এ শহর না আমায় ধারণ করতে পারবে, না পারবে উপেক্ষা করতে: ঋতুপর্ণ ঘোষ [২]

0
1067
ঋতুপর্ণ ঘোষ

সাক্ষাৎকার । কৌস্তভ বকশী
অনুবাদ । নাফিস সাদিক

অনুবাদকের নোট:
বাংলা চলচ্চিত্রের কিংবদন্তি নির্মাতাদের একজন ঋতুপর্ণ ঘোষ [৩১ আগস্ট ১৯৬৩–৩০ মে ২০১৩]। মাত্র ঊনপঞ্চাশ বছরের জীবনে নির্মিত উনিশটি চলচ্চিত্রের জন্য তিনি পেয়েছিলেন বারোটি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার। তাঁর নির্মিত প্রতিটি চলচ্চিত্রে মৌলিকত্ব এবং স্বাতন্ত্র্য এত তীব্রভাবে উপস্থিত যে আলাদাভাবে দাগ কেটে যায় দর্শকের মনে। নারীর মনস্তত্ত্ব, অবচেতন- অবদমনের বিচিত্র দ্বন্দ্ব এবং সমাজের অলিখিত-অনালোকিত নানা সমস্যায় আলো ফেলেছেন তিনি।
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক এবং চলচ্চিত্র সমালোচক কৌস্তভ বকশীকে দেওয়া একটি দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে ঋতুপর্ণ ঘোষের চলচ্চিত্র ভাবনার নানাদিক উঠে এসেছে। সাক্ষাৎকারটি ছাপা হয়েছিল চলচ্চিত্র ও সমন্বিত শিল্পকলা বিষয়ক কলকাতাকেন্দ্রিক পত্রিকা ‘সিলুয়েট’-এ (Silhouette)। সাক্ষাৎকারটি অনুবাদ করা হলো তিন কিস্তিতে। বাংলায় অনুবাদের জন্য ‘সিলুয়েট’ সম্পাদক অমিতাভ নাগের অনুমতি নেওয়া হয়েছে।
আজ প্রকাশিত হলো সাক্ষাৎকারটির দ্বিতীয় কিস্তি।

প্রথম কিস্তি পড়তে এই বাক্যে ক্লিক করুন


ঋতুপর্ণ ঘোষ
ঋতুপর্ণ ঘোষ
ফিল্মমেকার, অ্যাকটর; ভারত । ৩১ আগস্ট ১৯৬৩–৩০ মে ২০১৩

কিস্তি-

কৌস্তভ বকশী
এখন একটু ভিন্ন প্রসঙ্গে আসি। আপনার চলচ্চিত্রগুলোতে শারীরিক সম্পর্ক একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। ওই দৃশ্যগুলোতে আপনি কখনো রূপকের আশ্রয় নেননি। কোনো রকম ভণিতা ছাড়াই খোলামেলাভাবে যৌনতা দেখিয়েছেন। কিন্তু অন্তরমহল-এ দেখানো খোলামেলা যৌনদৃশ্য নিয়ে যখন মধ্যবিত্ত বাঙালি দর্শক শ্রেণি অভিযোগ জানাল, তখন আপনি কেন ক্ষমা চাইলেন?

ঋতুপর্ণ ঘোষ
দেখুন, যে বিষয় নিয়ে আমি চলচ্চিত্র বানিয়েছি, তার জন্য কিন্তু ক্ষমা চাইনি। ক্ষমা চেয়েছি একটা ভুল বোঝাবুঝির জন্য। অন্তরমহল যে প্রাপ্তবয়স্কদের, তা কিন্তু কোনো পোস্টারই নির্দেশ করেনি। বেশিরভাগ পোস্টারেই চারজন প্রধান অভিনেতার ক্লোজআপ ছিল।

