স্মরণ হলো একধরনের আগ্রাসন: অ্যালাঁ রেনের ‘লাস্ট ইয়ার অ্যাট মারিয়েনবাদ’ নিয়ে কিছু কথা

212
লাস্ট ইয়ার অ্যাট মারিয়েনবাদ

লিখেছেন: আবির্ভাব মৈত্র


লাস্ট ইয়ার অ্যাট মারিয়েনবাদ
মূল শিরোনাম: L’Année dernière à Marienbad
ফিল্মমেকার: অ্যালাঁ রেনে
স্ক্রিনরাইটার: অ্যালাঁ রব-গ্রিয়্যে
সিনেমাটোগ্রাফার: সাশা ভিয়ের্নি
এডিটর: অঁরি কল্পি; জেসমিন চেসনি
মিউজিক স্কোর: ফ্রাঁসো স্যেরিগ
কাস্ট [ক্যারেকটার]: জিওর্জিও আলবের্তাজ্জি [পুরুষটি]; দেলফিন স্যেরিগ [নারীটি]; সাশা পিতোয়েফ [দ্বিতীয় পুরুষ]
রানিংটাইম: ৯৪ মিনিট
ভাষা: ফ্রেঞ্চ
দেশ: ফ্রান্স; ইতালি
রিলিজ: ২৯ আগস্ট ১৯৬১


“এমনও একদিন ছিল, যেদিন পদ্মার ওপারে বসে অল্প অল্প শাঁখ-ঘণ্টার শব্দ ভেসে আসত, আকাশের মেঘগুলো মুহূর্তে মুহূর্তে রঙ বদলাত, কিন্তু তারপর…”

কোমল গান্ধার-এর বিখ্যাত ‘বাফার শটের’ পূর্ববর্তী মুহূর্তে ভৃগুর মুখে এই সংলাপ আমাদের যেন অতীতের স্মৃতিমন্থনে সামিল হতে হাতছানি দিয়ে আহ্বান করে। ফেলে আসা সময়ের এই স্মৃতিমন্থনে আমরা যেন একপ্রকারের আনন্দ বা তৃপ্তি খুঁজে পাই। এই প্রসঙ্গে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের চলচ্চিত্রবিদ্যা বিভাগের গবেষক সায়ন্তন দত্ত তার এক লেখায় উল্লেখ করেছেন, “‘স্মৃতিমন্থন’ আর ‘নস্টালজিয়া’– এই দুটো শব্দ ইতিহাসের একটি বিশেষ ধরনের নির্মাণকে আন্ডারলাইন করে। যে নির্মাণের মধ্যে থাকে অতীতকে আঁকড়ে ধরে একধরনের কাল্পনিক আশ্রয় খোঁজার চেষ্টা, শান্তি খোঁজার চেষ্টা।”

রবীন্দ্রনাথের মেঘদূত শীর্ষক প্রবন্ধের সম্বন্ধে বলতে গিয়ে বিশিষ্ট তাত্ত্বিক শিবাজী বন্দ্যোপাধ্যায় তার এক লেখায় উল্লেখ করেছেন, অতীতের সাথে এই নিরন্তর প্রণয়লীলা আসলে বর্তমান সময়ের অন্ধকারময় বাস্তবের থেকে পলায়নের চেষ্টা। ফলত অতীতকে বর্তমানে প্রতিস্থাপনের চেষ্টায় সৃষ্টি হয় এক কাল্পনিক ইউটোপিয়া। কিন্তু অতীতকে বর্তমানের সাথে মিলিয়ে দেওয়ার এই চেষ্টায় আমরা ভুলে যাই, এই দুই কালের মধ্যিখানের চ্যুতিকে।

শিবাজী বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথা উদ্ধৃত করেই বলি, “যদি পূর্বগঠিত অতীত এবং বর্তমানের মধ্যে কোনো চ্যুতি গঠিত হয়, তাহলে এ কথা অস্বীকারের কোনো জায়গা নেই যে এর মধ্যিখানে এক বীভৎস কিছু ঘটে গেছে।” বস্ততপক্ষেই এই বীভৎস কিছু ফেলে আসা সময়ের স্মরণের এক বিশেষ তাৎপর্যকে বহন করে। যেই না সময়ের মধ্যিখানে অবস্থিত চ্যুতি লঙ্ঘিত হয়, সেই মুহূর্তেই এই বীভৎসতা এক ট্রমার রূপে আমাদের স্মৃতিমেদুরতার যাবতীয় ইলিউশনকে ভেঙ্গে চুরমার করে দেয়।

