অ্যা ব্রাইটার সামার ডে: উজ্জ্বলতর অন্ধকারের আখ্যান

350
অ্যা ব্রাইটার সামার ডে

লিখেছেন । জাহিদ হাসান

অ্যা ব্রাইটার সামার ডে
[A Brighter Summer Day]
ফিল্মমেকার: এডওয়ার্ড ইয়াং
স্ক্রিনপ্লে: হাং হাং, লাই মিংতাং, এলেক্স ইয়াং, এডওয়ার্ড ইয়াং
প্রডিউসার: ইউ ও-ইয়েন, চ্যাং হাং, এডওয়ার্ড ইয়াং
কাস্ট [ক্যারেক্টার]: চ্যাং চেন [ঝাও সি’র], লিসা ইয়াং [মিং], ওয়াং মাও [ক্যাট]
রানিং টাইম: ৩ ঘণ্টা ৫৭ মিনিট
ভাষা: মান্দারিন, সাংহাইনিজ, তাইওয়ানিজ
দেশ: তাইওয়ান
রিলিজ: ২৭ জুলাই ১৯৯১


একটি উজ্জ্বলতর গ্রীষ্মের দুপুর!

এক বাবা স্কুলের অফিসে তার ছেলের পরীক্ষার ফল নিয়ে কথা বলতে এসেছে, চীনা সাহিত্যে কম নাম্বার পাওয়াতে তাকে নাইট স্কুলে শিফট করা হচ্ছে। বাবা বলছে তার ছেলে সব বিষয়ে একশ’র কাছাকাছি পেয়েছে, চীনা সাহিত্যে এত কম পাওয়ার কথা না, নিশ্চয়ই কোথাও ভুল হচ্ছে।

অফিসের বাইরেই বসে আছে ছেলেটি। তার নাম ঝাও সি’র। চেহারা কিশোরসুলভ অদ্ভুত সারল্যে মাখানো। আরেকবার চেক করে দেখার অনুরোধ করে সেই উজ্জ্বল খরতপ্ত দুপুরে ঝাও সি’র আর তার বাবা সাইকেল চালিয়ে বাড়িতে ফেরে। রেডিওতে বাজতে থাকে কারা কারা এ বছর স্কুলের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছে। ঠিক এমন একটি খরতপ্ত আবেশ ধরে রেখে শুরু হয় সিনেমা। শুরুতে পটভূমিকায় লেখা ভেসে ওঠে–

‘১৯৪৯ সালে চীনের গৃহযুদ্ধে কমিউনিস্ট পার্টির কাছে ন্যাশনালিস্ট পার্টি পরাজিত হয়ে মূল ভূখণ্ডের লাখো মানুষের সাথে তাইওয়ানে পালিয়ে আসে। সেইসব বাস্তুহারা বাবা মায়ের অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ জীবন তাদের সন্তানের জীবনেও ফেলছিল অস্থিরতার ছাপ। সেই অস্থিরতার মধ্যে নিজেদের আইডেন্টিটি আর নিরাপত্তা খুঁজে নিতে তারা জায়গায় জায়গায় গড়ে তুলছিলো গ্যাং!’

পুরো সিনেমা জুড়ে আছে এই যুদ্ধোত্তর আইডেন্টিটি ক্রাইসিস যা স্পর্শ করেছে চীন থেকে পালিয়ে আসা প্রতিটি পরিবারকে। ঝাও সি’রের পরিবারও এই থাবার নির্মম শিকার। সিনেমায় এই ক্রাইসিস বড় দাগে মূলত দুইভাবে দেখা যায়, ঝাও সি’রের পারিবারিক জীবনে, তার বাবা-মা-ভাই-বোনের ক্লান্তি, অতৃপ্তি আর হতাশায় এবং ঝাও সি’রের সামাজিক জীবনে, তার ব্যক্তিজীবনের ব্যর্থতায়, বন্ধুত্বের বিশ্বাসঘাতকতায়, প্রতিদ্বন্দ্বী গ্যাংগুলোর অমানবিক দ্বন্দ্বে।


আমরা দেখি
নগরজীবনের রূঢ়
বাস্তবতা, টিমটিমে আলোয়
জ্বলতে থাকা জীবনের
আলো-আধাঁরি
গল্পগুলো

দুটি ভাগের মধ্যে যোগসূত্র হলো ঝাও সি’র। তার চোখেই আমরা দেখতে পাই যুদ্ধের পরেও থাকে আরেক যুদ্ধ, যে যুদ্ধ আরও বহু বছর অনবরত চলে যুদ্ধবিধ্বস্ত মানুষগুলোর অন্তর্দ্বন্দ্বে। আমরা ছুঁয়ে দেখি সেই সময়টা যখন সামাজিক অস্থিরতা-অরাজকতা ব্যক্তিজীবনে আঘাত হানে। আমরা দেখি নগরজীবনের রূঢ় বাস্তবতা, টিমটিমে আলোয় জ্বলতে থাকা জীবনের আলো-আধাঁরি গল্পগুলো।

সুদীর্ঘ চার ঘণ্টার এই কাব্য আমাদেরকে বলে সেই সামাজিক অস্থিরতার জালে আটকে পড়া কিশোর ঝাও সি’রের শুদ্ধতা আর সারল্য হারানোর গল্প, দেখায় তার নৈতিকতার স্খলনের পরিস্থিতি!

২.

