রেহানা মরিয়ম নূর: আমাদের সিনেমা সেন্সের প্রেক্ষিতে

559
রেহানা মরিয়ম নূর

লিখেছেন: আনিস পারভেজ

রেহানা মরিয়ম নূর

রেহানা মরিয়ম নূর
Rehana Maryam Noor
ফিল্মমেকার, স্ক্রিনরাইটার, এডিটর: আবদুল্লাহ মোহাম্মদ সাদ
প্রডিউসার: জেরেমি ‍চুয়া
সিনেমাটোগ্রাফার: তুহিন তমিজুল
মিউজিক: শৈব তালুকদার
কাস্ট [ক্যারেকটার]: আজমেরী হক বাঁধন [রেহানা মরিয়ম নূর]; আফিয়া জাহিন জাইমা [ইমু]; কাজী সামি হাসান [আরেফিন]; আফিয়া তাবাসসুম বর্ণ [অ্যানি]
রানিংটাইম: ১০৭ মিনিট
ভাষা: বাংলা
দেশ: বাংলাদেশ
রিলিজ: ৭ জুলাই ২০২১ [কান]; ১২ নভেম্বর ২০২১ [বাংলাদেশ]


সিনেমা শুরুর তিরিশ মিনিট আগেই টিকিট কেটে লাউঞ্জে বসে আছি। আর পনেরো মিনিট পরে সিনেমা শুরু হবে– এখনও আমি ছাড়া কোনো দর্শক নেই। গেটকিপারকে ডেকে কিছুটা বাতচিত করলাম। সে বলল প্রথম দু’দিন বাদে এখন মাত্র হাতে গোনা কিছু দর্শক আসছে রেহানা মরিয়ম নূর দেখতে। কেন আসছে না? আমার প্রশ্নের উত্তরে সে বলল, সাদাকালা সিনেমা, তাও ঘোলা, কিছুই দেখা যায় না। তারপরে আবার পর্দা কাঁপে, হলের দোষ নাই, এইডা তো শ্যামলী হল, বেস্ট প্রোজেক্টর; পরিচালক ঠিকমতো ক্যামেরা চালাইতে পারে নাই। তারপরে বাইরেরও কোনো সিন নাই, খালি একই জায়গার মইদ্ধে কাহিনি– ডাইনেও যায় না বামেও না; মনে হয় পরিচালক পয়সা বাঁচাইছে। এইরকম কাপাইন্না সিনেমা দশ মিনিট দেখলে চোখ বিস করে। দেখেন, আপনি নিজেই বুজবেন, এই তো কিছুক্ষণ পরেই শুরু হইব।

সিনেমা শুরুর ঠিক আগ মুহূর্তে আরও কিছু দর্শক এলো, গুনে দেখলাম আমরা সব মিলিয়ে নয় জন। সিনেমা মুক্তির তৃতীয় দিনের দুপুরের শো। সিনেমা শেষে বেরিয়ে যাওয়ার পথে আমি একটি তরুণ যুগলকে জিজ্ঞেস করলাম, কেমন লেগেছে? ওরা কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলো। ছেলেটি আমতা আমতা করে বলল, ভালোই। মেয়েটি বলল, শেষটি অসম্পূর্ণ। ইতিমধ্যে বেশ কিছু রিভিউ হয়েছে– পত্রিকায় ও সামাজিক মাধ্যমে। অনেকেই তুমুল প্রশংসা করছে, কেউ বলছে এটি নারীবাদী সিনেমা।

ভালোমন্দ প্রতিক্রিয়ায় রেহানা মরিয়ম নূর এখন টক অব দ্য টাউন। শিল্প নিয়ে মানুষের প্রতিক্রিয়া ভিন্নতর হয়– এটাই স্বাভাবিক, কেননা আমাদের আছে রুচির পার্থক্য এবং সে প্রেক্ষিতে ভিন্ন প্রত্যাশা এবং সর্বোপরি আমাদের সিনেমা সেন্স নির্ধারণ করে একটি সিনেমা আমাদের বোধে কী অর্থ তৈরি করবে।

