দেশি সিনেমার বক্স অফিস: হিট-সুপারহিটের পাটিগণিত

4
651

লিখেছেন: মোহাম্মদ নূরুজ্জামান

‘সাহসীরা যেখানে যেতে ভয় পায়, পরিণাম জানে না বলে নির্বোধেরা অবলীলায় সেখানে গিয়ে লাফালাফি শুরু করে দেয়।’ নিজেকে দিয়েই এই প্রবাদের সত্যতা টের পেলাম। সারা দেশে যেখানে মিছিল করে একের পর এক সিনেমা-হল বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, ঠিক সেই সময়টাতেই আমার মনে হলো যে, সিনেমাটা হলে বসেই দেখার জিনিস; তাই মানুষকে হলমুখী করা দরকার। কারো অপেক্ষা না করে নিজের সারা জীবনের সঞ্চয় আর কাছের মানুষদের ভবিষ্যৎ বিপন্ন করে চালু করে ফেললাম সীমিত আসনের সিনেমা থিয়েটার সিনেস্কোপ

এদিকে চলচ্চিত্র ব্যবসার বিন্দু-বিসর্গও জানা নেই। এমনকি সিনেমা-হলের টিকেট কাউন্টারকেই যে ‘বক্স অফিস’ বলে, সেটাও জেনেছি মাত্র কিছুদিন আগে। ভেবেছিলাম একবার পথে নেমে পড়তে পারলে সময়ের সাথে সাথেই পথটা চেনা হয়ে যাবে। এই অতি-আত্মবিশ্বাসের খেসারত দিতে দিতে জিভ বেরিয়ে গেলেও একটা লাভ হয়েছে, বাংলাদেশি চলচ্চিত্রের বাণিজ্যিক সম্ভাবনার ফাঁক-ফোঁকরগুলো মোটাদাগে হলেও চিনতে পারছি। একজন স্বাধীন নির্মাতা বা প্রযোজক হিসেবে চলচ্চিত্রের এই বাণিজ্যিক বিষয়গুলো আগে কখনোই বুঝতে চাইনি বা বুঝতে পারিনি, অথচ বোঝাটা আবশ্যক ছিল।

সিনেস্কোপসিনেপ্লেক্স, নারায়ণগঞ্জ

সিনেস্কোপ উদ্বোধন করেছিলাম ‘বাংলাদেশি চলচ্চিত্র উৎসব’ দিয়ে, সাড়া ছিল আশাতীত। তাই উৎসবের পরের দুই সপ্তাহ পুরানো ছবিই চালানোর সিদ্ধান্ত নিলাম। কিন্তু ফল হলো পুরো উল্টো; উৎসবের সময় টিকেট পাওয়ার জন্য লোকজন যেখানে মিনিটে মিনিটে ফোন দিত, নিয়মিত শো চালুর পরে ডিসকাউন্ট দিয়েও সেখানে দর্শক পাওয়া দুষ্কর হয়ে পড়ল। বুঝলাম, উৎসবেই দর্শক পুরানো ছবি দেখতে পছন্দ করে; নিয়মিত শোতে টাটকা ছবি না হলে কেউ টিকেট কাটে না।

এদিকে আমি আবার পণ করেছি নিজের রুচিতে যে ছবি পাশ মার্ক পাবে না, সেটা দর্শককে চাপিয়ে দেব না। কিন্তু বিপদ হলো, আমাদের মেইনস্ট্রিম সিনেমা বলতে যেগুলোকে বোঝানো হয়, সেগুলোকে পাশ মার্ক তো দূরে থাক, পরীক্ষায় বসাতেই মন সায় দেয় না। কপাল ভালো যে, সেই সময়টাতেই অনেক নতুন নির্মাতার আনকোরা কিছু ফিল্ম মুক্তি পেতে শুরু করল। তবে ঝামেলা হলো ডিস্ট্রিবিউটর বা প্রযোজকরা তাদের এক একটা সিনেমা এক সপ্তাহ চালানোর জন্য আমার কাছে যে পরিমাণ টাকা চাচ্ছিলেন, সেটা যোগাতে আমার হলের প্রতিটি শো যদি হাউসফুলও হয়, আর নিজের লাভ বা ওভারহেড দূরে থাক, টিকেটের পুরোটা দেওয়ার পরেও উল্টো আরও পকেট থেকে টাকা ভরতে হবে!

আমি কিছুতেই হিসাব মেলাতে পারলাম না, আমার কাছাকাছি সিনেমা-হলে দেবীআয়নাবাজিডুবঢাকা অ্যাটাক বা এই জাতীয় বহুল আলোচিত ছবি দেখতে গিয়ে কখনোই বিশ-পঁচিশজনের বেশি দর্শক পাইনি; আবার তাদের টিকেটের দামও আমার হলের চেয়ে অনেক কম। তাহলে এই সিনেমা-হলগুলো ব্যবসা করে কীভাবে? তাদের সাথে অনেক ঝোলাঝুলি করেও লাভ হলো না, কেউ ‘বিজনেস সিক্রেট’ ফাঁস করে না।

ইতি তোমারই ঢাকা মুক্তি পেল। সিনেস্কোপ-এর নিয়মিত দর্শকদের অনেকেই আমাদের ফেসবুক পেইজে ছবিটির ব্যাপারে আগ্রহ দেখালেন, আর অনেকদিন ধরে আমিও ছবিটির দিকে চোখ রাখছিলাম। ঘনিষ্ঠ কয়েকজন ছবিটি দেখেছেন, প্রশংসাও করেছেন। তাই ভাবলাম, লাভ-লস যাই হোক, ছবিটি সিনেস্কোপ-এ চালাব, দেখা যাক যাদেরকে আমি আমাদের দর্শক মনে করি, তাদের রি-অ্যাকশন কী!

