লকডাউনের ডায়েরি-৩: পেদ্রো আলমোদোভার

0
68
পেদ্রো আলমোদোভার

মূল : পেদ্রো আলমোদোভার
স্প্যানিশ থেকে ইংরেজি : মার দিয়েস্ত্রো-দোপিদো
ইংরেজি থেকে বাংলা : রুদ্র আরিফ

অনুবাদকের নোট:
পেদ্রো আলমোদোভার। ২৫ সেপ্টেম্বর ১৯৪৯–। স্প্যানিশ মাস্টার ফিল্মমেকার। বৈশ্বিক মহামারি করোনাভাইরাসের দিনগুলোতে রয়েছেন আইসোলেশনে। ফিল্ম : ‘পেপি, লুসি, বম’, ‘ল্যাবিরিন্থ অব প্যাশন’, ‘ডার্ক হেবিটস’, ‘হোয়াট হেভ আই ডান টু ডিজার্ভ দিস?’, ‘মেটাডর’, ‘ল অব ডিজায়ার’, ‘উইমেন অন দ্য ভার্জ অব অ্যা নার্ভাস ব্রেকডাউন’, ‘টাই মি আপ! টাই মি ডাউন!’, ‘হাই হিলস’, ‘কিকা’, ‘দ্য ফ্লাওয়ার অব মাই সিক্রেট’, ‘লিভ ফ্লেশ’, ‘অল অ্যাবাউট মাই মাদার’, ‘টক টু হার’, ‘ব্যাড এডুকেশন’, ‘ভলভার’, ‘ব্রোকেন এমব্রেসেস’, ‘দ্য স্কিন আই লাভ ইন’, ‘আ’ম সো এক্সাইটেড’, ‘জুলিয়েতা’ ও ‘পেইন অ্যান্ড গ্লোরি’। অস্কারজয়ী এই ফিল্মমেকার করোনাভাইরাসের দিনলিপি লিখছেন স্প্যানিশ ভাষায়। সেগুলো ইংরেজি অনুবাদে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হচ্ছে ব্রিটিশ ফিল্ম ইনস্টিটিউটের ‘সাইট অ্যান্ড সাউন্ড’ ফিল্ম ম্যাগাজিনে। তারই বাংলা অনুবাদ, এখানে, কয়েক কিস্তিতে…

আগের কিস্তি পড়তে ক্লিক করুন: প্রথম কিস্তিদ্বিতীয় কিস্তি


পেদ্রো আলমোদোভার
পোর্ট্রেট: পাস্কেল কির্চমেইর

সোমবার [১৩ মার্চ] রাতে, চলমান কোয়ারেন্টিনের নতুন কঠিনতর কড়াকড়ি আরোপের ঘোষণা যখন এলো, আমি প্রথমবারের মতো ক্লসট্রোফোবিয়ার উপসর্গ টের পেতে শুরু করলাম। যেহেতু খানিকটা সময় ক্লসট্রোফোবিয়া ও অ্যাগোরাফোবিয়ায় ভুগেছি, তাই এগুলো একটু দেরিতে এলো। আমি জানি এগুলো বিপরীত প্যাথোলজি; তবু আমার শরীর তো প্যারাডক্সিক্যাল– এটিই এর [আমার শরীরের] অন্যতম বৈশিষ্ট্য, এবং এটা চিরকালেরই।

ওই রাতেই বুঝে গিয়েছিলাম, পরের দিন আমাকে বাড়ির বাইরে বের হওয়া চেষ্টা করা লাগবে। মনে হচ্ছিল আমি হয়তো কোনো পূর্বপরিকল্পিত অপরাধকর্ম করতে যাচ্ছি। যদি আপনি নিজেকে কোনো নিষিদ্ধ পুলক দেন, তাহলে সেটি এড়ানোর কোনো উপায়ই আপনার থাকবে না। সস্তাধরের পাল্প সাহিত্যের মতো শোনাচ্ছে কথাটা; এবং কথাটা আসলে তা-ই, তবু এরজন্য আমি বন্দীদশার প্রভাবকেই দায়ী করি।