সিনেমা শুরুর দৃশ্যটি ১৯৫৯ সালের। এরপরের দৃশ্যে আমরা প্রবেশ করি ১৯৬০ সালে। ঝাও সি’র এখন নাইট স্কুলে পড়ে। ধীরে ধীরে বোঝা যায় সে অনেকটাই অন্তর্মুখী চরিত্রের। তার বন্ধু বলতে গেলে মোটে দুজন। তাদের ডাকনাম ক্যাট আর এয়ারপ্লেন। সে আর ক্যাট ক্লাস ফাকিঁ দিয়ে স্কুলের পাশের স্টুডিওতে লুকিয়ে শুটিং দেখে। কিছুক্ষণ পর গার্ডের ধাওয়া খেয়ে পালাতে গেলে কৌশলে গার্ড তাকে ঠিকই ধরে ফেলে, এরপর তাকে একটি ঘরে নিয়ে যায়। ওদিকে সি’রের বন্ধু ক্যাট বাইরে থেকে ঘরের জানালায় পাথর ছুড়ে মারে। গার্ড ক্যাটকে ধরতে গেলে সি’র গার্ডের টর্চলাইট চুরি করে পালিয়ে যায়।

অ্যা ব্রাইটার সামার ডে। ফিল্মমেকার: এডওয়ার্ড ইয়াং

এই টর্চলাইট সিনেমাটির খুব গুরুত্বপূর্ণ মেটাফর। বারবার বিভিন্ন পরিস্থিতিতে সি’রের নানা ব্যবহারে ঘুরে ফিরে আসবে এই টর্চের আলো অথবা অন্ধকার। এরপর দৌড়ে স্কুলে যাবার সময় অন্ধকারে টর্চের আলো ফেলে তারা তাদের স্কুলের একজন ছেলে স্লাইকে একজন মেয়ের সাথে অন্তরঙ্গ অবস্থায় দেখে ফেলে। স্লাইয়ের সাথে কে ছিল তা যদিও স্পষ্ট করে বোঝা যায়নি। ঝাও সি’র ধরে নেয় এই মেয়েটি যেড।

কিছুক্ষণ পরই আমরা তাইওয়ানের কিশোরজগতের অন্ধকার দিকে প্রবেশ করি। ক্ষমতার লোভে এলাকার গ্যাংগুলোর মধ্যে মারামারি। প্রত্যেক গ্যাংই চায় অন্যের ওপর আধিপত্য খাটাতে। এমনই দুটি প্রতিদ্বন্দ্বী গ্যাং হলো ২১৭ ক্লাব এবং পার্ক স্ট্রিট ক্লাব। পার্ক স্ট্রিট ক্লাবের নেতা হানি, যে কি না প্রতিদ্বন্দ্বী ২১৭ ক্লাবের একজনকে খুন করে এখন দক্ষিণ তাইওয়ানে গা ঢাকা দিয়ে আছে। তার অবর্তমানে স্লাই তার জায়গাটা দখলের চেষ্টা করছে। যদিও ক্লাবেরই আরেকজন ছেলে ডয়েসের সাথে এ নিয়ে তার হাড্ডাহাড্ডি লড়াইও চলছে।

তো, সেই রাতে ঝাও সি’র আর তার বন্ধুরা পরীক্ষার পর স্কুলের বাইরে আড্ডা দিচ্ছিল, তখন খবর আসে স্লাইকে ২১৭ ক্লাবের এলাকায় একা পেয়ে আটকে রেখেছে। ঝাও সি’রের কাছ থেকে টর্চটা নিয়ে পার্ক স্ট্রিটের ছেলেরা স্লাইকে সাহায্য করতে যায়। সঙ্গে ঝাও সি’রও যায়। যদিও সে নিরপেক্ষ, কোনো দলেই তার কোনো সক্রিয়তা নেই। সেখানে গিয়ে পার্ক স্ট্রিটের ছেলেরা ২১৭ ক্লাবের ছেলেদের অমানবিকভাবে মারধোর করে। কয়েকজন মিলে ২১৭ ক্লাবের এক কিশোরকে ধরে নিয়ে এলে স্লাই ক্যাটকে ইট দিয়ে বলে ছেলেটির মুখে মারতে। ক্যাট আর সি’র কেউই কাজটি না করলে স্লাই নিজেই ছেলেটিকে আঘাত করে রক্তাক্ত করে ফেলে।


আঁধারের দিকেই যেন সে
ধীরে প্রবেশ করতে
শুরু করেছে

এইসব ভয়াবহ নৃশংসতার ছায়া পরে সি’রের অন্তর্জগতে। সে স্থিরভাবে দাঁড়িয়ে দেখে, এরপর বাড়তে ফেরে। ঘরের আলো সে জ্বালায় আর নেভায়। সি’র বুঝতে পারে তার চোখে কোনো একটা সমস্যা হয়েছে, সে হুট করে ফেলা আলোতে ঘোলা দেখে। আঁধারের দিকেই যেন সে ধীরে প্রবেশ করতে শুরু করেছে।

পরের দিন সকালে আমরা সি’রের পুরো পরিবারকে দেখি। তার একজন বড় ভাই আছে লাও এ’র। তিনটি বোন আছে। দুজন বোন বড়, একজন ছোট। বাবা কোনোমতে একটি সরকারি চাকরির ব্যবস্থা করে বেচেঁ আছে। মা শিক্ষকের চাকরি করতে চায়, যদিও সে তার সব সার্টিফিকেট সাংহাইতে ফেলে এসেছে। প্রতিবেশির কাছ থেকে ধারকর্জ করে দিনপার করছে তারা। এখনও তারা আশায় বুক বেধেঁ আছে সাংহাই ফেরার, স্বপ্ন দেখে কমিউনিস্টদের তাড়িয়ে তারা আবার আগের উজ্জ্বল দিনগুলোতে ফিরবে।