লাস্ট ইয়ার অ্যাট মারিয়েনবাদ। ফিল্মমেকার: অ্যালাঁ রেনে

সচেতন শিল্পীরা স্মৃতিচারণের পরবর্তী এই ট্রমাকে বারবার চোখে আঙুল দিয়ে চিহ্নিত করেন। লেখাটির শুরুতে কোমল গান্ধার ছবির যে দৃশ্যের কথা উল্লেখ করেছিলাম, সেখানে ভৃগুর দেশভাগের পূর্ববর্তী সময়ের স্মৃতিচারণের মধ্যে দিয়ে সময়ের মধ্যিখানের চ্যুতি একপ্রকারে লঙ্ঘিত হয়। সেই কারণেই চ্যুতি পরবর্তী দেশভাগের বীভৎসতা সমস্ত স্মৃতিমেদুরতাকে এক জোরে ধাক্কা মারে– সৃষ্টি হয় ট্রমার, যা পরবর্তী দৃশ্যেই রেললাইন ধরে আছড়ে পরে দূরে রাখা বাফারের ওপর। স্মরণ হয়ে ওঠে আগ্রাসনের প্রতীক।

স্মরণের এই আগ্রাসী রূপের এক অসামান্য চিত্ররূপ উঠে আসে অ্যালাঁ রেনের ১৯৬১ সালে নির্মিত ছবি লাস্ট ইয়ার অ্যাট মারিয়েনবাদ-এর মধ্যে দিয়ে। সমাজের উচ্চবিত্তে ভরপুর এক সুসজ্জিত হোটেলে একদিন একটি পুরুষের সঙ্গে এক নারীর আলাপ হয়। পুরুষটি নারীটিকে বলে, ঠিক এক বছর আগে ইউরোপের কোনো এক জায়গায় একইভাবে তাদের দেখা হয়েছিল। সেই সময় তারা দুজনেই একে অন্যের প্রেমে পড়া সত্ত্বেও নারীটি জানায়, সে পূর্বেই অন্য একজনের প্রণয়িনী। তাই তার পক্ষে সেই মুহূর্তে পুরুষটির সঙ্গে কোনোভাবে প্রেমের সম্পর্কে আবদ্ধ হওয়া সম্ভব নয়। যদিও সে কথা দেয়, যদি এক বছর পর তাদের পুনরায় সাক্ষাৎ সম্ভব হয়, তাহলে তাদের প্রেমে আবদ্ধ হতে কোনো বাধা থাকবে না।

কিন্তু অদ্ভুতভাবে এক বছর বাদে যখন তাদের মধ্যে পুনরায় সাক্ষাৎ হয়, তখন নারীটি পুরুষটিকে চিনতে অস্বীকার করে। শুধু তাই নয়, তাদের মধ্যকার পূর্বের কোনো প্রণয়ের সম্ভবনাকেও সে একইভাবে নাকচ করে। অতপর পুরুষটি স্মৃতিচারণের মাধ্যমে তাকে বারবার ফেলে আসা সময়ের কথা মনে করানোর চেষ্টা করে। কিন্তু বিভিন্নভাবে বোঝানোর পরেও নারীটি অতীতে তাদের সম্পর্কের কথা স্মরণ করতে ব্যর্থ হয়। এরই মধ্যে আসে এক তৃতীয় চরিত্র– সম্ভবত নারীটির স্বামী (ছবিতে এই ব্যাপারটি স্পষ্ট করে বলা হয়নি) এবং তৈরি হয় এক ত্রিকোণ প্রেম।

গল্পের জটিলতায় এর থেকে বেশি না ঢুকেই আমরা বুঝতে পারি, লাস্ট ইয়ার অ্যাট মারিয়েনবাদ হলো নায়ক কর্তৃক নায়িকার ভালোবাসা আদায়ের চিরাচরিত এক আখ্যান। কিন্তু আখ্যানের গভীরতায় না গিয়ে যদি ছবিটির মূল বক্ত্যবের দিকে আমরা দৃষ্টি নিক্ষেপ করি, তাহলে দেখতে পাব, রেনে অতীতের রোমন্থন ও একইসাথে তার অস্বীকার– এই দুই-এর এক সংঘাত সৃষ্টি করতে বেশি আগ্রহী।


