পতঙ্গবিজ্ঞানীর কৌতূহল থেকেই ফিল্মমেকার হয়ে উঠেছি: ফেল্লিনি

122
ফেদেরিকো ফেল্লিনি

সাক্ষাৎকারক: টনি মারাইনি
অনুবাদ: রুদ্র আরিফ

ফেদেরিকো ফেল্লিনি

গ্রন্থসূত্র: সাক্ষাৎ ফিল্মমেকার ফেদেরিকো ফেল্লিনি
গ্রন্থনা ও অনুবাদ: রুদ্র আরিফ
প্রচ্ছদ: দেওয়ান আতিকুর রহমান
প্রকাশক: ঐতিহ্য, ঢাকা
প্রথম প্রকাশ: বইমেলা ২০২০
পৃষ্ঠাসংখ্যা: ১৯২
মূল্য: ৩৫০ টাকা


কিস্তি: ১/৩


টনি মারাইনি :: আপনি সাক্ষাৎকার দিতে পছন্দ করেন না; আপনার সাক্ষাৎকার পাওয়া যেকোনো সাংবাদিকের জন্যই কঠিন কাজ। আপনাকে জানিয়ে দিচ্ছি, আমি যতটা না সাংবাদিক, তারও বেশি কবি।

ফেদেরিকো ফেল্লিনি :: দারুণ ব্যাপার!

টনি :: একটি বিষয় আপনাকে নিশ্চয়ই পুলকিত করবে : সাক্ষাৎকারটি নেওয়ার উৎকণ্ঠায়, সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখি আমি আর কথা বলতে পারছি না; মুখ দিয়ে কোনো শব্দ বেরুচ্ছে না!

ফেল্লিনি :: কথা কম বলা সাংবাদিকদের আমি পছন্দ করি! সাক্ষাৎকার দিতে আমার অনিচ্ছুক হওয়ার কারণ, আমি মনে করি, আমাদের এগুলো এড়িয়ে যাওয়া উচিত। আমি এই স্থির মস্তিষ্কের সিদ্ধান্তটিতে অনড় থাকার চেষ্টা করছি। তবে সুনির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্রে শেষ পর্যন্ত রাজি হই; কেননা, আমাকে সাক্ষাৎকার দেওয়ার জন্য বন্ধুরা পীড়াপীড়ি করে। তাছাড়া নতুন কারও সঙ্গে আলাপ কৌতূহল তো রয়েছেই। এটি অবশ্য আত্মতৃপ্তিকরও; ফলে নিজের সম্পর্কে বুলি কপচানোর অসভ্য দম্ভ ও নির্লজ্জ আকাঙ্ক্ষা থেকেই আমি রাজি হই।


যা
ইতোমধ্যে
বলে ফেলেছি–
সেটির পুনরাবৃত্তি
করার ভয় থেকে
আমি অন্য
গল্প
ফেঁদে ফেলি

জীবনে প্রচুর সাক্ষাৎকার দিয়েছি; ফলে নিজের কথার ওপর আমার কোনো আস্থা নেই। নিজের কথাই পুনরাবৃত্তি করি। মনে করার চেষ্টা করি, কোন কথাটি ইতিমধ্যে বলে ফেলেছি এবং কোন কথাটি এখনও বলা হয়নি। যা ইতোমধ্যে বলে ফেলেছি– সেটির পুনরাবৃত্তি করার ভয় থেকে আমি অন্য গল্প ফেঁদে ফেলি!

টনি :: তার মানে নিজেকে অবিশ্বাস করেন?

