ইকিরু: জীবন ছোট, তাই প্রেমে পড়ো

120
ইকিরু

লিখেছেন: জিম ইসমাইল

ইকিরু
বিকল্প ইংরেজি শিরোনাম: টু লিভ
ফিল্মমেকার: আকিরা কুরোসাওয়া
স্ক্রিনরাইটার: আকিরা কুরোসাওয়া; শিনোবু হাশিমোতো; হিদেয়ো ওগুনি
প্রডিউসার: সরিজো মতোকি
সিনেমাটোগ্রাফার: আসাকাজু নাকাই
এডিটর: কোইচি আইওয়াশিতা
মিউজিক স্কোর: ফুমিও হায়াসাকা
কাস্ট [ক্যারেক্টার]: তাকাশি শিমুরা [কাঞ্জি ওয়াতানাবে]; শিনিচি হিমোরি [কিমুরা]; হারুয়ো তানাকা [সাকাই]; মিনোরু চিয়াকি [নগুচি]
রানিংটাইম: ১৪৩ মিনিট
ভাষা: জাপানিজ
দেশ: জাপান
রিলিজ: ৯ অক্টোবর ১৯৫২


রশোমন [১৯৫০] আকিরা কুরোসাওয়ার দ্বাদশতম ছবি। এর আগে পর্যন্ত কুরোসাওয়া নিজ দেশে অসংবর্ধিত একজন পরিচালক। উন্নাসিক পশ্চিমি চলচ্চিত্র দুনিয়াতেও জাপান অসংবর্ধিত একটি দেশ। কিন্তু ১৯৫১ সালের ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে যখন রশোমন সেরা ছবির শিরোপা পেল, তখন ছবিটা পাল্টে গেল। এর কিছুদিন পরে ১৯৫২ সালে সেরা বিদেশি ছবির জন্য অস্কারও পেল। আর কে না জানে পশ্চিমের গবাক্ষ দিয়ে প্রাচ্যের সূর্যোদয় না দেখলে আমাদের সূর্য দেখা সফল হয় না!

রশোমন ছবির সাফল্য জাপানি চলচ্চিত্র সম্পর্কে বহির্বিশ্বের দর্শক-সমালোচকদের আগ্রহী করে তোলে এবং একজন মহৎ পরিচালক হিসেবে কুরোসাওয়ার সঙ্গে সারা বিশ্বের পরিচয় হয়। ডোনাল্ড রিচি তার দ্য ফিল্মস অব আকিরা কুরোসাওয়া বইতে রশোমন সম্পর্কে এক জায়গায় বলছেন, ‘Actually, of course, what had happened is that in this film the confines of ‘Japaneese’ thought could not contain the director ,who thereby joined the world at large. Rashomon speaks to everyone, not just to the Japaneese.’

ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে রশোমন-এর জন্য সেরা ছবির পুরস্কার নিতে গিয়ে আকিরা কুরোসাওয়া বললেন, ‘পুরস্কার পেলে কার না ভালো লাগে? আমারও আনন্দ হচ্ছে। আরও আনন্দ পেতাম যদি এই পুরস্কার আমি কনটেম্পোরারি জাপানকে বিষয় করে কোনো ছবির জন্য পেতাম।’

রশোমন-এর দু’বছরের মাথায় তিনি তৈরি করেন ইকিরু। এই সিনেমা একদিকে যেমন ব্যক্তিমানুষের নির্বাণ লাভের গল্প, আরেকদিকে তেমনি সমসাময়িক জাপানের সরকারি ব্যুরোক্রেসির সমালোচনা। যুদ্ধ-পরবর্তী জাপানের সরকারি ব্যবস্থাকে নগ্ন করে দিলেন ইকিরুতে। তৎকালীন জাপানের পারিবারিক মূল্যবোধকেও তুলে আনলেন।

‘গত তিরিশ বছরে আমি কত কি করেছি, কিন্তু সূর্যাস্ত কী– তাই ভুলে গেছিলাম।
আর এখন আমার কাছে সূর্যাস্তের আনন্দ নেবার মতো সময় নেই!’

