নগরকীর্তন: অন্য এক প্রেমের গল্প

0
265
নগরকীর্তন

লিখেছেন । নাফিস সাদিক

নগরকীর্তন
The Eunuch and the Flute Player
ফিল্মমেকার, স্ক্রিনরাইটার । কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়
প্রডিউসার । অ্যাক্রোপলিস এন্টারটেনমেন্ট প্রাইভেট লিমিটেড
সিনেমাটোগ্রাফার । শীর্ষ রায়
মিউজিক । প্রবুদ্ধ বন্দ্যোপাধ্যায়
এডিটর । শুভজিৎ সিংহ
কাস্ট [ক্যারেকটার] । ঋদ্ধি সেন [পরিমল/ পুটি]; ঋত্বিক চক্রবর্তী [মধু]; মানবী বন্দ্যোপাধ্যায় [স্বয়ং]; শঙ্করী মণ্ডল নস্কর [আরতি]
রানিংটাইম । ১১৫ মিনিট
ভাষা । বাংলা
দেশ । ভারত
রিলিজ । ২০১৭


প্রেমের কি নির্দিষ্ট কোনো প্যাটার্ন আছে? কে কার প্রেমে পড়বে, সেটা কি নির্দিষ্ট করে দেওয়া সম্ভব? হয়তো না। ঠিক এ কারণেই পৃথিবীজুড়ে প্রেমের গল্পগুলোও বিচিত্র। প্রেমের কাছে তুচ্ছ হয়ে যায় সবকিছু– গায়ের রঙ, বয়স, অর্থ-বিত্ত। বৃদ্ধ প্রেমে পড়তে পারে কিশোরীর, উচ্চবিত্ত মেয়েটির হৃদয়ের সন্ধান পেতে পারে সাধারণ ঘরের কোনো তরুণ।

বিচিত্র সব প্রেমের গল্পের রেণু ছড়িয়ে রয়েছে পৃথিবীর বুকজুড়ে। তবু মানুষ প্রেমকে একটি নির্দিষ্ট প্যাটার্নে ফেলতে চায়। কিছু প্রেম সহজেই মেনে নিতে পারে, আবার কিছু প্রেম হয় প্রথাবিরুদ্ধ। এমনই একটি প্রথাবিরুদ্ধ প্রেম, এ সমাজ যাকে মেনে নেবে না জানা সত্ত্বেও ঘটে– তারই মর্মস্পর্শী গল্প বলেছেন কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায় তার নগরকীর্তন চলচ্চিত্রে। ২০১৭ সালে নির্মিত এই চলচ্চিত্রটি গত বছর বড়পর্দায় মুক্তির পরে সম্প্রতি অনলাইন স্ট্রিমিং প্লাটফর্মে মুক্তি পেয়েছে।

নগরকীর্তন নিয়ে আলাপের শুরুতেই ‘হিজড়া’ সম্প্রদায় নিয়ে কিছুটা আলাপ হওয়া জরুরি। অশোভন বিবেচনায় ২০১৩ সাল থেকে সরকারিভাবে ‘হিজড়া’র পরিবর্তে ‘তৃতীয় লিঙ্গ’ শব্দটির প্রচলন করা হয়েছে। তবে আমি এখানে ‘হিজড়া’ শব্দটিই ব্যবহার করছি, কারণ সেই নামেই আমাদের সমাজ তাদেরকে দেখতে অভ্যস্ত এবং এই লেখাতেও এই শব্দ ব্যবহার করে তাদেরকে কোনোভাবে অবজ্ঞা করা উদ্দেশ্য নয়।

হিজড়াদের নিয়ে মানুষের প্রতিক্রিয়া কিংবা অভিজ্ঞতা– কোনোটিই সুখকর নয়। বাসে- ট্রেনে যাত্রাপথে দুই হাতের তালু এক করে বিশেষ কায়দায় তালি দিয়ে এরা আকস্মিকভাবে বলে ওঠে, ‘অ্যাই ট্যাকা দে, টাকা দে।’ শিশুরা তাদের দেখে আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। আবার সদ্য জন্ম নেওয়া কোনো শিশুর খবর পেলে তারা সেই বাড়িতে উপস্থিত হয়, দাবি করে বসে মোটা অঙ্কের টাকা। তাদের নিয়ে আমাদের বিরক্তির সীমা থাকে না– ‘এরা আসে কোথা থেকে?!’

