আমার ‘ফলেন লিভস’, আমার আকি কাউরিসমাকি: আলমা পয়স্তি

75
aki kaurismäki

আকি কাউরিসমাকি
ফলেন লিভস। অ্যাকট্রেস: আলমা পয়ন্তি

আলমা পয়স্তি :: তিনি আমার শৈশবের পুরোটাতেই জুড়ে ছিলেন। আমার ধারণা, ফিনল্যান্ডে কারও পক্ষেই তা থেকে পালানো সম্ভব হয়নি; আর তা সৌভাগ্যক্রমেই! আমি আমার সারা জীবন (তার ফিল্মগুলো) উপভোগ করেছি। অল্পবয়সে টেলিভিশনে দেখেছি সেগুলো। তারপর, যতদূর মনে পড়ে, সিনেমা-হলে গিয়ে তার প্রথম যে সিনেমা দেখেছিলাম, সেটি দ্য ম্যান উইদাউট অ্যা পাস্ট [২০০২]। সিনেমাটি আমার ভীষণ মনে ধরেছিল। আমার মতে, এটির হিউমার নিঃসন্দেহে দুর্দান্ত।

তার সিনেমায় অভিনয় করতে পারা আমার জন্য নিশ্চিতভাবেই অনেক বড় সম্মানের। কখনো স্বপ্নেও এমন কিছু ভাবতে পেরেছিলাম কি না, মনে পড়ে না; কেননা, (ততদিনে) তিনি তার শেষ সিনেমাটি বানিয়ে ফেলেছিলেন। মানুষ হিসেবেও তিনি একজন ভীষণ জোরালো অখ-তার অধিকারী। আমি বলতে চাচ্ছি, কোনো ধরনের পাবলিক লাইফ বা এ রকম কোনো জীবন তিনি কাটান না। আর, সব সময়ই নিজের টিম নিয়ে কাজ করেন।


এখনো নিজের গায়ে
চিমটি কাটি
আমি

তো, একদিন আমি একটি ফোন কল পেলাম; বলা হলো, তিনি আমার সঙ্গে দেখা করতে চান। সেই মধ্যাহ্নভোজে আমার সঙ্গে সহ-অভিনেতা ইয়ুস্সি (ভাতানেন) ছিলেন। সেখানে আকি একটি স্ক্রিপ্টের কিংবা একটি ফিল্মের এই আইডিয়া (আমাদের কাছে) হাজির করেন; আর জানতে চান, আমরা (তার দলে) যোগ দেব কি না। অথচ তার সঙ্গে দেখা করতে পারাটাই তো ছিল (আমার কাছে) সত্যিকারের অবিশ্বাস্য ঘটনা। আমরা সত্যি সত্যি (একসঙ্গে) সিনেমাটি বানিয়েছি কি না, তাদের সঙ্গে এই জার্নি আদৌ ঘটেছে নাকি– (নিজেকে বিশ্বাস করাতে) এখনো নিজের গায়ে চিমটি কাটি আমি!

পয়স্তি :: আসলে, এ ধরনের স্ক্রিপ্ট আমি (জীবনে আগে) কখনো দেখিনি। সংলাপগুলো ভীষণ সচেতনভাবে বাছাইকৃত; সংখ্যায় সামান্য, তবে অনেকটা কবিতার মতো। কাহিনিটি আমার অন্তর ছুঁয়ে গেছে; আর বেশ মজারও। (আমার অভিনীত) চরিত্রটির ক্লুগুলোর পাশাপাশি সেগুলো উপলব্ধির ব্যাপারও ছিল। এই স্ক্রিপ্ট মর্মে মর্মে উপলব্ধি করে কীভাবে পড়া সম্ভব, আমার পক্ষে তা আত্মস্থ করা ছিল একান্ত আবশ্যক। ফলে ব্যাপারটি এক ধরনের দারুণ ছিল; কেননা, বুঝতে পেরেছিলাম, (এই স্ক্রিপ্ট) এতই চমৎকারভাবে ভারসাম্যপূর্ণ, ফলে তাতে কোনো কিছু সংযোজন কিংবা পরিমার্জন করার আমার আদৌ দরকার নেই।