তাইওয়ানের জীবন তাই তাদের কাছে অনিশ্চিত এবং অনেকটা দায়সারা গোছের। কোনোমতে শুধু টিকে থাকতে চায় তারা। এতগুলো সন্তানের খাওয়া পরার ব্যবস্থা করতেই তারা হিমশিম খাচ্ছে, সেখানে আলাদা আলাদাভাবে সন্তানদের দেখাশোনা করা খোঁজ-খবর নেওয়া তাদের পক্ষে হয়ে ওঠে না। সর্বোচ্চ তারা কিছু টুকটাক প্রশ্ন করতে পারে, এর বেশি কে কী করল, কোথায় গেল তা তাদের কাছে অজানাই থাকে।

সি’রের বাবার বন্ধু ওয়াং তাকে প্রোমোশনের লোভ দেখায়, নিয়মকানুন আর মূল্যবোধে আরও শিথিল হতে বলে আর বোঝাতে চেষ্টা করে এই অনিয়ম-দুর্নীতিভরা তাইওয়ানই এখন তাদের ঠিকানা; এটা সাংহাই নয়, তাই সাংহাইয়ের আদর্শ এখানে ধরে রাখলে চলবে না। তবু সি’রের বাবা বুঝে পায় না কী করবে। আদর্শের বাইরে পা রাখার পাত্র সে নয়।

ওদিকে স্লাই জানতে পারে তাকে আর যেডকে দেখে ফেলা নিয়ে সি’র কথা বলছে। সে সি’রকে হুমকি দেয়। সি’রও ভয় না পেয়ে স্লাইকে মারতে এগিয়ে যায়; কিন্তু তাদের সামনে শিক্ষক চলে আসায় ঘটনা আর আগায় না।

সি’র স্কুলের মেডিকেলে চোখের চেক-আপের জন্য গেলে কাকতালীয়ভাবে সেখানে দেখা হয় মিংয়ের সাথে। মিং হলো সেই মেয়ে, যাকে কেন্দ্র করে হানি এক ব্যক্তিকে খুন করে পলাতক। সি’র আর মিং একসাথে ক্লাস ফাঁকি দিয়ে স্টুডিওতে যায়, সেখানে একজন পরিচালক মিংকে দেখে অডিশনের জন্য পরের দিন আসতে বলে। ক্রমে সি’র ও মিংয়ের মাঝে বন্ধুত্ব হয়। যদিও সি’রের মধ্যে সবসময়ই সংকোচ কাজ করে; কারণ মিং তো হানির প্রেমিকা। সি’র কারও সাথে ঝামেলা করতে চায় না।

পরদিন সি’রের ক্লাসে ‘মা’ নামের একজন ছেলে নতুন ভর্তি হয়। ক্যাট চুপিচুপি সি’রকে বলে মা সেই ছেলেটি যে কি না আগের স্কুলে একজনকে মেরে ফেলেছিল। এরপর স্লাই পরীক্ষায় সি’রের খাতা নকল করায় তাদের দুজনকেই অফিসে ডেকে পাঠানো হয়। সি’রকে সে পরীক্ষায় ফেইল করানো হলে তার বাবা স্কুলের অফিসে আসে। এখানে আমরা সি’র এবং তার বাবার মধ্যকার কথাবার্তায় দেখতে পাই তার বাবার মতাদর্শ। অন্যায়কে প্রশ্র‍য় না দেওয়া প্রতিবাদী বলিষ্ঠ এক কণ্ঠস্বর। অন্যায়ের সাথে সে কোনোরকম আপসে না গিয়ে ছেলেকে বরঞ্চ ফেইলই করাবে, তবু মাথা নত করবে না। যদিও বাড়িতে ফিরে সি’রের মায়ের সাথে এ নিয়ে তার কথা কাটাকাটি হয়। মা মনে করে, এই সময় নীতি দেখানোর নয়। এসব নীতি ফলিয়ে এখানে আগে বাড়া সম্ভব না। বাবা-মায়ের এমন মূল্যবোধের দ্বান্দ্বিকতার প্রভাব কি পড়ে সি’রের ওপর? উত্তর মিলবে সিনেমাতেই।

এরপর একসময় দেখা যায় ২১৭ ক্লাবের নেতা শ্যানডং থ্রেড নামে এক দালালের মাধ্যমে স্লাইয়ের সাথে আপসে অডিটোরিয়ামে ব্যবসা করার প্রস্তাব পাঠায়। স্লাইও রাজি হয়ে যায়। এরই মধ্যে সি’র আর মিং যখন এক রেস্টুরেন্টে বসে আইসক্রিম খাচ্ছিল, সেখানে অপ্রত্যাশিতভাবে চলে আসে হানি। সে দক্ষিণ তাইওয়ান থেকে ফিরে এসেছে। সি’রকে অবশ্য সে কিছু বলে না, বরং তাকে সে পছন্দই করে ফেলে। সেখানেই ২১৭ ক্লাবের সাথে মধ্যস্থতা করবে কি না, এ নিয়ে হানির সাথে তার বাকবিতণ্ডা হয়। হানি কোনোরকম আপসে যেতে চায় না। তবে হানি বুঝতে পারে ক্লাব এখন স্লাইয়ের কথায় চলে। হানি কিছু পুরনো বন্ধুর সাথে নতুন লোকদের নিয়ে দল গঠন করে।