প্রায় একই সময়ে বিবর নামে আরেকটি চলচ্চিত্র মুক্তি পেয়েছিল। মুক্তির আগে সেটার প্রোমো এবং পোস্টার আলাদাভাবে নির্দেশ করছিল যে, এটা প্রাপ্তবয়স্কদের চলচ্চিত্র। কিন্তু আমি আমার চলচ্চিত্রের পোস্টারে কোনোভাবেই যৌনতার ইঙ্গিত আনতে চাইনি। হয়তো এটা একটা ভুল ছিল। মধ্যবিত্ত বাঙালি দর্শক, যারা পরিবার নিয়ে, বিশেষ করে শিশুদের সঙ্গে নিয়ে চলচ্চিত্র দেখতে গিয়েছিলেন, তারা অন্তরমহল দেখতে গিয়ে খুব অস্বস্তিতে পড়েন। চলচ্চিত্রে যা দেখানো হয়েছে, তার জন্য তারা প্রস্তুত ছিলেন না।

ঋতুপর্ণ ঘোষ
অন্তরমহল
ফিল্মমেকার । ঋতুপর্ণ ঘোষ

কৌস্তভ বকশী
যখন আপনি ‘মধ্যবিত্ত বাঙালি দর্শক’ কথাটা বলেন, তখন আসলে কোন শ্রেণিকে নির্দেশ করেন? আমি কিন্তু অন্তরমহল দেখতে গিয়ে একেবারেই বিব্রত হইনি। সত্যি বলতে, বাংলা চলচ্চিত্রে শারীরিক বাসনা-কামনার একটি ভণিতাবিহীন নিখুঁত রূপায়ণ হিসেবে আমি এটাকে দেখেছি।

ঋতুপর্ণ ঘোষ
একটু খুলে বলি। উনিশে এপ্রিল মুক্তির আগে আমি কিছুটা দ্বিধায় ভুগছিলাম, আসলে চলচ্চিত্রের দর্শকেরা বুঝতে পারবেন কি না– সরোজিনী একজন বিধবা এবং তার বিবাহবিচ্ছেদও হয়নি। চলচ্চিত্রে বিধবাদের সাধারণত যে রূপে দেখানো হয়, আমি সেই প্রথাগত রূপটি ভেঙে ফেললাম। সরোজিনী সব সময় সেজেগুজে থাকতে পছন্দ করে, বিশেষ করে মেকআপ এবং গহনাপত্র নিয়ে সচেতন থাকে। এমনকি তাকে আমি মঙ্গলসূত্রও পরালাম। এটা কিন্তু যথেষ্ট ধোঁয়াশা সৃষ্টি করতে পারত। কারণ মঙ্গলসূত্র শুধু একটি অলঙ্কার নয়, পাশাপাশি কিছু সম্প্রদায় এটাকে বৈবাহিক শান্তি এবং সমৃদ্ধির প্রতীক হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

উনিশে এপ্রিল মুক্তি পেলে খেয়াল করলাম, সরোজিনীর বেদনা অনেককেই স্পর্শ করেনি। কারণ বিধবা হিসেবে তার অসহায় রূপটি আমি দেখাইনি। বরং অদিতিই কিন্তু দর্শকের, অর্থাৎ মধ্যবিত্ত বাঙালি শ্রেণির সমবেদনা লাভ করল। সরোজিনী যদি প্রথাগত নিয়মে তার বৈধব্যের রীতিনীতি পালন করত, তাহলে কিন্তু দুজনই সমান সমবেদনা পেত। কাজেই ‘মধ্যবিত্ত বাঙালি দর্শক’ বলতে আমি কোন শ্রেণিকে বুঝিয়েছি, আশা করি আপনি বুঝতে পেরেছেন।

কৌস্তভ বকশী
কিন্তু আপনার চোখের বালি কি এই শ্রেণির দর্শককে অন্তরমহল-এর জন্য প্রস্তুত করতে পারেনি? চোখের বালিতে প্রকাশ্য যৌনমিলনের দৃশ্য ছিল। এছাড়া আরেকটা বিশেষ দৃশ্যে আপনি বিধবা বিনোদিনীর মাসিক হওয়া দেখিয়েছেন।

