য়্যুতয়া ২২ জুলাই: নৃশংস হত্যাকাণ্ডের চলচ্চিত্রায়ণ

0
183

লিখেছেন । আসিফামি রহমান সৈকত

য়্যুতয়া: ২২ জুলাই
Utøya: July 22
ফিল্মমেকার । এরিক পোপ্পা
প্রডিউসার । ফিন ইয়ারদ্রুম; স্তাইন বি. ক্যভা
স্ক্রিনরাইটার । সিভ রায়েন্দ্রাম এলিয়াস্যেন; আন্না বখ-ভিগ
সিনেমাটোগ্রাফার । মার্টিন অটেনবেক
মিউজিক । ওলফগাং প্লাগা
এডিটর । এইনার এগেলান্দ
কাস্ট [ক্যারেক্টার] । আন্দ্রেয়া বার্নৎজান [কায়া]; আলেকসান্দার হলমান [মাগনুস]; ব্রাদা ফ্রিস্তাদ [পিটার]
রানিংটাইম । ৯০ মিনিট
ভাষা । নরওয়েজিয়ান
দেশ । নরওয়ে
রিলিজ । ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৮


সারা দুনিয়া আতঙ্কে কেঁপে উঠেছিল ২২ জুলাই ২০১১-এর ঘটনায়। নরওয়ের রাজধানী অসলোর অদূরে য়্যুতয়া [ইংরেজি/চলতি উচ্চারণে– উটোয়া] দ্বীপে ঘটে যাওয়া এক নৃশংস হত্যাকাণ্ডের অভিজ্ঞতার ওপর নির্মিত হয় য়্যুতয়া: ২২ জুলাই চলচ্চিত্র, যেটা অনেকটা ডকুমেন্টারি ফিল্ম স্টাইলে করা। দর্শক মনে করবে, সারাক্ষণ তাদের কেউ একজন সেখানেই আছে, চলচ্চিত্রটির প্রোটাগনিস্ট [মূল যাকে নিয়ে গল্পটাকে এগিয়ে নেওয়া হয়েছে] কায়ার সাথে, পুরো ঘটনার সাক্ষী হয়ে। একটানে প্রায় কোনো কাট ছাড়া, কোনো বাধা ছাড়া, বহমান সময়ের মতো টানা প্রায় ৭০ মিনিটের এই চিত্রায়ণে দর্শককে একদম প্রকৃত অনুভূতির অনেক কাছাকাছি নিয়ে যায় চলচ্চিত্রটি।

কে, কী, কেন– এইসব কথা না বলে, ঐদিনের ঘটনায় যারা আক্রান্ত হয়, সেই ৭০+ মিনিটের গণহত্যায় যে ঠাণ্ডা মাথার খুনি ভয়াবহ আতঙ্ক তৈরি করেছিল কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে, যা বেঁচে যাওয়াদের মধ্যে সারা জীবনের জন্য চরম মানসিক ক্ষত তৈরি করেছিল, এবং সেটা কেন– তা য়্যুতয়া চলচ্চিত্রের সিনেমাটোগ্রাফির পদ্ধতির কারণে আরও বেশি অনুভব করা গেছে। এই জন্যই এই চলচ্চিত্রের এত গুরুত্ব।


দর্শককে
সত্যিকারের
বোধের, সেই সময়ের
আতঙ্কের অনুভূতির কাছাকাছি
নিয়ে যেতে পেরেছে
য়্যুতয়া চলচ্চিত্রটি

পুরো কাহিনি, রিপোর্ট– সব তো বিস্তারিত সব জায়গাতেই আছে। ইউটিউবে, বিবিসিতে , সারা পৃথিবীর গণমাধ্যমে তথ্যের কোনো অভাব নেই এই ঘটনার; কিন্তু ভিজুয়াল দিয়ে, শট, চিত্র দিয়ে, সেট দিয়ে সেটার একদম কাছে নেবার ক্ষমতা রাখে একমাত্র চলচ্চিত্র।দর্শককে সত্যিকারের বোধের, সেই সময়ের আতঙ্কের অনুভূতির কাছাকাছি নিয়ে যেতে পেরেছে য়্যুতয়া চলচ্চিত্রটি। সেইজন্য এই সিনেমার পরিচালক এবং সিনেমাটোগ্রাফার ধন্যবাদ পাবেনই।

