ই্যরি মেঞ্জেলের সঙ্গে আলাপ

0
100
ই্যরি মেঞ্জেল jiří menzel

সাক্ষাৎকার । নিক ডসন
ভূমিকা ও অনুবাদ । রুদ্র আরিফ

অনুবাদকের নোট
৮২ বছর বয়সে চিরতরে চোখ বুজলেন চেক নিউ ওয়েভের মাস্টার ফিল্মমেকার ই্যরি মেঞ্জেল [২৩ ফেব্রুয়ারি ১৯৩৮–৫ সেপ্টেম্বর ২০২০]। চলচ্চিত্রে হাস্যরস ও স্মৃতিকাতরতার মিশ্রণে জীবনের এক তিক্ত-মধুর রূপ ফুটিয়ে তোলায় পারদর্শী ছিলেন তিনি।

সমকালীন আরও অনেক ফিল্মমেকারের মতো, ক্যারিয়ারের উড়ুক্কু বেলায় তাকেও পড়তে হয় তৎকালীন চেকোস্লোভাকিয়ান কমিউনিস্ট সরকারের রোষানলে। দীর্ঘদিন ফিল্মমেকিংসহ সিনেমাসংশ্লিষ্ট যেকোনো কর্মকাণ্ড থেকে নিষিদ্ধ করা হয় তাকে। সেই প্রবল প্রতিকূল সময়ে সহযোদ্ধাদের কেউ কেউ বিদেশে, বিশেষত হলিউডের চাকচিক্যময় জগতে পা বাড়ালেও নিজের জন্য তেমন সমাধান পছন্দ হয়নি ই্যরির। নিপীড়ন সয়ে স্বদেশেই থেকে গেছেন।

১৯৬৬ সালে নির্মিত ‘ক্লোজলি ওয়াচড ট্রেনস’ সিনেমা দিয়ে অস্কার জয়সহ আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র মণ্ডলে ব্যাপক পরিচিতি পাওয়া ই্যরি জীবনের শেষ ফিচার ফিল্ম বানিয়েছেন ২০১৩ সালে, ‘দ্য ডন জুয়ান’। মাঝখানে আরও বানিয়েছেন ‘ক্রাইম ইন অ্যা মিউজিক হল’ [১৯৬৮], ‘লার্কস অন অ্যা স্ট্রিং’ [১৯৬৯], ‘হু লুকস ফর গোল্ড?’ [১৯৭৪], ‘দোজ ওয়ান্ডারফুল মুভি ক্রেঙ্কস’ [১৯৭৮], ‘মাই সুইট লিটল ভিলেজ’ [১৯৮৫], ‘এন্ড অব দ্য ওল্ড টাইমস’ [১৯৮৯], ‘লাইফ অ্যান্ড এক্সট্রাঅর্ডিনারি অ্যাডভেঞ্চারস অব প্রাইভেট ইভান চোনকিন’ [১৯৯৩], ‘আই সার্ভড দ্য কিং অব ইংল্যান্ড’ [২০০৬] প্রভৃতি।

প্রিয় পাঠক, নিক ডসনের নেওয়া এবং ‘ফিল্মমেকার ম্যাগাজিন’-এ ২৮ আগস্ট ২০০৮-এ প্রকাশ পাওয়া এই সাক্ষাৎকারের সূত্র ধরে, চলুন মাস্টার ফিল্মমেকার ই্যরি মেঞ্জেলকে বিদায়ী সালাম জানানো যাক…


ই্যরি মেঞ্জেল
ই্যরি মেঞ্জেল
জন্ম । ২৩ ফেব্রুয়ারি ১৯৩৮; প্রাগ, চেক প্রজাতন্ত্র
মৃত্যু । ৫ সেপ্টেম্বর ২০২০; প্রাগ, চেক প্রজাতন্ত্র

সাক্ষাৎকার

নিক ডসন :: বহুমিল হ্রাবালের [১৯১৪-১৯৯৭] বেশ কিছু সাহিত্যকর্ম অবলম্বনে আপনি সিনেমা বানিয়েছেন। তার লেখার বিশেষ কোন জিনিস আপনাকে আকৃষ্ট করে?

