‘কিলারস অব দ্য ফ্লাওয়ার মুন’-এর শিকার কিংবা মলি হয়ে ওঠা: লিলি গ্ল্যাডস্টোন

94
লিলি গ্ল্যাডস্টোন

মলি বার্কহার্ট
মলি বার্কহার্ট। জন্ম: ১ ডিসেম্বর ১৮৮৬; মৃত্যু: ১৬ জুন ১৯৩৭; ওসেজ কান্ট্রি, ওকলাহোমা, যুক্তরাষ্ট্র

লিলি গ্ল্যাডস্টোন :: ধন্যবাদ। আমি অভিভূত। অবশ্য গত আড়াই বছর ধরে ক্রমাগত অভিভূতই হয়ে যাচ্ছি।

লিলি :: সত্যিকার অর্থে আমিও খুশি। আসলে, সানড্যান্সে [সানড্যান্স ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল; যুক্তরাষ্ট্র] এ নিয়ে আমরা আলাপ করার সময় আমি জানতাম, এটি এক ধরনের প্যারালাল হতে যাচ্ছে; আর, আশা করছিলাম, এর আরেকটু উত্থানে কিলারস অব দ্য ফ্লাওয়ার মুন সম্ভবত সাহায্য করবে। তবে এটি যখন মুক্তি পেল, তখনই নিশ্চিত হতে পেরেছি, এই দুই সিনেমা কতটা পরস্পর পরিপূরক। বহুদিক থেকেই (এ দুটি) একই স্থানকাল, একই কাহিনি ধারণ করে আছে– স্রেফ শতবর্ষ আগে-পরের।

লিলি :: ফিল্মটি মুক্তি পাওয়ার পর থেকে, বিশেষত আদিবাসী নারীদের সঙ্গে আলাপনে বিষয়টি সামনে আসতে শুরু করেছিল। কমিউনিটিতে সবার সঙ্গে সিনেমাটি দেখার এবং এর ভাঁজ খোলার একটি উপায় খুঁজে নেওয়ার আইডিয়াটি ছিল মহাগুরুত্বপূর্ণ। তা স্রেফ আদিবাসী নারীদের সঙ্গেই নয়। ওসেজ জনগোষ্ঠীর অনেকের সঙ্গেই তখন থেকে আমি কথা বলেছি।

কিলারস অব দ্য ফ্লাওয়ার মুন। অ্যাকট্রেস: লিলি গ্ল্যাডস্টোন

যারা সিনেমাটি প্রথমবারের মতো দেখেছেন, তারা বলেছেন এটি সবাই মিলে দেখা তাদের কাছে কতটা গুরুত্বপূর্ণ; আর তারপর সিনেমা-হলে গিয়ে (নিজ গোত্রের বাইরে) একা একা, একটি বৃহত্তর দর্শকদলের সঙ্গে দেখার অভিজ্ঞতা কত ভিন্ন এবং তা কতটুকু ছাপ ফেলতে সক্ষম। সিনেমাটির সময়ব্যাপ্তি নিয়ে অনেকেই মুখ টিপে হেসেছেন; অসঙ্গত মুহূর্তগুলোর প্রতি ছুড়ে দিয়েছেন অট্টহাসি, আর কান পেতেছেন পাশের সিনেমা-হল থেকে ভেসে আসা টেইলর সুইফটের [টেইলর সুইফট: দ্য এরাস ট্যুর; স্যাম রেঞ্চ; ২০২৩] আওয়াজের দিকে।


‘আশা
করছি,
কাহিনিটি
সত্যিকার অর্থে
যা বলছে, এই উত্তেজনা
যেন সেটিকে ছাপিয়ে না যায়