নেটফ্লিক্সও ২২ জুলাই [যেহেতু ঘটনাটা ঘটেছিল ২২ জুলাই ২০১১] নামে একটা চলচ্চিত্র করেছে একই ঘটনার ওপর; কিন্তু সেখানে ঘটনার বর্ণনাই বেশি মনে হয়েছে; মনে হয়েছে আরেকটি অ্যাকশন ফিল্ম [যদিও সত্যি ঘটনা], আদতে সেটা শুধু তা নয়। আর টেকনিক্যাল জায়গা থেকে য়্যুতয়া ছবিতে ছিল বিরামহীন একটানা শট। এক শটের বলাই যায়; সেখানে নেটফ্লিক্সের ২২জুলাই-এ কাট-কাট করে অনেক দৃশ্যে প্রায়ই কাহিনির ভেতরে যাবার চেষ্টায়, বোধের জায়গাতে বাধাগ্রস্ত হয়েছে। যদিও মানবজাতির ইতিহাসে এই কলঙ্কজনক দিনের একটা ডকুমেন্টেশন, একটা সত্যাশ্রয়ী ফিকশন থাকার প্রয়োজনীয়তা থেকে ২২ জুলাই গুরুত্বপূর্ণ চলচ্চিত্র এবং নেটফ্লিক্সের কারণে এটা সারা দুনিয়ার মানুষের সহজে দেখার সুযোগও হয়েছে। তাই পরিচালক ধন্যবাদ অবশ্যই পেতে পারেন, নেটফ্লিক্সও।

আন্দার্স বারিং ব্রাইভিক চরম ডানপন্থী। সে ইউরোপ থেকে মুসলিম, মার্ক্সবাদী, উদারপন্থীদের তাড়াতে চায়। সে মনে করে, সে একটা ঘৃণ্য গণহত্যা দিয়ে ইউরোপকে মুক্ত করার দূত। যেজন্য সে তার নিজ দেশের ভবিষ্যত কিশোর-কিশোরীকেও হত্যা করতে পিছপা হয় না । পৃথিবীর অন্যতম ধনী, সচ্ছল , শিক্ষিত, মার্জিত একটা দেশে এই ঘটনা অভাবনীয়, যে দেশ থেকে শান্তির জন্য নোবেল পুরস্কারের ঘোষণা আসে।

টাকা পয়সা, প্রথাগত শিক্ষা– এইসব কিছু যে শেষ সমাধান নয়, যদি মানুষের আদর্শ, নৈতিকতা, শিক্ষা, পরিবার… এই জায়গাগুলোতে ফাঁক থাকে, নিউজিল্যন্ডের ঘটনাও কি সেটাই আবার প্রমাণ করে না? আমার নিজের ভাইও সেই সময় পড়াশোনার জন্য নরওয়েতে ছিল। তখন নাকি নরওয়েতে বসবাসরত মুসলিমরা আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়েন, যাতে আবার তাদের ওপর এর দায় না এসে পড়ে। কী রকম একটা ভীতিকর পরিস্থিতি এই পৃথিবীতে চলছে এখন! বিশেষ করে ৯/১১-এর ঘটনার পর এই মাত্রা দেশে দেশে চরমপন্থীদের উত্থানের মাত্রা বাড়িয়ে দিয়েছে, দেশে দেশে ব্যক্তিগত ব্যাপারে হস্তক্ষেপের লাইসেন্স করার সুযোগ দিয়েছে। দিন শেষে এই ব্যপারগুলো কি আসলে সমস্যাকে বাড়িয়েই দিচ্ছে না?