ই্যরি মেঞ্জেল :: হ্রাবালের লেখা চেকোস্লোভাকিয়ায় যখন প্রকাশ হতে শুরু করল, তখন থেকেই ওগুলো আমার সত্যিই ভালোলাগে। হ্রাবালের লেখা যথেষ্ট দেরি করে ছাপা হয়েছে। তিনি অনেক আগে থেকেই লিখছিলেন। কিন্তু ১৯৫০-এর দশকের স্তালিনবাদী সাহিত্যের ছাঁচে তার লেখা মোটেও মানানসই ছিল না; তাই তার লেখালেখির প্রকাশ বেশ দেরিতে ঘটে। ১৯৬০-এর দশকের শুরুতে এগুলো প্রকাশ পেতে শুরু করল– প্রথমে বিভিন্ন ম্যাগাজিনে, তারপর বই আকারে।

যখনই ছাপা হতে শুরু করল, হ্রাবালের লেখার প্রেমে পড়ে গেলাম আমি। কেননা, চেক সাহিত্য আমি ভালোবাসি, এবং কারেল সাপেকের [১৮৯০-১৯৩৮] মতো সাহিত্যিকদের লেখায় তৈরি চেক সাহিত্যের অতুলনীয় ঐতিহ্যের একটি ধারাবাহিকতা হ্রাবালের মধ্যে দেখতে পেয়েছিলাম।


আমাদের
পুরো প্রজন্মই
হ্রাবালের লেখার
প্রেমে পড়ে গিয়েছিল

আমি একা নই, বরং আমাদের পুরো প্রজন্মই হ্রাবালের লেখার প্রেমে পড়ে গিয়েছিল। যখন আমার একদল সমকালীন ফিল্মমেকার সিদ্ধান্ত নিলেন, হ্রাবালের সাহিত্যকর্ম অবলম্বনে, ছোটগল্পগুলো নিয়ে একসঙ্গে একটা সিনেমা বানাবেন, সেই প্রকল্পে তারা আমাকেও যুক্ত হতে বললেন। পার্লস অব দ্য ডিপ নামের ওই শর্টফিল্মগুলোর কাজ করতে গিয়েই হ্রাবালের সঙ্গে দেখা করলাম আমি; পরবর্তীকালে নিশ্চিতভাবেই ক্লোজলি ওয়াচড ট্রেনস বানাতে গিয়ে তার সঙ্গে ব্যাপকভাবে কাজ করার সুযোগ পেয়েছি।

সেই সময় থেকে হ্রাবালের মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্ব টিকে ছিল আমার।

নিক :: হ্রাবালের সঙ্গে আপনার ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কারণেই কি তার সঙ্গে যৌথভাবে এত বেশি কাজ করেছেন?

ই্যরি:: হ্রাবালের লেখালেখি ছাপার অনুমতি যখন ছিল না এবং আমার নিজেরও যখন ছিল না সিনেমা বানানোর অনুমতি, সেই সময়েই তার সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্ক বেশি গাঢ় হয়ে ওঠে। সে সময়ে হ্রাবালের গ্রীষ্মকালীন বাড়িতে আমি প্রচুর সময় কাটিয়েছি, এবং তার শিল্পগত স্তর ছাড়িয়ে আরও গভীরভাবে তাকে বুঝতে পেরেছি।

ই্যরি মেঞ্জেল বহুমিল হ্রাবাল

নিক :: আপনাদের দুজনের বিশেষ শিল্পগত সংযোগ কী ছিল?

ই্যরি :: মানুষকে দেখার, তাদেরকে তাদের সত্যিকারের রূপে– একেবারেই সত্যিকারের আপসহীন দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখা সত্ত্বেও ভালোবাসার যে সক্ষমতা হ্রাবালের ছিল, সেটি আমাকে সবসময়ই মুগ্ধ করত। কোনোভাবেই মনুষ্যবিদ্বেষী ছিলেন না তিনি। বিপরীতে বলতে পারি, অতি সাম্প্রতিক চেক সাহিত্যিকদের এবং সার্বিকভাবে বিশ্ব সাহিত্যের দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে আমি একটা প্রবল মনুষ্যবিদ্বেষী প্রবণতার দেখা পাই, যেটি হ্রাবালের কাজে ছিল না; বরং সেখানে মানুষের প্রতি ভালোবাসাই সত্যিকার অর্থে ছিল হাজির।

নিক :: আপনি আর হ্রাবাল একটি অভিন্ন বিশ্বদর্শনের অধিকারী ছিলেন– এমনটা মনে হয় আপনার?

