স্বপ্ন, সময় ও সিনেমা

159
বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত

লিখেছেন । বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত

গ্রন্থসূত্র: স্বপ্ন, সময় ও সিনেমা/ বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত
[প্রথম প্রকাশ: ১৯৯৩/৯৪
প্রথম পরম্পরা সংস্করণ: জানুয়ারি ২০১৫
(পরম্পরা প্রকাশন, ২০এ বেনিয়াটোলা লেন, কলকাতা, ভারত)
পৃষ্ঠাসংখ্যা: ১৩৪
মূল্য: ২০০ টাকা (রুপি)]


কবিতা লেখার জন্য কবিত্বশক্তি ছাড়া আর যা যা দরকার তা হলো সাদা পাতা, পেন ও লিটল ম্যাগাজিন; ছবি আঁকার জন্যও ওই, মানে সাদা পাতা, রং তুলি ব্রাশ বা হাতের আঙুল ইত্যাদি; যন্ত্রবাদক বা গায়কের জন্য লাগে তবলচি এবং কিছু শ্রোতা; তবলচির লাগে ছোটো মাপের হাতুড়ি, পাউডার।

খুব সহজ মনে হলেও এসব কিছুই তেমন সহজসাধ্য নয়। এ সবকিছুর পেছনেই কষ্ট আছে, দুঃখ আছে, মন খারাপ আছে, দাঁত কিড়মিড় করা আছে, রাগে গরগর করে ওঠা আছে। তবু একদিন কবির কবিতার বই বের হয়, ছবি প্রদর্শনীর জন্য একটা ব্যবস্থা হয়ে যায়, গ্রামোফোনের ডিস্কে সত্যি সত্যি ঘুরে যায় যন্ত্রবাদক বা গায়কের রেকর্ড, আর তবলচি একদিন দেখতে পান সমস্ত আসর জুড়ে তাঁর, শুধুমাত্র তাঁরই অনুষ্ঠান। হাসি ফুটে ওঠে সবার মুখে।

কিন্তু ফিল্ম ভালোবেসে এবং ফিল্ম করতে চেয়ে একজনকে যা করতে হয়, তা হলো তপ্ত কয়লা থেকে তাতানো তাওয়ায় লাফালাফি করা। মাঝে মাঝে তার মনে হয়, ফিল্মে পাওয়ার চাইতে ভূত বা জিনে পাওয়া ঢের সুখের। কেননা জায়গা কলকাতা এবং সে যা করতে চায় তা হলো নিজের ভাবনা-বিশ্বাসকে আঁকড়ে ধরে থেকে সম্মানজনক শর্তে একটি সুস্থ ছবি।

ছোটোবেলায় আমরা থাকতাম ছোট্ট একটা মফস্বল শহরে। বাবা ছিলেন ডাক্তার, খসখস করে প্রেসক্রিপশন লিখতেন, আর মা বুনতেন লাল ও হলদে সুতোর বাঘ, হরিণ; শীতকালে দ্রুত নড়ে যেত তাঁর হাতের আঙুল ও কাঁটা, আর উলের বল গড়িয়ে যেত এক ঘর থেকে আরেক ঘরে। স্কুলে এক-একদিন টিফিনের পর ছুটি হয়ে যেত, একটা বড়ো হলঘর ছিল, হলঘরে মস্ত বড়ো একটা টেবিল ছিল, টেবিলের ওপর দুদিক ফুটো টিনের একটা গোল কৌটোর ভেতর থেকে একদিন ম্যাজিশিয়ান নানান রঙের রুমাল, পায়রা, বিস্কুট বের করে দেখাতেন আমাদের। আমরা দেখতাম সার্কাস, রেবা রক্ষিতের বুকের ওপর হাতি, পুজোর সময় যাত্রা।