চোখের বালি
চোখের বালি
ফিল্মমেকার । ঋতুপর্ণ ঘোষ

ঋতুপর্ণ ঘোষ
হ্যাঁ। তবে আমি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের উপন্যাস নিয়ে কাজ করছিলাম বলে তার নিচে ঐ জিনিসগুলো চাপা পড়ে গিয়েছিল। ঔপন্যাসিকের প্রচলিত ‘মূল্যবোধ’ ধারণ করেই চলচ্চিত্রটি নির্মিত হয়েছে; কাজেই দর্শকেরা প্রকাশ্য যৌনতাকে সহ্য করতে পেরেছেন। তবে এ ব্যাপারে অনেক মানুষ আপত্তি তুলেছিল।

কৌস্তভ বকশী
অন্তরমহল
-এ আপনি যেভাবে যৌনতার স্থূল রূপগুলোকে দেখিয়েছেন, সেটার কারণেই কি দর্শকদের এমন প্রতিক্রিয়া? যেমন, প্রধান চরিত্রটি যখন প্রতিবার তার সঙ্গীর সঙ্গে মিলিত হয়, তখন বিছানায় যে ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দ…

ঋতুপর্ণ ঘোষ
যতক্ষণ পর্যন্ত আপনি যৌনতাকে রোমান্টিক ভঙ্গিতে উপস্থাপন করবেন, তা নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার কোনো কারণ দেখি না। সরাসরি দেখানোর থেকে যদি আকারে-ইঙ্গিতে দেখানো যায়, সেটা বরং আরও ভালো। কিন্তু আপনি যখন এর স্থূলতাকে, মানে মিশে থাকা হিংস্রতাকেও প্রকাশ করবেন, তা নিয়ে দুশ্চিন্তার যথেষ্ট অবকাশ রয়েছে।

কৌস্তভ বকশী
নৌকাডুবি
তে কিন্তু আমি মনে করেছিলাম, কমলা ও রমেশের মধ্যে শারীরিক সম্পর্ক গড়ে উঠবে। কিন্তু তা হয়নি। মনে হয় ওভাবে দেখালে চলচ্চিত্রটা আরও জটিল হয়ে যেত…

নৌকাডুবি
নৌকাডুবি
ফিল্মমেকার । ঋতুপর্ণ ঘোষ

ঋতুপর্ণ ঘোষ
পরিকল্পিতভাবেই ওটা বাদ দিয়েছি। কারণ এখানে আমি সহজ চলচ্চিত্র বানাতে চেয়েছি; যেমন ধরুন বালিকা বধূর মতো। প্রধান চারটি চরিত্রই এখানে এক প্রকার কামনাবিহীন জীবন পার করেছে। এটা ইচ্ছা করেই করেছি।

যাহোক, চোখের বালির পর নৌকাডুবি বানানোর কোনো প্রয়োজন ছিল না। চোখের বালি উপন্যাস হিসেবেও নৌকাডুবির চেয়ে যথেষ্ট চিত্তাকর্ষক এবং বৈচিত্র্যপূর্ণ। যৌন সম্পর্কের সম্ভাবনা আবিষ্কারের জন্য চোখের বালিই বেশি উপযুক্ত ছিল।

কৌস্তভ বকশী
আমি মনে করি চোখের বালি নির্মাণে আপনি যে স্বাধীনতা গ্রহণ করেছেন, সেটি প্রশংসনীয়। বিশেষ করে আপনার বিনোদিনী চরিত্রটি ছিল প্রথাবিরোধী। বেশিরভাগ দৃশ্যে তার শরীরী ভাষা প্রাধান্য পেয়েছে। নারীর যে পুরুষতান্ত্রিক গঠন, তার বাইরে আসতে সক্ষম হয়েছে বিনোদিনী।


লাল
শুধু কামনার
রঙ নয়, আমি এটাকে
বিদ্রোহের রঙ হিসেবেও
ব্যবহার করেছি

ঋতুপর্ণ ঘোষ
হুম। বিনোদিনীর বিদ্রোহকে ফুটিয়ে তোলার প্রতীক হিসেবে আমি বারবার লাল রঙ ব্যবহার করেছি। চোখের বালিতে লাল শুধু কামনার রঙ নয়, আমি এটাকে বিদ্রোহের রঙ হিসেবেও ব্যবহার করেছি।

