এ শহর না আমায় ধারণ করতে পারবে, না পারবে উপেক্ষা করতে: ঋতুপর্ণ ঘোষ [১]

0
2653

সাক্ষাৎকার । কৌস্তভ বকশী
অনুবাদ । নাফিস সাদিক

অনুবাদকের নোট:
বাংলা চলচ্চিত্রের কিংবদন্তি নির্মাতাদের একজন ঋতুপর্ণ ঘোষ [৩১ আগস্ট ১৯৬৩–৩০ মে ২০১৩]। মাত্র ঊনপঞ্চাশ বছরের জীবনে নির্মিত উনিশটি চলচ্চিত্রের জন্য তিনি পেয়েছিলেন বারোটি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার। তাঁর নির্মিত প্রতিটি চলচ্চিত্রে মৌলিকত্ব এবং স্বাতন্ত্র্য এত তীব্রভাবে উপস্থিত যে আলাদাভাবে দাগ কেটে যায় দর্শকের মনে। নারীর মনস্তত্ত্ব, অবচেতন- অবদমনের বিচিত্র দ্বন্দ্ব এবং সমাজের অলিখিত-অনালোকিত নানা সমস্যায় আলো ফেলেছেন তিনি।
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক এবং চলচ্চিত্র সমালোচক কৌস্তভ বকশীকে দেওয়া একটি দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে ঋতুপর্ণ ঘোষের চলচ্চিত্র ভাবনার নানাদিক উঠে এসেছে। সাক্ষাৎকারটি ছাপা হয়েছিল চলচ্চিত্র ও সমন্বিত শিল্পকলা বিষয়ক কলকাতাকেন্দ্রিক পত্রিকা ‘সিলুয়েট’-এ (Silhouette)। সাক্ষাৎকারটি অনুবাদ করা হলো তিনটি কিস্তিতে। বাংলায় অনুবাদের জন্য ‘সিলুয়েট’ সম্পাদক অমিতাভ নাগের অনুমতি নেওয়া হয়েছে।
আজ প্রকাশিত হলো সাক্ষাৎকারটির প্রথম কিস্তি।

ঋতুপর্ণ ঘোষ
ঋতুপর্ণ ঘোষ
ফিল্মমেকার; ভারত । ৩১ আগস্ট ১৯৬৩–৩০ মে ২০১৩

কিস্তি-১

কৌস্তভ বকশী
আপনি মাঝে মাঝে সত্যজিৎ রায়কে আপনার গুরু বলে অভিহিত করেছেন। আমার স্পষ্ট মনে পড়ে আপনার লেখা একটি আর্টিকেলের শিরোনাম ছিল, ‘তাঁকে অভিভাবক বলব না কেন?’ আপনি কি নিজেকে সত্যজিৎ রায়ের ঘরানার একজন মনে করেন? না কি অজয় কর, অরবিন্দ মুখোপাধ্যায়, তপন সিংহ এবং তরুণ মজুমদারদের দেখানো বাংলা চলচ্চিত্রের জনপ্রিয় ধারার পথেই আপনি হাঁটছেন?

ঋতুপর্ণ ঘোষ
চলচ্চিত্রকার হওয়ার পিছনে সত্যজিৎ রায়ই ছিলেন আমার অনুপ্রেরণা। জানি না আমার চলচ্চিত্রগুলো অজয় কর বা তপন সিংহের নির্মাণের সঙ্গে মেলে কি না। যদি মিল থাকে, এই সাদৃশ্য নিতান্তই অনাকাঙ্ক্ষিত।

তবে হ্যাঁ, আমি অজয় কর বা তরুণ মজুমদারের চলচ্চিত্র অবশ্যই উপভোগ করি। সত্য বলতে আমি তো অজয় করের সাত পাকে বাঁধার রীতিমতো ভক্ত। তাঁর সব সৃষ্টির মধ্যে এটা একেবারে অন্য রকম। হয়তো তার এই চলচ্চিত্রের কিছুটা ছায়া আমার উনিশে এপ্রিলেও পড়েছে।