সিনেমা-হল

চলচ্চিত্র ব্যবসার কিছু না জানলেও এটা ততদিনে এটা বুঝে ফেলেছি যে, মুক্তির প্রথম সপ্তাহের চেয়ে দ্বিতীয় সপ্তাহে ছবির দাম অনেকটাই কমে যায়। তাই দ্বিতীয় সপ্তাহ শুরুর আগেই প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান চ্যানেল আই-এর সাথে মিটিং সেট করা হলো। সিনেমাটির দেখভালের দায়িত্বে থাকা আবু শাহেদ ইমনের সাথে দামদস্তুর নিয়ে কথা শুরু হলো; যতগুলো হল পাবেন ভেবেছিলেন, ততগুলো পাননি বলেই হয়তো তিনি কিছুটা নমনীয় ছিলেন আর আমার নির্মাতা পরিচয়ও কিছুটা এক্সট্রা খাতির পেতে সহায়তা করল; তার ওপরে কয়েকজন কমন ফ্রেন্ডের রিকমেনডেশনে একটা সহনীয় অঙ্কের টাকায় ছবিটা পেয়ে গেলাম।

ফরমাল মিটিং শেষে চ্যানেল আইয়ের ছাদে সবাই চা খাচ্ছিলাম, আমার সাথে থাকা যুবরাজ শামীম দু’দিন আগে জয়দেবপুরের একটা হলে সিনেমাটা দেখার অভিজ্ঞতা বলছিল, টিকেটের গায়ে মূল্য পঁয়ত্রিশ টাকা লেখা থাকলেও তার কিনতে হয়েছিল ষাট টাকায়। বলতে বলতে পকেট থেকে টিকেটটা বের করল। আবু শাহেদ ইমন ওর কাছ থেকে টিকেটটা নিয়ে একটু চোখ বুলিয়েই বললেন যে, এই টিকেট থেকে মাত্র বারো টাকা তার পকেটে ঢুকবে। আমি কিছুই বুঝলাম না, ষাট টাকা দিয়ে কেনা টিকেটের মাত্র বারো টাকা প্রযোজক পাবেন কেন? বাকি টাকা কার পকেটে যাবে? এভাবে কতজন দর্শক একটা সিনেমা দেখলে প্রযোজক ব্রেক ইভেনে যাবেন? আর একটা সিনেমা যদি অন্তত বিনিয়োগের সমান টাকা ফেরত না পায়, তাহলে সেই প্রযোজক পরের ছবি বানাবেনই বা কেন?


সবাই তুচ্ছ আর নগদ লাভের লোভে পড়ে গোটা চলচ্চিত্র ব্যবসাটাকেই বিপন্ন করে তুলেছে

এই টিকেটটা আমি সংগ্রহে রাখলাম, এরই সূত্র ধরে বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রির বক্স অফিসের সরল অঙ্কটা মেলানোর চেষ্টা করতে থাকলাম। হিসাবটা মেলাতে কেবল যে কাঠ-খড় পোড়াতে হয়েছে– তাই নয়; সাথে কেরোসিন-পেট্রোল-অকটেন থেকে শুরু করে খাঁটি গাওয়া ঘিও ঢালতে হয়েছে। কারণ একটাই, কেউ ‘বিজনেস সিক্রেট’ ফাঁস করতে নারাজ। অথচ এখানে গোপনীয়তার কোনো প্রয়োজনই ছিল না, যদি প্রযোজক-পরিবেশক-বুকিং এজেন্ট-হল মালিক– পুরো চেইনটিতে সততা আর স্বচ্ছতা থাকত। সবাই তুচ্ছ আর নগদ লাভের লোভে পড়ে গোটা চলচ্চিত্র ব্যবসাটাকেই বিপন্ন করে তুলেছে।

আমাদের দেশে চলচ্চিত্র তৈরি করার পর প্রযোজক ছবিটি বাজারজাত করার দায়িত্ব দেন পরিবেশককে, পরিবেশকের কাছ থেকেই প্রদর্শকের কাছে ছবি পৌঁছানোর কথা থাকলেও তাদের সেতু হিসেবে কাজ করে বুকিং এজেন্ট। প্রাথমিক পর্যায়ে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের প্রেক্ষাগৃহগুলোতে ছবি পৌঁছানোর প্রক্রিয়া সহজ করতেই বুকিং এজেন্টের সৃষ্টি। এরা ডিস্ট্রিবিউটর এবং হল মালিক– দুই পক্ষের কাছ থেকেই কমিশন নিয়ে থাকেন। খুব অল্প দিনেই দুই পক্ষেরই বুকিং এজেন্টের ওপর নির্ভরশীলতা বাড়তে থাকে আর সেটা বুঝতে পেরে তারাও দাপট বাড়াতে বাড়াতে এক পর্যায়ে পুরো পরিবেশন-প্রদর্শন সিস্টেমটাকেই জিম্মি করে ফেলেন।


