আমার একাকিত্ব প্রয়োজন, নিজেকে দেওয়ার মতো একান্ত সময় প্রয়োজন: বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত

301
বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত

সাক্ষাৎকার ও ভূমিকা: অমিতাভ নাগ
অনুবাদ: নাফিস সাদিক

‘যখন আমি কোনো পেইন্টিংয়ের দিকে তাকাই, সেখানে ক্যানভাসে আঁকা লাইনগুলোর বাইরে আমি আরও অনেক ছবি দেখতে শুরু করি। আবার কবিতার ক্ষেত্রে লাইনগুলোর মধ্যে আমি এক রকম প্যাটার্ন অনুভব করি, যেগুলো তৈরি হয়, নড়েচড়ে, আবার মনের মাঝেই মিলিয়ে যায়। যখন সিনেমা বানানো শুরু করলাম, আমার একমাত্র ইচ্ছা ছিল বন্ধ চোখে যেসব চলমান ছবি দেখতে পাই, সেগুলোর চিত্ররূপ প্রদান করা,’ কয়েক দশক আগে চলচ্চিত্রকার ও কবি বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত তার এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন এই কথাগুলোই। সিনেমা বানানোর চার দশকের যাত্রা শেষেও তিনি তার সেই অঙ্গীকারের প্রতি সৎ থেকেছেন। নিয়মিত জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জনের বাইরে তার জন্য একটি আকাঙ্ক্ষিত মুহূর্ত এসেছিল ২০০২ সালের ভেনিস ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে, সেখানে উত্তরা ছবির জন্য তিনি ‘স্পেশাল ডিরেক্টর’স অ্যাওয়ার্ড’ অর্জন করেছিলেন।

যখন আমি তার দক্ষিণ কলকাতার ফ্ল্যাটে এই সাক্ষাৎকার গ্রহণের জন্য দেখা করি, দুজন মুখোমুখি হই বহু বছর পর। তার চেহারায় বার্ধক্যের ছাপ স্পষ্ট এবং উনি বেশ নিচুস্বরে, ধীরে ধীরে কথা বলছিলেন। আমাকে মাঝে মাঝে পুনরাবৃত্তি করতেও হচ্ছিল। তবে যখন ইমেজ ও কবিতার কথা উচ্চারণ করছিলেন, তার দুই চোখ ঐ সময়গুলোয় উজ্জ্বল হয়ে উঠছিল।

সাক্ষাৎকারটির উল্লেখযোগ্য অংশ নিচে দেওয়া হলো:

দূরত্ব । ফিল্মমেকার: বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত

অমিতাভ নাগ: আপনার প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য ছবি দূরত্ব নির্মিত হয়েছিল ১৯৭৮ সালে। সেখান থেকে ছবি বানানোয় আপনার সুদীর্ঘ চার দশকের যাত্রা পূর্ণ হতে যাচ্ছে। কেমন ছিল এই পথচলা?

বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত: এ ছিল সিনেমা ও কবিতার সঙ্গে নিবিড় এক যাত্রা। ওই সুদীর্ঘ যাত্রাই আজকের আমাকে সৃষ্টি করেছে। আমি সব সময় সিনেমা বানানোয় সৎ থাকতে চেয়েছি। এমন অনেক সময় এসেছে, যখন আর সামনে এগোনো অসম্ভব হয়ে পড়েছে, তখন সিনেমাই আমাকে পথ দেখিয়েছে। সামনে এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণা দিয়েছে।

এখন আমার শরীর ভেঙে পড়েছে, তবে মনের শক্তি আজও অটুট। এইমাত্র আমি আমার পরের ছবির জন্য রেকি করে এলাম। সঠিক লোকেশন খুঁজে পেতে সকাল থেকে সন্ধ্যে পর্যন্ত আমাকে ছোটাছুটি করতে হয়েছে। হ্যাঁ, এটা শ্রমসাধ্য, কিন্তু এখনো আমি সেই আগের মতো উৎসাহ অনুভব করি, যেমনটা অনুভব করেছিলাম দূরত্বর শুটিং করার আগে।

অমিতাভ নাগ: আপনার ছবিতে ইমেজ খুব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এগুলো কীভাবে আপনার ভেতরে জন্ম নেয়?


