‘সুবর্ণরেখা’ ছবির আটটি শটের ক্লোজ রিডিং

2
476
সুবর্ণরেখা

লিখেছেন । সায়ন্তন দত্ত

শিল্প, অর্থাৎ ইংরেজিতে আর্ট– তা নিয়ে যাঁরা ভাবনা-চিন্তা করেন, তাঁদের মাঝে মাঝেই একটি অ-সামান্য প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়। প্রশ্নটা আপাত অর্থে খুব সোজা– প্রাথমিকভাবে, শিল্প কী করে? শিল্প আমাদের কী দেয়? কেন কেউ জ্ঞানচর্চা, রাজনীতিচর্চা, বিজ্ঞানচর্চার মতো হাজারটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছেড়ে শিল্প নিয়ে পাগলামি করেন জীবনের দীর্ঘ একটা সময়জুড়ে?

আমার আজকের এই লেখার উদ্দেশ্য কোনোভাবেই এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়া নয়। আসলে, শতাব্দী প্রাচীন এই প্রশ্নের বোধহয় কোনো উত্তর হয়ও না। টলস্টয় থেকে রবীন্দ্রনাথ থেকে সার্ত্রে– ‘শিল্প কী’– এই প্রশ্নের উত্তর ভেবেছেন। শিল্পের প্রয়োজনীয়তা কী– একদম এই নামেও বই লেখা হয়েছে, তাতে নিজের মতো করে উত্তর দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে। সুতরাং বলা বাহুল্য, একটিমাত্র কোনো প্রবন্ধে কোনোভাবেই এই প্রশ্নের উত্তরের চেষ্টামাত্রও করছি না। ফ্র্যাংকলি– আমি নিজের ছাড়া কারও উত্তর সম্পর্কে আর কিছু জানিও না। বিশ্ববিখ্যাত জার্মান নাট্যকার ব্রেখট বলেছিলেন, মানুষের জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সুখ হলো ভাবনার সুখ। শিল্প আমাকে ভাবনার উপাদান দেয়, আমার জন্য এইটুকুই যথেষ্ট। আমি বরং প্রশ্নটাকে একটু অন্যভাবে সাজিয়ে নিতে চাই, কারণ ‘শিল্প কী করে’ প্রশ্নটির উত্তর আমার কাছে নেই। তাই– ‘কীভাবে’ একটি শিল্পকর্ম এই কাজটা করে– আমরা এ লেখায় তার কিছু কিছু উপাদান খুঁজে দেখার চেষ্টা করতে পারি।

কিছুদিন আগে সঞ্জয় মুখোপাধ্যায়, আমাদের সঞ্জয় স্যারের একটা প্রয়োজনে সুবর্ণরেখা ছবি থেকে সীতার গানের ছোট্ট দুই মিনিটের সামান্য বেশি একটা অংশ এডিট করে বের করে আনতে হয়েছিল। সেই প্রয়োজনেই গানটা একবারের বেশি দুইবার শুনতেই–তৎক্ষণাৎ– যেন ম্যাজিক হলো। সেই থেকে ক্রমাগত কানের কাছে বেজে গেল আরতি মুখোপাধ্যায়ের কন্ঠ– আর চোখ বন্ধ করলেই ঋত্বিকের অ-ন-ব-দ্য দৃশ্য গঠন। বস্তুত ঋত্বিকের কম্পোজিশন নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আলোচনা করা যায়– শুধু এই দু’মিনিটের ছোট্ট দৃশ্যের আটখানা মাত্র শট নিয়ে। তাই, আমার এ লেখা এক অর্থে নিজের মধ্যে জমে থাকা ভাবনার প্রকাশ– ছোট্ট এই দুই মিনিটের দৃশ্য নিয়ে। আর একদিক থেকে বলা যায়, শিল্প কীভাবে কাউকে ভাবনায় বুঁদ করে রাখতে পারে– সেই দিকটিও কিছুটা ভাবনার চেষ্টা করব লেখার বাকি অংশে।

সুবর্ণরেখা ছবিকে অনেকেই ভারতবর্ষের শ্রেষ্ঠতম ফিচার ফিল্ম বলে থাকেন। তা ঠিক কী ভুল, সেই তর্ক এখানে অবান্তর; তবে এ কথা বলাই যায়, এই ছোট্ট দুই মিনিটের দৃশ্য থেকে যা প্রমাণও করা যায়– চলচ্চিত্রের অন্তত প্রাথমিক কয়েকটি ব্যাপারে ১৯৬২ সালে ঋত্বিক ঘটক ভারতীয় চলচ্চিত্রের শ্রেষ্ঠতম কিছু দৃশ্যের নির্মাণ করছেন। যেমন কম্পোজিশন, যেমন এডিটিং, যেমন লেন্সের ব্যবহার; আর তার সঙ্গে কীভাবে ফিল্মের প্রতিটি উপাদান মিলে মিশে শিল্পের তুরীয় মুহূর্তে উন্নীত হতে পারে।