কোনো ছবির বাণিজ্যিক ভাগ্য পুরোপুরিই এখন এই ডন-মাফিয়াদের মর্জির ওপর নির্ভরশীল

এজেন্টদের ক্ষমতা অসহনীয় মাত্রায় চলে গেলে তাদের দমাতে একসময়কার আলাদা আলাদা প্রযোজক সমিতি আর পরিবেশক সমিতি জোট বেঁধে একটি সমিতিতে পরিণত হয়; কিন্তু লাভ হয়নি। শোনা যায়, নিজের ছবিকে বেশি হল পাইয়ে দেবার জন্য কোনো কোনো প্রযোজক উল্টো বুকিং এজেন্টকেই খুশি রাখার জন্য ব্যস্ত থাকেন। দৌরাত্ম এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, কোন সিনেমা কোন হলে চলবে– সেটা এখন আর প্রযোজক কিংবা হল মালিকের সিদ্ধান্ত নয়; পুরো নিয়ন্ত্রণই বুকিং এজেন্টের হাতে। তাই কোনো ছবির বাণিজ্যিক ভাগ্য পুরোপুরিই এখন এই ডন-মাফিয়াদের মর্জির ওপর নির্ভরশীল। তাদের পাশ কাটিয়েও যে হল পর্যন্ত ছবি নিয়ে যাওয়া যায় না– তা নয়; কিন্তু সেই ঝুঁকি নেওয়ার মতো প্রযোজক আর হল মালিকের সংখ্যা নগন্য।

আমাদের দেশে ফিল্ম ডিস্ট্রিবিউশনের মোটামুটি তিনটি পদ্ধতি চালু আছে। প্রথমটি হলো ‘ফিক্সড রেন্টাল’, পরেরটি ‘মিনিমাম গ্যারান্টি’, আরেকটিকে বলা হয় ‘পারসেন্টেজ’।

ফিক্সড রেন্টাল পদ্ধতিতে সিনেমা-হল কোনো একটি সিনেমা নির্দিষ্ট সময় মেয়াদে প্রদর্শনের জন্য এককালীন একটা থোক টাকা প্রযোজককে দিয়ে থাকেন। এই টাকার অঙ্ক ওঠা-নামা করে সিনেমার কাস্টিং, প্রচারণা আর কোন সময় সেটা মুক্তি পাচ্ছে, তার ওপর। কোনো সুপারস্টারের ছবির দাম স্বভাবতই তুলনামূলক কম জনপ্রিয় অভিনয় শিল্পীর ছবির চেয়ে কম; আবার ঈদে মুক্তিপ্রাপ্ত সিনেমার দাম বছরের অন্য সময়ের চেয়ে বেশি হওয়াটাই স্বাভাবিক। অন্যদিকে মুক্তির প্রথম সপ্তাহ থেকে যতই দিন যেতে থাকে, ছবির দামও ততই কমতে থাকে। দাম যাই হোক, শর্ত একটাই, লাভ-ক্ষতির পুরোটাই বর্তাবে হল মালিকের ঘাড়ে, প্রযোজক টেনশন ফ্রি। তাই প্রযোজকরা এই পদ্ধতিতেই ছবি বিক্রি করতে আগ্রহ দেখান বেশি।

এই পদ্ধতির পুরো ঝুঁকিটাই প্রদর্শককে নিতে হয় বলে লাভ ওঠাতে হলের পক্ষ থেকেই স্থানীয়ভাবে অতিরিক্ত প্রচার-প্রচারণার ব্যবস্থাও করতে হয় নিজ খরচে। আমি পরে বুঝতে পেরেছি, সবাই নতুন ছবির জন্য এত দাম হাঁকাচ্ছিল কেন আর কিছু না বুঝেই চ্যানেল আইয়ের কাছ থেকে আমরা এ পদ্ধতিতেই ইতি তোমারই ঢাকা নিয়েছিলাম। চলচ্চিত্রের বাজার মন্দা হওয়ার কারণে কেবল ঈদের সময় ছাড়া কোনো সিনেমা-হল এখন আর ফিক্সড রেন্টালে যেতে চায় না।

আরেকটা প্রচলিত পদ্ধতি হলো মিনিমাম গ্যারান্টি, সংক্ষেপে এমজি। এই পদ্ধতিতে হল মালিক প্রযোজককে ছবির গ্যারেন্টি হিসেবে ন্যূনতম একটা অঙ্কের টাকা দিয়ে থাকেন, পরবর্তীকালে হল থেকে সিনেমা নেমে গেলে টিকেট বিক্রির লভ্যাংশ সমান হারে ভাগাভাগি হয়। এই ন্যূনতম থোক টাকার পরিমাণও নির্ধারিত হয় ফিক্সড রেন্টালের মতোই কাস্টিং, মুক্তির সময় ইত্যাদির ওপর। এই পদ্ধতিতে হল মালিকের ওপর প্রাথমিক বিনিয়োগের ধাক্কা কম লাগলেও সমস্যা হয় ন্যূনতম গ্যারান্টির টাকার চেয়ে টিকেট বিক্রি কম হলে। কারণ, লাভ হলে প্রযোজক তখন আধাআধি বুঝে নিলেও এই পদ্ধতিতে লোকসানের দায় প্রযোজকের নয়।