নগরকীর্তন

প্রেমের যেমন নানা রূপ আছে, তেমনিভাবে লৈঙ্গিকসত্তারও আছে অজস্র রূপ। কোষের মোট ২৩ জোড়া ক্রোমোজমের মধ্যে ২২ জোড়া মানুষের দৈহিক গঠন সৃষ্টি করে, অবশিষ্ট এক জোড়া ক্রোমোজম লিঙ্গ নির্ধারণ করে। এই সেক্স ক্রোমোজমের যে স্বাভাবিক গঠন [নারীর জন্য XX এবং পুরুষের জন্য XY], প্রকৃতির অদ্ভূত খেয়ালে তা মাঝে মাঝে পরিবর্তিত হয়ে XXX বা XXY হয়ে যায়। দেখা দেয় বিচিত্র সব সমস্যা। কারও দেহে নারী ও পুরুষ– দু’ ধরনের লৈঙ্গিক বৈশিষ্ট্যই প্রকাশ পায়। কারও আবার শরীরের ভেতর এবং বাইরে লৈঙ্গিক পরিচয় নির্ধারণী অঙ্গগুলোর গঠন দু’রকম হয়। কেউ আবার পুরুষের দেহে নারীর মন নিয়ে আটকা পড়ে যায় আজীবন।

প্রকৃতির এই অদ্ভুত খেয়াল বা অস্বাভাবিকতাকে সাধারণ মানুষ সহ্য করতে পারে না। একদিকে হাসি-তামাশা, অন্যদিকে প্রবল অবজ্ঞায় বিপর্যস্ত করে ফেলতে চায় তাদের জীবন। যে ছেলের মধ্যে সামান্য মেয়েলি স্বভাব দেখা যায়, তাকে পাড়ার ছেলেরা ‘হাফ লেডিস’, ‘হিজড়া’ ইত্যাদি বলে অবিরাম উত্যক্ত করে; আবার যে মেয়ের কণ্ঠ কিংবা শারীরিক গঠন কিছুটা পুরুষালি, তাকেও সরাসরি অথবা আড়ালে ‘হিজড়া’ বলে। এই অস্বাভাবিকতাকে মানুষ সহানুভূতির চোখে তো দেখেই না, বরং ঘৃণা করে।

বাংলা ভাষায় ‘হিজড়া’ শব্দটি একইসঙ্গে বহু অর্থ জ্ঞাপন করে। এটিকে একটি অপমানসূচক গালি বললেও ভুল হবে না। সেক্স ক্রোমোজম অথবা হরমোনের বিপর্যয় থেকে সৃষ্ট এই মানুষেরা ক্রমাগত সামাজিক অবজ্ঞা এবং ঘৃণা সহ্য না করতে পেরে গড়ে তোলে নিজস্ব গোষ্ঠী। স্বাভাবিক উপার্জনের পথ না পেয়ে অথবা অন্য কোনো ক্রোধ থেকে তারা বেছে নেয় মানুষের দ্বারে দ্বারে ঘুরে জোরপূর্বক অর্থ গ্রহণের এই হীন পন্থা।

