লেখকের স্বাক্ষর: মিশায়েল হানেকার সঙ্গে কথোপকথন

1
152
মিশায়েল হানেকা

সাক্ষাৎকার: হিলারি ওয়েস্টন
অনুবাদ: রাগিব শাহরিয়ার

অনুবাদকের নোট
মিশায়েল হানেকা। জন্ম মার্চ ২৩, ১৯৪২। অস্ট্রিয়ান ফিল্মমেকার ও স্ক্রিনরাইটার। ফিল্ম বানিয়েছেন ফরাসি, জার্মান ও ইংরেজি ভাষায়। পড়ান ‘ফিল্ম একাডেমি ভিয়েনা’তে। তার উল্লেখযোগ্য সিনেমা– দ্য সেভেন্থ কন্টিনেন্ট, দ্য পিয়ানো টিচার, দ্য হোয়াইট রিবন, আমুর, ফানি গেমস, টাইম অব দ্য ওলফ, হ্যাপি এন্ড। দ্য হোয়াইট রিবন’ ও ‘আমুর’-এর জন্য ২০০৯ ও ২০১২ সালে জিতেছেন পাম দ’র এবং ‘আমুর’ চলচ্চিত্রটি ৮৫ তম অস্কারে বেস্ট ফরেন ফিল্ম ক্যাটাগরিতে পুরস্কৃত হয়।

দ্য সেভেন্থ কন্টিনেন্ট

হিলারি ওয়েস্টন :: সিনেমায় আপনার প্রথম অভিজ্ঞতার কথা মনে করতে পারেন?

মিশায়েল হানেকা :: লরেন্স অলিভিয়েরের পরিচালনায় হ্যামলেট-ই আমার প্রথম সিনেমা, যা একইসঙ্গে আমি দেখেছি এবং দেখিনি। দাদিমা আমাকে সিনেমাটি দেখাতে নিয়ে যান। সিনেমা শুরুই হয় খুবই অন্ধকার এবং দালানগুলির বিষণ্ণ শট দিয়ে। সঙ্গীতায়োজন ছিল আরও বিরক্তিকর। আমি এতটাই ভয় পেয়েছিলাম যে, রীতিমতো কান্না জুড়ে দেই। দর্শকেরা বিরক্ত হচ্ছিল; তাই আমাকে ওখান থেকে বের করে আনতে হয়েছিল দাদীমার।

হিলারি :: সেই অভিজ্ঞতা অবচেতনে আপনাকে প্রভাবিত করেছে কোনো না কোনোভাবে। এমন কোনো পরিচালক কী আছেন, যিনি আপনাকে সিনেমায় আসতে উদ্বুদ্ধ করেছিলেন?


অভিনয় স্কুলের ভর্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারিনি

হানেকা :: ছোটবেলায় আমি অনেককিছু করতে চাইতাম। প্রথমত, আমি একজন কনসার্ট পিয়ানিস্ট হতে চেয়েছিলাম। কিন্তু আমার আসলে ওরকম গুণ ছিল না। এরপর হতে চেয়েছিলাম অভিনেতা; কারণ আমার বাবা-মা অভিনয়ে যুক্ত ছিলেন। কিন্তু অভিনয় স্কুলের ভর্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারিনি। এরপর লিখতে শুরু করি, সমালোচক হই, দেখি নানারকম জিনিস। এই ‘দেখা’র কারণে চিন্তা আসে, আমি হয়তো এগুলোই নিজে করতে পারব। প্রভাবিত করেছেন, এমন কারও নাম যদি আমাকে বলতেই হয়, সেক্ষেত্রে রোবের ব্রেসোঁর নাম বলব।

দ্য পিয়ানো টিচার

হিলারি :: ব্রেসোঁর কাজগুলোয় কী এমন ছিল যা আপনার সঙ্গে সরাসরি ‘কথা’ বলেছে?