ইকিরু এমন এক মানুষের কথা বলে যে জীবনের প্রান্তে এসে জানতে পারে, আর ছয় মাস পরে তার মৃত্যু হবে। জীবনে মৃত্যুর উপস্থিতি কত তীব্র, মৃত্যুর পাদতলে জীবনের মূল্য কী, মানুষের বেঁচে থাকার তাৎপর্যই বা-কি– এই হলো ইকিরুর বিষয়বস্তু। ‘মাঝে মাঝে আমার মৃত্যুর কথা মনে হয়’, কুরোসাওয়া লিখছেন, ‘আই থিঙ্ক অব সিজিং টু বি… এই নানান ভাবনাগুলো থেকেই ইকিরুর জন্ম।’


সে এমনিতেই একটা
শবদেহের মতো।
গত পঁচিশ বছর
ধরে একটা
জীবন্ত
লাশ
হয়েই বেঁচে ছিল

ছবির নায়ক ওয়াতানাবে সরকারি দপ্তরের আমলা। পাবলিক অ্যাফেয়ার্স ডিভিশনের সেকশন চিফ। ছবির শুরুতেই আমরা দেখি পর্দা জুড়ে ক্লোজআপে একটি এক্সরে প্লে­ট। ন্যারেটর জানায়, এক্সরে প্লে­টটি ছবির প্রধান চরিত্রের। সে ক্যানসারে আক্রান্ত। চিকিৎসক জানায়, আর ছয় মাস তার আয়ু। কিন্তু ছবির নায়ক তার কর্কট রোগের কথা এখনো জানে না। এরপর কাট। কাট টু ওয়াতানাবে, তার দপ্তর। এই কাট তার আন্তর্জগতকে বহির্জগত থেকে আলাদা করে। প্রাত্যহিক দাপ্তরিক কাজে ব্যস্ত ওয়াতানাবেকে দেখিয়ে, ন্যারেটর আমাদের জানিয়ে রাখে– ‘সে এমনিতেই একটা শবদেহের মতো। গত পঁচিশ বছর ধরে একটা জীবন্ত লাশ হয়েই বেঁচে ছিল।’

সে তার জীবন-যৌবন খুব নিষ্প্রাণ ও একঘেয়ে কাটিয়েছে। গত তিরিশ বছর ধরে কর্মজীবনে এতটাই ডুবে ছিল যে সূর্যাস্ত দেখতে ভুলে গেছিলেন। তার ‘হৃদয়ে জীবন নেই।’ ওয়াতানাবের কর্মজীবন শুধু নয়, তার ব্যক্তিগত জীবনও অর্থহীন। স্ত্রী মারা গেছে। একমাত্র পুত্র মিতসু বিবাহিত, স্বার্থপরের মতো জীবন কাটায়। লাভ-লোকসানের সম্পর্ক ছাড়া বাবার সঙ্গে অন্য কোনো মানসিক সম্পর্ক নেই। ওয়াতানাবের জীবন একাকীত্বে ভারাক্রান্ত। যদিও এতসবের মাঝেও ওয়াতানাবে ছিল অসাড়।

আকিরা কুরোসাওয়া
ইকিরু। ফিল্মমেকার: আকিরা কুরোসাওয়া

এইরকম একটা সময়ে ওয়াতানাবে জানতে পারে, তার আয়ু আর কয়েকটা মাস। একটি ব্যস্ত রাস্তায় সে একা হেঁটে চলেছে, ন্ব্যুজ। গাড়ি চলছে। রাস্তায় লোকজন; কিন্তু এই দৃশ্যে এতটুকু শব্দ নেই। কিছুক্ষণ পর ওয়াতানাবের খুব পাশ দিয়ে হঠাৎ একটা ট্রাক হর্ন বাজিয়ে চলে গেলে দৃশ্যটিতে শব্দ ফিরে আসে। ওয়াতানাবে চমকে ওঠে। তার সাড় ফিরে আসে। কতদিনের ঘুম থেকে জেগে ওঠে যেন। সিম্বলিক। সেই সময় এই শৈলীর ব্যবহার অভূতপূর্ব।

