স্করসেজির সঙ্গে গভীর আলাপে ‘কিলারস অব দ্য ফ্লাওয়ার মুন’ সৃষ্টির নেপথ্য কাহিনি

114
মার্টিন স্করসেজি

মার্টিন স্করসেজি। ফিল্মমেকার। জন্ম: ১৭ নভেম্বর ১৯৪২; নিউইয়র্ক, যুক্তরাষ্ট্র

মার্টিন স্করসেজি :: নিশ্চিতভাবেই। আমার ধারণা, ব্যাপারটি বেশ আগের, ১৯৭৪ সালের কোনো এক সময়ের, যখন অল্প কয়েকটি দিন, মাত্র এক বা দুই দিন, সম্ভবত দুই দিনই আমি সুযোগ পেয়েছিলাম সাউথ ড্যাকোটায় ওগলালা লাকোতা (সিয়ুক্স) আদিবাসীগোষ্ঠীর সঙ্গে সময় কাটানোর। তখন একটি প্রজেক্টের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলাম, যেটি কাজ করেনি। এ ছিল এক ট্রমাটিক অভিজ্ঞতা; আর আমার বয়স তখন এত কম ছিল, সেটি বুঝতে পারিনি। ওই ক্ষতি ও ওই দারিদ্র্যকে করতে পারিনি অনুধাবন।

আমিও অবশ্য আরেক ধরনের দারিদ্র্যের মধ্যে বড় হয়েছি– এলিজাবেথ স্ট্রিট, মট স্ট্রিট ও মালবেরির শ্রমিক শ্রেণির নারী-পুরুষদের মাঝখানেই শুধু নয়; বোয়ারি স্ট্রিটেও। তার মানে আমি ‘ওরই’ দারিদ্র্যের সঙ্গেই বেড়ে উঠেছি। তবে ‘এ রকম’ কিছু কখনোই দেখেনি, এবং এর কারণ ব্যাখ্যা করা আমার পক্ষে অসম্ভব বলে হয়ে পড়েছিলাম অসহায়।

সে সময়ে লস অ্যাঞ্জেলেসে আবারও কয়েকজন নেটিভ আমেরিকানের সঙ্গে দেখা করেছিলাম; আরেকটি প্রজেক্ট নিয়ে কথা বলেছিলাম আমরা। আর তাতেও আমি দেখতে পেয়েছিলাম, শিশুকালে এই যে অবিশ্বাস্য কল্পনা নিয়ে আমরা বড় হয়ে উঠছিলাম– এমনকি ব্রোকেন অ্যারো [ডেলমার ডেভস; ১৯৫০], ড্রাম বিট [ডেলমার ডেভস; ১৯৫৪], অ্যাপাচি [রবার্ট অ্যাল্ডরিচ; ১৯৫৪], ডেভিল’স ডোরওয়ের [অ্যান্থনি মান; ১৯৫০] মতো কাজগুলো দিয়ে হলিউড ফিল্মের খারাপ দিকগুলোকে ভালো করে তোলার চমৎকার সব প্রচেষ্টা থাকা সত্ত্বেও, এই সকল ফিল্মই ছিল প্রো-নেটিভ আমেরিকান, যেগুলোতে তবু নেটিভ আমেরিকানদের চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন আমেরিকান শেতাঙ্গ অভিনেতারা। তবে কাহিনিগুলো তাদের দিক থেকে সঠিকই শুধু নয়, বরং সংস্কৃতিটির প্রতি একটি শ্রদ্ধাজ্ঞাপনও জারি রাখার মাধ্যমে ভারসাম্যপূর্ণ হয়ে উঠেছিল, বিশেষ করে ব্রোকেন অ্যারোতে– এমনটাই মনে হয়েছে আমার।

কিলারস অব দ্য ফ্লাওয়ার মুন। ফিল্মমেকার: মার্টিন স্করসেজি

তবে যেকোনো মূল্যেই দারিদ্র্য সম্পর্কে আমার ভেতর সব সময় সচেতনতা ছিল, এবং বরাবরই অনুভব করেছি, মাত্র কয়েকদিন থাকার পরও একে প্রত্যক্ষ করতে পেরেছি। কিন্তু স্যাম পেকিনপার হাত ধরে ওয়েস্টার্ন ধারার চূড়ান্ত সীমায় পৌঁছানোর সমাপনীর মধ্য দিয়ে তখন একটি নতুন তল্লাটেরও আবির্ভাব ঘটেছিল: নেটিভ আমেরিকান অভিজ্ঞতার সকল নিরিখকে কীভাবে আমরা (সিনেমায়) ফুটিয়ে তুলব, এ নিয়ে আমাদের ভাবনা কেমন হওয়া উচিত? তারা সকলেই কি আসলেই হারিয়ে গেছেন (কালের গর্ভে)?


(আমার
শৈশবের
কল্পনার চেয়ে এরা)
একেবারেই
আলাদা

একদিক থেকে, শিশুকালে আমরা ভাবতাম, তারা আমাদের সঙ্গেই রয়েছেন, তবে তারা দেখতে-শুনতে এখন আমাদেরই মতো। আমরা তখন ছিলাম শিশু; আর, আমার ধারণা, নেটিভ জনগোষ্ঠীগুলো সম্পর্কে এভাবে আত্মীকরণে বাধ্য হয়ে তাদেরকে একটি সুনির্দিষ্ট ব্যাপ্তিতে কল্পনা করতাম আমরা। তবে (তাদের সত্যিকারের অস্তিত্ব সম্পর্কে) জানা ছিল না আমার। সেখানে যখন গেলাম, তাদের উপস্থিতির দেখা পেলাম, আর বুঝলাম, (আমার শৈশবের কল্পনার চেয়ে এরা) একেবারেই আলাদা।

স্করসেজি :: নিজেকে এই ভাবনা থেকে দূরে রেখেছিলাম। এই দূরত্ব তৈরির কারণ, ওই অভিঘাত আমার জন্য ছিল মারাত্মক তীব্র। কোনো না কোনোভাবে এটিকে একটি সঠিক গল্প হয়ে ওঠার দরকার ছিলই; আর সে জন্য লেগে গেছে এক দীর্ঘ সময়।

সাইলেন্স। ফিল্মমেকার: মার্টিন স্করসেজি

স্করসেজি :: বইটি আমাকে দিয়েছিলেন রিক ইয়র্ন। রিক আমার ম্যানেজার; লিও [লিওনার্দো] ডিক্যাপ্রিওরও ম্যানেজার। তবে হ্যাঁ, ফ্লাওয়ার মুনের আইডিয়াটি– ফ্লাওয়ার মুন হলো মেয়েলি, আর আমরা কাজ করেছি স্রেফ সাইলেন্স [২০০৬] ঘিরে, এবং মুনের ইমেজগুলোর ও যিশুর নারীসুলভ দিকটির বোধের ওপর– যেটি যিশুর পুরুষালি দিকটির তুলনায় সত্যিকার অর্থেই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তার মানে, আমার কাছে ফ্লাওয়ার মুনটি মেয়েলি বা নারীসুলভ; তবে ‘কিলারস অব দ্য ফ্লাওয়ার মুন’ বা ‘ফ্লাওয়ার মুনের খুনিরা’, এই সংঘাত, এবং এই ল্যান্ডস্কেপ– যেটির অবস্থান শুধুই ছিল আমার কল্পজগতে– সেই বৃক্ষহীন তৃণভূমিতে ব্যক্তিগতভাবে আগে কখনোই যাইনি।

যখন গেলাম, একটি সড়ক ধরে বহু দূর গাড়ি চালিয়ে যেতে হয়েছিল আমাদের; আর আমি অবাক হয়ে ভাবছিলাম, কেন এত ধীরে যাচ্ছি; বারবার তাকাচ্ছিলাম স্পিডোমিটারের দিকে– আমরা যাচ্ছিলাম ৭৫ কিলোমিটার গতিতে, ততক্ষণে কেটে গিয়েছিল ৪৫ মিনিট; আর বুঝে গেলাম, এই স্থানের কোনোই অন্ত নেই। কোনো পাশে কোনো বৃক্ষও ছিল না। ফলে গাড়ি আসলে কত জোরে চলছিল, ওই অবস্থায় আপনার পক্ষে তা আন্দাজ করা কখনোই সম্ভব নয়।

