যুদ্ধ উপলব্ধির সিনেমাটিক হস্তান্তর: শিন্ডলার’স লিস্টের ভাষায়

0
220
শিন্ডলার'স লিস্ট

লিখেছেন। আসিফামি রহমান সৈকত

শিন্ডলার’স লিস্ট
Schindler’s List
ফিল্মমেকার । স্টিভেন স্পিলবার্গ
উৎস-উপন্যাস । শিন্ডলার’স আর্ক/ থমাস কেনেলি
স্ক্রিনরাইটার । স্টিভেন জাইলিয়ান
প্রডিউসার । স্টিভেন স্পিলবার্গ; জেরাল্ড আর. মলেন; ব্র্যাঙ্কো লুস্টিগ
সিনেমাটোগ্রাফার । ইয়ানুস কামিন্সকি
মিউজিক । জন উইলিয়ামস
এডিটর । মাইকেল কান
কাস্ট [ক্যারেকটার] । লায়াম নিসন [অস্কার শিন্ডলার]; বেন কিংসলি [স্টার্ন]; রাফ ফিয়েন্স [আমন গথ]
রানিংটাইম । ১৯৫ মিনিট
ভাষা । ইংরেজি
দেশ । যুক্তরাষ্ট্র
রিলিজ । ৩০ নভেম্বর ১৯৯৩


বাঙালি কি একাত্তরকে ঠিকমতো বুঝেছে? এই যুদ্ধ যারা দেখেনি বা সেই সময়ে যারা ছিল না, তারা কি খুব সহজেই এটাকে বুঝতে পারে?

পারে না। সম্ভবও না। মা হবার আনন্দ, কষ্ট শুধু মা-ই বুঝতে পারে; কারণ সেই অবস্থা, সেই সময়ের মধ্যে দিয়ে তাকেই আসলে যেতে হয়। একাত্তরকে যে কারণে অনেকেই বুঝে উঠতে পারে না, বা পারা সহজ নয়; সেজন্য আমাদের সম্বল হচ্ছে বই, সিনেমা, জাদুঘর, সেই সময়ের পত্র-পত্রিকা– তাও আবার অনেক রাজনৈতিক কারণে আসল ঘটনা থেকে অনবরত সরে যাওয়ার সমস্যা তো ঘটতেই থাকে; কোনো কোনো দল তাকে বিকৃত করে, আর কোনো কোনো দল তাকে অতিরঞ্জিত করে সত্য থেকে অনেক দূরে নিয়ে যায় আমাদের।


একটা প্রেম,
একটা মিছিল,
কিছু পলায়নের দৃশ্য,
গোলাগুলি, তারপর আনন্দ মিছিল
টাইপের ফরমুলা ছবি
ব্যাপারটাকে
হালকাই
করে
দেয়

কিন্তু বাংলাদেশের আমরা যারা আছি, বা পুরো পৃথিবীর বাঙালিরা যে যেখানেই থাকেন একাত্তর একটা অংশ তাদের, জরুরি অংশ। এজন্যই এই বিষয়ে সিনেমা বানানো হলে তা সবার বোধগম্য হলেই ভালো হয় এবং একটা প্রেম, একটা মিছিল, কিছু পলায়নের দৃশ্য, গোলাগুলি, তারপর আনন্দ মিছিল টাইপের ফরমুলা ছবি ব্যাপারটাকে হালকাই করে দেয়।

অতি গম্ভীর বা অতি হালকা– দুটাই অতিরিক্ত। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ তো আরও দূরেরই একটা ব্যপার; ইউরোপ যেভাবে আক্রান্ত, এই এলাকা ঠিক সেভাবে নয়। তার ওপর ইহুদিদের ওপর যে হলোকাস্ট, সেটা ছিল জার্মান অক্ষশক্তির চরম শয়তানির বহিঃপ্রকাশ। এটার উপলব্ধি না হলে ঐ সময়ের গল্প বোঝা কঠিন। বিশেষ করে আজকের যুগে, যখন ইহুদি বসতি একটা বড় রাজনৈতিক ইস্যু, এই পৃথিবীতে। এবং বিলিয়ন বিলিয়ন মানুষের ইহুদিদের সম্পর্কে সঠিক-বেঠিক এক ধরনের ধারণা যেখানে আছে, যেটাকে নিয়ে নিয়ত রাজনীতি হয়, সেই রকম একটা বিষয়ে এমন চলচ্চিত্রই আমরা আশা করি, যেটা বোধগম্য হবে অধিকাংশের, মানবিক জায়গাগুলো থেকে দেখার চেষ্টা হবে।

স্পিলবার্গ নিজেও ভাবেন নাই ,মানুষ এটা সম্পর্কে এত জানতে চায়; তিনি নিজেই অবাক হয়ে গেছেন, যখন দেখেন ২০ মিলিয়ন ডলার বাজেটের ছবি ৩০০ মিলিয়নের ওপর ব্যবসা করেছে। মানে সত্যকে জানার প্রতি মানুষের প্রবল আগ্রহ আর সহজ করে সেটা বলার পদ্ধতির প্রতি টান মানুষের কাছে আসলেই সমাদৃত।

স্পিলবার্গের ছবি, জনপ্রিয় ধারার অনেক ছবির যিনি নির্মাতা, তার ছবি যখন শিন্ডলার’স লিস্ট হবে, তখন সেটা নিয়ে তো একটা আলোড়ন হবেই; তার ওপর যদি তিনি সেটাকে গল্প শোনানোর আগ্রহ থেকে নির্মাণ করেন, তাহলে একটু ছাড় তো দিতেই হয়; আর তখন তা তরুণ দর্শককেও আকৃষ্ট করে। তাদের কিন্তু আরও বেশি জানা দরকার বিষয়গুলো; আগ্রহ তৈরি হবার দরকার– এই বিষয়গুলো নিয়ে আরও পড়াশোনার; সেটা কিন্তু তিনি করতে পেরেছিলেন তার এই ছবি দিয়ে। নইলে ১০ গুণের বেশি টাকা ফেরত আসত না কখনোই।