ফেল্লিনি :: ঠিকই বলেছেন। সাংবাদিকদের নয়, বরং নিজেকেই অবিশ্বাস করি আমি; এমনকি যদিও গত ৫০ বছর ধরে মনে হচ্ছে, সাংবাদিকেরা সবসময় আমাকে যত ফালতু প্রশ্নই করেছে।

সাক্ষাৎকার হলো মনঃসমীক্ষাগত অধিবেশন ও প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষণের মধ্যকার একটি পথ। ফলে যত সাক্ষাৎকার দিয়েছি, সেগুলো নিয়ে আমার খানিকটা অস্বস্তি রয়েই গেছে। আমি বরং নিজের কথার পুনরাবৃত্তি করার বদলে নিজেকে পুনর্বিবেচনা করারই চেষ্টা করি। তাছাড়া, আমার কিছু বিব্রতকর সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। কখনো কখনো উত্তর জানা থাকে না আমার।

টনি :: আপনার উত্তরগুলো তো আপনি নিজের সিনেমাগুলো বানানোর মাধ্যমে, সেগুলোতেই ইতোমধ্যে দিয়ে রেখেছেন।


কোনো
কাজ নিয়ে
কথা বলার জন্য
সেটির প্রণেতা হচ্ছেন
সবচেয়ে কম
উপযুক্ত
ব্যক্তি

ফেল্লিনি :: ঠিকই বলেছেন। একজন প্রণেতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উত্তরটি স্বয়ং তার কাজই; আর আমার কাজে লোকেরা আমি যা বলার চেষ্টা করেছি– সেটির দেখা খুব সামান্যই পায়। তবু, কোনো কাজ নিয়ে কথা বলার জন্য সেটির প্রণেতা হচ্ছেন সবচেয়ে কম উপযুক্ত ব্যক্তি।

টনি :: তারা সিনেমাটি দেখে প্রশ্ন করতে চায়, এবং সবচেয়ে বড় কথা, সৃষ্টিই এই প্রয়োজনীয়তাকে প্রেরণা জোগায়। উদাহরণ হিসেবে যদি আপনার সর্বশেষ সিনেমাটির কথা ধরি, এটি বোঝার চেষ্টা চালাতে গিয়েই সেই কৃষ্ণমূর্তির কিছু অনুচ্ছেদ আমি পুনর্বার পড়েছি– যাকে আপনি চিন্তাবিধ হিসেবে চেনেন।

ফেল্লিনি :: হ্যাঁ, হ্যাঁ। সেই অনুচ্ছেদগুলো আপনি কোন বইয়ে পেয়েছেন? আমিও পড়তে চাই। যাহোক, একজন লেখক যখন সৃষ্টি করেন, ‘অন্য’ সমস্যাগুলো তিনি জাহির করেন বলে আমি মনে করি না। সত্যিকার অর্থেই, যখন আমি কাজ করি, তখন অন্যকিছুর কথা ভাবি না। আমরা যেটিকে লেখকের নিজ সৃষ্টির ‘কারুকার্যের’ দিক বলি, তার মানে তিনি যা বলতে চান সেটি তিনি ‘যেভাবে’ প্রকাশ করেন– সেটির ব্যাপারে প্রণেতাটি নিশ্চিতভাবেই অবগত থাকেন। তবে ‘কেন’ ও ‘কাকে’ শোনাবেন– সেই সমস্যা নিয়ে তিনি খুব একটা উদ্বিগ্ন হন বলে আমার মনে হয় না।

দ্য ভয়েস অব দ্য মুন। ফিল্মমেকার: ফেদেরিকো ফেল্লিনি

টনি :: তবু, যদি ‘অন্যদের’ না-ও বলেন, প্রায় সব সৃজনকর্তার মতো আপনি নিশ্চয়ই এটি নিজেকেই শোনান? এই নিজেকে শোনানোর মধ্যে কি নিজের একটি ক্রমোন্নত বাকপটু চেতনার পুনর্মূল্যায়ন চলতে থাকে না?

ফেল্লিনি :: জীবনে সাধারণত কাজ করার অভিজ্ঞতা কারিগরি পর্যায়ে একটি বৃহৎ ওস্তাদপনা এনে দেয়; আর এর ফলে, বাছ-বিচার সম্পর্কে, এবং সেগুলো বয়ে নিয়ে যাওয়ার উপায় সম্পর্কে আরও ভালোভাবে যাচাই করা যায়। তবে এই যে আপনি উল্লেখ করলেন, আমার কাজজুড়ে নিজ সম্পর্কে নিজের হয়তো একটি ব্যাপাকমাত্রার জানাশোনা আছে– সেই জানার আরও গভীরতর বোধের প্রসঙ্গে আপনাকে জানাতে চাই, এখানে মূল্যায়নের কোনো কিছু আছে বলে আমি মনে করি না। গত জন্মদিনে এক বন্ধু জিজ্ঞেস করেছিল, সত্তর বছর বয়সে পৌঁছে আমার কেমন লাগছে; জবাবে স্বতঃস্ফূর্তভাবে মুখ থেকে বেরিয়ে গেছে, ‘সত্তর? আমার তো মনে হয় আমার বয়স সবসময়ই সত্তর ছিল!’

