লিটল মিস সানশাইন: হাসির দমকে উলঙ্গ মার্কিন সমাজব্যবস্থা

2
135
হাসান শাওন

লিখেছেন: হাসান শাওন

লিটল মিস সানশাইন
ফিল্মমেকার । জোনাথন ডেটন; ভ্যালেরি ফ্যারিস
স্ক্রিনরাইটার । মাইকেল আর্নট
প্রডিউসার । মার্ক টার্টলটার্ব; ডেভিস টি. ফ্রেন্ডলি; পিটার স্যারফ; অ্যালবার্ট বার্জার; রন য়ের্ক্সা
মিউজিক । মাইকের ড্যানা
সিনেমাটোগ্রাফার । টিম সার্স্টেড
এডিটর । পামেলা মার্টিন
কাস্ট [ক্যারেকটার] । গ্রেগ কিনার [রিচার্ড হুভার]; স্টিভ ক্যারেল [ফ্র্যাঙ্ক গিন্সবার্গ]; টনি চলেট [শেরিল হুভার]; পল ড্যানো [ডোয়াইন হুভার]; অ্যাবিগেইল ব্রেসলিন [অলিভ হুভার]; অ্যালেন আর্কিন [এডুইন হুভার]
ভাষা । ইংরেজি
দেশ । যুক্তরাষ্ট্র
রানিংটাইম । ১০২ মিনিট
রিলিজ । ২০ জানুয়ারি ২০০৬
অ্যাওয়ার্ড । বেস্ট অরিজিনাল স্ক্রিনপ্লে; বেস্ট সাপোর্টিং অ্যাকটর (অ্যালেন আর্কিন) [অস্কার]

লিটল মিস সানশাইন

হাসতে হাসতে তাচ্ছিল্য। বাদ যায় না মার্কিন শিক্ষা ব্যবস্থা, স্বাস্থ্যখাত, সেইসঙ্গে বর্ণবাদী শিশু সুন্দরী প্রতিযোগিতা। এ সব কিছু নিয়ে এ সিনেমা লিটল মিস সানশাইন। কমেডি ড্রামা জনরা আখ্যায়িত হলেও এর হাসির দমকে প্রকাশ পায় বাস্তবতা। দর্শক ভ্রমণ করেন সিনেমার চরিত্রদের সাথে। সেইসঙ্গে চাক্ষুস দেখতে পান মার্কিনি সমাজ ব্যবস্থার এক অন্য চেহারা।

২০০৬ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত, পরিচালক দম্পতি জনাথন ডাইটন ও ভ্যালেরি ফ্যারিস নির্মিত প্রথম ছবি লিটল মিস সানশাইন। এর চিত্রনাট্যকার মিশেল আর্নট। হলিউডি বিবেচনায় এটি একটি লো বাজেট ফিল্ম। খরচ হয় প্রায় আশি লাখ মার্কিন ডলার। ২০০৫-এর ৬ জুন এর শুটিং শুরু হয়। চিত্র ধারণ করা হয় ৩০ দিন ধরে। ক্যালিফোর্নিয়া ও দক্ষিণ অ্যারিজোনায় চলে এর চিত্রায়ন। এরপর চলে সম্পাদনার কাজ।

২০০৬-এর ২০ জানুয়ারি ছবিটির প্রিমিয়ার হয় সানড্যান্স ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে। এর পরিবেশনা স্বত্ব কিনে নেয় ফক্স সার্চ লাইট পিকচার। যুক্তরাষ্ট্রের সীমিত পরিসরে ছবি মুক্তি পায় ২০০৬ সালের ২৬ জুলাই। চারটি ক্যাটাগরিতে অ্যাকাডেমি অ্যাওয়ার্ডের জন্য মনোনীত হয় ছবিটি।

একটি মার্কিন যৌথ পরিবারের পরিবারের খুঁটিনাটি পাওয়া যায় এ ছবিতে। দুই সন্তানের জননী শেরিল হুবার আর গৃহকর্তা তার স্বামী রিচার্ড। পরিবারে আরও আছে শেরিলের ভাই ফ্রাংক। আছে নিৎসে ভর করা টিনএজার ডোইন। আছে পরিবারের সবচেয়ে বয়স্ক সদস্য রিচার্ডের বাবা এডওয়ার্ড। কনিষ্ঠতম সদস্য শেরিল, রিচার্ড কন্যা অলিভ।