মৃত্যুভয়ে প্রথমে সে তার ছেলেকে আঁকড়ে ধরার চেষ্টা করে। কিন্তু তাদের মধ্যে কোনো সংযোগ গড়ে ওঠে না। সে ঠিক করে বাকি জীবনটা আনন্দে কাটাবে। ব্যাংক থেকে সব টাকা তুলে নিয়ে খরচ করতে থাকে। চারপাশের উন্মত্ত পরিবেশকে আকর্ষণ করে বেঁচে থাকার চেষ্টা করে। কিন্তু সফল হয় না। সুরা-নারীসঙ্গ-নাইটক্লাবে উন্মত্ত উল্লাস তাকে সাময়িক সুখ দিলেও প্রকৃত আনন্দ দিতে পারে না। প্রমোদ আসলে ফাঁপা, মাইন্ডলেস কমফোর্ট। মাঝে, তয়ো নামে একটি প্রাণোচ্ছল তরুণীর সঙ্গে তার সম্পর্ক তৈরি হয়। কিন্তু ওয়াতানাবে ভুলে যায়, তরুণীটি একজন রক্ত-মাংসের মানুষ। সে কোনো অবজেক্ট নয় যা কেবল ওয়াতানাবের বাঁচার রসদ হয়ে টিকে থাকবে! সম্পর্ক বেশিদিন স্থায়ী হয় না। আমাদের প্রৌঢ় নায়ক বুঝতে পারে, সে আসলে একজন নিঃস্ব রিক্ত মানুষ।

এইরকম সংকটজনক অবস্থায় ওয়াতানাবের মনে পড়ে, তার অফিসে বহুদিন থেকে স্থানীয় মহিলাদের একটি আবেদন ফাইল চাপা পড়ে আছে। বাচ্চাদের জন্য একটি পার্ক তৈরির আবেদন। মহিলারা আবেদন নিয়ে বহুদিন ঘুরেছে– এই টেবিল থেকে সেই টেবিল, এক ডিপার্টমেন্ট থেকে আরেক ডিপার্টমেন্টে। কিন্তু কাজ হয়নি। ওয়াতানাবে ঠিক করে, সে পার্কটি তৈরি করে যাবে। এরপরে আমরা দেখি ওয়াতানাবের হার না মানা একক লড়াই। যত সময় এগিয়েছে, সে আরও অসুস্থ হয়েছে।

অসুস্থতা যত বেড়েছে, সে আরও দৃঢ়চেতা হয়েছে। রাগ, ঘৃণা, অবজ্ঞা আর তাকে আলোড়িত করে না। এবং শেষ পর্যন্ত সে সমস্ত সরকারি বাধা বিপত্তি পেরিয়ে একটি নোংরা ডোবাকে বাচ্চাদের খেলার পার্কে পরিণত করে। পার্কটি তৈরি করার মধ্যে দিয়ে ওয়াতানাবে তার এতদিনের আত্মিক দারিদ্র কাটিয়ে খুঁজে পায় আত্মিক ঐশ্বর্য।

দস্তয়েভস্কির সাহিত্যের প্রতি কুরোসাওয়ার প্রবল অনুরাগের কথা জানা যায়। দস্তয়েভস্কির মতো কুরোসাওয়া নিজেও মানবিকতায় আস্থা হারাননি (অন্তত প্রথম দিকের ছবিগুলিতে)। সবরকম মানুষের মধ্যে তিনি মানবিক গুণের সন্ধান পেতেন। জীবন আর ভালোবাসার প্রতি কুরোসাওয়ার আস্থা এই ছবিতেও অনুভব করা যায়।

ইকিরু

দ্য ড্রাংকেন অ্যাঞ্জেলহাই অ্যান্ড লো— এই ছবিগুলোর মতো ইকিরুকেও দুই ভাগে ভাগ করা যায়। প্রথম ভাগে আমরা দেখি ওয়াতানাবে কী করে জীবনের অর্থ পুনরাবিষ্কার করে। ছবির দ্বিতীয় ভাগ শুরু হয় ওয়াতানাবের মৃত্যুর পরবর্তী ঘটনাক্রমকে কেন্দ্র করে। ওয়াতানাবে মৃত। তার স্মৃতিতে একত্রিত হয়েছে তার আমলা সহকর্মীরা, ডেপুটি মেয়র এবং আত্মীয় পরিজন। ওয়াতানাবেকে নিয়ে, বিশেষ করে তার পার্ক তৈরির ঘটনাকে নিয়ে লোকজন নিজের মতো করে বিশ্লে­ষণ করছেন। অনেকগুলো দৃষ্টিভঙ্গির বৈপরীত্যে আসলে জীবন রহস্যকে পর্যবেক্ষণ।

