পরিচর্যার জন্য কিছু পরে তাকে ছবিতে আনা হয়। আরেকটু পরে আমরা ফার্দিনান্দ ও মারিয়েনকে পালিয়ে যেতে দেখি। মারিয়েনের অ্যাপার্টমেন্টের দেওয়ালে আলজেরীয় বিপ্লবের ছবি, রাইফেলের সারি ইত্যাদি দৃশ্যের সমাহার। মারিয়েনের রাজনৈতিক ভাবনা আসলে রাজনীতিকে ছবিতে অঙ্গীভূত করার গোদারীয় ধারা।

লা শিনোয়াজ। ফিল্মমেকার: জ্যঁ-লুক গোদার

রাজনীতি গোদারের ভাবনা-অতিরিক্ত প্রজ্ঞা। তার চরিত্ররা রাজনৈতিক এবং তার থেকেও বড় কথা হলো জীবনের যাবতীয় মুহূর্তকে বিশ্ব-রাজনীতির প্রেক্ষাপটে মেলে ধরা গোদারের এক ধরনের মুদ্রা-গুণ। ১৯৬৭ সালে নির্মিত লা শিনোয়াজ তার সারা জীবনের রাজনৈতিক বীক্ষার ভরকেন্দ্র বলা যেতে পারে। চীনের বৈপ্লবিক ক্রিয়াকলাপ এবং শোষণমুক্তি প্রকল্পে বামান্দোলনের শোধনবাদী ঝোঁক– এই দ্বন্দ্ব ছবিটির মূল। অন্যদিকে, জ্যাক-হেনরি বার্নার্ডিনের পল ভার্জিনি ফরাসি বিপ্লবের প্রাক্বালে রচিত এবং পিয়ের লো ফ্যুর ফার্দিনান্দ-মারিয়েন এই পল ভার্জিনির আদলে প্রকৃতির কোলে নিভৃতে তাদের ভালোবাসার স্থায়িত্ব ঘোষণা করে। কিন্তু এরপর মারিয়েনকে আমরা দেখি বিভিন্ন পুরুষের সঙ্গে পালিয়ে বেড়াতে। অবিরত আগন্তুকদের আগমন ও প্রত্যেকবার প্রেক্ষাপট বদলে গিয়ে নবতর সম্ভাবনার দ্বার খুলে যাওয়া– মারিয়েন ও ফার্দিনান্দের এইসব মুহূর্তগুলি কি কল্পনা ছিল কিংবা অযুত সম্ভাবনার পারিসরিক পটভূমি?

“we are made of dreams”– ফার্দিনান্দের উক্তিও আছে। কিন্তু প্রেম যদি অস্তিত্বের নিরাপত্তার সবচেয়ে জোরালো অভিব্যক্তি হয় তাহলে পিয়ের লো ফ্যু ছবিতে ফার্দিনান্দ প্রকৃত প্রেমের অনুসন্ধানে রত হয়ে শেষাবধি প্রকাশ করে মানবিক অস্তিত্বের নিরাপত্তাহীনতাকেই! এই ছবির এক ধরনের ভীতিপ্রদ আবহাওয়া সেই নিরাপত্তাহীনতারই বহিঃপ্রকাশ। আলো-আঁধারি, নৈঃশব্দ্য ও স্পেস শব্দ-ত্রয় চিত্রকর ভালাস্কেজের জীবনীগ্রন্থ থেকে ছবির শুরুতে উল্লেখিত হয়েছে। এই আলো-আঁধারি, নৈঃশব্দ্য ও স্পেসের ব্যঞ্জনা এক চরম শূন্যতার দিকে নিয়ে যায় ছবির শেষ ফ্রেমটিকে। ফার্দিনান্দ ডিনামাইট বেঁধে নিজেকে উড়িয়ে দেয়, প্রেক্ষাপটের সমুদ্র ও নীলাকাশ সাদা শূন্যতায় পরিব্যাপ্ত হয়।


