এটারনিটি অ্যান্ড অ্যা ডে: অ্যাঞ্জেলোপুলোসের ছবি ও সমসাময়িক ওডিসি

302
থিও অ্যাঞ্জেলোপোলুস

লিখেছেন: সুমেধা

থিও অ্যাঞ্জেলোপোলুস

এটারনিটি অ্যান্ড অ্যা ডে
[Mia aioniótita kai mia méra]
ফিল্মমেকার: থিও অ্যাঞ্জেলোপুলোস
স্ক্রিনরাইটার: টনিনো গেররা, থিও অ্যাঞ্জেলোপুলোস, পেত্রোস মারকারিস, জর্জিও সিলভাগনি
প্রডিউসার: থিও অ্যাঞ্জেলোপুলোস, এরিক হুমান, জর্জিও সিলভাগনি
সিনেমাটোগ্রাফার: ইয়োর্গোস আরভানিতিস, আন্দ্রেয়াস সিনানোস
কাস্ট [ক্যারেক্টার]: আলেকসান্দ্র [ব্রুনো গ্রাঞ্জ]; ইসাবেল রেনো [আনা]; ফাব্রিজিয়ো বেন্তিভগলিয়ো [কবি]; আকিলিস স্কেভিস [বালক]
মিউজিক: এলিনি কারাইন্দু
এডিটর: ইয়ানিস সিতসোপুলোস
রানিংটাইম: ১৩৭ মিনিট
ভাষা: গ্রিক
দেশ: গ্রিস
রিলিজ: ২৩ মে ১৯৯৮
অ্যাওয়ার্ড: পাম দি’অর [কান ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল, ফ্রান্স; ১৯৯৮]


টি. এস. এলিয়ট তার একটি বিখ্যাত কবিতার শুরুটা করেন অনেকটা এইভাবে–

“Time present and time past
Are both perhaps present in time future,
And time future contained in time past.
If all time is eternally present
All time is unredeemable.”

এই পাঁচটি লাইনের শ্রেষ্ঠ সিনেমাটিক পরিগ্রহণ যদি কিছু হয়ে থাকে, তা নিঃসন্দেহে থিও অ্যাঞ্জেলোপুলোসের ১৯৯৮ সালে মুক্তি পাওয়া এটারনিটি অ্যান্ড অ্যা ডে ছবির একটি সিন, যা দুটি দীর্ঘ শটে বিভক্ত। একটি শট শুরু হয় ছবির ৫১তম মিনিটে, আর স্থায়ী হয় ৫৫তম মিনিট পর্যন্ত; আর দ্বিতীয়টি ৫৫তম মিনিটে শুরু হয়ে শেষ হয় ৫৯তম মিনিটে। একেকটা শটের গড় সময়ব্যাপ্তি মোটামুটি সাড়ে চার মিনিট।

অতীতের অভিঘাতই বর্তমানের গতিপ্রকৃতির নির্ণায়ক, আবার বর্তমানের কার্যপ্রণালী ঠিক করে ভবিষ্যৎ কোন স্রোতে বইবে। আমাদের অতীত সুপ্ত হয়ে থাকে বর্তমানে।

এবার সিন’টা খেয়াল করুন: গাড়ি চালিয়ে ছবির কেন্দ্রীয় চরিত্র আলেকসান্দ্র, আলবেনিয়ান ছোট্ট রিফিউজি ছেলেটিকে নিয়ে আসে এক নদীর ধারে। এরপর নদীর ধার ঘেঁষে হাঁটতে হাঁটতে, আলেকসান্দ্র সেই উনিশ শতকের গ্রীক কবি ডিওনিওসিস সলোমোসের (যার একটি অসমাপ্ত কবিতা শেষ করাই আলেকসান্দ্রর একমাত্র লক্ষ্য) গল্প শোনাতে থাকে ছেলেটিকে। তারপর একই শটে ক্যামেরা প্যান করতে থাকে; আর আমরা অনতিদূরে স্বয়ং সলোমসকে দেখি তার কবিতা নিয়ে চিন্তায় মগ্ন। হলিউড বা অন্য কোনো ছবি হলে হয় একটা ‘কাট’, নয়তো ফ্ল্যাশবাকে দেখানো হতো; কিন্তু অ্যাঞ্জেলোপুলোস একই শটের মধ্যে অতীত ও বর্তমানের সহাবস্থান দেখান।