অ্যা ব্রাইটার সামার ডে

সে রাতে হানির কাছে সি’রের ভাই লাও এ’র ২১৭ ক্লাবের বিরুদ্ধে বিচার নিয়ে আসে। সে শ্যানডংয়ের পুল ক্লাবে জুয়া খেলে বহু টাকার দেনায় পড়ে গেছে, এখন শ্যানডং টাকার জন্য তার উপর অত্যাচার করা শুরু করেছে। লাও এ’রের সাথে হানির ডেরায় সি’র এবং ক্যাটও আসে। তবে হানি ভাবে সে আবার দক্ষিণে ফিরে যাবে। টাকা আর ক্ষমতার জন্য অন্যদের এমন কাড়াকাড়ি দেখে সে খুব অবাক হয়। তবু সে পরদিন অডিটোরিয়ামের কনসার্টে যায় যেখানে শ্যানডং এবং স্লাই দুই প্রতিদ্বন্দ্বী ক্লাবের দুইজনই ছিল। তারা আপসে পার্টনারশিপে রাজি হয়েছে।

অডিটোরিয়ামের বাইরে কিছুটা হাতাহাতির পর শ্যানডং আর হানি আলাদাভাবে কথা বলতে যায় এবং হানির অসতর্ক মুহূর্তে চলন্ত গাড়ির সামনে হানিকে ধাক্কা দেয়। হানি মারা যায়। রেডিওতে এটা দুর্ঘটনা বলে প্রচার হয়। তবে পার্ক স্ট্রিটের সবাই ঠিকই বুঝতে পারে, এটা ২১৭ ক্লাবের কারও কাজ। এ খবর শুনে মিং কষ্টে ভেঙে পড়ে। সে অসুস্থ হয়ে গেলে স্কুলের ডাক্তারের বাসায় চিকিৎসা নেয়।

এর কিছুদিন পর স্কুলে সির’এর সাথে মিং এর দেখা হয়। মিং বলে হানির মৃত্যু সে এখনো মানতে পারছে না। সি’র তার দিকে ভালোবাসার কোমল হাত বাড়িয়ে দেয়। বলে যে মিংকে একা থাকতে হবে না, সে মিংকে সব যন্ত্রণা থেকে দূরে বুকে আগলে রাখবে। তবু মিং মানে না।

ক্রমে মা’এর সাথে সি’রের বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে। মা সি’র আর ক্যাটকে তার বাসায় নিয়ে যায়। সি’রকে তার সামুরাই তলোয়ার দেখায়, বন্দুক দিয়ে পাখি শিকার করা শেখায়। মা স্লাইয়ের প্রেমিকা যেডের সাথে ফ্লার্ট করতে শুরু করে। সাথে সি’রকেও নিয়ে যায়। মা-এর স্বভাব অনেকটা এমনই, কোনো সম্পর্কেই সে স্থির থাকে না, আজ একজন তো কাল আরেকজন।

এরপরের একটি দৃশ্যে আমরা দেখি, সি’র রাতের আঁধারে কটু কথা বলা প্রতিবেশী আংকেল ফ্যাটকে মারতে যায়। তবে লোকটি মাতাল অবস্থায় রাস্তায় পড়ে গেলে তাকে মারার বদলে উলটো ধরে বাসায় পৌছে দেয় সি’র। আমরা বুঝি, এখনো সি’রের মধ্যে কোমলতা বেঁচে আছে।


মানুষ
মেরে ফেলা
কি এতটাই সহজ,
স্বাভাবিক? অন্ধকারের
জগতে সি’রের এমনই
নিভৃত দ্বন্দ্বময়
পদচারণা

ওদিকে টাইফুন ঝড়ের এক রাতে হানির পুরনো বন্ধুর দলটি শ্যানডংয়ের ডেরায় অতর্কিত আক্রমণ করে এবং তাকে তলোয়ার দিয়ে হত্যা করে। লাও এ’রের সাথে সি’রও সেখানে ছিল। সবাই বেরিয়ে গেলে শ্যানডং যখন মৃত্যু যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছিল, সি’র টর্চ মেরে তাকে দেখে। অন্য নিথর মৃতদেহগুলোকে দেখে। মানুষ মেরে ফেলা কি এতটাই সহজ, স্বাভাবিক? অন্ধকারের জগতে সি’রের এমনই নিভৃত দ্বন্দ্বময় পদচারণা। শ্যানডংকে জিজ্ঞেস করে সে কি আসলেই হানিকে মেরেছে কি না। উত্তরের আগেই শ্যানডংয়ের স্ত্রী চলে এলে অন্ধকারেই সি’র বেরিয়ে যায়। আততায়ীর দলটি এরপর স্লাইকে আক্রমণ করলেও স্লাই পালিয়ে যায়। এই দলটিতে কারা আছে, তাদের উদ্দেশ্য কী– পরিচালক আমাদের স্পষ্ট করে জানান না।

ওদিকে সি’রের বাবাকে গোয়েন্দা ধরে নিয়ে যায় তাইওয়ান থেকে সাংহাই পালিয়ে যাওয়া পুরনো বন্ধুর সূত্র ধরে। দুদিন পর সেখান থেকে ফিরলেও চাকরিতে তার ডিমোশন হয়। পরিবারের কথা ভেবে সে হতাশায় পড়ে যায়। মানসিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে। অনেকটা যেন সমাজের পাপ পঙ্কিলতা কলুষতার সাথে যুঝবার শক্তি হারিয়ে ফেলে।