স্করসেজি :: হ্যাঁ। ওয়েস্ট ও এ ধরনের সকল কিছু ঘিরে এই সামগ্রিক আইডিয়ার ওপর লিও আর আমি একসঙ্গে একটি ফিল্ম বানাতে চেয়েছিলাম। লিও চেয়েছিলেন এফবিআই অ্যাজেন্ট টম হোয়াইটের চরিত্রে অভিনয় করতে। তাই তাকে বলেছিলাম, এ কাজ আমরা কীভাবে করব– তা নিয়ে আমি ভাবছি। কেননা, তাকে অত চকচকে হতে হবে– তা বলছি না; কিন্তু বাস্তবে টম হোয়াইট ছিলেন একজন ভীষণ রকমের দৃঢ়চেতা মানুষ। ভীষণ, ভীষণ, ভীষণ রকমের নিয়মনিষ্ঠ, নীতিবান ও অকপট। মিতবাকও। সহসা মুখে কিছু বলতেন না। বেশি কিছু বলার দরকারও পড়ত না।

অথচ লিওকে দেখায়– এ কথা তাকে বহুবার বলেছি আমি, ‘তোমার চেহারা একটি ফিল্মি-চেহারা।’ তাকে বলেছিলাম, ‘তোমার পক্ষে নির্বাক সিনেমায় অভিনয় করা সম্ভব। মুখে কোনো কথা বলার দরকার পড়বে না; স্রেফ তোমার চোখ, চালচলন, যা কিছু তুমি করো– তা-ই বলে দেবে সবকিছু।’ লিওর মধ্যে এই বৈশিষ্ট্য রয়েছে; কিন্তু আমি জানি, ফিল্মে কথা বলতে তিনি পছন্দ করেন।

কিলারস অব দ্য ফ্লাওয়ার মুন। ফিল্মমেকার: মার্টিন স্করসেজি

এরপর আমিও উপলব্ধি করলাম, এই লোকগুলো কারা? আমি বললাম, এই লোকগুলো ওয়াশিংটন থেকে এসেছে; এবং যে মুহূর্তে তারা ট্রেন থেকে নেমেছে, যে মুহূর্তে শহরটিতে পা রেখেছে, “তুমি তখন চারদিকে তাকাবে আর বব [রবার্ট] ডি নিরোকে দেখতে পাবে, এটা-ওটা দেখতে পাবে আর ভাববে, ‘আমি জানি, এই কাণ্ড কে ঘটিয়েছে।’”


প্লট
কীভাবে
সাজাতে হয়,
জানি না
আমি

দর্শকেরা আমাদের চেয়ে অনেক এগিয়ে। আমি বলেছিলাম, ব্যাপারটি এ রকম: ব্যাপারগুলো বোঝার চেষ্টা চালানোর জন্য আমরা আড়াই ঘণ্টা ধরে এই লোকগুলোর ওপর নজর রাখব। এটি একটি পুলিশি পদ্ধতি। বইটিতে এটি ভালোভাবেই কাজ করেছে। কিন্তু আমার কাছে একটি পুলিশি পদ্ধতি মানে হলো, আমি এটিকে দেখব; অথচ নিজে প্রয়োগ করতে পারব না। এর প্রয়োগ কীভাবে করতে হয়, জানা নেই আমার। প্লট কীভাবে সাজাতে হয়, জানি না আমি। কলম কোথায় ধরতে হয়, আমার তা অজানা। এ কারণে বলেছিলাম, ‘কী বিশ্রী ব্যাপার! এখানে আমরা কী করতে যাচ্ছি?’ তাই আমরা বারবার, বারবার চেষ্টা চালিয়ে গিয়েছিলাম।

আমাদের স্ক্রিপ্টটি ছিল ২০০ পৃষ্ঠারও বেশি; আর এক রাতে সবাই মিলে একটানা সেটি পড়তে থাকলাম: আমি, লিও, (কো-রাইটার) এরিক (রথ), আমার কন্যা এবং একদল লোক। প্রথম দুই ঘণ্টা বেশ চঞ্চল ছিলাম আমরা। এর পরের দুই ঘণ্টা, কী যে বলব, লেখাগুলো উচ্চারণ করতে খানিকটা দাঁতে দাঁত লেগে যাচ্ছিল। এককথায়, আমরা সত্যিকার অর্থেই কাহিনিটির প্রাণশক্তি খুইয়ে ফেলেছিলাম; আর আমি গল্পটি আরও, আরও বহুবার শোনাতে চেয়েছিলাম। প্রান্তগুলোতে পৌঁছানোর জন্য, কথাগুলো শোনানোর জন্য আরও বেশি অবান্তর আলাপ করতে চেয়েছিলাম– যেগুলোকে প্রান্ত মনে হলেও আদতে তা নয়।

তবে একইসঙ্গে, অল্প কয়েকবার ওকলাহোমায় যাওয়ার সৌভাগ্য আমার হয়েছিল। আর সেখানে প্রথম যে কাজ করেছিলাম, তা হলো– আমরা পরস্পর পরস্পরকে কীভাবে সহযোগিতা করতে পারি, তা যাচাই করতে ওসেজ জাতিগোষ্ঠীর সঙ্গে মিটিংয়ের কালে আমি ছিলাম ভীষণ সতর্ক। টের পেয়েছিলাম, আস্থার ব্যাপারটি নিয়ে তারা উদ্বিগ্ন। তাদেরকে আমি বোঝাতে পেরেছিলাম, তাদের ও এই কাহিনির ক্ষেত্রে নিজের পক্ষে যতটা সম্ভব সেরা প্রচেষ্টা প্রয়োগ করতে চাই; আর, তারা আমাকে বিশ্বাস করতে পারবেন– এই আশা করছিলাম।


‘আর্নস্ট
ও মলি কিন্তু
পরস্পরের প্রেমে
পড়েছিল– এ কথা
ভুলে যাবেন
না’

তারা বিশ্বাস করতে শুরু করেছিলেন; তবে আমিও বুঝতে পারি, কেন তারা আস্থা রাখেন না। ব্যাপারটি পুরোপুরি বুঝতে পারি। আর তা হলো, এই কাহিনিটি। আপনি কোনো বন্ধনের ওপর আস্থা রাখতে পারবেন, এই গল্পে সে রকম সত্যিকার অর্থে কী রয়েছে? দেখুন, এটির রয়েছে বিবিধ স্তর; এখানে রয়েছে বিবিধ দিক ও ভুলভ্রান্তি; তবে রয়েছে আস্থার জায়গা। আসলে, ওসেজদের কাছ থেকে আমি যা কিছু জেনেছিলাম, তা হলো, তাদের সবগুলো পরিবারই এখনো এখানেই বাস করে। বার্কহার্টস পরিবার, হেনরি রনের রন পরিবার…। তাদের বংশধররা আমাদের যা বলেছিলেন, তা হলো, ‘আর্নস্ট ও মলি কিন্তু পরস্পরের প্রেমে পড়েছিল– এ কথা ভুলে যাবেন না।’

ওই নারী কেন এখানেই থেকে গিয়েছিলেন? কেন তিনি ওই পুরুষের সঙ্গে থেকেছিলেন? কীভাবে ওই পুরুষের সঙ্গে থেকেছিলেন নারীটি? একজন মানুষ আরেকজন মানুষের সঙ্গে কেন বসবাস করেন, জানি না আমরা। ‘কীভাবে করেন’– সেটি অন্য প্রসঙ্গ, কাহিনিটির অন্য দিক। ‘কীভাবে’টি প্রবঞ্চনা, আত্মপ্রবন্ধনা; ‘কীভাবে’টি ভালোবাসা– যেটি পুরুষটি কী করছেন সে ব্যাপারে নারীটির ভাবার সাহস দেখানোর চেয়েও শক্তিধর।