চোখের বালি

কৌস্তভ বকশী
বেশিরভাগ চলচ্চিত্রেই আপনি সচেতনভাবে নারীর কামনাকে এনেছেন, কিন্তু এদের কোনোটিকেই সেই অর্থে ‘নারীবাদী’ নির্মাণ বলা যায় না। ভারত কিংবা ধরুন সারাবিশ্ব এখনো কি পূর্ণরূপে ‘নারীবাদী চলচ্চিত্র’ গ্রহণের জন্য প্রস্তুত?

ঋতুপর্ণ ঘোষ
এত বড় পরিসরে যাওয়াটা আসলেই কঠিন এবং ‘পুরুষতান্ত্রিক কাঠামো’কে অগ্রাহ্য করাও সহজ নয়। এজন্য আমি আমার চলচ্চিত্রগুলোকে ‘নারীকেন্দ্রিক’ [Womanist] বলতে পছন্দ করি, ‘নারীবাদী’ [Feminist] নয়।

কৌস্তভ বকশী
বিপরীত লিঙ্গভিত্তিক যৌনসম্পর্কের যে প্রচলিত মডেল, এর বাইরে গিয়ে যৌনসম্পর্কের ভিন্নধর্মী মাত্রা [Queer relationship] নিয়ে কাজ করাটাও তো কঠিন?


নারী-পুরুষ
সম্পর্কের যে
প্রচলিত মডেল, তাকে
অতিক্রম করা কঠিন হয়ে পড়ে

ঋতুপর্ণ ঘোষ
অবশ্যই। ভিন্নধর্মী যৌনসম্পর্ক নিয়ে কাজ করতে গেলেও নারী-পুরুষ সম্পর্কের যে প্রচলিত মডেল, তাকে অতিক্রম করা কঠিন হয়ে পড়ে।

কৌস্তভ বকশী
আরেকটি প্রেমের গল্প
তে এটা বেশ স্পষ্টভাবে এসেছে, তাই না?

ঋতুপর্ণ ঘোষ
ওই চলচ্চিত্রে আমার ভূমিকাটা কিন্তু পুরুষের ছিল না, ছিল অনেকটা ‘সারোগেট’ মহিলাদের মতো [যে নারী অন্য নারীর জন্য গর্ভধারণ করে এবং জন্মের পর সন্তানটিকে তাকে দান করে]। কাজেই নারী-পুরুষের যে প্রচলিত ত্রিভূজ প্রেমের গল্প, তা থেকে আরেকটি প্রেমের গল্প আলাদা কিছু না।

যদি আরও পুরুষালি কোনো ব্যক্তি অভিরূপের ভূমিকায় অভিনয় করত, তাহলে কিন্তু পুরো জিনিসটাই বদলে যেত। ভারতের প্রেক্ষাপটে একজন মেয়েলি পুরুষকেই নারীর ভূমিকায় অবতীর্ণ করা সহজ ছিল।

আরেকটি প্রেমের গল্প
আরেকটি প্রেমের গল্প
ফিল্মমেকার । কৌশিক গাঙ্গুলি
কাস্ট । ইন্দ্রনীল সেনগুপ্ত; ঋতুপর্ণ ঘোষ

কৌস্তভ বকশী
আরেকটি প্রেমের গল্প
-এর কেন্দ্রীয় চরিত্র অভিরূপ এবং ব্যক্তি ঋতুপর্ণ ঘোষ– দুজন যে আলাদা ব্যক্তি, তা আপনি বারবার দাবি করেছেন। এটা ঠিক, অভিনেতা এবং তিনি যে চরিত্রে অভিনয় করছেন, দুটো পরিচয়কে গুলিয়ে ফেলা উচিত না। তবে এটা কি চিত্রাঙ্গদা: দ্য ক্রাউনিং উইশ-এর জন্যও সত্য?

