হাওয়া: যেভাবে একটি জগতের উন্মোচন

698
হাওয়া

লিখেছেন: আনিস পারভেজ

হাওয়া

হাওয়া
ফিল্মমেকার: মেজবাউর রহমান সুমন
স্ক্রিনরাইটার: জাহিন ফারুক আমিন, সুকর্ণ শাহেদ ধীমান
এক্সিকিউটিভ প্রডিউসার: শিমুল চন্দ্র বিশ্বাস
সিনেমাটোগ্রাফার: কামরুল হাসান খসরু
মিউজিক স্কোর: রাশিদ শরীফ শোয়েব
এডিটর: সজল অলোক
কাস্ট: চঞ্চল চৌধুরী, নাজিয়া তুষি, শরিফুল রাজ, সুমন আনোয়ার, সোহেল মন্ডল
রানিংটাইম: ২ ঘণ্টা
ভাষা: বাংলা
দেশ: বাংলাদেশ
রিলিজ: ২৯ জুলাই ২০২২


জেনেসিসে যেমন, ‘শুরুতে ছিল শব্দ, ঈশ্বরের সাথে শব্দ এবং শব্দই ঈশ্বর’, হাওয়াতেও এরকমই– শুরু হয় শব্দ দিয়ে, পর্দায় কোনোকিছু দৃশ্যমান হবার আগে। একজন হকার ইঙ্গিতময় শব্দ উচ্চারণ করে তৈরি করে পটভূমি, জানান দেয় একটি কিচ্ছার, দরিয়া বা সমুদ্রের কিচ্ছা যেখানে বিজ্ঞান অর্থাৎ মানুষের যুক্তি খাটে না, এবং ইশারা দেয় সিনেমাটিতে সুপ্ত দর্শন সম্পর্কে।

পর্দার ডান দিক থেকে মিডশটে একটি ভ্যান ঢোকে, মাছের ভ্যান, ভ্যানের সামনে থেকে হাওয়ায় উড়তে থাকা পলিথিন; পর্দা থেকে হাওয়া আসে হলের ভেতর হাওয়া দেখতে আসা দর্শকের চোখে মুখে ও শরীরে। অনেকগুলো ইন্টারকাট, ছোট ছোট দৃশ্য– বাজারে মানুষের ভিড়, দোকানি চা বিক্রি করছে, নাপিত বাহুমূল কামাচ্ছে এক ব্যক্তির যার নাম চান মাঝি [চঞ্চল চৌধুরী]– গল্পের কেন্দ্রের চরিত্র।

হকারটিকে দেখা যায় জড়িবুটি বিপণনে মানুষজনকে সম্মোহিত করছে কথায়, ওখানে যারা দাঁড়িয়ে তাদের পরবর্তীকালে দেখা যাবে ট্রলারে যেখানে কিচ্ছার আবর্তন। বা দিক থেকে ডান দিকে মাছ ধরার ট্রলারের যাত্রা, যার নাম ‘নয়নতারা’। লং শটে সাগরের বুকে ট্রলার। চরাচরে নীল শূন্যতা ঝিলিমিলি করে কাঁপছে চিকন ঢেউয়ে, সাউন্ডট্র্যাকে একটি নারীকণ্ঠে ঝিম জাগানিয়া অদ্ভুত সুর– যেন প্রাচীনদের কণ্ঠ থেকে সময় অতিক্রান্ত কোনো ধ্বনি, দেশি বাদ্যযন্ত্রে পাশ্চাত্যের সিম্ফনি। এ সুর সিনেমায় ফিরে ফিরে আসে।

এভাবেই শুরু হয় একটি জগতের, নাম তার হাওয়া, মেজবাউর রহমান সুমন ও তাঁর সংঘ– চিত্রনাট্যকার, চিত্রগ্রাহক, সম্পাদক, সঙ্গীত নির্মাতা, অভিনেতা ও আর সকল– একটি জগতকে সিনেমায়িত করেন যেখানে অনেকগুলো লেয়ারের কাজ, লোভ ও চুরি, লিবিডোর তাড়না এবং সর্বোপরি প্রতিশোধের কিচ্ছা, যা ঘটে বা ঘটতে পারত বা ঘটা প্রয়োজন; এসবের বুনোন বাস্তব ও কল্পবাস্তবের সুতোয়। আছে ভালোবাসারও ঈষৎ হাওয়া।

