ঋতুপর্ণ: তাকে সার্থক করে রাখা

119
ঋতুপর্ণ ঘোষ

লিখেছেন: আসিফ রহমান সৈকত

নারীর পারস্পেকটিভ থেকে নারীকে দেখা, তাকে বিশ্লেষণ, তার মনস্তত্ত্বের, তার কাজের। আর পুরুষের পারস্পেকটিভ থেকে নারীকে বিশ্লেষণ আরেক রকম। কিন্তু এই দুই জায়গা থেকেই সত্যিকারের নারীর যে রূপ, মনস্তত্ত্ব বোঝার ক্ষমতা যিনি রাখেন, তিনি পরিচালক ঋতুপর্ণ ঘোষ। সারা বাংলায়, পুরো ভারতীয় উপমহাদেশে, হয়তো সারা পৃথিবীতেও এই কঠিন জায়গাতে নিজেকে নিয়ে যাওয়ার এবং সেখান থেকে ঐ মানসিকতাগুলোকে বিশ্লেষণের ক্ষমতা যে কয়জন রাখেন, তাদের মধ্যে ঋতুপর্ণ সেরা। বাঙালি হিসাবে এই দাবি আমি সাহস নিয়েই করতে পারি। করতে চাই।

ঋতুপর্ণের সিনেমা, সব চরিত্র কাল্পনিক আর অজয় দেবগন, ঐশ্বরিয়া রাইয়ের মতো অভিনয়শিল্পীদেরকে তাদের অভিনয় জীবনের অন্যতম সেরা কাজ করার সুযোগ তৈরি করে দেওয়া রেইনকোট সিনেমাতে এই চিন্তার জায়গাটা আমরা দৃশ্যে আর শব্দে দেখতে আর শুনতে পাই; যেটা আগে হয়তো আসেনি এভাবে। দেখার পর একটা গভীর ভাবনা আপনাআপনি ভর করে নিজের ওপর। সেটা যদি কেউ সত্যি পুরোটা মনোযোগ দিয়ে দেখে, তার এড়ানোর কোনো উপায় থাকে না। এই বোধ অন্য সব সিনেমা থেকে কেউ পাবে না।


ইচ্ছে
পূরণ না
হওয়ার বা
হতে না দেওয়ার
বা হতে চাওয়ার পথে
বাধা পেরোনোর যুদ্ধের গল্প

আর এই জায়গাটাকে একেবারে অন্য মাত্রায় নিয়ে গেছে চিত্রাঙ্গদা সিনেমা। যেটা ইচ্ছেপূরণের গল্প। দোটানায় থাকা মানুষের গল্প। আশেপাশের কঠিন অবুঝ জায়গার গল্প। ইচ্ছে পূরণ না হওয়ার বা হতে না দেওয়ার বা হতে চাওয়ার পথে বাধা পেরোনোর যুদ্ধের গল্প। যে বোধের পরিচয় খুবই কম মানুষেরই আছে। সেটাও পর্দায় দর্শকের কাছে পৌছানোর ক্ষমতা রাখেন, একজন ঋতুপর্ণ ঘোষ। আর কেউ পারেন না। সহজে পারেন না। আর করতেও চান না।

রেইনকোট। ফিল্মমেকার: ঋতুপর্ণ ঘোষ

না বলা কথা বা না বলতে পারা কথাকে ইমেজ দিয়ে বলতে চাওয়ার ইচ্ছাকে ইমেজে ফুটিয়ে তোলার দারুণ ক্ষমতা দেখি আমরা রেইনকোট সিনেমাতে। আর এই ‘হবে হবে, হচ্ছে হচ্ছে’ মুহূর্তগুলো দর্শক হিসাবে আমাদেরকে তাড়িয়ে বেড়ায়। আমাদের মধ্যেও একইরকম অনুক্ত কিছু প্রকাশ করার তাড়না তৈরি করে। দর্শক আর নিজের মধ্যে থাকেন না। নিজেও অপ্রকাশের যন্ত্রণাতে আক্রান্ত হয়ে অস্থিরতায় ভোগেন।