নগরকীর্তন

লৈঙ্গিক পরিচয়ের এই ভিন্ন মাত্রাগুলো নিয়ে সাধারণ মানুষের মাঝে ইতোমধ্যে কিছুটা সচেতনতা তৈরি হয়েছে। ভিন্ন ভিন্ন নামে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে এই বিচিত্র সব বৈশিষ্ট্যকে। এদের মধ্যে একটি ভাগ হলো ‘Transgender’, বাংলায় যাদের বলা হয় ‘রূপান্তরকামী’। এই শ্রেণির মানুষেরা এক ধরনের লৈঙ্গিক গঠন নিয়ে জন্মগ্রহণ করে, অথচ ভিন্ন লিঙ্গের মনস্তাত্ত্বিক গঠন নিয়ে বাস করে। মানে পুরুষের দেহে আটকে পড়ে নারীর মন, অথবা নারীর দেহে আটকা পড়ে পুরুষ। বাংলাদেশের হিজড়া সম্প্রদায়ের একটি বড় অংশ রূপান্তরকামী পুরুষেরা।

এতক্ষণ ধরে এগুলো বিস্তৃতভাবে বলার কারণ হলো, নগরকীর্তনকে বুঝতে হলে লৈঙ্গিক পরিচয়ের এই ভিন্ন মাত্রাগুলো বোঝা জরুরি। নগরকীর্তন একটি প্রেমের গল্প। তবে এই প্রেম সাধারণ কোনো প্রেম না: একজন রূপান্তরকামী পুরুষের সঙ্গে অন্য একজন পুরুষের প্রেমের গল্প। এই ছবি কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায় ঋতুপর্ণ ঘোষকে উৎসর্গ করেছেন।

নগরকীর্তন

চলচ্চিত্রের পর্দায় বিচিত্র স্বাদের গল্প বলতে পছন্দ করেন কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়। ২০০৫ সালে তার নির্মিত দ্বিতীয় চলচ্চিত্র শূন্য এ বুকের বিষয় ছিল নারীদেহ নিয়ে পুরুষের অতিরঞ্জিত কল্পনা ও আকাঙ্ক্ষা। এক চিত্রশিল্পী বিয়ের রাতে যখন স্ত্রীর অগঠিত [সমান] বক্ষ আবিষ্কার করে, তা নিয়ে সৃষ্ট জটিলতাকে কেন্দ্র করে তার প্রথম আলোচিত চলচ্চিত্রটি নির্মিত হয়েছিল। আবার ২০১০ সালে যৌন সম্পর্কের ভিন্ন মাত্রা নিয়ে তিনি নির্মাণ করেছিলেন আরেকটি প্রেমের গল্প— যেখানে প্রখ্যাত নির্মাতা ঋতুপর্ণ ঘোষ প্রথমবারের মতো কেন্দ্রীয় চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন। নির্মাণ করেছেন ফোলি- আর্টিস্টের সম্ভাব্য মানসিক জটিলতা নিয়ে শব্দ-এর [২০১২] মতো চলচ্চিত্র। সামাজিক ঘাত-প্রতিঘাতকে কেন্দ্র করে আমাদের না বলা সব গল্প তিনি ক্রমাগতভাবে তুলে আনতে চেয়েছেন চলচ্চিত্রের পর্দায়।

নগরকীর্তন সমাজের এমন একটি অংশের গল্প– যারা রহস্য আবৃত; সহজ চোখে যাদের দেখা হয় না। বলা হয়েছে এমন এক প্রেমের গল্প, এ সমাজ যার অস্তিত্ব স্বীকার করে না। এর বাইরেও নগরকীর্তন কলকাতা নামক শহরের গল্প এবং এই শহরের এক কোণে পড়ে থাকা নিতান্ত সাধারণ মানুষের গল্প।

কলকাতা থেকে আরও দূরে, নদীয়া জেলার নবদ্বীপে এক কীর্তনিয়া [রাধা-কৃষ্ণের ভক্তিমূলক সংগীত গাওয়াকে যারা পেশা হিসেবে গ্রহণ করেছে] পরিবারে মধুর জন্ম। পারিবারিক পেশা ছেড়ে জীবিকার সন্ধানে সে এসেছে কলকাতায়। এক চাইনিজ রেস্তোরাঁ থেকে হোম ডেলিভারি দেওয়ার কাজ করে। রাতের বেলা বায়না হলে সে কলকাতারই একটি ছোট কীর্তন দলে বাঁশি বাজায়।