চরাচর । ফিল্মমেকার: বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত

সিনেমা দেখেছিলাম প্রথম ভগবান শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য, তারপর একটা পুরানো বড়ুয়াসাহেব, মানে, প্রমথেশ বড়ুয়ার ছবি। মনে আছে সেদিন সারা দুপুর আমাদের মা বসেছিলেন আয়নার সামনে, ফিরে আসার পথে মন ভারী হয়েছিল তাঁর, কেননা কথা কাটাকাটি হয়েছিল ওই ছবির ভালোমন্দ নিয়ে বাবার সঙ্গে। এমনই জনপ্রিয় ছিলেন প্রমথেশ বড়ুয়া এবং তাঁর ছবিগুলি।

বহু পরে প্রমথেশ বড়ুয়ার কয়েকটি ছবি দেখে আমি স্তম্ভিত হয়েছিলাম। চলচ্চিত্র যে একটি অসম্ভব ক্ষমতাবান শিল্প তা ভুলিয়ে দেবার জন্য তাঁর ছবি দেখার অভিজ্ঞতাই যথেষ্ট। তাঁর চলচ্চিত্রে আসার আগেই বিদেশে আইজেনস্টাইন, পুদভকিন, গ্রিফিথের যুগ প্রায় শেষ হতে চলেছে, তোলা হয়ে গেছে সেই বিখ্যাত নির্বাক ছবিটি– কার্ল ড্রেয়ারের দ্য প্যাশন অফ দ্য জোয়ান অফ আর্ক,– প্রমথেশ বড়ুয়ার খ্যাতির প্রথম অধ্যায়েই প্রায় তরুণ অরসন ওয়েলস ১৯৪১ সালে শেষে করেছেন সিটিজেন কেন যা সম্ভবত আজ পর্যন্ত তোলা আমেরিকার শ্রেষ্ঠতম ছবি, ফ্রান্সে অঁদ্রে বাজাঁ তাঁর পৃথিবীখ্যাত হোয়াট ইজ সিনেমা গ্রন্থের প্রবন্ধগুলি লিখতে শুরু করেছেন এবং প্রমথেশ বড়ুয়ার মৃত্যুর সামান্য কিছু আগে বা পরে ডানিয়েল ভালক্রজ ও লো দুকার সঙ্গে কাইয়ে দ্যু সিনেমা নামে বিখ্যাত ফিল্মের জার্নালটি প্রকাশিত করতে শুরু করে দিয়েছেন ১৯৫১ সালে, যে জার্নালটিকে ঘিরে কয়েক বছর পরে জড়ো হতে শুরু করেছিলেন ফ্রাঁসোয়া ত্রুফো, জাঁ লুক গদার, ক্লদ শ্যাব্রল, জাক্ রিভেতের মতো ক্ষমতাবান চলচ্চিত্রকারেরা।


পরদার
ডান দিক,
বাঁ দিক, ওপর
ও নীচ থেকে উঁকি
মারছে বারবার অশিক্ষিতের
দাঁত বের করা
হাসি

প্রমথের বড়ুয়া বাংলা চলচ্চিত্রে সত্যি সাহেবের মতো রাজত্ব করে গেছেন, প্রভাবিত করেছেন এ মাধ্যমটিকে। এবং এটা অস্বীকার করে লাভ নেই যে সেটা দুর্ভাগ্যেরই হয়েছে বাংলা চলচ্চিত্রের পক্ষে। তাই ১৯৫৫ সাল থেকে ১৯৬০-৬১’র মধ্যে পথের পাঁচালী, অপরাজিত, বাইশে শ্রাবণ, অন্তরীক্ষর মতো ছবি হয়ে যাবার পরেও আজ বাংলা ছবি জুড়ে প্রতাপের সঙ্গে রাজত্ব করে চলেছে প্রাক যুদ্ধের ভাবনা-চিন্তা, আঙ্গিক, অভিনয়। পরদার ডান দিক, বাঁ দিক, ওপর ও নীচ থেকে উঁকি মারছে বারবার অশিক্ষিতের দাঁত বের করা হাসি। সেই হাসি আজ আর হাততালি পায় না, পয়সা পায় না সব সময়; তবু হাসি থামেনি, আশায়-আশায় আশায়-আশায় হেসে চলেছে।

