দৃশ্য-সংস্কৃতির সঙ্কটকালে ওয়েব কন্টেন্ট দমন ও নিয়ন্ত্রণের বাসনা

1
216
বেলায়াত হোসেন মামুন

লিখেছেন । বেলায়াত হোসেন মামুন

বাংলাদেশের চলচ্চিত্র সংস্কৃতি বা দৃশ্য-সংস্কৃতির এখন ঘোর বিপদের কাল চলছে। এমনটা নয় যে এটা কেবল এই করোনা মহামারি বা অতিমারির প্রকোপ। এটা আসলে বেশ অনেকদিন ধরেই দেশের দৃশ্য-সংস্কৃতিকে রাহুগ্রস্ত করছিল। করোনা মহামারি এই বাস্তবতাকে নিকটবর্তী করেছে মাত্র।

বাংলাদেশের দৃশ্য-সংস্কৃতির এই সঙ্কটকাল অতীতের যে কোনো সময়ের চেয়ে এখন কঠিন পরিস্থিতিতে পৌঁছেছে। যে কোনো অর্থেই এটা খুব দুঃখজনক বাস্তবতা আজ। সিনেমা-হল বন্ধ, সিনেমা নির্মাণের যাবতীয় প্রচেষ্টা বাধাগ্রস্ত এবং বাণিজ্যিক চলচ্চিত্রের আঁতুরঘর এফডিসি ভাঙনের কাজ শুরু হয়েছে বা বলা ভালো এফডিসি বেহাত হচ্ছে বাণিজ্যিক সিনেমার একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণের ঘেরটোপ হতে।


টেলিভিশনে
চিন্তাশীল প্রোডাকশনের
শূন্যতা এবং অতি-বাণিজ্য
প্রবণতার জন্য দশকের পর দশক
ধরে ভাঁড়ামিপূর্ণ ক্যারিকেচার দিয়ে
নিজেদের দর্শক
হারিয়েছে

পাশাপাশি দেশের টেলিভিশনে চিন্তাশীল প্রোডাকশনের শূন্যতা এবং অতি-বাণিজ্য প্রবণতার জন্য দশকের পর দশক ধরে ভাঁড়ামিপূর্ণ ক্যারিকেচার দিয়ে নিজেদের দর্শক হারিয়েছে। এই বাস্তবতায় আদতে আমাদের দৃশ্য-সংস্কৃতি এখন নিজের অস্তিত্বকে টিকিয়ে রাখার লড়াইয়ের অন্তিমভাগে অবস্থান করছে।

এফডিসির ফ্লোর ভেঙে নির্মিত হচ্ছে ১৫ তলা বাণিজ্যিক ভবন
ছবি । চ্যানেল আই

এই পরিস্থিতিতে জীবনযাপন খুব কঠিন; কারণ চলচ্চিত্র অথবা দৃশ্য-মাধ্যমের অপর যে কোনো কন্টেন্ট নির্মাতাদের সঙ্গে কেবল অভিনয়শিল্পীরা নন, কারিগরি ব্যবস্থাপনা, বিপণনসহ বিভিন্ন স্তরে প্রচুর মানুষ জীবনযুদ্ধে লিপ্ত। এইসব মানুষ যদি বর্তমান বাস্তবতায় কর্মহীন থাকতে থাকতে পেশা বদল করেন, তাহলে আগামীদিনে দৃশ্য-মাধ্যমে যথেষ্ট ‘পেশাদার’ মানুষ না-থাকার আরেক সঙ্কট আমাদের মোকাবেলা করতে হবে।

দৃশ্য-সংস্কৃতি খুব জটিল একটি মাধ্যম। এই মাধ্যমে যারাই যত রকমের কাজে যুক্ত আছেন, তাতে তাদের নিজস্ব কিছু প্রশিক্ষণ ও অভিজ্ঞতা আছে। আছে দীর্ঘদিনের চর্চা ও অভ্যাসের মাধ্যমে গড়ে ওঠা সহজাত গুণ। এইসব প্রয়োজনীয় মানুষ একবার হারালে রাতারাতি আবার তাদের তৈরি করা সহজ কাজ নয়।