পরিকল্পনাটা পাকিয়ে ফেললাম: খাবার কিনতে বের হবো, একেবারেই নিখাঁদ এক কেনাকাটার উদ্দেশ্যে বের হওয়া এবং নিজের দেখভাল যেহেতু নিজেই করছি– তাই একটা অকৃত্রিম প্রয়োজনের জায়গা থেকেই। আর তাই মঙ্গলবার সকালে আমি বাইরে যাওয়ার পোশাক পরলাম; মনে হলো যেন ব্যতিক্রম কিছু করতে যাচ্ছি: পোশাক পরা! এ কাজটা শেষবার করেছি ১৭ দিন আগে; আর পোশাক পরে প্রস্তুত হওয়াটা আমার কাছে বরাবরই খুব নিবিড় ও খুবই বিশেষ কিছু বলে মনে হয়।

পোশাক পরে প্রস্তুত হওয়ার বেশ কিছু স্মৃতি মনে পড়ে গেল– যেগুলো আমার কাছে ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত; আর সেটা আমি এখন উপলব্ধি করছি, তবে মনের গহীনে তা সবসময়ই গেথে ছিল। যেমন ধরুন, মনে পড়ল, ১৯৮০ সালে লোপে দে রুয়েদা স্ট্রিটে আমি পোশাক পরে প্রস্তুত হচ্ছিলাম কন্দে দে পেনালভার স্ট্রিটের পেনালভার সিনেমায় [সিনেমা-হল] পেপি, লুসি, বম অ্যান্ড দ্য আদার গার্লস লাইক মম-এর প্রিমিয়ারে যাওয়ার জন্য।

পেপি, লুসি, বম অ্যান্ড দ্য আদার গার্লস লাইক মম
ফিল্মমেকার: পেদ্রো আলমোদোভার

যদিও সেটি ছিল ওই সিনেমা-হলে সিনেমাটির পুনঃমুক্তির ব্যাপার, তবু আমার কাছে এ ছিল যেন লস অ্যাঞ্জেলেসের কোডাক থিয়েটারের প্রিমিয়ারে যাওয়ার মতো। এই প্রথমবার আমার কোনো সিনেমা দর্শক দেখবে, এই প্রথমবার বাণিজ্যিক সার্কিটের অংশ হিসেবে সত্যিকারের সিনেমা-হলে দেখানো হবে– যেখানকার সব আসন লোকে পূর্ণ; দর্শকরা দেখছেন সেইসব ইমেজ– যেগুলো আমি ও আমার বন্ধুরা দেড় বছর ধরে শুটিং করে বানিয়েছি। আর তারা খুব বেশি হাসি-মশকরা করে সিনেমা-হল থেকে উঠে যাননি।

মনে পড়ে, সেদিন আমি লন্ডনের পোর্টোবেল্লো মার্কেট থেকে নিজেরই কেনা একটি লালরঙা স্যাটিন বোম্বার জ্যাকেট পরেছিলাম।

ব্যাপারটি সবসময় এমন নয় যে, কেউ আসলে পরিকল্পনা করে কোনো পোশাক পরে কিংবা সেভাবে পরার কথা সবসময় মনে থাকে আপনার। মনে পড়ে, পেপির প্রিমিয়ারের দু’বছর পরে, ‘লা মোভিদা’র [লা মোভিদা মাদ্রিলেনা; প্রতিসাংস্কৃতিক আন্দোলন, মাদ্রিদ, স্পেন, ১৯৭৫] সময়ে, মালাসানায় [মাদ্রিদের একটা অঞ্চল] আমার চোখেরই সমানে এক বালকের গড়ে তোলা এক পানশালায় যাওয়া আগে সচেতনভাবেই একটা ধূসররঙা মাও কলারের স্যুট পরেছিলাম। মাও কলার জীবনে খুব বেশি পরিনি, বরং পারকিন্সই আমার পছন্দ; কেননা, সেটি ডাবল চিন ঢেকে রাখে। মনে পড়ে, সেদিন মাও কলারের স্যুট পরার কারণ, সেই বালক পরের দুই-তিন বছর আমার জীবনের একটা অংশ হয়ে উঠেছিল। আমার জীবনে একটা দাগ কেটে গেছে সে।