হাওয়া। ফিল্মমেকার: মেজবাউর রহমান সুমন

লোভ, লিবিডো এবং প্রতিশোধ মানব ইতিহাসের পরতে পরতে এবং মানুষের শিরায় শিরায়; এসবই মৌল তাড়না যা মানুষকে দিয়ে ভালো ও মন্দভাবে উদ্দীপ্ত করে ঘটনা ঘটাতে। এসব নিয়ে হয়েছে বিস্তর শিল্প সৃষ্টি এবং তৈরি হয়েছে অগুণতি সিনেমা। ভবিষ্যতেও হবে, হতেই থাকবে। ঘটনার বিবরণ শিল্পের কাজ নয়, শিল্প ঘটানোর গড়নে নান্দনিক ছোঁয়া দিয়ে সনাতন ঘটনার বিবিধ ব্যাখ্যা দেয়, সৃষ্টি করে নতুন অভিঘাত। শিল্প ইন্দ্রিয় দিয়ে ইন্দ্রিয়াতীত লোকের চাবি খোলে, এবং তা করতে গিয়ে শিল্প ও মানব জ্ঞানের পরপম্পরায় ভর করলেও একজন শিল্পী নিজস্ব সাক্ষর রাখেন প্রচলিত ফ্রেমের বাইরের দ্যুতি এনে পরম্পরা-অভিযোজিত শিল্পে নতুন মাত্রা দিয়ে। সুমন এ কাজটিই করেছেন হাওয়ায়।


প্রচলিত মিথ ভরকেন্দ্র
হলেও হাওয়া মিথের
গুটি উল্টেছে

হাওয়া গল্প হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে এ জনসমাজের মিথের ওপর। মনসামঙ্গল-এর মিথের সাথে মেশানো দরিয়ার মানুষের মিথ, যা এই বাঙলায় ধমনিতে বইছে হাজার বছর ধরে। প্রচলিত মিথ ভরকেন্দ্র হলেও হাওয়া মিথের গুটি উল্টেছে।

মনসামঙ্গল-এর চাঁদ বণিকের সাথে মনসার যে দ্বন্দ্ব তা হাজার বছর ধরে বাঙলা ও অসমের কৌম-মনস্তত্ত্বকে চিন্তা আবেগ ও সর্বোপরি বোধের জোগান দিয়েছে, যা থেকে রচিত হয়েছে গান পালা এবং সিনেমা। স্মৃতি ও শ্রবণে যুগের পর যুগ পেরিয়ে বিশ্বাসে ও মননে হাজার বছর চাষাবাদ করে করে চাঁদ বণিকের সাথে মনসার দ্বন্দ্ব বাঙলার জনপ্রিয় মিথগুলোর একটি। চেতনে ও অবচেতনে চাঁদ বণিক বাঙলায় নায়ক যাকে মনসা দংশেছে বারবার। হাওয়ায় চান মাঝি ও গুলতির [নাজিফা তুষি] লড়াইয়ে চান হেরে যায়, যদিও তাঁর নাম চাঁদ বণিকের স্থানিক রূপ এবং গুলতিকে পাঠিয়েছে কোনো দেবী, হয়তো মনসা।

হাওয়া

এভাবেই হাওয়া মনসামঙ্গল থেকে, আরও গাড় অর্থে বাঙলার মিথকে ধারণ করেও ভিন্ন মাত্রায় বিকশিত– এখানে চান মাঝির ভেতর আছে অহং, কিন্তু নেই চাঁদ বণিকের চারিত্রিক দৃঢ়তা। চান মাঝি পাপাচারের সাক্ষাৎ মূর্তি। আর এখানেই সম্ভবত সুমনের শক্তি ও মেধা সে একই গুটি ব্যবহার করেও গুটি উল্টে দিয়েছে, তৈরি করেছে নতুন এক মাত্রা যেখানে জননন্দিত মিথের ছায়ায় ভিন্ন অর্থ সংস্থাপিত হয়। এবং দর্শক তা গ্রহণ করে যার অবচেতন ও অর্ধচেতনে আছে মনসামঙ্গল-এর ছায়া ও লোকালয়ের কৌম-মনস্তত্ত্ব। হাওয়ার হাওয়া কৌম-মনস্তত্ত্বে ভিন্ন টোকা দিয়েছে কারণ নির্মাতা হিসেবে সুমন ধরতে পেরেছেন এ সময়কার চিত্তের চাহিদা ও দার্শনিক বোধ, যা তিনি শ্লাঘা জাগানিয়া মুন্সিয়ানায় সিনেমায়িত করেছেন।