টেলিভিশনে
দেখার সময়
কোনো কোনো
চলচ্চিত্র সম্পর্কে
আপনার পূর্ব প্রতিক্রিয়া
একেবারেই বদলে যেতে পারে

তবে উনিশে এপ্রিল-এর গল্পটি সত্যজিৎ রায়ের জলসাঘর থেকে অনুপ্রাণিত। দূরদর্শনে এই চলচ্চিত্র দেখার সময় উনিশে এপ্রিল-এর গল্প আমার মাথায় আসে। টেলিভিশনে দেখার সময় কোনো কোনো চলচ্চিত্র সম্পর্কে আপনার পূর্ব প্রতিক্রিয়া একেবারেই বদলে যেতে পারে। কারণ টেলিভিশন আরও কাছ থেকে দেখার এবং চলচ্চিত্রের চরিত্রগুলোকে আরও কাছ থেকে অনুভব করার একটা সুযোগ সৃষ্টি করে।

আরও পরিষ্কারভাবে বললে, টেলিভিশনে জলসাঘর দেখতে গিয়ে এই চলচ্চিত্রকে আমার নতুন আলোয় দেখার সুযোগ হয়। সুদীর্ঘকাল ধরে একজন মানুষের সঙ্গে তার বিরাট বাড়ির যে লালিত সম্পর্ক, তা আমি এই চলচ্চিত্রে খুঁজে পাই। এর পরপরই একজন অবসর নেওয়া নর্তকীকে প্রধান চরিত্রে রেখে তার সঙ্গে তার বাড়ির গভীর সম্পর্কের এই গল্পটি আমার মাথায় আসে। নর্তকীর মেয়ের চরিত্রটি আরও পরে মাথায় আসে; মূলত মায়ের চরিত্র থেকেই তার উদ্ভব।

উনিশে এপ্রিল
উনিশে এপ্রিল

কৌস্তভ বকশী
উনিশে এপ্রিল
চলচ্চিত্রের নামটাও বেশ ব্যতিক্রমী। রবীন্দ্রনাথের ‘নতুন বৌঠান’ কাদম্বরী দেবীও এই ১৯শে এপ্রিলেই আত্মহত্যার চেষ্টা করেছিলেন। যেহেতু আপনার চলচ্চিত্রের কেন্দ্রীয় চরিত্রও আত্মহত্যার চেষ্টা করে, ঐ ঘটনা মাথায় রেখেই কি চলচ্চিত্রের এমন নামকরণ করেছিলেন?

ঋতুপর্ণ ঘোষ
একেবারেই না। সত্যি বলতে আমার ঐ সময়ে জানাই ছিল না যে, কাদম্বরী দেবী ১৯শে এপ্রিল আত্মহত্যার চেষ্টা করেন এবং দু’দিন বাদে মারা যান। ‘১৯’ সংখ্যাটি বেছে নিয়েছিলাম সম্পূর্ণ ভিন্ন এক কারণে। ঐ চলচ্চিত্রে ক্যালেন্ডার কিন্তু খুব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। মনে পড়ে? আমার এমন একটা তারিখের দরকার ছিল, যেখানে দু’টো ডিজিটেরই পরিবর্তনের মাধ্যমে আমি একটা নতুন দিনকে নির্দেশ করতে পারব। অর্থাৎ এখানে ১৯ হয়ে যাবে ২০, যা একটি নতুন সূচনাকে নির্দেশ করবে। এমন একটা অনুভব নিয়েই কিন্তু এই চলচ্চিত্রের সমাপ্তি ঘটেছে।

আর ‘এপ্রিল’ মাসটি বেছে নেওয়ার কারণ, এ সময় প্রায়ই সন্ধ্যায় কালবৈশাখী ঝড় হয়। এই চলচ্চিত্রে ঝড় ও বৃষ্টির ভূমিকা ছিল তাৎপর্যপূর্ণ। কাজেই এমন একটা টাইটেল বেছে নিয়েছি।