আরও মনে পড়ছে, ডিজাইনার আন্তোনিও আলভারাদোর তৈরি পার্পল সিল্ক স্যানটুং টাক্সেডো, এবং স্টাডেড অ্যাংকেল বুট পরেছিলাম– এখন যে রকম বুট বানান (ফ্যাশন ডিজাইনার ক্রিশ্চিয়ন) লুবুতিন; সেটি জীবনের প্রথম পরেছিলাম ১৯৮৯ সালের অস্কার অনুষ্ঠানে। আমরা অস্কার পাইনি, (স্প্যানিশ অভিনেত্রী) কারমেন মুরার সঙ্গে আমার সম্পর্ক ভেঙে গিয়েছিল ঠিকই; তবে মনে পড়ে, লস অ্যাঞ্জেলেসের সেই সফর ছিল ঘটনাবহুল।

ওম্যান অন দ্য ভার্জ অব অ্যা নার্ভাস ব্রেকডাউন
কাস্ট: মারিয়া বারাঙ্কো, কারমেন মুরা, আন্তোনিও বান্দেরাস
ফিল্মমেকার: পেদ্রো আলদোমোভার

অনুষ্ঠানের চার-পাঁচদিন আগে (হলিউড অভিনেত্রী) জেন ফন্ডার বাসায় ডিনার সেরেছিলাম আমরা; ওম্যান অন দ্য ভার্জ অব অ্যা নার্ভাস ব্রেকডাউন-এর রিমেকের ব্যাপারে বেশ আচ্ছন্ন ছিলেন তিনি। খুবই অল্প কয়েকজন লোককে নিমন্ত্রণ করেছিলেন। (হলিউড অভিনেত্রী) অ্যাঞ্জেলিকা হাস্টন ও তার তখনকার পার্টনার– (হলিউড তারকা) জ্যাক নিকলসন– যিনি (মরোক্কান অভিনেত্রী) বিবিয়ানা ফার্নান্দেজকে বলেছিলেন, সেদিন দুপুরেই তাকে (বাস্কেটবল টিম লস অ্যাঞ্জেলেস) লেকারসের খেলা দেখতে দেখেছেন। যেন কোনো মেকআপই করেননি– এ রকম ন্যাচারাল মেকআপের (মার্কিন গায়িকা) সের’কে দেখাচ্ছিল আরও বেশি গর্জিয়াস, আরও বেশি সুন্দরী এবং আকারে আমার অনুমানের চেয়েও আরও বেশি ছোট।

আরও ছিলেন মরগ্যান ফেয়ারচাইল্ড। হ্যাঁ! (আমি ভেবেছিলাম, পরের অতিথিটি নিশ্চয়ই সুজান সনট্যাগের মতো কেউ হবেন।) সত্যি চমকে গিয়েছিলাম; কেননা, বাকিদের তুলনায় মরগ্যান ফেয়ারচাইল্ডকে আমার কাছে তুলনামূলক লো-প্রোফাইলের মনে হয়েছিল (যদিও ফ্লেমিঙ্গো রোডফ্যালকন ক্রেস্ট টিভি সিরিজে অভিনয় করা তার জন্য কম অর্জন নয়)। আমার এই অবাক ভাব নিশ্চয়ই নজরে পড়েছিল জেন ফন্ডার; আর সম্ভবত এ কারণেই নিজে নিজে ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন, মরগ্যান ফেয়ারচাইল্ডের সঙ্গে তিনি বিভিন্ন বিক্ষোভে অংশ নিতে অভ্যস্ত, এবং তাকে অন্য কিছু না হলেও একজন নারীবাদী হিসেবে গণ্য করেন।

নারী অতিথিগণ আর জ্যাকের এনার্জিতে, গানে ভরা এক সান্ধ্যোৎসব কাটালাম আমরা। তাদের সঙ্গে ও ঘরের দেয়ালে ঝোলানো পেইন্টিংগুলোর সঙ্গে প্রচুর ছবি তুললাম; ওই পেইন্টিংগুলো জেনের বাবা– (হলিউড তারকা) হেনরি ফন্ডার সংগ্রহের।