হ্যাঁ, বাড়িয়েই দিচ্ছে এবং দিবে, সেই আশঙ্কাই বেশি। ব্যক্তিগত মত প্রকাশের স্বাধীনতা না থাকায়, অবদমিত ক্ষোভ প্রকাশের সুযোগ না থাকায়, বিস্ফোরণের আশঙ্কাই বাড়িয়ে দিচ্ছে এই ঘটনাগুলো, এই পদক্ষেপগুলো। বুশের ইরাক আক্রমণ, আফগানিস্তানে অবস্থান সমস্যার কি আসলে কোনো সমাধান করতে পেরেছে? জাতির সমস্যা জাতির নিজেকেই সমাধান করতে হবে। আর দিন শেষে এই দুনিয়া, এই পৃথিবী আসলে সব মানুষের; এক একটা দেশ এক একটা নির্দিষ্ট সীমানা নিয়ন্ত্রণ করে হয়তো, কিন্তু মানুষের জন্যই তো এই দুনিয়া। দুনিয়ার যেকোনো প্রান্তে তার বসবাসের অধিকার আছে। এই অধিকারের জোরেই তো পুরো দুনিয়া এগিয়েছে, দাঁড়িয়েছে; নইলে এই বাধাগুলো তো খুব বেশি দিনের নয়, হয়তো কয়েক’শ বছরের মাত্র। দুনিয়ার বয়স তো সেই তুলনায় কিছুই নয়।


এক
প্রজন্ম
একটা দেশকে
একা আগাতে পারে
না, সেটা অনেক দিনের
অনেক মানুষের অনেক
বছরের শ্রম আর চিন্তার ফসল

দুনিয়ার এগিয়ে যাওয়ার জন্য এটা স্বাভাবিক প্রক্রিয়া, এই শিক্ষাটা সব জাতিকেই দিতে হবে। সব জাতিরই তা থাকতে হবে। এখন তো অবস্থা এমন হয়েছে, এক হাজার বছর আগে সে যেখান থেকে এসেছে, তাকে সেখানে ফেরত যেতে হবে বা সেই জায়গার অধিকার দাবি করার কথাও অনেকে বলে, যদিও তার বাবা, তার নিজের জন্ম হয়তো সেখানে নয়; সব দেশই এখন কম বেশি এই ব্যাপারগুলো নিয়ে মতানৈক্য আর অহেতুক বাগবিতণ্ডায় জর্জরিত। কিন্তু সত্যি কথা হলো, কাউকে ছাড়াই কেউ আসলে আগাতে পারেনি। এক প্রজন্ম একটা দেশকে একা আগাতে পারে না, সেটা অনেক দিনের অনেক মানুষের অনেক বছরের শ্রম আর চিন্তার ফসল; সেই অবদান একজন মানুষের সেখানে যত ক্ষুদ্রই হোক বা যত বিশালই হোক। তাই য়্যুতয়াতে ২২ জুলাইয়ের ঘটনার চলচ্চিত্রায়ন জরুরি এবং এর বিশ্লেষণও জরুরি, মানবজাতির জন্যই।

২০১১-তে এই ধরনের ঘটনা, নরওয়ের মতো দেশে হওয়া আরও দুঃখিত করে আমাদের।

য়্যুতয়া চলচ্চিত্রের পরিচালক এরিক পোপ্পে– যার নিজেরও সিনেমাটোগ্রাফার হিসাবে চলচ্চিত্রে কাজ করার অভিজ্ঞতা আছে, স্ক্রিপ্ট লিখা আর ফটোগ্রাফিরও অভিজ্ঞতা আছে, যেটা চলচ্চিত্রটার অন্য রকম ভিজুয়াল থেকে বুঝা যায়। যে ট্রিটমেন্ট এখানে দেওয়া হয়েছে, তা দর্শককে পুরো ঘটনার স্থলে উপস্থিত থাকার অনুভূতি দেয়, বাস্তবতার বোধের কাছে নিয়ে যায়; মনে হয় যেন ঘটনাস্থলে থাকা কেউ ক্যমেরা হাতে মূল চরিত্র বা তাদের আশেপাশেই ছিল। ডকুমেন্টারি ফিল্মের মতো, কিন্তু এর জন্য দীর্ঘ অনুশীলন এবং শক্ত পরিকল্পনার কোনো বিকল্প নেই; কারণ প্রায় একটানে পুরো দৃশ্য ধারণ কোনো সহজ বিষয় নয়। পুরো ব্যপারটা একবারে সিনেমাটোগ্রাফারের মাথায় থাকতে হয়। সেট ডিজাইনারের জানতে হয়, কখন কোথায় কে থাকবে। অভিনয় শিল্পীদের জানতে হয়, কখন কোথায় তাদের জায়গাগুলো শুরু করতে হবে।

