চলচ্চিত্রের শ্রুতি: সংলাপ, শব্দ ও সংগীত

315
প্রসূন রহমান

লিখেছেন । প্রসূন রহমান

চার্লি চ্যাপলিন বলেছিলেন, দ্য বিগেস্ট থিং ইউ ক্যন সে ইন এ মুভি ইজ- ‘এলিফ্যান্ট’!

মাধ্যম যখন ভিজুয়াল, আমরা যখন অভিনয় শিল্পীর চোখ মুখ দেখতে পারি, তার হাসি-কান্না, সুখ-দঃখ, ক্ষুধা-যন্ত্রণা, ক্ষোভ-বিদ্বেষ সবই বুঝতে পারি, তাহলে উচ্চারণ করবার কী প্রয়োজন। অথচ কাহিনিচিত্রে আমরা প্রায়শই দেখতে পাই, অভিনয় শিল্পী হাত দুটো উপরে তুলে সজোরে হাই তুলছেন আর বলছেন- ‘আমার অনেক ঘুম পাচ্ছে!’ শিল্পীর চোখে-মুখে, আলোতে, ছায়ায়, পোশাকে, পরিবেশে ঘটমান মুহূর্তের উপস্থাপনায় আমরা যদি বুঝতে পারি তার ঘুম পাচ্ছে, তাহলে আর উচ্চারণ করবার কী প্রয়োজন! এই প্রয়োজন-অপ্রয়োজনের ভাবনাটুকইু চলচ্চিত্রে আমাদের শব্দ নিয়ে খেলার বিষয়টিকে মনে করিয়ে দেয়।

নির্বাক যুগের ছবির কথা মনে করলেই প্রথমে যে মুখটি আমাদের সামনে ভেসে ওঠে, সেটি চ্যাপলিনের মুখ। শুধুমাত্র অভিব্যক্তি দিয়েই অনেক কথা বলেছেন তিনি। কিন্তু যখন তার চলচ্চিত্রেও শব্দ যোগ হয়, তখনও বড় পরিমিত ছিলেন এই শব্দের ব্যবহারে।

যদি ইতিহাসের দিকে খানিকটা ফিরে তাকাই, আমরা জানবো, লুমিয়ের ভ্রাতৃদ্বয় ১৮৯৫ সালে যখন তাদের প্রথম ছবি প্রদর্শন করছিলেন প্যারিসে, সেখানে একজন পিয়ানো বাদক লাইভ বাজিয়েছিলেন দৃশ্যের সাথে সংযুক্তি হিসেবে। এরপর প্রযুক্তির বিবর্তনে পর্যায়ক্রমে সংলাপ ও সংগীতের সাথে যুক্ত হয় অ্যামবিয়েন্ট, ফলি সাউন্ড এবং সাউন্ড ইফেক্ট। এই চলচ্চিত্রে ব্যবহৃত শব্দ নিয়ে একটি অর্থপূর্ণ চলচ্চিত্রের নাম- শব্দ। নির্মাতা পশ্চিমবঙ্গের কৌশিক গাঙ্গুলি।

শব্দ
ফিল্মমেকার: কৌশিক গাঙ্গুলি

উপমহাদেশের চলচ্চিত্রেও যখন শব্দ যোগ হয়, এর ব্যবহার পরিমিতই ছিল। কিন্তু ক্রমশঃ সবকিছু কেমন যেন উচ্চকিত হতে থাকে। আমরা ১৯২৮ সালের সিরাজ: আ রোমান্স অফ ইন্ডিয়া চলচ্চিত্রের কথা মনে করতে পারি। মঞ্চ নাটক থেকে সেটি চলচ্চিত্রে রূপান্তর করেছিলেন জার্মান পরিচালক ফ্রাঞ্জ ওশেন। প্রধান চরিত্রের অভিনেতা এবং প্রযোজক ছিলেন হিমাংশু রায়। আগ্রার রাজ পরিবারে সেবাদাসী হিসেবে বিক্রি হয়ে যাওয়া এক তরুণীর খোঁজে আসা তার ছেলেবেলার প্রেমিক ও তার প্রেমের বিপজ্জনক পরিণতির গল্প এটি। ভারতীয় নির্বাক চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এটি দ্বিতীয় চলচ্চিত্র, যা স্টুডিওর বাইরে এসে রিয়েল লোকেশনে (তাজমহলসহ) চিত্রায়িত হয়।