তার মানে বুঝতেই পারছেন, আমার জবাবের মধ্যে নিজের সত্যিকারের অনুভূতির প্রতিফলন ঘটেছে। আমার কাছে নিজের সত্তর বছর বয়সটি নিজেরই ৪০, ৩৫, ২৫, কিংবা আরও কম বয়সকালের চেয়ে খুব একটা আলাদা নয়।

টনি :: আপনার যে নিজেকে সবসময়ই সত্তর বছর বয়সী মনে হয়েছে– এ কথার খুব একটা মানে হয় না; তবে, আপনাকে যতদূর বুঝতে পেরেছি, তাতে বলতে পারি, এই বয়সে পৌঁছানো, এবং পেছনে ফিরে তাকানোর পর আপনার সম্ভবত অনুভূতি হয়েছে– সেই তরুণকাল থেকে আপনি একই রকম রয়েছেন।

ফেল্লিনি :: হ্যাঁ, কিশোরকাল থেকে। ঠিকই বলেছেন। এ একেবারেই কিশোর বয়সই। ‘নিশ্চল সময়’– কথাটি কার সৃষ্টি, জানি না; তবে এটিকে আমি এই অভিধায়ই ডাকব।

টনি :: নিখাদ উপলব্ধি ও স্বতঃস্ফূর্ততার এই মন্তব্য যারই সৃষ্টি হোক না কেন, এটি নিশ্চিতভাবেই অতিক্রম করে যাওয়ার কিংবা বলা ভালো, রক্ষাকবচের চেষ্টাতেই সৃষ্টি হয়েছে।

ফেল্লিনি :: আপনি এখনও আমাদের কৃষ্ণমূর্তির রেফারেন্স টানছেন!

টনি :: হ্যাঁ; এবং অস্তিত্বশীল সময়ের গুরুত্বের প্রশ্নে, আপনার সিনে-সৃষ্টিগুলোর প্রতিরূপটি ঘটনাবলি, কালপঞ্জি ও ইত্যাদির স্তূপে তৈরি একটি ইতিহাসগত, সোজাসাপ্টা ও রৈখিক পরম্পরার বিপরীত।

ফেল্লিনি :: ঠিকই ধরেছেন। দুর্ভাগ্যক্রমে, নিজেদের উদ্দেশ্য-নিহিত প্রশিক্ষণের কারণে আমাদের, মানে এই পশ্চিমাদের জীবনজুড়ে একটি চলমান সময়রেখার ভাবনা রয়েছে, যেটির প্রতিটি পদক্ষেপ, পরিবর্তন, উপসংহার ও লক্ষ্যে আমাদের সবাইকেই পৌঁছাতে হয়।

টনি :: আপনাকে কিছু কথা জিজ্ঞেস করতে চাই। কেউ কেউ বলে, আপনার সব সিনেমা আসলে একই রকম। তাছাড়া, আপনার ফ্যান্টাসিগুলোর যে এই সার্কুলার রিপিটিটিভ মোশনটি রয়েছে, সে ব্যাপারেও আপনি একমত বলেই মনে হলো। তবু আমার কাছে এটিকে বছরের পর বছর ধরে একটি সর্পিলপথে এক মুভমেন্ট ট্রাভেল বলে মনে হয়, যেন প্রতিবার একটি নতুন অনুষঙ্গ এসে সমস্যাটিকে আরেকটু উঁচু স্তরে সরিয়ে নেয়।

