পাকা (রিভার অব ব্লাড): প্রজন্মখাদকদের কথকতা

165
পাকা (রিভার অব ব্লাড)

লিখেছেন: সুমন সাহা

পাকা (রিভার অব ব্লাড)

পাকা
[River of Blood]
ফিল্মমেকার ও স্ক্রিনরাইটার: নিথীন লুকোস
প্রডিউসর: রাজ রচকোন্ডা, অনুরাগ কাশ্যপ
সিনেমাটোগ্রাফার: শ্রীকান্ত কাবোথু
এডিটর: অরুণিমা শঙ্কর
মিউজিক: ফৈজল আহমেদ
কাস্ট [ক্যারেক্টার]: বাসিল পাউলোস [জনি], বিনীথা কোশী [আন্না], নিথীন জর্জ [জোয়ী], অতুল জন [পাচ্চি], জোস কিঝাক্কান [কোচেপ্পু]
রানিংটাইম: ১০১ মিনিট
ভাষা: মলয়ালম
দেশ: ভারত
রিলিজ: সেপ্টেম্বর ২০২১ [টরোন্টো], ৭ জুলাই ২০২২ [সোনিলিভ]


নিথীন লুকোসের পাকা (রিভার অব ব্লাড)-এর শুরুটা খুব প্রমিসিং। ছবি শুরু হচ্ছে এক যুবকের ক্লোজআপ দিয়ে। চোখে-মুখে উদ্বেগ, ব্যাকগ্রাউন্ডে কথা হচ্ছে বিভিন্ন মানুষজনের, পাশাপাশি জল বয়ে যাওয়ার শব্দ, বোঝা যাচ্ছে যে, কিছু একটা হয়েছে নদী-তীরবর্তী এলাকায়। পরবর্তী কয়েকটি শটে দেখা যায়, নদী পারে বেশ কিছু মানুষ জড়ো হয়েছে, পুলিশ উপস্থিত, এক বুড়ো বলবান লোক গায়ে তেল মাখছে, নদীতে নামার আয়োজনে ব্যস্ত। একটু পরে বোঝা গেল, নদীতে বুড়ো নেমেছে লাশ টেনে পারে বয়ে আনবে বলে। লাশ দেখে উপস্থিত জনতার গুঞ্জন বেড়ে গেলেও যে ছেলের ক্লোজআপ দিয়ে ছবির শুরু, সে ক্রমশ ধীরে-ধীরে ভিড় ছাড়িয়ে বাড়ির পথে পা বাড়ায়।

সামান্য এই আয়োজন থেকে এটা ধারণা করতে পারা গেল, এই নদীতে লাশ পড়ে এবং লাশ টেনে পাড়ে নিয়ে আসার জন্য পেশাদার ডুবুরি তথা লাশ-কুড়ানিও রয়েছে।
ছবিটা ভারতের উত্তর-পূর্ব কেরালার ওয়ানাড় অঞ্চলের অতীত ইতিহাসকে ধরতে চেয়েছে, যেখানে নিথীন লুকোস নিজেই জীবনের একটা সুবিশাল পর্ব কাটিয়েছেন। ‘৪০ থেকে ‘৭০-এর দশকের মধ্যে কেরালার দক্ষিণ বা মধ্যপ্রান্ত থেকে প্রচুর নাগরিক উত্তর-পূর্বের এই অঞ্চলে চলে গিয়ে নতুন করে বসতি স্থাপন করেছিল। সেই সময়ে ওই অঞ্চলে একটি-দুটি পরিবারের অন্তর্কলহের ভার প্রজন্মের পর প্রজন্ম বয়ে বেরিয়েছে, এখনো বেরাচ্ছে।


