বুদ্ধদেব দাশগুপ্তের কূজনবাহার

122
বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত
বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত । ১১ ফেব্রুয়ারি ১৯৪৪-১০ জুন ২০২১

লিখেছেন । পিয়াস মজিদ

‘নিখিল ঘুমিয়ে কাদা, নিখিলের বউ জানলা খুলে উড়ে গেলো তারাদের পাশে। তারারা আশ্চর্য হয়ে জানতে চাইলো– নাম কী? নিখিলের বউ বললো– তারা। সকালবেলা নিখিল ছুটলো বাজার, ছুটলো অপিস, টিউশন, নাটকের রিহার্সাল তারপর খেয়েদেয়ে ছুটলো বিছানায়। মাঝরাতে, ধড়ফড় করে ঘুম ভেঙে গেলো নিখিলের, তার সারা মুখে গালে জল আর বুকের ওপর উড়ে এসে কখন শুয়ে তারা,

তারার শরীর জুড়ে ঘন মেঘ জল হয়ে ঝরছে অবিরাম।’

রাত্রি, বুদ্ধদেব দাশগুপ্তের কবিতা


বুদ্ধদেব দাশগুপ্তের চরাচর (১৯৯৩) প্রথম দেখার বিকেল-সন্ধ্যাটা মনে আছে আজও, মজে আছি এখনও। কুমিল্লা শিল্পকলা একাডেমি প্রাঙ্গণের উন্মুক্ত মঞ্চ, সাল ২০০১-এর নভেম্বর-ডিসেম্বরের হিমহাওয়া, বাইরে টুকটাক পাখির ডাক আর চরাচর থেকে ভেসে আসা পাখিবাহার; সদ্য কৈশোর-পেরুনো আমার অপটু আঁখিতে সেই যেন বুঝতে শেখার শুরু– গল্প একটা থাকতেই পারে মুভিতে, কিন্তু তারও চেয়ে বড়ো কথা গল্প-ছাপিয়ে যাওয়া অগল্পরা।

বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত
চরাচর । ফিল্মমেকার: বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত

চরাচর-এ যেমন পাখি-বিকিকিনির আখ্যানাংশ উপচে আছে পাখি-রং পরিস্থিতিতে। ঝাঁকে ঝাঁকে পাখি। স্তব্ধতার বুক চিরে চরাচরের ভেতর-বেদনকে ভাস্বর করা। পাখি কি কেবলই পাখি!

পাখির ঠোঁটে আমাদের ফেলে আসা সময়াভা; স্মৃতি ও সত্তার জিজীবিষা।

যেমন পাখি তেমনি বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত সাম্প্রতিক সিনে-কাজ উড়োজাহাজ-এর পাখায় গেঁথে দেন যেন আমাদের আদিম ভাসান আর আদিম উড়ান।

কবি তিনি, এটা বুদ্ধদেব দাশগুপ্তের ভূষণ বা প্রসাধন নয় বরং এ তাঁর চলচ্চিত্রকার-সত্তার অদ্বৈত অন্বয়। কবিতার মেঘলা আকাশ থেকে যেমন শব্দ পড়ে টাপুর টুপুর, তেমনি তাঁর মুভিতে চিঠিও হয়ে ওঠে চরিত্র। কথা বলে চিঠির বাক্স; সভ্যতার হারানো সব স্বরগ্রামে। পত্রের প্রান্তর থেকে তাঁর মুভিরা পাড়ি দেয় বিস্তৃত মাঠে, সড়কে এবং যেনবা পৌরাণিক সমকালে।

বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত
তাহাদের কথা। ফিল্মমেকার: বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত

তাঁর মুভি দর্শনোত্তর পৃথিবীতে দক্ষিণবঙ্গে বসেও টের পাওয়া যায় অনিবার্য উত্তরার আবাহন, নীল বেদনার নদীতে নিমজ্জিত হতে হতে ধাক্কা পড়ে লাল দরজার গায়ে। নিজের নির্জনে হারাতে গিয়ে মনে হয় তাহাদের কথা আর জগতটার মরচে ধরা মুখের আড়ালে তাঁরই সূত্রে দেখতে তো পাই আমাদেরই বিলুপ্ত রংবাহার; আমি ইয়াছিন আর আমার মধুবালাদূরত্ব পেরিয়ে বাঘ বাহাদুর মাড়িয়ে আমরা সন্ধান পাই আনোয়ার কা আজিব কিসসা, তাঁর মুভিতে যেন একেবারেই অন্যরকম মিঠুন চক্রবর্তী থেকে জুন মালিয়া। চরিত্রের চৌকাঠ নয়, বুদ্ধদেবীয় ‘নন-ফ্যান্টাস্টিক’ ফ্যান্টাসি যেন তাঁদের তাড়িত করে।


গাছে
বসে পাতার
পাশ ফিরে শোয়ার
শব্দও যেন তিনি সংকলন করেন

একটা স্থির অরণ্য যেন তাঁর চলচ্চিত্র। গাছে বসে পাতার পাশ ফিরে শোয়ার শব্দও যেন তিনি সংকলন করেন আর ফিল্মি ব্যাকরণ ভেঙে কাজ করেন বৃক্ষের ভাষা নিয়ে।

তারকোভস্কির ইভানের শৈশবছায়া বা কুরোসাওয়ার স্বপ্নসংহিতা যেমন আমাদের ব্যখ্যাহীন বুঁদ করে রাখে, তেমনি বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত আবিষ্টতার অবিকল্প আবহ তৈরি করতে থাকেন।

বুদ্ধদেব দাশগুপ্তের সঙ্গে আমার রোজ দেখা হয়। পাখির শব্দ শুনলে মনে হয়, তাঁর চলচ্চিত্রের চৌহদ্দি থেকে একঝাঁক অলীকের পাখি, আমার মেট্রোপলিটন-বেঁচে থাকা ভেদ করে ঢুকে গেছে আমারই ভেতর হেজেমজে থাকা আশ্চর্য চরাচরে।

Print Friendly, PDF & Email
কবি । ঢাকা, বাংলাদেশ ।। কবিতার বই : নাচপ্রতিমার লাশ; মারবেল ফলের মওসুম; গোধূলিগুচ্ছ; কুয়াশা ক্যাফে; নিঝুম মল্লার; প্রেমপিয়ানো; ক্ষুধা ও রেস্তোরাঁর প্রতিবেশী; নির্ঘুম নক্ষত্রের নিশ্বাস; গোলাপের নহবত; বসন্ত; কোকিলের কর্তব্য