চরিত্র দুইটা জানে না যে তারা কি জানে না বা আরেকজন জানে কি না। কিন্তু দর্শক সেটা কিছুটা জেনে নিজেই আরও অস্বস্তিতে ভুগতে থাকেন। হিন্দি সিনেমার ইতিহাসে এটা মাইলফলক একটা সিনেমা। হিন্দি সিনেমা যখন পথ হারায়, তখন এই রকম সিনেমা আবার শৈল্পিক সিনেমার তাড়না তৈরি করে। নির্মাতাদের মধ্যে। দর্শকের মধ্যেও তৈরি করে নতুন পিপাসা।


রেশ
থেকে যায়
সিনেমার পরেও

৫০ বছরও পূর্ণ হলো না ঋতুপর্ণ ঘোষের। চলে গেলেন আমাদের ছেড়ে। অপূরণীয় ক্ষতি। কম করে হলেও আরও ১০টা ভালো চলচ্চিত্র তো আশাই করতে পারতাম। এই দুঃখ পূরণ হবার নয়। ১৯৬৩ সালের ৩১ আগস্টে জন্ম ওনার। ২০১৩-তেই চলে গেলেন। তার প্রতিটা সিনেমাই দেখতে ইচ্ছে করে। দেখে শেষ করা পর্যন্ত মন সরে না। রেশ থেকে যায় সিনেমার পরেও।

সত্যান্বেষী। ফিল্মমেকার: ঋতুপর্ণ ঘোষ

ব্যোমকেশ বক্সীকে নিয়ে হিন্দি আর বাংলাতে এত সিনেমা, নাটক হয়েছে; কিন্তু ঋতুপর্ণের সত্যান্বেষী, যেটা ২০১৩-তে নির্মিত, ওনার সর্বশেষ কাজ– সেটা যদি না হতো, বাঙালি এই ব্যোমকেশকে কি দেখত? এত বেশি পরিচিত, কাছের, সত্যিকারের একজন ব্যোমকেশকে দেখলাম মনে হয়। বাকি সব এক পাল্লায়, আর এইটা আরেক পাল্লায় সমান তালে লড়াই করার মতো একটা চলচ্চিত্র।

ব্যোমকেশকে এত চিন্তাশীল, অটল চরিত্রে আর কেউ রূপায়ণ করতে পারেনি। এই গভীর অন্তর্দৃষ্টি ছিল ঋতুপর্ণের। এটার নির্মাণেও সেই ছাপ। এটা চাইলেও কেউ নকল করতে পারবে না। আমাদেরকে আবার দেখতে হবে সেই ব্যোমকেশকেই, যাকে দেখে আমরা অভ্যস্ত। সাথে গোয়েন্দা টাইপ মিউজিক দিয়ে সেটাকে হালাল করা চেষ্টা, যেটা আগামীতেও অব্যাহত থাকবে! গোয়েন্দা সিনেমাতে এই সিনেমা বাংলাতে আলাদা হিসাবেই থাকবে।

লাস্ট লিয়ার। ফিল্মমেকার: ঋতুপর্ণ ঘোষ

লাস্ট লিয়ার সিনেমাতে যাকে দরকার, তাকেই নিলেন– অভিতাভ বচ্চন। একজন জাঁদরেল অভিনয় শিল্পীর জীবন সায়াহ্নে বসে নিজের সাথে হিসাব নিকাশ। নিজের সাথে মনস্তাত্ত্বিক লড়াই। সকলের মধ্যে নিজের একাকিত্বের খোঁজ পাওয়ার ভয়, অভিজ্ঞতার গল্প। অমিতাভ বচ্চন তার স্মৃতিচারণায় বলেন, ঋতুপর্ণ ঘোষ একমাত্র পরিচালক যিনি বচ্চন পরিবারের সকলের সঙ্গে কাজ করেছেন। তিনি একটি টুইটে লেখেন, ঋতুপর্ণ ছিলেন এক সংবেদনশীল শিল্পমনস্ক নরম মনের মানুষ। চলচ্চিত্রনির্মাতা শ্যাম বেনেগাল বলেন, ঋতুপর্ণের মৃত্যু একটা ‘বিরাট ট্রাজেডি’।