কখনো
অন্য কারও
ছবি থেকে ইমেজ
ধার করে এনে আমার
ছবিতে ব্যবহার
করিনি

বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত: মিউজিক, পেইন্টিং ও কবিতার কাছে আমি খুব গভীরভাবে ঋণী। আমার মা পিয়ানো বাজাতেন। তিনি বলতেন, ‘আমার দিকে তাকিও না। চোখ বন্ধ করো আর সুরটাকে অনুভব করো।’ এভাবেই আমার মনে ইমেজ জন্ম নেওয়া শুরু করে। এই প্রক্রিয়া আমি এখনো অনুসরণ করি। এই ইমেজগুলোকে ঠিক নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। আগে মনের মধ্যে এগুলো তৈরির জন্য আমাকে আলাদা মনোযোগ দিতে হতো। কিন্তু বছরের পর বছরের অনুশীলনে এখন এগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবেই তৈরি হয়। আমি কখনো অন্য কারও ছবি থেকে ইমেজ ধার করে এনে আমার ছবিতে ব্যবহার করিনি।

অমিতাভ নাগ: এই যাত্রায় কারা বা কী আপনার অনুপ্রেরণা হয়ে উঠেছে?

বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত: আমাকে অনুপ্রেরণা যুগিয়েছে জীবন, প্রকৃতি, শব্দ, চিত্রকলা ও সাহিত্য। আমি ছবি দেখেও অনুপ্রাণিত হই। আমার কাছে চার্লি চ্যাপলিনের পর (লুই) বুনুয়েল অন্যতম শ্রেষ্ঠ একজন নির্মাতা। বুনুয়েলের পরে (আন্দ্রেই) তারকোভস্কি এবং আরও কয়েকজন আছেন।

উত্তরার শুটিংয়ে বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত

অমিতাভ নাগ: এই যাত্রায় প্রতি এক দশকে আপনি পাঁচ থেকে ছয়টি করে ছবি বানিয়েছেন। বলা যায়, প্রতি দুই বছরে একটি করে ছবি। নিজের এই গতি নিয়ে আপনি সন্তুষ্ট?

বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত: এর চেয়ে বেশি গতিময় আমি হতে পারব না। আমার একাকিত্ব প্রয়োজন। নিজেকে দেওয়ার মতো একান্ত সময় প্রয়োজন। আমাদের মনটা পানি ধরার মাটির পাত্রের মতো। যদি আপনি এটা থেকে পান করার মতো পর্যাপ্ত পানি চান, তবে আগে এটাকে পূর্ণ করার সুযোগ দিতে হবে। যদি ভরে ওঠার আগেই এটা থেকে ঢেলে নেওয়া শুরু করেন, তবে এটা অল্প সময়েই খালি হয়ে যাবে।

অমিতাভ নাগ: আপনি এ পর্যন্ত ১৭টা পূর্ণদৈর্ঘ্য ছবি বানিয়েছেন। এদের মধ্যে কোন ছবি আপনি যা অর্জন করতে চেয়েছিলেন তার কাছাকাছি পৌঁছতে পেরেছে বলে মনে করেন?