একটি দেশের দৃশ্য-সংস্কৃতির বাতাবরণ তৈরি হতে যদি পঞ্চাশ-ষাট বছরের একটি জার্নি থাকে, তবে সে জার্নির অভিজ্ঞতা ও জ্ঞান এই সংস্কৃতিকে চলমান রাখতে প্রাণরস ও শক্তির উৎস হিসেবে কাজ করে। তাই আমরা এই মাধ্যমের সকল মানুষের একইসঙ্গে কর্মহীন হয়ে পড়ার বর্তমান বাস্তবতায় এবং জীবন ধারনের প্রয়োজনে পেশা বদলের এই পরিস্থিতিকে স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করতে পারি না।

এই ক্ষেত্রে এটাও বলা জরুরি যে, এই মাধ্যমের সকল মানুষ যে সহজে পেশা বদল করবার ‘সুযোগ’ পাবেন, তাও নয়। বহু মানুষ আছেন, যাদের বয়স ও শারীরিক সক্ষমতা আর এমন নেই যে তারা এই বর্তমান বাস্তবতায় কোনো নতুন পেশায় নিজেদের নিয়োগ করতে পারবেন। অনেকের কাছেই এটা আজ টিকে থাকার একটি যুদ্ধ মাত্র।

আবার অনেক তরুণ, যারা দৃশ্য-সংস্কৃতির প্রতি ভালোবাসায় একে পেশা ও প্যাশন হিসেবে গ্রহণ করতে এসেছেন; তাদের জন্য বর্তমান পরিস্থিতিতে দৃশ্য-সংস্কৃতি পেশা হিসেবে ভয়ানক অনিরাপদ একটি পথ হিসেবে পরিচিত হচ্ছে। দেশের দৃশ্য-সংস্কৃতিতে সক্রিয়– এমন অগণিত তারুণ্যের সকলেই খুব সচ্ছল পরিবারের সদস্য নন যে, তারা খুব সহজেই এই বাস্তবতার সঙ্গে নিজেদের মানিয়ে নিতে পারবেন।

এইসব তরুণের টিকে থাকা এবং সক্রিয় থাকাটা এখন খুবই অনিশ্চয়তায় পড়েছে। ফলে আমাদের দৃশ্য-সংস্কৃতি বহু প্রতিভাবান ও সম্ভাবনাময় তারুণ্যকে হারাতে যাচ্ছে বলে আমার বোধ হচ্ছে।


প্রয়োজন সত্যিকার
কার্যকর কিছু
উদ্যোগের

আর এসব ঋণাত্মক পরিসংখ্যান আমাদের দৃশ্য-সংস্কৃতির জন্য ভয়ানক ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতি তৈরি করছে। এই বিষয়ে তাই আমাদের সবাইকে আরও বেশি মনোযোগ দেওয়া উচিত এবং এই পরিস্থিতিতে আমাদের করণীয় ভাবাটাও জরুরি। প্রয়োজন সত্যিকার কার্যকর কিছু উদ্যোগের। যাতে করে দৃশ্য-সংস্কৃতির সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে যুক্ত সকল মানুষ এই সঙ্কটকাল সহজে অতিক্রম করতে পারেন।

এই দায় প্রধানত রাষ্ট্রের এবং রাষ্ট্র পরিচালনাকারী হিসেবে সরকারের দায়িত্ব ও কর্তব্যের মধ্যেই পড়ে।

যখন আমাদের দৃশ্য-সংস্কৃতির অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার লড়াইয়ে আমাদের আরও মনোযোগ ও একত্রিত হয়ে কাজ করা দরকার, তখন দুটি ঘটনা আমাকে গভীরভাবে বিচলিত করেছে। ঘটনা দুটি ভিন্ন হলেও এর অভিঘাত দেশের দৃশ্য-সংস্কৃতির গুণগত মান ও এর সামগ্রিক রাজনৈতিক অর্থনীতির জন্য সাংঘাতিক ক্ষতিকারক এবং তা উপেক্ষা করা সম্ভব নয়।