কৌস্তভ বকশী
আমি মনে করি কালবৈশাখী একটি ভ্রান্ত ধারণাও সৃষ্টি করেছে যে– পুরনো এবং জরাগ্রস্তকে মুছে ফেলে নতুনের জন্ম দেওয়া এমন…

ঋতুপর্ণ ঘোষ
হ্যাঁ, এটা একটা সম্ভাব্য ব্যাখ্যা হতে পারে। তবে ঝড়ের এমন রূপক মাত্রা ভেবে নিয়ে আমি কাজটা করিনি।

কৌস্তভ বকশী
বলে থাকেন, আপনি বড় হয়েছেন দেশীয় আবহের মধ্যে। অর্থাৎ ভারতীয় চলচ্চিত্রের মাঝেই আপনার বিকাশ এবং ইউরোপ-আমেরিকার চলচ্চিত্রের সঙ্গে সেই অর্থে আপনার পরিচয় নেই।


হলিউডের সঙ্গে আমার
পরিচয় হয়েছে
অনেক
পরে

ঋতুপর্ণ ঘোষ
কথাটা সত্য। হলিউডের সঙ্গে আমার পরিচয় হয়েছে অনেক পরে। তাদের ভাষা বুঝতে আমার সমস্যা হতো। মনে পড়ে, ইংরেজি সিনেমা দেখতে গিয়ে দৃশ্যগুলোকে আমি কল্পনায় বোঝার চেষ্টা করেছি; কারণ অভিনেতারা কী যে বলতেন, ঠিকমতো বুঝতে পারতাম না। কাজেই ঐ সিনেমাগুলো যখন সিনেমা-হলে মুক্তি পেতো, সেগুলো দেখার খুব একটা আগ্রহ হতো না আমার।

আরও দুঃখের বিষয়, সেই সময়ে সাবটাইটেলের কোনো ব্যবস্থা ছিল না। আমি মার্লন ব্রান্ডোর সঙ্গে পরিচিত হয়েছি ডিভিডির মাধ্যমে। আপনি বিশ্বাস করতে পারেন?

যাহোক, বর্তমানে আমি হলিউডের নির্বাচিত কিছু অভিনেতা এবং পরিচালকের চলচ্চিত্র ক্রমানুসারে দেখছি।

কৌস্তভ বকশী
কিন্তু মানুষ যখন উনিশে এপ্রিল-এর সাথে অটাম সোনাটার [১৯৭৮ সালে নির্মিত সুইডিশ পরিচালক ইংমার বারিমনের চলচ্চিত্র] মিল খুঁজে পেল, আপনি সেটাকে কীভাবে নিলেন?

ঋতুপর্ণ ঘোষ
হুম। মানুষ বলা শুরু করল, অটাম সোনাটার ছায়া অবলম্বনে নির্মিত হয়েছে উনিশে এপ্রিল। তাদের আমি বিশ্বাস করাতে পারিনি, সেই সময়ে বিদেশি চলচ্চিত্র সম্পর্কে আমার জ্ঞান ছিল যৎসামান্য এবং নিজেও তার আগে অটাম সোনাটা দেখিনি।

তাছাড়া আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, অটাম সোনাটাউনিশে এপ্রিল-এর মধ্যে কোনো রকম মিল নেই, যদিও আমি নিজে এখনো সিনেমাটা ঠিকমতো দেখে উঠতে পারিনি। মানুষ বারবার উনিশে এপ্রিলকে ঐ সিনেমাটার সঙ্গে তুলনা করায় ওটার ওপর আমার একটা মানসিক দূরত্ব তৈরি হয়েছে।

বাড়িওয়ালি
বাড়িওয়ালি

কৌস্তভ বকশী
আমার ধারণা, যে কোনো সাক্ষাৎকারগ্রহীতাই আপনার কাছে জানতে চায়, আপনি কীভাবে যে কোনো মানুষকে অভিনেতায় পরিণত করেন? অভিনেতাদের সঙ্গে কি কোনো নির্দিষ্ট পন্থায় আচরণ করেন? মানে, জানতে চাচ্ছি, একইসঙ্গে প্রতিভাবান প্রতিষ্ঠিত অভিনেতা, তারকা অথচ ভালো অভিনেতা নন, নবাগত এবং শিশুশিল্পী– সবাইকে নিয়ে আপনি কীভাবে কাজ করেন? একেকজনের জন্য কি একেক নিয়ম অনুসরণ করেন?