প্রথম
দেখায় মনে
হয় যেন প্রথানুগত্যের
প্রতি এক বিশেষ
আসক্তি বহন
করছে

বস্তুতপক্ষে ছবিটির সার্বিক ফর্মের মধ্যেই এই সংঘাতের বীজ যেন বপন করা থাকে। ১৯৬০-এর দশকে ফরাসি নব্যতরঙ্গের সময়ের পরিচালকেরা (গোদার, ত্রুফো, রিভেত, শেব্রল প্রমুখ) যখন চলচ্চিত্রের চিরাচরিত ধারাকে অতিক্রম করে নতুন কিছু নির্মাণে ব্যস্ত, তখন লাস্ট ইয়ার অ্যাট মারিয়েনবাদ প্রথম দেখায় মনে হয় যেন প্রথানুগত্যের প্রতি এক বিশেষ আসক্তি বহন করছে। ছবিটির শুরুতেই তিন মিনিটের মন্তাজে রেনে আমাদের হোটেলটির বিভিন্ন স্থান ঘুরিয়ে দেখান। বিরাট ঝাড়বাতি, সিলিংয়ে আঁকা ফ্রেসকো ও দেওয়ালের বিভিন্ন ‘baroque’ নকশার দৃশ্যরূপ রচনা করে তিনি যেন ইউরোপীয় শিল্পকলার গৌরবময় সময়ের স্মৃতিচারণায় মগ্ন থাকেন।

কিন্তু এই স্মৃতিচারণ দীর্ঘস্থায়ী হয়ার পূর্বেই তিনি আমাদের এক অদ্ভুত স্পেসে নিয়ে উপস্থাপন করেন। যেখানে সকল চরিত্রই যেন ভুতগ্রস্ত, আপ্রকৃতস্থ। তাদের বিচ্ছিন্ন কথপকথন ও আড়ষ্ট আকার-ইঙ্গিত ছবিটির মূল প্রবাহের পথে যেন এক বাধা সৃষ্টি করে। ফলস্বরূপ যেখানে ছবিটি শুরু হয়েছিল ছবির মতো সুন্দর অতীতের স্মরণ দিয়ে, তা মুহূর্তেই পাল্টে যায় এক অ্যাবস্ট্রাকশন মিশ্রিত স্পেসে। ফলস্বরূপ সৃষ্টি হয় স্মরণের বিপরীতে থাকা এক প্রতিস্মরণ। মূলত গোটা ছবিটি জুড়েই বারবার, স্মরণ ও প্রতিস্মরণের এই সংঘাত রচিত হয়।

ছবির ফর্মের মধ্যে দিয়ে এই বৈপরীত্য নির্মাণ আসলে আমাদের শুরু থেকেই সচেতন করে আখ্যানে লুকিয়ে থাকা স্মরণের পরবর্তী আগ্রাসনের ব্যাপারে। ছবিটিতে পুরুষটি বারবার নারীটিকে অতীতের কথা মনে করিয়ে একপ্রকারে অতীত ও বর্তমানকে এক সূত্রে গাথার চেষ্টা করে। রেনের পূর্ববর্তী ছবি হিরোশিমা মাই লাভ-এও এই প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। বস্তুত সেখানে তিনি অতীতের রোমন্থনকে বর্তমানে নিয়ে আসেন চরিত্রদ্বয়ের মধ্যে সংযোগ স্থাপনের জন্য। কিন্তু লাস্ট ইয়ার অ্যাট মারিয়েনবাদ-এ অতীত শুধুমাত্র রোমন্থনেই সীমাবদ্ধ থাকে না। বরং অতীত ও বর্তমানের সঙ্গে এক অদ্ভুত জাক্সটাপজিশনে পুরো সময়কালটি ঘেঁটে যায়– আমরা বুঝে উঠতে পারি না কোনটি অতীত ও কোনটি বর্তমান, কোনটি বাস্তব ও কোনটি কাল্পনিক।


যে
মুহূর্তে
চ্যুতিটি লঙ্ঘিত
হয়, তৎক্ষণাৎ তার মধ্যে
লুকিয়ে থাকা বীভৎসতা
যেন মাথাচাড়া
দিয়ে ওঠে