হাওয়া গড়ন বা শৈলীতে বহন করে বিভিন্ন পরম্পরা– নির্মিতিতে আছে লিয়োনার্দো দ্য ভিঞ্চির ত্রিকৌণিক-ব্লকিং এবং রামব্র্যান্টের আলো-আঁধারের ভেতর লালের ছোঁয়া। চিত্রগ্রাহক কামরুল হাসান খসরু ট্রলারের অতিসিমিত স্থানকে ব্যবহার করেছেন কখনো অ্যাপারচার ছোট করে যাতে দৃশ্যের বিস্তার অর্থাৎ ডেপথ অফ ফিল্ড বেড়ে যায়। বারবার ব্যবহৃত হয়েছে ত্রিকৌণিক-ব্লকিং এবং অনেক সময় একই ফ্রেমে তিনটি লেয়ারে পাত্রপাত্রি। ভিঞ্চির দ্য ভার্জিন অ্যান্ড চাইল্ড উইথ সেন্ট অ্যান-এর ত্রিকৌণিক-ব্লকিং ফ্রেম থেকে ফ্রেমে। চান মাঝি অন্যান্যদের নিয়ে আলোচনা করছে গুলতিকে নিয়ে কি করা কর্তব্য, ব্যাকগ্রাউন্ডে ছোট্ট দরজা দিয়ে দেখা যায় অনফোকাসে গুলতি হেঁটে যাচ্ছে ঘার ঘুরিয়ে মাঝিদের দেখতে দেখতে। উরকেস , পারকেস ও গুলতির আনন্দমুখর ভিডিও ধারণ, পেছন থেকে ইবা তাদের দেখছে, ত্রিকোণের ডান কোন থেকে চান মাঝির মুখ বেরিয়ে আসে, সে তাদের গালমন্দ করে। ত্রিকোণ কখনো চৌকোণে বদলায়, যা ঘটনার গতিকে বাড়িয়ে দেয়, দর্শক টানটান হয়ে বসে, মনোযোগ তার নিমজ্জিত সিনেমায় বুনোন জগতে।



রকম
আলো-আঁধারি
মোহময় এবং একইসাথে
ধারণ করে
রহস্য

রামব্র্যান্টের চিত্রকর্ম দ্য নাইট ওয়াচ-এর প্রচ্ছন্ন কিন্তু কার্যকরী ছোঁয়া কয়েকটি ফ্রেমে, যেমন জালে উঠে আসা গুলতিকে অর্ধবৃত্তাকারে সবাই দেখছে, মাঝখানে চান মাঝি। রামব্র্যান্টে বা রেনেসাঁ উত্তর ইউরোপীয় চিত্রের আলো-আঁধারি হাওয়ার রাতের দৃশ্যে, এবং বিশেষ করে জলে গুলতি ও ইবার আলাপের সময়– আঁধারের জল, চিকন করে কাঁপছে, ট্রলারের উপর থেকে লাল ট্রান্সটেন্ট লাইটের আলোয় গুলতির লাল রঙের শাড়ি। এ রকম আলো-আঁধারি মোহময় এবং একইসাথে ধারণ করে রহস্য।

সিনেমায় কিছু ইমেজ হয় মনোমুগ্ধকর, কিছু মাখনে ছুরির মতো শরীরে ঢুকে যায়। হাওয়ায় ইমেজ একইসাথে দুটো– মন ও শরীর– দুইই আবেশিত হয়। ক্যামেরা আকাশ থেকে পাখির চোখে সমুদ্র দেখে, কখনো জলের নিচে; আবার কখনো লেন্সের অর্ধেক জলের নিচে এবং অর্ধেক উপরে, যেমন উরকেস ও পারকেসের সাঁতারের সময়– আমরা সমুদ্রের শরীরে ঢুকে যাই যা এখনই গ্রাস করবে পারকেসকে। এখানেও তিনটি লেয়ার– ফোরগ্রাউন্ডে ফেনাভ জল, মাঝখানে উরকেস সাঁতরাচ্ছে এবং ব্যাকগ্রাউন্ডে ট্রলার।