হানেকা :: ব্রেসোঁর যে দিক আমাকে স্পর্শ করেছে, তা হচ্ছে দর্শক ও মাধ্যমের কাছে একটা গাম্ভীর্যতা তুলে ধরা। আমি তার স্থিরদৃষ্টি পছন্দ করি। একটা সম্পূর্ণ নতুন ব্যক্তিগত ও মৌলিক ভাষা আবিষ্কার করার ক্ষমতা তার ছিল, যার মাধ্যমে বিশ্বকে ভিন্নভাবে দেখার রাস্তা তৈরি হয়েছে। এ কাজ করা খুবই কষ্টসাধ্য। অধিকাংশ ফিল্মমেকারই সিনেমায় কিছু গতানুগতিক জিনিস ব্যবহার করেন। কিন্তু একটা ব্যক্তিগত স্বর কিংবা স্বাক্ষর খুঁজে পাওয়া সবচেয়ে কঠিন। গুটিকয়েক নির্মাতাই এ কাজ করতে সক্ষম হয়েছেন। সেইসকল নির্মাতাকে আমি বাতিঘর হিসেবেই দেখি। তাদের ভেতর অন্যতম হলেন তারকোভস্কি এবং জন ক্যাসাভেটস।

হিলারি :: আপনি ইজাবেল উপার এবং জ্যঁ-লুই ত্রাতিঁনেয়োঁর মতো অভিনেতাদের সঙ্গে দীর্ঘদিন কাজ করেছেন। তাদের সঙ্গে কীভাবে কাজ করেন?

হানেকা :: আসলে তেমন কোনো নির্দিষ্ট পদ্ধতি নেই; এটার জন্য আমার কোনো তত্ত্বও নেই। কিন্তু আমি তাদের পছন্দ করি এবং তাদের সঙ্গে কাজ করতে ভালোবাসি। এর পুরোটাই একটা বিশ্বাস তৈরির প্রক্রিয়া, যাতে অভিনেতারা বুঝতে পারে, আপনি সবসময় তাদের পক্ষে আছেন। এই ব্যাপারটাই তাদের ভেতর থেকে সেরাটা তুলে আনে। আমার ছাত্রছাত্রীরা মাঝেমধ্যেই জিজ্ঞেস করে: ‘আপনি অভিনেতা-অভিনেত্রীদের সঙ্গে কীভাবে কাজ করেন? রহস্যটা কী?’

তাদের বলতে হয়, আমার কোনো মেথড নেই। প্রতিটা অভিনেতাই আলাদা এবং আলাদাভাবেই তাদের সঙ্গে কাজ করতে হবে। একই অভিনেতার সঙ্গে আমি বারবার কাজ করেছি। কারণ তাদের শক্তি ও দুর্বলতা আমার জানা। যখন ইজাবেল উপারের সঙ্গে কাজ করি, তিনি স্ক্রিপ্ট পড়েন এবং আত্মস্থ করেন, যাতে পরে একটা লম্বা সময় চরিত্রগুলো নিয়ে আমাদের কথা বলতে না হয়।

দ্য হোয়াইট রিবন

হিলারি :: ফিল্মমেকিংয়ের কোন অংশটি সবচেয়ে বেশি আনন্দ দেয়?

হানেকা :: রি-রেকর্ডিং ও শব্দ মিশ্রণ। শব্দের ব্যাপারে বলতে গেলে আমি পাগল; দুই মাস ধরে আমরা শব্দ মিশ্রণ করতে থাকি। ব্যাপারটা অনেক বিলাসী; কিন্তু আমার জন্য সন্তুষ্টির। বেশ অনেক বছর ধরেই একজনের সঙ্গে কাজ করছি। আমি মূলত একজন শ্রোতা; দর্শক নই। মঞ্চ পরিচালক হিসেবে কাজ করেছি দীর্ঘকাল। মঞ্চের নিচে বসে থাকতাম আমি, যেখানে অভিনেতারা রিহার্সাল করতেন।