৯০ মিনিটের এই চলচ্চিত্রে সেই ৭৭ মিনিটের যে দুঃসহ স্মৃতির অসীম সময়ের ভয়ঙ্কর মুহূর্তগুলো, সেটা এই ধরনের দৃশ্যায়নের মাধ্যমে আরও দীর্ঘ মনে হয়েছে। দর্শককেও এই ৭৭ মিনিটের প্রতিটা সেকেন্ড আতঙ্ক আর অস্থিরতায় কাটাতে হয়েছে, যার জন্য এই রকম শট, দৃশ্যায়ন জরুরি ছিল। এর অবদান নিয়ে কোনো সন্দেহ নাই। এটাই পরিচালকের চিন্তার এবং সিনেমাটোগ্রাফারের তার পুরো ইউনিটের সাফল্যের সাথে তা শেষ করার কৃতিত্ব এবং বাহবা পাবার যোগ্য।

যেহেতু এরিক পোপ্পে নিজে নরওয়ের লোক এবং এই ব্যপারটার ফলাফল, অনুভূতি, আতঙ্ক– পুরো ব্যপারটাই তার অনেকের চেয়ে ভালো জানা, তাই তিনি নিজেই বিবিসির এক সাক্ষাতকারে বলেছেন, হত্যাকারীকে দেখানোর জন্য একটা মিনিটও দিতে চাননি পর্দায়। এই রকম একটা মানুষ যদি তার ঘৃণ্য, মানবতাবিরোধী কাজের জন্য কোনোভাবে কোথাও কোনো প্রচার পায়, তাহলে সেটা ‘নৈতিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ’ হবে বলে ভেবেছেন তিনি। এ কারণে এই খুনির মতো চিন্তার লোকজনের জন্যও তিনি তাকে দেখাতে চান না। কারণ, দিন শেষে এক বিন্দুও তার কাজের জন্য হত্যাকারী ব্রাইভিক লজ্জিত, ব্যথিত হয়নি।

পোপ্পে মনে করেন, সিনেমায় ওই হন্তারককে দেখানে হয়তো তার কথা নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়াতে আরও আলোচনা হবে, সেটা হয়তো তার প্রচারে সহায়ক হবে; আর ‘নীতিবান নির্মাতা’ হিসেবে তিনি সেটা কোনোভাবেই মেনে নিবেন না।

যারা ওই ঘটনায় আক্রান্ত হয়েছিলেন, পরিচালক এরিক পোপ্পে মূলত তাদের কথাই বলতে চেয়েছেন।

যদিও ২২ জুলাই-এর পরিচালক গ্রিনগ্রাস আরেকটা মত প্রকাশ করেছেন নিজের ছবির ক্ষেত্রে, যেখানে তিনি দীর্ঘ সময় ধরে খুনি ব্রাইভিককে দেখিয়েছেন, তার কথাগুলো বলতে দিয়েছেন, তার মতাদর্শ এক ধরনের প্রকাশও করতে দিয়েছেন– যদিও অনেকে এটাতে উৎসাহিত বোধ করতে পারে ব্রাইভিকের এই চরম ডানপন্থী মতবাদের সাথে; কিন্তু ডানপন্থীদের এক বড় নেতাকেও তিনি এনেছেন, তাদের গোপন অনলাইন বৈঠক হয়– এই বিষয় নিয়ে। তাদের ইউরোপজুড়ে এই নেটওয়ার্ক বাড়ছে– সেই কথা বলেন। তবে শেষে একটা কথা বলেন, নিজেদের মতবাদ প্রতিষ্ঠা করার উপায় অন্যায় হত্যা নয়; এটার জন্য জনগণের সম্পৃক্ততা থাকতে হবে। সবাই মিলে সংলাপের মধ্য দিয়েই সমাধান খুঁজতে হবে। ব্রাইভিকের উপায়কে তিনিও কোনোভাবেই সমর্থন করতে পারেননি। এই জায়গাতে ব্রাইভিককে একটু হতাশ দেখায়।