মিং আর সি’রের মধ্যে সম্পর্ক কিছুটা গাঢ় হয়, যদিও মিংয়ের দিক থেকে সম্পর্ক কতটা বিশ্বস্ত, তা নিয়ে সন্দেহ থেকেই যায়। সি’রও একদিন সন্দেহ করে, মিং বলে সে তো আগে থেকেই এমন। সবাই তাকে চায়। বাস্কেটবল টিমের টাইগার, এমনকি তার স্কুল মেডিকেলের ডাক্তার যুবকটিও। সি’র মেনে নিতে পারে না। পরদিন ডাক্তারের কাছে চোখের চেকআপের জন্য গেলে ডাক্তারের সাথে অসভ্য ব্যবহার করে। আমরা অবাক দৃষ্টিতে আগের ইন্ট্রোভার্ট আর ঝামেলা না চাওয়া কিশোরের পরিবর্তন দেখি, তার বদলে যাওয়ার পরিস্থিতি দেখি।

আবার অফিসে ডাকানো হয় সি’রের বাবাকে। আগের আদর্শবান বাবা এখন মাথা নত করে নেয়। ছাত্রের দোষের দায় যে শিক্ষকের উপরেও বর্তায়, আগের এমন প্রতিবাদী স্বরের পরিবর্তে সে বরং চুপ করে থাকে। সি’রের বাবাকে শিক্ষকেরা অপমান করলে সি’র সেখানের বালব ভাঙচুর করে। তাকে স্কুল থেকে বের করে দেওয়া হয়। এখানেই আমরা কিশোর সি’রের মধ্যে নৃশংসতার বীজ দেখি। আদর্শবান বাবার নতমুখ সি’র নিতে পারেনি, আবার পরিস্থিতির চাপে পড়া বাবাকে সে দোষও দিতে পারেনি। এই দ্বন্দ্বের প্রতিক্রিয়াই তার মধ্যে জন্ম দেয় এক হতাশা আর অসহায়ত্বের। সে ঠিক করে নাইটস্কুল বাদ দিয়ে, মন দিয়ে ডে স্কুলের জন্য পড়াশোনা করবে। মিংয়ের কাছ থেকে সে বিদায় নিয়ে আসে। শেষদেখা হিসেবে সি’র ক্যাট আর মিংকে নিয়ে মা’এর বাসায় নিমন্ত্রণে যায়।

অ্যা ব্রাইটার সামার ডে

তবে সে পড়াশোনার চেষ্টা করলেও পারে না। স্লাই এলাকায় ফিরলে তার কাছ থেকে সে জানে, মা আর মিং একসাথে ঘুরে বেড়াচ্ছে। যেডের কাছ থেকে জানতে পারে টর্চ মেরে স্লাইয়ের সাথে যে মেয়েকে অন্তরঙ্গ অবস্থায় দেখেছিল সে যেড নয়, মিং। সি’র এভাবে বন্ধু আর প্রেমিকার বিশ্বাসঘাতকার শিকার হয়। বাসায়ও সে দেখে তার ভাই ঋণের দায় থেকে বাঁচতে জুয়া খেলে টাকা আনলে তার বাবা তাকে পশুর মতো পেটায়। বাবা কিংবা ভাই কারো দোষই সে খুজে পায় না। কেবল ক্লান্ত চোখে বাইরে থেকে তাকিয়ে থাকে। অস্থির পরিস্থিতি যেন তার গলা চেপে ধরেছে।

সে মা’এর সাথে দেখা করতে গিয়ে শোনে, মিংয়ের মা সে বাসায় দেখাশোনার কাজ নিয়েছে। তাই মিং এখন সেখানেই থাকে। মা এটাও বলে, সে মিংয়ের সাথে শুধু সাময়িক সম্পর্কে আছে। সি’র বুঝে পায় না কী বলবে। সামাজিক বৈষম্য, তার এ গরিব হওয়ার দোষ যেন তাকে তার নৈতিকতাহীন ধনী বন্ধুর কাছে হারিয়ে দেয়।

পরদিন সে মা’কে হুমকি দেয় মিংয়ের কাছ থেকে দূরে থাকার জন্য। মা’ও তাকে পালটা হুমকি দেয়। সি’র তীব্র ক্ষোভে বোধবুদ্ধি হারিয়ে ফেলে। সে ক্যাটের ছুরি চুরি করে মা’কে মারার জন্য রাতের বেলা স্কুলের বাইরে দাড়িয়ে থাকে। মা’এর আগে বেরিয়ে আসে মিং। কিছুক্ষণ পরই মিং সি’রকে ছুরিসহ দেখে বুঝে ফেলে, সে কী করতে এসেছে। সি’র বলে, সব জানার পরেও সে মিংকে ভালোবাসে। সে চায় মিং তার কাছে ফিরে আসুক, শুধু তার হোক। মিং অন্য কারও সাথে থাকলে তার ভালো লাগে না। মিং পালটা জবাব দেয়, সে বদলাবে না; সে সি’রকে অন্যদের চেয়ে আলাদা ভেবেছিল, কিন্তু সি’র আর দশটা সাধারণ ছেলের মতোই।

কথাগুলো যেন বিধঁছিল সি’রের গায়ে। হতভম্ব সি’র অবুঝের মতো আবেগতাড়িত হয়ে মিংয়ের পেটে ছুরি ঢুকিয়ে দেয়। ঘটনার আকস্মিকতায় বুঝতেও পারে না সে কী করেছে। সি’রকে জেলে নিয়ে যাওয়া হয়। সে মিংয়ের নাম ধরে কাদঁতে থাকে। তার ফাসিঁর আদেশ দেওয়া হয়। কিশোর অপরাধী হিসেবে তাইওয়ানের প্রথম ফাসিঁর আদেশপ্রাপ্ত অপরাধী হওয়ায় সারা বিশ্বে আলোড়িত হয় এ ঘটনা। মিডিয়ায় ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার পর পরবর্তীকালে তাকে ১৫ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