দ্য ভয়েস অব দ্য মুন। ফিল্মমেকার: ফেদেরিকো ফেল্লিনি

আপনার শেষ সিনেমা দ্য ভয়েস অব দ্য মুন-এর উপাদানগুলো আসলে পৃথিবীকে অন্তর্দৃষ্টির ও দৃশ্যমান হওয়ার, ভঙ্গুরতার, বাস্তবতা বনাম স্বপ্নের দ্বন্দ্বের একটি মঞ্চ হিসেবে হাজির হয়েছে বরাবরের মতোই; তবে সিনেমাটির গতিপথে আমার কাছে প্রশ্নগুলোকে মৃত্যু, প্রকৃতির শক্তি, নারী ও প্রেম, প্রজন্মের সংঘাতের প্রতি একটি চূড়ান্ত, প্রতীকি, অনেকটাই ফিসফিসানি পুনর্মিলন বলে মনে হয়েছে।


সবসময়
একই সিনেমা
বানাতে চেয়েছি

ফেল্লিনি :: হয়তো ঠিকই বলেছেন। এই সিনেমায় ভিন্ন কিছু দেখার সক্ষমতা আমার নেই। আমার তো মনে হয়, সবসময় একই সিনেমা বানাতে চেয়েছি।

টনি :: বলেছিলেন, এটিই সবচেয়ে ক্লান্তিকর সিনেমা ছিল আপনার কাছে।

ফেল্লিনি :: যখন কোনো সিনেমা শুরু করা আটকে রাখার জন্য যেকোনো উপায়েই চেষ্টা করতে থাকি, তখন ক্লান্ত হয়ে পড়ি। সম্পূর্ণ বিরাগের এই মনোভাব আসলে ‘স্টার্টিং নিউরোসিস’ গুণের প্রতি একটি সৎ পদক্ষেপ; এ যেন সেই মুহূর্তকে স্থগিত করে দেওয়া, যখন তাকে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে তাকাতেই হবে নিজের দিকে, দেখতেই হবে নিজের পরিত্যাগ করতে চাওয়া ইমেজটিকে। কয়েক বছর ধরে অবস্থাটি আরও খারাপের দিকে যাচ্ছে। কোথায় যেতে চাই, নিজেকে কোথায় নিয়ে দাঁড় করাতে চাই– এসব বিষয় সাজিয়ে তুলতে নিজেকে বাধ্য করার অবস্থায় অনুভব করার আগ পর্যন্ত কোনো সিনেমার কাজ শুরু করা থেকে নিজেকে আটকে রাখার এই প্রবণতা আমার রয়েছে।

লা স্ত্রাদা নিয়ে আমার মেকিং অ্যা ফিল্ম [Fare un film] বইটিতে এসব কথা লিখেছি। শুরুর দিকে আমার শুধুই একটি দ্বিধার অনুভূতি ছিল; ছিল ওৎ পেতে থাকা এক ধরনের স্বর– যেটি আমাকে মনমরা করে তুলত, আমাকে অপরাধবোধে আচ্ছন্ন করে ফেলত– ঠিক যেন আমার ওপর ছায়া ফেলার মতো। অনুভূতিটি এমনই– যেন দুটি মানুষ পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে, যদিও বিষয়টি মারাত্মক ব্যাপার হয়ে উঠবে, তবু তারাই সেটির কারণ। কিন্তু শুধু একবার এই অনুভূতি স্বচ্ছস্ফটিক হয়ে উঠলেই, কাহিনিটি খুব সহজে ধরা দেয়– যেন সেটি জায়গা করে নেওয়ার জন্য এতদিন অপেক্ষায় ছিল।

টনি :: কী আপনার অনুভূতিকে স্বচ্ছস্ফটিক করে দেয়?