আসলে গ্রিনগ্রাস চেয়েছেন এই যে ব্যপারগুলো নিয়ে কথা হচ্ছে, এই যে ঘৃণা উদ্রেক করে দেওয়া হচ্ছে বা যারা দিচ্ছেন, তাদের দায়ও তারা এড়াতে পারেন না, এবং দেখা গেছে দিন শেষে তারাও এত খারাপ কিছু হবে, এত নৃশংস জায়গাতে গিয়ে দাঁড়াবে, তাদের মতাদর্শের কথার ভিত্তিতে ব্রাইভিকের মতো খুনিরা উৎসাহিত হবে, তার নিজের দেশের কিশোর-কিশোরীকে মেরে ফেলবে ঠাণ্ডা মাথায়, সেই জায়গাটাও দেখুক চরম ডানপন্থী ইউরোপিয়ানরা।

দিন শেষে অবশ্যই দুটোই নরওয়ের চলচ্চিত্র এবং নরওয়ের লোকজনই অধিকাংশ ছিলেন কাজ দুটিতে। তবে কাহিনির জায়গা থেকে ২২ জুলাই অনেক বেশি বিস্তারিত বিশ্লেষণে গিয়েছে। আর য়্যুতয়ার পরিচালক নিজে নরওয়েজিয়ান, তাই তিনি অনুভূতিটাকে, ভয়ের বোধটাকে পর্দায় নিয়ে আনতে চেয়েছেন।

দুজন পরিচালকই যার যার জায়গাতে সফল; তবে আমার মতে বোধটা দর্শকের মধ্যে সঞ্চারিত করাটা বেশি জরুরি, তাতে দর্শক নিজেই স্বউদ্যোগে পরবর্তীকালে পুরো ব্যাপারটার বিশ্লেষণে আগ্রহী হবেন, এবং তার ঘটনাটা দেখার একটা দৃষ্টিভঙ্গি আগে থেকেই তৈরি হবে– যেটা আক্রান্তদের চিন্তার সাথে, নরওয়ের বিবেকসম্পন্ন মানুষের চিন্তার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ হবে, এবং সেটা সব সময়ের জন্য, নরওয়ের জন্য বিশেষ করে, তাদের নিজেদের ব্যাপারে, তাদের নিজেদের দেশের ভবিষ্যতের ব্যপারে সঠিকভাবে ভাবার তাগিদ দেবে। সেই জায়গাতে এরিক পোপ্পের চলচ্চিত্র য়্যুতয়া অনেক বেশি যুক্তিযুক্ত চলচ্চিত্রায়ণ এবং সফল।

একটা সামার ক্যাম্প, বন্ধুদের মধ্যে আনন্দের একটা দিন কীভাবে ইতিহাসের কুৎসিত গল্পে পরিণত হলো, তা-ই দেখিয়েছেন পরিচালক তার য়্যুতয়া চলচ্চিত্রে। এইজন্য প্রথমে সামার ক্যাম্পের রঙিন তাঁবুগুলো সেখানকার ছেলেমেয়েদের আড্ডা আর হাসিঠাট্টা খুব অল্প সময়েই পুরো আনন্দের পরিবেশটাকে উপস্থাপন করে, যেটা পরে ঘটনার গভীরে আরও দুঃখবোধ তৈরিতে সাহায্য করে, দৃশ্যায়নে।

চরিত্রগুলো কায়ার সাথে আলাপ বা কথা দিয়ে একে একে আবির্ভূত হয়: কায়ার ছোট বোন, অন্য বন্ধু, নতুন পরিচিত বন্ধু– সবাই আস্তে আস্তে দর্শকের সামনে আসে। সেখান থেকে একটা জায়গাতে নিয়ে গুলির শব্দ, সবার উদ্দেশ্যহীন ছোটাছুটি, চিল্লাচিল্লি, চ্যাঁচামেচি আতঙ্কের জন্ম দেয়। এই জায়গাতে শব্দ দিয়ে পর্দার বাইরে একটা জগত তৈরি করেছেন পরিচালক খুব ভালোভাবেই। দর্শকও শক্তিশালী একটা গল্প শব্দ দিয়ে শুনেছে, আর নিজের মতো করে ভাবার সুযোগ পেয়েছে, যেটা আসলে য়্যুতয়া দ্বীপে সেদিনকার আক্রান্তদেরও হয়েছিল, যেহেতু অনেকক্ষণ অনেকেই হত্যাকারীকে ব্রাইভিককে দেখতে পায়নি। আর ব্রাইভিক যেহেতু পুলিশের পোশাক পরে ছিল, আর মিথ্যা কথা ছড়িয়ে দিচ্ছিল– ‘সব ঠিক আছে, পুলিশ এসেছে…’– এই বিভ্রান্তি আরও সহজ করেছিল সুপরিকল্পিত ঠাণ্ডা মাথার এক খুনির ব্যখ্যার অতীত নৃশংস এই কাজকে।

