‘লাল মোরগের ঝুঁটি’ কোন মুক্তিযুদ্ধের কথা বলে?

180
লাল মোরগের ঝুঁটি

লিখেছেন: আলতাফ শাহনেওয়াজ

লাল মোরগের ঝুঁটি
Call of the Red Rooster
কাহিনি, চিত্রনাট্য ও পরিচালনা: নূরুল আলম আতিক
প্রযোজক: মাতিয়া বানু শুকু
অভিনয়: লায়লা হাসান, আহমেদ রুবেল, আশনা হাবিব ভাবনা, অশোক বেপারী, আশীষ খন্দকার, জয়রাজ, শিল্পী সরকার, ইলোরা গওহর, জ্যোতিকা জ্যোতি, দিলরুবা দোয়েল, স্বাগতা, শাহজাহান সম্রাট, অনন্ত মুনির, দীপক সুমন, খলিলুর রহমান কাদেরী, সৈকত, যুবায়ের
চিত্রগ্রহণ: সুমন সরকার, কাশেফ শাহবাজী, মাজাহারুল ইসলাম
সম্পাদনা: সামির আহমেদ
শব্দ: সুকান্ত মজুমদার
সংগীত: রাশিদ শরীফ শোয়েব
শিল্প নির্দেশনা: লিটন কর, ওয়াদুদ রেইনি
ভাষা: বাংলা, উর্দু
দেশ: বাংলাদেশ
মুক্তি: ১০ ডিসেম্বর ২০২১


লাল মোরগের ঝুঁটি মুক্তিযুদ্ধের ছবি, এই কথাটি এত দিনে সবারই জানা হয়ে গেছে। তবে প্রশ্ন হলো, এই ছবির প্রতিটি ফ্রেমে যে মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযুদ্ধের যে সময়খণ্ড দেখানো হলো, সেই মুক্তিযুদ্ধ কাদের?

এটি কি মার্ক্সবাদীদের মুক্তিযুদ্ধ, নাকি আওয়ামীলীগ মুক্তিযুদ্ধের যে ন্যারেটিভ বা বয়ান হাজির করে, সেই মুক্তিযুদ্ধ? এটি কি আওয়ামীবিরোধীরা যুদ্ধের যে বয়ান দাখিল করে, সেই মুক্তিযুদ্ধ?

প্রশ্নের উত্তর পেতে আপনাকে অবশ্যই ছবিটি দেখতে হবে। আর অপনি যদি সাধারণ মানুষের চোখে মুক্তিযুদ্ধ দেখতে চান, তাহলেও আপনাকে এর পর্দায় চোখ রাখতে হবে।

মুক্তিযুদ্ধের ৫০ বছর চলছে। বিজয়ের সুবর্ণজয়ন্তীও সমাগত। আজ ১৬ ডিসেম্বর বিজয়ের সুবর্ণজয়ন্তী। তার ঠিক আগে গতকাল ১৫ ডিসেম্বর অতঃপর দেখা হলো নূরুল আলম আতিক পরিচালিত লাল মোরগের ঝুঁটি। ছবিটি দেখতে দেখতে ৫০ বছর আগের মুক্তিযুদ্ধকে যেন রক্তেমাংসে অনুভব করলাম আমরা। আচ্ছা, ‘যেন’ শব্দটি কেন ব্যবহার করলাম! এখানে আমরা তো আদতেই মুক্তিযুদ্ধের সেই সব অবরুদ্ধ বাস্তবতা দেখে তীব্র অসহায়ত্বসমেত এবং দমবন্ধ অবস্থায় বসে থেকেছি।

তো কী এমন আছে এই ছবিতে, যে কারণে মুক্তিযুদ্ধকে এমন শ্বাসরুদ্ধভাবে অনুভব করা গেল? প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে শুধু বলি, লাল মোরগের ঝুঁটিতে রাইফেল কাঁধে কোনো দামাল মুক্তিযোদ্ধা নেই, এই ছবির প্রায় সব চরিত্রই মুক্তিযোদ্ধা। এমনকি দু-একজন বিহারিও শেষাবধি ‘মানুষের’ পক্ষে থাকে।
মুক্তিযুদ্ধের যে সাদা-কালো ন্যাটেরিভ আমরা জানি, এটি তার বাইরের ছবি। লাল মোরগের ঝুঁটি ভিন্ন এক মুক্তিযুদ্ধের বয়ান, অর্থাৎ যে বয়ান আমাদের কেউ দেখায়নি, সেই বয়ান হাজির করে বলেই ছবিটি আমাদের ভালো লাগে। আর মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে-বিপক্ষের যারা এখানে চরিত্ররূপে উপস্থিত হয়, তারা কেউই ‘শুধু ভালো’ এবং ‘কেবলই খারাপ’ নয়, উভয়ের চরিত্রই আঁকা হয়েছে ভালো-মন্দ মিশিয়ে, ‘নো ম্যান এন্টায়ারলি গুড, নো ম্যান এন্টায়ারলি ব্যাড’ থিয়োরিতে।