সে জেলে যাবার এক বছর পর আবার কোনো এক উজ্জ্বলতর দুপুরে সি’রের মা তাদের জিনিসপত্র পরিষ্কার করছিল, হুট করেই সে খুঁজে পায় সি’রের স্কুলের পোশাক। অমনি ঠিক এক বছর আগেকার দুপুরের মতো নষ্ট রেডিওর একঘেঁয়ে ঘোলা স্বরে বাজতে থাকে কারা কারা সে বছর স্কুলের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছে। মা স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। আমরাও স্থির চোখে চেয়ে থাকি, সময়ের সাথে পরিস্থিতির পরিবর্তন দেখি। চক্রের মতো ঘুরেফিরে তবু তো জীবন এমনি চলতে থাকে অসংখ্য স্মৃতির সাক্ষী হয়ে। স্মৃতির রেশ ধরেই ফিরে ফিরে আসে উজ্জ্বল কিংবা উজ্জ্বলতর দুপুর!

অ্যা ব্রাইটার সামার ডে

৩.

তাইওয়ানের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট এ সিনেমার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। জনজীবনে দুর্নীতি, দুর্বল অর্থনীতি ও ব্যর্থ কূটনীতি বারবার নানাভাবে নানা অনুষঙ্গে উঠে এসেছে। সেইসাথে আছে বেকারত্বের ভয়াবহ সমস্যা যা ওই সময়কার সামাজিক অস্থিরতার অন্যতম প্রধান কারণ।


পরিচালক যথোপযুক্ত সেট
ও আবহের মাধ্যমে ঠিক
সে বিষাদময় সময়ের
অন্ধকারাচ্ছন্ন
ঘুপচিতে
আমাদের
নিয়ে যান অবলীলায়

সিনেমাটির সময়কালে যুক্তরাষ্ট্র তাইওয়ানের মিত্রপক্ষ ছিল এবং চীনের মূল ভূখণ্ড হিসেবে একে স্বীকৃতি দিয়েছিল। সেইসাথে তাইওয়ানকে সহযোগিতা করছিল কমিউনিস্ট চীনের সাথে লড়াইয়ে। এরই ফলাফল হিসেবে আমরা দেখি, তাইওয়ানের নগরজীবনে পাশ্চাত্যের আধুনিকতার ছোঁয়া। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় চরিত্রগুলোর ইংরেজি গানের প্রতি আসক্তি, নাইট ক্লাবগুলোয় তথাকথিত রক এন্ড রোল কালচারের বিস্তার, অডিটোরিয়ামে ক্যাটের গাওয়া গানগুলো আর সে স্টেজের প্রোডাকশন ডিজাইন। প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ্য, এ সিনেমার প্রোডাকশন ডিজাইন আলাদাভাবে প্রশংসার দাবিদার। পরিচালক যথোপযুক্ত সেট ও আবহের মাধ্যমে ঠিক সে বিষাদময় সময়ের অন্ধকারাচ্ছন্ন ঘুপচিতে আমাদের নিয়ে যান অবলীলায়।

অ্যা ব্রাইটার সামার ডে

সেই সাথে আমরা আরও দেখি, পুঁজিবাদের গ্রাস, অর্থের লোভে আদর্শের পতন। পরোক্ষভাবে দেখতে পাই, যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দাদের কার্যক্রম, ব্যক্তিস্বাধীনতায় তাদের হস্তক্ষেপ ও ব্যক্তিজীবনে তার প্রভাব। বাস্তবে স্বয়ং এডওয়ার্ড ইয়াংয়ের বাবাও ছিলেন এই পরিস্থিতির শিকার।

১৮৯৪ সালের প্রথম চীন-জাপান যুদ্ধের সময় হতে ১৯৪৫ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপানের পতনের আগ পর্যন্ত তাইওয়ান জাপানের অধীনে ছিল। তাই স্বাভাবিকভাবেই সেখানকার সংস্কৃতিতে ছিল জাপানিজ ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির স্পর্শ। তাইওয়ানের বাড়িঘরের নির্মাণকৌশল কিংবা সেখানকার মানুষের রুচিবোধে জড়িয়ে আছে জাপানিদের আধিপত্য। কিন্তু ১৯৪৯ সালের পর তাইওয়ানে আগত সাংহাইবাসী এর সাথে দীর্ঘসময় পরেও অভ্যস্ত হয়ে উঠতে পারেনি।

সিনেমার শুরুর দিকে একটি দৃশ্যে দেখা যায়, সি’রের পরিবারের সবাই একসাথে বসে রাতের খাবার খাচ্ছে। তখন প্রতিবেশীর বাসা থেকে ভেসে আসছে জাপানিজ গান। সি’রের মা খুব আক্ষেপের সাথে বলে, যে জাপানের মাধ্যমে তারা এত দীর্ঘ সময় লাঞ্ছিত-অত্যাচারিত-রক্তাক্ত হলো, এখন তাইওয়ানে এসে তারা কি না সেই জাপানিজ আদলে তৈরি বাসাতেই থাকছে; শুনছে জাপানিজ গান।

সিনেমার খুব গুরুত্বপূর্ণ এক চালিকাশক্তি এই দৃশ্যটি। মূলত সি’রের পরিবারের মতো আরও অসংখ্য পরিবার এই সাংস্কৃতিক বৈষম্যের শিকার, এই দ্বান্দ্বিকতাই বারবার ফুটে উঠেছে তাদের আইডেন্টিটি ক্রাইসিসের মধ্যে। তারা খুঁজে ফিরেছে তাদের শিকড়; কিন্তু এই বৈষম্যের কারণেই তারা যেন সময়ের সাথে খাপ খাওয়াতে পারছিল না।

এমনকি তাইওয়ানিজদের যে নিজস্ব স্বাতন্ত্র্যটুকু ছিল, সেখানকার মানুষের ভাষার বৈশিষ্ট্যে এবং তাদের ব্যক্তিত্বে, সাংহাই থেকে আগত চাইনিজরা তার সাথেও মিশতে পারেনি। হানি তাই বরং দক্ষিণ তাইওয়ানে গিয়ে কথা না বলে চুপ করে থাকাটাকেই বেছে নিয়েছিল। তার মতো বহু মানুষের সে অনিশ্চয় জীবন ছিল অভিযোজনের ক্লান্তিতে কিংবা অভিযোজিত হতে না পারার হতাশায় ভারাক্রান্ত।

অ্যা ব্রাইটার সামার ডে

৪.