তার মানে, এটি ছিল একটি চাপা দেওয়া বিষয়বস্তু; তবু নারীটি ওই পুরুষকে ভরসা করেছিলেন। তার মানে, এটি একটি প্রেমকাহিনি। আর (এই নারীর চরিত্রে অভিনয় করানোর ব্যাপারে) লিলির [লিলি গ্ল্যাডস্টোর] সঙ্গে আমরা আলাপ করেছিলাম একটি জুম মিটিংয়ে; কেননা, (কাস্টিং ডিরেক্টর) ইলেন লুইস আমাকে কেলি রেইশার্ডের সার্টেন উইমেন [২০১৬] ফিল্মটি দেখিয়েছিলেন, যেখানে লিলির অভিনয় ছিল অসাধারণ।

কিলারস অব দ্য ফ্লাওয়ার মুন। ফিল্মমেকার: মার্টিন স্করসেজি

এরপর তার সঙ্গে জুম মিটিংয়ে আলাপ করলেন লিও; কেননা, এই চরিত্রে আমরা কাকে অভিনয় করাতে যাচ্ছি, এ ব্যাপারে লিও লিখেন ভীষণ উদগ্রীব। নিশ্চিতভাবেই (এই চরিত্রের) অভিনেত্রীর নেটিভ আমেরিকান হওয়ার আবশ্যকতা রয়েছে; আর আমরা ওসেজদের অনুমোদন পেতে চেয়েছিলাম। লিলিকে তারা অনুমোদন দিলেন। তাকে তারা অনুমোদন দেওয়ার আগে, তার সঙ্গে জুমে এই আলাপচারিতা হয়েছিল লিওর; আর ওই জুম কল কেটে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই লিও আমাকে বলেছিলেন, ‘মেয়েটি দুর্দান্ত।’ আমি বলেছিলাম, ‘হ্যাঁ, বহুবিধ ভিন্ন দিক থেকে।’ আমার ধারণা, এর অনেকটুকুর দেখাই আপনারা এই ফিল্মে পাবেন; তার ব্যক্তিত্বে রয়েছে অখণ্ডতা, রসবোধ।

লিলির মধ্যে একটি গভীরতা রয়েছে; আর তার চেহারায় ক্ষণে ক্ষণে ভেসে ওঠে মিষ্টতা। তিনি আমাদের চেয়েও বেশি জানেন, এই আত্মবিশ্বাস অনুভব করেছিলাম আমরা। তিনি তা স্রেফ জানতেনই; তার মানে, ওই লোকগুলো তার চেনা, ওই পরিস্থিতি তিনি বুঝতে সক্ষম, দ্বিধাসমূহের সূক্ষতাগুলো বুঝতে পারেন; আর, আমার ধারণা, অনুপ্রবেশের বিষয়টিও।


‘মেয়েটি কী করে এখনো
এই ছেলের সঙ্গে
থাকছে?’

তবে যেকোনো কারণে, স্ক্রিপ্ট পাঠের এক সপ্তাহ পর লিও এলেন আমার কাছে; তারা [আর্নস্ট ও মলি] পরস্পর প্রেমে পড়েছিলেন– এই বিষয়টি তখনো আমাদের মাথায় কাজ করছিল। কিন্তু বাস্তবে, বিচারকার্যটি শেষ হওয়ার আগ পর্যন্ত নারীটি পুরুষটিকে ছেড়ে যাননি। এ রকম দৃশ্য আমরা রেখেছিলাম, যেখানে এফবিআই লোকগুলো– কিংবা বলা ভালো ব্যুরোর লোকগুলো বলছিল, ‘মেয়েটি কী করে এখনো এই ছেলের সঙ্গে থাকছে?’

তারা সত্যিকার অর্থেই এমন কথা বলেছিলেন। ওই আদালতের অনুলিখন কপি আমাদের কাছে রয়েছে। মলি তখনো ওই আদালতে ছিলেন। তিনি কি ব্যাপারটি বুঝতে পারেননি? তবে ওই নারী ও পুরুষের মধ্যে পরস্পর কিছু একটা ছিল; আর তারপর নারীটি পুরুষটিকে ছেড়ে চলে যান। আর আমরা বলেছিলাম, ঠিক আছে, কিন্তু এটি কী জিনিস? আমি বলেছিলাম, কাহিনিটি কী আসলে?

লিও আমাকে বললেন, আর্নস্ট চরিত্রে যেহেতু অন্য কেউ অভিনয় করবে, তাই এই বিষয়ের মধ্যে এটি গড়ে তোলা দরকার। সেই চেষ্টা চালালাম আমরা। টম হোয়াইটকে নিয়ে বোঝাপড়া করলাম; তবু পুলিশি পদ্ধতিটি মাথাচাড়া দিলেও এটি একে ছাপিয়ে গেল। ব্যক্তিগত কাহিনিটিকে ছাপিয়ে গেল ওই পুলিশি পদ্ধতি।

লিও আবারও এলেন; এক সপ্তাহ পর এক রাতে আমার বাড়িতে এসে বললেন, ‘এই ফিল্মের অন্তর কোনটি?’ বললাম, ‘অন্তর হলো মেয়েটি ও আর্নস্ট।’ তিনি বললেন, ‘আমি টম হোয়াইট চরিত্রে অভিনয় করছি– এতে যেহেতু কিছু যায়-আসে না, তাই টেক্সাস রেঞ্জারের প্রতিমাতুল্য প্রকৃতির সঙ্গে আমরা বোঝাপড়া করব।’

আমরা সেই প্রকৃতি দেখলাম; চমৎকার। লিওকে কি টমের চরিত্রে অভিনয় করতেই হবে? কাজটি যদি ভিন্নভাবে করি, কেমন হয়? আমি সেই চেষ্টা চালালাম। কিন্তু কোনো উপায় বের করতে পারলাম না। আমার দিকে তাকালেন লিও, বসে পড়লেন, আর বললেন, ‘থাক, নিরাশ হবেন না।’ বললেন, ‘আমি যদি আর্নস্ট চরিত্রে অভিনয় করি?’

স্করসেজি :: আমি বললাম, ‘তুমি যদি আর্নস্ট চরিত্রে অভিনয় করো আর আমরা যদি প্রেমকাহিনি নিয়ে বোঝাপড়া করি, তাহলে আমরা এখন এটির একেবারেই অন্তস্তলে পৌঁছে গেছি। ঠিক জায়গায় চলে এসেছি।’ বললাম, ‘তুমি নিশ্চিতভাবেই বুঝতে পেরেছ, তার মানে আমরা পৌঁছে গেছি স্ক্রিপ্টটির কেন্দ্রস্থলে, এটিকে ছিঁড়ে খুলে ফেলে সবকিছু পাল্টে নেব আমরা, আর স্টুডিওকে জানাব, তুমি অন্য লোকটির চরিত্রে অভিনয় করতে যাচ্ছ, আর এভাবেই এগিয়ে নেব কাজ। অন্যদিকে, লিলি তো অসামান্য; পুরো বিষয়টি পুনর্লিখন করব।’ আর আমরা তা-ই করেছি।

ক্যাসিনো। ফিল্মমেকার: মার্টিন স্করসেজি

তবে ‘পুনর্লিখন’ শব্দটি ভুল। আমরা পুরোটাই বরং গড়ে তুললাম। এরিক (রথ) আর আমি, কয়েকজন বন্ধুর সাহায্য নিয়ে। ক্যাসিনো [১৯৯৫] সিনেমার ক্ষেত্রেও একই কাজ করেছিলাম: আমি আর নিক পিলেজি; আমরা ট্রান্সক্রিপ্ট ধরে কাজ করেছিলাম। ফলে (এ বেলা) আমি বলতে পেরেছিলাম, “‘ওটা’ তুখোড় জায়গা।” এরপর আরেক লোক বলতে পেরেছিলেন, “শুনুন, আমরা কেন এখানে ‘এটা’ জুড়ে দিচ্ছি না?” ফলে বারবার সংযোজন-বিয়োজন-পরিমার্জন চলতে থাকল; আমি বলতে চাচ্ছি, রিহার্সালে যাওয়ার আগপর্যন্ত এভাবেই কাজ করেছি। এমনকি রিহার্সালে গিয়েও ‘এটা’-‘ওটা’ নিয়ে কাজ চালিয়ে গেছি।