শব্দ, সেট ডিজাইন আর অভিনয়– শক্তিশালী তিনটা দিক য়্যুতয়া চলচ্চিত্রের। খুনিকে না দেখিয়ে পুরো অনুভূতিটা এজন্যই ঠিকঠাক পর্দায় আনতে পেরেছেন পরিচালক।

সবাই যখন একসাথে একটা ঘরে আশ্রয় নিলো ক্যম্পের, সেখানে লং-শটে দরজাকে দেখানো হলো– ফ্রেমের দুইপাশে গাদাগাদি করে বসা, আতঙ্কিত সবাই, কিছুক্ষণ পরপর গুলির শব্দ, চিৎকারের শব্দ, কিছুক্ষণ পর পর ৪-৫ জন করে ঘরটাতে প্রবেশ– পুরো ঘটনায় আক্রান্তদের মানসিক অবস্থা আর ভয়াবহ পরিস্থিতির বুদ্ধিদীপ্ত চিত্রায়ণ। ২২ জুলাই চলচ্চিত্রে এই রকম একটা দৃশ্যও নাই, যা সেই জায়গাটাকে উপস্থাপন করতে পারে; উল্টো সেখানে অনেক দৃশ্য আছে, যেগুলো ব্যপারটাকে হালকাই করে তোলে। তারপরও ২২ জুলাই চলচ্চিত্রে আদালতে ট্রায়ালের জায়গাগুলো, হাসপাতালের দৃশ্যগুলো এবং ব্রেইভিক ও তার আইনজীবীর মধ্যকার মনস্তাত্ত্বিক টানাপড়েনগুলো ভালোভাবে উপস্থাপিত হয়েছে। ডানপন্থী নেতার বক্তব্য এবং দৃশ্যায়ণটাও অনেক বিশ্বাসযোগ্য হয়েছে।

য়্যুতয়া

পুরো ছবিতে শুরু থেকেই কায়া তার ছোট বোনের খোঁজে অস্থির থাকে; পালিয়ে যাওয়ার চেয়ে সেটার প্রতিই তার গুরুত্ব থাকে বেশি। এই দুটি কাজ একসাথে তাকে তাড়িত করে। এরমধ্যে সে তার পরিচিতদের আশ্বস্ত করে, অভয় দেয়; কিন্তু ঘটনা থামে না। তার বন্ধুরা তাকে এই সময়ের মধ্যেও অন্যদিকে মনোযোগ দিয়ে এই আতঙ্কের ভাবনা থেকে বাঁচাতে চায়। তার বন্ধু বলে, ‘বেঁচে থাকলে কী হতে চাও তুমি?’ কায়া আতঙ্কের মধ্যেও বলে, নরওয়ের প্রধানমন্ত্রী হতে চায় সে। তার বন্ধু হেসে বলে, সে সিনেমার অভিনেতা হতে চায়। আতঙ্কের মুহূর্তগুলো ভুলে থাকার চেষ্টা চলে।


এই
এক-দেড়
ঘণ্টায় যাদের
সাথে এই ভয়াবহ
সময় তারা কাটিয়েছে,
তারা তো সারাজীবনে
স্মৃতি থেকে মুছে
যাবার
নয়

পুলিশ প্রায় চলে এসেছে ভেবে তারা যখন পাড়ের দিকে আগাতে থাকে, সেই সময় গুলি লাগে কায়ার। তার বন্ধু কোনোমতে একটা নৌকাতে উঠে পড়ে। মাত্র ১ ঘণ্টা আগে পরিচিত হওয়া এক বন্ধুর কায়ার জন্য শরীর কেঁপে কান্না আসে। তাকিয়ে থাকে সে দ্বীপের দিকে। এই এক-দেড় ঘণ্টায় যাদের সাথে এই ভয়াবহ সময় তারা কাটিয়েছে, তারা তো সারাজীবনে স্মৃতি থেকে মুছে যাবার নয়; যায় না, সারাজীবন এই স্মৃতি বয়ে বেড়ানোর নতুন কষ্টকর, আতঙ্কের যাত্রা শুরু হয় তাদের। বেঁচে গিয়েও তারা কি খুব বেঁচে আছে?