এই সিকোয়েন্সটা অতি দীর্ঘ– প্রায় পঞ্চাশ মিনিট। চলচ্চিত্রে সাধারণত আসল সময়কে ছোট বা কমপ্রেসড করে নেওয়া হয়। এই কমপ্রেসড ফিল্মিক সময় দিয়ে আসল সময়ের একটি ইল্যুশন তৈরি করা হয়। ইকিরুর এই সিকোয়েন্সে তেমনটা হয়নি। কুরোসাওয়া আসল সময়কে খুব বেশি কমপ্রেসড করেননি। এবং ছবিটির দৈর্ঘ্য দাঁড়ায় প্রায় দুই ঘণ্টা তিরিশ মিনিট।


বাস্তব
এবং ভ্রমের
এই দ্বন্দ্বই জীবনের
তাৎপর্য বুঝতে আমাদের
সাহায্য
করে

ছবি মুক্তির পরে এই সিকোয়েন্সটি নিয়ে অভিযোগ ওঠে। অনেকের মতে এই দ্বিতীয় ভাগটি যেমন দীর্ঘ, তেমন ক্লান্তিকর। কিন্তু ছবির এই অংশকে আমার সেরা মনে হয়েছে। ‘রিয়েলিটি’ এবং ‘ইল্যুশন’– এই দুয়ের দ্বন্দ্ব স্পষ্ট হয়েছে। ইকিরুর প্রথম ভাগটি রিয়েলিটি। দ্বিতীয় ভাগে স্মৃতিসভায় উপস্থিত সদস্যদের ওয়াতানাবেকে নিয়ে যে প্রতিক্রিয়া, বিশ্লে­ষণ, সত্যকে মানতে পারা ও না পারা ইত্যাদি– এই পর্ব হলো ইল্যুশন। বাস্তব এবং ভ্রমের এই দ্বন্দ্বই জীবনের তাৎপর্য বুঝতে আমাদের সাহায্য করে।

কুরোসাওয়ার অধিকাংশ চলচ্চিত্রের ভরকেন্দ্র হলো এই কনট্রাস্ট বা কনফ্লিক্ট। এই দীর্ঘ ইল্যুশন পর্বে কুরোসাওয়া যেটা উঁচু তারে বাজিয়ে শোনাননি, অথচ ভীষণভাবে উপস্থিত, সেটি হলো আইরনি– তীব্র পরিহাস, যা আমাদের ভাবনার মজা পুকুরে ঢিল ফেলে। আমাদের চেতনার বৃত্তকে বিস্তৃত করে।

কুরোসাওয়া গল্প বলাতে বিশ্বাস করলেও কখনোই একটি নিটোল গল্প বলেননি। কোনো সময়েই ঘটনার পারম্পর্য রক্ষা করেন না। বারবার ফিরে যান ফ্ল্যাশব্যাকে। ইচ্ছেমতো দৃশ্যগুলো নিয়ে শাফল করতে থাকেন। এতে ছবিটির কোনো ক্ষতি হয় না। এটি কুরোসাওয়ার নিজস্ব স্টাইল।

দ্বিতীয়ার্ধের দীর্ঘ পঞ্চাশ মিনিটের সিকোয়েন্সে আমরা প্রয়োজনীয় সাতটি ফ্ল্যাশব্যাক পাই। সবশেষের ফ্ল্যাশব্যাকে পাই ইকিরুর বিখ্যাত সেই দোলনা সিকোয়েন্স। মৃত্যুর কিছু সময় আগে, এক শীতের রাত, ওয়াতানাবে পার্কটির একটি দোলনায় বসে ধীরে ধীরে দুলছে। তুষারপাত হতে শুরু করে। ওয়াতানাবে দুলতে থাকে। ওয়াতানাবের চোখে-মুখে শান্ত-সমাহিত ভাব। এখন সে জানে জীবনের মানে। মৃদু কণ্ঠে গাইতে শুরু করে তার প্রিয় একটি প্রেমের গান।

‘লাইফ ইজ শর্ট
ফল ইন লাভ, ডিয়ার মেইডেন
হোয়াইল ইউর লিপস আর স্টিল রেড ,
অ্যান্ড বিফোর ইউ আর কোল্ড ,
ফর দেয়ার উইল বি নো টু-মরো…’


তথ্যসূত্র:
১। The Films Of Akira Kurosawa; Donald Richie
২। Something Like an Autobiography; Akira Kurosawa; Translated by Audie E. Bock
Print Friendly, PDF & Email