গত ২৪ ও ২৫ জুন (২০২০) তথ্য মন্ত্রণালয়ের দুটি পৃথক পদক্ষেপে আমি ভাবিত হয়েছি। ২৪ জুন তথ্য মন্ত্রণালয় দেশে সম্প্রতি আলোচিত ওয়েব সিরিজ বিতর্কে সরকারি অবস্থান স্পষ্ট করেছে, যা আমাদের বর্তমান বাস্তবতাকে আরও সঙ্কটপূর্ণ করেছে। অন্যদিকে, ২৫ জুন তথ্য মন্ত্রণালয় ২০১৯-২০২০ সালে চলচ্চিত্র অনুদানপ্রাপ্তদের তালিকা ঘোষণা করেছে। এই তালিকা দেখে মনে হয়েছে– আমাদের দৃশ্য-সংস্কৃতির আর কোনো একটি ক্ষেত্রও বিনষ্ট হতে বাকি নেই। এটা ভীষণ পরিতাপের হলেও এটাই সত্য।

যদিও আজকের এই আলোচনায় চলচ্চিত্র অনুদান প্রসঙ্গটি আপাতত উহ্য রাখছি। চলচ্চিত্র অনুদানের ভ্রষ্ট হওয়া নিয়ে পৃথকভাবে লিখতে হবে। তাই আজ তা মুলতবি করলাম।

ভেঙে ফেলা ১ নম্বর ফ্লোর
ছবি । চ্যানেল আই

কিন্তু পরপর দুই দিনে চলচ্চিত্র অনুদান ও ওয়েব কন্টেন্ট বিষয়ে সরকারের তথ্য মন্ত্রণালয়ের এই পদক্ষেপ হতাশ করলেও তা আমাদের অবাক করেনি। আমরা অবাক হইনি, কারণ চলমান বাস্তবতায় এর চেয়ে ব্যতিক্রম কিছু আমরা আশাও করিনি। কিন্তু এটা তো আমাদের হতাশারই উচ্চারণ। নয় কি?


এই
অপ্রতিরোধ্য
ওয়েবনির্ভর ‘বিনোদন’
দুনিয়ায় আমরা কেবল নতুন
নই; আমরা অপ্রস্তুত ও নাবালক

ওয়েবনির্ভর বিনোদন বাণিজ্যে এক বিস্ময়কর বিস্তার ঘটে গেছে গত দশ বছরে। কোনো সন্দেহ নেই এই বিস্তার সামনের দিনগুলোতে আরও অপ্রতিরোধ্য হবে। এই অপ্রতিরোধ্য ওয়েবনির্ভর ‘বিনোদন’ দুনিয়ায় আমরা কেবল নতুন নই; আমরা অপ্রস্তুত ও নাবালক। আমাদের নাবালকত্বের উদাহরণ অনেক আছে। সাম্প্রতিক উদাহরণ হলো বাংলাদেশে নির্মিত দুই বা তিনটি ওয়েব সিরিজ নিয়ে ‘শ্লীল নাকি অশ্লীল’ বিতর্ক।

ব্যক্তিগত ডিভাইসভিত্তিক ‘বিনোদন’ প্রপঞ্চের বর্তমান বাস্তবতায় আমাদের দেশের ‘সংস্কৃতিজনের’ আলোচনার টপিক হলো ‘পরিবারের সবাই’ মিলে দেখার মতো বিনোদন কন্টেন্ট। আজকের দিনে এ ধরনের আলোচনার টপিকই যে হাস্যকর, তা যদি আমাদের ‘অগ্রসর’ মানুষজনই না বুঝতে পারেন, তবে ‘চিলে কান নেওয়া’ দেশের বহু জনতার আর দোষ কি?

এই সামাজিক চাপের পরিস্থিতিতে তথ্য মন্ত্রণালয় দুটি অনলাইন স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মের কাছে তাদের প্রচারিত ওয়েব সিরিজে ‘সেন্সরবিহীন ও কুরুচিপূর্ণ’ দৃশ্যের বিষয়ে ব্যাখা চেয়েছে। আর এই চিঠিতে তথ্য মন্ত্রণালয় মোট ৫টি আইনের বিভিন্ন ধারায় আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ এনেছে।


আইনগত

সামাজিক
ভয়ের খড়গ
মাথায় নিয়ে সৃজনশীল

চিন্তাশীল কাজ হবে?