পেদ্রো আলমোদোভারম্যাডোনা
লস অ্যাঞ্জেলেস, ১৯৮৯

অনুষ্ঠানের পরদিন সকালে, হোটেলে আমার কাছে একটা ফোন কল এলো, এক নারীর কণ্ঠ। তিনি সচেতনভাবে না ফেললেও তার কণ্ঠস্বর আমার মনে নিশ্চিতভাবেই প্রভাব ফেলল– যখন তিনি বললেন, ‘হ্যালো, আমি ম্যাডোনা। ডিক ট্রেসি সিনেমার শুটিং করছি। আপনাকে সেট দেখাতে পারলে খুশি হবো। আজকে আমার শুটিং নেই; আজ সারাটাদিন আপনাকে দিতে চাই।’


ভাবলাম, হয়তো কোনো নকল ম্যাডোনা
হবে; কিংবা কোনো সাইকোপ্যাথ–
যে আমাকে কেটে টুকরো
টুকরো করে
পরিত্যক্ত
জমিতে ফেলে রাখার পরিকল্পনা করছে

ভাবলাম, হয়তো কোনো নকল ম্যাডোনা হবে; কিংবা কোনো সাইকোপ্যাথ– যে আমাকে কেটে টুকরো টুকরো করে পরিত্যক্ত জমিতে ফেলে রাখার পরিকল্পনা করছে, যেমনটার বর্ণনা জেমস এলরয় তার উপন্যাসগুলোতে দারুণভাবে দিয়েছেন।

(আপনি যদি দ্য ব্ল্যাক ডালিয়া পড়েন, তাহলে বুঝতে পারবেন আমি কী বলতে চাচ্ছি: ও রকম একটি পতিত জমিতে এলরয়ের মাকে কেটে টুকরো টুকরো করে ফেলে রাখা হয়েছিল। ওই বই নিয়ে আমার খুবই স্নেহের– ব্রায়ান দে পালমার বানানো সিনেমাটাও দেখতে পারেন, যেখানে অভিনয় করেছেন স্কারলেট জোহানসন ও হিলারি সোয়াঙ্ক; তবে সত্যি হলো, সিনেমাটা খুব একটা ভালো হয়নি। কোয়ারেন্টিনে দেখার জন্য অবশ্য খারাপ না; তবে আমি বরং এটির আগে দে পালমার বানানো আরও বেশ কিছু সিনেমা দেখার পরামর্শ দিতে পারি আপনাদের: সিস্টারস, ফ্যান্টম অব দ্য প্যারাডাইস, কার্লিতো’স ওয়ে, বডি ডাবল— যেখানে মেলানি গ্রিফিথ তার অভিনয়ের সেরা শক্তি দেখিয়েছেন– মাড়াই দেওয়ার মতো করে, এবং সবার আগে বলব আল পাচিনোকে অভিনয়ে নিয়ে বানানো স্কারফেস-এর কথা। দ্য ব্ল্যাক ডালিয়া নিয়ে মাথা ঘামানোর দরকার নেই; বরং এই সিনেমাগুলো দেখার একটা রুটিন বানিয়ে নিন। আমি নিশ্চিত, শেষকালে আমাকে ধন্যবাদই দেবেন। এগুলো সত্যিই রত্ন, আসলেই সহজবোধ্য এবং সত্যিকার অথেই উপভোগ্য। লেখার শেষে আমি আপনাদের একটা তালিকা দেব।)

ম্যাডোনার আলাপে ফিরে আসি। আমার সঙ্গে যেকোনো সময় যে কেউ মজা করতেই পারে; কিন্তু অস্কার না জিতলেও আমার আত্মশ্রদ্ধাবোধ এতই বেশি ছিল, ধরেই নিলাম, এটি একটি খাঁটি ফোনকল। ম্যাডোনার কণ্ঠস্বর আমাকে সেই স্টুডিওর ঠিকানা জানাল, যেখানে তারা শুটিং করছিলেন। ফোন রেখে আমি যারপরনাই খুশি হয়ে গেলাম।