ছবি
বানানোর
সময় ফেলে আসা
শৈশবে ফিরে যাই আর
নিজের অতীত থেকে
ইমেজ ধার করে
আনি

বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত: সতেরটার মধ্যে একটাকে আমার প্রিয় ছবি হিসেবে বেছে নেওয়াটা ভারি কঠিন কাজ। কিন্তু একেবারেই যদি উত্তর চান, তবে বলব বাঘ বাহাদুর, উত্তরা, কালপুরুষ এবং আরও কয়েকটা ছবি নিয়ে আমার ভেতর আত্মতৃপ্তি কাজ করে। অনেক সময় নিজেকে আমার ছবি চরাচর-এর প্রধান চরিত্র– লখা বলে মনে হয়। যে চরিত্রগুলো আমি সৃষ্টি করি, সেগুলোর প্রতিটিতেই নিজেকে কিছুটা করে ঢুকিয়ে দিই। ছবি বানানোর সময় ফেলে আসা শৈশবে ফিরে যাই আর নিজের অতীত থেকে ইমেজ ধার করে আনি। আপনি এই ছবিগুলোকে ‘আত্মজৈবনিক’ বলতে পারবেন না, তবে এর প্রতিটিতেই আমি রয়েছি।

অমিতাভ নাগ: আপনার রাজনৈতিক দর্শন কী?

বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত: আমার রাজনৈতিক দর্শন আমার কাজেই প্রতিফলিত হয়েছে। আমার কবিতা এবং সিনেমা– দু’টোতেই। যে কোনো ধরনের রাজনৈতিক বিশ্বাস কোনো না কোনো ‘ইজমে’র সাথে যুক্ত। আমি জীবনে কখনো কোনো রাজনৈতিক দল বা নির্দিষ্ট কোনো ‘ইজমে’র পথ মাড়াইনি।

বর্তমানে ভারতে অনেক সৃজনশীল মানুষকেই দেখি বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সাথে সংযুক্ত হতে। এটা আমাকে পীড়িত করে। আমার কাছে এটা বিপজ্জনক মনে হয়। এমনকি আগে জরুরি মুহূর্তগুলোয় আপনি এর বিরুদ্ধে ধ্বনি শুনতে পেতেন, কিন্তু দুভার্গ্যজনকভাবে এখন কদাচিৎ শোনা যাবে।

বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত
বাঘ বাহাদুর । ফিল্মমেকার: বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত

অমিতাভ নাগ: আপনি কখনো আপস করেননি?

বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত: আমি কখনো আমার কাজ নিয়ে আপস করিনি। আপনি আজ যদি পশ্চিমবঙ্গের দিকে তাকান, দেখবেন, এখানকার বেশিরভাগ সৃজনশীল মানুষ কোনো স্বল্পস্থায়ী সুবিধার লোভে নিজেদেরকে রাষ্ট্রের কাছে বিকিয়ে দিয়েছে। আমি এটা গ্রহণ করতে পারি না, আবার এসবে অংশগ্রহণও করতে পারি না। মেইনস্ট্রিমের বাইরে থাকাকে বেছে নেওয়ার কারণে আমাকে বারবার হুমকি দেওয়া হয়েছে এবং একঘরে করে ফেলা হয়েছে। এটা আমার ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে এবং আমাকে একজন একাকী যাত্রীতে পরিণত করেছে।

অমিতাভ নাগ: গত কয়েক বছরে আপনার ছবিগুলো ভারতজুড়ে কম মানুষের কাছে পৌঁছেছে। আপনার কি এটা নিয়ে খারাপ লাগে?

বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত: বর্তমানে সিনেমার চরম দুরাবস্থা চলছে। নব্বইয়ের দশকেও আমরা যেসব সিনেমা দেখতাম, সেগুলো এখন অনেকের কাছে অর্থহীন মনে হয়। আজকালের বেশিরভাগ সিনেমার ইমেজ আমার কাছে অগভীর মনে হয়, এগুলো আমাকে প্রণোদিত করে না।

কখনো আপস করিনি; কারণ আমি জানতাম অন্যভাবে সিনেমা বানানোর চেষ্টা করে খুশি হতে পারব না। ভারতে আমার কিছু দর্শক আছে এবং আমি সেই দর্শকদের জন্যই কাজ করি।

অমিতাভ নাগ: আপনি যখন শুরু করেছিলেন, তখন ফিল্ম সোসাইটিগুলো পুরোদমে সক্রিয় ছিল। বর্তমান সময়ে এগুলোর প্রাসঙ্গিকতা কতটুকু?


