‘মেমোরিয়া’, নিজের শরীরে নিজেই না থাকা ঘিরে: আপিচাটপং ভিরাসেথাকুল

214
আপিচাটপং ভিরাসেথাকুল

সাক্ষাৎকার: রোরি ও’কনার
অনুবাদ: রুদ্র আরিফ

অনুবাদকের নোট
আপিচাটপং ভিরাসেথাকুল [১৬ জুলাই ১৯৭০–]। থাই মাস্টার ফিল্মমেকার। এশিয়ার এ অঞ্চলের সাম্প্রতিককালের সম্ভবত সবচেয়ে ঘোরবিস্তারি ফিল্মমেকার। বেলা তারের মতো রাগী ফিল্মমেকারও তার নির্মাণের প্রতি আগ্রহী। ইতোমধ্যেই জিতেছেন কান ফিল্ম ফেস্টিভ্যালের সর্বোচ্চ পদক– পাম দি’অর, মাস্টারপিস সিনেমা ‘আঙ্কেল বুনমি হু ক্যান রিকল হিজ পাস্ট লাইভস’-এর [২০১০] জন্য। তার সাম্প্রতিকতম ফিচার ফিল্ম ‘মেমোরিয়া’র প্রিমিয়ার হয়েছে ২০২১-এর কান ফেস্টিভ্যালে। এ সিনেমা ঘিরে এই আলাপ একেবারেই টাটকা, দিনকয়েক আগের…


মেমোরিয়া। অফিসিয়াল ট্রেইলার

রোরি ও’কনার :: আপনার সর্বশেষ সিনেমা মেমোরিয়ার প্রিমিয়ার হয়েছে ২০২১-এর কান ফিল ফেস্টিভ্যালে। সেখানে জুরি প্রাইজ বিজয়ী এই সিনেমার কেন্দ্রীয় ধারণাটি এক্সপ্লোডিং হেড সিনড্রোম [ইএইচএস] ঘিরে আপনার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে এসেছে। ইএইচএস এমন এক সংবেদনশীল অবস্থা, যাতে আক্রান্ত হলে মানুষ ঘুমের মধ্যে জোরাল আওয়াজ শোনে।

আপিচাটপং ভিরাসেথাকুল :: আমার মধ্যে এই উপসর্গ দেখা দিতে শুরু করে ২০১৬ সালে, তবে (সিনেমাটির) শুটিং করার সময় চলে গেছে। ইএইচএস না থাকাকে আমি মিস করছি: এটি তুলনামূলক কম ভীতিকর, অধিক কৌতুহলজাগানিয়া ও এক ধরনের স্বপ্নঘোরের মতো। কেননা, এই অভিজ্ঞতা (আক্রান্তজন ছাড়া) অন্য কারও পক্ষে পাওয়া সম্ভব নয়।

ইএইচএস ঘিরে সিনেমা বানানোর সিদ্ধান্ত কেন নিয়েছিলাম, জানি না; তবে ঘটনা হলো, এটি আমাকে ভিন্ন ভিন্ন শহরে নিয়ে গেছে। তাই একে আমি একজন সহচর হিসেবেই দেখতে শুরু করেছিলাম, আর সেই অন্বেষণ বেশ কাজের বলেই মনে করি।

রোরি :: কেন্দ্রীয় চরিত্র জেসিকা হল্যান্ডের ভূমিকায় অভিনয় করেছেন টিল্ডা সুইনটন। এই প্রথম এমন বিখ্যাত কাউকে নিয়ে আপনি কাজ করলেন। এটা কি আপনার মনোভাবে কোনো পরিবর্তন এনেছে?

ভিরাসেথাকুল :: টিল্ডার সঙ্গে আমার পরিচয় দীর্ঘকালের। তাই কলম্বিয়ায়– আমার জন্য একটি নতুন দেশে, একটি ভিন্ন ভাষা ও সংস্কৃতিতে (সিনেমাটির) শুটিং করার সময় তাকে পাওয়াটা ছিল স্বস্তির ব্যাপার। এ ছিল অনেকটা কোনো বন্ধুর সঙ্গে ভ্রমণের মতো। ন্যাচারাল সেটিংয়ে– যেখানে লোকে অভিনেতা-অভিনেত্রীর দিকে তাকাবে না কিংবা তাদের দিকে করবে না ইঙ্গিত– এমন পরিস্থিতিতে, লো বাজেট মেনে চলে, কী পেতে চাই, সে ব্যাপারে এই প্রথমবারের মতো আমাকে ভীষণ সচেতনভাবে কাজ করতে হয়েছিল নিশ্চয়ই। এমনকি ছোট ছোট গ্রামে যখন আমরা গিয়েছি, সেখানেও দেখেছি লোকে তাকে ঠিক চিনে ফেলছে।