ইন্ডিয়ান কান্ট্রি পুরো সিনেমা-হলগুলো বুকিং দিয়ে রেখেছিল; মার্জিত পোশাক পরে, ঐতিহ্যগত রেগালিয়া ও আধুনিক চমৎকার পোশাকপরিচ্ছদে সেজে তারা অপেক্ষা করছিল ফেটে পড়ার। সেখানকার সর্বত্রই এখানে-ওখানে ছোট ছোট প্রিমিয়ার হয়েছে; লোকজন আমাকে ছবি ও বার্তা পাঠিয়ে জানিয়েছেন, তারা এই সিনেমা নিয়ে কতটা রোমাঞ্চিত; আর আমার অন্তস্তল জুড়ে তখন শুধুই এই অনুভূতি: ‘আশা করছি, কাহিনিটি সত্যিকার অর্থে যা বলছে, এই উত্তেজনা যেন সেটিকে ছাপিয়ে না যায়।’ মার্টি [মার্টিন স্করসেজি] সব সময়ই এমন উত্তেজনার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছেন– ফিল্ম ও সিনেমাকে ‘কনটেন্ট’ ডাকার মাধ্যমে। তবে আধুনিক দর্শকেরা হরদমই সিনেমা-হলে গিয়ে এমনসব কনটেন্ট দেখতে অভ্যস্ত, যেখানে তারা কাহিনিটি কী নিয়ে– সে কথা কখনো কখনো বেমালুম ভুলে যান। আর এতে কী অনুষঙ্গ কাজ করছে– তা আদিবাসী মানুষেরা, আদিবাসী দর্শকেরা ভুলবেন না, সে কথা আমি জানি।

পুরো সময়জুড়ে প্রচুর বিষয় নিয়ে কথা বলতে চেয়েছিলাম আমি, তা সত্যিকার অর্থেই বিভিন্নভাবে; এমন এক ধরনের অনুতাপের জায়গা থেকে– যেমনটা করার উপায় আগে পাইনি, কিংবা তখন স্রেফ এমনটার আশা করেছিলাম। কেননা, বন্ধুদের কাছে ব্যক্তিগতভাবে যে বার্তা আমি দিচ্ছিলাম, সেটিই শোনাতে চেয়েছিলাম সবাইকে– সেখানে হাজির হওয়া প্রচুর দর্শকের কাছে এ ছিল একটি ভীষণ রকমের প্ররোচনামূলক অভিজ্ঞতা।

আমার ধারণা, আপনারা যারা সিনেমাটি দেখেছেন, এবং এটি একটি সত্যিকারের ট্রমাটিক সময় ছিল বলে পরবর্তীকালে একে উপলব্ধি করতে পেরেছেন, তাদের এ নিয়ে বহু কিছু করার ছিল। তা ছাড়া, এই ফিল্মে পরামর্শ দেওয়া প্রচুর ওসেজও ফিল্মটি দেখেছেন এবং তারা ফিল্মটি নিয়ে গর্বিত। এটি তাদের অবিশ্বাস্য রকমের প্ররোচনামূলক ইতিহাস, যা একদিক থেকে এই লোকগুলো আগলে রাখেন এবং তা (সিনেমার পর্দায়) দেখে যথার্থভাবেই তারা বিস্ময়াভিভূত ও মর্মাহত।


শিল্প আমাদের আরোগ্য
পেতে সাহায্য
করে

লিলি :: হ্যাঁ; যদিও পুরনো ক্ষতগুলো উন্মোচন করে দিয়েছে এবং ট্রমাগুলোকে সামনে হাজির করেছে, তবু এর মধ্যে আরোগ্য প্রক্রিয়ার একটি বড় পদক্ষেপ রয়েছে। আমি মনে করি, শেষ পর্যন্ত শিল্প আমাদের আরোগ্য পেতে সাহায্য করে; এটি আমাদের একদিক থেকে এইসব ভয়ঙ্কর ইতিহাসের ক্ষত সারানোর প্রক্রিয়ায় সহায়তা করে– যা আরও বেশি জলজ্যান্ত, আরও বেশি সজীব, আরও বেশি টেকসই হয়ে ওঠে নানাভাবে। কেননা, এর মধ্যে আপনি আবেগের বিনিয়োগ ঘটান। তবে এই আরোগ্য প্রক্রিয়া নিশ্চিতভাবেই বেদনাদায়ক।

আমার ধারণা, আরোগ্য বস্তুত আধুনিক সমাজে অনেক বেশি প্রয়োজনীয়; ফলে আমরা মনে করি, এটি নিশ্চয় আমাদের ভালো অনুভূতি দেবে। এ যেন সব সময় ভালো অনুভূতি দেয়– এমন কোনোকিছু হিসেবে গণ্য করে কোনো আরোগ্য চর্চাকে আমরা বিক্রয় করছি। অথচ তা এর ধরন নয়। এর বহু কিছুই ক্ষত জাগিয়ে তোলে এবং নানা কিছুকে নিঃশ্বাস নিতে দেয়– যেগুলো দংশন করে, তাতে রক্ত ঝরে, ব্যথা লাগে; তবে একে বের করে দেওয়াই, এই ইতিহাসের প্রতি সত্যিকারের পুনরুদ্ধাকারী সুবিচার জাহির করাই অনিবার্য।