ঋতুপর্ণ ঘোষ
আমি বলব না– ঋতুপর্ণ ঘোষ আর রূপ সম্পূর্ণ আলাদা। রূপের বয়সে আমি যে ভুলগুলো করেছিলাম, সেগুলো তার মাঝে খুঁজে পাই। যেহেতু ওই সময়টিকে ইতোমধ্যে অতিক্রম করে এসেছি, আমার মনে হলো রূপ’কে পথ দেখানো প্রয়োজন। ওর প্রতি আমার একটা অদ্ভুত স্নেহ জন্মে গেল। যখন ওকে ত্যাগ করতে হলো, তখন আমার প্রচণ্ড খারাপ লেগেছিল।

অন্যদিকে, চিত্রাঙ্গদার প্রধান চরিত্র রুদ্র লিঙ্গ পরিবর্তন করতে চেয়েছিল। চলচ্চিত্রের শেষে কিন্তু সে যেমন– তেমন রূপেই থাকতে চায়; ডাক্তারদেরকে সে তার ব্রেস্ট ইমপ্লান্ট সরিয়ে ফেলতে বলেছিল। তার সুরূপা হওয়ার ইচ্ছা চলে যায়… দুটো অবস্থানের মাঝখানে থাকাতেই সে আনন্দ খুঁজে পায়।

ঋতুপর্ণ ঘোষ
চিত্রাঙ্গদা
ফিল্মমেকার ও কাস্ট । ঋতুপর্ণ ঘোষ

কৌস্তভ বকশী
তার মানে আপনি কি লৈঙ্গিক অন্তর্বর্তী অবস্থানে বিশ্বাস করেন?


লৈঙ্গিক
পরিচয় নির্ধারণ
করে দেয়– এমন কোনো
পোশাক আমি কখনো পরব না…
না শাড়ি, না ধুতি-কোর্তা

ঋতুপর্ণ ঘোষ
জানি, আমার অনেক দর্শক মনে করেন, আমি সামনে কোনোদিন শাড়ি পরা শুরু করব। তাদেরকে বলছি, আমি কোনোদিন শাড়ি পরব না। আরও একজন জিজ্ঞেস করেছিল, আমি কোনোদিন ধুতি-কোর্তা পরা শুরু করব কি না? আমার উত্তর ছিল, পরব না। লৈঙ্গিক পরিচয় নির্ধারণ করে দেয়– এমন কোনো পোশাক আমি কখনো পরব না… না শাড়ি, না ধুতি-কোর্তা। আমি দুটোর মাঝখানেই চলব। লৈঙ্গিক তারল্যকে ফুটিয়ে তোলার এটাই শ্রেষ্ঠ উপায়।

কৌস্তভ বকশী
আবার আরেকটি প্রেমের গল্পতে ফিরে আসি। অনেকে মনে করেন, প্রথাবিরোধী যৌনসম্পর্ক নিয়ে আপনার যে ভাবনা, তার অনেকটা এ চলচ্চিত্রে এসেছে…

ঋতুপর্ণ ঘোষ
আপনারা জেনে থাকবেন, কৌশিক (গাঙ্গুলী) সমলৈঙ্গিক ভালোবাসার ব্যাপারটা খুব ভালো বোঝেন। তাদের অনুভূতিটা তিনি ভালো বোঝেন বলেই কিন্তু এই চলচ্চিত্রটি বানিয়েছেন। আমি শুধু আমার জীবন থেকে পাওয়া অভিজ্ঞতা এখানে দেখানোর চেষ্টা করেছি।

কৌস্তভ বকশী
একটা দৃশ্য ছিল, যেখানে রূপ চপলকে ক্যামেরার সামনে এসে তার যৌন জীবনের কিছু গোপন কথা প্রকাশ করার জন্য জোরাজুরি করে। চপল সেটা করতে অস্বীকার করলে রূপ প্রচণ্ড ক্ষেপে যায়। চলচ্চিত্রকার কিংবা নাট্যকাররা [যেমন, রমণীমোহন বা সুন্দর বিবির পালা] অনেক সময় যৌনতার এই ভিন্নরূপকে নিজেদের প্রয়োজনে ব্যবহার করেন। চপলকে দিয়ে জোরপূর্বক তার গোপন কথা বলানোর এই চেষ্টা কি তাদের বিরুদ্ধে এক ধরনের ব্যঙ্গাত্মক প্রতিবাদ?