নগরকীর্তন

এই শহরের এক হিজড়া আখড়ায় ঘটনাক্রমে মধুর সঙ্গে দেখা হয় পুটির। আসল নাম পরিমল। পরিমল থেকে ‘পরি’ এবং অবশেষে তা এসে ‘পুটি’তে এসে ঠেকেছে। পরিমল ছোটবেলা থেকেই মনস্তাত্ত্বিকভাবে মেয়ে ছিল। সে মেয়েদের পোশাক-আশাক পরতে ভালবাসত; চালচলনও ছিল মেয়েদের মতপ। প্রকৃতির অদ্ভুত খেয়ালে পুরুষের দেহের খাঁচায় আটকা পড়েছিল তার নারীর মনটি।

কৈশোরে সুভাষদা নামে এক শিক্ষককে ভালবেসেছিল সে; কিন্তু সুভাষদা যখন পরিমলের বড় বোনকে বিয়ে করে, হৃদয় ভেঙে যায় তার। জন্মস্থান বাগনান ছেড়ে সে এসে উপস্থিত হয় কলকাতার হিজড়া পল্লীতে। এই হিজড়া গোষ্ঠীও একজন গুরুমার অধীনে নির্দিষ্ট আচার মেনে জীবন পার করে।


যে
মন
নারীর,
তাকে নারীর
পোশাকেই সাজায় সে

এখানে এসে গুরুমা আরতির অধীনে পরিমল হয়ে ওঠে ‘পরি’ এবং বয়স অল্প বলে ‘পরি’ থেকে ‘পুটি’তে পরিণত হয়। পাঞ্জাবি ছেড়ে পরতে শুরু করে শাড়ি; সমান বুকে প্যাডেড ব্রা পরে জন্ম দেয় কৃত্রিম বাহ্যিক স্তনের। যে মন নারীর, তাকে নারীর পোশাকেই সাজায় সে। তবে দৈহিক গঠনের যে ভুল নিয়ে তার জন্ম, তা মোচনের আকাঙ্ক্ষা সে বয়ে বেড়ায় প্রতিক্ষণ। পুটির সেই নারীসুলভ কোমল হৃদয়টির সন্ধান পেয়েছিল আমাদের নবদ্বীপের বংশীবাদক মধু।

নগরকীর্তন

নগরকীর্তন একেবারে প্রান্তিক মানুষের প্রেমের গল্প। এই শ্রেণির মানুষের জীবনে সহজে কেউ উঁকি দিতে চায় না এবং তাদের গল্পও চলচ্চিত্রের পর্দায় খুব বেশি বলা হয় না। সাধারণ মানুষের সেই অকৃত্রিম রূপ অক্ষুণ্ন রাখার চেষ্টা করা হয়েছে এই চলচ্চিত্রে। মধু নামক এই অগোছালো, অপরিপাটি কথাবার্তায় অভ্যস্ত প্রেমিক চরিত্র আমাদের খুব পরিচিত, শহরে-গ্রামে আমরা অহরহ এদের দেখতে পাই। ছন্নছাড়া মধুর সঙ্গে পুটির প্রেমের বিকাশ পর্বটিকে অত্যন্ত সুচারুভাবে উপস্থাপন করেছেন কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়।

মান-অভিমানের পালায় বেশ কিছুদিন দেখা হয় না মধু আর পুটির। অবশেষে মধুর ঠিকানা খুঁজে বের করে একদিন তার ঘরে এসে উপস্থিত হয়। হঠাৎ করেই জিজ্ঞেস করে বসে, ‘ভালবাসো?’
মধু অবাক হয়ে বলে, ‘মানে?’
পুটি: আমি বাসি। দেখতে ইচ্ছে করে না আমায়?
মধু: করে।
পুটি: ওটাই… ঐটাই! তুমি ভালবাসো… তোমার ফিলিংস আছে। তাই পালিয়েছ! তোমার আমাদের গুরুকে নয়; নিজেকে ভয়, মধুদা।