লাল মোরগের ঝুঁটি
লাল মোরগের ঝুঁটি। ফিল্মমেকার: নূরুল আলম আতিক

এখানে একটু ব্যক্তিগত প্রসঙ্গের অবতারণা করি। আমার জন্ম মুক্তিযুদ্ধের বছর দশেক পরে। মুক্তিযুদ্ধের সময় আমার আম্মা ছিলেন তরুণী। ছিলেন দেশের ভেতরে অবরুদ্ধ। আম্মার কাছে আমি মুক্তিযুদ্ধের, সেই সময়ের অবরুদ্ধ বাংলাদেশের মানুষের যে বর্ণনা শুনেছি, সেসব সেভাবে কোনো বইতে পাইনি। তবে আজ এত বছর বাদে নূরুল আলম আতিকের লাল মোরগের ঝুঁটিতে দেখা দৃশ্যাবলির সঙ্গে আম্মার বলা সেই যুদ্ধের বর্ণনা মিলে গেল!


রক্ত,
গোলাগুলি,
চিৎকার, আগুন
ইত্যাদি না দেখেও আমরা
পেতে থাকি যুদ্ধের এক
ঘনিভূত ও দমবন্ধ
তাপের
আঁচ

ছবিটি ধীরে ধীরে আমাদেরকে এক ধরনের শ্বাসরুদ্ধ পরিবেশের মুখোমুখি করে সবার ভেতরে খানিকটা চাপ তৈরি করে, আনেকটা ক্লাস্টোফোবিয়ার মতো অনুভূতি হয়। এ সময় নানা দিকে ক্যামেরা ঘুরিয়ে পরিচালক মুক্তিযুদ্ধকালের অবরুদ্ধ বিচিত্র মানুষগুলোকে আমাদের দেখাতে থাকেন। আর সঙ্গে সঙ্গে রক্ত, গোলাগুলি, চিৎকার, আগুন ইত্যাদি না দেখেও আমরা পেতে থাকি যুদ্ধের এক ঘনিভূত ও দমবন্ধ তাপের আঁচ।

ছবিটির বিভিন্ন দৃশ্য নিয়েই বিস্তর আলাপ তোলা যাবে। বলা যাবে পাকিস্তানি ক্যাপ্টেন যখন এক মেয়েকে চাবুক পেটাতে থাকে, তখন ওই দৃশ্যের মাঝখানে কেন ঢুকে পড়ে আরেকটি দৃশ্য, যেখানে মেয়েটির দাদি কুমড়ার ওপর চামচ দিয়ে একের পর এক অঘাত করছেন।

দৃশ্য প্রসঙ্গ যখন এলই তবে আরেকটি দৃশ্যের কথাও বলা হোক। ছবিতে এক হিন্দু মেয়ের স্বামীকে হত্যা করে বিহারিরা। তখন ওই স্বামীর মনে পড়ে তার স্ত্রীর কপালে সিঁদুর পরানোর দৃশ্য। এরপরই পরিচালক আমাদের দেখান যে মেয়েটির মা মেয়ের মাথার সিঁদুর মুছিয়ে দিচ্ছেন। বলা দরকার, গোটা ছবিতে নির্মাতা নূরুল আলম আতিক একই দৃশ্যের মধ্যে এই সব বিপরীতধর্মী দৃশ্য বা দৃশ্যের ছাঁট এমনভাবে ঢুকিয়ে দিয়েছেন, যা ধীরে ধীরে দর্শকের তরফে এক ধরণের শ্বাসরোধী বাস্তবতা তৈরি করেছে।

লাল মোরগের ঝুঁটি

আবার যখন একটি হিন্দু পরিবারকে বিহারিরা জ্যান্ত পুড়িয়ে মারে, তখন তাদের শরীরে শুধু কেরোসিন ঢেলে দেওয়ার চিত্রই আমাদের দেখানো হয়, আগুন দেওয়ার পুরো দৃশ্যটুকু উহ্য রাখা হয়, অথবা সে দৃশ্য অন্য চরিত্রের অভিব্যক্তির মধ্য দিয়েই ব্যক্ত করা হয়। কেন এমনভাবে দৃশ্যটি প্রকাশিত হয়? কেনই-বা পুরো ছবিটি সাদাকালোতে নির্মাণ করা হয়েছে? জবাবগুলো পেতে হলে ছবিটি দেখার পর দর্শককে খানিটা বুদ্ধির ব্যয়াম করতে হবে, ভাবতে হবে।