কিলারস অব দ্য ফ্লাওয়ার মুন। অ্যাকটর: লিওনার্দো ডিক্যাপ্রিও; অ্যাকট্রেস: লিলি গ্ল্যাডস্টোন

লিলি :: হ্যাঁ, সেটিই ছিল সব। আমার সকল প্রবৃত্তি ছিল এ ঘিরেই: মলি কে ছিলেন, কীভাবে তাকে আত্মস্থ করা সম্ভব। এই প্রবৃত্তিগুলোকেই আমি সব সময় আমাদের পরামর্শকদের সঙ্গে কথা বলে ঝালিয়ে নিতে চেয়েছিলাম। আর অনেক ক্ষেত্রেই, আমি যে বেডরক থেকে এসেছি, আমার নিজের সম্প্রদায় ও নিজের পরিবার– এরা ছিল একটি সত্যিকারের দারুণ সূচনাবিন্দু।

তবে এ ছিল ভীষণ অমূল্য, একদম প্রতিটি দিনই জেনে যাওয়া যে, এখানে এই একদম কান ঘেঁষেই কোথাও ছিলেন একজন ওসেজ ব্যক্তি। আমার যখনই কোনোকিছু যাচাই করার দরকার পড়েছে, মুহূর্তেই তাদের পেয়েছি নাগাল, আর তারা সত্যিকার অর্থেই এই স্টোরিটেলিংয়ের অংশ ছিলেন এবং মলি চরিত্রকে আকার দিকে সত্যিকারের ভূমিকা রেখেছেন।


মলি
হিসেবে
ইংরেজিতে
যখন অভিনয়
করছিলাম, তারচেয়ে
বরং ওসেজ ভাষায় অভিনয়
করার সময়ই আমার
হরদম বেশি স্বস্তি
লেগেছে

একেবারেই শুরুর দিকের প্রাথমিক কাজ হিসেবে আমি জানতাম, ওই (ওসেজ) ভাষার মধ্যেই মলিকে আমার প্রথম খুঁজে নিতে হবে; আর সেই অনুসন্ধানের সমাপ্তি ঘটিয়েছি– যখন ওসেজ ভাষায় তার ভূমিকায় অভিনয় করেছি: সেখানেই পেয়েছি তার কণ্ঠস্বরের, তার চালচলনের, এমনকি স্বয়ং তার সন্ধান। মলি হিসেবে ইংরেজিতে যখন অভিনয় করছিলাম, তারচেয়ে বরং ওসেজ ভাষায় অভিনয় করার সময়ই আমার হরদম বেশি স্বস্তি লেগেছে।

লিলি :: যেদিন অভিনয়ের জন্য নিয়োগ পেলাম, সেদিনই ল্যাঙ্গুয়েজ অ্যাপ ডাউনলোড করে নিয়েছিলাম। তারপর নিজে নিজেই যতটা সম্ভব শব্দপ্রকরণ, অক্ষরবিন্যাস শিখেছিলাম। এভাবে দুই মাস প্রচেষ্টার পর, ভাষাটি যতটুকু সামলানো আমার পক্ষে যথেষ্ট ভেবে ধরে নিয়েছিলাম, সেই বিচারে বেশ দক্ষতা অর্জন করতে পেরেছিলাম। কিন্তু যখনই (ওসেজ ভাষা শিক্ষক) ক্রিস্টোফার কোটের কাছে ভাষা শিখতে ভর্তি হলাম, আর তার সঙ্গে সপ্তাহে তিনবার বসলাম– প্রতিবার এক ঘণ্টাব্যাপী সেশনে, দুই মাসের কোর্সে– তখনো আমার আসলে জীবনেও ওকলাহোমায় যাওয়া হয়নি। আর ব্যাপারটি ছিল বিশ্রী; তালগোল পাকানো।