ওসেজদের সঙ্গে প্রচুর বোঝাপড়া ও কাজের ব্যাপার ছিল আমাদের। তারা হয়তো কিছু একটা বলতেন; এক লোক, উইলসন পাইপস্টেম, পেশায় আইনজীবী। সত্যিকার অর্থেই দুর্ধর্ষ মানুষ। তিনি ওসেজ। শুরুতে ভীষণ উদ্বিগ্ন ছিলেন। আমার দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন, ‘আপনি কখনোই বুঝতে পারবেন না, আমাদের জীবনযাপনের রয়েছে নির্দিষ্ট ধরন।’

তিনি খুবই দাপুটে আইনজীবী, একজন আন্দোলনকর্মী। নির্দিষ্ট করে দেখিয়ে বলেছিলেন, “আমরা ‘এভাবে’ বেড়ে উঠেছি, ‘ওভাবে’ বেড়ে উঠেছি।” আমাকে কোনো পাঠ দিচ্ছেন কিংবা আমার বিরুদ্ধে তর্ক করছেন– এমনভাবে নয়; বরং আলাপের মাঝখানে উদাহরণ দিতে দিতে সবকিছু বুঝিয়ে দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, “আমরা আসলে ‘এ রকম’, আপনি তা বুঝতে পারবেন না। যেমন ধরুন, আমার বয়স যখন কম, দাদি বাড়িতে থাকতেন, আর এমন সময় আচমকা কোনো ঝড় শুরু হলে আমি ছুটোছুটি করতাম। দাদি তখন আমাকে বলতেন, ‘না, বসে থাকো, বসো, ঝড়টিকে, ঝড়ের ক্ষমতাকে আমাদের ওপর দিয়ে বয়ে যেতে দাও। এ ঈশ্বরের পক্ষ থেকে এক উপহার। ওয়াহ’কন-তাহের [ওসেজ ধর্মমতে, ঈশ্বর] পক্ষ থেকে একটি উপহার। ঝড়কে বয়ে যেতে দাও; একদম নড়ো না; ঝড়টিকে স্রেফ শুষে নাও।’” তিনি বলেছিলেন, ‘আমরা এভাবেই জীবন কাটাই।’

কিলারস অব দ্য ফ্লাওয়ার মুন-এর সেট। ফিল্মমেকার মার্টিন স্করসেজি, অ্যাকট্রেস লিলি গ্ল্যাডস্টোন ও অ্যাকটর লিওনার্দো ডিক্যাপ্রিও

উদাহরণটি আমি লিখে রেখেছিলাম। এখান থেকে, ওখান থেকে এভাবে বিভিন্ন অনুষঙ্গ নিয়েছি। আর আর্নস্ট ও মলির নৈশ্যভোজের দৃশ্যটির শেষাংশে, আমরা লিখে নিয়েছিলাম, আর্নস্টকে মলি বলছে– ‘হুইস্কি খাবে?’ তারপর তারা পানাহার করে। ছেলেটির চেয়ে মেয়েটি পানাহার করে বেশি; তবু সে মাতাল হয় না, অথচ ছেলেটি হয়ে যায়।


নারীটি এভাবেই পুরুষটিকে
নিয়ন্ত্রণ করেছে তখন;
পুরুষটি করেছে
স্রেফ অপেক্ষা

আমি বলেছিলাম, ‘এটি একটি দারুণ দৃশ্য হতে পারে।’ বলেছিলাম, “কিন্তু কেমন হয়, যদি এই দৃশ্যে কোনো বৃষ্টিবর্ষণ জুড়ে দেওয়া যায়? কেমন হয়, যদি কোনো ঝড় বয়ে যায়; ভীষণ রকমের অশুভ কিছু না বুঝিয়ে স্রেফ ঝড়; তবে ওই ঝড়ের ক্ষমতা, ওয়াহ’কন-তাহের সৌন্দর্য, ঝড়ের উপহার সমেত? আর তা করার জন্য, আপনাকে নিশ্চুপ থাকতে হবে। আপনি নিজের পাতি-নেকড়ে সত্তা ধরে রাখতে পারবেন না ক্ষণকাল।” নারীটি এভাবেই পুরুষটিকে নিয়ন্ত্রণ করেছে তখন; পুরুষটি করেছে স্রেফ অপেক্ষা।

তার মানে, এভাবেই গড়ে তোলা হয়েছে একে। এভাবে কাজ করতে বেশ আনন্দ পেয়েছিলাম আমরা। কেননা, সব সময়ই নতুন কিছু না কিছু খুঁজে পেয়েছি। কেননা, কেউ না কেউ কিছু না কিছু বলেছেন, কিংবা (প্রডিউসার) মারিয়েন বাওয়ার সন্ধান পেয়েছেন এক দারুণ বোঝাপড়ার। বাকি সবার সঙ্গে আমাদের যোগাযোগের মধ্যস্থতাকারী ছিলেন তিনি। ভিন্ন ভিন্ন ডিপার্টমেন্টের সঙ্গে, বিভিন্ন ডিপার্টমেন্টের ভিন্ন ভিন্ন ওসেজ কারিগরি পরামর্শকদের সঙ্গে কাজ করেছেন; এবং “তারা ‘এটা’ বলেছে, ওরা ‘ সেটা’ বলেছে…” ইত্যাদি তথ্য আমাদের দিয়েছেন। ‘এটি ইন্টারেস্টিং। ওটি কী?’ ‘দেখুন, তারা সাধারণত কী করে আমরা তা জানি: সবচেয়ে বয়স্ক কেউ মারা গেলে তার কফিনের ওপর দিয়ে হেঁটে যায় পরিবারের সবচেয়ে কনিষ্ঠ সদস্যটি।’ এটা ‘এমন’ হওয়া চাই, ‘অমন’ হোক। ‘এটা’ আমাদের করতেই হবে।…

এ কারণেই অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার দৃশ্যগুলো এত দীর্ঘ হয়ে গেছে। এ কারণেই, একদিক থেকে, ‘দীর্ঘ হয়ে গেছে’ বলতে আমি আসলে বোঝাচ্ছি– শুটিংকৃত দৃশ্যগুলো আরও বড় ছিল, তবে সেটিকে আমাদের আরও ছোট, সংক্ষিপ্ত করে আনতেই হয়েছিল। তা ছাড়া আমি– যার আবির্ভাব (ইতালির) সিসিলিয়ান পরিবার থেকে– এটি একটি অন্যতম মুখ্য বিষয়।

আমি বড় হয়ে ওঠার কালে প্রচুর বয়স্কজনকে মরতে দেখেছি। তার মানে, প্রচুর শবযাত্রার ভেতর বড় হয়েছি, যেখানে বয়স্ক ইতালিয়ান নারীরা, বয়স্ক সিসিলিয়ানরা কালো পোশাক পরেন। এ অনেকটা সালভাতোরে জ্যুলিয়ানোর [ফ্রান্সেস্কো রসি; ১৯৬২] মতো, মনে আছে তো? ‘তুরিদ্দু…’ বলে চিৎকার করে নারীটি তার ছেলের ওপর… এভাবেই বেড়ে উঠেছি আমরা। আর, ছেলেটি মায়ের পিঠ আঁকড়ে ধরে; আর নারীটি ঝাঁপ দেয় কফিনটির ওপর।