এই সিনেমাকে বরং মহাকাব্যই বলা যায়, চার ঘণ্টার ব্যাপ্তিতে যা আমাদের দেখায় যুদ্ধবিধ্বস্ত তাইওয়ানে সে সময়কার পরিস্থিতি, নাগরিক মধ্যবিত্ত জীবনের মাত্রাহীন অবসাদ আর তা থেকে উৎড়ানোর তীব্র চেষ্টা। তাদের কামনা-বাসনা-অনুযোগ-অভিযোগের ছোট ছোট মুহূর্ত। যেখানে ক্যাটের গাওয়া এলভিস প্রিসলি’র গানের মতোই অসংখ্য একাকী স্বর ক্রমাগত বাতাসে ভেসে বেড়ায় এক তীব্র তীক্ষ্ণ জিজ্ঞাসা নিয়ে– ‘Are you lonesome, tonight?’

যে সাধারণ জীবন সি’রের প্রাপ্য ছিল, তার বদলে সে যে কেবল সমাজের ফাঁকি আর বঞ্চনার শিকারই হয়ে রইল, সে দায় কার? সি’রের, না সমাজের?সমাজ বলছে পরিস্থিতির কারণে হয়তো সি’রকে দোষ দেওয়া যায় না, তবে যে পাপ সে করেছে তার দায়িত্ব তো সি’রের ঘাড়েই বর্তায়। অর্থাৎ সমাজ নিজে সেই পরিস্থিতি সৃষ্টি করে আবার দায়িত্ব দোষীর ঘাড়ে চাপিয়ে হাত মুছে ফেলল! তাহলে উক্ত পরিস্থিতিতে এই তথাকথিত ‘সমাজে’র দায়িত্ব কী ছিল? তা কি সে সুচারুভাবে পালন করতে পেরেছে? না করলে তার দায়ভার কেন ব্যক্তিবিশেষের উপর পড়বে? এডওয়ার্ড ইয়াং এর একটিরও উত্তর দেননি। তবে এমন বহু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উদয় করেছেন।

সিনেমাটোগ্রাফিতে ইয়াং রেখেছেন স্বতন্ত্রতার ছোঁয়া। পুরো সিনেমাটি তিনি অসংখ্য লং শটের মাধ্যমে আমাদের দেখান। যেন সমাজে ঘটে চলা নানান সঙ্গতি কিংবা অসঙ্গতির গোটা চিত্রটি আমরা ম্যাক্রো পার্সপেকটিভে দেখতে পাই। ক্লোজআপ শট নেই বললেই চলে। ক্যামেরার চলন ধীর এবং সুসংহত। এই পেসিং ধীরে ধীরে আমাদের আরও গভীরে নিয়ে চলে। এই মন্থরতা সিনেমাটির অন্যতম শক্তিশালী দিক। অনেক ফ্রেম ঠিক একই জায়গা একই এঙ্গেল থেকে নেওয়া, যেন আমরা দেখতে পাই চরিত্রগুলোর একঘেঁয়ে জীবনের প্রতিফলন। প্রতিটি চরিত্রের গাথুঁনি, তাদের আলাদা বৈশিষ্ট্য, মানসিকতা, মোটিফ কিংবা কোন পরিবর্তন খুব সুন্দরভাবে যত্নের সাথে দেখানো হয়েছে। মিংকে ভালোবাসার আগের সি’র আর পরের সি’রে তাই বিস্তর ফারাক। বিভিন্ন ঘটনা কীভাবে সি’রকে আন্দোলিত করে আমরা সি’রের সূক্ষ্ম পরিবর্তনগুলোর মাধ্যমে বুঝতে পারি। সি’রের বাবার আদর্শেও আমরা চিড় ধরতে দেখি। প্রথমবার স্কুলের অফিসে আসা বাবার সাথে দ্বিতীয়বারের বাবা অনেক ভিন্ন। বাস্তবতার গ্রাসে প্রতিটি চরিত্র নির্মমভাবে বিপর্যস্ত। সিনেমায় কোনো আবহসংগীত ছিল না যা সিনেমাটিকে আরও জীবন্ত আর বাস্তবঘেষাঁ করে তুলেছে। ইয়াং একদম মেপে মেপে প্রত্যেকটি উপাদানের চূড়ান্ত ব্যবহার করেছেন।

সিনেমায় বিভিন্ন মেটাফরের ব্যবহারও দারুণ। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত টর্চলাইটের জ্বলে ওঠা বা নিভে যাওয়ার এবং নষ্ট রেডিও হুটহাট থেমে যাওয়া বা চলতে শুরু করার ব্যবহার অনন্য। এর সাথে বিভিন্ন ফ্রেমে আলো-আঁধারের খেলা আমাদের বোধের জগতে আলাদা একটা মাত্রা জুড়ে দেয়।