এই যে ‘দেখার ইচ্ছাই প্রেম’, অথবা ‘প্রেম হলে ক্ষেত্রবিশেষে মানুষ সমাজের থেকে নিজেকেই বেশি ভয় পায়, তাই পালিয়ে বেড়ায়’– এমন সব কথোপকথন প্রেমের চিরন্তন প্রকাশকেই নির্দেশ করে। রেস্তোরাঁ থেকে খাবার হোম ডেলিভারি দেওয়ার ফাঁকে ট্রাফিক সিগনালে থেমে যাওয়া গাড়ি থেকে টাকা তুলতে থাকা পুটিকে মধুর এক নজর দেখার ইচ্ছা, অথবা মধুর কাছ থেকে চাইনিজ খাওয়ার জন্য অন্য হিজড়াদের কাছে ভর্ৎসনার শিকার হয়ে সৃষ্ট অভিমানবোধের প্রকাশে ক্রমশ এই প্রেমটি দর্শকও অনুভব করা শুরু করে।

নগরকীর্তন

রাধা- কৃষ্ণের বিরহ এবং মিলনের স্তুতিমূলক ধর্মীয় সঙ্গীত– কীর্তন এই আবেগঘন মুহূর্তগুলোতে বেজে উঠে প্রেমের সেই ব্যাখ্যাতীত প্রথাবিরুদ্ধ রূপ বারবার স্মরণ করিয়ে দেয়। মধুর প্রেমে আকুল হয়ে পুটি তার সঙ্গে ঘর বাঁধার স্বপ্ন দেখেছে। পুরুষ দেহে নারীর পোশাক লাগিয়ে নারী নয়; বরং চিকিৎসাবিদ্যার সাহায্যে সত্যিকারের নারীদেহ পেতে আকাঙ্ক্ষী হয়ে উঠেছে। বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে অর্থাভাব; তবু তারা দুজন একসঙ্গে থেকেছে, স্বপ্ন দেখেছে।


‘আচ্ছা,
টানটান
মেয়ে হতে
গেলে, মানে
ফুলবডি অপারেশন
করতে কত
খরচ?’

প্রেমের এই গল্প বলার সময় কৌশিক আমাদেরকে সমাজের বাস্তব মানুষের কাছেও নিয়ে গেছেন। অপারেশন করে পূর্ণাঙ্গ নারী হওয়া সম্ভব কি না, তা জানতে মধু ও পুটি হাজির হয়েছে কৃষ্ণনগর উইমেনস কলেজের প্রিন্সিপাল মানবী বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে। যিনি আপন যোগ্যতায় সোমনাথ থেকে মানবী হয়ে বহু সংগ্রাম করে এ পর্যন্ত আসতে পেরেছেন। তার কাছে যেয়ে জানতে পুটি জানতে চেয়েছে, ‘আচ্ছা, টানটান মেয়ে হতে গেলে, মানে ফুলবডি অপারেশন করতে কত খরচ?’

পাশ থেকে মধু তাকে থামিয়ে দিয়ে বলেছে, ‘থামো না! আপনি ফুলবডি ছাড়ুন, হাফবডি বলুন। নাইলে লিস্ট আলাদা আলাদা বলুন। ওপরটা, নিচেরটা।’

তাদের অধীরতা দেখে মানবী হেসে বলেন, ‘তুমি চুপ করো তো।’

মধু বলে, ‘না! না! যখন যেমন টাকা আসবে, তখন তেমন করব। ইন্সটলমেন্টে… হবে না?’

পুটি আবার জিজ্ঞেস করে, ‘খুব কষ্ট হয়?’