এটারনিটি অ্যান্ড অ্যা ডে। ফিল্মমেকার: থিও অ্যাঞ্জেলোপোলুস

অ্যাঞ্জেলোপুলোস বিশেষজ্ঞ অ্যান্ড্রু হর্টনের ভাষায়– ‘যেন বর্তমানের মধ্যেই অতীত সুপ্ত হয়ে রয়েছে, এবং থিও সেটা একটা শটের মধ্যে দিয়ে প্রকাশ করতে চাইছেন।’ আসলে এথেন্সের আক্রপোলিসের কাছ দিয়ে আপনি যদি টয়োটা চালিয়ে যান, উপলব্ধি করবেন কী অদ্ভুতভাবে বর্তমান আর অতীত মিশে যাচ্ছে।

দ্বিতীয় শটটি অতীতে নিয়ে যায়, যেখানে বহু বছর নির্বাসনে কাটিয়ে কবি সলোমস নিজের দেশে ফিরে এসে দেখে, সে তার মাতৃভাষা ভুলে গিয়েছে। অথচ তাকে বিপ্লবের জন্য নিজের মাতৃভাষা গ্রিকে কবিতা লিখতে হবে। তাই সে ভাষা শিখতে থাকে এক অদ্ভুত উপায়ে। প্রতিটি নতুন শব্দ শেখানোর জন্য সে পয়সা দিতে থাকে। বস্তুত সে পয়সার বিনিময়ে শব্দ কিনতে থাকে।

এক পরিত্যাক্ত ভাঙাচোরা খিলানে ঘেরা জায়গায় সলোমসকে যখন এক তরুণী এসে নতুন শব্দ শিখিয়ে দিয়ে যায়, দূর থেকে তা লক্ষ্য করে আলেকসান্দ্র ও ছোট্ট আলবেনিয়ান ছেলেটি। দ্বিতীয় বালকান যুদ্ধের পটভূমিকায় বিধ্বস্ত পূর্ব ইউরোপে তৈরি অ্যাঞ্জেলোপুলোসের ইউলিসিস গেজ ছবিতেও এমন এক দৃশ্য রয়েছে, যেখানে বর্তমান অতীতে গিয়ে মিশে যায় একই শটে।

আসলে এটারনিটি অ্যান্ড অ্যা ডে মারণরোগে আক্রান্ত এক বৃদ্ধ কবির কাহিনি। সে জানে তার মৃত্যু আসন্ন। পরের দিনই হাসপাতালে ভর্তি হবার কথা তার। এমন অবস্থায় তার অতীতের কথা মনে পড়ে। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে তার কেবল মনে হতে থাকে, কত তুচ্ছ কাজে সে তার সময় অতিবাহিত করেছে, নিজের স্ত্রী ও কাছের মানুষদের অবহেলা করে।


স্মৃতি
রোমন্থনের
মধ্যে দিয়ে সে
পূরণ করতে চায়
তার সমস্ত না পাওয়া

ব্যক্তিগত জীবনের এই রিক্ততা, নিঃসঙ্গতা থেকে মুক্তি পাবার জন্য আলেকসান্দ্র বারেবার ফিরে যায় অতীতে– স্ত্রী ও পরিজনদের সঙ্গে কাটানো এক ছুটির দিনে, কোনো এক সমুদ্র সৈকতের পাড়ে। স্মৃতি রোমন্থনের মধ্যে দিয়ে সে পূরণ করতে চায় তার সমস্ত না পাওয়া। মৃত স্ত্রীর সঙ্গে সে বারবার মিলিত হয়। এগুলো কিন্তু ঠিক ফ্ল্যাশব্যাক নয়; অনেকটা কল্পনা।

আমরা বর্তমানের বৃদ্ধ আলেকসান্দ্রকে দেখি তার অতীতে গিয়ে বিচরণ করতে: যদি আবার সেই দিনগুলো যাপন করবার কোনো সুযোগ থাকত, তাহলে সে যা যা করতে চাইত, এবং স্ত্রীকে যা যা বলতে চাইত– তাই-তাই করে ও বলে। সাইকোলজির পরিভাষায় অনেকটা ‘ম্যালঅ্যাডাপটিভ ডেড্রিমিং’য়ের অনুরূপ। আলেকসান্দ্রর নির্লিপ্ত উদাসীনতাই যৌবনে তার ও স্ত্রীর মাঝে এক দুর্লঙ্ঘ্য প্রাচীর হয়ে ছিল। আজ যখন মৃত্যু আসন্ন, তখন স্ত্রীর উষ্ণতাই সবচাইতে বেশি ঈপ্সিত।