আখ্যানের এ হেতু গঠনের ফলে চরিত্রগুলোর মধ্যে অতীতের একধরনের যাপন লক্ষ্য করা যায়। যার ফলে, অতীত ও বর্তমানের মধ্যের যে চ্যুতি, তা যেন লঙ্ঘিত হয়। আর যে মুহূর্তে চ্যুতিটি লঙ্ঘিত হয়, তৎক্ষণাৎ তার মধ্যে লুকিয়ে থাকা বীভৎসতা যেন মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। এই বীভৎসতাই এক ট্রমার রূপ ধারণ করে যেন সবকিছু ভেঙ্গে চুরমার করে দিতে চায়। স্মরণের এই রূপ অগ্রাসন ছবিটিতে বারবার ফিরে আসে বিভিন্ন দৃশ্যের মাধ্যমে– কখনো স্বামীটির হাতে নারীটির খুন, কখনোবা পুরুষটির নারীটির প্রতি আগ্রাসন বা পুরুষটিরই অপঘাতে মৃত্যু।

এই আগ্রাসনের বিরুদ্ধে ব্যর্থ প্রতিরোধের গড়ে তোলার ব্যাপারটিও এক্ষেত্রে তাৎপর্যপূর্ণ। কোমল গান্ধার-এর ‘বাফার শটে’ ঋত্বিক সাউন্ডে যেমন ভাবে ‘দোহাই আলি’ আর্তনাদকে ব্যবহার করেন স্মরণ কর্তৃক আগ্রাসনের ব্যর্থ প্রতিরোধ হিসেবে, তেমনই রেনের ছবিতে এই ব্যর্থ প্রতিরোধ হিসেবে একাধিকবার শোনা যায় নারীটির বীভৎস চিৎকার। এই চিৎকার শুধু চরিত্রটির অতীতের বীভৎস রূপ দর্শনের ভয়াল প্রতিক্রিয়া হয়ে থাকে না; বরং সমষ্টিগতভাবে সকলেই যে অতীতের স্মৃতিচারণার এক বিরাট নাশকতার শিকার তা চোখে আঙুল দিয়ে বুঝিয়ে দেয়।

লাস্ট ইয়ার অ্যাট মারিয়েনবাদ

কিন্তু এত কিছুর পরও শেষে নারীটি ও পুরুষটির মিলনই রচনা করেন রেনে। শেষের দৃশ্যে নারী ও পুরুষটির একসঙ্গে হোটেলটি থেকে প্রস্থান একপ্রকারে যেন তাদের অতীতকেই মান্যতা দেয়। বর্তমান ও অতীতের যেন মিলন ঘটে এই দুই প্রণয়ীর মিলনে। তাহলে কি রেনে শেষে এটাই বোঝালেন, যতই স্মরণের আগ্রাসনের ভ্রূকুটি থাকুক, অতীতের স্মৃতিমেদুরতাকে আঁকড়ে ধরে পলায়নই শেষ পন্থা?

লাস্ট ইয়ার অ্যাট মারিয়েনবাদ-এর চিত্রনাট্যকার আল্যাঁ রব-গ্রিয়্যে ছবিটি সম্পর্কে বলতে গিয়ে বলেছিলেন, এ ‘এক প্ররোচনার গল্প’, যেখানে গল্পের নায়ক, নায়িকাকে ‘অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ’ অফার করছে আল্যাঁ রেনের প্রথম পর্বের ছবিগুলোর (আমার দেখা) এক লক্ষ্যণীয় বিষয় অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতের এক ত্রিস্তরিয় স্পেসে অবস্থান। এই ত্রিস্তরিয় স্পেসে যেভাবে অতীত ও বর্তমান পাশাপাশি সহাবস্থান করে (পূর্বেই যা আলোচনা করা হয়েছে), তেমনি ভবিষ্যতের প্রতি এক বিস্ময় লুকিয়ে থাকে।

উদাহরণস্বরুপ রেনের ১৯৫৬ সালে নির্মিত স্বল্পদৈর্ঘ্যের ছবি নাইট অ্যান্ড ফগ-এর শেষ দৃশ্যটি আমাদের আলোচনার জন্য জরুরি হতে পারে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রায় এক দশক পর নাৎসি বন্দিশিবির নিয়ে নির্মিত বহুচর্চিত এই ছবির শেষ দৃশ্যে বিস্তীর্ণ প্রান্তরের ওপর দিয়ে ক্যামেরা প্যান করে শেষে কনসেনট্রেসন ক্যাম্পের একটি ভগ্নস্তুপের ওপর স্থির হয়। ব্যাকগ্রাউন্ডে ভয়েসওভারে ভেসে আসে, ‘আমাদের মধ্যে থেকে কে-ই-বা আমাদের সতর্ক করবে নতুন জল্লাদদের আগমনের হাত থেকে? তাদের চেহারা কি আমাদের থেকে সত্যিই আলাদা?’