সিনেমা সেন্স

অন্যান্য শিল্পের চাইতে সিনেমা শক্তিশালী এ কারণে যে এর আছে গুনগত তাৎক্ষনিকতা বা qualitative immediacy, অর্থাৎ সিনেমায় প্রদর্শিত বাস্তব আমাদের যাপিত জীবনের বাস্তবতার কার্বন কপি এবং এর চেয়ে বেশি, যা অন্যান্য শিল্পে সম্ভব নয়। দ্বিমাত্রিক চিত্রকলা ও আলোকচিত্রে গতি নেই, দর্শককে গতি তৈরি করে নিতে হয় মনের চোখে চেতনপ্রক্রিয়ায়। মঞ্চ নাটকেও বাস্তবের সাথে বিযুক্ততা থাকে। গুণগত তাৎক্ষণিকতার কারণে সিনেমা সরাসরি শরীরে টোকা দেয়, যৌন দৃশ্যে আমরা উদ্দীপ্ত হই, রক্তপাত দেখে ভয় পাই– শরীরে কাঁটা দেয়; আমাদের দেহমন তাৎক্ষণিকভাবে আলোড়িত হয়।


গুণগত
তাৎক্ষণিকতাই
সিনেমার প্রধান শত্রু
যা সিনেমাকে শুদ্ধ
শিল্প হতে বাধা
দেয়

দুঃখজনকভাবে গুণগত তাৎক্ষণিকতাই সিনেমার প্রধান শত্রু যা সিনেমাকে শুদ্ধ শিল্প হতে বাধা দেয়। বেশিরভাগ দর্শক চায় বিনোদন– গ্ল্যামার, যৌনতা, মেলোড্রামা, সহিংসতা এবং আরও কিছু যা দেখে মনে হবে পয়সা দিয়ে সিনেমা দেখে পয়সা উসুল হয়েছে। সিনেমা একটি ইন্ডাস্ট্রি– অনেক অর্থলগ্নি করতে হয়, যা মুনাফা-সহ ফেরত চাই, যা চিত্রকলার বেলায় নয়। আমজনতাকে উদ্দিষ্ট করে সিনেমা তৈরি করা হয়। চিত্রকলার, এমনকি সাহিত্যেরও, শিল্প হিসেবে অবস্থান বনেদি বৃত্তে, গণমন সন্তুষ্ট করার পূর্বশর্তে শৃঙ্খলিত নয়। কিন্তু তারপরেও একজন নিবেদিত সিনেমাকারের উদ্দেশ্য সিনেমাকে শিল্পোত্তীর্ণ করা।

সিনেমা শিল্প ও সস্তা বিনোদনের টানাটানিতে ক্রুশবিদ্ধ, এবং একটি গোত্র ও সংস্কৃতি এবং ব্যক্তির সিনেমা সেন্সের নিরিখে ক্রুশের পেরেকগুলো সহনীয় বা অসহনীয় হয়ে ওঠে।

যে কোনো শিল্পের সেন্স গড়ে ওঠে ঐতিহাসিক প্রক্রিয়ায়, প্রথমত শিল্পটির নির্মাণ ক্রিয়ায় টেকনিক ও প্রযুক্তির বিবর্তিত উদ্ভাবন ও ব্যবহারে, দ্বিতীয়ত শিল্পের ভোক্তার চেতনপ্রক্রিয়া বা কগনিশনের (Cognition) বিকাশে। কগনিশন ও প্রত্যক্ষণ (Perception) আড়াআড়িভাবে জড়িত। আমরা যা প্রত্যক্ষণ করি তাই চেতনপ্রক্রিয়ায় বিশ্লেষিত হয়ে অর্থ তৈরি করে। আমাদের প্রত্যক্ষণ বদলায়, একসময় যা দেখতে পেতাম না সময়ে অভ্যস্ত হয়ে তা দেখতে পাই এবং আমাদের কগনিশনও তা ব্যাখ্যা করতে পারে।

সিনেমার শুরুর প্রায় এক যুগ ক্লোজআপ আমাদের প্রত্যক্ষণে অর্থবহ হবে তা কেউ ভাবেনি। জর্জ আলবার্ট স্মিথের ১৯০০’র সিনেমা Seen Through a Telescope-এ প্রথম ক্লোজআপ ব্যবহার করলে দর্শক কিছুই বুঝে উঠতে পারেনি। তাই গ্রিফিত ১৯১১-তে নির্মিত The Lonedale Operato-এ ক্লোজআপ ব্যবহার করলে তাঁর ইউনিটের সবাই শঙ্কিত ছিল এই ভেবে যে পয়সা দিয়ে দর্শক একজন তারকার অংশ বিশেষ দেখতে চাইবে না। কিন্তু ততদিনে দর্শক ক্লোজআপের বিশেষত্ব এবং এর আবেদন বুঝে গেছে, ক্লোজআপ জনপ্রিয় হলো।