শিন্ডলার’স লিস্ট-এ একটা দৃশ্যে নাৎসি আর্মি [আমন গট, যে ক্রাকো কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পের দায়িত্বে ছিল] বিছানা থেকে উঠেই সকালে বারান্দাতে বসে নির্বিচারে পাখির মতো ইহুদিদের মারার দৃশ্যটা নির্মমভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন স্পিলবার্গ। আমনের ওভার দ্য শোল্ডার শট, যেখান থেকে ওয়াইড এঙ্গেলে পুরো কনসেন্ট্রেশন ক্যম্প দেখা যায়। এত বিস্তারিত যে, প্রায় কারওই মুখ দেখা যায় না। প্রতীকী অর্থে কারও মুখ দেখাটা জরুরি না এই মেসেজ; যে কাউকেই মারা যায়। অনেকটা পাখি মারার মতো– টার্গেট করলাম আর মারলাম।

এই সময় আবার মিড ক্লোজআপে দেখা যায়, আমনের বান্ধবী বিছানা থেকে বিরক্তি প্রকাশ করছে; কারণ, গুলির শব্দে তার ঘুম ভেঙে গেছে! যেন ইহুদি মারাটা কিছুই নয়; আসল সমস্যা গুলির শব্দ– যেটিতে তার ঘুম ভেঙে গেছে।


চা
বানানোর
চেয়ে গুলি করে
ইহুদি মারাটা সহজ

এখানে আরও ঘনীভূত করার জন্য একটা ডায়ালগ আছে: বান্ধবী যখন তার নাৎসি আর্মি বন্ধুকে সকালে চা বানাতে বলে, তখন আমন বিরক্ত হয়ে জবাব দেয়, ‘তুমি নিজে বানিয়ে খাও।’ ব্যপারটা এমন, চা বানানোর চেয়ে গুলি করে ইহুদি মারাটা সহজ।

যুদ্ধ এবং হিটলারের মতাদর্শ– এই রকম চরিত্র তৈরি করেছে অনেক অনেক, সেই সময়। দর্শককে পরিচালক দমবন্ধ পরিস্থিতির অনুভূতি দিতে পেরেছেন সিনেমাটোগ্রাফির কিছু জরুরি কাজ দিয়ে।

শিন্ডলার আসলে কখন ব্যবসার কথা ভাবছেন আর কখন মানবিক দিকগুলো নিয়ে ভাবছেন, সেটা নিয়ে সুন্দর একধরনের দ্বিধাতে দর্শককেও রেখেছেন পরিচালক। যখন নিজের পার্সোনাল সেক্রেটারি নির্বাচনের জন্য মেয়েদের কাজ দেখছিলেন, তখন খুব সুন্দর করে এক ধরনের মন্তাজ তৈরি করেছেন। একেকবার একেক মেয়ের কাজ দেখছিলেন। যাকে নিবেন না বলে মনে হচ্ছে, তার দিকে তাকিয়ে কী যেন ভাবছিলেন শিন্ডলার; আর যে মেয়ে কাজ জানত, বুঝলেন, সে যখন কাজটা করছিল, তখন অন্যদিকে তাকিয়ে দেখা গেল, শিন্ডলার অনেক চিন্তিত হয়ে সিগারেট টানছেন।

শেষে শিন্ডলারের প্রধান সহযোগী, অ্যাকাউন্ট্যান্ট স্টার্ন– যিনি তার ব্যবসার দিকগুলো গুছিয়ে দিচ্ছিলেন, যিনি নিজে একজন ইহুদি– যখন শিন্ডলারকে বললেন, ‘আপনি তাহলে কাকে রাখছেন আপনার পার্সোনাল সেক্রেটারি হিসাবে?’, তখন শিন্ডলার ভাবলেষহীনভাবে তার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘সবাইকে।’

স্টার্ন চিন্তিত মুখে আবার কী যেন বলতে গেলেন। একইভাবে শিন্ডলার আবার বললেন, ‘সবাইকে।’


সিনেমার
নির্বাক যুগের
যে ঐতিহ্য, ছবি দিয়ে
গল্প বলা, সেটা যদি শক্তিশালী
হয়, তখন ডায়ালগ ব্যপারটাকে আরও
মহাশক্তিশালী
করে

পরের শটে দেখা গেল, সব পার্সোনাল সেক্রেটারিকে নিয়ে শিন্ডলার একটা ছবি তুলছেন। ডায়ালগ ছাড়াও আপনি যদি, শুধু এই দৃশ্যগুলো পরপর দেখেন, বুঝতে খুব একটা অসুবিধা হবে না এই অংশটা। এজন্যই বলা হয়, সিনেমার নির্বাক যুগের যে ঐতিহ্য, ছবি দিয়ে গল্প বলা, সেটা যদি শক্তিশালী হয়, তখন ডায়ালগ ব্যপারটাকে আরও মহাশক্তিশালী করে।

এই ছবির প্রচুর দৃশ্য শুধু দেখেই গল্প বলে দেবার মতো। এখানেই পরিচালকের তার সিনেমাটোগ্রাফারের, এডিটরের মাধ্যমে বিস্তারিত গল্প বলার শক্তিশালী দক্ষতা প্রকাশ পায়।

Print Friendly, PDF & Email
শেয়ার
ফিল্মমেকার; চলচ্চিত্রকর্মী; লেখক ।। বাংলাদেশ

মন্তব্য লিখুন