এই জায়গাটা ২২ জুলাই চলচ্চিত্রে আরও ভালোভাবে দেখানোর চেষ্টা হয়েছে। শেষ দৃশ্যে কায়া যখন নৌকায় দেখে তার সহযাত্রীদের, তখনো সে জানে না তার বোন কোথায়? কায়া যার জন্য তার পুরো শেষ সময় দিয়ে দিলো।

২২ জুলাই । আদালতে সবাই

আগেই বলেছি, ২২ জুলাই ছবির জরুরি জায়গাগুলো হলো আদালত কক্ষের আলাপ, আইনজীবীর অবস্থা ব্রাইভিকের হয়ে লড়ার কারণে, প্রধানমন্ত্রীর অবস্থান ও পদক্ষেপগুলো দেখানো।

২২ জুলাই । নরওয়ের প্রধানমন্ত্রী আক্রান্তদের পরিবারের সাথে

তদন্ত কমিশনের রিপোর্ট বের হলে , প্রধানমন্ত্রী সব পরিবারের সাথে নিজে বসেন, তাদের কাছে তদন্ত কমিশনের রিপোর্ট শেয়ার করেন এবং ভেতর থেকেই বলেন– ‘আমরা আরও ভালোভাবে অবস্থাটা সামলাতে পারতাম। পুলিশ আরও দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে পারত। কাস্টমস আগেই এটা আঁচ করতে পারত, বোমা তৈরির রাসায়নিক আনার সময়ই। আমরা এজন্য দুঃখিত।’

শেষে যেটা বলেন, সেটা আরও জরুরি। নরওয়ের প্রধানমন্ত্রী নরওয়ের জনগণের সত্যিকার প্রতিনিধির মতোই বলেন, ‘আমি অনেক দুঃখিত এই ঘটনার জন্য।’ তার কথায় যে স্বর, যে অনুতপ্তের মাত্রা, যে শারীরিক ভাষা– সেটা যে দায়িত্ববোধ থেকে, সেটার পূর্ণ প্রতিফলন হয় সেই দৃশ্যে। প্রধানমন্ত্রী ইয়েন্স স্টল্টেনবার্গের দল পরবর্তী নির্বাচনে পরাজিত হয়; যদিও লেবার পার্টিই একক দল হিসাবে সর্বোচ্চ ভোট পায়, কিন্তু দিন শেষে এই প্রধানমন্ত্রী দল বা তার নিজের চেয়ে দেশকেই বড় করে দেখেছেন, সত্যকে খুঁজে বের করেছেন নরওয়ের ভবিষ্যতের জন্য, এবং আবারও প্রতিজ্ঞা করেছেন আরও বেশি গণতন্ত্র, উদারতা ও মানবতার জন্য কাজ করার; কিন্তু সেটি শিশুসুলভভাবে নয়।

২০১৪ সাল থেকে তিনি ন্যটোর সাধারণ সম্পাদক হিসাবে কাজ করছেন।

য়্যুতয়া২২ জুলাই— দুটো চলচ্চিত্রই আমাদের দেখা জরুরি দুনিয়াটাকে আরেকটু বুঝতে, আমাদের পরবর্তী পদক্ষেপগুলোকে আরও যুক্তিযুক্ত করতে। তবে আগে বলব য়্যুতয়া দেখে তারপর নেটফ্লিক্সের ২২ জুলাই দেখুন। একটা হলো ঘটনার দিনের অবস্থা, আরেকটা পরবর্তীকালে ট্রায়াল, খুনি, এর সাথে সম্পর্কযুক্ত নরওয়ের জনগণ, সরকারের পদক্ষেপ এবং জনগণের ভাবনার কথা নিয়ে। দুটোই জরুরি কাজ।

Print Friendly, PDF & Email
শেয়ার
ফিল্মমেকার; চলচ্চিত্রকর্মী; লেখক ।। বাংলাদেশ

মন্তব্য লিখুন