পয়স্তি :: দেখুন, তিনি মাত্র ওয়ান-টেকে শুটিং শেষ করার আকাঙ্ক্ষা রাখেন। কোনো রিহার্সাল নেই; শুধু এক ও একটিমাত্র টেক; যদি তা আমরা ঠিকঠাকমতো করতে না পারি, সে ক্ষেত্রে দুটি টেক নেন। ফলে, শুরুর দিকে এ ছিল এক ধরনের আতঙ্কজনক প্রক্রিয়া; তবে কাজ শুরু করামাত্রই আপনি তা ভালোবেসে ফেলবেন এবং এ থেকে সত্যিকার অর্থেই প্রেরণা পাবেন।

চল্লিশ বছর ধরে সিনেমা বানাচ্ছেন তিনি; ফলে নিজে কী করছেন– তা তার খুব ভালোভাবে জানা। অন্যদিকে, এভাবে কাজ করতে যারা অভ্যস্ত নন, তারা কাজ শুরুর পর মুহূর্তেই বুঝতে পারবেন, (দারুণ) কিছু একটা ঘটছে! আর তা পরিণত হয় ভীষণ নিগূঢ় কিছুতে। ফলে (তার প্রক্রিয়ায় কাজ করার ক্ষেত্রে) প্রণোদনাজনিত কোনো সমস্যায় পড়তে হয় না!

পয়স্তি :: আমার ধারণা, আপনি একে এভাবে চলতে দিতেই পছন্দ করবেন। আর, তিনি যদি আরেকবার চেষ্টা করতে চান, তাহলে আমরাও আরেকবার করব– (তার প্রতি) এই আস্থা (তৈরি হয়ে যাবে আপনার)। তিনি যদি (ওয়ান-টেকেই) খুশি থাকেন, তাহলে এটি এমনই হওয়ার ছিল; কেননা, আকি এতই নিখুঁত, যে, তার রুচির ওপর কিংবা কোনো একটি শট থেকে তিনি যা চেয়েছিলেন তা পেয়ে গেছেন– এ ব্যাপারে আপনি সত্যি আস্থা রাখতে পারবেন।


তিনিই
তো ‘আকি
কাউরিসমাকিধর্মী
সিনেমা’গুলো
নির্মাণের
ওস্তাদ

সবচেয়ে বড় কথা, তিনিই তো ‘আকি কাউরিসমাকিধর্মী সিনেমা’গুলো নির্মাণের ওস্তাদ! (এই প্রক্রিয়া তার) আগের সিনেমাগুলোতে নিশ্চিতভাবেই কাজ করেছে; ফলে (তার সঙ্গে কাজ করতে এসে) এ ধরনের যেকোনো উৎকণ্ঠাকে নিজের মন থেকে আমাকে তাড়িয়ে দিতে হয়েছেই।

আমার কাছে ব্যাপারটি ছিল, নিজের পক্ষে যত বেশি সম্ভব স্তর জুড়ে দেওয়ার স্রেফ চেষ্টা চালানো। নিজের পক্ষে যতটা সম্ভব নিখাদ ও সৎ থাকা। কিংবা সে রকম দুঃসাহস দেখানো, আর ক্যামেরাকে তা দৃশ্যবন্দি করতে দেওয়া।