খেয়াল করুন, তথ্য মন্ত্রণালয় ‘ব্যাখ্যা’ চাওয়ার জন্য দেশে অলরেডি বিদ্যমান ৫টি আইনের কথা উল্লেখ করে সেইসব আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ এনেছে। অর্থাৎ, ওয়েবনির্ভর এই নতুন ‘বিনোদন’ তরঙ্গকে নিয়ন্ত্রণে সরকারের আসলে ‘নতুন’ কোনো আইন প্রণয়নেরও প্রয়োজন নেই। বিদ্যমান গোটা পাঁচেক আইনের বিভিন্ন ধারায় চাইলে সরকার এই ওয়েবের দুনিয়ার জন্য কন্টেন্ট প্রস্তুতকারী যে কোনো নির্মাতা-অভিনেতা-কলাকুশলীর বিরুদ্ধে নানাবিধ আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ আনতে পারে। তো, এই আইনগত ও সামাজিক ভয়ের খড়গ মাথায় নিয়ে সৃজনশীল ও চিন্তাশীল কাজ হবে?

ওয়েব কন্টেন্ট নিয়ে ওঠা এই সামাজিক বিতর্কের চাপ এবং সরকারের তথ্য মন্ত্রণালয়ের ‘কারণ দর্শানোর’ এই চিঠি আর নানাবিধ হুমকির পর ওয়েব কন্টেন্ট নির্মাণের স্বতস্ফূর্ত প্রবাহ ইতোমধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। যারা এই ক্ষেত্রে অর্থ লগ্নি করার কথা ভাবছিলেন, তারা পিছিয়ে গেছেন বলে শুনেছি। আর যারা নির্মাণ করার ইচ্ছে নিয়ে প্রস্তুত হচ্ছিলেন, যারা অভিনয়ের জন্য নিজেদের প্রস্তুত করছিলেন, তাদের উদ্দীপনা কিছুতেই একই রকম নেই।

এই ‘ভীতি’ তৈরির প্রকল্পে আসলে সত্যিকারের ক্ষতিটা হলো কার?

এ সময়ে আলোচনায় এসেছিল ‘শ্লীল-অশ্লীল’ বিতর্ক। আগামীকাল হয়তো অন্য কিছু নিয়ে বিতর্ক হবে। বিতর্ক সমাজে হতেই পারে। বিতর্ক হওয়াটা স্বাস্থ্যকর বিষয়। যে সমাজে বিতর্ক ও মুক্ত মত প্রকাশের অবাধ স্পেস থাকে না, সে সমাজ তো মৃত সমাজ। এটা ভালো যে, আমাদের সমাজে বিতর্ক এখনো কিছু কিছু হয়।


সমাজের
কিছু না-বুঝ
মানুষের চাপ ও কিছু
মানুষের হুমকি-ধামকিতে
শিল্প ও শিল্পীর প্রতি রাষ্ট্রের
দায় এবং অঙ্গিকার আমরা ভুলে যাব?

বিতর্ক হয়, তাই বলে সামাজিক এই বিতর্কে ভয়ে ভীত হয়ে অথবা অতি উদ্দীপনায় চটজলদি তা বন্ধ করতে তৎপর হতে হবে? সমাজের কিছু না-বুঝ মানুষের চাপ ও কিছু মানুষের হুমকি-ধামকিতে শিল্প ও শিল্পীর প্রতি রাষ্ট্রের দায় এবং অঙ্গিকার আমরা ভুলে যাব?

রাষ্ট্রের কর্তব্য শিল্প ও শিল্পীর সুরক্ষা দেওয়া। শিল্পীর সৃজনশীল চিন্তা ও স্বাধীনতায় ভয় বিস্তার নয়। কিন্তু তথ্য মন্ত্রণালয়ের যে পদক্ষেপ, তাতে সামাজিক এই বিতর্কে আমাদের রাষ্ট্র শিল্প ও শিল্পীর তৎপরতাকে লাল ফিতার ভয়ই দেখিয়েছে। এটা দুঃখজনক।

পূর্বের কথা রেশ ধরে বলছি, বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শুধু নয়, পুরো দৃশ্য-সংস্কৃতিই এখনো অবিকশিত রয়ে গেছে। অথচ বাংলাদেশের মানুষ এখন প্রতিমুহূর্তে দুনিয়ার সবরকম দৃশ্য-মাধ্যমের সুবিধা ও সুযোগ গ্রহণ করছে। কিন্তু সে সুযোগ ও সুবিধা গ্রহণের বিষয়ে আমাদের এই বিপুল জনগোষ্ঠী মূলত অপর দেশের পণ্যের ভোক্তা বা খরিদদার মাত্র।