ঋতুপর্ণ ঘোষ
আপনার এই ব্যাখ্যার প্রতি আমি দ্বিমত জানাব না। কৌশিক কিন্তু চপল দা’কে খুব রোমান্টিক ভঙ্গিতে উপস্থাপন করেছেন। তবে হ্যাঁ, চপল দা যে তার ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে অন্য সবার সামনে কথা বলতে অস্বস্তিবোধ করছে, এটা নিয়ে কথা বলাও জরুরি।

কৌস্তভ বকশী
এখন পর্যন্ত বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে শুধু তিনটিতে– আরেকটি প্রেমের গল্প, মেমোরিজ ইন মার্চচিত্রাঙ্গদা: দ্য ক্রাউনিং উইশ-এ ভিন্নধর্মী পুরুষ চরিত্র প্রধান ভূমিকায় অভিনয় করেছে। তিনটি চলচ্চিত্রেই দেখা যায়, এমন চরিত্রের বাবা-মা খুব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।

আরেকটি প্রেমের গল্পতে রূপ যখনই একাকীত্ব অনুভব করে কিংবা অবসাদে ভোগে, সে তার মাকে স্মরণ করে। মেমোরিজ ইন মার্চ-এ মা এক সময় তার পুত্রের ভিন্নধর্মী যৌন মনস্তত্ত্ব মেনে নেয়। আবার চিত্রাঙ্গদায় রুদ্রের বাবা-মা তার যাত্রায় খুব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। একজন ব্যক্তির যৌনচেতনা বা দৃষ্টিভঙ্গির পেছনে পরিবারের অনুমোদন ঠিক কতটা গুরুত্বপূর্ণ?

মেমোরিজ ইন মার্চ
মেমোরিজ ইন মার্চ
ফিল্মমেকার । সঞ্জয় নাগ
কাস্ট । ঋতুপর্ণ ঘোষ; দীপ্তি নাভাল

ঋতুপর্ণ ঘোষ
একজন সাধারণ মানুষ যেভাবে জীবনযাপন করে, তার তুলনায় একজন প্রথাবিরুদ্ধ যৌন মনস্তত্ত্বের মানুষের দৈনন্দিন জীবন কিন্তু যথেষ্ট কঠিন। আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হলো, এ ধরনের মানুষের যত বয়স বাড়ে, তারা ততই একা হতে থাকে… তাদেরকে একাকী জীবন পার করতে বাধ্য করা হয়। আমাদের দেশে দুজন পুরুষ তো একটা শিশুকে দত্তক পর্যন্ত নিতে পারে না… কাজেই এ ধরনের মানুষকে বার্ধক্যে দেখার মতো কেউ থাকে না। তাই আমার কাছে মনে হয়, পরিবারের পক্ষে তাকে ধারণ ও গ্রহণ করা একান্ত জরুরি।

কৌস্তভ বকশী
এই প্রসঙ্গে আরেকটা প্রশ্ন জিজ্ঞেস করছি। সমলৈঙ্গিক আকর্ষণ নিয়ে কোনো চলচ্চিত্র কি ‘অতঃপর তারা সুখে শান্তিতে বাস করতে থাকল’– এমন অনুভূতি নিয়ে শেষ হতে পারে? এ ধরনের বেশিরভাগ চলচ্চিত্রই দেখি হতাশা আর বেদনা নিয়ে শেষ হয়।

চিত্রাঙ্গদা
চিত্রাঙ্গদা

ঋতুপর্ণ ঘোষ
আমি মনে করি এটা সম্ভব না। যদি আপনি এমন করেন, তবে আপনাকে বাস্তবের সঙ্গে আপস করতে হবে। অন্তত এই সময়ে তো এটা কোনোভাবেই সম্ভব নয়।