ধরা যাক, দুই লাখ টাকা মিনিমাম গ্যারান্টিতে একটা সিনেমা নেওয়া হলো এবং টিকেট বিক্রি হলো তিন লাখ টাকার, তখন লাভের এক লাখ টাকা থেকে প্রযোজক পাবেন পঞ্চাশ হাজার আর হল মালিক পাবেন পঞ্চাশ হাজার। কিন্তু দুই লাখ টাকা মিনিমাম গ্যারান্টি দেওয়ার পর যদি টিকেট বিক্রি হয় এক লাখ টাকার, সেক্ষেত্রে প্রযোজক গ্যারান্টির অতিরিক্ত কোনো টাকা পাবেন না; এক লাখ টাকার ক্ষতি পুরোটাই প্রদর্শকের। প্রযোজক সে ক্ষেত্রে গ্যারান্টির অঙ্ক থেকে এক টাকাও ফেরত দেবেন না।

লোকসানের ঝুঁকি থাকায় এই পদ্ধতিতেও ঈদ বা বিশেষ কোনো উপলক্ষ ছাড়া সিনেমা-হলগুলো আগ্রহ দেখায় না।

তৃতীয় যে পদ্ধতি, পার্সেন্টেজ, সেটাই মূলত এখন আমাদের দেশে সবচেয়ে চালু। এই পদ্ধতিতে প্রযোজক আর প্রদর্শক ঠিক করে নেন টিকেট বিক্রির শতকরা কত ভাগ কে পাবেন। একসময় প্রযোজক পেতেন ৬০% আর প্রদর্শক পেতেন ৪০%, তবে আমার অভিজ্ঞতায় আমি দেখেছি ভাগাভাগিটা এখন সমান সমান। আর ছবি পুরানো হয়ে গেলে প্রযোজকের লভ্যাংশ কমে যায়।

প্রফিট শেয়ারিংয়ের চুক্তিটা মূলত প্রদর্শক আর পরিবেশকের মধ্যেই হয়ে থাকে, যেখানে হল থেকে পাওয়া টাকার ১৫% পান পরিবেশক আর ৮৫% পান প্রযোজক, ডিস্ট্রিবিউটর আবার তার প্রাপ্য থেকে ১০% টাকা দেন বুকিং এজেন্টকে, বুকিং এজেন্ট হলের কাছ থেকেও একটা লভ্যাংশ পেয়ে থাকে। ডিস্ট্রিবিউটর আর বুকিং এজেন্টকে যেহেতু প্রযোজকই নিয়োগ করে থাকেন, তাই বলার সুবিধার্থে আমি মোটা দাগে হলের সাথে প্রযোজককে দ্বিতীয় পক্ষ বিবেচনা করেই হিসাবগুলো দেখাচ্ছি।

পদ্ধতিগুলো বোঝার পরে আমার জন্য নতুন ছবি পাওয়া বেশ সহজ হয়ে গেল আর স্বচ্ছতা বজায় রেখে লেনদেনের কারণে ডিস্ট্রিবিউটররাও নিয়মিত সিনেস্কোপকে ছবি দিতে শুরু করলেন। একটা ছবি সিনেস্কোপ-এ বেশ ভালো চলল; আমরা খুশি, ডিস্ট্রিবিউটরও খুশি। কিছুদিন পর সেই ছবির প্রযোজনা সংস্থার সাথে আলাপ করতে গিয়ে জানলাম, ছবি বিরাট লোকসানে আছে। সবচেয়ে ভয়াবহ খবর হলো, শুধু সিনেস্কোপ থেকেই আমরা যে পরিমাণ টাকা পাঠিয়েছি, সব হল মিলেও ডিস্ট্রিবিউটরদের কাছ থেকে মোট পাওয়া টাকার পরিমাণ তার চেয়ে কম!

এবার আমি প্রযোজকের দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যবসাটা বোঝার চেষ্টা করলাম। জয়দেবপুরের বর্ষা সিনেমা-হলে প্রদর্শিত ইতি তোমারই ঢাকা ছবির টিকেটটা বিশ্লেষণ করতে বসলাম।

বিবরণটাকা
প্রবেশ ফি২৪.৩০
মুসক [ভ্যাট]০৩.৬৫
ব্লোয়ার চার্জ [ফ্যান]০৪.৪০
পৌর কর০২.৬৫
মোট৩৫.০০

এতদিনে কিছুটা অভিজ্ঞতা হওয়ার কারণে প্রথমেই বুঝে ফেললাম, আবু শাহেদ ইমন কেন বলেছিলেন এই টিকেট থেকে ১২ টাকা তার পকেটে আসবে। কারণ এই হলের সাথে প্রযোজকের প্রফিট শেয়ারিংয়ের চুক্তি হয়েছিল ‘পারসেন্টেজ’ পদ্ধতিতে আর তা ছিল ৫০%-৫০%। আর এই ভাগাভাগিটা হয় ‘প্রবেশ ফি’র ওপরে; টিকেটের মোট মূল্যের ওপরে নয়। এই প্রবেশ ফি’র ওপর ভিত্তি করেই সরকার নির্ধারিত হারে ভ্যাট, পৌর কর কেটে রাখা হয় আর তার সাথে যুক্ত হয় ফ্যান কিংবা ক্ষেত্রবিশেষে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের রক্ষণাবেক্ষণ চার্জ।