বেশ কয়েক বছর আগে যখন আমি এই শিল্প-মাধ্যমটির সঙ্গে ওতপ্রোত এক ভালোবাসায় জড়িয়ে গেছি, নিজের ছবি করার কথা মাথার মধ্যে ঘুনপোকার মতো নড়াচড়া করতে শুরু করেছে, তখন প্রায়ই একটা কানাঘুষো শুনতাম, বাংলা চলচ্চিত্র আন্দোলন শুরু হয়েছে। আমি এবং আমার মতো আরও অনেকেই বিশ্বাস করেছিলাম এইসব। কলেজ, ইউনিভার্সিটির ক্লাস ফেলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ছবি দেখা, বই কেনা এবং ফিল্ম সংক্রান্ত নানান আলোচনা শুনে থমথমে মুখ করে বাড়ি ফিরতাম। ভাবতাম গোটা ব্যাপারটা দ্রুত একদিন আমাদের হাতে তুলে দেওয়া হবে, উপহার হিসেবে!

বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত
বাঘ বাহাদুর । ফিল্মমেকার: বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত

হায়, শীঘ্রই রঙিন চশমা খুলে ফেলতে হলো। কিন্তু ততদিনে অনেক দেরি হয়ে গেছে। আসলে সামাজিক, রাজনৈতিক বা সাংস্কৃতিক যাই হোক না কেন, কোনো আন্দোলনই একা তার পারিপার্শ্বিককে বাদ দিয়ে বা দু-তিনজন ব্যক্তিকে ঘিরে গড়ে ওঠে না।

কেননা গোটা ব্যবস্থার কান ধরে নাড়া দেবার মতো ক্ষমতা শুধুমাত্র দু-তিন জোড়া হাতের থাকে না, থাকার কথাও নয়। এ অনেকটা শান্ত, স্থির জলে বড়ো পাটকেল ছোড়ার মতো, যার ঢেউ বৃত্তাকারে ছড়িয়ে পড়ে অনেক দূর পর্যন্ত। সত্যজিৎ রায়ের ছবিগুলি বিদেশে মুহুর্মুহু করতালি পেয়েছে, ভারতীয় ছবি বলতেই তাঁর ছবিই বুঝিয়েছে, কাগজে তাঁর পুরস্কার পাওয়ার ছবি দেখে আমরা আরও সুখী এবং আরও তৃপ্ত হয়েছি; কলকাতা ৭১-এর পর মৃণাল সেন নতুনভাবে আবিষ্কৃত হয়েছেন, তাঁর শেষ ছবি তেলুগু ভাষায় ওকা উরি কথা অনেককেই বিস্মিত করেছে, তবু আবার কবে তাঁর বাংলা ভাষায় ছবি তোলা সম্ভব হবে আমরা জানি না; ঋত্বিক ঘটক শেষবারের মতো উইংসের ভেতর ঢুকে পড়বার আগে পর্যন্ত তাঁর ছবিগুলোতে বারবার ঝলসে উঠেছেন অমানুষিক দক্ষতায়। রাজেন তরফদার ছবি করছেন না বহুদিন, শতরঞ্জ কে খিলাড়ির পরও সত্যজিৎ রায়কে জয় বাবা ফেলুনাথ করতে হচ্ছে। প্রতিশ্রুতিবান পূর্ণেন্দু পত্রী বেশ কিছুকাল বসে থাকবার পর অত্যন্ত ভয়ে ভয়ে আরম্ভ করেছেন রবীন্দ্রনাথের মালঞ্চ। বাকি সমস্ত কিছু জুড়ে অন্ধকার, আর সেই অন্ধকারের ভেতর ঘুরে চলা ফিল্মের রিলের সাউন্ড ট্রাক থেকে খোনা গলায় মাঝে মাঝেই চিৎকার শোনা যাচ্ছে– ‘আন্দোলন না ঘেঁচু, আন্দোলন না ঘেঁচু।’ মুখ থুবড়ে থেঁতলে পড়ে আছে অনেকের প্যারালাল ফিল্ম মুভমেন্টের স্বপ্ন।