ঋতুপর্ণ ঘোষ
অবশ্যই। প্রত্যেকের জন্য আলাদা নিয়ম।

কৌস্তভ বকশী
এ পর্যন্ত কোন অভিনেতার সঙ্গে কাজ করে সবচেয়ে বেশি আনন্দ পেয়েছেন?

ঋতুপর্ণ ঘোষ
সবচেয়ে বেশি আনন্দ পেয়েছি কিরণ খেরের সঙ্গে কাজ করে। উনি যদি বাংলা জানতেন, তাহলে আমি তাঁকে দিয়ে আরও অনেক চলচ্চিত্রে অভিনয় করাতাম। আমার শুধু তাঁকে বলতে হতো, আমি কী চাই। ব্যাস, তিনি একেবারে অনায়াসে করে ফেলতেন। আমি শুধু তাকে বললাম, বনলতার [বাড়িওয়ালি চলচ্চিত্রের কেন্দ্রীয় চরিত্র] বয়স হচ্ছে, কাজেই হাড়ে হাড়ে সে ব্যথা অনুভব করছে। বসা থেকে ওঠার সময় তার কিছুটা কষ্ট হচ্ছে এবং সাধারণভাবে হাঁটা শুরুর আগে সে কিছুটা খোঁড়াবে। কিরণ তো আমাকে পুরোই চমকে দিলেন! তিনি সঙ্গে সঙ্গে হাঁটার ভঙ্গিটা ধরে ফেললেন।

তিনি সাধারণত পাশ্চাত্য পোশাক পরে সেটে আসতেন। কিন্তু যখন সেগুলো বদলে শাড়ি পরে নিতেন, তখন তো তাঁকে আর চেনাই যেত না। একেবারে কিরণ খের থেকে বনলতা হয়ে উঠতেন।

বাড়িওয়ালি
বাড়িওয়ালি
কাস্ট । কিরণ খের

কৌস্তভ বকশী
মনে হয়, আপনার কাছে কোনো জাদুর কাঠি আছে, যা দিয়ে সহজেই অভিনেতাদের কাছ থেকে তাদের সর্বোচ্চটা আদায় করতে পারেন। তরুণ অভিনেতাদের মধ্যে কার সঙ্গে সবচেয়ে সহজে কাজ করতে পেরেছেন?

ঋতুপর্ণ ঘোষ
কঙ্কনার [কঙ্কনা সেন শর্মা] সঙ্গে কাজ করা সবচেয়ে সহজ ছিল। পরিচালিত হওয়ার বিষয়টি তিনি ঠিক পছন্দ করেন না। যখন স্ক্রিপ্ট পড়ে শোনাই, তখন খুব স্থিরভঙ্গিতে দর্শকের মতো শোনেন। এরপর অভিনয়ের সময় ওর নিজস্ব ভঙ্গি বেরিয়ে আসে এবং বেশির ভাগ সময়ই খুব সুনিপুণভাবে করতে পারেন।

এছাড়া রাইমার [রাইমা সেন] সঙ্গেও কয়েকটি চলচ্চিত্রে কাজ করার সুযোগ হয়েছে। তিনি আবার পুরোপুরি পরিচালক দ্বারা পরিচালিত হতে পছন্দ করেন। এটাকেও কিন্তু ছোট করে দেখা যাবে না!