আপিচাটপং ভিরাসেথাকুল
‘মেমোরিয়া’র শুটিংয়ে লিড কাস্ট টিল্ডা সুইনটনের সঙ্গে ফিল্মমেকার আপিচাটপং ভিরাসেথাকুল

রোরি :: সাউন্ড এই সিনেমার মূল বিষয়; আর তা শুধু জেসিকার ইএইচএস’র প্রসঙ্গেই নয়।

ভিরাসেথাকুল :: জেসিকায় মাথায় থাকা সাউন্ডকে শ্রবণযোগ্য রূপান্তর করা হয়েছে, যেন তার সংবেদনের সঙ্গে দর্শক একাত্মতা বোধ করতে পারেন। আমরা হয়ে উঠেছি জেসিকা; কেননা, তাকে অনুভব করতে পারছি আমরা। এটি এভাবে দর্শককে নিজ নিজ সংবেদনের ব্যাপারে সতর্ক করে তুলে তাদেরকে সক্রিয় করেছে সিনেমার কৃত্রিমতা, এবং তাদের সংবেদনগুলোকে একজন ফিল্মমেকার ও সাউন্ড ডিজাইনার কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করে– তা নিয়ে ভাবতে। এ বস্তুত বিভ্রমের খেলা।

রোরি :: জেসিকা যা শোনে, সেই শব্দকে সে পৃথিবীর কেন্দ্রস্থল থেকে আসার একটি গর্জন বলে অভিহীত করে। সিনেমাটিতে এক ধরনের অন্তভৌম বোধ রয়েছে: প্রত্নতাত্ত্বিক খনন কাজ জেসিকার দেখতে যাওয়া, খুলি…। অবাক হয়ে ভাবছি, কবর দিয়ে রাখা ইতিহাস, কিংবা এমনকি ট্রমার নিরিখে এটিকে কোনো রাজনৈতিক দিক হিসেবে আপনি দেখেন কি না?

ভিরাসেথাকুল :: কলম্বিয়ায় থাকাকালে নিজের জন্মভূমি থাইল্যান্ডের সঙ্গে একটি জোরাল সংযোগ আমি অনুভব করেছি। দেশটিকে নিয়ে যত বেশি ঘাঁটবেন, যত বেশি লোকের সঙ্গে কথা বলবেন, উজ্জ্বল রঙের স্তর পেরিয়ে অতীতের কিছু অমীমাংসিত বিষয়ের দেখা ততই পেতে থাকবেন আপনি।

রোরি :: থাইল্যান্ড ও কলম্বিয়ার মধ্যে আপনার খুঁজে পাওয়া আরও কিছু মিল সম্পর্কে বলবেন?

ভিরাসেথাকুল :: আমার ধারণা, উভয় দেশই সামনে আগানোর চেষ্টা চালাচ্ছে, তবু অতীতে পড়ে রয়েছে আটকা। থাইল্যান্ডে রয়েছে এক জটিল রাজনৈতিক পরিস্থিতি, যেখানে সামরিক শাসনকালে খুন কিংবা ‘গুম’ হয়ে যাওয়া লোকগুলোকে এখনো শনাক্ত করা হয়নি; আর সেইসব খুনের জন্য যারা দায়ী, তারাই এখন রাষ্ট্রক্ষমতার গুরুত্বপূর্ণ জায়গাগুলোতে বসে আছে। কলম্বিয়ার ইতিহাসের পাতায়ও রয়েছে একই ধরনের অধ্যায়।

আপিচাটপং ভিরাসেথাকুল
মেমোরিয়া

অবশ্য, শুরু থেকেই নিজেকে আমি বলে এসেছি, আমার পক্ষে রাজনৈতিক সিনেমা নয়, বরং শুধুই ব্যক্তিগত সিনেমা বানানো সম্ভব; তাই আমাকে যেসব জিনিস বেশি টানে, যেমন– মানুষের মেমোরি ও মেডিক্যাল এনভায়রনমেন্ট– সেগুলোকেই ধরার চেষ্টা চালিয়েছি।

রোরি :: মেমোরিয়ায় এর আকার ঘটে বোগোতা হাসপাতালের মাধ্যমে, যেখানে নিজের অসুস্থ বোনকে দেখতে যায় জেসিকা। আপনার কাজে মেডিক্যাল সেটিং হরদমই ঘুরে-ফিরে আসে; আরও আসে জঙ্গল। কী আপনাকে ওসব জায়গায় টেনে নিয়ে যায়?