ই্যরি :: এমনটা বলা যেতেই পারে বলে মনে করি; একইভাবে বলতে পারেন, হ্রাবালের আইডিয়া ও দৃষ্টিভঙ্গিগুলো আমাকে প্রভাবিত করেছে। শিল্প সম্পর্কে সার্বিকভাবে আমার নিজস্ব আইডিয়াগুলোতে অন্য অনেক চেক লেখকের প্রভাব পড়েছে ঠিকই, তবে সম্ভবত হ্রাবালের প্রভাবই পড়েছে ব্যাপক মাত্রায়।

দ্য লাইফ অ্যান্ড এক্সট্রাঅর্ডিনারি অ্যাডভেঞ্চারস অব প্রাইভেট ইভান চোনকিন

নিক :: আপনার সর্বশেষ [সাক্ষাৎকার গ্রহণকালের হিসেবে] ফিচার ফিল্ম আই সার্ভড দ্য কিং অব ইংল্যান্ড-এর সঙ্গে এর ঠিক আগের সিনেমা দ্য লাইফ অ্যান্ড এক্সট্রাঅর্ডিনারি অ্যাডভেঞ্চারস অব প্রাইভেট ইভান চোনকিন-এর মধ্যে ১২ বছরের ব্যবধান। ফিল্মমেকিংয়ে এত বড় গ্যাপ হওয়ার কারণ কী?

ই্যরি :: দেখুন, আমার মনে আবেদন তৈরি করার মতো কোনো কাজের প্রস্তাব আসলে দীর্ঘদিন পাইনি। অবশেষে যখন এই সিনেমা করার প্রস্তাব এলো, নিশ্চিতভাবেই এটির প্রতি ভীষণ উৎসাহী হয়ে উঠি।

আমার ধারণা, সিনেমা বানানোর জন্য টাকা কীভাবে জোগাতে হয়, চেক প্রজাতন্ত্রে এখন সেটি একটি বড় ব্যাপার; আর এ কাজ কী করে করতে হয়, আমি আসলেই জানি না। এই সিনেমায় আমি সত্যি নিজেকে জড়িয়ে নিয়েছিলাম, আর এই প্রকল্প সত্যিকার অর্থেই তৈরি হওয়ার জন্য প্রস্তুত হয়ে ছিল। সিনেমাটিতে আগে থেকেই আমার পক্ষপাত ছিল। এই প্রকল্প আমার মনে আবেদন তৈরি করেছিল এবং এটিকে তৈরি করা যৌক্তিক বলে মনে হয়েছে।

নিক :: আমি জেনেছি, ১৯৯০-এর দশকে, যখন হ্রাবাল জীবিত, তখনই এই সিনেমা বানানোর কথা ছিল আপনার; এবং এই প্রোডাকশনের ইতিহাস বেশ রূঢ়।

ই্যরি :: ঠিকই বলেছেন; আমরা একসঙ্গে এটির কাজ শুরু করেছিলাম। কিন্তু এক পর্যায়ে এর স্বত্বাধিকারী এই প্রকল্প একটি বেসরকারি টেলিভিশন কোম্পানির কাছে বিক্রি করে দেন। সেই পর্যায়ে এটির স্বত্ব হারাতে হয়েছিল বলে একটি ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে আমি জনসমক্ষে এর প্রডিউসারকে মারধর করেছিলাম।

অবশেষে, বহু বছর পর একে একটি পূর্ণাঙ্গ সিনেমা বানানোর প্রস্তাব নিয়ে এটির স্বত্ব আবার আমার কাছে চলে আসে।

নিক :: এই সিনেমা যে সময়কাল ধারণ করেছে, সেটি আসলে আপনার জন্মেরও আগের সময় কিংবা যখন আপনি একেবারেই অল্পবয়সী; অথচ এটিকে আপনি চেক ইতিহাসের একটি সামগ্রিক রূপের সূচক হিসেবে ধারণ করেছেন?