সিরাজ প্রথমে শব্দহীন চলচ্চিত্র হিসেবে মুক্তি পেলেও ২০১৭ সালে এটিতে আবহসংগীত যোগ হয়। ব্রিটিশ ফিল্ম ইনস্টিটিউটের উদ্যোগে এর ডিজিটাল রেস্টোরেশন হয় এবং একইসাথে আনুশকা শংকরের সেঁতার ও সঙ্গীতে এর সাথে যুক্ত হয় আবহসংগীত। যার দুটি সংস্করণই ধ্রুপদি চলচ্চিত্রের সম্মান পেয়েছে।

আন্ডার দ স্কিন
ফিল্মমেকার: জোনাথন গ্লেজার

সবাক যুগে এসেও আমরা অনেক সংলাপহীন, বা প্রায় সংলাপ-বিহীন চলচ্চিত্রের খোঁজ পাই। এর মাঝে– অল ইজ লস্ট, ইন দ্য সিটি অব সিলভিয়া, ফ্যান্টাসিয়া, দ বিয়ার, ওয়াল ই, আন্ডার দ স্কিন, হাশ, আ কোয়াইট প্লেস, দ্য বোট এবং দ্য আর্টিস্ট উল্লেখযোগ্য। উপমহাদেশের চলচ্চিত্রের মাঝেও শ্রিনিবাসা রাও পরিচালিত পুস্পক চলচ্চিত্রের কথা বলতে পারি। কিংবা সাম্প্রতিক পশ্চিমবঙ্গের বাংলা ছবি- আসা যাওয়ার মাঝে

প্রামাণ্য চলচ্চিত্রের কথা ও বলা যায়– যেমন রন ফ্রিকের শামসারা এবং বারাকা। কিংবা গডফ্রে রেজিওর কাট্সি ট্রিলজি (কয়ানিসকাট্সি, পাওয়াকাট্সি, নাকাওয়াকাট্সি)। যার সবকটি কেবলমাত্র আবহসংগীত নির্ভর। কোনো সংলাপ, কথা বা ধারাবর্ণনা নেই।


যখন আমরা সংলাপের
ব্যবহার করছি তা
যেন আমাদের
ভারাক্রান্ত
না করে

তার মানে অডিও-ভিজুয়াল মিডিয়ায় সংলাপ বা ধারাবর্ণনা ছাড়াও গল্প বলা যেতে পারে। কিন্তু সৃজনশীল নির্মাতা মনে রাখতে চেষ্টা করেন, যখন আমরা সংলাপের ব্যবহার করছি তা যেন আমাদের ভারাক্রান্ত না করে। প্রয়াত নির্মাতা তারেক মাসুদ একদা দুঃখভরে লিখেছিলেন, ‘আমাদের নির্বাক যুগের চলচ্চিত্রে শিশিরের শব্দ শোনা যেতো, আর এখনকার চলচ্চিত্র সারাক্ষণ বকবক করে।’

চলচ্চিত্র এবং টেলিভিশন উভয় মাধ্যমেই বেশিরভাগ নির্মাণ ও উপস্থাপনা সংলাপের ভারে জর্জরিত। দুটি চরিত্র পাশাপাশি দাঁড়ানো মানেই অজস্র কথামালার ফুলঝুড়ি। উপমহাদেশের চলচ্চিত্রে অনেক কথা বলে হয়ে যায় গানের মধ্য দিয়েও। যা নির্মাতাকে গল্প বলার ক্ষেত্রে সময়কে অতিক্রম করারও একরকম সুযোগ করে দেয়।

তবে আধুনিক চলচ্চিত্রে শব্দকে দৃশ্যের প্রায় সমান গুরুত্বই দেওয়া হয়। যর্থাথ শব্দ ও সংগীতের ব্যবহার যেমন একটি মুহূর্তকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারে, তেমনি ভুল ব্যবহারও একটি মুহূর্তকে অর্থহীন করে তুলতে পারে। ক্রমে একটি চলচ্চিত্রে শব্দ সংগ্রাহক, শব্দ প্রকৌশলী, আবহসংগীত রচয়িতার যেমন বিশেষায়িত পদ তৈরি হয়েছে, তেমনি তৈরি হয়েছে শব্দ শিল্পীর। যারা চলচ্চিত্রে শ্রুত প্রতিটি শব্দকে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছেন। যে কারণে কোনো কোনো চলচ্চিত্রের সাউন্ড ডিজাইন করতে অনেক সময় পোস্ট-প্রডাকশনের বেশিরভাগ সময় ব্যয় হয়। প্রযোজককেও বরাদ্দ রাখতে হয় যথেষ্ট পরিমাণ বাজেট।