পয়ন্তি :: ওই কুকুরটি আসলে আকির নিজের কুকুর; পর্তুগালের একটি বেওয়ারিশ কুকুর; ওর নামও আলমা! এর আগে আসলে কখনোই ক্যামেরার সামনে সে কাজ করেনি; তবে নিঃসন্দেহে এক সহজাত প্রতিভা। কুকুরটিকে বোঝার জন্য ওর সঙ্গে প্রচুর সময় কাটিয়েছি আমি; একসঙ্গে খেলা করেছি, সসেজ খেয়েছি। ওই শটগুলোতে সে নিজ মর্জিমতো আচরণ করেছে ঠিকই, তবে সেগুলো ছিল নিখুঁত। সে একজন স্টোরিটেলার।

aki kaurismäki
ফলেন লিভস-এর সেট। ফিল্মমেকার আকি কাউরিসমাকি, অ্যাকট্রেস আলমা পয়ন্তি, অ্যাকটর ইয়ুস্সি ভাতানেন

পয়স্তি :: এ ছিল সত্যিকার অর্থেই একটি বিশেষ উপহার এবং একটি শিক্ষাযাত্রা। কত অল্পতে আপনার পক্ষে কত বেশি কথা বলতে পারা সম্ভব– তা শেখার ভীষণ বিশুদ্ধকরণ ব্যাপারও ছিল এটি। আর, আপনার কাছে যখন এই ভীষণ কঠোর, মিনিমালিস্টিক ফ্রেম থাকবে, আপনি অভিব্যক্তিকে খুব একটা ছড়িয়ে দিতে পারবেন না। তবে মুভমেন্টের জায়গা ছিল অন্যত্র। ফলে তা সম্ভবত আরও গভীর হয়ে উঠেছে।


এ যেন নিজের পুরনো
সিনেমাগুলোর কিংবা
নিজের সিনেমার
নায়কগুলোর
সঙ্গে তার
একটি আলাপচারিতা…

পয়স্তি :: আকির মুখ থেকে নিরন্তর এ ধরনের উদাহরণের ফুলকি বেরোয়! তিনি সব সময়ই সিনেমা, সাহিত্য, সংগীত নিয়ে কথা বলতে থাকেন। শুধু পুরনোগুলো নিয়েই নয়, সমকালীনগুলো নিয়েও; বর্তমানে কী চলছে– সে ব্যাপারে তিনি ভীষণ সজাগ। আমার ধারণা, এ যেন নিজের পুরনো সিনেমাগুলোর কিংবা নিজের সিনেমার নায়কগুলোর সঙ্গে তার একটি আলাপচারিতা; তিনি তা এখানে জুড়ে দিয়ে, গোদারের প্রতি কিংবা ব্রিফ এনকাউন্টার-এর [ডেভিড লিন; ১৯৪৫] প্রতি এক ধরনের চোখ টিপ মারেন এবং চ্যাপলিনের প্রতি নিজের বিশাল ভালোবাসা তাতে নিশ্চিতভাবেই বর্তমান। আমার ধারণা, তিনি ও জিম জারমুশ বহু বছর ধরেই পরস্পরের প্রতি চোখ টিপ মেরে চলেছেন।

পয়স্তি :: তা তো বটেই; এটি আকির অন্তস্তলে বসত করে। এ কোনো উন্নাসিকতা নয়, এ কাউকে খারিজ করে দেওয়ার ব্যাপার নয়; কেননা, কখনো কখনো আপনি নিজের দেখা সিনেমাগুলোর স্রেফ রেফারেন্স টানার মাধ্যমে সেগুলোর প্রতি আবেগ উগরে দেন। কিন্তু এখানে এর উপস্থিতির কারণ, তিনি সত্যিকার অর্থেই একজন সিনেমাপ্রেমী। আর জানেন তো, (এই ফিল্মে কাজ করতে গিয়ে) এ জীবনে আমার সত্যিকার অর্থেই দেখা জরুরি– এমন সিনেমার তালিকাটি প্রকৃত অর্থে দীর্ঘ হয়ে উঠেছে! আপনি একে অনুপ্রেরণা বলতে পারেন।