অ্যা ব্রাইটার সামার ডে

এই [উপরের] পোস্টারটি দেখে ব্যক্তিগতভাবে মিংকে আমার মনে হয়েছে সমাজেরই এক বিমূর্ত প্রতীক। আরও ভেঙে বলতে হলে, যে নিষ্ঠুর সামাজিক আগ্রাসন তখনকার মানুষদের কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছিল, মিং ঠিক তারই প্রতিচ্ছবি। অনবরত মিং অভিনয় করে যায়, আমরা কখনোই জানতে পারি না সে কাকে চায়, তবে তার কথায় বুঝতে পারি সে চায় অন্য সবার কামনার মূলে থাকতে। সবাই তাকে চায়, কিন্তু সে নিজের স্বেচ্ছাচারিতায় ব্যস্ত। তার যখন যা প্রয়োজন সে মিটিয়ে নিতে জানে। তাকে কেউ বদলাতে চাইলেও পারে না। হানি চেয়েছিল, একইভাবে সি’রও, কেউই পারেনি।

একটি দৃশ্যে ইয়াং এই ইশারা আমাদের দিয়েছেন। হানি আর সি’র পাশাপাশি বসে কথা বলছিল। হানি সি’রকে তার পড়া একটি বইয়ের কথা বলে। যেখানে অতীতের কোনো এক যুদ্ধে সবাই যখন পালাচ্ছিল, এক পাগলাটে ছেলে সব ভয় তুচ্ছ করে প্রতিবাদে এগিয়ে আসে। সে ব্যর্থ হয় এবং মারা যায়। পর্দায় ফুটে ওঠে মিংয়ের চেহারা। বইয়ের নাম ‘ওয়ার অ্যান্ড পিস’। হানিও তো সব তুচ্ছ করে মিংকে চেয়েছিল, একই ধারায় সি’রও, পরিণতিতে তাদের কী হয়েছে? মিংই কি সমাজের সেই ফাঁদের প্রতিচ্ছবি নয়, যাতে হানি আর সি’র অনিবার্যভাবে আটকে পড়ে?

প্রচ্ছন্নভাবে হলেও ইয়াং কিন্তু দেখিয়েছেন, মিং কীভাবে তার মায়ের এবং নিজের চিকিৎসায় স্কুল মেডিকেলের ডাক্তারকে ব্যবহার করে। ‘ব্যবহার’ শব্দটা বলার অর্থ এজন্য যে, সিনেমায় পরবর্তী একটি মুহূর্তে সে স্পষ্টভাবে প্রকাশ করে, সে অনেক আগে থেকেই বুঝত এই ডাক্তার তাকে কামনা করে। মিং স্বেচ্ছাচারিণী, স্বার্থপর, কপট। সি’র যেন তারই নির্মম শিকার। সে চেয়েছিল তাকে নিজের মতো করে পেতে, অভ্যস্ত হতে, এমনকি তাকে বদলাতে। কোনোটিই সে পারেনি।

অ্যা ব্রাইটার সামার ডে

সমাজও ঠিক একই নিষ্ঠুরতা দেখায় সি’রকে। ঋত্বিক ঘটকের সিনেমায় নারীকে আমরা দেশ হয়ে উঠতে দেখেছি। নারীকে ঋত্বিক জননী এবং দেশ হিসেবে বারবার মূর্ত করেছেন। ইয়াংয়ের মধ্যে আমি এই ছায়াটিকে যেন খুঁজে পেয়েছি, যদিও প্রয়োগের ভঙ্গি একেবারেই আলাদা।

সিনেমাটি সম্পর্কে চমকপ্রদ দুটো তথ্য হচ্ছে, এটি স্বয়ং ইয়াংয়ের স্মৃতির ভিত্তিতে বানানো। তিনি বাস্তবেই কিশোর অপরাধের খুনের ঘটনায় খুব আলোড়িত হয়েছিলেন এবং পরে এই বিষয় ঘিরে সিনেমাটি বানিয়েছেন। দ্বিতীয়ত, সিনেমার নাম আসলে দুটি, একটি চাইনিজ যার ইংরেজি অনুবাদ হচ্ছে– ‘Youngster Homicide Incident at Guling Street’; আরেকটি হলো, উল্লেখিত ইংরেজি নাম, যেটি এলভিস প্রিসলির গান থেকে নেওয়া। অনেক সমালোচকের মতে, দুটি নামের মতো এই সিনেমায় দুটি গল্প আছে: একটি গল্প এক কিশোরের খুনী হয়ে ওঠার; আরেকটি হলো মানবমনের গভীরে থাকা একাকীত্ব, এক কিশোরের নিজের অস্তিত্ব খুজেঁ ফেরার গল্প।

এমন অভিনব পরিচালনার জন্য এডওয়ার্ড ইয়াং বহু সমালোচকের ভুয়সী প্রশংসা পেয়েছেন। তিনি ‘তাইওয়ানিজ নিউ ওয়েভ’ পরিচালকদের একজন। এই সিনেমাটিই ৬৪তম অস্কারে তাইওয়ানের প্রথম সিনেমা হিসেবে এন্ট্রি করে, যদিও নমিনেশন পায়নি। তবে গোল্ডেন হর্স ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল, এশিয়া প্যাসিফিক ফিল্ম ফেস্টিভ্যালসহ নানা ফেস্টিভ্যালে সম্মানজনক পুরস্কারে ভূষিত হয়েছে।

সব পুরস্কারের ঊর্ধ্বে এটি উজ্জ্বল হয়ে থাকবে এক যুদ্ধ বিধ্বস্ত সমাজের বাস্তবতাকে সুক্ষ্মভাবে ফুটিয়ে তোলার কারুকাজে!

Print Friendly, PDF & Email