‘ওয়ানস আপোন অ্যা টাইম ইন আনাতোলিয়া’ নিয়ে নুরির সঙ্গে চকিত আলাপ

90

সাক্ষাৎকার: জোসেফ প্রইমাকিস
অনুবাদ: রুদ্র আরিফ


জোসেফ প্রইমাকিস :: এই সিনেমায় যে রকম গ্রামাঞ্চলের দেখা মেলে, আপনি এমন পরিবেশেই বেড়ে উঠেছেন। এই চিত্রমালা কি আপনার শৈশব স্মৃতির ওপর ভর দিয়ে গড়ে তোলা?

নুরি বিলগে জিলান :: (সিনেমাটিতে দেখা মেলা) এই লোকগুলোকে আমি বেশ ভালোভাবেই চিনি। কেননা, আমার বাবাও ছিলেন তাদেরই একজন। ছোট এক শহরের আমলা ছিলেন তিনি– এই সিনেমার প্রধান দুটি চরিত্রের মতোই অনেকটা; সত্যিকারের এক স্ট্রাগলের জীবন তাদের। তারা সত্যিকার অর্থেই স্থানীয় লোকসমাজ থেকে নিজেদের আলাদা করে রাখেন; কেননা, যেমন ধরুন, আপনি যদি পেশায় বিচারক হন, তাহলে নিজের ভীষণ পরিচিত কারও বিচার আপনার পক্ষে করা সহজ হবে না। তাই এরা নিজ সমমর্যাদার লোকদের মধ্যেই শুধু মেশেন– যেখানে একটি ক্ষমতার লড়াইয়ের আবির্ভাব ঘটে; কেননা, তারা একে অন্যকে সবসময় অপদস্থ করার চেষ্টা করেন।

তবে এটি আমার স্মৃতির ওপর ভিত্তি করে বানানো নয়; বরং তারচেয়েও বেশি কিছু। আমার কো-স্ক্রিপ্টরাইটারও ছিলেন ওই লোকগুলোর একজন। তিনি চিকিৎসক। তুরস্কে (চিকিৎসকের) লাইসেন্স পেতে হলে আপনাকে আনাতোলিয়ার প্রত্যন্ত এলাকাগুলো অন্তত দুই বছর কাজ করে আসতে হবে। সিনেমাটিতে যে শহর দেখানো হয়েছে, তিনি (আমার কো-স্ক্রিনরাইটার) সেখানেই কাজ করতেন; আমাদের কাহিনিতে যা দেখতে পাই, তার অবিকল সেরকম একটি অভিজ্ঞতা হয়েছিল: একটা খুনের ঘটনা ঘটেছিল, এবং মৃতদেহের খোঁজে ঘুরতে ঘুরতে সারাটা রাত কেটে গিয়েছিল তাদের।

ওয়ানস আপোন অ্যা টাইম ইন আনাতোলিয়া। ফিল্মমেকার: নুরি বিলগে জিলান

জোসেফ :: এই সিনেমায় দেখা খুনিটির চেয়ে তিনি কি জায়গাটি আরও ভালোভাবে স্মরণ করতে পেরেছিলেন?

নুরি :: মোটেও না। খুনটা কেন হয়েছিল কিংবা লাশটি কোথায় পুতে রাখা হয়েছিল– সেসব তার মনে নেই; তবে আবহটা মনে ছিল। কারও যা মনে থাকে, ঠিক সেটি (সিনেমার) স্ক্রিপ্টে বেশিরভাগ সময় সাধারণত জায়গা দেওয়া হয় না; এ কারণে স্ক্রিপ্ট লেখার সময় আমরা বহু কিছু পাল্টে নিয়েছি; আর, একবার লেখা হয়ে গেলে, আবারও রি-রাইট করেছি। এমনকি চেখভের বিভিন্ন গল্প থেকে কিছু উদ্ধৃতিও ব্যবহার করেছি।

জোসেফ :: আপনার সিনেমাটিকে ফিল্ম নোয়্যার একটা প্রকরণ বলে মনে হয়, যার মধ্যে আপনি হাস্যরসাত্মক বকবকানির প্রচুর অনুষঙ্গ জুড়ে দিয়েছেন।


জীবন তো ক্ষণে ক্ষণে
খুবই হাস্যকরও
হয়ে ওঠে

নুরি :: এটি ফিল্ম নোয়্যাধর্মী বা এ রকম কিছু কি না– জানি না। আমরা একে স্রেফ যতটা সম্ভব বাস্তবধর্মী করে তুলতে চেয়েছিলাম। এমনকি হাস্যরসাত্মকও করতে চাইনি; কিন্তু বাস্তব জীবন তো ক্ষণে ক্ষণে খুবই হাস্যকরও হয়ে ওঠে।

জোসেফ :: সিনেমাটির স্ট্রাকচারের পাশাপাশি শিরোনামটিও ওয়েস্টার্নের ইশারা দেয়।

নুরি :: শিরোনামটি আসলে বাস্তব ঘটনাটিতে থাকা ড্রাইভারদের একজনের সত্যিকারের উদ্ধৃতি থেকে নেওয়া; যদিও শুনতে সার্জো লিওনির (সিনেমার নামের) মতো লাগছে, তবে এই সিনেমায় তার কোনো রেফারেন্স নেই। এটিকে হয়তো একটি টার্কিশ ওয়েস্টার্ন বলে ডাকা যেতে পারে, কিন্তু সেভাবে আমি ভাবিনি কখনো।

ওয়ানস আপোন অ্যা টাইম ইন আনাতোলিয়া

জোসেফ :: আপনার কেন্দ্রীয় চরিত্রটির একটি ভীষণ সন্দেহজনক সিদ্ধান্তের ভেতর দিয়ে সিনেমাটি শেষ হয়। কেন সে এমনটা করল?