ডিক ট্রেসি
কাস্ট: ম্যাডোনা, ওয়ারেন বিটি
ফিল্মমেকার: ওয়ারেন বিটি

সত্যি হলো, ওয়ারেন বিটি থেকে শুরু করে ভিত্তোরিও স্তোরারো– পুরো টিম অশেষ দয়ালু হয়ে ওঠল। তারা আমার এমন যত্ন নিলেন, যেন আমি (কিংবদন্তি ফিল্মমেকার) জর্জ কুকর। বিটি তার নামে থাকা চেয়ার– ‘দ্য ডিরেক্টর’স চেয়ার’-এ আমাকে বসতে বাধ্য করলেন, যেন তারা যে সিকুয়েন্সের শুট করছিলেন, আমি ঠিকঠাক দেখতে পারি।

আরেকটু হলে স্বীকার করে ফেলছিলাম, শৈশবে নিজের ভেতর যৌনতা আবিষ্কার করেছি স্প্লেডার ইন দ্য গ্রাস-এ তাকে দেখেই (পেইন অ্যান্ড গ্লোরির বিল্ডার চরিত্রটির কোনো অস্তিত্ব ছিল না তখন); তবে সে কথা বলা থেকে নিজেকে অবশ্য আটকাতে পেরেছিলাম। একদমই অচেনা রূপের আল পাচিনোর নিরন্তর বকবকানির একটি সিকুয়েন্সের শুট করছিলেন তারা। পরের বছর এ চরিত্রের জন্য তিনি অস্কারে নমিনেশন পেয়েছিলেন এবং সিনেমাটি পেয়েছিল তিনটি পদক।

ম্যাডোনা আমাকে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে পুরো সেট দেখালেন আর এমন একজন মানুষের সঙ্গে পরিচয় হলো, যার আমি গভীর অনুরাগী: মিলেনা কানোনেরো– যে কস্টিউম ডিজাইনার ততদিনে শ্যারটস অব ফায়ার, ব্যারি লিন্ডনদ্য কটন ক্লাব-এর জন্য তিনটি অস্কার পেয়ে গেছেন [ডিক ট্রেসির জন্য পরের বছরও অস্কার নমিনেশন পেয়েছিলেন তিনি]। কোয়ারেন্টিনের সময় এই তিনটি সিনেমাও দেখার পরমর্শ আপনাদের আমি দেব। কুব্রিকের বানানো আমার প্রিয় সিনেমা ব্যারি লিন্ডন


হলিউডে
আমার কাজ
করতে চাওয়ার
একমাত্র কারণ বোধহয়
এটিই: ডিটেইলের প্রতি আচ্ছন্নতা

মিলেনা কানোনেরা চতুর্থ* অস্কার পেয়েছিলেন কোন সিনেমার জন্য, আমার ঠিক মনে পড়ছে না। তার ওয়ার্কশপে হাজির হওয়াটা ছিল আমার সেই সফরে মনে সম্ভবত সবচেয়ে গভীর দাগ কেটে দেওয়ার ঘটনা। হলিউডে আমার কাজ করতে চাওয়ার একমাত্র কারণ বোধহয় এটিই: ডিটেইলের প্রতি আচ্ছন্নতা।

  • [অনুবাদকের নোট: দ্য কটন ক্লাব-এর জন্য নমিনেশন পেলেও অস্কার পাননি মিলেনা; তার অস্কারজয়ী তৃতীয় ও চতুর্থ সিনেমা– মারি আতোয়ানিতে (২০০৬) ও দ্য গ্র্যান্ড বুদাপেস্ট হোটেল (২০১৪)।]

ডিক চেরির অন্যতম বৈশিষ্ট্য– কমিক এই চরিত্রের মাথার হলুদ হ্যাট। কমিকে হ্যাটটি যে রকম, ঠিক সে রকম হলুদ হ্যাটের পাওয়ার জন্য ঘোরগ্রস্ত হয়ে পড়েছিলেন মিলেনা। তিনি আমাকে প্রায় দুই’শ হ্যাট দেখিয়েছেন, রঙের তারতম্যের প্রশ্নে যেগুলোর একটার সঙ্গে আরেকটার পার্থক্য অতি সামান্য। ডিটেইলের প্রতি এই যে আচ্ছন্নতা, আমি এটা পুরোদস্তুর ধরতে পেরেছি। শুটিংয়ের সময়, কিছু কিছু ক্ষেত্রে, আমার সামর্থ্যরে মধ্যে আমিও ঠিক একই কাজ করি। কাজটা অন্যভাবে করলে কী হতো– জানি না (তবে জানি, কম খরচে কীভাবে করতে হয়)।