কিলারস অব দ্য ফ্লাওয়ার মুন। ফিল্মমেকার: মার্টিন স্করসেজি

আমি বলেছিলাম, ‘তারা শোকাহতদের ও শোকপ্রকাশে পেশাদার বিলাপকারীদের কথা বলছেন।’ বলেছিলাম, ‘তাদের ওখানে বিলাপকারী আছেন।’ কান্না করেন– এমন লোক আছেন তাদের। তাই আমরা এটি রাখতে চেয়েছি। আর এর শুটিং করতে গিয়ে খেয়াল করলাম, তারা বলেছেন, ‘আমরা এ কাজ বাড়ির সামনে করি।’ আমি বলেছিলাম, ‘দারুণ!’ আরও বলেছিলাম, ‘ঠিক আছে, যথেষ্ট উপর থেকে একটি ওয়াইড শটে এটি দেখানো হোক।’ সেখানে ছিল বাড়িটি, এর পেছনে আর কিছুই ছিল না; আর সেখানে ছিল তিনটি মানবদেহ– তারা চিৎকার করে বিলাপ করছিল, এবং এর শব্দ হয়ে উঠেছে দুর্দান্ত।

(সিনেমাটোগ্রাফার বলেছিলেন,) ‘আরেকটি টাইট শট নিয়ে রাখবেন নাকি?’ আমি বলেছিলাম, ‘না।’ তিনি বলেছিলেন, ‘আমার কাছে একটি টাইটার শট রয়েছে, এটি সম্ভবত…।’ আমি বলেছিলাম, ‘না, শটটি ওপর থেকেই থাকবে। এটি উপর থেকেই থাকা উচিত মনে করি; কেননা, তারা ওয়াহ’কন-তাহের উদ্দেশ্যে বিলাপ করছে। আমরা তা দেখতে পাচ্ছি। আর, এখানে রয়েছে এই ছোট্ট বাড়িটি এবং করুণ মানবগোষ্ঠী। আমরা যেমন, সবাই আসলে তেমনই আছি; আর, আমরা স্রেফ বিলাপ করছি– যা আপনি আদতে শুনতে পাচ্ছেন না।’ তার মানে, ব্যাপারটি এ রকমই ছিল।


প্রযুক্তি আমাকে সীমাবদ্ধ
করে দিক–
তা চাই
না

স্করসেজি :: না, আমি চালাচ্ছি না। চালাতে পারলে ভালোই লাগত; ক্রেন চালাতে মন্দ লাগত না আমার। কিন্তু তাহলে আমি সব ধরনের ঝামেলার মধ্যে পড়ে যেতাম। কিন্তু না, প্রযুক্তি আমাকে সীমাবদ্ধ করে দিক– তা চাই না। এ কথা দিয়ে প্রযুক্তির ওপর অনেক বেশি ঝুলে থাকা বোঝাচ্ছি। বছরের পর বছর ধরে, সব সময় এ লড়াই করে যাচ্ছি আমি। এ কারণেই একগুচ্ছ ভিন্ন ভিন্ন ডিরেক্টর অব ফটোগ্রাফির সঙ্গে দারুণ সম্পর্ক ছিল আমার; মাইক চ্যাপম্যান এবং নিশ্চিতভাবেই, মাইকেল বলহাউসের সঙ্গে। এর বাইরে যাদের সঙ্গে কাজ করেছি, তারা দুর্ধর্ষ হলেও একসঙ্গে মাত্র একটি বা দুটি ফিল্ম করেছি। তবে হরদমই খেয়াল করেছি, অনেক ডিরেক্টর অব ফটোগ্রাফি যন্ত্রপাতি খুব পছন্দ করেন, এবং যন্ত্রপাতি এভাবেই কদর পায়।

দ্য উলফ্ অব ওয়াল স্ট্রিট। ফিল্মমেকার: মার্টিন স্করসেজি

স্করসেজি :: হ্যাঁ, এ রকম কিছু করেছিলাম আমরা। হ্যাঁ, ঠিক বলেছেন।

স্করসেজি :: না; কয়েকটি ল্যান্ডস্কেপকে সোজা করার কথা বাদ দিলে, একদমই নয়। যেমন ধরুন, কয়েকটি বৃক্ষকে যথেষ্ট ঠিকঠাক মনে হয়নি; সে ক্ষেত্রে। আমাদের বলা হয়েছিল, এই বৃক্ষগুলো এই মাটির অংশ হবেই– এমন কোনো কথা নেই। না; পহুস্কা শহরে, যেখানে আমরা শুটিং করেছি, সেই শহরকে ফেয়ারফ্যাক্স শহরের মতো করে তুলতে (প্রোডাকশন ডিজাইনার) জ্যাক ফিস্ক যা কিছু করেছেন, আমরা তা খেয়ালে রেখেছি। এটি হয়ে উঠেছিল অনেকটাই স্টুডিওর মতো। বলে রাখি, সেখান থেকে ফেয়ারফ্যাক্স অঞ্চলের দূরত্ব ৪৫ মিনিটের। দেখে মনে হয়েছিল, আমরা আক্ষরিক অর্থেই ওইসব এলাকায় যাচ্ছি। দোকানগুলোর সামনের দিকগুলো আমরা পুনঃমেরামত করে নিয়েছিলাম। এভাবে সত্যিকারের সেই সময়কালে পৌঁছানোর প্রয়াস ছিল আমাদের। আসলেই, সেই ১৯২১ ও ১৯২২ সালের সময়কালে প্রচুর সময় কাটিয়েছিলাম আমরা।


‘এই দেখো, এটিই তোমাদের
আমেরিকার ইতিহাস।
এই সেই ইতিহাস,
যা তোমাদের
বিদ্যালয়ে
পড়ানো
হয়
না।
আমাদের এই
সমাজ এর ওপরই
গড়ে উঠেছে এবং এর
মুখদর্শনের সাহস কারও নেই’

স্করসেজি :: ঠিক তা-ই। একদম। এর সম্ভাব্য কারণ, আমি যেখান থেকে এসেছি, একে একেবারের রাস্তার পর্যায়ে থেকে দেখে এসেছি বলে মনে করি। আপনিই সঠিক, আপনিই এর যোগ্য– এ কথা বিশ্বাস করার ক্ষেত্রে অনেক কিছুই জড়িত। আর, এ দেশের প্রণয়ন যারা করেছেন, সেইসব শেতাঙ্গ প্রটেস্ট্যান্ট– ব্রিটিশ, ফরাসি, ডাচ ও জার্মানদের ব্যাপারে গত পঁচিশ-ত্রিশ বছর ধরে আমি প্রতিনিয়ত সচেতনতা জারি রেখেছি। যে ধরনের ভাবনায় ভর দিয়ে এ দেশ গড়ে উঠেছে, সে ব্যাপারেও। এটি ক্যাথলিক নয়, ইহুদিধর্মী নয়; বরং ইউরোপিয়ান। তবে এর কর্মনীতি প্রটেস্ট্যান্ট, যা আসলে শ্রেয়। স্রেফ এভাবে আকার ধারণ করেছিল দেশটি। পরে এর ভেতর থেকে বেরিয়ে এসেছিল রাজনৈতিক ও ক্ষমতাকেন্দ্রিক কাঠামো; আর তা রয়ে গেছে। সেটি এর সঙ্গে স্রেফ রয়ে গেছে।

কিলারস অব দ্য ফ্লাওয়ার মুন। ফিল্মমেকার: মার্টিন স্করসেজি

আমি আমার কাছের লোকদেরও খেয়াল করে দেখেছি, যারা মূলত যথেষ্ট ভদ্র হলেও কিছু খারাপ কাজ করেছেন এবং আইনি কর্মকর্তাদের কাছ থেকে অন্যায় সুবিধা নিয়েছেন। ফলে বেড়ে ওঠার দিনগুলোতে ভাবতাম, কোনো আইন কর্মকর্তাই আস্থাভাজন নয়। কিছু ভালো পুলিশ ছিল, কিছু ভালো আইনশৃঙ্খলারক্ষাকারী ছিল; ভালো মানুষ। কিছু আবার ভালো নয়। কিন্তু আমার বাবার পৃথিবীতে, তার প্রজন্মে এ ছিল একেবারেই ভিন্ন অভিজ্ঞতা। তবে এই বিষয়টি– সরকারি চাকরির জন্য রাজনীতিতে যোগ দেওয়ার আইডিয়াটি আমার আসলেই ভালো লাগে; আর তারা সত্যিকার অর্থেই জনসেবক। তা যদি সত্যিকার অর্থেই জনগণের সেবা করে থাকলে, তাহলে তা আসলেই ইন্টারেস্টিং।

