কাকে বলে সৎ অভিনয়?

268
নাসিরুদ্দিন শাহ
মূল অলংকরণ: সংগৃহীত

লিখেছেন । নাসিরুদ্দিন শাহ
অনুবাদ । আবদুল্লাহ আল দুররানী সনি


‘অভিনয়’ শব্দটির আভিধানিক অর্থ ‘ভান করা’ বা ‘বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করা’ বা ‘ছদ্মবেশ ধরা’ বা ‘আবেগী’ হওয়া নয়; বরং খুব সহজভাবে ‘করতে পারা’। যারা এই বিষয়ে জানেন না (এবং এর মধ্যে আমার দেখা অভিনেতাদের একটি বিস্ময়কর সংখ্যা অন্তর্ভুক্ত), তারা এমন একটি কাজে সততার কথা বলাকে অসঙ্গতিপূর্ণ বলে মনে করবেন– যা স্বাভাবিকভাবেই একটি শিল্পকর্ম হিসাবে বিবেচিত হয়। তবু তারা স্বীকার করবেন, সত্যের অধরা গুণ হলো প্রত্যেক মননশীল অভিনেতার যাত্রার লক্ষ্য এবং অভিনেতার কাছ থেকে এটা তাদের নিজেদের প্রত্যাশা।

অভিনয়ের ক্ষেত্রে সত্যকে কী বলে তা সংজ্ঞায়িত করার চেষ্টা করার আগে, অসৎ অভিনেতার মতো কোনো বিষয় থাকতে পারে কি না, তা ভেবে দেখা দরকার। অভিনেতা যেমন লেখক বা সংগীতশিল্পীর কাজ করতে পারেন না, তেমনি অন্য কেউ তাদের জন্য অভিনয় করতে পারেন না। অভিনেতা যেকোনো সৃজনশীল ব্যক্তির মতোই একে অপরের কাছ থেকে ধারণা অনুকরণ ও চুরি করতে পারেন; কিন্তু যতক্ষণ না তারা তাদের কাজে জীবন থেকে পাওয়া ধারণা ব্যবহার করছেন, এর ফলাফল অনুকরণ বা চুরির কাতারেই থেকে যায়।


চলচ্চিত্রের
চেয়ে নিজেকে
বেশি গুরুত্বপূর্ণ
মনে করা অসাধুতা
না হলেও তা আপত্তিকর
এবং নির্লজ্জের
প্রতীক

তারপরও, এমন কোনো কৌশল নেই যা দিয়ে একজন অভিনেতা প্রবঞ্চনা করতে পারেন এবং একটা খারাপ অভিনয়কে ভালো করতে পারেন– প্রত্যয়হীন চলচ্চিত্র তারকারা প্রায়ই আত্মমগ্নতার আশ্রয় নেন, যারা বিশ্বাস করেন না অন্য সকলের চেয়ে সেরা হতে গেলে তাদের নিজের দক্ষতার প্রমাণ, অভিনয়, সৎ বা অন্য কোনো সংজ্ঞার অন্তর্ভুক্ত হতে হয়। চলচ্চিত্রের চেয়ে নিজেকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে করা অসাধুতা না হলেও তা আপত্তিকর এবং নির্লজ্জের প্রতীক। তারকা এটা করেন; কারণ তিনি স্কুলের বুলিংয়ের মতো এটি করতে পারেন।

জেনেসিস [১৯৮৬]। ফিল্মমেকার: মৃণাল সেন। কাস্ট: ওম প্রকাশ, শাবানা আজমি, নাসিরুদ্দিন শাহ

‘ভালো’ অভিনেতা বনাম ‘খারাপ’ অভিনেতা

অভিনেতাদের জন্য একটি অসৎ কাজ হলো অনিচ্ছার মাধ্যমে তাদের অদম্য সম্ভাবনা পূরণ করতে অস্বীকার করাটা। এই ধরনের অভিনেতারা শেষ পর্যন্ত নিজেদের এবং তাদের উপরে ন্যস্ত কাজেরও ক্ষতি করেন। তবে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছানো উচিত নয় যে, সব অভিনেতা সব দিক দিয়েই সৎ; বরং এটা বলা উচিত, অভিনেতা (তারকার বিপরীতে) বা তিনি যে কাজ করেন না– তা প্রতারণা করেও কোনোভাবেই অর্জন করতে পারবেন না।

সব অভিনেতাকে হয় ‘ভালো’ বা ‘খারাপ; শ্রেণিবিভাগে ফেলে দেওয়া যেকোনো ক্ষেত্রেই অন্যায়; যদিও নিঃসন্দেহে এমন কিছু ব্যক্তি আছেন, যাদের এই পেশায় থাকা কোনোভাবেই উচিত নয় এবং এমনকি তাদের খারাপ বলাও এক ধরনের প্রশংসা করা। তাই তাদের নিয়ে আমাদের নিজেদের চিন্তা করা উচিত নয়। এখানে অলস ও পরিশ্রমী অভিনেতা আছেন, আত্মবিশ্বাসী ও উদ্বিগ্ন অভিনেতা আছেন, স্বার্থপর ও উদার অভিনেতা আছেন, বিনয়ী ও লোক-দেখানো অভিনেতা আছেন, উদ্যমী অভিনেতা ও অনাগ্রহী অভিনেতা আছেন, চতুর অভিনেতা ও প্লডিং অভিনেতা আছেন– ঠিক যেমন বাস্তব জগতের যেকোনো পেশায় এই ধরনের মানুষ আছে।