ই্যরি :: একটি একেবারেই প্রধান বাক্য এই সিনেমায় আবির্ভূত হলেও মূল বইয়ে ছিল না: ‘চেকরা যুদ্ধ বাঁধায় না।’ এটি সম্ভবত চেক ইতিহাসের একটি ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ থিম।

আই সার্ভড দ্য কিং অব ইংল্যান্ড

নিক :: যে সময়কালে বেশিরভাগ মানুষকেই ব্যাপক ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে, সিনেমাটি নানাদিক থেকেই ইতিহাসের সেই সময়কালের প্রতি একটি প্যারাডক্স, একটি স্নেহময় ও স্মৃতিকাতর ফিরে দেখা। আপনি এভাবে এটিকে দেখানোর ফ্রেম বেছে নিলেন কেন?

ই্যরি :: এই মনোভাবও বোধহয় আমি হ্রাবালের সাহিত্যকর্ম থেকেই আয়ত্ত্ব করেছি। হ্রাবাল এ পথই বেছে নিয়েছিলেন এবং আবিষ্কার করেছিলেন। এই সিনেমার কাহিনিতে যা বলা কিংবা অর্জন করা হয়েছে, তাতে যদি কোনো শিক্ষা বা নৈতিকতা থেকে থাকে, তাহলে সেটি খুব বেশি রূঢ়ভাবে বলার উপায় ছিল না; বরং যেন কোনো বন্ধুকে বন্ধুবৎসল তরিকায় বলা হচ্ছে– এমনটা হওয়ারই ছিল।

নিক :: হ্যাঁ, একে দেখতে আসলেই কোনো জঘন্য সময়ের সুন্দর জীবনের একটি উপলব্ধি বলে মনে হয়।

ই্যরি :: এ একটি বুনো বৈপরীত্য। কালো কোনো কিছুর প্রতি কারও মনোযোগ টানতে চাইলে সেটির ব্যাকগ্রাউন্ডে আপনাকে সাদা জুড়ে দিতে হবে।


যখন
১০ বছরের
বালক ছিলাম,
সেই বয়স থেকেই
মেয়েদের প্রতি আমার
আচ্ছন্নতা
রয়েছে

নিক: এই সিনেমার আরেকটি দিক হলো, তরুণীদের প্রতি বুড়ো পুরুষদের উল্লাসমুখরতা।

ই্যরি :: এটি আমি হ্রাবালের কাছ থেকে নিয়েছি; তবে কোনো বুড়ো লোকের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বিশেষভাবে দেখাইনি। যখন ১০ বছরের বালক ছিলাম, সেই বয়স থেকেই মেয়েদের প্রতি আমার আচ্ছন্নতা রয়েছে।

নিক :: সিনেমায় একটি সংলাপ রয়েছে, যেখানে এর নায়ক ইয়ান দিতে’কে বলা হয়, ‘তুমি ছোট, এবং ছোট মানুষদের লোক।’ এই বাক্য কি সার্বিকভাবে চেক মানুষদের বেলায়ও প্রযোজ্য?

ই্যরি :: এটিও আমার আইডিয়া নয়, বরং হ্রাবালের বই থেকে সরাসরি নেওয়া। তবে আমি বরং বলি, ছোট মানুষদের সংঘবদ্ধ থাকার এবং পরস্পরের কাজে লাগার আইডিয়া থেকেই এর উৎপত্তি। কেননা, সবচেয়ে বড় কথা, দিতে’কে কথাটি আরেকজন ছোট মানুষই বলেছে। এ কথা নিঃসঙ্গতার মর্ম থেকে বলা।

ক্লোজলি ওয়াচড ট্রেনস

নিক :: বহু বছর পেছনে তাকিয়ে একটু বলুন, অতি অল্প বয়সে পাওয়া ক্লোজলি ওয়াচড ট্রেনস-এর ব্যাপক সাফল্য আপনার ক্যারিয়ারে কতটুকু প্রভাব ফেলেছিল?