স্করসেজি :: জানি না। কেউ চেষ্টা চালাতে পারে; একজন ভালো পাবলিক সার্ভেন্ট হওয়ার চেষ্টা কেউ চালাতেই পারে। এ প্রসঙ্গে ব্ল্যাক নার্সিসাস [মাইকেল পাওয়েল, এমেরিক প্রেসবার্গার; ১৯৪৭] ফিল্মের একটি সংলাপ মনে পড়ে গেল: ভারতে যাওয়ার আগে ডেবোরা কেরকে [ডেবোরা কের অভিনীত সিস্টার ক্লোডাগ চরিত্রটিকে] মাদার সুপিরিয়র বলে: ‘মনে রেখ, তাদের সকলের নেতাটি হলো তাদের সকলের সেবক।’

স্করসেজি :: হ্যাঁ, ওই সিনেমা নিয়ে মানুষ দু’ভাগ হয়ে গেছে। তবে ফিল্মটি আমার পছন্দের; কেননা, এর সংলাপের প্রতিটি বাক্যের পক্ষে অসংখ্য বিষয়ের অর্থ প্রকাশ করা সম্ভব। এটি আমার কাছে আসলেই যথেষ্ট ইন্টারেস্টিং ছিল। আমি সত্যিকার অর্থেই এই সিনেমা বানাতে চেয়েছিলাম। পুরস্কার জয়ের বিষয়টি– ভুলে যাবেন না, বেস্ট ডিরেক্টর হিসেবে, বেস্ট পিকচার হিসেবে কোনো অস্কার পাওয়ার ঘটনা (আমার জন্য) ছিল ৩৭ বছর আগের কথা, যা আমাকে পুরোপুরি চমকে দিয়েছিল। তবে আমি যখন (ফিল্মমেকিং) শুরু করেছিলাম, সেই সময়ের তুলনায় বর্তমান একাডেমি [যারা অস্কার দেয়] একদমই আলাদা। তবু আমার জন্য ওই পুরস্কার ছিল অনভিপ্রেত।

দ্য ডিপার্টেড বানিয়েছিলাম (ফিল্মমেকিংয়ে) একটি ইস্তফা দেওয়া হিসেবে। (ফিচার ফিল্মমেকিং) আমি ছেড়ে দিচ্ছিলাম; স্রেফ কয়েকটি ছোট ফিল্ম বানানোর দিকে বাড়িয়েছিলাম পা। আর তখনই দ্য ডিপার্টেড আলো ছড়ালো। নির্মাণের প্রসঙ্গে, অনেক কারণেই এটি ছিল খুবই কঠিন এক কাজ। সে একেবারেই আলাদা একটি গল্প। তবে এটির ভেতর দিয়ে এবং এটিকে পাশ কাটিয়ে পথ খুঁজে নিতে গিয়ে আমাদের বেশ লড়তে হয়েছিল, এ কথা আমাকে বলতেই হবে। একইসঙ্গে এটির ভেতর দিয়ে, এবং এর গণ্ডির বাইরে থেকে। অবশেষে যখন একে বড়পর্দায় ছুড়ে দিতে পারলাম, লোকে পছন্দ করল।

দ্য ডিপার্টেড। ফিল্মমেকার: মার্টিন স্করসেজি

সিনেমাটি ভালো ছিল নাকি বাজে– তা নিয়ে একদমই ভাবিনি, এমন কথা বলছি না। আমার স্রেফ মনে হয়েছিল, আমরা কিছু একটা সম্পন্ন করতে পেরেছি। এই সিনেমা এমন পরিণতি পাবে, তা আমি জানতাম না। এ ব্যাপারে কোনো ধারণাই ছিল না আমার। আর আমার পরবর্তী সিনেমাটি হতে যাচ্ছে সাইলেন্স— এমনটাই ভেবে রেখেছিলাম। কিন্তু এর মাঝখানে হয়ে গেল শাটার আইল্যান্ড

তার কিছু কারণ রয়েছে। কিছু একটাকে আমি অনুভব করেছিলাম, আর সেটি বানানোর পথে এগিয়ে গিয়েছিলাম; তাই ভাবলাম, এবারে আরেকটি ‘মুভি’ বানানোর চেষ্টা চালানো যাক। আর, স্ক্রিপ্টটি আমি পেলাম, আর স্রেফ প্রেমে পড়ে গেলাম ওই স্ক্রিপ্টের। তখন বুঝতে পারিনি, অভিনেতাদের সঙ্গে কাজ শুরু করার আগ পর্যন্ত বুঝে ওঠতে পারিনি– এই ভিন্ন স্তরগুলো। জানতাম, এখানে কোন স্তরগুলো রয়েছে; তবে কীভাবে সেগুলোকে গ্রহণ করতে হবে, কীভাবে এর শুট করা চাই, কীভাবে আত্মস্থ করতে হবে ইমেজগুলোকে, এবং অভিনেতাদের কীভাবে নির্দেশনা দিতে হবে… (বুঝতে পারিনি)।


স্টুডিওতে আমি আর
কোনো ফিল্ম বানাব
না, এ কথা জানা
ছিল আমার

অবশ্য এখানে ব্যাপারটি একদিক থেকে আপনাআপনিই ছিল; দ্য ডিপার্টেড-এর পর, এ ছিল অনেকটাই এ রকম: স্টুডিওতে আমি আর কোনো ফিল্ম বানাব না, এ কথা জানা ছিল আমার। কেননা, সে সময়ে– সেই দিনগুলোতে এবং এমনকি আজকের দিনেও স্টুডিওর লোকগুলোর সঙ্গে আমাদের কোনো ঝামেলা না থাকলেও, তারা একটি ফ্রাঞ্চাইজি’স ফিল্ম চেয়েছিল, আর আমি চেয়েছিলাম লোক [চরিত্র] দুটিকে মেরে ফেলতে। তারা চেয়েছিল (ওদের মধ্যে) একজনকে বাঁচিয়ে রাখতে। আমি এভাবে ফিল্ম বানাতে চাইনি। তাতে বুঝে গিয়েছিলাম, ফিল্মমেকিং অব্যাহত রাখতে পারব– এমন কোনো উপায় আর অবশিষ্ট নেই। এর ফলে তখন থেকে সবকিছুই স্বাধীনধর্মী হয়ে উঠে শাটার আইল্যান্ড-এ এসে একটি নির্দিষ্ট মাত্রা ছড়িয়ে দিয়েছে।

শাটার আইল্যান্ড। ফিল্মমেকার: মার্টিন স্করসেজি

আমার খেয়াল রাখতেন (প্যারামাউন্ট পিকচারের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা) ব্র্যাড গ্রে। আমার কাছে এলেন তিনি। আমাকে দ্য ডিপার্টেড বানাতে দিলেন; আর সম্মতি জানালেন শাটার আইল্যান্ড-এর ব্যাপারে। আর পরবর্তীকালে তিনি মারা গেলেন। তারপর থেকে (আমার ফিল্মমেকিং) সত্যিকার অর্থেই ইনডিপেনডেন্ট। স্টুডিওর ভেতর দিয়ে ওভাবে সিনেমা বানানোর আর কোনো মানে নেই আমার।

স্করসেজি :: হ্যাঁ।

দ্য লাস্ট টেম্পটেশন অব ক্রাইস্ট। ফিল্মমেকার: মার্টিন স্করসেজি

স্করসেজি :: এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই। আমার কাছে ব্যাপারটি ছিল একে অন্বেষণ করা। কিছু কিছু ক্ষেত্রে, যেমন ধরুন দ্য লাস্ট টেম্পটেশন অব ক্রাইস্ট-এর [১৯৮৮] বেলায় ইউনিভার্সেলের [স্টুডিও] সঙ্গে আমার একটি চুক্তি ছিল। আমার কাছ থেকে কয়েকটি মুভি পাওনা ছিল তাদের; সেগুলোই পরিণত হয়েছিল কেপ ফিয়ার [১৯৯১] ও ক্যাসিনোতে। এই তো!