গলার [আওয়াজের] দিকে মনোযোগ দিলে আমি ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র ভুলও শুনতে পাই; কিন্তু চেহারার দিকে তাকালে হয়তো সেই ভুল চোখে না-ও পড়তে পারে

অভিনেতারা হয়তো বলতেন, ‘আপনি আমার দিকে তাকাচ্ছেনই না!’ জবাব দিতাম, ‘কিন্তু ওভাবেই আমি আপনাকে ভালো দেখতে পাচ্ছি।’ আপনার গলার [আওয়াজের] দিকে মনোযোগ দিলে আমি ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র ভুলও শুনতে পাই; কিন্তু চেহারার দিকে তাকালে হয়তো সেই ভুল চোখে না-ও পড়তে পারে।

হ্যাপি এন্ড

হিলারি :: স্ক্রিপ্ট লেখার সময়ে আপনি কি নির্মাতাসুলভ চিন্তা করেন এবং ভাবেন– দৃশ্যটা দিয়ে কীভাবে গল্পটা বলা হবে? আমার ধারণা, হ্যাপি এন্ড-এর বেলায় এমনটা হয়েছিল…

হানেকা :: যেসব ফিল্মমেকার নিজেদের সিনেমা পরিচালনার পাশাপাশি চিত্রনাট্যও লিখেছেন, তাদের সিনেমা আমাকে অনুপ্রেরণা যুগিয়েছে, প্রভাবিত করেছে। লেখার পাশাপাশি তারা এ-ও জানেন, চূড়ান্ত ফলাফল হিসেবে কী বেরিয়ে আসতে যাচ্ছে। তারা বিষয় নিয়ে ভাবছেন, সংলাপ নিয়ে ভাবছেন, কীভাবে চিত্রায়িত হবে– সেটাও; সবকিছুই ঐ একই মুহুর্তে।

উদাহরণ হিসেবে, ‘কোড আননৌন সিনেমার প্রায় দশ মিনিট দীর্ঘ একটি দৃশ্যের কথা বলতে পারি। ওই দৃশ্য পর্দায় তুলে ধরা খুবই জটিল ছিল। আমি যদি পরিচালনা না করতাম, তাহলে আমার জন্য এটা লেখা একপ্রকার অসম্ভব হতো। আবার এটা আমি না লিখলে, পরিচালনা করাটাও একইরকম অসম্ভব হয়ে উঠত।

যখন আমি লিখছি, তখন আমি চিন্তা করছি– কীভাবে সেটা মঞ্চস্থ করা যায়, কীভাবে কোনো দৃশ্য পরিচালনা করতে পারি। আবার যদি এমন কোনো ব্যক্তি হয়, যে কি না পরিচালনা করছে, কিন্তু চিত্রনাট্য লিখছে না– তখন আপনি আসলে ঝুকিটা নিচ্ছেন না। সুতরাং, যা বানাচ্ছেন– সবই প্রায় গতানুগতিক হয়ে উঠছে।

আবার, গল্প হয়তো খুবই ভালোভাবে বলা হয়েছে এবং প্রযুক্তিগতভাবেও বেশ বলিষ্ঠ, কিন্তু এসব কেবল হলিউড স্টুডিও প্রোডাকশনে হয়, যেখানে সিনেমা নির্মিত হয় দক্ষ প্রযুক্তিবিদ এবং প্রযুক্তিতে বিশেষজ্ঞ এমন ব্যক্তিবর্গের সাহায্যে, কিন্তু এটা খুবই নৈর্ব্যাক্তিক। বিষয়বস্তু থেকে এর গঠন কাঠামো আলাদা করে ভাবা যায় না। তবে ওই ধরন শুধু লেখক-নির্মাতার ক্ষেত্রেই সম্ভব।

টাইম অব দ্য ওলফ

হিলারি :: এমন কোনো সাহিত্যিক আছেন, যার সাহিত্যের সঙ্গে আপনি আত্মীয়তা অনুভব করেন?