অ্যাঞ্জেলোপুলোস ও আরভানিতিস জুটি [ইয়োর্গোস আরভানিতিস হচ্ছেন অ্যাঞ্জেলোপুলোসের অধিকাংশ ছবির সিনেমাটোগ্রাফার] আমাদের কিছু চিরস্মরণীয় দৃশ্য উপহার দিয়েছে। তার মধ্যে, যখন আলবেনিয়া থেকে অবৈধভাবে, বর্ডার ক্রস করে গ্রিসে পালিয়ে আসা ছেলেটিকে একটি শিশু পাচারকারী দলের হাত থেকে বাঁচানোর পর, তাকে নিজের দেশে ঠাকুমার কাছে ফিরিয়ে দেবার জন্য গাড়ি চালিয়ে কাঁটাতারে ঘেরা একটি বর্ডারে নিয়ে আসে আলেকসান্দ্র, এক অদ্ভুত মায়াবী দৃশ্যের জন্ম হয়। কুয়াশাচ্ছন্ন বর্ডারে প্রবল তুষারপাতের মধ্যে আমরা দেখি কাঁটাতারে কিছু অদ্ভুত অশরীরী ঝুলছে!

একইভাবে কিছু অসামান্য ইমেজের সৃষ্টি হয় সেই সুদীর্ঘ বাস যাত্রার সময়, যখন আলেকসান্দ্র তার ছোট্ট রিফিউজি বন্ধুটিকে বন্দরে শেষবারের জন্য ছেড়ে আসতে যায়। বাসের মধ্যে বহু আসা-যাওয়া যাত্রীর মাঝে একটি ঘুমন্ত যুবককে লাল পতাকার সঙ্গে দেখি; আর দেখি সেই উনিশ শতকের কবিকে আলেকসান্দ্রকে একটি কবিতা শোনাতে।

সেই আশির দশকের শুরু থেকেই অ্যাঞ্জেলোপুলোস তার ছবির মূল চরিত্রের জন্য বিদেশি অভিনেতাদের নির্বাচিত করেন, কখনো সেটা মার্চেল্লো মাস্ত্রোইয়ান্নি [ইতালি], তো কখনো হার্ভে কাইটেল [যুক্তরাষ্ট্র]। এ ক্ষেত্রেও ব্যতিক্রম হয়নি। সুইস থেসপিয়ান ব্রুনো গাঞ্জকে আমরা অসহায় এক কবির ভূমিকায় পাই।

ছবিটি দেখতে গিয়ে প্রায়ই মনে হয়, আলেকসান্দ্রর শিল্পী জীবনের যে খেদ এবং ব্যক্তিগত জীবনের যে অনুশোচনা বা আক্ষেপ, তার একটা প্রায়শ্চিত্ত সে করে জীবনের শেষ দিনে ওই আলবেনিয়ান ছোট্ট ছেলেটিকে প্রথমে পুলিশ, তারপর পাচারকারীদের হাত থেকে বাঁচিয়ে। এইভাবে সে স্ত্রীর প্রতি করা বঞ্চনারও একটা খেসারত দেয়।

থিও অ্যাঞ্জেলোপোলুস
এটারনিটি অ্যান্ড অ্যা ডে

আসলে জীবনের প্রান্তে পৌঁছলে যৌবনের অনেক কিছুকেই তুচ্ছ বলে মনে হয়; অথচ একদা সেই তুচ্ছ জিনিসগুলোর পেছনেই আমরা মরীচিকার মতো ছুটেছি। দেখতে দেখতে আমার ওয়াইল্ড স্ট্রবেরিজ-এর [Smultronstället; ইংমার বারিমন; ১৯৫৭] সেই বৃদ্ধ প্রফেসর ইসাক বারি চরিত্রটির কথাও মনে হচ্ছিল। লুন্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডক্টরেট প্রাপ্ত ইসাকও মারাত্মক একটা গিল্ট বা বিবেকের দংশনে ভোগে। ব্যক্তিগত শূন্যতার কাছে জীবনের সমস্ত খ্যাতি, অর্জন, শিরোপা অর্থহীন বলে মনে হয় তার।

প্রিয় পাঠক/দর্শক, এটারনিটি অ্যান্ড অ্যা ডে ছবিটিকে চাইলে আপনি ‘কনটেম্পোরারি ওডিসি’ হিসেবে পড়তেই পারেন। আসলে অ্যাঞ্জেলোপুলোসের সমস্ত ছবিই এক সুদীর্ঘ যাত্রা। হোমারের ওডিসির নায়ক ওডিশাস যেমন দীর্ঘ যাত্রা করে ইথিকাসের দিকে, এখানেও আলেকসান্দ্র যাত্রা করে, তবে তার গন্তব্য ইথিকাস কোনো স্থান নয়, একটা ‘স্টেট অব বিং’ বা ইনার পিস– অন্তরের শান্তি। এখানে অবশ্যই পেনিলোপে আলেকসান্দ্রর মৃত স্ত্রী আনা। আর টেলেম্যাকাস আলবেনিয়া থেকে বর্ডার ক্রস করে পালিয়ে আসা সেই ছোট্ট ছেলেটি।