হাওয়া

সহজাত শক্তিতেই সিনেমা শরীরকে উদ্দীপ্ত করে, যাকে আমরা বলি ‘দ্য পাওয়ার অব ইমিডিয়েসি’, ফ্রেমের আকার ও বিস্তার এবং গতি দর্শকের সাথে পর্দার দূরত্ব ঘুচিয়ে তাকে করে তোলে যেন সে ঘটনায় গ্রোথিত। হাওয়ার চিত্রায়ন যেমন আমাদের নিমজ্জিত করে ঠিক তেমনি এর সম্পাদনা মাঝেমধ্যেই ঘটনা থেকে বিরাম দেয়, সময় দেয় অন্য অঙ্কে যাবার জন্য। ভয়ানক কিছু ঘটে যাওয়ার পর পর্দা জুড়ে সমুদ্রের উল্লম্ব ঢেউয়ের ক্লোজআপ কিংবা মিডশটে রাতের অন্ধকারে গুলতি হেঁটে যায় ট্রলারের লম্বালম্বি এপাশ থেকে ওপাশ, গুলতির উধাও হয়ে যাওয়ার পর জলের গভীরে তিমির ঘোরাফেরা– এ রকম অসংখ্য ট্রানজিশন আমাদের কগ্নিশনে ছায়া ফেলে চেতনার স্রোতকে সিনেমায় উন্মোচিত জগতের সাথে কখনো গ্রোথিত রাখতে আবার কখনো দেয় বিরাম দর্শককে নিজস্ব ভাবনা ও অনুভূতির মাটিতে ফিরে আসতে।

সজল অলক জাম্পকাটের বদলে অধিকাংশ সময় ট্রানজিশনে ব্যবহার করেছেন ‘সিমলেস এডিট’, যার ফলে সিনেমার শরীর জুড়ে রয়েছে সংগীতের ছন্দ। দেশি বাদ্যযন্ত্রে পাশ্চাত্যের সুর যার তলানিতে একটি প্রাচীন আর্তি, রাশিদ শরীফ শোয়েবের আবহসংগীতের এ ধারাটি হাওয়ায় আছে সম্পাদনার হাত ধরাধরি করে। তাই লং শট থকে ক্লোজে গেলেও দৃষ্টিভঙ্গ হয় না।


বিশ্বাসে বিষ খেলেও সয়ে
যায়, অবিশ্বাসে মধু
খেলেও
ক্ষতি

হাওয়ায় সংগীতে ও ধ্বনিতে মিশেল প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য, কথনে গ্রিক নাটক ও মহাভারত-এর অনুকরণে সিনেমার শুরুতেই বলে দেওয়া হয় কী ঘটছে। দৃশ্যের আগেই শব্দ, হকার বলছে সমুদ্রে অনেক কিছুই ঘটে যার ব্যাখ্যা নেই। বিশ্বাসেই ঘটনা ঘটে, অর্থাৎ একটি জগতের সৃষ্টি হয়। হকারের জবানিতে, বিশ্বাসে বিষ খেলেও সয়ে যায়, অবিশ্বাসে মধু খেলেও ক্ষতি। দুনিয়া পাপে ভরে গেছে, কিন্তু হাজার বছরের গাছপালায় গুণের কমতি নেই, এখনো এর দাওয়াইয়ের গুণ অব্যর্থ। হকার যা উহ্য রেখেছে তা হলো প্রকৃতি অবিকৃত এবং এরও আছে ন্যায়বোধ, তাই প্রকৃতি মানুষের পাপের শাস্তি দেবে।

পৃথিবীর সর্বত্র তো বটেই, বাঙলার কৌম-মনস্তত্ত্বও প্রকৃতির কাছে প্রত্যাশা করে পাপ ও অনাচারের বিচার। মানুষের এ প্রত্যাশা যুগে যুগে রূপ নিয়েছে গল্পে, এবং গল্প আকার পেয়েছে মানুষের কল্প-বাস্তবতায়, যার বিবিধ নাম, যেমন পরাবাস্তবতা, জাদুবাস্তবতা ইত্যাদি যা চেতন ও অবচেতনের বাসনার কল্প-বাস্তবতা। কল্প-বাস্তবতায় রূপ রূপকের সাহায্য নেয়, দৃশ্যমান বাস্তবতায় দেওয়া হয় অতিলৌকিক প্রলেপ।