সাউন্ড ও ইমেজের এই অদ্ভুত জাক্সটাপজিশনে পূর্বে আলোচিত এই ত্রিস্তরিয় স্পেসটি যেন আমাদের কাছে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। অতীতের ভারবহনকারী ওই ভগ্নস্তূপ যেন বর্তমান সময়ে দাঁড়িয়ে হয়ে ওঠে ভবিষ্যতের এক সূচক।

লাস্ট ইয়ার অ্যাট মারিয়েনবাদ

পূর্বেই আমরা আলোচনা করেছি যে অতীত ও বর্তমান পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন। তাদের মধ্যে মিলনের চেষ্টা একপ্রকার আগ্রাসনের প্রতি ইন্ধন যোগায়। কিন্তু ভবিষ্যতকে যদি বর্তমানের এক বিকল্প হিসেবে স্থাপনের চেষ্টা হয়, তাহলে তৈরি হয় এক নতুন ইলিউশনের। আর একে ভর করেই তৈরি হয় একধরনের ইউটোপিয়ার। লাস্ট ইয়ার অ্যাট মারিয়েনবাদ-এর শেষে তাই পুরুষ ও নারীটির মিলন হয়ে ওঠে এই ইউটোপিয়ারই সূচক।

বস্তুত এই নতুন ইলিউশন স্মরণের এক নতুন সম্ভাবনাকে উসকে দেয়। তাই পূর্বে আলোচিত স্মরণের আগ্রাসন আবারও ফিরে আসার পথ খোলা থাকে। তাই শেষ দৃশ্যে পুরুষ ও নারীটির মিলন এবং হোটেলটি থেকে তাদের প্রস্থান চক্রাকারে তাদের অতীতের কাছেই ফিরিয়ে আনে (শেষ দৃশ্যে প্রথম দৃশ্যে প্রদর্শিত নাটকের রেফারেন্স চক্রাকারে পূর্বতন স্থানে ফিরে আসাকেই ব্যাখা করে)। এই প্রক্রিয়ায় অতীতের আগ্রাসন পুনরায় ফিরে আসে কি না, তার কোন স্পষ্ট ব্যাখা রেনে শেষ পর্যন্ত আমাদের দেন না। তার হয়তো আলাদা করে দরকারও পড়ে না।

বিরাট হোটেলের শেষ স্টিল ইমেজই যেন বলে দেয় স্মরণপন্থার জাল থেকে বেরোনোর উপায় নেই, ঠিক যেমন লাস্ট ইয়ার অ্যাট মারিয়েনবাদ-এর চরিত্ররাও এই হোটেল থেকে কোনোদিন বেরোতে পারবে না।

রেফারেন্স
১. দত্ত, সায়ন্তন, “দেশভাগের যন্ত্রণা: কোমল গান্ধার ছবির দুটি দৃশ্য”, অগাস্ট ১৫, ২০২১
২. দত্ত, সায়ন্তন, “নস্টালজিয়ার বিপ্রতীপে: ঋত্বিক ঘটকের পঁচানব্বইতম জন্মদিনে”, নভেম্বর ৪, ২০২০
৩. বন্দ্যোপাধ্যায়, শিবাজি, “Dis-membering and Re-membering: The Art of Ritwik Ghatak”, SIBAJI BANDYOPADHYAY READER, P – 214
৪. Morrissette, Bruce, “Monsieur X on the Double Track: Last Year at Marienbad”, 1961.
৫. Alain Resnais, Last Year at Marienbad, 1961, Hiroshima Mon Amour, 1959, Night and Fog, 1956.
৬. ঋত্বিক ঘটক, কোমল গান্ধার, ১৯৬১
Print Friendly, PDF & Email