ই্যরি :: প্রভাব আসলে খুবই অল্পকালই পড়েছিল; কেননা, (‘বেস্ট ফরেন ল্যাঙ্গুয়েজ ফিল্ম’ ক্যাটাগরিতে সিনেমাটি অস্কার পাওয়ার) মাত্র চার মাস পরই (তৎকালীন চেকোস্লোভাকিয়ায়) রাশিয়ান ট্যাঙ্কের আগমন ঘটে এবং আমার ক্যারিয়ার বাধাগ্রস্ত ও সত্যিকার অর্থেই একটি অনির্দিষ্টকালের জন্য লাইনচ্যুত হয়ে যায়।

নিক :: আপনার সমকালীন চেক ফিল্মমেকারদের মধ্যে ইভান পাসার [১৯৩৩-২০২০] ও মিলোস ফরমান [১৯৩২-২০১৮] সেই সময়ে হলিউডে পাড়ি জমান। আপনিও কি সেরকম কিছু করার কথা ভেবেছিলেন?

ই্যরি :: একেবারেই সুনির্দিষ্ট হতাশাজনক মুহূর্তগুলোতে আমিও তেমনটাই ভেবেছিলাম; নিজ দেশে আমার পক্ষে আর কিছুই করা সম্ভব নয়– স্রেফ এই ভাবনা থেকেই। কিন্তু মিলোস যা করেছেন, তা করার কোনো আকাঙ্ক্ষা আমার কখনোই ছিল না।

নিক :: ফরমানের মতো আমেরিকায় পাড়ি জমিয়ে নিজের ক্যারিয়ারের পথ বেছে নেওয়ার কথা কখনো ভেবেছিলেন?

ই্যরি :: এমন কর্মের ভালো কোনো ফল হতে পারত– আমার তা মনে হয় না; ফরমানের মতো ওই ধরনের যথেষ্ট ভিত্তিগত স্পৃহা, ওই ধরনের শক্তি আমার নেই।

নিক :: তাহলে এখনো সিনেমা বানানোর স্পৃহা আপনি কী করে পান?

ই্যরি :: কারণ, এটাই আমার কর্ম।

নিক :: নিজের এই কর্ম থেকে কখনো অবসর নিতে পারবেন– এমনটা অনুভব করেন?

ই্যরি :: এটা সম্ভব নয়। কেউ যখন রাস্তায় দেখা হলে আমাকে বলেন, ‘আপনার সিনেমা আমার ভালোলাগে,’ তখন আমারও ভালোলাগে। এমন ঘটনা আমাকে খুব তৃপ্তি দেয়।


সমালোচকদের
জন্য কিংবা বিখ্যাত
হওয়ার জন্য সিনেমা বানাইনি

নিক : আপনার এক সাক্ষাৎকারে পড়েছি, নিজেকে আপনি অনেকটাই ওয়াইল্ডধর্মী [আইরিশ কবি অস্কার ওয়াইল্ড; ১৮৫৪-১৯০০] মনে করেন: ‘প্রতিভার কথা বাদ দিলে, বিনয়ই আমার একমাত্র চারিত্রিক ত্রুটি।’ যদিও এটি নিশ্চিতভাবেই এক ধরনের কথার কথা; তবে নিজের ভেতর কতটুকু ‘প্রতিভা’ আপনি অনুভব করেন এবং সেটির কতটুকুই দুনিয়ার পক্ষে ধরতে পারা সম্ভব হয়েছে বলে আপনার ধারণা?

ই্যরি :: দেখুন, নিজের অর্জন নিয়ে পুরোপুরি সত্যিকার অর্থেই তৃপ্ত– এমন কথা নিশ্চয়ই কেউ কখনো বলতে পারে না; তবে সামগ্রিকভাবে এক ধরনের তৃপ্তি তো হয়ই। একদম শুরু থেকেই চেয়েছিলাম আমার কাজের যেন তাৎপর্য থাকে এবং লোকে যেন আমার সিনেমাগুলো দেখেন ও পছন্দ করেন।

সমালোচকদের জন্য কিংবা বিখ্যাত হওয়ার জন্য সিনেমা বানাইনি আমি; বরং চেয়েছি গণমানুষ যেন সেগুলো উপভোগ করেন। তারা সিনেমাগুলো দেখতে যাবেন, এমনকি সেগুলো চটুল না হলেও।

হু লুকস ফর গোল্ড?