ম্যাডোনা যদি আপনাকে কল করে আর এত বেশি খেয়াল রাখে আপনার, যেমনটা সেদিন করেছিলেন– আমি অস্কার না জেতার পরও, তার মানে আপনার প্রতি ওই ‘ম্যাটেরিয়াল গার্লে’র সত্যিই অশেষ কৌতূহল রয়েছে। আমাদের আবারও দেখা হতে খুব বেশিদিন সময় লাগেনি; পরের বছর তার ব্লন্ড অ্যামবিশান ট্যুর-এই দেখা হয়েছিল।

পেদ্রো আলমোদোভারম্যাডোনা

তিনি যেদিন মাদ্রিদে থাকলেন, তার সঙ্গে আমি ঘুরতে বের হলাম। তার জন্য প্যালেস হোটেলে একটা বিরাট ফ্লামেঙ্কো পার্টির আয়োজন করলাম; সঙ্গে ছিলেন (স্প্যানিশ অভিনেত্রী) লা পোলাকা, তার স্বামী (আর্হেন্তাইন গায়ক) ইল পলাকো, লোলেস লিওন, বিবিয়ানা ফার্নান্দেজ, রসি দে পালমা; তবে তিনি আমাকে ইতোমধ্যেই একেবারে সোজাসাপ্টা বলে দিয়েছিলেন, আমার বাইরে শুধু আরেকজন অতিথির সঙ্গে দেখা করার আগ্রহ রয়েছে তার: (স্প্যানিশ অভিনেতা) আন্তোনিও বান্দেরাস। তাকে কথা দিলাম, আন্তোনিও-ও থাকবেন ওই পার্টিতে; তবে তাকে বলিনি, তার ভীষণ ভক্ত– ওর তখনকার স্ত্রী আনা লেজাকে বাদ দিয়ে ওকে নিমন্ত্রণ করতে পারব না।

আমরা কে কোথায় কীভাবে বসব– সেটি ম্যাডোনাই ঠিক করে দিলেন (আমার বন্ধুদের ও তার নৃত্যশিল্পীদের জন্য সেখানে বেশ কিছু রাউন্ড টেবিল ছিল)। স্বভাবতই তিনি মূল টেবিলে বসলেন– আমাকে তার ডান পাশে আর আন্তোনিওকে বাম পাশে রেখে। আর আনা লেজাকে পাঠিয়ে দিলেন সেই বিশাল বৈঠকখানার সবচেয়ে দূরের টেবিলে!


পরের কিস্তি, আসছে…

Print Friendly, PDF & Email
শেয়ার
সম্পাদক : ফিল্মফ্রি । ঢাকা, বাংলাদেশ।। সিনেমার বই [সম্পাদনা/অনুবাদ] : ফিল্মমেকারের ভাষা [৪ খণ্ড : ইরান, লাতিন, আফ্রিকা, কোরিয়া]; ফ্রাঁসোয়া ত্রুফো : প্রেম ও দেহগ্রস্ত ফিল্মমেকার; তারকোভস্কির ডায়েরি; স্মৃতির তারকোভস্কি; হিচকক-ত্রুফো কথোপকথন; কুরোসাওয়ার আত্মজীবনী; আন্তোনিওনির সিনে-জগত; কিয়ারোস্তামির সিনে-রাস্তা; সিনেঅলা [৩ খণ্ড]; বার্গম্যান/বারিমন; ডেভিড লিঞ্চের নোটবুক; ফেদেরিকো ফেল্লিনি; সাক্ষাৎ ফিল্মমেকার ফেদেরিকো ফেল্লিনি ।। কবিতার বই : ওপেন এয়ার কনসার্টের কবিতা; র‍্যাম্পমডেলের বাথটাবে অন্ধ কচ্ছপ; হাড়ের গ্যারেজ; মেনিকিনের লাল ইতিহাস ।। মিউজিকের বই [অনুবাদ] : আমার জন লেনন [মূল : সিনথিয়া লেনন]

মন্তব্য লিখুন