আমার সবচেয়ে বড় ভয় ছিল, আমাকে একটি ব্ল্যাকফিট ডায়ালেক্টে আবেদন করতে হবে– যেটি এমন এক আদিভাষী ভাষা, যে ভাষায় আমি সাবলীলভাবে কথা বলতে না পারলেও নিজের পরিচয় হাজির করতে সক্ষম। ১০ পর্যন্ত গুনতে পারি। গালিগালাজ, পশু-প্রাণী ও এটা-ওটার নাম বলতে পারি। কিন্তু ব্ল্যাকফিটের পদবিন্যাস, শব্দাংশ, ধ্বনি– সবকিছুই (ওসেজ ভাষার তুলনায়) একেবারেই আলাদা।


যতবারই ভাবছিলাম বাড়াবাড়ি
রকমের ধীর গতিতে বলছি,
ততবারই কথা বলার গতি
আরও ধীরজ করে
নিতে হয়েছে
আমাকে

ওসেজ (ভাষা শেখা) কঠিন ছিল। লাকোটা ভাষার সঙ্গে ওসেজের অনেক কিছুই মিলেমিশে গেছে। উভয় ভাষার মধ্যেই একটি সাদৃশ্য, কিংবা অভিন্ন ভাষা-ভিত্তি রয়েছে; তবে শত-শত বছরের বাণিজ্যের কারণে ফ্রেঞ্চ ও স্প্যানিশ ভাষার প্রচুর প্রভাব পড়েছে ওসেজের ওপর। ফলে এটি একটি অবিশ্বাস্য রকমের অনুপম ও ভীষণ রকমের কঠিন ভাষা; আর তা এমন এক তালে বলতে হয়, তাতে যতবারই ভাবছিলাম বাড়াবাড়ি রকমের ধীর গতিতে বলছি, ততবারই কথা বলার গতি আরও ধীরজ করে নিতে হয়েছে আমাকে।

সেটে যাওয়ার পরও ভাষাশিক্ষা চালিয়ে গিয়েছিলাম; (ওসেজ ভাষা পরামর্শক) জ্যানিস কার্পেন্টারের সঙ্গে কাজ শুরু করেছিলাম, যেন নারীদের কথ্যভাষাকে পরিশোধন করে নিতে পারি। কেননা, বিশেষ করে সেই সময়ে এ ভাষায় নারী ও পুরুষদের কথ্যভাষা ছিল একেবারেই আলাদা; অবশ্য এখনো আলাদাই তা। এ কারণেই আমি বলি, ক্রিস আমাকে বাড়িটির ভিত্তি ও কাঠামো গড়তে সাহায্য করেছেন; অন্যদিকে জ্যানিসই সেই মানুষ, যিনি সাহায্য করেছেন ওয়ালপেপার ও জানালাগুলোর আচ্ছাদন বেছে নিতে এবং বাড়িটিকে সত্যিকার অর্থেই পরিমার্জিত ও বাসযোগ্য করে তুলতে।

কিলারস অব দ্য ফ্লাওয়ার মুন। অ্যাকট্রেস: লিলি গ্ল্যাডস্টোন; অ্যাকটর: লিওনার্দো ডিক্যাপ্রিও

আবেগাত্মক দৃশ্যগুলোকে উচ্চকিত করে তোলার ক্ষেত্রে ভাষার ভূমিকা এখনো আমি টের পাই। এমনই একটি দৃশ্যের কথা মনে আছে এখনো। আপনি যদি আমাকে এই মুহূর্তে ওসেজ ভাষায় কিছু বলতে বলেন, তাহলে সোজাসাপ্টা সেই দৃশ্যের সংলাপ শুরু করব, যেখানে মলি ও আর্নেস্টের মধ্যে ঝগড়া চলছিল; এটি সাবটাইটেল ধরে অনুভব করা অসম্ভব। কেননা, ঝগড়াটি এক উচ্চতর আবেগাত্মক পর্যায়ে পরিবেশন করা হয়েছিল; তবে এই সংলাপ আমার কাছে হাজির হয়েছিল শুধুই ওসেজ ভাষায়। এই দৃশ্যের রিহার্সাল ইংরেজি ভাষায় একবারও করিনি আমরা। এটি আমার ভেতর জায়গা করে নিয়ে, অন্তস্তলেই রয়ে গেছে।