ছোট্ট অলিভের খুব শখ শিশুদের সুন্দরী প্রতিযোগিতায় নাম লেখানোর। দাদা এডওয়ার্ডের পূর্ণ সমর্থন সে পায়। একদিন খবর আসে ক্যালিফোর্নিয়ায় একটি শিশু সুন্দরী প্রতিযোগিতায় মনোনীত হয়েছে অলিভ। তাদের আবাসস্থল থেকে প্রতিযোগিতার স্থান প্রায় ২০০ কিলোমিটার দূরে। পুরো পরিবার একটি ভক্সওয়াগনে যাত্রা শুরু করে। এই যাত্রা ঘিরেই লিটল মিস সানশাইন-এর গল্প আবর্তিত হয়েছে।

অলিভের দাদার মৃত্যু হয় যাত্রায়। গোপনে তার মরদেহ হাসপাতাল থেকে বের করা হয়। তবু যাত্রা থামে না। গাড়ি নষ্ট, পুলিশি তল্লাশি এমন বহু বিঘ্ন পাড়ি দিয়ে দুইদিনের যাত্রায় পুরো পরিবার অনুষ্ঠানস্থলে পৌঁছায়। শিশুদের সুন্দরী প্রতিযোগিতার বিকৃতি পুরো পরিবারের সামনে উন্মোচিত হয়। তারা বুঝতে পারে, অলিভ এর উপযুক্ত নয়। কিন্তু শিশুটির মনোবল যেন ভেঙে না পড়ে, সে চেষ্টাই করে যায় পরিবারের সবাই।

অলিভের পারফর্মের সময় সবাই শুরু করে একেক কীর্তিকলাপ। আয়োজকরা বিগড়ে যায়। আর কোনোদিন এই সুন্দরী প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে পারবে না– এই শর্তে অনুষ্ঠান থেকে বের করে দেওয়া অলিভ ও তার পুরো পরিবারকে।

দৃশ্যের পর দৃশ্য সাজিয়ে নির্মিত হয় চলচ্চিত্র। দর্শককে যুক্ত করার জন্য এর মধ্যে যোগ থাকে বাস্তবতার। আর বাস্তবতা বিযুক্ত কতক্ষণ থাকা যায়? কল্পনার পঙ্খিরাজ ঘোড়াও তো বাস্তবতাহীনতা প্রকাশ করে না। তাই জমিন ঘনিষ্ঠতা একটি শিল্পের যথার্থতা প্রকাশ করে। লিটল মিস সানশাইনকে এজন্য এক মূহুর্তের জন্যও অপ্রাসঙ্গিক মনে হয় না।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পরিবার কাঠামো, সমাজ ও রাষ্ট্র ব্যবস্থা সেই সঙ্গে সব কিছুর তীব্র বাণিজ্যিকীকরণ এ ছবিতে হাসির দমকে প্রকাশ পায়। এর সঙ্গে আছে সর্বগ্রাসী ভোগবাদ। এখনো বর্ণবাদের বিরুদ্ধে লড়ছে দেশটির জনগণ। স্বাস্থ্যখাতে কম বরাদ্দের জন্য সমালোচনায় আছে এর প্রশাসন। আর তীব্র ক্ষোভ আছে পুলিশের আচরণ নিয়ে। এসব সব কিছুর বিনির্মাণের জন্য এখনো লড়ছেন মার্কিন জনগণ।

একটি শিশুর বিকাশে পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র কী ভূমিকা রাখছে সেটিরও চাক্ষুস প্রমাণ এ সিনেমা। একটি ভক্সওয়াগানের ছুটে চলায় উন্মোচিত হয় অনেক কিছু।

এছাড়া সুন্দরী প্রতিযোগিতার সঙ্গে যোগ আছে বর্ণবাদেরও। সার্বিকভাবে নারীকে অবমাননার একটির বার্তা এর ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হয়। এক্ষেত্রে সরাসরি কথা না বলে কমেডির আশ্রয় নেওয়া পরিচালকদ্বয়ের নান্দনিকতাই স্পষ্ট করে।

তাই লিটল মিস সানশাইন একটি কাল অতিক্রম করে যাওয়া সিনেমা। এখনো আছে এর প্রাসঙ্গিকতা। বিশ্বের শ্রেষ্ঠত্ব দাবিকারী দেশের নাগরিকরা কতভাবে নিগৃহীত– তা প্রকাশ পায় সিনেমায়। কমেডি যথার্থ শিল্পীর হাতে পড়লে তা চাবুকে রূপ নেয়। লিটল মিস সানশাইন তারই প্রমাণ রাখে।

Print Friendly, PDF & Email
শেয়ার
লেখক, সাংবাদিক ।। ঢাকা, বাংলাদেশ

2 মন্তব্যগুলো

মন্তব্য লিখুন