ছবির শুরু ও শেষ একটি বৃত্তের মতো একই বিন্দুতে এসে মিলিত হয়। সেই সি বিচ। ছবির একদম শুরুতে আমরা ছোট্ট আলেকসান্দ্রকে যেখানে বন্ধুদের সঙ্গে খেলা করতে দেখি, সুদীর্ঘ যাত্রার শেষে রৌদ্রকরোজ্জ্বল সেই সমুদ্র সৈকতেই স্ত্রীর সঙ্গে আবার মিলিত হয় সে। আর পিছনে বেজে ওঠে এলিনি কারাইন্দুর সুর দেওয়া অসামান্য সেই ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোর, যা ছবিতে বারবার ঘুরে ফিরে আসে। এক অলীক পরাবাস্তবতার মধ্যে ছবি শেষ হয়।

অপার বিস্ময়ে আমি দেখি, থিও অ্যাঞ্জেলোপুলোস কীভাবে একটি মানুষের ব্যক্তিগত যাত্রার [পার্সোনাল অডিসি] সঙ্গে ইতিহাস, সমকাল, পুরাণ, রিফিউজি ক্রাইসিস, গ্রিক-আলবেনিয়া বর্ডার সমস্যা এবং রাজনীতিকে জুড়ে দেন। হ্যাঁ রাজনীতি। বাসে লাল পতাকা নিয়ে ওঠা ওই ঘুমিয়ে পরা যুবকটিকে আমার বিশেষ অর্থবহ মনে হয়।


অ্যাঞ্জেলোপুলোস
যেন চাইছেন,
আপনি
দৃশ্যের
গভীরে
সম্পূর্ণ
ডুবে
যান

জীবনানন্দ দাশ একবার বলেছিলেন, ‘শিল্পীর অস্থির ভিতরে থাকবে ইতিহাস চেতনা ও মর্মে থাকবে পরিচ্ছন্ন কাল জ্ঞান।’ থিও অ্যাঞ্জেলোপুলোস যেভাবে ইতিহাস ও সমকালের মধ্যে এক ধরনের সেতু নির্মাণ করেন, তাতে তিনি নিঃসন্দেহে একজন বড় শিল্পী। দ্রুত এডিটিংয়ের যুগে যেখানে একেকটি শটের সময়সীমা গড়ে তিন থেকে চার সেকেন্ড, অ্যাঞ্জেলোপুলোস সেখানে এক উজ্জ্বল ব্যতিক্রম। লং শট, ডিপ ফোকাস, লম্বা লম্বা ট্র্যাকিং শট– যার একেকটি গড়ে তিন থেকে সাড়ে তিন মিনিট… অ্যাঞ্জেলোপুলোসের ছবি ধীম গতিতে চলতে থাকে। পরিচালকের কোনো তাড়াহুড়ো নেই। অ্যাঞ্জেলোপুলোস যেন চাইছেন, আপনি দৃশ্যের গভীরে সম্পূর্ণ ডুবে যান।

থিও অ্যাঞ্জেলোপোলুস
এটারনিটি অ্যান্ড অ্যা ডে

আসলে অ্যাঞ্জেলোপুলোসের ছবি দেখে আপনি হল থেকে বেরোনোর পর কেউ যদি ছবির কাহিনি জিজ্ঞাসা করা হয়, বলতেই পারবেন না। কারণ অ্যাঞ্জেলোপুলোস কোনো আখ্যানধর্মী ছবি করেননি। কোনো সুনির্দিষ্ট প্লট, সেন্ট্রাল কনফ্লিক্ট বা ক্রাইসিস– যা আখ্যানের পক্ষে জরুরি, এবং শেষে রেজোলিউশন নেই।

দৃশ্যের মাত্রা ছাড়িয়ে সিনেমা কখনো কখনো কবিতার পর্যায় চলে যায়। তখন তাকে আর শব্দে ধরা যায় না। কবিতার মতোই তাকে অনুভব করতে হয় সমস্ত স্নায়ু দিয়ে। এটারনিটি অ্যান্ড অ্যা ডের একেকটি দৃশ্য এত গভীর যে, তা আপনাকে আচ্ছন্ন করে রাখবে। এ এক অনুভূতি যা অনির্বচনীয়।

Print Friendly, PDF & Email