শেষের চার্জটাই হলের ‘বিজনেস সিক্রেট’: যে যেমন খুশি এটা বাড়ায় কমায়, কোনো কোনো সিনেমা-হল আবার এর সাথে বাড়তি আরও কিছু চার্জ যোগ করে দেয়; ফলে টিকেটের মোট দাম বেড়ে যায়। এতে করে হলের আয়ের খাত বাড়লেও প্রযোজকের খাতায় কানাকড়িও যোগ হয় না। ইমন সাহেব এ টিকেট থেকে ১২.১৫ টাকা পাচ্ছেন; কারণ তিনি কোনো ডিস্ট্রিবিউটর নিয়োগ দেননি। ডিস্ট্রিবিউটরের ১৫% হিস্যা দিতে হলে তিনি পেতেন সাকূল্যে ১০.৩৩ টাকা।


একটা গালভরা নাম আছে, ‘বক্স অফিস রিপোর্ট’। এই রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করেই একটি সিনেমা হিট হয়, সুপারহিট হয়, আবার ফ্লপও হয়

এবার আসা যাক মূল জায়গায়: টিকেটটি কিন্তু দর্শক কিনেছিলেন ৬০ টাকায়, প্রযোজক এটা জানার পরেও কেন ৩৫ টাকা ধরেই তার লাভ-লোকসান হিসাব করলেন? কারণ তিনি জানেন যে, এটা নিয়ে উচ্চবাচ্য করে ফায়দা হবে না, এটা ‘ওপেন সিক্রেট’। বেশিরভাগ হলেই টিকেটের গায়ে যে মূল্য লেখা থাকে, টিকেট বিক্রি হয় তার চেয়ে বেশি দামে– এটা বুকিং এজেন্ট জানেন, ডিস্ট্রিবিউটর জানেন, খোদ প্রযোজকও জানেন। কারণ, প্রতিটি হলেই প্রযোজক পক্ষের একজন ‘রিপ্রেজেন্টেটিভ’ নিয়োগ করা হয়, যার কাজ হচ্ছে প্রতি শো-তে কোন শ্রেণির কয়টি টিকেট বিক্রি হলো– নিয়োগকর্তাকে তা রিপোর্ট করা। এই রিপোর্টিংটাই কিন্তু চলচ্চিত্র ব্যবসার সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক দলিল; এর একটা গালভরা নাম আছে, ‘বক্স অফিস রিপোর্ট’। এই রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করেই একটি সিনেমা হিট হয়, সুপারহিট হয়, আবার ফ্লপও হয়।

এই গুরুত্বপূর্ণ কাজের জন্য তাকে দৈনিক একটা ভাতাও দিতে হয় হল মালিককে। এটা হলো নিয়মের কথা; বাস্তবতা হলো প্রযোজক আর প্রদর্শকের মাঝে থাকা সেতুগুলো দুই পক্ষের যোগাযোগ রক্ষার দায়িত্বে থেকে বরং যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করাকেই কর্তব্য মনে করেন। হল কর্তৃপক্ষের সাথে তারা একটা ডিলে চলে যাওয়ার পাঁয়তারা করেন; দুই পক্ষ সমঝোতায় এসে গেলে টিকেটের বিক্রয়মূল্য তো বটেই, দর্শক সংখ্যাও অনেক কমিয়ে রিপোর্ট করা হয়। এতে হলের লাভ বাড়ে, রিপোর্টারের কিছু নগদ কামাই হয়; কিন্তু প্রযোজক পড়েন লোকসানের গাড্ডায়।

এই লোকগুলো একবারও চিন্তা করেন না যে, লোকসানে পড়লে প্রযোজক আর ছবি বানাবেন না; ছবি না বানালে হল চলবে কী করে? আর হল না চললে এই মধ্যস্বত্ত্বভোগীদেরও তো অস্তিত্ব থাকবে না। এই ‘ওপেন সিক্রেট’ জেনেও কেন প্রযোজক মুখ বুজে থাকেন? নিজেদের কেন জিম্মি মনে করেন? নাকি দুর্বলতা তাদের নিজেদের মধ্যেই! আজকের দিনে অনলাইনে কী না করা হচ্ছে? সামান্য এই রিপোর্টিং সিস্টেমটি হালনাগাদ করা কি এতই জটিল?

বিপদ কিন্তু এখানেই শেষ নয়। দর্শক আয়নাবাজি ছবিটি হুমড়ি খেয়ে দেখেছেন, সেই হিসেবে এটি আপাতদৃষ্টিতে সুপারহিট ছবির তকমা পাওয়ার কথা; অথচ বক্স অফিস রিপোর্ট অনুসারে ছবিটি আছে ফ্লপ ক্যাটাগরিতে। এক ইন্টারভিউতে দেওয়া ছবির পরিচালকের ভাষ্যমতে, এত বছর পরেও অনেক হল থেকেই তারা পাওনা টাকা আদায় পর্যন্ত করতে পারেননি! যদি পারতেন, তবেও নাকি তারা লোকসানেই থেকে যেতেন!