লিলি :: মার্টির সঙ্গে আমার প্রথম সাক্ষাৎ জুম কলে। আমি স্কাইপে কথা বলতে চেয়েছিলাম; কেননা, আমি একজন মিলেনিয়াল। (জুম কলে) মার্টির সঙ্গে কথা বলার রিকুয়েস্ট পেলাম। মনে পড়ে, আমাকে আমার শোবার ঘরে থেকেই এই জীবন পরিবর্তনকারী অডিশন দেওয়ার অনুমতি দেওয়ায় আমি সত্যি সত্যি কৃতজ্ঞ। এ জন্য যদি তার সঙ্গে সামনাসামনি দেখা করতে হতো, তাহলে আমাকে বিমানে উড়াল দিতে হতো, একটি পুরো সপ্তাহান্ত চলে যেতে তাতে, আর আমি খুব মুশকিলে পড়ে যেতাম। আমাকে আমার নিজের পরিমণ্ডলের বাইরে যেতে হয়নি।

আমি মনে করি, মলির ক্ষেত্রে ব্যাপারটি ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ ছিল; এবং তাকে দীর্ঘমেয়াদে বোঝার জন্য প্রচুর খাটাখাটনির ভেতর দিয়ে যেতে হয়েছে আমাদের। যেমন ধরুন, কেন তিনি (আর্নেস্টকে) ছেড়ে গেলেন না? ব্যাপারটি এমন: এটি তো তার নিজের ভূখণ্ড। তিনি এখানকারই মানুষ। এই মাটিতেই তার ভিত্তি; আর আমি মনে করি, এটি আমার জন্য সত্যিকারের সৌভাগ্যের ছিল যে, মার্টির সঙ্গে প্রথম মিটিং নিজের বাড়িতে বসেই করতে পেরেছিলাম, যেখানে শুনতে পাচ্ছিলাম পাশের ঘর থেকে ভেসে আসা আমার বাবা-মায়ের কণ্ঠস্বর।

কিলারস অব দ্য ফ্লাওয়ার মুন-এর সেট। অ্যাকট্রেস লিলি গ্ল্যাডস্টোন ও ফিল্মমেকার মার্টিন স্করসেজি

লিলি :: সত্যিকার অর্থে, মার্টি ভীষণ দক্ষ। ফলে আমার প্রথম মিটিংয়ের বেলায় তিনি আসলে মূল লেখাটি নিয়েই কথা বলছিলেন। তার কাস্টিং ডিরেক্টরের ইলেন লুইসের মাধ্যমে আমার কাছে পাঠানো অংশগুলোতে পারফর্ম করছিলাম, আর এই অংশগুলো কীভাবে পাল্টে যাচ্ছে– তা নিয়ে অল্পস্বল্প কথা বলেছিলাম। এটির ব্যাপারে অনেক বেশি কার্যকরী হয়ে উঠতে তখন চাইনি আমি; তবে নতুন দিকটি পাওয়া আমার জন্য ছিল একটি সত্যিকারের স্বস্তি।


যে মলিকে আমি চিনি,
যার চরিত্রে অভিনয়
করতে পারব–
এ সে
নয়

এক বছর আগে (কাহিনিটির) ভিন্ন দিক নিয়ে অডিশন দিয়েছিলাম; আর তা আমার কাছে নিশ্চিতভাবেই মনে হয়েছিল… সেখানে ভীষণ ব্যাখ্যামূলক স্বগতোক্তি ছড়ানো। এগুলো পড়ে স্রেফ মনে হয়েছিল, এই মলি একটি তৃতীয় স্তরের চরিত্র; যে মলিকে আমি চিনি, যার চরিত্রে অভিনয় করতে পারব– এ সে নয়। কিন্তু নতুন দিকটি পাওয়ামাত্রই আচমকা সেইসব স্পেস, সেইসব প্রতিক্রিয়ার দেখা পেলাম, সেখানে তা মাখিয়ে তোলার মতো পর্যাপ্ত সময় রয়েছে। এর ভেতর ছিল প্রহারের হাজিরা। আর তা কাজে দিয়েছে।

ব্যাপারটিকে মনে হয়েছিল কোনো ঐশ্বরিক মুহূর্তের মতো; আর এটি আমার মনে ভীষণ রকমের ভরসা এনে দিয়েছিল। এই চরিত্রে নিয়োজিত হওয়ার, এই কাহিনিকে বহুভাবে গড়ে তোলার আইডিয়াটি ছিল আতঙ্কজাগানিয়া; অনেক বেশি বড় কিছু মনে হয়েছিল। তবে ভাগ্য ভালো, সেখানে ছড়িয়ে ছিল এইসব ছোট ছোট সবুজ আলো, আর কখনো কখনো তা একেবারেই মহাজাগতিক মহিমায়– যেগুলোর দেখা সিনেমাটিতে আপনারা পেয়েছেন।