হাসপাতালকে মনে
হয় যেন আমার
নিজের
বাড়ি

ভিরাসেথাকুল :: মেডিক্যাল সেটিং এসেছে শৈশব থেকে: আমার বাবা-মা দুজনেই ছিলেন ডাক্তার; তাই থাইল্যান্ডের হাসপাতালগুলোই ছিল শিশুকালে আমার প্লেগ্রাউন্ড। হাসপাতালের সময় আলাদা; এর রয়েছে এক অনন্য গন্ধ। হাসপাতালকে মনে হয় যেন আমার নিজের বাড়ি।

জঙ্গলের প্রতি আমার কৌতুহলের শুরু কখন, জানি না; তবে জঙ্গলকে মুক্তি ও রহস্যের এক জায়গা বলে মনে হয়। বৌদ্ধধর্মীয় সংস্কৃতিতে আত্মা ও প্রাণীর মধ্যে একটা গভীর সংযোগ রয়েছে। যদিও আত্মায় বিশ্বাসী নই, তবু এর আইডিয়া আমার ভেতরে কোনো না কোনোভাবে জায়গা করে নিয়েছে।

জঙ্গলে গেলে আপনি প্রচুর প্রাণের দেখা পাবেন। নিজের না জানা প্রাচুর্যের কথা জঙ্গল আপনাকে মনে করিয়ে দেবে।

রোরি :: গবেষণা কেন্দ্রের এক দৃশ্যে জেসিকা একটি খুলির সামনে দাঁড়ায়, আর একটি মুহূর্তে নিজের আঙুল ওই খুলির সেই ফুটোর ভেতরে প্রবেশ করায়, যে ফুটো করা হয়েছিল মন্দ আত্মাকে নিষ্কৃতি দিতে। আপনার কি মনে হয় এইসব অনুষঙ্গের ভেতর ইতিহাসেরও যোগসূত্র রয়েছে?


যদি
নিজের
মাথাটা একদম
খুলে ফেলে, ভেতরে
আটকা পড়া ভয়ঙ্কর
জিনিসগুলো
বের করে
দেওয়া
যেত

ভিরাসেথাকুল :: সে সময়ে আমি প্রেম, বিচ্ছেদ, মৃত্যু ও অসুস্থতা ঘিরে নিজের বিষয়আশয়ের ভেতর দিয়ে কাজ করার চেষ্টা করছিলাম। অতীতকালে লোকে বিশ্বাস করত, মন্দ আত্মাগুলো আপনার মাথার ভেতরে আটকা পড়ে থাকে, তাই (মৃত ব্যক্তির খুলি ফুটো করে দিয়ে) সেগুলোকে মুক্তি দেওয়া দরকার। ইএইচএসে আক্রান্ত হলে আপনার মনে হতে থাকবে– যদি নিজের মাথাটা একদম খুলে ফেলে, ভেতরে আটকা পড়া ভয়ঙ্কর জিনিসগুলো বের করে দেওয়া যেত! সেই একই ধরনের গরজ বোধের অনুভূতি দর্শককে দিতে চেয়েছিলাম আমি।

আপিচাটপং ভিরাসেথাকুল
মেমোরিয়া

রোরি :: মেমোরিয়ার শুট করেছেন ২০১৯ সালে, (কোভিড) মহামারি শুরুর আগে। সিনেমাটি যখন বানিয়েছেন, সেই প্রকৃত উদ্দেশ্যের তুলনায় লোকে এখন এটাকে ভিন্নভাবে উপলব্ধি করবে বলে মনে করেন?