সাধারণভাবে আমরা হিট-সুপারহিট শব্দগুলো দিয়ে কোনো সিনেমার জনপ্রিয়তার কথা আভাস পেলেও শব্দগুলোর আসল মানদণ্ড হচ্ছে বাণিজ্যিক সাফল্য। প্রযোজক তার বিনিয়োগ ঘরে তুলতে না পারলে ছবি যে ফ্লপ, সে তো জানা কথাই; সব ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে হিট-সুপারহিটের বিবেচ্য বিষয়আশয়ও আবার এক রকম নয়। হলিউডে মিলিয়ন-বিলিয়ন ডলারে, বলিউডে আবার শ-কোটি রুপিতে আয়ের অংক ওঠা-নামা করে: ছবি প্রথম সপ্তাহে কত আয় করল, দেশে কত আয় করল, বাইরে কত করল– সব কিছু বিবেচনায় নিয়েই ছবির ক্যাটাগরি ঠিক করা হয়। তবে সবক্ষেত্রেই আয়-ব্যয়ের মোটামুটি একটা অনুপাত হিসাব করেই প্রাথমিকভাবে সিনেমার বাণিজ্যিক সফলতা নির্ধারণ করা হয়।

সেই আনুপাতিক হিসাবটা অনেকটা এ রকম:

ক্যাটাগরিবিনিয়োগের অনুপাতে আয় [শতকরা]
ফ্লপ১০০% থেকে কম
অ্যাভারেজ১০০% থেকে ১২৫%
হিট১২৫% থেকে ১৭৫%
সুপারহিট১৭৫% থেকে ২০০%
ব্লকবাস্টার২০০% বা তার চেয়ে বেশি


বাংলাদেশেও আমরা প্রায়ই অমুক সিনেমা হিট, তমুক সিনেমা সুপারহিট হয়েছে শুনতে পাই; হয়তো সত্যি সত্যিই সিনেমাটি হিট বা সুপারহিট। কিন্তু বর্তমান প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসারে আমাদের দেশে কোনো সিনেমা হিট হওয়ার সম্ভাবনা কতটুকু?

দেশে এখন সিনেমা-হলের সংখ্যা যতই হোক না কেন, তার মধ্যে মাত্র শ’খানেক হল খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হলেও সারা বছর ধরে চলে। বাকিগুলো কেবল দুই ঈদকে কেন্দ্র করে কয়েক সপ্তাহের জন্য চালু থাকে। এর মধ্য হাতেগোনা কয়েকটি হল শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত, তারচেয়েও অনেক কমসংখ্যক আছে সিনেপ্লেক্স। এই অবস্থায় দেড় কোটি টাকা লগ্নি করা একটি সিনেমার মূলধন উঠে আসতে কতজন দর্শককে এই ছবিটি দেখতে হবে– তার একটা সরল হিসাব বের করার চেষ্টা করা যেতে পারে।

বিভিন্ন মানের সিনেমা-হল এবং বিভিন্ন শ্রেণির আসন বিবেচনা করে সদ্য বিলুপ্ত রাজমণি সিনেমা-হলের ড্রেস সার্কেল বা ডিসির একটি টিকেটের মূল্যকে গড় ধরে নিচ্ছি হিসাবের সুবিধার্থে; সত্যিকারের গড় হয়তো এর চেয়ে বেশি নয়, বরং কমই হবে। এই টিকেট থেকে পারসেন্টেজ পদ্ধতিতে প্রযোজকের হাতে আসন প্রতি আসবে সর্বোচ্চ ১৫ টাকা।

তাহলে, বিনিয়োগ ওঠাতে মোট দর্শক প্রয়োজন= ১,৫০,০০,০০০ ÷ ১৫ = ১০,০০,০০০ জন।

প্রযোজক ও পরিবেশক সমিতির নিয়ম অনুযায়ী ঈদ বা কোনো বিশেষ উপলক্ষ্য ছাড়া প্রতি সপ্তাহে সর্বোচ্চ দুটি ছবি মুক্তি পেতে পারে। আশাবাদী হিসেবেই ধরে নিই, আমাদের ছবিটির রিলিজের সপ্তাহে অন্য কোনো ছবি রিলিজ হয়নি, এমনকি আগের সপ্তাহে মুক্তিপ্রাপ্ত কোনো ছবিও দ্বিতীয় সপ্তাহ পর্যন্ত হলে থাকেনি। অর্থাৎ আমাদের ছবিটিই দেশের প্রতিটি হলে চলছে।

এ অবস্থায় হলপ্রতি দর্শক প্রয়োজন ১০,০০,০০০ ÷ ১০০ = ১০,০০০ জন।

আমাদের দেশে এক হাজার বা তারচেয়ে বেশি আসনসংখ্যা বিশিষ্ট সিনেমা-হল খুবই কম; আবার দুইশ আসনের হলও আছে। বড় শহরগুলোর বাইরে তিনশ বা চারশ আসনের বেশি ধারণ ক্ষমতার প্রেক্ষাগৃহ নেই বললেই চলে। আসনসংখ্যা যা-ই হোক, আসনের অন্তত পঁচিশ শতাংশই আবার ভাঙাচোরা, ছাড়পোকার অভয়ারণ্য। অর্থাৎ ব্যবহারোপোযোগী না।

আবারও একটু আশাবাদী হওয়া যাক। ধরি, প্রতিটি হলের গড় ধারণক্ষমতা ৫০০ আসন।
সেই হিসাবে প্রতিটি হলে হাউসফুল শো প্রয়োজন ১০,০০০ ÷ ৫০০ = ২০টি; অর্থাৎ, সপ্তাহের ৭ দিন ১০০টি প্রেক্ষাগৃহের প্রতিটির প্রতিদিনকার ৩টি শোর প্রতিটিই হাউসফুল হতে হবে।