ফেল্লিনি :: জ্যুলিয়েত্তা [মাসিনা]। এক সময় আমি ওকে নিয়ে একটি সিনেমা বানাতে চেয়েছিলাম। ওর একলার পক্ষেই একজন ক্লাউনের বিস্ময়মুখরতা, আতঙ্ক, আনন্দ, কমিক, নিরানন্দ ফুটিয়ে তোলা সম্ভব। আমি মনে করি, কোনো অভিনেতার ভেতর ক্লাউনধর্মী প্রতিভা খুঁজে পাওয়া তার পক্ষে অর্জনযোগ্য সবচেয়ে মূল্যবান উপহার। জ্যুলিয়েত্তা এমনই ধরনের অভিনেত্রী, যে খুব বিনয়ের সঙ্গে জানে– আমি কী করতে চাই, আমার রুচিই-বা কেমন।

লা স্ত্রাদা। অ্যাকট্রেস: জ্যুলিয়েত্তা মাসিনা। ফিল্মমেকার: ফেদেরিকো ফেল্লিনি

পরিকল্পনা থাকা প্রয়োজন– এমন একটি পেশায়, কোনো সিনেমার কাজ শুরু করার ক্ষেত্রে আমার এই মন্থরতা নিশ্চিতভাবেই অগ্রহণযোগ্য; তবে স্বীকার করে নিচ্ছি, কোনো সিনেমা শুরু করার জন্য এই আবহের প্রয়োজন আমার পড়েই। যখন শুরু করি, একটি ফুরফুরে মেজাজ খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা থাকে আমার; স্টোরিটেলিংয়ের সেই অগাধ সুস্থিরতা, সেই সুখানুভব আমি দ্য ইন্টারভিউর শুটিংয়ের সময় পেয়েছি।

দিনের পর দিন, শুটিং করে করে বানানো হয়েছিল সিনেমাটি। এ ধরনের সিনেমার প্রতিই আমার লক্ষ্য প্রতিনিয়ত বাড়ছে। ফলে, সর্বশেষ সিনেমা দ্য ভয়েস অব দ্য মুন-এর বেলায় একইভাবে কাজ করার, সার্কাসের লোকগুলোর মতো কাজ করার চেষ্টা চালিয়েছি : একটা একটা দৃশ্য সৃষ্টি করা, আদতে কোনোকিছুই নয়– এমন কিছুর প্রদর্শন করা। জীবনের কাছ থেকে দালানকোঠা, আলো, পরিস্থিতি, মৌসুম– সবকিছু একেবারেই নিবিড়ভাবে নিয়ে দৃশ্য গঠন করার প্রয়োজন আমার পড়েই।

এই সিনেমার বেলায় দালানকোঠা থেকে প্রচারণা পর্যন্ত– সবকিছুই আমি নকশা ও সৃষ্টি করে নিয়েছি। যতবারই সেটে গিয়েছি, দেখেছি সেটি ফাঁকা, দেখেছি ধূলির স্তর পড়ে আছে, কিছু জানালা বন্ধ হয়ে ভেঙে গেছে বাতাসের তোড়ে; আর নিজেকে জিজ্ঞেস করেছি, ‘হচ্ছেটা কী?’ শুনুন, আপনাকে বলি, দৃশ্যমান রোমান্টিকের ঝুঁকিটিতে নিজের ভেতর থেকে আমি শুনতে পাই, ‘তুমি দেখে নিও, চত্বরটি আবারও জ্যান্ত হয়ে উঠবে, গির্জাটির বারান্দায় ঘণ্টা বাজানোর লোকটির দেখা মেলবে আবারও, কেউ না কেউ আবারও ঢুকে পড়বে কোনো দোকানে– কিছু কেনার জন্য…।’

আর হয়েছিলও তা-ই। এ যেন প্রয়োজনের তাগিদে সেটটির জ্যান্ত হয়ে ওঠা। আমি তখন সিনেমাটি বানালাম : গুরুত্বপূর্ণ জিনিসগুলোকে মনে হলো তুচ্ছ, আর নৈমিত্তিক জিনিসগুলো যেন হয়ে উঠল গুরুত্বপূর্ণ। দ্য ইন্টারভিউর ন্যাচারালনেস এই সিনেমায়ও আমি অর্জন করতে চেয়েছিলাম।

টনি :: দ্য ইন্টারভিউ একটি আত্মজৈবনিক সিনেমা। আমরা তরুণ ফেদেরিকো ফেল্লিনিকে, সদ্যযুবক সাংবাদিকটিকে দেখতে পাই– যে ১৯৪১ সালের কোনো একদিন সিনেসিত্তায় এসে হাজির হয়েছিল। এই স্টুডিওর ঝমকালো রূপ, এটির কল্পনা-কল্পনা খেলা, এবং জীবনের গল্পকে গড়ে ও ভেঙে ফেলার মানুষ– ফিল্মমেকারের প্রায়-অতিপ্রাকৃতিক ক্ষমতা তাকে প্রলোভিত করেছিল।