আমাকে যখন চরিত্রটিতে অভিনয়ের প্রস্তাব চূড়ান্তভাবে দেওয়া হলো, মার্টির সঙ্গে আমরা তখন (স্ক্রিপ্টটি) পড়ছিলাম, আর তা ছিল অসাধারণ। এটি বলে বোঝানো মুশকিল; কেননা, অভিনেতাদের প্রতি মানুষের শ্রদ্ধা পেয়ে যে আপনি অভ্যস্ত, তার পক্ষে কাজটিকে অডিশনের মধ্যে ঠেলে দেওয়া, এবং তাতে কী হয়– সে ব্যাপারে মাথা না ঘামানো…। ফলে এটি উদারতা নাকি অকৃত্রিমতার গুণগান– তা বলে বোঝানো মুশকিল ছিল। কিন্তু এর পরপরই আমি একটি ফোনকল পেলাম, তার [মার্টিন স্করসেজি] ও লিওর [লিওনার্দো ডিক্যাপ্রিও] সঙ্গে মিটিং করার শিডিউল চাওয়া হলো আমার কাছে।

(স্ক্রিপ্টটির) এই নতুন সংস্করণকে আমি গ্রাহাম গ্রিনির দ্য কোয়াইট আমেরিকান [১৯৫৫] উপন্যাসের সঙ্গে তুলনা করতেই; অর্থাৎ এখানে একটি সম্পর্কের কাহিনির সাদৃশ্য জুড়ে দিলে ইতিহাসটি দারুণ ধাক্কা দেবে– জানাতেই মার্টি বেশ রোমাঞ্চিত হয়ে পড়লেন। একটি ব্যাপার এখন আমি বুঝতে পারি: যখন কোনোকিছু (স্করসেজির) সঙ্গে অনুরণিত হয়, আর তা তার ভেতর দিয়ে বয়ে যায় খানিকটা বৈদ্যুতিক ঝাঁকুনির মতো, তখন তিনি স্রেফ রোমাঞ্চিত হয়ে পড়েন। এমন সময়ে নিজের কাছে থাকা যে কারও দিকে তিনি সাধারণত ঘুরে তাকান, আর বারবার টোকা দেন তাদেরকে। ব্যাপারটি এ রকম: ‘তুমি এটা শুনতে পাচ্ছ?’ তার মধ্যে সেই প্রাণশক্তি নিরন্তরভাবেই বিরাজমান। এমনকি তিনি ও লিও যখন একই রুমে ছিলেন না, তারা ছিলেন স্ক্রিনে দুটি চেহারা হিসেবে, তখনো তিনি লিওর স্ক্রিনে টোকা দিচ্ছিলেন।

ওই কল যখন এলো, আশা করছিলাম– লিও ও আমাকে একসঙ্গে একটি সত্যিকারের রসায়নের গল্প শোনানোর জন্যই সিডিউল চাচ্ছেন; অথচ সেটি ছিল (অভিনয়ের) প্রস্তাব। এই খবর যেদিন আমি পেলাম, সেদিন ছিল প্রকৃত অর্থেই মলি বার্কহার্টের জন্মদিন– পয়লা ডিসেম্বর।

কিলারস অব দ্য ফ্লাওয়ার মুন। অ্যাকটর: লিওনার্দো ডিক্যাপ্রিও; অ্যাকট্রেস: লিলি গ্ল্যাডস্টোন

লিলি :: দিন শেষে যে মানুষটির অভিমত আমার কাছে সব সময়ই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, তিনি মার্জি বার্কহার্ট। তিনি মলির নানতি এবং (মলি-আর্নস্ট দম্পতির পুত্র জেমস ওরফে) কাউবয়ের কন্যা। দাদিকে কখনোই দেখেননি মার্জি; মলি মারা গেছেন ১৯৩৬ সালে। তবে নিজের বাবার কাছে দাদি সম্পর্কে খুব বেশি নয়, বরং ছোট ছোট কিছু গল্প শুনে মলি সম্পর্কে তার একটি চেতনা গড়ে উঠেছে।