মানবী উত্তর দেয়, ‘যে কষ্ট নিয়ে বেঁচে আছিস, অপারেশনের কষ্ট তার চেয়ে বেশি নয় রে, পুটি।’

নগরকীর্তন

এমন টুকরো টুকরো দৃশ্য থেকে নিম্নবিত্ত পরিবারে জন্ম নেওয়া রূপান্তরকামীরা যে ভয়াবহ মানসিক কষ্টের মধ্য দিয়ে যায় এবং চিকিৎসা ব্যবস্থার সহজলভ্যতার অভাবে তাদের রূপান্তরিত হওয়ার স্বপ্ন কীভাবে অধরা রয়ে যায়, তা আমাদের কাছে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। মানবী প্রাণপণ প্রচেষ্টায় যতদূর এসেছেন, সেখানে অবস্থান করেও তার জীবন খুব বেশি সহজ হয়নি। কাজেই তিনিও কোনো আশার আলো দেখাতে পারলেন না। পুটির হাতে শ্রীচৈতন্যের মূর্তি তুলে দেওয়াতেই তার দৌড় সীমাবদ্ধ।

শ্রীচৈতন্যের এই মূর্তিও প্রেম নামক দুর্বোধ্য রহস্যের এক ভিন্ন গল্প নির্দেশ করে। সংসারে মনোযোগী করানোর জন্য মা শচীদেবী নিমাইয়ের [শ্রীচৈতন্যের মাতৃপ্রদত্ত নাম] বিয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু বধূ বিষ্ণুপ্রিয়া কখনো স্বামীর হৃদয়ের সন্ধান পাননি। শ্রীচৈতন্যের দেহ-মন সব কৃষ্ণের প্রেমে আচ্ছন্ন, ভাবসমাধিস্থ হয়েই কেটে যায় তার দিনরাত। কৃষ্ণপ্রেমে আচ্ছন্ন শ্রীচৈতন্যের এই গল্পও প্রথাবিরুদ্ধ প্রেমের গল্প।

বাস্তবে যেমনটা ঘটে, তেমনটাই ঘটেছে নগরকীর্তন-এ। মধু ও পুটির প্রেম কোনো পরিণতি লাভ করেনি। অন্য হিজড়াদের এলাকায় টাকা তোলার অপরাধে পুটি লৈঙ্গিকভাবে হিজড়া কি না, তা বোঝার জন্য তারা তাকে নগ্ন করে পরীক্ষা করেছে। এই নগ্ন করার দৃশ্য চারপাশ থেকে ছুটে আসা মানুষ পৈশাচিক আনন্দ নিয়ে উপভোগ করেছে, পাশাপাশি নিজেদের মোবাইলফোনে ভিডিও করেও দৃশ্যটা সংরক্ষণ করেছে।

নগরকীর্তন

পুরুষ শরীরে আটকা পড়ার নারী হৃদয়ের কষ্ট হিজড়ারাও বুঝতে চায়নি; তারা পুটির গায়ে বেদনার রঙ নীল ঢেলে দিয়েছে। এই লাঞ্ছনা ও অপমান সহ্য না করতে পেরে পুলিশ স্টেশনে গলায় দড়ি দিয়ে আত্মহত্যা করেছে সে। রূপান্তরের যুদ্ধে ঝরে গেছে আরও একটি প্রাণ এবং এই ঝরে যাওয়া প্রাণগুলোকে আমরা যেন মনে রাখি, এমন এক আকাঙ্ক্ষা নিয়েই চলচ্চিত্রটির সমাপ্তি ঘটেছে।

এই চলচ্চিত্রে মধু সমকামী, নাকি বিষমকামী– এই প্রশ্নের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে তার প্রেমিকসত্তা। একজন রূপান্তরকামীর প্রেমিক হিসেবে মধু চরিত্রটিকে এখানে ঠিক যেভাবে দেখানো হয়েছে, বাস্তবের মধুরা তার থেকে অনেকটাই আলাদা। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দেখা যায়, এই পুরুষ প্রেমিকেরা রূপান্তরকামীদের নারী সত্তার প্রতি আকৃষ্ট হয় এবং তাদের যথেচ্ছ ব্যবহার করে। এক পর্যায়ে হয় তাদের আকর্ষণ ফুরিয়ে যায়, নয়তো সামাজিকভাবে স্বীকৃত কোনো সম্পর্কের সম্ভাবনা না দেখে এই প্রেমিকরা তাদের পরিত্যাগ করে। এই ভঙ্গ হৃদয়ের যন্ত্রণা রূপান্তরকামীদের আরও অসহিষ্ণু করে তোলে।