ফেল্লিনি :: যুবক বয়সে যখন সিনেসিত্তায় গিয়ে দেখলাম, ফিল্মমেকারেরা শুটিং করছেন, তখন তাদের ক্ষমতা দেখে, হুংকার ও চিৎকার দিয়ে সুন্দরী অভিনেত্রীদের কাঁদিয়ে ফেলা দেখে মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে গিয়েছিলাম; খুবই সুন্দরী ও খুবই বিখ্যাত অভিনেত্রী ইসা পোলাকে কীভাবে কাঁদিয়ে ফেলেছিলেন ব্লাসেত্তি– সেটি দেখার কথা বিশেষভাবে মনে পড়ে; তবে তাদেরকে আমার অভব্য, উদ্ধত, অভদ্র ও দাম্ভিক বলেও মনে হয়েছিল।


নিজের
ভেতর আমি
চতুর্দশ শতকের
কোনো চিত্রশিল্পীর
দেখা পাই, যার একজন
ক্লায়েন্ট থাকা
লাগেই

দ্য ইন্টারভিউতে অত্যাচারী ফিল্মমেকারের এই ছবি ধরার চেষ্টা করেছি। এতকিছু সত্ত্বেও আমাকে প্রলুব্ধ করার এক ব্যক্তিত্ব ছিল সে। তবে সেসময়ে আমি কোনোদিনই ফিল্মমেকার হওয়ার কথা ভাবিনি; অমন বদমেজাজ, অমন কণ্ঠ, অমন কর্তৃত্বপনা, অমন ঔদ্যত্যের ঘাটতি ছিল আমার। ভেবে নিয়েছিলাম, হয়তো লেখক কিংবা পেইন্টার হবো; কিংবা হবো [পত্রিকার] কোনো ‘বিশেষ প্রতিনিধি’। কিন্তু দেখা গেল আমার মধ্যে সবরকমের খুঁতই আছে! কেননা এক ধরনের পুলক থেকেই, যেন কোনো পতঙ্গবিজ্ঞানীর কৌতূহল থেকেই আমি ফিল্মমেকার হয়ে উঠেছিলাম। আমার সিনেমাগুলো তাই অভিব্যক্তির সিনেমা।

দ্য ইন্টারভিউ। ফিল্মমেকার: ফেদেরিকো ফেল্লিনি

দ্য ইন্টারভিউ বানাতে রাজি হয়েছিলাম একটি চুক্তি রক্ষা করার জন্য। নিজের ভেতর আমি চতুর্দশ শতকের কোনো চিত্রশিল্পীর দেখা পাই, যার একজন ক্লায়েন্ট থাকা লাগেই, যেটি সেসময়ে সাধারণত স্বয়ং গির্জাই হতো। মানবাত্মাকে গভীরভাবে বোঝার জন্য, একইসঙ্গে প্রলুব্ধ ও বিপন্ন হওয়ার প্রয়োজনে, গির্জা কর্তৃপক্ষ শিল্পীর কিশোরস্বভাবটি বুঝতে পারতেন। কিন্তু আজকের দুনিয়ায় এই দৃষ্টিভঙ্গিকে একদমই বিবেচনায় নেওয়া হয় না। তবু, উদাহরণ হিসেবে বলছি, আমার একজন ক্লায়েন্ট দরকার।

দ্য ইন্টারভিউর ক্ষেত্রে টেলিভিশনকে কথা দিয়েছিলাম, আমার একটি বিশেষ চুক্তি করা ছিল। যেহেতু প্রতিশ্রুতি রক্ষা করার নীতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়ার শিক্ষা ছোটবেলাতেই পেয়েছি, ফলে সেটি রাখতে চেয়েছি। এ কারণেই এই টেলিভিশন-ফিল্ম এভাবে, নিজে নিজেই, কোনো ট্রমা ছাড়াই তৈরি হয়ে গেছে; কেননা, এটি প্রফুল্লতার স্বাধীনতাটির এবং প্রত্যাশার চাপে তৈরি না হওয়ার প্রলুব্ধকারী দিকটি জাহির করেছে।