কোন
আন্দোলন
কতটা খাঁটি বা কতটা
ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়তে
পারে সেটা বোঝা যায় সেই আন্দোলন
আমাদের সমাজজীবনের মূল
শিকড় থেকে জন্ম নিয়েছে
কি না বা বাইরের
কোনো
আন্দোলন
থেকে শৌখিনভাবে
প্রভাবিত হয়ে গড়ে উঠেছে
কি না তার
ওপর

কোন আন্দোলন কতটা খাঁটি বা কতটা ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়তে পারে সেটা বোঝা যায় সেই আন্দোলন আমাদের সমাজজীবনের মূল শিকড় থেকে জন্ম নিয়েছে কি না বা বাইরের কোনো আন্দোলন থেকে শৌখিনভাবে প্রভাবিত হয়ে গড়ে উঠেছে কি না তার ওপর। প্রসঙ্গত লাতিন আমেরিকান দেশগুলিতে যথার্থভাবেই চলচ্চিত্র আন্দোলন শুরু হয়েছে, তার কারণ সেখানে বিদেশের বিভিন্ন চলচ্চিত্র আন্দোলনকে ওদেশের চিত্রপরিচালকেরা নিজেদের সামাজিক-রাজনৈতিক সমস্যাগুলিকে তুলে ধরার জন্য যতটা কাজে লাগানো যায় ততটাই কাজে লাগিয়েছিলেন। কিন্তু আমাদের এখানে যা হয়েছে তা হলো তখনকার হলিউডের ধ্যানধারণার বাইরে নিউ ওয়েভ বা নিও-রিয়ালিজম প্রভৃতি নানা মুভমেন্টগুলো যে শিক্ষিত ও শহুরে মধ্যবিত্ত বুদ্ধিজীবীদের নাড়া দিচ্ছিল, তাঁরা অনেকটাই মাটির সঙ্গে সম্পর্ক শূন্য ছিলেন যে কারণে তাঁদের কাছে বিদেশের চলচ্চিত্র সম্পর্কিত পরীক্ষা-নিরীক্ষাগুলো শুধুমাত্র শৌখিন আন্দোলনের ব্যাপার হয়ে দাঁড়াল প্রথম থেকে।

এর মানে আদৌ এই নয় যে এঁদের কারও কারও মধ্যে এক ধরনের সমাজ চেতনা বা এক ধরনের সমাজ সম্পর্কিত ভাবনা-চিন্তা ছিল না, কিন্তু সেসবের পরিপূরক হিসেবে চলচ্চিত্র আন্দোলনকে তাঁরা কখনোই দেখেননি। এ দেশের বুদ্ধিজীবীদের একটি অদ্ভুত চরিত্র আছে, তা হলো সামাজিক সমস্যাগুলো নিয়ে তাঁরা ভাবেন একরকমভাবে, কিন্তু শিল্প-সংস্কৃতির ক্ষেত্রে তাঁরা অদ্ভুত এক বিশুদ্ধতাবাদী চিন্তা-ভাবনায় ভোগেন। ফলে, শিল্প-সাহিত্য সংস্কৃতির উপজীব্য হিসেবে সামাজিক-রাজনৈতিক ভাবনাকে অনেক ক্ষেত্রেই তাঁরা গ্রহণ করেন না।

বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত
তাহাদের কথা। ফিল্মমেকার: বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত

ওই মানসিকতার কারণ দেখতে গেলে ঘাড় ফিরিয়ে দেখতে হয় অনেক দূর। প্রাগৈতিহাসিক মানুষ তার চিত্রাঙ্কন, ভাস্কর্যকে কখনোই শিল্পকর্ম হিসেবে আলাদা কোনো কাজ বলে মনে করেনি। গুহার গায়ে বাইসন বা বলগা হরিণ এঁকে সে ভেবেছে গভীর বনের ভেতর ঘুরে বেড়ানো বাইসন বা হরিণের কথা, যাকে সে পাথরের বর্শায় বিদ্ধ করে শিকার করবে তার ক্ষুধার জন্য। তার অনেক অনেক হাজার বছর পরে প্রাকৃতিক সম্পদ যখন অসম বণ্টনের ভেতর দিয়ে এগোতে শুরু করল এবং তা কুক্ষিগত হতে থাকল অল্প কিছু মানুষের হাতে, তারা আস্তে আস্তে মালিকানা গ্রহণ করতে শুরু করল সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলের। ভাষা, সংগীত, চিত্রকর্ম সবই তারা ধনের বিনিময়ে ক্রয় করতে শুরু করল এবং এগুলিকে ব্যবহৃত হতে দিতে শুরু করল তাদেরই স্বার্থে।