রানওয়ে
ফিল্মমেকার: তারেক মাসুদ

স্মৃতি থেকে মনে পড়ে, তারেক মাসুদ তার সর্বশেষ নির্মাণ রানওয়ে চলচ্চিত্রের সাউন্ড ডিজাইনেই প্রায় ৪ মাস সময় দিয়েছিলেন। সংগীতের ব্যবহারে উনি যা চাইছিলেন, তা দিতে ব্যর্থ হতেও দেখেছি দুজন স্বনামধন্য সঙ্গীত পরিচালককে।

আমরা জেনেছিলাম সত্যজিৎ রায় তার শেষ দিককার সব ছবিতে নিজেই সংগীত পরিচালক হিসেবেও আর্বির্ভূত হয়েছিলেন। প্রথমদিককার সব ছবিতে রবিশংকর আবহসংগীত নির্মাণ করলেও এক সময় দুজনের মধ্যে বোঝাপড়ার সমস্যা হতে থাকে। পরে রায় বাবু নিজেই সেটির দায়িত্ব নেন। তার নিজের সংগীতবিষয়ক জ্ঞানকেও তিনি কাজে লাগিয়েছেন যথার্থভাবে।

একটি সৃজনশীল চলচ্চিত্র সবদিকে থেকে নিখুঁত হয়ে উঠবার পেছনে সময় ও বরাদ্দ অর্থ একটি নিয়ামক হয়ে ওঠে। কিন্তু চলচ্চিত্র নির্মাণ প্রক্রিয়ায় যে কর্ম বিভাজন এতে শব্দ একটা সময় খুব বেশি গুরুত্ব না পেলেও এখন পরিস্থিতি পাল্টেছে। আমাদের প্র্যাকটিসেও এক সময় অন-লোকেশন সাউন্ড রেকর্ডিং বলে কিছু ছিল না। কিন্তু সৃজনশীল নির্মাতারা স্টুডিওর বাইরের কোলাহলময় লোকেশনেও চেষ্টা করছেন অন-লোকেশন শব্দ ধারনের। যদিও অনেক ক্ষেত্রেই ডাবিংয়ের প্রয়োজন পড়ছে, তবু গাইড ট্র্যাক হিসেবে হলেও সেটি নিয়ে রাখার চেষ্টা করছেন। এক্ষেত্রে ডিজিটাল প্রযুক্তিও অনেক শব্দধারক যন্ত্রকে সহজলভ্য করে দিয়েছেন।

অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে একজন নির্মাতা এখন প্রযুক্তিগত দিক থেকে অনেক স্বাধীন ও সুবিধাপ্রাপ্ত। যা একইসাথে যেমন সহজলভ্য, তেমনি সাশ্রয়ী। এরপরও যদি আমাদের অর্থপূর্ণ নির্মাণের পরিমাণ কম হয়, সৃজনশীল ও প্রযুক্তিগত দিক থেকে উন্নত না হয়, তাহলে সেটি আমাদেরই ব্যর্থতা।

একটি চলচ্চিত্রে শিল্পের সবগুলো শাখা এসে মিলিত হলেও মাধ্যম হিসেবে যেহেতু এটি প্রযুক্তি নির্ভর, তাই প্রযুক্তির উপরেও আমাদের দখল বাড়ানোর চেষ্টা চলতে থাকবে নিশ্চয়ই।


প্রথম প্রকাশ: রুপালী ক্যানভাস
[লেখকের অনুমতিক্রমে পুনঃপ্রকাশিত]
Print Friendly, PDF & Email
লেখক ও ফিল্মমেকার; ঢাকা, বাংলাদেশ ।। ফিচার-ফিল্ম: সুতপার ঠিকানা [২০১৫]; জন্মভূমি [২০১৮]; ঢাকা ড্রিম [২০২১] । ডকু-ফিল্ম: ধান ও প্রার্থণা [২০০৮]; দ্য ওয়াল [২০০৯]; ফেরা [২০১২]; নিগ্রহকাল [২০১৯]; নদী ও নির্মাতা [২০১৯]; ব্যালাড অব রোহিঙ্গা পিপল [২০২০]; এই পুরাতন আখরগুলি [২০২০] ।। প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান: ইমেশন ক্রিয়েটর ।। উপন্যাস: ধূলার অক্ষর [২০০৯]। কাব্যগল্প: ঈশ্বরের ইচ্ছে নেই বলে [২০০৯]। কলাম সংকলন: সৃজনশীলতার সংকটে স্যাটেলাইট চ্যানেল [২০১২]। ফিল্ম-বুক [সম্পাদনা]: চলচ্চিত্রযাত্রা [তারেক মাসুদের চলচ্চিত্র বিষয়ক লেখার সংকলন]। ওয়েবসাইট: www.imationcreator.com

মন্তব্য লিখুন

Please enter your comment!
Please enter your name here