আত্মবিনাশ
কোনো সমাধান
নয়; গোদার সমাধান
অনুসন্ধানীও
নন

আত্মবিনাশ কোনো সমাধান নয়; গোদার সমাধান অনুসন্ধানীও নন। ইঙ্গমার বার্গম্যানের চলচ্চিত্রে মৃত্যু বা আত্মহনন যেমন ঈশ্বরের অস্তিত্ব থেকে অনস্তিত্বের দিকে যাত্রার দার্শনিক প্রতিন্যাস, গোদারের ক্ষেত্রে কিন্তু ব্যাপারটা একেবারেই তা নয়। গোদারের ভুবন ঈশ্বরশূন্য; কারণ যা নেই তা নিয়ে ভাবার কোনো অর্থই তিনি খুঁজে পান না। ফলত তার ছবির আত্মহনন বা মৃত্যু যেন সেই অত্যাবশ্যক বিরতি যা অভূতপূর্ব সমস্ত পরিস্থিতির হাত থেকে তার চরিত্রদের নিস্তার দেবে!

প্রকৃতপ্রস্তাবে পিয়ের লো ফ্যুর ফার্দিনান্দ-মারিয়েন এই যুগল-ভাবনা গোদারের মনোজগতের সবচেয়ে নিকটবর্তী বলে অনেকে মনে করেন। ভিয়েতনামে নিহত শহীদের সংখ্যা যা আমরা সংবাদপত্রে জানতে পারি তা তাদের মর্মান্তিক অনুভূতির কতটা কাছাকাছি আমাদের নিয়ে যায়? তথ্য ও সত্যের ব্যবধান গোদারের অন্যতম প্রিয় ভাবনা। কোনো মর্মান্তিক ঘটনার কথা যখন একজন আরেকজনকে বলে তখন যে বলছে ও যে শুনছে উভয়েই অনুভূতির স্তরে সেই ঘটনার কতটা কাছাকাছি পৌঁছতে পারে?

উইকেন্ড। ফিল্মমেকার: জ্যঁ-লুক গোদার

১৯৬৭ সালে নির্মিত উইকেন্ড ছবিতে রাস্তায় জ্যামের একটি দৃশ্য আছে। কোনো উঁচু বিল্ডিংয়ের উপর থেকে দৃশ্যটি না তুলে গোদার ক্যামেরা ঢুকিয়ে দেন জ্যামে আটকে থাকা গাড়ির ভেতরে! জ্যামের মধ্যে ধীরে ধীরে গাড়িও এগোতে থাকে একই তালে ধীরে ধীরে ক্যামেরাও এগোতে থাকে। প্রথাসিদ্ধ ভঙ্গির বিপরীতে এই ‘অপর’ নির্মাণ, সত্যের কত কাছাকছি তথ্য পৌঁছতে পারে তার ব্যঞ্জনায় পরিপূর্ণ হয়ে আছে।

লে ক্যারিবিনিয়ার্স [১৯৬৩] ছবির শুরুর দিকে দুই সৈনিককে দেখতে পাই কল্পিত এক যুদ্ধে যাওয়ার অঙ্গীকারে ভেড়ার মাংস দিয়ে এক ভোজ সভার আয়োজনে সচেষ্ট। একটি ভেড়াকে জবাই করা হয়। কল্পিত যুদ্ধের দুই সৈনিক ভালোর জন্য সরলতা, পবিত্রতা ও ত্যাগের প্রতীক ‘ভেড়ার মিথ’কে কি ব্যঙ্গ করে? এর কিছু পরেই দেখতে পাই যুদ্ধক্ষেত্রে একটি বাড়িতে একজন সৈনিক অবোধের মতো রেমব্রা-র আত্ম-প্রতিকৃতিতে সেলাম ঠুকে মন্তব্য করে একজন সৈনিকের সর্বদা একজন শিল্পীর কাছে মাথা নত করা উচিত! পর মুহূর্তেই ম্যাডোনার ছবিটির সামনে এক মহিলার দিকে সেই সৈনিক বন্দুক উঁচিয়ে এগিয়ে যায়। আজকের ক্রম-অধঃপতিত সমাজে মিথ কি তাহলে প্রহসনের নামান্তর!

ফার্দিনান্দ আত্মহননের পথ বেছে নিয়েছিল আর গোদার তার সৃষ্ট চরিত্রের সঙ্গে নিজের ব্যবধান ঘুচিয়ে দিয়ে বেছে নিলেন ‘স্বেচ্ছামৃত্যুর’ অনন্য পথ।

Print Friendly, PDF & Email