নিক :: ফিল্মমেকিং আপনার কর্ম ছিল বলেই এটি চালিয়ে গেছেন– এ কথা দিয়ে ঠিক কী বোঝাতে চেয়েছেন?

ই্যরি :: ফিল্মমেকিংকে আমার কাছে যতদিন তাৎপর্যপূর্ণ মনে হবে, লোকেরা যতদিন দেখবেন ও পছন্দ করবেন– ততদিন আমি সিনেমা বানিয়ে যাব। সেই সম্ভাবনা যতদিন থাকবে, ততদিন সিনেমা বানানোর প্রয়োজনীয়তা আমি অনুভব করে যাব।

নিক :: ফিল্মমেকার হিসেবে আপনি আন্তর্জাতিকভাবে বিখ্যাত; কিন্তু বহু বছর ধরে চেক সিনেমায় অভিনয়ও যে করেছেন, এ তথ্য ততটা পরিচিত নয়। একটি সময়কালে সিনেমা বানাতে সক্ষম ছিলেন না বলেই কি অভিনয় শুরু করেছিলেন?

ই্যরি :: এর সঙ্গে সেন্সরশিপের কোনো সম্পর্ক নেই। যখন আমার ওপর ফিল্মমেকিংয়ে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হলো, তখন অভিনয় কিংবা সিনেমাসংশ্লিষ্ট যেকোনো কর্মকাণ্ডেই নিষিদ্ধ ছিলাম। কোনো সহজাত কিংবা পেশাদার অভিনেতা আমি নই; বরং আমার অভিনীত প্রথম চলচ্চিত্রের [অ্যাকুয়েসড] জন্য ছিলাম স্রেফ ঠিকঠাক লোক। সিনেমাটি বানিয়েছেন স্লোভাক ফিল্মমেকার (ইয়ান) কাদার [১৯১৮-১৯৭৯]। লোকে আমাকে ওই সিনেমায় দেখে ধরে নিলেন, আমি অভিনেতা। তারপর তারা আমাকে একের পর এক কাস্ট করতে লাগলেন, আমিও অভিনয় করে গেলাম।

সিনেমার পাশাপাশি বেশ কিছু মঞ্চনাটকেও সাফল্যের সঙ্গে অভিনয় করেছি; তবু নিজেকে কোনো সহজাত কিংবা পেশাদার অভিনেতা মোটেও ভাবি না।

নিক :: ফিল্মমেকার হিসেবে কাজ করার সময় আপনার অভিনয় প্রতিভা কতটুকু কাজে লাগে?

ই্যরি :: অভিনেতাদের সঙ্গে খুবই চমৎকার কোমল করি আমি।

দ্য ডন জুয়ানস

নিক :: আমি পড়েছি, মঞ্চনাটকই ছিল আপনার প্রথম প্রেম এবং শুরুতে আপনি ফিল্ম স্কুলে ভর্তি হওয়ার চেয়ে বরং থিয়েটার নিয়েই পড়তে চেয়েছিলেন। মঞ্চের প্রতি এখনো একই ধরনের অনুরাগ অনুভব করেন? সিনেমার প্রতি আপনার যে অনুরাগ, সেটির সঙ্গে একে কীভাবে তুলনা করবেন?

ই্যরি :: হ্যাঁ, মঞ্চনাটকই আমার প্রথম প্রেম ছিল এবং আমি মঞ্চেই কাজ করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু প্রতিভায় ঘাটতি ছিল বলে ড্রামা একাডেমি আমাকে ভর্তি করায়নি। সে সময় খেয়াল করলাম, টেলিভিশন একটি উদীয়মান মাধ্যম; খেয়াল করলাম, টেলিভিশনের জন্য অপেক্ষাকৃত কম মেধা ও সক্ষমতার অভিনেতার দরকার পড়বে। এ কারণে ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন একাডেমিতে [সে সময় এটি একটি অভিন্ন একাডেমি ছিল] ভর্তির আবেদন করলাম। ভাগ্য ভালো, সেখানে গ্রেট চেক ফিল্মমেকার ওতাকার ভাভ্রার [১৯১১-২০১১] কাছে ফিল্মমেকিংয়ের পাঠ নিতে পেরেছি।


হাইস্কুলের
প্রথম রিপোর্ট কার্ড
হাতে পাওয়ার পর বাবা
আমার পিঠে একটা
রড ভেঙেছিলেন

নিক :: স্কুলে আপনি কেমন ছিলেন: স্মার্ট ছাত্র, ক্লাস ক্লাউন নাকি হাবাগোবা?