তারও অনেক হাজার বছর পরে এলো শিল্প-বিপ্লব, শুরু হয়ে গেল নতুন, ঝকমকে ও চমৎকার ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থা। রাজা-মহারাজার বদলে এলো অন্য আর একদল সামান্য কিছু মানুষ যারা সম্পদ সংগ্রহের ব্যবস্থাকে পুরো ঢেলে সাজাল। সম্পদহীন সাধারণ মানুষের কাঁধে শ্রমের জোয়াল চাপিয়ে সেই সামান্য সংখ্যক মানুষেরা তাদের সম্পদের পরিমাণ বাড়ানোর চিরস্থায়ী ব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য সুন্দরভাবে বলতে শুরু করল, শিল্প শুধুমাত্র শিল্পের জন্যই। কেননা, তারা বুঝছিল মানুষ বড়ো দ্রুত নতজানু হয়ে বসে যাবতীয় শিল্প-সংস্কৃতির সৃষ্টির কাছে। সুতরাং শিল্প যদি জীবনের কথা বলে, চারপাশের কথা বলে, তবে অগণন মানুষ একদিন বুঝতে পারবে তাদের অবস্থা, বুঝতে পারবে যে, যে সম্পদে ছিল সবার অংশ, তা কী করে চলে গেল গুটিকয় মানুষের হাতে।


আমাদের
বোঝানো হলো
কবিতা কবিতার জন্য,
মেয়েমানুষ পুরুষমানুষের
জন্য, সিনেমা সিনেমার জন্য,
বেঁচে থাকা আসলে চোখ
খুলে ও চোখ বন্ধ করে
ঘুমিয়ে থাকার
জন্য

এই ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থারই সবচেয়ে নবজাত ‘মেকানিক্যাল রিপ্রোডাকশন অব আর্ট’ হলো চলচ্চিত্র মাধ্যমটি। যা সবচেয়ে বেশি দেখে এবং দেখাতে পারে। তাই প্রথম থেকেই তাকে ভুলভাবে ব্যবহার করা এবং করতে দেওয়া হলো। এক মিথ্যার সুন্দর মোড়কে মুড়ে এই মাধ্যমটিকে কাজে লাগানো হলো অর্থ আত্মসাতের নতুন একটি যন্ত্র হিসেবে। আমাদের মতো অর্থনৈতিকভাবে অনুন্নত দেশগুলিতে ওই ব্যবস্থা তার নতুন বাজার তৈরি করার ফাঁকে ফাঁকে বিপজ্জনকভাবে নিয়ে এসেছিল অনেক কিছুই, একদিন নিয়ে এলো এই মোহিনী মাধ্যমটিকে, উপভোগ করতে বলা হলো আমাদের। কমার্শিয়াল সাহিত্যের পাশাপাশি, তাল রেখে শুরু হলো কমার্শিয়াল সিনেমার যুগ। আমাদের বোঝানো হলো কবিতা কবিতার জন্য, মেয়েমানুষ পুরুষমানুষের জন্য, সিনেমা সিনেমার জন্য, বেঁচে থাকা আসলে চোখ খুলে ও চোখ বন্ধ করে ঘুমিয়ে থাকার জন্য।

ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থা তার নিজের স্বার্থেই শিল্পকে বিশুদ্ধ ভাবনার বিষয় বলে ঢাক পেটায়। মাঝে মাঝে আমাদের কান কতটা তৈরি হয়েছে তা বোঝার জন্য কাঠি তুলে দেওয়া হয় আমাদের হাতে, আমরাও বাজাই ওইভাবেই। বুঝতে চাই না একটি দেশের সামাজিক-অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক বিষয়গুলিকে বাদ দিয়ে শিল্প-সংস্কৃতি চর্চার অর্থ হলো বাবুরাম সাপুড়ের কাছ থেকে সেই জ্যান্ত সাপ চাওয়া, যে নড়ে না চড়ে না, কাউকে কাটে না। অর্থাৎ কোনো কাজে লাগে না।

আজ অনেক দিন হলো চলচ্চিত্র আন্দোলন নামে যে বায়ু এক বিশাল বেলুনে ফুঁ দিয়ে ঢোকানো হয়েছিল, এখানকার প্রযোজক-পরিবেশক ও প্রদর্শককূল বহু আগেই তাতে ছোট্ট আলপিন ফুটিয়ে দিয়েছে। দর্শক, সরকার ও তার ব্যবস্থা যা দাঁড়িয়ে থাকে কচ্ছপের পিঠে, তা দেখেছে এবং অপরিণত বালকের স্বরে কেঁদে শেষ করেছে দায়িত্ব। আর এসবেরই মাঝখানে এই মাধ্যমটিকে নিয়ে নাড়াচাড়া করার যোগ্যতা যাদের সবচেয়ে কম, তারা ভিড় করে এসেছে ভাঁড়দের মতো, নকল গোঁফ নেড়ে আমাদের বুঝিয়েছে তারা কী দায়িত্ববান। এসবের বিরুদ্ধে যে সংঘবদ্ধ প্রতিরোধ দরকার ছিল তার কথা মনে পড়েনি অনেকেরই, বা পড়লেও দার্শনিকসুলভ মানসিকতা নিয়ে দূরে দাঁড়িয়ে থেকেছেন।

ভূপতির হাত চারুলতার হাতের দিকে এগোতে গিয়ে স্থির হয়ে যায়, পরদা জুড়ে আমরা দেখতে পাই দুটি স্থির হাতের দৃশ্য। আমাদের অভিভূত হওয়া বাড়ে। ব্যস। এ দেশে ফিল্ম সোসাইটি আন্দোলনও শুধুমাত্র বিদেশি ছবি দেখিয়েই শেষ হয়েছে। কিন্তু কোথাও এই গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যমটিকে নিয়ে যত অল্প পরিসরেই হোক, আমাদের একান্ত দেশজ ভাবনা-চিন্তা-সংস্কার ও তার সংকট এবং সম্ভাব্য সমাধানকে এই মাধ্যমটির সাহায্যে তুলে ধরার কোনো চেষ্টা কিন্তু তেমন ছিল না। অথচ লাতিন আমেরিকায় যে বুদ্ধিজীবীরা তাদের চলচ্চিত্র আন্দোলনের সামিল হলেন, তাঁরা নিজেদের দেশের সামাজিক-রাজনৈতিক আন্দোলনগুলোর সঙ্গেও ঘনিষ্ঠ ছিলেন।

আনোয়ার কা আজব কিসসা । ফিল্মমেকার: বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত

আমাদের দেশে ভালো চলচ্চিত্রের দর্শক তৈরি হয়েছেন, সুস্থ ছবি তৈরির প্রবণতাও দেখা গেছে কখনো-কখনো, কিন্তু তা অসুস্থ চলচ্চিত্রের সঙ্গে সামান্যতম প্রতিদ্বন্দ্বিতায়ও দাঁড়াতে পারেনি। ফলে আজ আমাদের পায়ের তলায় তৈরি হয়েছে দিগন্ত বিস্তৃত এক ফাঁপা ও বিপজ্জনক জমি। শহর, মফস্বল, গ্রামগঞ্জে অসুস্থ চলচ্চিত্রকে পৌঁছে দেবার আখড়ার সংখ্যা ক্রমশই বেড়েছে। গ্রামের কিশোর রাখালটিও আজ বিশ্বস্ত হতে চলেছে সাদা-কালো বা রঙিন সেলুলয়েডের তৈরি করা ভুল জীবনের প্রতি। সমস্ত লোকায়ত সংস্কৃতি ও শিল্পকে গ্রাস করে সেই ভুল বিশ্বাসের জীবন আজ অলক্ষ্যে তার বিশাল থাবা তুলে ধরেছে আমাদের জীবনের মূল শেকড়গুলির দিকে।