যে কেউ যেকোনো সময় অনেক কারণে বিচিত্রভাবে বা প্রবলভাবে অসৎ হতে পারেন, এটি কেবল প্রতিভা বা লক্ষ্যের বেলায় নয়। কিন্তু আমাদের কুয়োর ব্যাঙের মতো সিনেমাজগতে একজন অভিনেতার সময়ানুবর্তিতা এবং ইঙ্গিতে কথা বলার ক্ষমতা তাকে ‘ভালো’ হিসেবে যোগ্যতা অর্জনের জন্য যথেষ্ট এবং গ্লিসারিনের সাহায্য ছাড়াই কাঁদতে পারা তাকে ‘মহানের’ দলে ফেলে দেয়; যেন একজন সৎ শিল্পীর অতিমাত্রার গুণাবলী অর্জন ও লালন করা নিজের মধ্যেই একটি সমাপ্তি বা কোনো ধরনের অর্জন।

স্পর্শ [১৯৮০]। ফিল্মমেকার: সাই পরাঞ্জপাই। কাস্ট: শাবানা আজমি, নাসিরুদ্দিন শাহ

‘পণ্য পরিবাহক’

মহান ড. শ্রীরাম লাগুর আত্মজীবনী লামানের (দ্য কেরিয়ার অব গুডস) শিরোনামে একজন অভিনেতার কাজের সবচেয়ে উপযুক্ত এবং সংক্ষিপ্ত যে সংজ্ঞা পেয়েছি, তা হলো, ‘অভিনেতা হলেন সেই দূত, যাকে কোনোকিছু বিকৃত বা ক্ষতি না করে দর্শকদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।’ যদি তিনি সেই শর্ত পূরণ করেন, তবে যে কেউ তার ওপর আরোপিত পদ্ধতি সম্পর্কে বিচার এবং এটিকে সৎ বা অন্যভাবে চিহ্নিত করতে পারেন না ।

যদি পণ্যগুলো নিরাপদে ও পূর্ণাঙ্গভাবে সরবরাহ করা হয়, তাহলে সেগুলো কাঁধে, মাথায় না হাতের বগলে করে বহন করা হলো, তা দেখা অমূলক।


সৎ
অভিনেতা
কি তিনি, যিনি
পুরস্কারের কথা চিন্তা
না করেই স্রোতের বিরুদ্ধে
যান এমন কিছু তৈরির চেষ্টায়,
যেটিকে নিজে গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন?

অভিনয়ে পরোক্ষ ও অধ্যাত্মগত বলে কিছু নেই; এর পুরোটাই কঠোর পরিশ্রম। তাহলে একজন সৎ অভিনেতা কি তিনি, যিনি পুরস্কারের কথা চিন্তা না করেই স্রোতের বিরুদ্ধে যান এমন কিছু তৈরির চেষ্টায়, যেটিকে নিজে গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন? অথবা কর্তব্যপরায়ণ ব্যক্তি– যিনি শর্তসাপেক্ষ অভিব্যক্তি খরচ করেন এবং নিজের সবচেয়ে কমটা দেন? অথবা এমন কেউ যিনি তার বন্দনীয় চটকদার সরঞ্জামগুলোর প্রকাশ্য প্রদর্শন করেন? অথবা যিনি নিজের সৃষ্টির কার্যকারিতা বজায় রেখে তার সৃষ্টির সৌন্দর্য ধারণ করার চেষ্টা করেন? নাকি একজন সৎ শিল্পী, যার কাছে সৃষ্টিই সব?

আমি জানি না এবং নিশ্চিতভাবে কোনো উত্তর পাওয়ার আশাও করতে পারছি না। তাই আমার মতে, অভিনেতাদের দায়িত্ব কী, তা নিয়ে না ভেবে আমি বরং অভিনেতার পক্ষে কী করা সম্ভব আর কী নয়, তা নিয়ে ভাবতে চাই।

নাসিরুদ্দিন শাহ
মান্দি [১৯৮৩]। ফিল্মমেকার: শ্যাম বেনেগাল। কাস্ট: নাসিরুদ্দিন শাহ

একজন অভিনেতা কি কোনো চরিত্রকে আরও ভালোভাবে ফুটিয়ে তুলতে পারেন?