কিন্তু আমরা যখন কুন্দুন [১৯৯৭] ও ব্রিংগিং আউট দ্য ডেড [১৯৯৯] বানিয়েছি, ততদিনে তা ফুরিয়ে গিয়েছিল। সত্যি ফুরিয়ে গিয়েছিল। আমরা সেই ফুরিয়ে যাওয়ার বিষয়টি ঘোষণা করেছিলাম; ব্রিংগিং আউট দ্য ডেড চলেছিল মাত্র কয়েক সপ্তাহ। এটি ছিল একটি প্যারামাউন্ট [স্টুডিও] ফিল্ম। আর সেটিই ছিল পরিসমাপ্তি। কিন্তু আবারও (আমার অ্যাজেন্ট মাইকেল) অভিটস এসে হাজির হলেন এবং লিও, (হার্ভি) উয়েন্সটেইন ও বাকি সবাইকে আমার সঙ্গে জুড়ে দিয়ে (আমাকে) গ্যাংস অব নিউইয়র্ক [২০০২] বানাতে আন্তরিকভাবে সহযোগিতা করলেন। আর সেটি পরিণত হলো আমার জীবনের একটি সম্পূর্ণই আরেকটি সময়কালে।


‘ঠিক আছে, এই ঘোরের
যবনিকা ঘটে
গেছে’

সেটির যখন সমাপ্তি ঘটল, দারুণ খুশি হয়েছিলাম; কিন্তু গ্যাংস অব নিউইয়র্ক-এর প্রতি ঘোর আমার রয়েই গিয়েছিল। এমনকি আমি আমার মাথার ভেতর এই সিনেমার কাজ কখনো সত্যিকার অর্থে শেষ করতে পারিনি। স্রেফ বলেছিলাম, ‘ঠিক আছে, এই ঘোরের যবনিকা ঘটে গেছে।’ অথচ একদিক থেকে তা এখনো কাটিয়ে উঠতে পারিনি; সাইলেন্স-এর স্ক্রিপ্টেও তাতে ফাটল ধরেনি। ফলে একটি ‘মুভি’ বানানোর জন্য প্রস্তুতই ছিলাম।

আমি কাজ করতে এবং একটি ফিল্ম বানাতে চেয়েছিলাম; আর তাদের [স্টুডিও] কাছে ছিল ওই জিনিসটি, যেটির নাম দ্য অ্যাভিয়েটর [২০০৪]। এটি কী নিয়ে, তা আমাকে বলেননি তারা। ফলে আমি পড়তে শুরু করলাম– আমাকে এখন বলতে আসবেন না এটি হাওয়ার্ড হিউজকে ঘিরে; কেননা, স্পিলবার্গ, ওয়ারেন বেটি এটি বানাতে চান– তবে সে সময় আমি এটি পড়েই যাচ্ছিলাম। এ এক ভিন্ন ধরনের হাওয়ার্ড হিউজ; এটি প্রারম্ভিক হাওয়ার্ড হিউজ। তিনি উড়ে বেড়ান, এবং তিনি– কিন্তু এখানে, এ সময়ের মধ্যে, তিনি কোনো দরজার হাতল স্পর্শ করতে অক্ষম।

দ্য অ্যাভিয়েটর। ফিল্মমেকার: মার্টিন স্করসেজি

ব্যাপারটি ইন্টারেস্টিং। এ কারণে ওই ফিল্ম আমরা বানিয়েছিলাম। এমনকি তা দারুণই হয়েছিল। সেখানে একটি দুর্ধর্ষ শট ছিল। এডিটিং ছিল দারুণ; তবে ডিস্ট্রিবিউশনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কিছু অনুষঙ্গের কারণে বেশ কিছু গুরুতর ঝামেলা বয়ে এনেছিল শেষ পর্যন্ত। আমার কাছে কিছু ভীষণ বিশ্রী (অনুষঙ্গ) ছিল, আর সেই পর্যায়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, আমার পক্ষে আর সিনেমা বানানো সম্ভব নয়। আমাকে সেগুলো যদি এভাবেই বানাতে হয়, তা হলে (আমার পক্ষে) এ কাজ শেষ (হয়ে গেছে)। তাই বললাম, আমি এটি বানাতে চেয়েছিলাম। দ্য ডিপার্টেড-এর স্ক্রিপ্টটি পেলাম; আইডিয়াটি পছন্দ হলো, আর বললাম, ‘চলো, একে রাস্তায় বানানো যাক, চলো করা যাক কিছু একটা।’

কিন্তু সেটি হয়ে উঠল– জানা গেল এটি সেই ওয়ার্নার ব্রোসের [স্টুডিও] কাজ– যেটি ছিল দ্য অ্যাভিয়েটর-এর অন্যতম ডিস্ট্রিবিউট, যেটির সঙ্গে আমাদের কিছু বিবাদ ঘটেছিল। তারা বলল, ‘চিন্তা করবেন না, আমরা আপনার খেয়াল রাখব।’ কিন্তু ইতোমধ্যেই তা কঠিন হয়ে পড়ল। তাই তারপর বলেছিলাম, ‘আর নয়।’


আমাকে যদি এভাবেই
কোনো ফিল্ম বানাতে
হয়, তাহলে আর
ফিল্ম বানানোর
কোনোই
মানে নেই আমার

এ কারণেই আমরা শাটার আইল্যান্ড-এর কাজে নেমে পড়েছিলাম; তবে নিজে যেভাবে চেয়েছি, অনেকটা সেভাবেই বানাতে পেরেছিলাম দ্য ডিপার্টেড। কিন্তু একদম প্রথম দিন থেকে শেষ দিন পর্যন্ত এ ছিল সব দিক থেকেই একটি হাতাহাতি, ঝগড়াঝাটির বালাই। ফলে ওই পর্যায়ে উপলব্ধি করেছিলাম, আমাকে যদি এভাবেই কোনো ফিল্ম বানাতে হয়, তাহলে আর ফিল্ম বানানোর কোনোই মানে নেই আমার। এ কারণেই ইনডিপেনডেন্ট ফিল্মগুলোই বানানোর ছিল; আর বানানোর ছিল সাইলেন্স ও এ ধরনের ফিল্ম।

স্করসেজি :: হ্যাঁ, হ্যাঁ।

স্করসেজি :: আমার ধারণা, কথাটি এভাবে বলা যাক: এটি আমার মাথায় গেঁথে আছে। সাতজন মানুষের পক্ষে সত্তর জন হওয়া সম্ভব; কিন্তু সংখ্যাটিকে সাত জনই ‘অনুভব’ করা চাই, কেননা, সত্যিকার অর্থেই আমি খর্বাকৃতির। এখন তো বুড়ো হয়ে গেছি। ঘরটি বাতি আর সব ধরনের তারে ভরে ফেলার চেষ্টা করি। আমার সামনে হাজির থাকার, আমাকে চলাফেরায় সাহায্য করার জন্য একজন সহকারীর দরকার পড়েই।

দ্য আইরিশম্যান। ফিল্মমেকার: মার্টিন স্করসেজি

আবারও স্বল্পসংখ্যক কলাকুশলী নিয়ে কাজ করার স্বাধীনতা পেলে আমার সত্যি ভালো লাগবে; এক ধরনের স্বাধীনতা অনুভব করব। কিন্তু, যেমন ধরুন, দ্য আইরিশম্যান-এর বেলায় এ প্রসঙ্গ অবান্তর; কেননা, ওইসব ট্রাক, সিজিআই, আর বব [ডি নিরো] ও আমি– আমার বয়স তখন ৭৫ বছর। ববের বয়স তখন ছিল ৭৫ বছর, আলের [আল পাচিনো] ছিল ৭৭, আর জোর [জো পেস্কি]… ওর বয়স কত, জানি না। আমি বলতে চাচ্ছি, একটি নির্দিষ্ট পর্যায়ে আমরা সবাই যখন প্রস্তুত, তখন একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ ভালো সময় কাটানোর জন্য তা বেশ যথেষ্ট।