আমি মনে করি, এই পুরো সময়কাল নিয়ে অনেক প্রজন্মের মধ্যে খুব একটা কথা হয়নি। (অতীত ভুলে সামনের দিকে) এগিয়ে যেতে চেয়েছে লোকজন। দৃশ্যপট থেকে (উইলিয়াম) হেলকে ছেটে ফেলা হয়েছিল; লোকে তার নাম উচ্চারণ করা থামিয়ে দিয়েছিল। ফলে আমরা যখন মার্জির সঙ্গে মিটিংয়ে বসলাম, আমি জানতাম, ‘এই হলেন মলি এবং এভাবে তার চরিত্রে অভিনয় করা যাবে’– এ ধরনের কোনো তালিকা তিনি আমার হাতে তুলে দেবেন না। এর কোনো ব্লুপ্রিন্ট ছিল না; তবে নিজেদের পরিবারের ভেতরে তারা এই উত্তরাধিকার ছড়িয়ে দিয়ে গিয়েছিলেন, আর সেখানেই একে খুঁজে পাওয়া সম্ভব। এ কারণে ওই মিটিং থেকে ছোট ছোট প্রচুর আভাস বেরিয়ে এসেছিল। লোকজনের ভিড়ে মার্জি যেভাবে কথা বলেন, আচার-আচরণ করেন– এর ভেতরই মলির অনেক ছাপ ছড়িয়ে ছিল।

তবে লিও ও আমার– দুজনের কাছেই একটি বিষয় বড় হয়ে উঠেছিল: (মলি ও আর্নেস্টের) সেই দাম্পত্যজীবনকে সত্যিকার অর্থে বুঝতে পারার মধ্যে আসলে কতটুকু ধাঁধা ছড়ানো, এবং কাজটি আমার ও লিওর জন্য কতটুকু কঠিন হতে যাচ্ছে– সে ব্যাপারে মার্জি কতটুকু জানতেন। কেননা, এমনকি যদিও মৃত্যুর আগ মুহূর্ত পর্যন্ত আর্নেস্ট জোরের সঙ্গে দাবি করে গেছেন এবং তারা পরস্পরকে ভালোবাসতেন– এ কথা ওই সম্প্রদায় বলে বেড়ায়, তবু মলি ও আর্নেস্টের সত্যিকারের প্রেম ছিল– এমন কথা বিশ্বাস করা একেবারেই অসম্ভব।


একটি
দীর্ঘ সময়
ধরে স্রেফ মেনে
নিয়েছিলাম, তিনি
আমাকে দেখছেন, আর
তাই হয়ে পড়েছিলাম স্রেফ
আতঙ্কগ্রস্ত

মার্জি বলেছিলেন, তা ছিল; তবু সেটিকে আমাদের পক্ষে সাধন করা সম্ভব কি না– সে ব্যাপারে আমাদের সেই মিটিংয়ে তিনি অবিশ্বাস্য রকমের সন্দেহ প্রকাশ করেছিলেন। তাই এ নিয়ে প্রতিটি খুটিনাটি বিষয়ে কথা বলেছি আমরা। আর অবশেষে আমার মনে হয়েছে, মার্জি যেন সারাটা সময় আমার কাঁধের পেছন থেকে উঁকি দিয়ে আমাকে দেখছেন। এর ফলে আমি ভীষণ নার্ভাস হয়ে পড়েছিলাম, এবং একটি দীর্ঘ সময় ধরে স্রেফ মেনে নিয়েছিলাম, তিনি আমাকে দেখছেন, আর তাই হয়ে পড়েছিলাম স্রেফ আতঙ্কগ্রস্ত।

লিলি গ্ল্যাডস্টোন :: আমাদের ওসেজ প্রিমিয়ারে আমি ব্যক্তিগতভাবে তার সঙ্গে দেখা করেছিলাম। আমরা কাজটি যেভাবে করেছি, এটি যেভাবে সম্পন্ন করেছি, তাতে মুগ্ধতা প্রকাশ করেছিলেন তিনি। তাদের [মলি-আর্নস্ট দম্পতির] দৃঢ়তা কেমন ছিল– তা দেখতে পারাটা তার জন্য কত অবিশ্বাস্য, সেই কথা বারবার বলছিলেন। ‘তাদের দাম্পত্য সম্পর্কটি এমনই তো হওয়ার কথা’– এমনটাই অনুভব করেছিলেন মার্জি; আর তাতে এই সম্পর্ক ভীষণ রহস্যময় হয়ে ধরা দিয়েছে তার কাছে।