বাংলাদেশের কিছু মানুষের অপর দেশের হাজার রকমের ‘বিনোদন পণ্যের’ কাস্টমার হওয়াটাতে কোনো আপত্তির কিছু নেই (এই ক্ষেত্রে আমি মনে করি কারও স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করার অধিকারও কারও নেই। অর্থাৎ কারও কোনো কিছুর খরিদদার হওয়া বা না-হওয়াতে কারও আপত্তি থাকা উচিতও নয়। কিন্তু এই ক্ষেত্রে আমি দেশের ‘সুধীজনদের’ যে ডাবল স্ট্যান্ডার্ন্ড আচরণ দেখি, সেটা বলতেই এই ‘আপত্তি’র প্রসঙ্গ আনছি), যত আপত্তি কেবল নিজের দেশের কন্টেন্টের বিষয় ও ভঙ্গিতে। অদ্ভুত এই ডিলেমা!

অথচ সবাই জানেন, অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ভীষণভাবে মুক্ত স্পেস। কারও অপছন্দ হলেও বা কেউ চাইলেও তা সীমায়িত করা যায় না। কিন্তু এই অসম্ভবকে ‘সম্ভব’ করবার গোয়ার্তুমি আমরা দেখছি বাংলাদেশে। অনলাইনের সব রকম কন্টেন্টকে ‘সেন্সর’ করবার এই যে সামাজিক চাপ ও সরকারি বাসনা, তা আদতে অজ্ঞতা ছাড়া আর কিছু নয়। আর এই অজ্ঞতার মাশুল আমাদেরকে চড়া মূল্যে দিতে হতে পারে। কারণ, প্রতিদিন আমাদের নিজের দেশের বাজার হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে। আর নিজের দেশের দৃশ্য-সংস্কৃতি প্রায় মরতে বসেছে। এটা একবার যদি পুরোপুরি ধ্বসে পড়ে, তবে একে পুনরায় ফিরিয়ে আনা সময়সাপেক্ষ শুধু নয়, বহুগুণ কঠিন কাজ হবে। অথচ আজকের দিনের কিছু সচেতন ও দূরদৃষ্টিসম্পন্ন সিদ্ধান্ত এই পরিস্থিতি বদলে দিতে পারে। কিন্তু সে চেষ্টা এখনো কারও মাঝে দেখছি না।

বিনোদন ও চিন্তাশীল– উভয় কাজের জন্য অনলাইন মাধ্যমের সম্ভাবনা বিপুল। এই সম্ভাবনাকে ‘বিপদ’ ভেবে আমাদের সমাজ ও সরকার একে লাল ফিতায় বাঁধতে তৎপর হয়েছে। জানা কথা, এটা আখেরে আমাদের কোনো কাজে আসবে না। আমরা আমাদের দেশের দর্শককে অপর দেশের বানানো কন্টেন্টে আসক্ত হতে দেখছি। এটা চলছে এবং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বাড়বে। এতে আমাদের সামগ্রিক সাংস্কৃতিক দেউলিয়ানা তরান্বিত হচ্ছে কেবল। যা থেকে বাঁচতে হলে আমাদেরকে ‘সেন্সরবিহীন ও কুরুচিপূর্ণ’– এসব কথার ‘মোরাল পুলিশিং’ সামাজিকভাবে বন্ধ করতে হবে।

কারণ ‘সেন্সর’ শব্দটিই বর্তমান দুনিয়ায় একটি আধিপত্যকামী ও দমনমূলক শব্দ। এটি এখন আর কোনো সভ্য রাষ্ট্রের ভাষা নয়। ‘কুরুচিপূর্ণ’ শব্দটিও ভীষণভাবে আপেক্ষিক। কারণ, রুচি যার যার ব্যক্তিগত। আপনার রুচিতে যা অস্বস্তিকর, তা আপনি দেখবেন না। কিন্তু কাউকে দেখতে দেবেন না– এটা কোনো গণতান্ত্রিক আচরণের মধ্যে পড়ে না।

ভেঙে ফেলা ২ নম্বর ফ্লোর
ছবি । চ্যানেল আই

একইভাবে ‘আপত্তিকর’ শব্দটিও আপেক্ষিক। আপনার কাছে যা ‘আপত্তিকর’, তা অন্যের কাছে নাও তো হতে পারে।

একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের মানুষের সব রকম বিষয়ে স্বাধীনতা ভোগ করবার কথা। তার চিন্তার যেমন স্বাধীনতা আছে, আছে মত প্রকাশের স্বাধীনতা। কিন্তু কারও মত পছন্দ না হলেও তা অপরকে মানতেই হবে– এমন জবরদস্তি নিশ্চয়ই সংবিধান সম্মত হতে পারে না।


স্বাধীন
বাংলাদেশে
আমরা নিজেরাই
এমনসব আইন তৈরি
করেছি, যা আমাদের নিজেদের
হাত-পা ও মুখ
বেঁধে ফেলছে

আফসোসের বিষয় হলো, আমরা ব্রিটিশদের কাছ থেকে স্বাধীনতা পেয়েছি, কিন্তু ব্রিটিশ অনেক আইন থেকে আজও মুক্ত হতে পারিনি। আমরা পাকিস্তানের বিরুদ্ধে লড়াই করে বিজয়ী হয়েছি, কিন্তু পাকিস্তানি আমলাতন্ত্রকে বাতিল করিনি; বরং তা নিজেদের মধ্যে আত্তীকরণ করে নিয়েছি। আর এর ফলে স্বাধীন বাংলাদেশে আমরা নিজেরাই এমনসব আইন তৈরি করেছি, যা আমাদের নিজেদের হাত-পা ও মুখ বেঁধে ফেলছে।

এখন আমাদের সচেতন হওয়া উচিত নিজেদের ঘরকে নিজেদের মতো গড়ে তোলার প্রয়োজনীয় চিন্তায়। আমাদের উচিত দেশের সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক আধিপত্যকামী সকল আবর্জনা দূর করার। আমাদের উচিত প্রশাসনিক ও আইনগত সকল শোষণমূলক ব্যবস্থা ও দমনমূলক আইন বাতিলের জন্য নিজেদের একত্রিত ও ঐক্যবদ্ধ করায় মনোযোগী হওয়া।

সংস্কৃতি ও শিল্পের নিরঙ্কুশ মুক্তির জন্য যদি আমাদের সংবিধান নতুন করে লিখতে হয়, তবে তাই করতে হবে। কারণ যা আমাদের বেঁধে রাখে, তা যত মূল্যবানই হোক কেন– আদতে এক শৃঙ্খল। যে শৃঙ্খল বেঁধে রাখে, তা স্বর্ণের হোক কিংবা পাটের– সে দড়ি কেটে ফেলাতেই মুক্তি।

১৪ জুলাই ২০২০, ঢাকা
Print Friendly, PDF & Email
শেয়ার
লেখক; চলচ্চিত্র নির্মাতা; চলচ্চিত্র সংগঠক। ঢাকা, বাংলাদেশ। সাধারণ সম্পাদক, ফেডারেশন অব ফিল্ম সোসাইটিজ অব বাংলাদেশ। সভাপতি, ম্যুভিয়ানা ফিল্ম সোসাইটি। নির্মিত প্রামাণ্যচিত্র : অনিবার্য [ পোশাক শ্রমিক আন্দোলন; ২০১১]; পথিকৃৎ [চলচ্চিত্রকার বাদল রহমানের জীবন ও কর্মভিত্তিক; ২০১২ (যৌথ নির্মাণ)]; সময়ের মুখ [জাতীয় অধ্যাপক মুস্তাফা নূরউল ইসলামের জীবন অবলম্বনে; ২০১৮]। সম্পাদিত ফিল্ম-ম্যাগাজিন : ম্যুভিয়ানা; চিত্ররূপ। সিনে-গ্রান্থ : চলচ্চিত্রপাঠ [সম্পাদনা]; চলচ্চিত্রের সাথে বোঝাপড়া; স্বাধীন চলচ্চিত্র আন্দোলনের ইশতেহার : বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ; চলচ্চিত্রকথা [তারেক মাসুদের বক্তৃতা ও সাক্ষাৎকার; সম্পাদনা]। পরিকল্পক ও উৎসব পরিচালক : নতুন চলচ্চিত্র নতুন নির্মাতা চলচ্চিত্র উৎসব

১টি কমেন্ট

মন্তব্য লিখুন