পরিচালকের
কাছে এমন আত্মসমর্পণ
করতে পারাটা একটা দুর্লভ গুণ

শাবানা আজমী আমাকে একবার বলেছিলেন, পরিচালকের কাছে এমন আত্মসমর্পণ করতে পারাটা একটা দুর্লভ গুণ। এছাড়া ঋতুপর্ণা [সেনগুপ্ত] তাঁর তারকাসুলভ মনোভাব নিয়ে কখনো আমার কাছে আসেন না। চলচ্চিত্রের যে কোনো চরিত্রে অভিনয়ের জন্য তাঁকে তৈরি করে নেওয়াটাও সহজ।

তিতলি
তিতলি
কাস্ট । অপর্ণা সেন, কঙ্গনা সেন শর্মা

কৌস্তভ বকশী
আমি বিশেষ করে শুভ মহরৎ-এ রাখী গুলজারের অভিনয় দেখে বিমোহিত হয়েছিলাম!

ঋতুপর্ণ ঘোষ
রাখী গুলজার মেক-আপ নিয়ে কখনো খুঁতখুঁতে নন। তাঁর প্রবল আত্মবিশ্বাস রয়েছে। এটাই তাঁকে ‘রাঙা পিসিমা’র রূপ দেওয়ার কাজটি সহজ করেছে।

শুরুতে আমি তাঁকে ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়কে অনুকরণ করতে বলেছিলাম। কিন্তু রাখী’দি যেহেতু অনেকদিন বাংলা চলচ্চিত্রের সংস্পর্শে ছিলেন না, তার পক্ষে আমি কি বলছি– বোঝা সম্ভব হয়নি। এরপর যখন কয়েকটা দৃশ্য অভিনয় করে দেখালাম, তিনি আমাকে নিখুঁতভাবে অনুসরণ করলেন।

সত্যি বলতে, আমি তাঁর ভেতর আলাদা কিছু জিনিস লক্ষ করেছিলাম। তাঁর কাছ থেকে সর্বোচ্চ অভিনয়টা বের করে আনতে হলে তাঁকে যথেষ্ট সুযোগ দিতে হবে। তিনি রান্না করতে পছন্দ করেন, পরিবেশন করতে পছন্দ করেন এবং খানও খুব পরিচ্ছন্নভাবে– এই জিনিস আমি পরিষ্কারভাবে বুঝতে পেরেছিলাম।

কাজেই এই কাজগুলো করার সুযোগ তাঁকে দিলে তিনি খুব আগ্রহ নিয়ে করেন। আমি এটাকেই কাজে লাগালাম। ভাইঝির জন্য অথবা তার বন্ধুর জন্য রাঙা পিসিমার যে দরদ, তা ফুটে উঠেছে খাবার রান্না এবং পরিবেশনের সঙ্গে তাঁর সরাসরি সম্পৃক্ততার কারণে। গৃহের আভ্যন্তরীণ পরিবেশে তাঁর যে আবদ্ধতা, তাও সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছে।

শুভ মহরৎ
শুভ মহরৎ

কৌস্তভ বকশী
আর শর্মিলা ঠাকুর?

ঋতুপর্ণ ঘোষ
রিংকু’দি [শর্মিলা ঠাকুর] অত্যন্ত পরিপাটি এবং সংবেদনশীল মানুষ। তাঁকে পরিচালনার জন্যও আমি একটা উপায় খুঁজে পেয়েছিলাম। একটি নির্দিষ্ট দৃশ্যে যথার্থ আবহ আনার জন্য আপনাকে তাঁর অভিনীত পূর্বের যে কোনো চলচ্চিত্রের নির্দিষ্ট দৃশ্যের কথা মনে করিয়ে দিতে হবে।

শুভ মহরৎ-এ এমন একটা দৃশ্য ছিল, যেখানে তিনি স্নান শেষে বিছানায় এসে বসেন। তাঁর চুল থেকে জল চুঁইয়ে পড়তে থাকে। এরপর তাঁর স্বামীর সঙ্গে কিছু গুরুত্বপূর্ণ সংলাপ চলে। আমি তাঁকে বললাম, “রিংকু’দি, তুই দেবীর অমুক সিকুয়েন্সটা মনে কর… আমি ঠিক ওরকম চাইছি।” আমি মনে করি, রিংকু’দি, অমিত’দা [অমিতাভ বচ্চন] এবং রিনা’দি [অপর্ণা সেন]– এঁরা সবাই একই শ্রেণির অভিনেতা।”

কৌস্তভ বকশী
শিশুশিল্পীদের নিয়ে কেমনভাবে কাজ করেন? হীরের আংটিখেলা— উভয় চলচ্চিত্রে শিশুরা প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেছে এবং তারা খুব ভালোভাবেই করেছে। তাদেরকে নিয়ে কীভাবে কাজ করলেন?