যেন রূপকথার গল্প, অথচ
প্রচণ্ড বাস্তব মিশে
রয়েছে
তাতে

প্রতিশোধ-স্পৃহায় অন্য পক্ষের কাউকে খুন করে ওরাতু নদীতে গুম করে দেওয়া জলভাতে পরিণত হয়েছিল একটা সময়ে। অতীতের সেইসব কালোঘন দিনের কথা নিথীন তার ঠাকুমার কাছে শুনতেন, যেন রূপকথার গল্প, অথচ প্রচণ্ড বাস্তব মিশে রয়েছে তাতে। বড় হয়ে সেই ঠাকুমার গল্পকাহিনিকেই ছুঁতে চেয়েছেন প্রথম ছবিতে।

পাকা ছবিতে এরকমই অন্তর্কলহে লিপ্ত দুই পরিবারকে দেখানো হচ্ছে। যে যুবককে দিয়ে ছবি শুরু হয়, সে অর্থাৎ পাচ্চি এই ছবির প্রোটাগনিস্ট নয়; প্রোটাগনিস্ট হলো তার জ্যাঠতুতো দাদা, জনি। অন্যদিকে আছে আন্নার পরিবার, যাদের সঙ্গে জনির পরিবারের মার-মার-কাট-কাট অবস্থা। গত কয়েক বছর রক্তের দাপট শান্ত থাকলেও কখন কী হয়ে যায়, কেউ তা আগে থেকে বলতে পারে না। তাই জনি ও আন্না ঠিক করেছে, তাদের মধ্যে বিয়েটা একবার হয়ে গেলে এই দুই পরিবারে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বয়ে চলা প্রতিশোধের লালসা-খেলা বন্ধ করা সম্ভব হবে।

পাকা (রিভার অব ব্লাড)। ফিল্মমেকার: নিথীন লুকোস

জনি ও আন্নার প্রেমের ব্যাপারে আন্নার পরিবারের কেউ জানে না। এবং ছবি যত এগোয়, তত আমরা বুঝতে পারি, আন্নার দুই কাকা ও অন্ধ ঠাকুরদার দাপট জনির পরিবারের তুলনায় অনেক-অনেক বেশি।

শেক্সপিয়ার-এর রোমিও অ্যান্ড জুলিয়েট-এরই নতুন এক ভাষ্য বলা যেতে পারে ছবিটাকে, যদিও এখানে প্রেম মুখ্য নয়, বরং এই যে সংজ্ঞাহীন ভায়োলেন্স ও রিভেঞ্জের ক্রোনোলজিক্যাল খেলা– তা বেশিমাত্রায় প্রাধান্য পেয়েছে এবং সেই কারণে ছবির ন্যারেটিভকেও হতে হয়েছে অন্য রকম। এতদিনকার গুমচাপা আবহ আবার ফুলেফেঁপে ওঠে, যখন জনির কাকা অর্থাৎ পাচ্চির বাবা জেল থেকে ছাড়া পেয়ে গ্রামে ফেরত আসে। পাগলা নদীর রক্তের খিদে আবার মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে।

ছবিটার প্রথম ভাগ বেশ গোছানো ও এনগেজিং। ন্যারেটিভের সঙ্গে ভিজ্যুয়াল রিপ্রেজেন্টেশন তালমিল খাচ্ছিল ভালোভাবে। অথচ, দ্বিতীয় ভাগ অগোছালো হয়ে যাওয়ায় স্ট্রাইকিং ভিজ্যুয়াল বেশি করে দর্শকদের ওপরে চেপে বসে। ন্যারেটিভের দিক থেকে দ্বিতীয় ভাগের কয়েকটি জায়গা দুর্বল ঠেকেছে, একটা নির্দিষ্ট সময়ের পরে এই রিভেঞ্জের ব্যাপারটা বেশ মনোটোনাস লাগছিল।