সিনেমার ইতিহাসে তিনটে দিকনির্দেশক এগিয়ে যাওয়া আছে: ক্রমাগত উন্নততর প্রযুক্তি– সিনেমাটোগ্রাফি, সম্পাদনা ও শব্দে, সিনেমা শৈলীর উৎকর্ষতা, এবং দর্শকের প্রত্যক্ষণ ও কগনিশনে পরিবর্তন। এর সমান্তরালে সিনেমা সেন্স গড়ে উঠলো।

রেহানা মরিয়ম নূর
রেহানা মরিয়ম নূর। ফিল্মমেকার: আবদুল্লাহ মোহাম্মদ সাদ

সিনেমা সেন্স ঐতিহাসিকভাবে তৈরি হয়েছে বলে সবসময়ই বিবর্তিত হয়। গল্প বয়ানে নতুন ধারা গড়ে ওঠে, ক্যামেরার ফ্রেমিং ও আলোর ব্যাকরণ বদলে যায়, সম্পাদনা শৈলীও এক জায়গায় থেমে নেই। দৃশ্যান্তরে সময় পার হয়েছে দেখাতে এখন আর ফেড আউট এবং ডিজলভ ব্যবহার করতে হওয়া না। একটা সময় লং শটে স্থান ও চরিত্রদের একসাথে দেখিয়ে, যেটাকে বলা হয় এস্টাব্লিশিং শট (Establishing shot), মিড শট হয়ে ক্লোজ শটে যেতে হতো; এটাই ছিল রীতি এবং দর্শকের কগনিশন সেভাবেই অভ্যস্ত ছিল। এখন আর সেরকম প্রয়োজন নেই, যদি না সিনেমাকার বিশেষ কোনো অর্থ প্রয়োগ করতে চান ফেড আউট, ফেড ইন এবং ডিজলভ ব্যবহার করে। মেধাবী সিনেমাকারদের নিরীক্ষায় সিনেমার গড়ন অবিরত বদলাচ্ছে, সমান্তরালে পরিবর্তন ঘটছে দর্শকের সিনেমা সেন্সের। মানুষের ভাষা যেমন বদলায়, বদলায় শিল্প সেন্স ও সিনেমা সেন্স।

সিনেমা সেন্সের একটি ইউনিভার্সাল কাঠামো তৈরি হলেও গোত্র ও সংস্কৃতি ভেদে সিনেমা সেন্সেও কিন্তু পার্থক্য আছে। তারকোভস্কি বা আব্বাস কিয়ারস্তামির সিনেমা বোধে জায়গা দেবার জন্য যথাযথ সিনেমা সেন্স সব সংস্কৃতি বা ব্যক্তির নেই, যেমন বেদের মেয়ে জ্যোৎস্না বা দোস্ত দুশমন সবাই দেখতে যাবে না। স্ক্যান্ডেনাভিয়ায় ধীর লয়ের যে সিনেমাটি সেখানকার লোকজন নিবিষ্ট চিত্তে দেখবে, আলোড়িত থাকবে বহুদিন, আমেরিকায় সে সিনেমাটিই হয়তো দর্শক ছুঁড়ে ফেলে দিতে পারে। ফ্রান্সে বহু আগে জাম্পকাট রীতিভুত হলেও আমেরিকায় মসৃণ কাটই (Invisible editing) এখনও কাঙ্ক্ষিত এবং আদর্শ।

বাংলাদেশে সিনেমা সেন্স

বাংলাদেশেও সিনেমা সেন্স বদলেছে, তারপরেও মূল ধারার সিনেমায় এখনও কাহিনিতে মেলোড্রামার প্রাধান্য। সরল রৈখিক গল্পের বয়ানে দর্শক-প্রত্যক্ষন অভ্যস্ত। দর্শক চায় জমজমাট গল্প যা তাকে বিনোদিত করবে; গভীর বোধে তাড়িত হতে এখনও আমরা প্রস্তুত নই। ক্লোজআপে লাস্যময়ী নায়িকার নাভিমুল দেখতে পাওয়া, নায়কের সাথে ভিলেনের মারামারিতে ঢিসুম ঢিসুম শব্দ, গলায় ঢোক গেলার মতো সংলাপ প্রক্ষেপণ এবং গল্পের সবকিছু স্পষ্ট বা এক্সপ্লিসিট ভাবে (Explicit) বলে দেয়াতে দর্শক আরাম বোধ করে। অন্তর্নিহিত বা ইমপ্লিসিট (Implicit) অর্থ খোঁজার ক্লেশটুকু দর্শক নিতে চায় না। সিনেমায় থাকতে হবে ইনডোর ও আউডোরের দৃশ্যাবলী। সিনেমার সুরটি এখনও প্রবলভাবে নাটকীয়।