সিনেমাকে
প্রোমোট করার
নামে ফিল্ম সোসাইটির
সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অনেক ব্যক্তি
নীরবে নিজেদেরকেই প্রোমোট করেছেন

বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত: ভারতের ফিল্ম সোসাইটিগুলোর সমস্যা হলো, এগুলো নিজেরাও জানে না, বর্তমানে এরা প্রাসঙ্গিকতা হারিয়েছে। ষাট এবং সত্তরের দশকে সিনেমা প্রদর্শনের মাধ্যমে এরা দর্শক তৈরি ও লালনে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল, অথবা সহস্রাব্দের শেষদিকে যখন ইন্টারন্যশনাল ফিল্মগুলো ভারতে সহজে দেখতে পাওয়া যেত না, তখনো এরা প্রাসঙ্গিক ছিল। কিন্তু আমার যেটা মনে হয়, সিনেমাকে প্রোমোট করার নামে ফিল্ম সোসাইটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অনেক ব্যক্তি নীরবে নিজেদেরকেই প্রোমোট করেছেন।

বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত
টোপ । ফিল্মমেকার: বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত

অমিতাভ নাগ: আপনার সর্বশেষ সিনেমা– টোপ। এখানে কে টোপ এবং এই টোপ কে ফেলেছে?

বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত: আমি মনে করি, এটা হলো সিস্টেম। সিস্টেমই সাধারণ মানুষকে টোপে ফেলে, এর নিজস্ব মোহে আকৃষ্ট হতে বাধ্য করে। এর প্রমাণ আমরা সব জায়গায়ই দেখি– বিজ্ঞাপনে, রাজনীতিতে। এর চেয়ে খারাপ সময় আমি আর আগে কখনো দেখেছি বলে মনে পড়ে না। এটাকে আমার এক রকম রাজনেতিক অবস্থান বলতে পারেন।

অমিতাভ নাগ: আপনার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী?

বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত: আমি অক্টোবরে, ঠিক পূজার পরে আমার নতুন ছবির শুটিং শুরু করার পরিকল্পনা করছি। আপাতত ছবিটির নাম দিয়েছি উড়োজাহাজ। এটা আমার নিজের গল্প এবং একজন মানুষের স্বপ্নের গল্প– যে সিস্টেম মানুষটিকে দমন-পীড়ন করে, তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করার স্বপ্ন দেখে সে।


[২০১৭ সালের ৫ আগস্ট এ সাক্ষাৎকার ইংরেজিতে প্রকাশিত হয়েছিল 'দ্য হিন্দু' পত্রিকায়। অমিতাভ নাগের অনুমতিক্রমে এটি বাংলায় অনুবাদ ও এখানে প্রকাশ করা হলো। অমিতাভ নাগ একজন ভারতীয় ইনডিপেনডেন্ট ফিল্ম ক্রিটিক, কবি ও কথাকার। থাকেন পশ্চিমবঙ্গের কলকাতায়। লিখেন বাংলা ও ইংরেজিতে। সম্পাদনা করেন চলচ্চিত্র ও সমন্বিত শিল্পকলা বিষয়ক ইংরেজিভাষী জার্নাল 'সিলুয়েট'। তার বইয়ের মধ্যে রয়েছে: 'স্মৃতিসত্তা ও সিনেমা', "সত্যজিৎ রায়'স হিরোস অ্যান্ড হিরোইনস", 'বিয়ন্ড অপু: ২০ ফেভারিট ফিল্ম রোলস অব সৌমিত্র চ্যাটার্জি' প্রভৃতি। ওয়েবসাইট: www.amitavanag.net]

Print Friendly, PDF & Email