আর, আপনি যদি বলতে চান, ‘আরে, চলো রাস্তায় নেমে আরেকটি দৃশ্যের শুট করে আসি, চলো এবার সবগুলো ট্রাককে সরিয়ে নিই,’ তখন তাদের ঘুমের প্রয়োজন। তার মানে, আমরা এক ধরনের আটকা পড়ে গিয়েছিলাম। কিন্তু কিলারস অব দ্য ফ্লাওয়ার মুন-এর বেলায় পহুস্কা শহরকে পেয়ে ব্যাপারটি আমাদের জন্য বিশেষ কিছু হয়ে উঠেছিল। অ্যাডাম সামনার একজন দুর্দান্ত অ্যাসিস্ট্যান্ট ডিরেক্টর। স্টিভেন স্পিলবার্গ ও রিডলি স্কটের সঙ্গে কাজ করেন। তার মঞ্চায়ন চমৎকার, এবং ব্যাকগ্রান্ড স্টাফ– আমি হয়তো বললাম, ‘আচ্ছা, তারা এই ব্লকে আসবে, আমরা এভাবে ট্র্যাক করব,’ আর নিশ্চিতভাবেই এটি ১৯২১ সাল। অতএব ব্যাকগ্রান্ড, কস্টিউম, ঘোড়া… সব কিছুর জন্য লোক দরকার আপনার। এটি এমন নয় যে আপনি নিউইয়র্কে শুটিং করছেন; তবে নিয়ন্ত্রণ ছিল আমাদের হাতেই। এ ছিল যেন কোনো স্টুডিওর মতো। নিয়ন্ত্রণ আমাদের হাতে ছিল। আর তা, একটি হাস্যকর পন্থায়, এমন এক অনুভূতি এনে দিয়েছে আমাদের মনে যে, আমরা কোনো ছোট ছবি বানাচ্ছি।

তা ছাড়া, ওসেজদের কাছ থেকে দারুণ নিষ্ঠা পেয়েছি আমরা; ক্যামেরার পেছনে কাজ করা প্রতিটি লোকই কস্টিউমগুলো সঠিক কি না– তা যাচাই করে দিয়েছেন। আমি সেগুলো বেছে নিয়েছি। (কস্টিউম ডিজাইনার) জেকি ওয়েস্টের সঙ্গে এ নিয়ে কাজ করেছি। সাদাকালো ছবি ও ড্রয়িংগুলো সবখানেই পাঠিয়েছি আমি। প্রয়োজনে কোনো টাই কিংবা কলার কিংবা জুতো গোল করে নিয়েছি। তারা আমাকে ওসেজদের কাছ থেকে জিনিসপত্র এনে দিয়েছেন এবং নির্দিষ্ট কিছু জিনিসপত্র আমি গোল করে নিয়েছি। তারা আমাকে বলে দিয়েছেন– কোনটা সঠিক আর কোনটা ভুল। তবে প্রাথমিকভাবে, আমি বলতে চাচ্ছি, বোতাম প্রসঙ্গে।

কিলারস অব দ্য ফ্লাওয়ার মুন। ফিল্মমেকার: মার্টিন স্করসেজি

এই ফিল্মে যত জায়গা দেখানো হয়েছে, সবগুলোতেই গিয়েছি আমি, আর সেখানকার সব নর-নারী আমাকে ও জ্যাকিকে কস্টিউম দেখিয়েছেন; ঐতিহাসিক আলোকচিত্রগুলো এবং দ্য উইনিং অব বারবারা ওর্থ-এর [হেনরি কিং; ১৯২৬] মতো ফিল্মগুলো থেকেও দেখেছি– ফিল্মটি আমি এক রাতে দেখে নিয়েছি। আমার স্ত্রী তখন ছিলেন হাসপাতালে; ফিল্মটি আমি টিভিতে, টিসিএম চ্যানেলে দেখেছি। যতদূর মনে পড়ে, ওই ফিল্মে গাড়ির ভেতর গগলস পরেছিলেন গ্যারি কুপার। নির্বাক ফিল্ম। তাই আমরা (আমাদের ফিল্মে) গগলস রেখেছি।

কিংবা ব্লাড অন দ্য মুন [রবার্ট ওয়াইজ; ১৯৪৮] ফিল্মটি– যেটি আমি গত রাতে আবারও দেখেছি; কেননা, টিসিএম-এর সঙ্গে এর ওপর কিছু একটা করতে চাই। ব্লাড অন দ্য মুন-এর কস্টিউমিং এবং চরিত্রগুলোর চালচলনের গুরুগম্ভীর ধরণ। আর রবার্ট মিচাম, চার্লস ম্যাকগ্র, রবার্ট প্রিস্টন।… এই (কিলারস অব দ্য ফ্লাওয়ার মুন) সিনেমায় এসবের ভীষণ রকমের গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব রয়েছে। ফলে (সিনেমাটি বানাতে গিয়ে) আমি স্বাধীন অনুভব করেছি, এবং তা সম্ভবত একদিক থেকে আমরা লস অ্যাঞ্জেলেসে ছিলাম না বলে, নিউইয়র্কে (এই ফিল্ম) বানাইনি বলে।

মার্টিন স্করসেজি

অন্য কোথাও যাওয়ার ছিল না আমাদের। আপনি রয়েছেন একটি বিরাট বাড়িতে, যেটি আমি ভাড়া নিয়েছিলাম, এবং আপনি সেখানে একটি মুভি বানাতে যাচ্ছেন, আপনি (ওকলাহোমার) তুলসা শহরে যাচ্ছেন না; তুলসা শহরের রাতের জীবন (আপনার ওই সিনেমায়) রয়েছে।… আমি বার্টলসভিলেতেও গিয়েছিলাম, টেরি ম্যালিক যেখানে বড় হয়েছেন।

মার্টিন স্করসেজি :: ছবিটি নিয়ে (ভাবা শুধু)।

Print Friendly, PDF & Email
সম্পাদক: ফিল্মফ্রি । ঢাকা, বাংলাদেশ।। সিনেমার বই [সম্পাদনা/অনুবাদ]: ফিল্মমেকারের ভাষা [৪ খণ্ড: ইরান, লাতিন, আফ্রিকা, কোরিয়া]; ফ্রাঁসোয়া ত্রুফো: প্রেম ও দেহগ্রস্ত ফিল্মমেকার; তারকোভস্কির ডায়েরি; স্মৃতির তারকোভস্কি; হিচকক-ত্রুফো কথোপকথন; কুরোসাওয়ার আত্মজীবনী; আন্তোনিওনির সিনে-জগত; কিয়ারোস্তামির সিনে-রাস্তা; সিনেঅলা [৪ খণ্ড]; বার্গম্যান/বারিমন; ডেভিড লিঞ্চের নোটবুক; ফেদেরিকো ফেল্লিনি; সাক্ষাৎ ফিল্মমেকার ফেদেরিকো ফেল্লিনি; সাক্ষাৎ ফিল্মমেকার ক্রিস্তফ কিয়েস্লোফস্কি; সাক্ষাৎ ফিল্মমেকার চান্তাল আকেরমান; সাক্ষাৎ ফিল্মমেকার বেলা তার; সাক্ষাৎ ফিল্মমেকার নুরি বিলগে জিলান; ক্রিস্তফ কিয়েস্লোফস্কি; বেলা তার; সের্গেই পারাজানোভ; ভেরা খিতিলোভা; সিনেমা সন্তরণ ।। কবিতার বই: ওপেন এয়ার কনসার্টের কবিতা; র‍্যাম্পমডেলের বাথটাবে অন্ধ কচ্ছপ; হাড়ের গ্যারেজ; মেনিকিনের লাল ইতিহাস ।। মিউজিকের বই [অনুবাদ]: আমার জন লেনন [মূল : সিনথিয়া লেনন]; আমার বব মার্লি [মূল: রিটা মার্লি] ।। সম্পাদিত অনলাইন রক মিউজিক জার্নাল: লালগান