অন্যদিকে, সমান্তরাল বা বিকল্প ধারার সিনেমায় কিছু নিরীক্ষা হলেও মূল ধারার সিনেমা সেন্সটিই এখানে অনুঘটক। এসব সিনেমায় প্রায়ই প্রতীকের ব্যবহার, যা কখনও সিনেমা না হয়ে নাটক হয়ে যায়; যেমন গেরিলা (২০১১)। আমরা স্মরণ করতে পারি আলতাফ মাহমুদকে পাকিস্তানি সৈন্যদের ধরে নিয়ে যাওয়ার দৃশটি, যেসময় ব্যাকগ্রাউন্ড সঙ্গীতে বাজতে থাকে ‘কারার ঐ লৌহকপাট, ভেঙ্গে ফেল, কর রে লোপাট’। সিনেমায় ইশারা মোটা দাগের হলে তা হয়ে যায় নাটক।


অপরিমিতিবোধ যেন আমাদের
নির্মাতাদের সিনেমা
সেন্সের
অঙ্গ

অন্যদিকে এক্সপ্লিসিট বয়ান থেকেও নির্মাতারা বেরিয়ে আসতে পারছেন না। মেঘমল্লার (২০১৫) যুদ্ধের বিভীষিকায় একটি ব্যক্তি ও পরিবারের গল্প, দেখেই বোঝা যায় প্রেক্ষাপট মুক্তিযুদ্ধ। প্রয়োজন ছিল না মুক্তিযোদ্ধাদের নদী পারি দেয়া এবং আরও কিছু দৃশ্যের। অপরিমিতিবোধ যেন আমাদের নির্মাতাদের সিনেমা সেন্সের অঙ্গ।

এ দেশে গল্প বলায় প্রথম ব্যতিক্রম জহির রায়হানেকখনো আসেনি (১৯৬১)। কিন্তু প্রচলিত সিনেমা সেন্সের বাইরে প্রথম বৈপ্লবিক নিরীক্ষা সাদেক খানের নদী ও নারী (১৯৬৫), যেখানে ফ্ল্যাশ-ব্যাকের সাথে গল্প এগোয় ফ্ল্যাশ-ফরওয়ার্ডে, সাথে ব্ল্যাঙ্ক ফ্রেম ও ফ্রিজশট । আমাদের দেশে সিনেমা সেন্স নিয়ে দ্বিতীয় নিরীক্ষণটি করেন আলমগীর কবির সূর্যকন্যায় (১৯৭৬)। এখানে বহিঃবাস্তবের সাথে মনোবাস্তবের মিশেলে একটি বোধকে গড়ন দেয়া হয়। আলমগীর কবির এনিমেশনের আশ্রয় নেন, এবং ব্যবহার করেন নেগেটিভ চিত্র, যা ছিল এদেশের সিনেমা সেন্সের আওতা বহির্ভূত। তিনিই পরবর্তীকালে তাঁর ওঁতর সিনেমা রূপালী সৈকতে (১৯৭৯) সিনেমা ভ্যারিতি স্টাইলে গল্পের ও বোধের বুনোন করে আমাদের সিনেমা সেন্সের দূরবর্তী নিরীক্ষা করেন।

রেহানা মরিয়ম নূর
রেহানা মরিয়ম নূর

রেহানা মরিয়ম নূর

আবদুল্লাহ মোহাম্মদ সাদ বাংলাদেশের সিনেমা সেন্সের একশো আশি ডিগ্রি বিপরীতে নির্মাণ করেছেন রেহানা মরিয়ম নূর। পুরো সিনেমায় রেহানা ছাড়া আর প্রায় সবাই অফ-ফোকাস। মনে হয় পর্দা জুড়ে কুয়াশা, নীলাভ সাদা, তার ভেতর একটি চরিত্র রেহানা, যে সামান্য অন্যায়টুকুও মেনে নিতে রাজি নয়, কারণ প্রশ্রয়ে প্রশ্রয়ে অন্যায় মহীরুহ হয়ে ওঠে।