মার্জি বার্কহার্ট। জন্ম: ২ মার্চ ১৯৬২

তিনি আমাকে স্রেফ সজোরে জড়িয়ে ধরেছিলেন। নিজের নাতি-নাতনিদের, অর্থাৎ মলির নাতনির নাতি-নাতনিদের সঙ্গে আমাকে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন। সেখানে দেখা পাওয়া সবচেয়ে কমবয়সীটির কথা মনে পড়ে আমার। মার্জির চেহারা আমার কাছে অবিকল মলির মতো মনে হয়েছে। এক সেকেন্ডের মধ্যেই অনুভব করেছিলাম, তার দিকে তাকিয়েই তার দাদির দেখা পেয়ে যাব। ঠিক এভাবেই এই ফিল্মের মধ্য দিয়ে নিজের দাদির দেখা পেয়েছিলেন তিনি।

আর, এ কথা লিও আগেই বলেছেন। লিও বলেছিলেন, আমি (আমার অভিনয়ের মধ্য দিয়ে) মলিকে হাজির করছি বলে মনে হয়েছে তার। অবশ্য অভিনয় করার সময় বিষয়টিকে এভাবে দেখার সত্যিকার অর্থেই দরকার মনে করিনি। আমি তো অভিনয় করছিলাম নিজের চাকরির অংশ হিসেবে। তবে মলির মধ্যে নিজেকে অবশ্যই খানিকটা হারিয়ে ফেলেছিলাম; কেননা, পরে যখন ফিল্মটি দেখেছি, তাতে মলির উপস্থিতি প্রবলভাবে টের পেয়েছিলাম। অনুভব করেছিলাম তার প্রতিরক্ষাবোধ।

বাকি দর্শকেরা প্রথমবার তার দেখা পাওয়ার পর যেমন অনুভব করেছিলেন, আমার অনুভূতিও ছিল সে রকমই।

Print Friendly, PDF & Email
সম্পাদক: ফিল্মফ্রি । ঢাকা, বাংলাদেশ।। সিনেমার বই [সম্পাদনা/অনুবাদ]: ফিল্মমেকারের ভাষা [৪ খণ্ড: ইরান, লাতিন, আফ্রিকা, কোরিয়া]; ফ্রাঁসোয়া ত্রুফো: প্রেম ও দেহগ্রস্ত ফিল্মমেকার; তারকোভস্কির ডায়েরি; স্মৃতির তারকোভস্কি; হিচকক-ত্রুফো কথোপকথন; কুরোসাওয়ার আত্মজীবনী; আন্তোনিওনির সিনে-জগত; কিয়ারোস্তামির সিনে-রাস্তা; সিনেঅলা [৪ খণ্ড]; বার্গম্যান/বারিমন; ডেভিড লিঞ্চের নোটবুক; ফেদেরিকো ফেল্লিনি; সাক্ষাৎ ফিল্মমেকার ফেদেরিকো ফেল্লিনি; সাক্ষাৎ ফিল্মমেকার ক্রিস্তফ কিয়েস্লোফস্কি; সাক্ষাৎ ফিল্মমেকার চান্তাল আকেরমান; সাক্ষাৎ ফিল্মমেকার বেলা তার; সাক্ষাৎ ফিল্মমেকার নুরি বিলগে জিলান; ক্রিস্তফ কিয়েস্লোফস্কি; বেলা তার; সের্গেই পারাজানোভ; ভেরা খিতিলোভা; সিনেমা সন্তরণ ।। কবিতার বই: ওপেন এয়ার কনসার্টের কবিতা; র‍্যাম্পমডেলের বাথটাবে অন্ধ কচ্ছপ; হাড়ের গ্যারেজ; মেনিকিনের লাল ইতিহাস ।। মিউজিকের বই [অনুবাদ]: আমার জন লেনন [মূল : সিনথিয়া লেনন]; আমার বব মার্লি [মূল: রিটা মার্লি] ।। সম্পাদিত অনলাইন রক মিউজিক জার্নাল: লালগান