হাওয়া

পৃথিবীর সব মিথই অতিলৌকিক, এখানে পাখি কথা বলে ও বুদ্ধি দেয়, যেমন ময়মনসিংহ গীতিকায় সুক পাখি। গারসিয়া মারকেসের শতবর্ষের নীরবতায় ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য-বাস্তব ও কল্প-বাস্তব অহর্নিশ একই সময়ে ঘটতে থাকে, আলকেমিস্ট মরে যাওয়ার পরেও ফিরে আসে। প্রকৃতির যতটুকু মানুষের বোধগম্য তার চেয়ে অনেক বেশি বোধাতীত, অজানা এক জগতের বাসিন্দা প্রতিটি মানুষ, এক সীমাহীন অন্বেষণের সে যাত্রি। প্রথমত, বোধাতীত জগতকে বোধে আনতে এবং দ্বিতীয়ত নিজের সীমাবদ্ধ শক্তিকে অতিক্রান্ত করে শুভ্র সুন্দর প্রতিষ্ঠা করতে মানুষ গল্প নাটক পালা ও চিত্রকলায় বিবিধ মাত্রায় রূপকের ব্যবহার করে, কখনো পুরো গড়নটি হয়ে ওঠে অতিলৌকিক বা বিমূর্ত। বিশ্বাসে ও এর অভিব্যক্তি শিল্পে মানুষ বারবারই প্রকৃতির সাহায্য চেয়েছে যা তার সাধ্যাতীত।


হাওয়া
ততটুকুই
অতিলৌকিক
যতটা এ জনপদের
লোকশিল্পে একসময়
চর্চিত হতো এবং
স্থানীয় মিথে
গ্রোথিত

সিনেমার শুরুর দিনগুলোতে, গত শতকের বিশ দশক থেকেই, পরাবাস্তব আঙ্গিকে সিনেমা তৈরি হয়েছে, যেমন বুনুয়েলের আন্দালুসিয়ান ডগ, এবং এখনো হচ্ছে। সুমনের হাওয়া শুদ্ধ পরাবাস্তব সিনেমা থেকে ভিন্ন। হাওয়ায় ততটুকুই অতিলৌকিক যতটা এ জনপদের লোকশিল্পে একসময় চর্চিত হতো এবং স্থানীয় মিথে গ্রোথিত। হাওয়ায় ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য-বাস্তবের সঙ্গে কল্প-বাস্তবের শিল্পিত মিশ্রণ যার উদ্দিষ্ট একটি বার্তা সরব করা, তা হলো পাপ ও অনাচারে ভরে যাওয়া মানবজীবনে প্রকৃতি হাত দেবে, কারণ প্রকৃতি নষ্ট হয়ে যায়নি। গুলতি মানুষ, মৎস্যকন্যা নাকি দেবী-প্রেরিত তা এখানকার কৌম-মনস্তত্ত্বে ধোঁয়াশা তৈরি করে না, আমাদের কগ্নিশন অনায়াসে তা গ্রহণ করে, করে রস আস্বাদন এবং অনেকেই রস নিংড়ে এর পেছনের দর্শনটুকুও ধরতে পারে এবং সাজিয়ে নিতে পারে নিজস্ব ব্যাখ্যায়।

হাওয়া

হাওয়া একটি জগতকে সৃষ্টি করে, যা একইসাথে দর্শককে প্রীত করে এবং ভাবায়, এবং এর আবেদন চিত্তে এবং বোধে। একটি সফল সিনেমার শক্তিই হলো বিনোদন ও মননে টোকা, এ দুটোর মিলন অনেক দুরূহ, অনেক সময় সাংঘর্ষিক– বিনোদন মননকে মেরে ফেলে এবং মনন বিনোদনকে কাছে আসতে দেয় না। সুমন অসামান্য কুশলতায় এ দুইয়ের ব্যাল্যান্স করেছেন যখন প্যারালাল সিনেমার অনেক নির্মাতাই কলাকৈবল্যের অকুশলি সাধক এবং ফিল্ম ফেস্টিভ্যালমুখি হয়ে বাংলাদেশের সিনেমাকে ক্রমশই জনবিচ্ছিন্ন করে ফেলছেন আর মূলধারার সিনেমা হয়েছে লক্ষিন্দরের লাশ। সুমন বেহুলা হয়ে গাঙে নেমেছেন, তাঁর নৌকায় লক্ষিন্দরের লাশরূপী বাংলা সিনেমা। হাওয়ায় আমরা লক্ষিন্দরকে চোখ খুলতে দেখছি।

বাংলাদেশের সিনেমায় সম্ভবত প্রাণ আসছে সুমনের হাত ধরে।

Print Friendly, PDF & Email