কৌস্তভ বকশী
লিঙ্গ ও যৌনতার যে নানামাত্রিক তত্ত্বের উদ্ভব ঘটছে, তার আলোকে অনেক সাহিত্য এবং চলচ্চিত্রের ভাষাকে নতুনভাবে পাঠ করা হচ্ছে। যেমন ধরুন, গুপী গাইন বাঘা বাইন

ঋতুপর্ণ ঘোষ
হুম… গুপী ও বাঘার মধ্যের বন্ধনকে প্রথাবিরুদ্ধ সম্পর্ক [Queer] হিসেবে পাঠ করা যেতে পারে। তাদের দুজনকেই সমাজ সাধারণভাবে মেনে নেয়নি এবং কাকতালীয়ভাবে তাদের দুজনের একটা বাঁশঝাড়ে দেখা হয়ে যায়। তবে বাঘা যেহেতু রাজকুমারীকে বিয়ে করার স্বপ্ন দেখে, তাদের মধ্যে সমলৈঙ্গিক আকর্ষণ গড়ে ওঠার সম্ভাবনা বাতিল হয়ে যায়।

গুপী গাইন বাঘা বাইন
ফিল্মমেকার । সত্যজিৎ রায়

চলচ্চিত্রের শেষে দেখা যায়, গুপী ও বাঘা– দুজনেই তাদের স্বপ্নের রাজকুমারীকে বিয়ে করতে সক্ষম হয়। সত্যজিৎ রায় সব দৃশ্য সাদা-কালোয় গ্রহণ করলেও ঐ অংশটুকু রঙিন দৃশ্যে ধারণ করেন। সাদা-কালো থেকে রঙিনে যাওয়ার এই অংশটি বেশ পরিকল্পিত এবং তাৎপর্যপূর্ণ বলে আমার কাছে মনে হয়। ঠিক এ কারণেই বিয়েটা একটা প্রথাবদ্ধ সমাপ্তি [বেশিরভাগ আনন্দঘন সমাপ্তির মতো], নাকি তারা নতুন কোনো স্বপ্নদৃশ্যে প্রবেশ করে– তা নিয়ে আমরা দ্বিধায় পড়ে যাই।

অন্য কথায় বলতে গেলে, রাজকন্যাদের সঙ্গে গুপী ও বাঘার বিয়ে কি আসলেই হয়? নাকি পুরো ব্যাপারটা স্বপ্নে ঘটেছে? এদিক থেকে প্রথাবিরুদ্ধ যৌনচেতনার একটি নিদর্শন হিসেবে গুপী গাইন বাঘা বাইন চলচ্চিত্রটিকে পুনঃপাঠ করার সম্ভাবনা দৃঢ় হয়।


সাক্ষাৎকার গ্রহণকারীর নোট:
যদিও ঋতুপর্ণ ঘোষের সঙ্গে ওপরের এই কথোপকথন অনেকটা আনুষ্ঠানিক সাক্ষাৎকারের মতো লাগছে, তবে কথোপকথনটি এখানে যেভাবে উপস্থাপিত হয়েছে, সেভাবে আমাদের আলাপ হয়নি। ঋতুপর্ণ ঘোষকে আমি ‘ঋতুদা, তুমি’ বলতাম আর ঋতুদা আমাকে ‘তুই’ বলতেন। প্রকাশের সময় সম্বোধনেও পরিবর্তন আনতে হলো। বিভিন্ন সময়ে তাঁর সঙ্গে আমার যে কথা হয়েছে, তারই চুম্বক অংশ এখানে একসঙ্গে উপস্থাপন করেছি। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে আমরা প্রায়শ বাংলাতেই আলাপ করেছি, কাজেই বিভিন্ন বিষয়ে ঋতুপর্ণ ঘোষের এই প্রতিক্রিয়া মূলত আমার পুনর্লেখন।


শেষ কিস্তি পড়তে এই বাক্য ক্লিক করুন

Print Friendly, PDF & Email
শেয়ার
সাহিত্য, চিত্রকলা ও চলচ্চিত্র অনুরাগী। শিক্ষার্থী, অর্থনীতি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ।। বাংলাদেশ

মন্তব্য লিখুন