ই্যরি :: খারাপ ছাত্র ছিলাম। হাইস্কুলের প্রথম রিপোর্ট কার্ড হাতে পাওয়ার পর বাবা আমার পিঠে একটা রড ভেঙেছিলেন!

নিক :: এ কারণে পড়াশোনায় আরও বেশি মন দিতে শুরু করেছিলেন?

ই্যরি :: জীবনেও না!

নিক :: তাহলে আপনার সাফল্যের রহস্য কী?

ই্যরি :: আমার আসলে কপাল ভালো!

ই্যরি মেঞ্জেল, জীবনের শেষ সিনেমা দ্য ডন জুয়ানস-এর শুটিংয়ে

নিক :: এমন কোনো সিনেমা আছে, যেটি আকাঙ্ক্ষা থাকলেও বানাতে পারেননি?

ই্যরি :: দ্য বাইবেল। কিন্তু ওই বর্ণনার সঙ্গে অন্য কোনো কিছু মানাবে বলে মনে হয় না।

নিক :: একজন ফিল্মমেকারের কি সবসময়ই ঝুঁকি নেওয়া উচিত?

ই্যরি :: না; কেননা, তিনি তার নিজের টাকায় কাজ করছেন না।

নিক :: তার মানে, আপনি নিজে কোনোদিনও ঝুঁকি নেননি?

ই্যরি :: ঝুঁকি নিতে আমার ভালোলাগে না; দেখিয়ে বেড়াতে [প্রদর্শনবাদ বা এক্সিবিশনিজম] আমার ভালোলাগে না।


দর্শকদের
ছোট
করে
দেখবেন না

নিক :: শেষ প্রশ্ন, উদীয়মান ফিল্মমেকারদের আপনি কী পরামর্শ দেবেন?

ই্যরি :: যাদের নিয়ে কাজ করছেন, তাদের সঙ্গে একটা ভালো সম্পর্ক গড়ে তুলুন। অন্যদিকে, দর্শকদের ছোট করে দেখবেন না, তাদের অপমান করবেন না কিংবা তাদের নিয়ে মজা কুড়াবেন না।

Print Friendly, PDF & Email
শেয়ার
সম্পাদক : ফিল্মফ্রি । ঢাকা, বাংলাদেশ।। সিনেমার বই [সম্পাদনা/অনুবাদ] : ফিল্মমেকারের ভাষা [৪ খণ্ড : ইরান, লাতিন, আফ্রিকা, কোরিয়া]; ফ্রাঁসোয়া ত্রুফো : প্রেম ও দেহগ্রস্ত ফিল্মমেকার; তারকোভস্কির ডায়েরি; স্মৃতির তারকোভস্কি; হিচকক-ত্রুফো কথোপকথন; কুরোসাওয়ার আত্মজীবনী; আন্তোনিওনির সিনে-জগত; কিয়ারোস্তামির সিনে-রাস্তা; সিনেঅলা [৩ খণ্ড]; বার্গম্যান/বারিমন; ডেভিড লিঞ্চের নোটবুক; ফেদেরিকো ফেল্লিনি; সাক্ষাৎ ফিল্মমেকার ফেদেরিকো ফেল্লিনি ।। কবিতার বই : ওপেন এয়ার কনসার্টের কবিতা; র‍্যাম্পমডেলের বাথটাবে অন্ধ কচ্ছপ; হাড়ের গ্যারেজ; মেনিকিনের লাল ইতিহাস ।। মিউজিকের বই [অনুবাদ] : আমার জন লেনন [মূল : সিনথিয়া লেনন]

মন্তব্য লিখুন