একটি
ঘোলা পৃথিবীতে
আমরা দোদুল্যমান

যে পৃথিবীতে দাঁড়িয়ে রেহানা লড়ছে, লড়ছে একা, তা ঘোলা এবং দুলছে– প্রায় পুরোটাই হ্যান্ডহেল্ড ক্যামেরায় মিড এবং ক্লোজ শটে চিত্রায়িত হালকা নিল পেলেটে। সাদ অসামান্য মুন্সিয়ানায় একটি পৃথিবীকে দেখিয়েছে যেখানে আমরা ভীষণ পর্যুদস্ত। একটি ঘোলা পৃথিবীতে আমরা দোদুল্যমান। আমরা সুস্থির বা স্থিত হতে পারছি না।

রেহানা একটি ব্যক্তি হলেও আসলে আমাদের হারিয়ে যাওয়া বিবেক এবং তলানিতে পড়ে যাওয়া প্রতিবাদের স্পিরিট। তাই ফুটেজের নব্বুই ভাগই, কিংবা তার চেয়েও বেশি, তাঁকে নিয়ে। বিবেক আমাদের সাথে কথা বলে, আমরা শুনি না, শুনতে চাই না। তাই স্কুলে কথোপকথনে দুই পক্ষের কথা শুনতে পেলেও ফ্রেম জুড়ে আমরা দেখি শুধুই রেহানাকে। এ প্রেক্ষিতে একটি শট খুবই ইঙ্গিতময়, মিডশটে রেহানা স্কুল কর্তৃপক্ষের সাথে জোরালো, এবং অবশ্যই আগ্রাসী স্বরে কথা বলছে। ফ্রেমের ডানদিকে রেহানা, বা দিকটা খালি, বুঝতে পারি ওপাশেই আছে কর্তৃপক্ষ, যা আসলে একটি অদৃশ্য সিস্টেম যেখানে আমরা কাঠামোগত ভাবে শৃঙ্খলিত। সামাজিক সিস্টেম দেখা যায় না, কিন্তু এ সিস্টেমই প্রবলভাবে আমাদের আচরণ ও সিদ্ধান্তকে নিয়ন্ত্রিত করে এবং এভাবেই সিস্টেমের পুনরুৎপাদন করে।

রেহানা মরিয়ম নূর

বিবেক একা হলে কখনও স্পিরিট হয় তীব্রতর, জ্বলজ্বলে এবং দৃশ্যত আগ্রাসী। তাই শুরুর দৃশে রেহানার দরোজায় সজোরে কড়া নাড়া, নকল করায় ছাত্রকে পরীক্ষার হল থকে বের করে দেয়া এবং যৌন অত্যাচারী সিনিয়র অধ্যাপককে বিচারের সম্মুখিন করার জন্য চেষ্টা করে গেলেও ভিক্টিম মেয়েটি সিস্টেমগত কারণে অভিযোগ করতে রাজি না হওয়ায় কৌশলী মিথ্যায় নিজেকেই ভিক্টিম সাজানোয় এবং সর্বোপরি নিজের মেয়ের সাথে ন্যায় প্রতিষ্ঠার অদম্য তাড়নায় রুঢ় ব্যবহার করায় তাকে হিস্টিরিয়াগ্রস্ত মনে হতেই পারে। এ সমাজে অনেক সমস্যার চাপে নারী অবদমিত, তদুপরি বৃহৎ পরিসরের আমাদের সকলেরই আছে সামাজিক ও কাঠামোগত সমস্যা, যেখানে থেকে আমাদের দম বন্ধ হয়ে যায়। তাই আস্বাভাবিক নয় যে সিনেমাটিতে একটিও আউটডোর দৃশ্য নেই–অর্থাৎ আমরা শ্বাস নিতে পারছি না। এ রকম অবস্থায় রেহানার মতো যেকোনো সংবেদনশীল ও নিজের বিবেকে সাড়া দেয়া ব্যক্তি অনেকটা হিস্টিরিয়াগ্রস্তের মতো আচরণ করে, করেই থাকবে।