তবু এখনও হয়তো খুব বেশি দেরি হয়ে যায়নি, হয়তো এখনও সময় আছে কিছু। সুস্থ এবং মানবিক দিক থেকে ক্ষতিকর নয় এমন চলচ্চিত্র তৈরির আবহাওয়া তৈরি করার মূল দায়িত্ব যেমন অনেকটাই চলচ্চিত্র পরিচালকদের, তেমন এ কথাও বলা যায় যে দর্শক ও সরকারেরও কিছুটা দায়িত্ব থেকে যায়। দর্শক ছবি দেখেন। সরকার ছবি থেকে কর বাবদ মোট রাজস্বের একটা মোটা অংশ পান, অথচ তার থেকে সামান্যতম অংশের যে ছিটেফোঁটা এই শিল্পটিতে ফিরে আসে তা জানতে পারলে ঘোড়াও হেসে ফেলবে।

একজন নবীন পরিচালকের পক্ষে ছবি করার জন্য বেশ বড়ো একটি বাধা হলো টাকা। একজন টাকাওয়ালা লোকের সঙ্গে, যে পরিচালকের পক্ষে সম্মানজনক শর্তে তাকে দিয়ে ছবি করাতে চান, দেখা হওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে করতে নবীন পরিচালকের মাথায় টাক পড়ে যায়। এই বাধা কাটিয়ে উঠেও একজন তরুণ এবং নতুন পরিচালক অনেক সময়ই শেষ পর্যন্ত মানবিক দিক থেকে ক্ষতিকর ভাবনা-চিন্তার খাদে পড়ে যায়। কেননা টাকাওয়ালা লোকটির সঙ্গে দেখা হবার পর ছবি করার জন্য তাকে কম্প্রোমাইজের শেষতম ধাপে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। এইভাবে দাঁড়িয়ে ছবি করার কারণ, যেটা ভালো ও সুস্থ ছবি করার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড়ো বাধা, পরিচালকের গভীর অন্তর্দৃষ্টির অভাব এবং জীবন ও পারিপার্শ্বিক সম্পর্কে চেতনাহীন দুই চোখের দৃষ্টি।


অধিকাংশ
ক্ষেত্রেই চলচ্চিত্র
পরিচালকদের ভাবলেশহীন
ঠাণ্ডা মুখগুলি দেখে মনে হয়
বুঝি-বা নতুন হিমযুগ শুরু হতে চলেছে

ভারতবর্ষে, বিশেষত কলকাতায় প্রত্যেক বছরই নতুন কিছু পরিচালক, তাঁদের ছবি তৈরির কাজটি শেষ করেন, কিন্তু খুব কম সংখ্যকই আমাদের ভাবান, এবং ভাবান না বলেই আমরা ক্রমশ আতঙ্কিত হয়ে উঠতে থাকি। আজ, তৃতীয় বিশ্বের প্রায় সমস্ত দেশগুলি জুড়েই যখন এই মাধ্যমটিকে সামাজিক ও রাজনৈতিক সংগ্রামের অন্যতম একটি সাংস্কৃতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে, তখন এ দেশে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই চলচ্চিত্র পরিচালকদের ভাবলেশহীন ঠাণ্ডা মুখগুলি দেখে মনে হয় বুঝি-বা নতুন হিমযুগ শুরু হতে চলেছে।