আগেই বলেছি, এই সিনেমায় মুক্তিযুদ্ধকে দেখানো হয়েছে আমজনতার প্রেক্ষাপট থেকে। ফলে মুক্তিযুদ্ধ এখানে কোনো পক্ষের দৃষ্টিকোণ থেকে নয়, উপস্থাপিত হয়েছে অন্য রকম এক বয়ানে। সেই বয়ানটি কেমন, জানতে লাল মোরগের ঝুঁটি দেখে ফেলাই ভালো।


আহমেদ রুবেলের অভিনয়ের কোথাও
কোথাও থিয়েট্রিক্যাল ভঙ্গি ফুলের
মধ্য যেন একটু কাঁটার
মতোই বিঁধেছে

যেহেতু ৫০ বছর আগের অগ্নিগর্ভ এক কালপর্বকে মূর্ত করাই এখানে উদ্দেশ্য, তাই ছবির পরিবেশ ও আবহকেও ৫০ বছর আগে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা ছিল লাল মোরগের ঝুঁটির সর্বত্রই। অভিনয়শিল্পীদের সবাই-ই বাস্তবের মাটিতে পা রেখে স্বাভাবিক অভিনয় করেছেন। এদের মধ্যে আলাদাভাবে চোখে পড়েছে শিল্পী সরকার অপু, আশীষ খন্দকার, জয়রাজসহ আরও কয়েকজনের (অনেক অভিনয়শিল্পীর নাম জানি না) অভিনয়। তা ছাড়া, চরিত্রের দরকারে আশনা হাবীব ভাবনা নিজেকে যেভাবে ভেঙেছেন, তা প্রশংসার দাবি রাখে। তবে আহমেদ রুবেলের অভিনয়ের কোথাও কোথাও থিয়েট্রিক্যাল ভঙ্গি ফুলের মধ্য যেন একটু কাঁটার মতোই বিঁধেছে।

লাল মোরগের ঝুঁটি

ছবিটি সম্ভবত ঢাকায় আজই শেষবার দেখা যাবে। ফলে ঢাকায় যারা আছেন, তাদের জন্য এই সুযোগ হাতছাড়া করা ঠিক হবে না।

‘বাংলাদেশে ভালো মানের মুক্তিযুদ্ধের ছবি নির্মিত হয়নি’, এমন আফসোস যাদের আছে, অতি অবশ্যই তারা এই সিনেমা দেখবেন। আশা করি আফসোস ঘুঁচে যাবে। আর যারা আরেক কদম বাড়িয়ে বলেন, ‘এখানে আসলে ভালো ছবির খুব অভাব’, লাল মোরগের ঝুঁটি দর্শন তাদের জন্য কর্তব্যের পর্যায়ে পড়ে বৈকি! ছবির বিভিন্ন বিষয়, নির্মাণ শৈলী নিয়ে তর্ক হতে পারে। সে তর্ক আমরা করতেও রাজি। তবে সবার আগে ছবিটি দেখতে তো হবে।

শেষে বলি, যদি কেউ ভেবে থাকেন, এ সিনেমা ‘হাই থটের’, ‘আর্টফিল্ম’ টাইপের, তারা খুবই ভুল ভাবছেন। কেননা, লাল মোরগের ঝুঁটি আপনার, আমার, সবার ছবি। গণমানুষের মুক্তিযুদ্ধের কাহিনিচিত্রের মুখোমুখি তো জনমানুষকেই হতে হবে, তাই না?


১৬ ডিসেম্বর ২০২১, ঢাকা
Print Friendly, PDF & Email
কবি, লেখক; বাংলাদেশ । লেখালেখির শুরু 'নির্লিপ্ত নয়ন' নামে, ছোটকাগজে ।। কবিতার বই: ‘রাত্রির অদ্ভুত নিমগাছ’ [২০১১], ‘আলাদিনের গ্রামে’ [২০১৬, ‘কলহবিদ্যুৎ’ [২০১৯], ‘সামান্য দেখার অন্ধকারে’ [২০২০], ‘সহসা দুয়ারে’ [২০২১] ।। নাট্যগ্রন্থ: ‘নৃত্যকী’ [২০১৬]। সম্পাদিত ছোটকাগজ: ‘ঢোল সমুদ্দুর’ [২০০১] ও ‘শাখাভরা ফুল’ [২০০৯] ।। অ্যাওয়ার্ড: ‘আদম সম্মাননা ২০১৬’ [ভারত]; ‘কালি ও কলম তরুণ কবি ও লেখক পুরস্কার ২০১৭’