নগরকীর্তন

নগরকীর্তন-এর মধুকে অবশ্য তার প্রেমে অবিচল থাকতে দেখা যায়। সে দ্বিধায় পড়ে, ‘সত্যিই হয়? এ রকম দুটো লোকের মধ্যে… ছেলে-ছেলে প্রেম হয়?’

পুটির নকল চুলের আড়ালে কোঁকড়ানো ছোট চুল দেখে সে চমকে ওঠে, এরপর আবার নিজেকে সামলে নেয়। এমনকি পুটির আত্মহননের বেদনা সহ্য করতে না পেরে উদভ্রান্ত অবস্থায় সে নারীসাজে আরতির হিজড়া পল্লীতে এসে পৌঁছায়। তবে মধুর মতো এমন একনিষ্ঠ প্রেমিক চরিত্র বাস্তবে ঠিক কতটুকু মেলে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়ে যায়।

এই চলচ্চিত্রের মূল শক্তি মধু চরিত্রে ঋত্বিক চক্রবর্তী এবং পুটি চরিত্রে ঋদ্ধি সেনের অভিনয়ে নিহিত। দুজনেই তাদের অভিনয় প্রতিভার সর্বোচ্চটা দিয়ে নিজেদেরকে ছাপিয়ে গেছেন। রূপান্তরকামী পুরুষের চরিত্রে ঋদ্ধি সেনের কথাবার্তা, হাঁটার ভঙ্গি থেকে শুরু করে চোখের দৃষ্টি পর্যন্ত সবকিছুতে যে যত্নের ছাপ পাওয়া যায়, তা অতুলনীয়। আকুল চোখে মধুর মাঝে প্রেম অনুসন্ধান, অথবা পূর্ণ নারী শরীরের দিকে তাকিয়ে ঐ শরীরের জন্য আকাঙ্ক্ষাভরা বেদনার্ত চাহনির দৃশ্যগুলো রূপান্তরকামীদের কষ্টটুকু দর্শক হৃদয়ের খুব কাছাকাছি পৌঁছে দেয়।

নগরকীর্তন

রৈখিক বর্ণায় না যেয়ে কাহিনিটি ভিন্ন আঙ্গিকে সেলাই করায় গল্পটি আরও আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে। বর্তমান-অতীত সবকিছুকে মিলিয়ে ক্রমাগতভাবে এই এগিয়ে চলা চলচ্চিত্রের মাঝে একটা আলাদা গতির সঞ্চার করেছে বলেই অনুভব হয়।

ভারতের ৬৫তম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের আসরে নগরকীর্তন স্পেশাল জুরি অ্যাওয়ার্ডসহ তিনটি পুরস্কার লাভ করে। পাশাপাশি পুটি চরিত্রে অনবদ্য অভিনয়ের জন্য মাত্র উনিশ বছর বয়সে সেরা অভিনেতার সম্মান লাভ করেন ঋদ্ধি সেন।

লৈঙ্গিক পরিচয় ও যৌন সম্পর্কের ভিন্ন মাত্রার একটি মানবিক চিত্রায়ন হিসেবে নগরকীর্তনকে আমরা মনে রাখব। এ ধরনের নির্মাণ তাদের নিয়ে সমাজজুড়ে মিশে থাকা অজ্ঞতা ও কুসংস্কারের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের একটি শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে কাজ করবে বলে মনে করি।

Print Friendly, PDF & Email
শেয়ার
সাহিত্য, চিত্রকলা ও চলচ্চিত্র অনুরাগী। শিক্ষার্থী, অর্থনীতি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ।। বাংলাদেশ

মন্তব্য লিখুন