বহু যুগ থেকে এক দুষ্টচক্রের মধ্যে পড়ে থাকা এই শিল্প মাধ্যমটি সম্পর্কে সরকারি মাথাব্যথা আমাদের ঢাক-ঢোল পিটিয়ে জানানো হয়েছে। তবু, জগদ্দল পাথর নড়েনি এক চুলও। বরং ভালো ছবি দেখানোর জায়গা কমে এসেছে ক্রমশ, সেন্সরভিত্তিক রিলিজের ভাবনা শিকেয় উঠেছে, মোটামুটি ব্যবহারযোগ্য কাঁচা-ফিল্ম (সাদা/কালো) পাওয়া বন্ধ হয়ে গেছে, আর সুস্থ ছবি করার জন্য সেদিনেরই সেইসব প্রযোজকেরা আজ হারিয়ে গেছেন অনেকদিন। তবু, এসবেরই মাঝখানে পশ্চিমবাংলার সাম্প্রতিক সরকারের এ মাধ্যমটির প্রতি যথার্থ সৎ ও সাহসী অনুরাগ এ রাজ্যে ভালো ছবি ও তার চলার আবহাওয়া তৈরি করতে এ রকম আশা করা হয়তো আবার ভুল করা হবে না।

কালপুরুষ । ফিল্মমেকার: বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত

হয়তো সত্যিই আসবেন একদল তরতাজা নতুন পরিচালক, যাঁদের কাঁধের ওপর মাথাটি সত্যিকারের রক্তমাংসের, তৈরি করবেন যথেষ্ট যোগ্যতা নিয়ে সেই চলচ্চিত্রগুলি, যেগুলি দাঁড়িয়ে থাকবে জীবনের পাশাপাশি। তাঁরা নিশ্চয়ই স্বপ্ন দেখবেন না হলের টিকিটবাবুর ছোট্ট জানালার সামনে তার নাওয়া খাওয়া ঘুম কেড়ে নেবার জন্য হাজার হাজার লোক দাঁড়িয়ে থাকবে তাঁদের ছবি দেখার জন্যে। কিন্তু তাঁরা এটুকু নিশ্চয়ই আশা করবেন যে সুস্থ দর্শক যাঁরা সংখ্যায় নিতান্ত কম হবেন না, থাকবেন তাঁদের পাশে। যাঁরা এই আস্থাটুকু রাখবেন যে ক্ষতিকর ভাবনা-চিন্তার এক গভীর খাঁদের ধারে দর্শককে দাঁড় করিয়ে রেখে পরিচালক তার হাত ধরে খাঁদের ভেতর ঝুলে পড়তে চাইবেন না।

এ দেশের এক অতি অস্থির অথচ সৎ এবং যার-পর-নাই ক্ষমতাবান চিত্র পরিচালকের মতো সেই নতুন পরিচালকের অন্তত এটুকু বলার সাহস থাকবে, ‘আমি ফিল্ম ভালোবাসি বলেই ফিল্ম করতে আসিনি, আমি ফিল্ম করতে চাই এর মধ্যে দিয়ে আমার ভাবনাকে অনেকের কাছে তুলে ধরার জন্য।’


প্রথম প্রকাশ: দেশ, ১৩৮৭
[বুদ্ধদেব দাশগুপ্তের প্রয়াণে শ্রদ্ধাঞ্জলিস্বরূপ প্রকাশ করা হলো লেখাটি। পুনঃপ্রকাশের অনুমতি নেওয়া হয়নি বলে আন্তরিক দুঃখিত। সংশ্লিষ্ট কারও দৃষ্টিগোচর হলে ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে অনুমতি দেওয়ার আবেদন জারি রইল: ফিল্মফ্রি]

Print Friendly, PDF & Email
কবি ও মাস্টার ফিল্মমেকার; ভারত। জন্ম: ১১ ফেব্রুয়ারি ১৯৪৪; মৃত্যু: ১০ জুন ২০২১ ।। ফিচার ফিল্ম: দূরত্ব; নিম অন্নপূর্ণা; গৃহযুদ্ধ; আন্ধি গলি; ফেরা; বাঘ বাহাদুর; তাহাদের কথা; চরাচর; লাল দরজা; উত্তরা; মন্দ মেয়ের উপাখ্যান; স্বপ্নের দিন; আমি, ইয়াসিন আর আমার মধুবালা; কালপুরুষ; জানালা; মুক্তি; পত্রলেখা; আনোয়ার কা আজব কিসসা; টোপ; উড়োজাহাজ