আমরা রেহানাকে একটি প্রতিবাদি বিবেক হিসেবে দেখতে পাই বলেই তার অতীত জানা অত্যাবশ্যক নয়; যদিও আমাদের সিনেমা সেন্স তা ডিম্যান্ড করে। আমাদের সিনেমা সেন্স বুঝতে দেয় না সে কেন তার মেয়ের সাথে রুঢ় আচরণ করে। আমাদের অনেকেই ডিস্টার্ব বোধ করি ঘরের বাইরের কোনো দৃশ্য না থাকায়। আমরা যা বুঝতে পারি না তাই হচ্ছে এ সিনেমার শক্তি। রেহানা মরিয়ম নূর শুধুই একটি বার্তা দেয় না, আমাদের ভেতর গ্রোথিত করে একটি বোধ যা নিয়ে ঘরে ফিরে এলে আমাদের অনেকেরই বিবমিষা হয় সমাজ ও সিস্টেম নিয়ে যা আমাদের সুবোধকে ভোঁতা করে দিয়েছে।

সিনেমাটি হয়তো শেষ হতে পারতো ছাত্রদের বিক্ষোভের দৃশ্যে নতি স্বীকার না করে রেহানার কলাপ্সেবল গেটে ধাক্কা দেয়ার দৃশ্যে। ইতিমধ্যেই কিন্তু ইমপ্লিসিটলি বলা হয়ে গেছে যা কিছু বলার। প্রয়োজন কি ছিল প্রফেসর ইমতিয়াজের সরি হওয়া দেখানোর? আমার মনে হয় ইমতিয়াজের স্বীকারোক্তি বাড়তি কোনো ভ্যালু তৈরি করে না। কিন্তু দ্বিতীয় ভাবনায় মনে হলো হাসপাতালের চিকিৎসাধীন অবস্থায় ভিজিটরদের সংলাপ একটি অত্যন্ত প্রয়োজনীয় বিষয়কে স্পষ্ট করে। ভিজিটররা যখন নারীবাদ নিয়ে আলাপ করছিল, রেহানা তাতে তো যোগ দেয় না, বরঞ্চ সে তার ভাইয়ের সাথে অন্যান্য আলাপসালাপে তা থেকে নিজেকে বিযুক্ত রাখে। এ বিযুক্ততা রেহানাকে নারীবাদী তকমার বাইরে নিয়ে যায়, আমরা নিশ্চিত হই সাদ কোনো ইজম বা বাদে নারীর মুক্তি এবং সিস্টেম থেকে আমাদের আছান দেখছে না।

রেহানা মরিয়ম নূর
রেহানা মরিয়ম নূর

আমাদের অনেকেই তো অভিজ্ঞতা থেকে জানি, একাডেমিক কচকচানিতে নারীবাদ (Faminism) হয়েছে জটিল এবং সমস্যা থেকে দূরবর্তী, যেমনটি হয়েছে মার্ক্সবাদ। তাই শেষ পর্যন্ত রেহানা মরিয়ম নূর যেমন সামাজিক সিস্টেমের বিরুদ্ধে একটি প্রতিবাদ, ঠিক তেমনি চর্চিত তত্ত্ব ও এক্টিভিজমের অসারত্বকে দেখিয়ে দেয়ার মৃদু ইশারা।

সাদের প্রথম সিনেমা লাইভ ফ্রম ঢাকা (২০১৬) একটি ডার্ক সিনেমা, প্রায় সব ফ্রেমেই প্রটোগনিস্ট, অধিকাংশই ৫০ থেকে ৬০ মিমি. লেন্সে তোলা শট, Film Noir-এর মতো অল্প আলো। ফ্রেমগুলো দেখতে দেখতে ক্লাস্টফোবিয়া বোধ হয়। প্রথম নির্মাণেই সাদ আমাদের প্রচলিত সিনেমা সেন্সের বাইরে গিয়ে বুনেছে দৃশ্য ও শব্দ, সূচনা করেছে নিজস্ব একটি সিনেমা ভাষার। দ্বিতীয় সিনেমা রেহানা মরিয়ম নূর-এ তার ভাষা পেয়েছে পরিপূর্ণতা, আর বাংলাদেশ পেলো একটি সিনেমা যা ইশারা দিয়ে যায় দর্শকের নিজস্ব বোধে ও চেতনপ্রক্রিয়ায় পর্দায় দেখা সিনেমাটিকে বারবার নির্মাণ করার।

এভাবেই হয়তো বদলাবে বাংলাদেশের সিনেমা সেন্স।

Print Friendly, PDF & Email