তার
নিজস্ব
একটা লাইব্রেরি
ছিল এবং তিনি ধর্মকর্ম
করার মতো করে
পড়াশোনা
করতেন

বাড়িওয়ালি সিনেমাতে অভিনয় করা অভিনেত্রী কিরণ খের ঋতুপর্ণের শিশুসুলভ প্রাণোচ্ছ্বলতার কথা স্মরণ করে বলেন, চলচ্চিত্র জগৎ অশিক্ষিত লোকে ভর্তি। সেখানে ঋতুপর্ণ ছিলেন একজন শিক্ষিত মানুষ। তার নিজস্ব একটা লাইব্রেরি ছিল এবং তিনি ধর্মকর্ম করার মতো করে পড়াশোনা করতেন। তার জ্ঞানের কোনো তুলনা নেই। ঋতুপর্ণ তার জীবন এবং কাজকে এক করে, চলচ্চিত্র নির্মাণ কে সাধনা এবং জীবনযাপনের অংশ করেছিলেন।

সব চরিত্র কাল্পনিক। ফিল্মমেকার: ঋতুপর্ণ ঘোষ

একজন কবি , তার মানসিকতা এবং সেটাকে পর্দায় এনেছিলেন সত্যিকারভাবে, সব চরিত্র কাল্পনিক সিনেমাতে। ঋতুপর্ণ যে সারাক্ষণ তার আশেপাশের মানুষ, অনুষ্ঠান, সভা, আলাপ সব কিছু গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেন, তার আরেকটা নমুনা এই সিনেমাতে আমরা পাই। আর আমরা কোনো পক্ষ নিতে পারি না; আমরা জীবন দেখি। জীবনকে না বোঝার যন্ত্রণা দেখি। সিদ্ধান্তহীনতায় আক্রান্ত মানুষদের দেখি। মানুষ হিসাবে আমাদের অসহায়ত্বের জায়গাটা পর্দায় দেখি।

মনে পড়ে, যেদিন আমি সিনেমাটা দেখেছিলাম, সেদিন স্বপ্নে আমার প্রিয় মানুষকে নিয়ে প্রিয় জায়গাতে ঘুরে বেড়িয়েছি । ঘুম থেকে উঠেও সেই অনুভূতি সচল ছিল। ভালো সিনেমা, কিন্তু মেডিটেশনেরও কাজ করে– এই সিনেমা দেখে সেটা আবার উপলব্ধি হলো। সিনেমাতে নিজেদের দেখা পাই। নিজেদেরকে ডিরেক্টরস পয়েন্ট অব ভিউ থেকে দেখার সুযোগ পাই।


যারা
এখনো
সিনেমাকে
শিল্পের জায়গাতে
শক্তিশালী মাধ্যম হিসাবে
মনে করেন, তারা সেই যাত্রাতে
ইতিমধ্যেই আছেন,
ঋতুপর্ণের
সাথে

বাংলার যে কয়জন পরিচালকের সিনেমা প্রজন্মের পর প্রজন্ম খুঁজে খুঁজে আবার দেখবে। বারবার দেখবে। দেখার প্রয়োজন বোধ করবে। নিজেকে প্রকাশের ভাষার খোঁজে। অব্যক্ত কথা ইমেজে বলার তাড়নায়। তাদের মধ্যে ঋতুপর্ণ ঘোষ থাকবেন। আগামী ৩০ বছর তো অবশ্যই থাকবেন, যারা এখনো সিনেমাকে শিল্পের জায়গাতে শক্তিশালী মাধ্যম হিসাবে মনে করেন, তারা সেই যাত্রাতে ইতিমধ্যেই আছেন, ঋতুপর্ণের সাথে, তার সিনেমাগুলোকে নিয়ে।

যে যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে তিনি গেছেন, যে কথা তিনি প্রকাশ করতে চেয়েছেন, সে কথা আমরা যত বেশি বুঝতে পারব, শিল্পী হিসেবে তিনি তত বেশি সার্থক হয়ে উঠবেন বলেই আমার বিশ্বাস। আমরা তাকে সার্থক থাকতে দিতে চাই।

Print Friendly, PDF & Email