হানেকা :: অনেকেই আছেন। আমার বাড়িতে ছয় হাজারের থেকেও বেশি বই আছে। অন্যতম ভালোলাগার বই টমাস মানের ডক্টর ফস্টাস। জর্মন সাহিত্যের সঙ্গে আমি তীব্র আত্মীয়তা অনুভব করি। রবার্ট মুসিলের দ্য ম্যান উইদাউট কোয়ালিটিস-এর কথা বলতে পারি; আরও আছেন তলস্তয় ও দস্তয়েভস্কি। সামসময়িক সাহিত্যিকদের মধ্যে মিশেল উয়েলবেক’কে পছন্দ করি। প্রতি সপ্তাহে আমি অন্তত একটি করে বই পড়ি, সুতরাং উত্তর দেওয়াটা কঠিন।

হিলারি :: তবে কি আপনি দেখার চেয়ে পড়েন বেশি?


একটা নির্দিষ্ট আগে দেখা সিনেমা বারবার দেখি

হানেকা :: হ্যাঁ। কিন্তু আমি একটা নির্দিষ্ট আগে দেখা সিনেমা বারবার দেখি। কারণ সিনেমাটা যদি ভালো হয় এবং আপনি যদি সেটা বিশ বারও দেখেন, তবু নতুন কিছু না কিছু শিখতে পারবেন। আমাকে অবশ্য বাধ্য হয়েই দেখতে হয়; কারণ আমি সিনেমা পড়াই। সুতরাং প্রতি বছর যখন নতুন ছাত্রছাত্রী আসে, একটা কোর্স আছে– যেটায় ক্লাসিক সিনেমাগুলো তাদের দেখাই। দ্য মিরর, ও আজার বালতাজার, দ্য ক্রনিকেল অব আনা মাগদালেনা বাখ, অ্যা ওম্যান আন্ডার দ্য ইনফ্লুয়েন্স— এসব সেরা ক্লাসিক সিনেমা দিয়েই মূলত শুরু করি।

আমুর

হিলারি :: যদিও আপনি নিয়মিত নতুন সিনেমাগুলি দেখছেন না, সামসময়িক এমন কোনো নির্মাতা আছেন– যার কাজ ভালো লাগে?

হানেকা :: আসগর ফরহাদিকে আমার পছন্দ। আমি মনে করি তিনি একজন ভালো স্ক্রিনরাইটার। তার চিত্রনাট্যগুলো সত্যিই বিস্ময়কর, চেখভের সমতুল্য। এছাড়াও ইয়োরগস লান্থিমোস, রুবেন ওসলান্ড– এরা সবাই অনেক ইন্টারেস্টিং; এরা সবাই লেখক-নির্মাতা।

সূত্র: দ্য ক্রাইটেরিয়ন কালেকশন
Print Friendly, PDF & Email
শেয়ার
কবি; চলচ্চিত্রপ্রেমী ।। শিক্ষার্থী, ফিল্ম ও ফটোগ্রাফি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ।। বাংলাদেশ

১টি কমেন্ট

  1. একদম অন্য কিছু দিক নিয়ে কথা বলেছেন পরিচালক । শব্দ মিশ্রণে তাঁর অভিজ্ঞতা বা কাজ করার প্রক্রিয়াটা শুনে ভালো লাগলো
    ছয় হাজার বই এর সংগ্রহ , প্রতি সপ্তাহে একট বই পড়ার অভ্যাস অনুকরণীয় এবং পড়াশুনার গুরুত্বটা সিনেমার ক্ষেত্রেও যে অনেক বেশি সেটা আবার প্রমাণ করে। আরেকটা কথা জরুরী যে দেখা চলচ্চিত্র যেটা উনার ভালো লাগে সেটা বার বার উনি দেখেন, ২০ বার হলেও , কারণ ভালো ছবি হলে সব সময় ই সেখান থেকে অনেক কিছু শেখার থাকে।

    জরুরী লেখা এটি। পরিচালক, সিনেমা বানাতে যারা চান, তাদের জন্য অনেক ভালো একটা লেখা এটি।

মন্তব্য লিখুন