সিনেমা বানানো একটি রোমাঞ্চকর জার্নি, সবচেয়ে বড় কথা– প্রডিসারদের জন্য। অতীতের দিকে তাকিয়ে আমার কোনো নালিশ নেই। প্রতিটি সিনেমারই নিজ নিজ ঝামেলা, নিজ নিজ বিলম্ব থাকে; তবে কোনো জার্নির বাধাগুলোও স্বয়ং সেই জার্নিরই প্রতিনিধিত্বের অংশ। অসুবিধাগুলো রহস্যের, এমনকি বন্ধুত্বের দৈব অভিব্যক্তির উদ্ঘাটন করে বলে ভ্রমণটি ঋদ্ধ হয়। দ্য ইন্টারভিউতে সিনেমার জার্নিটি শুরু করার, ঠিকঠাক করে নেওয়ার এই সমস্যাগুলো আমার হয়নি। তবে আমার শেষ সিনেমা, দ্য ভয়েস অব দ্য মুন-এ তা হয়েছে।

অমর্যাদার সঙ্গে এই শেষ সিনেমাকে আমি ঢেকে দিয়েছিলাম; এই সিনেমাকে সেভাবে লাথি মেরে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছিলাম, যেভাবে লোকে কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত অসুখকে ছুঁতে চায় না। নিউমোনিয়া না বাধানোর জন্য আপনি কী করেন? নিশ্চয়ই নিজেকে সুরক্ষিত রাখার চেষ্টা করেন।

টনি মারাইনি। জন্ম : ১৯৪১। লেখিকা, ইতিহাসবিদ, নৃতাত্ত্বিক; ইতালি
সাক্ষাৎকারগ্রহণকাল : ১৯৯০
ইংরেজি শিরোনাম : চ্যাটিং অ্যাবাউট আদার থিংস : ফেদেরিকো ফেল্লিনি
ইতালিয়ান থেকে ইংরেজি অনুবাদ : এ. কে. বিয়ারম্যান
সূত্র : ব্রাইট লাইটস ফিল্ম জার্নাল; অনলাইন ফিল্ম জার্নাল, যুক্তরাষ্ট্র। ১৯৯৪

পরের কিস্তি, আসছে শিগগির…

Print Friendly, PDF & Email
সম্পাদক : ফিল্মফ্রি । ঢাকা, বাংলাদেশ।। সিনেমার বই [সম্পাদনা/অনুবাদ] : ফিল্মমেকারের ভাষা [৪ খণ্ড : ইরান, লাতিন, আফ্রিকা, কোরিয়া]; ফ্রাঁসোয়া ত্রুফো : প্রেম ও দেহগ্রস্ত ফিল্মমেকার; তারকোভস্কির ডায়েরি; স্মৃতির তারকোভস্কি; হিচকক-ত্রুফো কথোপকথন; কুরোসাওয়ার আত্মজীবনী; আন্তোনিওনির সিনে-জগত; কিয়ারোস্তামির সিনে-রাস্তা; সিনেঅলা [৩ খণ্ড]; বার্গম্যান/বারিমন; ডেভিড লিঞ্চের নোটবুক; ফেদেরিকো ফেল্লিনি; সাক্ষাৎ ফিল্মমেকার ফেদেরিকো ফেল্লিনি; সাক্ষাৎ ফিল্মমেকার ক্রিস্তফ কিয়েস্লোফস্কি; সাক্ষাৎ ফিল্মমেকার চান্তাল আকেরমান ।। কবিতার বই : ওপেন এয়ার কনসার্টের কবিতা; র‍্যাম্পমডেলের বাথটাবে অন্ধ কচ্ছপ; হাড়ের গ্যারেজ; মেনিকিনের লাল ইতিহাস ।। মিউজিকের বই [অনুবাদ] : আমার জন লেনন [মূল : সিনথিয়া লেনন]