এই হিসাব থেকে ধারণা পেলাম, দেশের প্রতিটি চালু সিনেমা-হলে প্রতিদিন তিনটি করে ‘তিল ঠাঁই আর নাহিরে’ ক্যাটাগরির হাউসফুল শো এক সপ্তাহ চললে তবেই কেবল সিনেমাটির বিনিয়োগ ব্রেক ইভেনে আসতে পারে। সারা দুনিয়াতেই মুক্তির প্রথম সপ্তাহের পর সিনেমার ক্রেজ কমতে থাকে, এটা স্বীকার করে নিলে আমাদের আলোচ্য সিনেমাটির গায়ে হিট বা সুপারহিট তকমা লাগাতে হলে একইভাবে অন্তত তিন সপ্তাহ চলতে হবে।

এই হিসাব করতে গিয়ে অতি আশাবাদী অ্যাপ্রোচে এগিয়েও বাস্তবসম্মত একটা উপসংহারে পৌঁছানো যাচ্ছে না। কারণ, আমাদের দেশি সিনেমার ইতিহাসে শুধু একটি সিনেমাই শতভাগ প্রেক্ষাগৃহে চলেছে– এমন নজির নেই। এমনকি আমাদের ইন্ডাস্ট্রির সত্যিকারের সুপারহিট ছবি বেদের মেয়ে জোসনা প্রদর্শনের জন্যেই কেবল গ্রামে-গঞ্জে বাঁশের বেড়া দেওয়া নতুন নতুন সিনেমা-হলও গড়ে উঠেছিল, পর্দায় ছিল টানা কয়েক মাস; তারপরও সেটা এক সপ্তাহের জন্যেও শতভাগ প্রেক্ষাগৃহে ছিল না।

ইউটিউবে ৭ দিনে ১০ লক্ষ ভিউ এখন ডাল-ভাত হয়ে গেলেও বর্তমান প্রেক্ষাপটে ১০ লক্ষ দর্শককে সিনেমা-হলে নিয়ে যাওয়া কিন্তু নেহাতই কষ্ট-কল্পনা। এরপরও এই দেড় কোটি টাকা বাজেটে প্রতি বছর ডজন ডজন ছবি হচ্ছে আর বাণিজ্যিক ছবি বিবেচনায় এটা কিন্তু কোনো উচ্চাভিলাষী বাজেটও বলা যাবে না।


আমাদের প্রযোজকেরা কেন ‘সংশপ্তক’ হতে চাচ্ছেন, এখন পর্যন্ত এই রহস্যের কিনারা করতে পারিনি

লোকসান নিশ্চিত জেনেও তবে কেন প্রযোজকরা সিনেমায় টাকা ঢালছেন? পরাজয় নিশ্চিত জেনেও যুদ্ধ চালিয়ে যায় যে বীর, বাংলা ভাষায় তার জন্য একটা চমৎকার শব্দ বরাদ্দ আছে, ‘সংশপ্তক’। আমাদের প্রযোজকেরা কেন ‘সংশপ্তক’ হতে চাচ্ছেন, এখন পর্যন্ত এই রহস্যের কিনারা করতে পারিনি।

এই ছবিটিকেই যদি সিনেপ্লেক্সের ৩০০ টাকার টিকেটের বিবেচনায় চিন্তা করি, তাহলে সেখান থেকে প্রযোজকের হাতে আসত আসনপ্রতি ৬০ টাকা, সেক্ষেত্রে দর্শক প্রয়োজন হতো এক চতুর্থাংশ। কিন্তু এই হিসাবও বাস্তবসম্মত নয়; কারণ সিনেপ্লেক্সে গিয়ে বাংলা ছবি দেখার মানসিকতা রাখেন কতজন দর্শক?

ইদানিং চলচ্চিত্রের বাণিজ্যিক সম্ভাবনা ঝুঁকেছে স্ট্রিমিং প্ল্যাটফরমগুলোর ওপর, তবে প্রতিযোগিতাটি সেখানে আন্তর্জাতিক। এই আসরে যে প্রতিযোগিরা ইতোমধ্যেই আসন গেড়ে বসে আছেন, আমাদের এই দেড় কোটি টাকা বাজেটের ছবিগুলো তাদের পাশে দাঁড়ানোর সক্ষমতা রাখতে পারবে কি না– সেটাও কিন্তু একটা বড় প্রশ্ন।

প্রেক্ষাগৃহ ছাড়াও একটি চলচ্চিত্র থেকে আয়ের আরও নানান রাস্তা আছে; কিন্তু চলচ্চিত্র যদি প্রেক্ষাগৃহের জন্যই তৈরি করা হয়ে থাকে, তাহলে অবশ্যই তার প্রধান আয়ের উৎস সিনেমা-হল। হল থেকে অন্তত বিনিয়োগের সমান অর্থ নিশ্চিত করা না গেলে প্রযোজক বাধ্য হবেন মাধ্যম পরিবর্তন করতে; সেটা করতে গেলে প্রোডাকশনের চরিত্রও বদলে যাবে নিশ্চিতভাবেই। সেই প্রোডাকশনকেও তাত্ত্বিকরা তখন আর ‘সিনেমা’ নামেই ডাকবেন কি না, কে জানে! এখনই তো ‘টেলিফিল্ম’, ‘ভিডিও ফিকশন’ ইত্যাদি কত কত নাম শুনতে পাই।