ঋতুপর্ণ ঘোষ
আমি কখনো শিশুদেরকে ‘শিশু’ হিসেবে বিবেচনা করিনি। অভিনয়ের ক্ষেত্রেও তাদেরকে কখনো অযাচিত উপদেশ বা আদর দিই না, সাধারণত শিশুদের সঙ্গে যেটা করা হয়। আমি তাদের সঙ্গে সব সময় বড়দের মতো আচরণ করেছি। কাজেই তারা নিজেদেরকে ‘গুরুত্বপূর্ণ’ ভাবার সুযোগ পেয়েছে এবং অসাধারণ অভিনয় করেছে।

কৌস্তভ বকশী
ডাবিং শিল্পীদেরকে আপনি কীভাবে নির্দেশনা দেন? চোখের বালিতে সুদীপ্তা চক্রবর্তীর কণ্ঠাভিনয় নিয়ে তো এখনো কথা হয়…

ঋতুপর্ণ ঘোষ
সাধারণত শুরুতে আমি নিজেই কণ্ঠ দিই এবং এরপর ডাবিং শিল্পীরা আমাকে অনুকরণ করেন। টুম্পার [সুদীপ্তা চক্রবর্তী] ক্ষেত্রে যেটা হয়েছিল, তিনি যখন ডাবিং করছিলেন, আমি তখন আশপাশে উপস্থিত ছিলাম না বলা চলে। আমি শুধু তাঁকে বলেছিলাম, আমার মতো করে একটি কিশোরী মেয়ের কণ্ঠে কথা বলতে।

অন্যদিকে মোনালি ঠাকুরকে [নৌকাডুবি চলচ্চিত্রে] বলেছিলাম, সংলাপ বলার সময় কোনোভাবেই তার গায়কী কণ্ঠ না নিয়ে আসতে। এবং তিনিও কাজটা করেছিলেন অসাধারণভাবে।

দ্য লাস্ট লিয়ার-এর সেটে ঋতুপর্ণ ঘোষঅমিতাভ বচ্চন

সাক্ষাৎকার গ্রহণকারীর নোট:
যদিও ঋতুপর্ণ ঘোষের সঙ্গে ওপরের এই কথোপকথন অনেকটা আনুষ্ঠানিক সাক্ষাৎকারের মতো লাগছে, তবে কথোপকথনটি এখানে যেভাবে উপস্থাপিত হয়েছে, সেভাবে আমাদের আলাপ হয়নি। ঋতুপর্ণ ঘোষকে আমি ‘ঋতুদা, তুমি’ বলতাম আর ঋতুদা আমাকে ‘তুই’ বলতেন। প্রকাশের সময় সম্বোধনেও পরিবর্তন আনতে হলো। বিভিন্ন সময়ে তাঁর সঙ্গে আমার যে কথা হয়েছে, তারই চুম্বক অংশ এখানে একসঙ্গে উপস্থাপন করেছি। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে আমরা প্রায়শ বাংলাতেই আলাপ করেছি, কাজেই বিভিন্ন বিষয়ে ঋতুপর্ণ ঘোষের এই প্রতিক্রিয়া মূলত আমার পুনর্লেখন।


দ্বিতীয় কিস্তি পড়তে এই বাক্যে ক্লিক করুন

Print Friendly, PDF & Email
শেয়ার
সাহিত্য, চিত্রকলা ও চলচ্চিত্র অনুরাগী। শিক্ষার্থী, অর্থনীতি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ।। বাংলাদেশ

মন্তব্য লিখুন