আকি কাউরিসমাকি
ফলেন লিভস। অ্যাকট্রেস: আলমা পয়ন্তি

আলমা পয়স্তি :: দেখা যাক! আমি বলতে চাচ্ছি, তিনি যে এই সিনেমা বানিয়েছেন– এই ঘটনা সবাইকেই চমকে দিয়েছে, এমনকি স্বয়ং তাকেও। তিনি ভীষণ প্রাণীত হয়েছেন; এটির শুটিংয়ের সময় সত্যিকার অর্থেই ছিলেন দারুণ মেজাজে। তা ছাড়া, আরেকটি সিনেমা হয়তো বানাতে যাচ্ছেন– এমন কথাও বলছিলেন।… আমি স্রেফ আশা করি, তা যেন হয়।


তার আঙুলগুলো এরপর
কোনদিকে যাবে– সে
কথা কে-ই-বা
বলতে
পারে

এই স্ক্রিপ্টের আবির্ভাব কীভাবে ঘটল, সে কথা তিনি (আমাকে) বলেছেন। এ ছিল একেবারেই মজার ব্যাপার। তিনি তখন বরং একেবারেই আরেকটি সিনেমার (স্ক্রিপ্ট) লিখছিলেন। অথচ তার আঙুলগুলো স্রেফ স্বয়ংক্রিয়ভাবে এটি লিখতে শুরু করে দিয়েছিল, আর তিনি এই স্ক্রিপ্ট একেবারেই অল্প সময়ের মধ্যে লিখে ফেলেছেন। তারপর তার মনে হয়েছিল, ‘আচ্ছা! আমি সম্ভবত (প্রলিতারিয়েত) ট্রিলজির চতুর্থ অংশটি লিখে ফেললাম! এটি সম্ভবত রোমান্টিক কমেডি হয়ে উঠবে। এমনটা কে ভেবেছিল কবে?’ তার মানে, হ্যাঁ, তার আঙুলগুলো এরপর কোনদিকে যাবে– সে কথা কে-ই-বা বলতে পারে!

Print Friendly, PDF & Email
সম্পাদক: ফিল্মফ্রি । ঢাকা, বাংলাদেশ।। সিনেমার বই [সম্পাদনা/অনুবাদ]: ফিল্মমেকারের ভাষা [৪ খণ্ড: ইরান, লাতিন, আফ্রিকা, কোরিয়া]; ফ্রাঁসোয়া ত্রুফো: প্রেম ও দেহগ্রস্ত ফিল্মমেকার; তারকোভস্কির ডায়েরি; স্মৃতির তারকোভস্কি; হিচকক-ত্রুফো কথোপকথন; কুরোসাওয়ার আত্মজীবনী; আন্তোনিওনির সিনে-জগত; কিয়ারোস্তামির সিনে-রাস্তা; সিনেঅলা [৪ খণ্ড]; বার্গম্যান/বারিমন; ডেভিড লিঞ্চের নোটবুক; ফেদেরিকো ফেল্লিনি; সাক্ষাৎ ফিল্মমেকার ফেদেরিকো ফেল্লিনি; সাক্ষাৎ ফিল্মমেকার ক্রিস্তফ কিয়েস্লোফস্কি; সাক্ষাৎ ফিল্মমেকার চান্তাল আকেরমান; সাক্ষাৎ ফিল্মমেকার বেলা তার; সাক্ষাৎ ফিল্মমেকার নুরি বিলগে জিলান; ক্রিস্তফ কিয়েস্লোফস্কি; বেলা তার; সের্গেই পারাজানোভ; ভেরা খিতিলোভা; সিনেমা সন্তরণ ।। কবিতার বই: ওপেন এয়ার কনসার্টের কবিতা; র‍্যাম্পমডেলের বাথটাবে অন্ধ কচ্ছপ; হাড়ের গ্যারেজ; মেনিকিনের লাল ইতিহাস ।। মিউজিকের বই [অনুবাদ]: আমার জন লেনন [মূল : সিনথিয়া লেনন]; আমার বব মার্লি [মূল: রিটা মার্লি] ।। সম্পাদিত অনলাইন রক মিউজিক জার্নাল: লালগান