আশাবাদী হতে গিয়ে নিরাশ হলেও এই হিসাবের পর আমার ব্যক্তিগত দুটো উপলব্ধি হয়েছে। প্রথমত, চলচ্চিত্রের ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে হলে একটা সময় পর্যন্ত নির্মাণ ব্যয় আরও কমাতে হবে; সে ক্ষেত্রে লগ্নীকৃত টাকা উঠিয়ে আনা তুলনামূলক সহজ। কম বাজেটের ব্যবসাসফল সিনেমার উদাহরণ কিন্তু বিশ্ব-সিনেমায় অপ্রতুল নয়; অনেক ক্ষেত্রেই মেধা দিয়ে বাজেটের সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করা সম্ভব হয়েছে। এই সিনেমাগুলো দর্শক পছন্দ করলে আবার সিনেমা-হলগুলো মুখরিত হতে থাকবে। দল বেঁধে সিনেমা দেখতে যাওয়ার সংস্কৃতি এখনো কিন্তু হারিয়ে যায়নি; এমন কয়েকটা দল সিনেস্কোপ-এর নিয়মিত দর্শক। অনেকেই এমন সুযোগের জন্য অপেক্ষা করেন; কিন্তু পরিবেশ আর নিরাপত্তার বিবেচনায় সিনেমা হলের দিকে পা বাড়ান না। এটা একটা সামাজিক প্রয়োজনও বটে।

আরেকটা উপলব্ধি হচ্ছে, ধীরে ধীরে হলেও সিনেপ্লেক্সের সংখ্যা বাড়াতে হবে। নিদেনপক্ষে সিনেমা-হলের পরিবেশ এবং কারিগরি মান উন্নত করতেই হবে। কারণ, স্বস্তিবোধ না করলে দর্শক সেখানে যাবে না, আর দর্শক না গেলে প্রেক্ষাগৃহের জন্য সিনেমা বানানোর প্রয়োজনটাই বা কি!

এত সীমাবদ্ধতার মাঝেও স্বপ্ন দেখতে চাই– নতুন আইডিয়ার এক ঝাঁক সিনেমা এসে আমাদের কাঁপিয়ে দিয়ে যাচ্ছে, দর্শককে নতুন রুচিতে উত্তীর্ণ করে জাগিয়ে তুলছে আমাদের মৃতপ্রায় চলচ্চিত্র বাণিজ্যকে। আশাবাদী হতে গেলে সেই মসীহের জন্য অপেক্ষা করা ছাড়া গত্যন্তর নেই।

Print Friendly, PDF & Email
শেয়ার
ফিল্মমেকার; আর্কিটেক্ট । বাংলাদেশ ।। ফিচার ফিল্ম : আম কাঁঠালের ছুটি [সম্পন্ন, মুক্তির অপেক্ষায়]; মাস্তুল [নির্মিতব্য] ।। শর্ট ফিল্ম : জংশন; যাত্রা ।। প্রতিষ্ঠাতা : সিনেস্কোপ [সিঙ্গেল স্ক্রিন সিনেমা থিয়েটার, নারায়ণগঞ্জ]

4 মন্তব্যগুলো

  1. অনেক কিছু পরিষ্কারভাবে বুঝতে পারলাম। এ বিষয়ে খোলামেলা আলোচনা চলচ্চিত্রের খাতিরেই প্রয়োজন।

    সুচিন্তিত ভাবনাটি এমন পরিপাটি রূপে উপস্থাপনের জন্য অনেক ধন্যবাদ।

  2. আশাকে বাঁচিয়ে রাখাও একটা লড়াই। এতকিছুর পরেও নুরুজ্জামানের যে আশার অপেক্ষা তা সফল হয়ে উঠুক।

  3. আরেকটা পদ্ধতির কথা শুনছিলাম, হল রেন্টাল নেওয়া,এক সপ্তাহ দুই সপ্তাহ এভাবে। টিকেট এর পুরো টাকা প্রযোজক পাবে,সাথে লাভ ক্ষতি পুরোটা ভোগ করবে। হল মালিক শুধু রেল্টাল ফি পাবেন। এ পদ্ধতিতে কাজ হয় নাকি দেশে???

  4. ভারতের বিশেষ করে পশ্চিমবংগের চলচ্চিত্রের বানিজ্যিক পরিকাঠামোর সামগ্রিক পরিস্থিতির সাথে প্রায় ১০০ শতাংশ মিল পেলাম। ছবি যেমনই হোক না কেন তার আয় কেবলমাত্র তার যোগ্যতা ও বিপননের উপরেই নির্ভরশীল হওয়া উচিত। কিন্তু বাস্তবে সে কল্পনা দুর্লভ। তাই একজন পরিবেসক ও প্রযোজক হিসেবে এজেন্টরাজ এর বিলুপ্তি এবং বিক্রয়ে সচ্ছতা না আসা অবধি এই পরম্পরার কোন পরিবর্তন ঘটার সম্ভবনা দিশাহীন বলেই মনে হয়।।

মন্তব্য লিখুন