ভিরাসেথাকুল :: কান ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে প্রদর্শনীর আগ পর্যন্ত মহামারির কোনো সংযোগ আমি অনুভব করিনি। সিনেমাটি সংযোগচ্যুতি ঘিরে, নিজের শরীরে নিজেই না থাকা ঘিরে: জেসিকা তো নিজের শরীর থেকে অনেকটাই বেরিয়ে পড়েছে। তাছাড়া, সিনেমাটি একাকিত্বের আইডিয়ার ঘটিয়েছে প্রতিফলন। কিন্তু এরপর হাজারও মানুষ একসঙ্গে বসে সিনেমা দেখার ব্যাপারটিতে দুই বছর আইসোলেশনে কাটানোর ঘটনা আমার ভেতর নাড়া দিয়েছে।

রোরি :: যুক্তরাষ্ট্রে সিনেমাটি একবারে এক শহরে মুক্তি দেওয়ার যে সিদ্ধান্ত আপনার, সেটি বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। সারা দেশে একবারে এবং/অথবা অনলাইন স্ট্রিমিংয়ে মুক্তি দেওয়ার বদলে এমন সিদ্ধান্তের কারণ কী?

ভিরাসেথাকুল :: এ ছিল এক বিবৃতি: আমি মনে করি, সিনেমা আসলে ল্যাপটপে দেখার জিনিস নয়, বরং সিনেমা দেখার বিষয়টি একটি কমিউনাল অ্যাকটিভিটি হওয়া উচিত। এটি আরও বেশি দর্শকের কাছে পৌঁছানোরও ব্যাপার। আপনি যখন স্বাভাবিক পন্থায় কোনো সিনেমা মুক্তি দেবেন, সেটির কথা দ্রুতই ভুলে যাবে সবাই; শুধু বড় বড় শহরে যারা থাকে, তারাই দেখবে।

রোরি ও’কনার :: ওই নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া আপনাকে অবাক করেছিল?

আপিচাটপং ভিরাসেথাকুল :: আমি ভেবেছিলাম, আমার মতোই দর্শকও বড় পর্দায় সিনেমা দেখতে পছন্দ করেন; কিন্তু ভুলে গিয়েছিলাম, লোকে এখন সবকিছু তৎক্ষণাৎ পেতে চায়, আর এই তাৎক্ষণিক তৃপ্তির বিষয়টি সমকালীন জীবনেরই অংশ। তাদের প্রতিক্রিয়া শুধু ওই বিষয়ের ওপর জোর দিয়েই। থাইল্যান্ডেও একই মনোভাবে সিনেমাটি মুক্তি দেওয়ার কথা ভাবছি; কেননা, লোকাল সিনেমা-হলের সঙ্গে কাজ করতে চাই আমি।

কমিউনিটির সঙ্গে সংলাপের বিষয়টি আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ।


রোরি ও'কনার। লেখক, বার্লিন, জার্মানি
সূত্র: ফ্রিজ ডটকম। ১৯ জানুয়ারি ২০২২
Print Friendly, PDF & Email
সম্পাদক: ফিল্মফ্রি । ঢাকা, বাংলাদেশ।। সিনেমার বই [সম্পাদনা/অনুবাদ]: ফিল্মমেকারের ভাষা [৪ খণ্ড: ইরান, লাতিন, আফ্রিকা, কোরিয়া]; ফ্রাঁসোয়া ত্রুফো: প্রেম ও দেহগ্রস্ত ফিল্মমেকার; তারকোভস্কির ডায়েরি; স্মৃতির তারকোভস্কি; হিচকক-ত্রুফো কথোপকথন; কুরোসাওয়ার আত্মজীবনী; আন্তোনিওনির সিনে-জগত; কিয়ারোস্তামির সিনে-রাস্তা; সিনেঅলা [৩ খণ্ড]; বার্গম্যান/বারিমন; ডেভিড লিঞ্চের নোটবুক; ফেদেরিকো ফেল্লিনি; সাক্ষাৎ ফিল্মমেকার ফেদেরিকো ফেল্লিনি; সাক্ষাৎ ফিল্মমেকার ক্রিস্তফ কিয়েস্লোফস্কি; সাক্ষাৎ ফিল্মমেকার চান্তাল আকেরমান; সাক্ষাৎ ফিল্মমেকার বেলা তার; সাক্ষাৎ ফিল্মমেকার নুরি বিলগে জিলান; ক্রিস্তফ কিয়েস্লোফস্কি; বেলা তার ।। কবিতার বই: ওপেন এয়ার কনসার্টের কবিতা; র‍্যাম্পমডেলের বাথটাবে অন্ধ কচ্ছপ; হাড়ের গ্যারেজ; মেনিকিনের লাল ইতিহাস ।। মিউজিকের বই [অনুবাদ]: আমার জন লেনন [মূল : সিনথিয়া লেনন]; আমার বব মার্লি [মূল: রিটা মার্লি] ।। সম্পাদিত অনলাইন রক মিউজিক জার্নাল: লালগান