নুরি :: এর অন্তত পাঁচটা কারণ আমার কাছে আছে, কিন্তু আপনাকে বলতে পারব না। সেই কারণ পাঁচটি আমি এখানে [সিনেমাটিতে] খুব সতর্কতার সঙ্গে জুড়ে দিয়েছি; তবে সেগুলো বের করতে হলে আপনাকে [দর্শক] নিজ কল্পনাশক্তির ব্যবহার ঘটাতে হবে। জীবন আসলে এভাবে কাজ করে: আমরা তথ্য পাই, খুঁটিনাটিগুলো জড়ো করি, তারপর সঠিক নিষ্পত্তি আন্দাজ করার জন্য নিজ কল্পনাশক্তির ব্যবহার দরকার পড়ে আমাদের।

জোসেফ :: আপনি বললেন, একটি বাস্তবধর্মী ভঙ্গিমা ধরে রাখার চেষ্টা করেছেন; তবু মৃতদেহটি খোঁজার মাঝখানে ভিকটিমকে খুনিটি জ্যান্ত দেখতে পায়, এবং পরবর্তীকালে ওই ভিকটিমের প্রেতাত্মা শহরজুড়ে ঘুরে বেড়ানোর কথা বলাবলি করে অন্যরা।

নুরি :: খুনি যখন ভিকটিমকে দেখে, সেটি ছিল স্বপ্ন; আর স্বপ্ন তো জীবনেরই একটা অংশ; এগুলো বাস্তবধর্মী অনুষঙ্গই। প্রেতাত্মাটির কথা গ্রামবাসীর বলাবলি করার কারণ, ছোট শহরগুলোতে কোনো খুনের ঘটনা ঘটলে সবসময় এ ধরনের আলাপই চলতে থাকে; এটিও বাস্তবতার অংশ, যদি তা স্রেফ ছোট শহরের বাস্তবতার হয়ে থাকে, তবু। রহস্যময় আইডিয়া তাদের প্রিয়; এ নিয়ে তারা নিরন্তর বকবক করতে পারে। এ বিষয়টির ওপর আমি আসলে প্রচুর দৃশ্যের শুট করেছিলাম; কিন্তু তাতে সিনেমাটি বাড়াবাড়ি রকমের বড় হয়ে যাচ্ছিল।

ওয়ানস আপোন অ্যা টাইম ইন আনাতোলিয়া

জোসেফ প্রইমাকিস :: সিনেমাটি সংলাপে ঠাসা; বেশিরভাগই ছোট ছোট সংলাপ। তাই এই লোকগুলো কী বলছে, সেদিকে আপনি বেশ গভীরভাবে খেয়াল রেখেছেন।

নুরি বিলগে জিলান :: হ্যাঁ, ছোট শহরের লোকেরা আমার কাছে একেবারেই আলাদা ধরনের মানুষ। তারা আপনাকে জীবনের একটি আলাদা অংশ দেখাবে; তাদের কাছ থেকে বহু জিনিস শিখতে পারবেন। আপনি যদি শুধু শহরেই বাস করেন, তাহলে, আমার ধারণা, জীবনের কিছু একটা খুইয়ে ফেলছেন।


সূত্র: সিনেইউরোপা। অনলাইন ফিল্ম জার্নাল; ৩১ মে ২০১১

Print Friendly, PDF & Email
সম্পাদক : ফিল্মফ্রি । ঢাকা, বাংলাদেশ।। সিনেমার বই [সম্পাদনা/অনুবাদ] : ফিল্মমেকারের ভাষা [৪ খণ্ড : ইরান, লাতিন, আফ্রিকা, কোরিয়া]; ফ্রাঁসোয়া ত্রুফো : প্রেম ও দেহগ্রস্ত ফিল্মমেকার; তারকোভস্কির ডায়েরি; স্মৃতির তারকোভস্কি; হিচকক-ত্রুফো কথোপকথন; কুরোসাওয়ার আত্মজীবনী; আন্তোনিওনির সিনে-জগত; কিয়ারোস্তামির সিনে-রাস্তা; সিনেঅলা [৩ খণ্ড]; বার্গম্যান/বারিমন; ডেভিড লিঞ্চের নোটবুক; ফেদেরিকো ফেল্লিনি; সাক্ষাৎ ফিল্মমেকার ফেদেরিকো ফেল্লিনি; সাক্ষাৎ ফিল্মমেকার ক্রিস্তফ কিয়েস্লোফস্কি; সাক্ষাৎ ফিল্মমেকার চান্তাল আকেরমান ।। কবিতার বই : ওপেন এয়ার কনসার্টের কবিতা; র‍্যাম্পমডেলের বাথটাবে অন্ধ কচ্ছপ; হাড়ের গ্যারেজ; মেনিকিনের লাল ইতিহাস ।। মিউজিকের বই [অনুবাদ] : আমার জন লেনন [মূল : সিনথিয়া লেনন]