একজন অভিনেতা কেবল তার চিত্তবিনোদনের ক্ষমতা প্রদর্শনের জন্য কাজ করেন কি না, বা তার কাজে আরও বিশেষ কোনো মাত্রা আছে কি না, এবং একজন অভিনেতাকে তার পছন্দ করা কাজের গুণমান থেকে স্বাধীনভাবে মূল্যায়ন করা যায় কি না– এই প্রশ্নগুলোর ভেতরেই উত্তর রয়েছে। কেউ একটি কাজে দুর্দান্ত অভিনয় করে অন্য কাজে বিপর্যয়ে পড়ার কারণটি বেশ সহজ। কারণ, তার ফলাফল মূলত এমন কিছু বিষয়ের ওপর নির্ভরশীল, যার ওপর তার কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। কোনো অভিনেতা তার কাজের চেয়ে বড় হতে পারেন না।

তাহলে সততা মানে কি নিজের ভেতরকার অবস্থা প্রকাশ করা? নাকি সৎভাবে কাজ করার রাস্তা খুঁজে বের করে তা আয়ত্ত করার চেষ্টা করা? সততা সম্পর্কে যেকোনো উপলব্ধি বা একজন ব্যক্তি যে অন্যের ধারণা প্রকাশ করছেন, তা কি কোনোভাবে উদ্দেশ্যমূলক হতে পারে?

অভিনেতার মূল্যায়ন তার কাজ বাছাই এবং নিজ প্রত্যয়ের ওপর নির্ভর করে। কিন্তু প্রসঙ্গটি যদি পশ্চাদগামী ও প্রতিক্রিয়াশীল হয়, তাহলে কি অভিনেতার সততা তার শিল্পের দক্ষতা দিয়ে বিচার করা হয়? অথবা এই ধরনের ধারণার মুখপাত্র হওয়ার ইচ্ছার জন্য?

কর্মা [১৯৮৬]। ফিল্মমেকার: সুভাষ ঘাই। কাস্ট: অনিল কাপুর, নাসিরুদ্দিন শাহ, জ্যাকি শ্রফ

‘আবেগীয় সততা’

কান্না তো হাসি ও হাই তোলার মতোই সংক্রামক, এবং দর্শকরা চোখে যে পানি দেখেন, তা কি আসল নাকি গ্লিসারিনের মাধ্যমে এসেছে, সে বিষয়কে তারা গুরুত্ব দেন না। সুতরাং, অভিনেতার মানসিক সততা বিচার করা সহজ নয়। নকল অশ্রুও একটি আবেগঘন অনুরণন তৈরি করতে পারে। তাই কান্না অকুণ্ঠচিত্ত হলেও তা ভালো অভিনয়ের মানদণ্ড ভাবা ভুল।

প্রায় ৪০ বছর আগে সত্যজিৎ রায় ভাববাদী ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন, ‘আমাদের দর্শকদের আরও বেশি চাহিদাপূর্ণ হওয়া উচিত।’ বেঁচে থাকলে তিনি আজ আমাদের দর্শকদের আরও মূক হওয়া এবং আমাদের মৃতপ্রায় চলচ্চিত্রের অবস্থা নিয়ে সন্তুষ্টি দেখে আরও গভীরভাবে হতাশ হয়ে পড়তেন।

এর জন্য দায়ী নির্ধারিত বিনিয়োগকারীরা, যারা এই সিনেমাগুলো বানান এবং যাদের একমাত্র উদ্দেশ্য (এখন প্রকাশ্যে স্বীকৃতি চলচ্চিত্রের অশ্লীল প্রদর্শন বক্স-অফিস সংগ্রহে শূন্য) হলো দর্শকদের বিভ্রান্ত করা এবং ক্ষমাশীলদের তেলে মাথায় তেল দিয়ে তাদের বিনিয়োগকে এক’শ গুণ বাড়ানো।

জনসাধারণের রুচিকে তাদের নিজেদের স্তরে নামিয়ে আনতে সফল হওয়ার পর যেদিন দর্শকরা বুঝতে পারবেন বারংবার যেই একই ছাইপাঁশ তারা আনন্দের সঙ্গে গিলছেন, তাতে তারা সন্তুষ্ট নন, এবং যখন তারা নতুন ও আসল সিনেমার দাবি তুলবেন, তখন এই ভন্ডরা ক্লিওপেট্রিয়ান সংকটে পড়বে।

যাইহোক, আমি যে সাহস করে বলছি, এটাও ইউটোপিয়ান চিন্তা-ভাবনা!

দ্য ডার্টি পিকচার
দ্য ডার্টি পিকচার [২০১১]। ফিল্মমেকার: মিলান লুথরিয়া। কাস্ট: বিদ্যা বালান, নাসিরুদ্দিন শাহ

  • নাসিরুদ্দিন শাহ। অভিনেতা, ভারত। জন্ম: ২০ জুলাই ১৯৫০। ফিল্ম: ‘গোধূলি’; ‘জুনুন’, ‘স্পর্শ’, ‘আক্রোশ’, ‘চক্র’, ‘সাজায়ে মউত’, ‘বাজার’, ‘প্রতিদান’, ‘অর্ধ সত্য’, ‘মহান যোশী হাজির হো!’, ‘হিরো হিরালাল’, ‘মনসুন ওয়েডিং’, ‘ভ্যালি অব ফ্লাওয়ারস’ প্রভৃতি।
  • সূত্র: স্ক্রল; ওয়েবসাইট, ভারত। ১২ সেপ্টেম্বর ২০২১
Print Friendly, PDF & Email