ছবির শেষের একটু আগে সামান্য কয়েক দিনের জন্য টাইম-জাম্প আছে একটা, সেটা এস্ট্যাব্লিশ করার জন্য কিছুই দেখানো হয়নি; ফলে চট করে দর্শকদের অ্যাটাচমেন্ট কেটে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে ওই মুহূর্তে। প্রচণ্ডভাবে মেল ডমিন্যান্ট একটা সমাজে মেল ডমিনেন্সের প্রাধান্য বেশি থাকলেও এই ছবিতে নারীরা হয় একেবারে নিশ্চুপ, আর নয়তো জনি-পাচ্চির ঠাকুমার মতো কেউ, যে বর্তমানে শয্যাশায়ী, স্মৃতি-পঙ্গু, অথচ জীবনের একটা লম্বা সময় প্রতিশোধ বুকে গুজে নিজের সন্তানদের ও নাতিদের বড় করেছে, তাদের মধ্যেও রক্তের খিদে ভরে দিয়েছে।

পাকা (রিভার অব ব্লাড)

নারী চরিত্রদের চিত্রায়ন বুঝতে তাই আমার একটু সমস্যা হয়েছে। তাছাড়া শিক্ষিত মেয়ে আন্না চরিত্রটিকে ঠিকমতো ধরতে পারিনি। মেয়েটির স্ট্যান্ড পয়েন্ট কোথায়, সে রিভলভার কেনই-বা বের করেছিল, কেনই-বা তা আবার ফেরত দিলো এবং সে চুল কাটল কেন, সে কেন কোনোরকম প্রতিবাদ করল না একবারের জন্যেও, সবথেকে বড় কথা, সে পালিয়ে কেন গেল না এই গ্রাম ছেড়ে… এরকম কিছু প্রশ্ন জাগছে মনে ছবিটা দেখার পর।

মূল ব্যাপারটি হলো, ইন্টারজেনারেশনাল রিভেঞ্জ দেখাতে গিয়ে ও ছবিটিকে ইন্টারন্যাশনাল একটা টাচ দিতে গিয়ে ছবিটায় কিছু জায়গা প্রিটেনশাস হয়ে পড়েছে, হয়তো নিথীনের অজান্তেই। যে কারণে ছবির দ্বিতীয় ভাগ এমন অসংজ্ঞত ঠেকেছে।

নিথীন নিজে একজন সাউন্ড ডিজাইনার, বিগত বছর পাঁচ-ছয় ধরে সাউন্ডের কাজ করেছেন বেশ কয়েকটি ছবিতে। এই ছবির সাউন্ডের কাজও বেশ চমৎকার, তবে একটি নির্দিষ্ট জায়গায় এক ব্যক্তির ডায়ালগ চলাকালীন সাউন্ডে এক ডিসটর্শন লক্ষ্য করা যায়, যা নিথীনের টিমের কানে ধরা পড়ার কথা ছিল। এটা কীভাবে এড়িয়ে গেল?


ভিজ্যুয়ালগুলো ন্যারেটিভের
দিক থেকে কোনো
ফিলোসফিক্যাল
ডেপ্‌থ তৈরি
করতে
পারে
না

ভিজ্যুয়ালগতভাবে ছবিটা বেশ ভালো। তবে ভিজ্যুয়ালগুলো ন্যারেটিভের দিক থেকে কোনো ফিলোসফিক্যাল ডেপ্‌থ তৈরি করতে পারে না। ছবিতে পরতও কম, দেখার পর ভাবতে বসলে অনায়াসে পেঁয়াজের সমস্ত খোসা ছাড়িয়ে ফেলা যায় কিছুক্ষণের মধ্যে। নতুন করে আর খোঁসা খুঁজে পাওয়া যায় না ছাড়ানোর মতো। এটা একটা বড় সমস্যা এই ছবিতে।

পাকা (রিভার অব ব্লাড)

একবার দেখা যেতেই পারে। প্রথম কাজ হিসাবে মন্দ নয়। ছবিটা বিভিন্ন মহলে সুখ্যাতি পেয়েছে যদিও, তবে ফেস্টিভ্যাল-জনিত ডক্কানিনাদ কোনোকালেই সঠিক ধারণা দেয় না এবং এক্ষেত্রেও দেয়নি।

Print Friendly, PDF & Email