সীতা
এই দুই
পুরুষের সঙ্গে
যতবার যেখানে
যেখানে জরুরি ‘কথা’
বলতে গেছে, ঋত্বিকের ক্যামেরা
চরম মমতার সঙ্গে মাধবী মুখোপাধ্যায়ের
ক্লোজআপ ধরেছে; আর তারপরেই,
সীতার কণ্ঠ গান
হয়ে বেরিয়েছে

সরাসরি টেক্সচুয়াল অ্যানালাইসিসের আগে একটা কথাই বলে নেব। সুবর্ণরেখায় পরম ঔদ্ধত্ব এবং দাপটের সঙ্গে ঋত্বিক যেভাবে রামায়ণকে ‘সে এক সীতার গল্প’ বলে বলতে শুরু করেন– তার রাজনৈতিক গুরুত্বের কথা ঠিক এই মুহূর্তে কতখানি জরুরি, তা না বলে দিলেও হয়। বরং, লক্ষণীয় যেটা– ‘সে এক সীতার গল্প হলেও’ কেউ যদি মন দিয়ে একাধিকবার সুবর্ণরেখা দেখেন, লক্ষ্য করবেন, গল্পের কেন্দ্রে কিন্তু ‘সীতা’র চরিত্রটি সেভাবে নেই। ‘সীতার গল্প’ হলেও সীতার মুখে সরাসরি ঋত্বিক সংলাপ রেখেছেন হাতেগোণা কয়েকটি মাত্র। গল্পের সিংহভাগ আবর্তিত হয়েছে মূলত দুই পুরুষকে নিয়ে– যারা দুজনেই সীতার জীবনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ– ঈশ্বর এবং অভিরাম। সীতা এই দুই পুরুষের সঙ্গে যতবার যেখানে যেখানে জরুরি ‘কথা’ বলতে গেছে, ঋত্বিকের ক্যামেরা চরম মমতার সঙ্গে মাধবী মুখোপাধ্যায়ের ক্লোজআপ ধরেছে; আর তারপরেই, সীতার কণ্ঠ গান হয়ে বেরিয়েছে।

ছবির প্রধান প্রধান অংশ বারবার সীতার গান দিয়ে ভিত গাঁথা যেন; সঙ্গে স্ট্রাকচারাল অ্যানালাইসিস করলে বোঝা যাবে, কাঠামোর ক্ষেত্রেও সঙ্গীত কতটা গুরুত্বপূর্ণ। [এ বিষয়ে কবীর সুমনের অসামান্য লেখাটি পড়ে দেখতে পারেন।] বোঝাই যায়, যে সীতার গল্প বলতে ঋত্বিক ক্যামেরা আর শব্দযন্ত্র নিয়ে মহাকাব্য নির্মাণে নেমেছেন, সেখানে সীতার বলতে চাওয়া কথা সবটাই আসলে লুপ্ত করে, কোডেড করে রাখা আছে শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের সুরের মধ্যে। বন্দীশের ‘কথা’ সেখানে খুব একটা সাহায্য করবে না– ‘আজু কী আনন্দ’, বা ‘মোরা দুঁখু আ’র মতো ‘কথা’ আমাদের বিশেষ কিছু দেয় না; বরং দেয় ওস্তাদ বাহাদুর খানের সঙ্গীত নির্মাণ এবং আরতি মুখোপাধ্যায়ের অসামান্য অসামান্য অসামান্য কণ্ঠ। আমরা এ বিষয়ে বিশেষ কথা বলব না এখন আর; আমরা দেখব, কীভাবে ঋত্বিক সমান দক্ষতায় তাঁর সহ-auteur-দের [এই শব্দটির বাংলা করা নিষ্প্রয়োজন] সঙ্গে পাল্লা দিয়ে দৃশ্যে সেই একই ম্যাজিক নির্মাণ করেছেন।

অবশ্যই ভিডিওটি এখান থেকে দেখে নিন:

দুই মিনিট আঠারো সেকেন্ডের এই অংশটি নিখুঁত আটটি শটে বিভক্ত। এডিটিংয়ে ঋত্বিক একেবারে ক্লাসিকাল এখানে– হলিউড অর্থে নয়, বরং আইজেনস্টাইনের অর্থে। আইজেনস্টাইনের রিদমিক মন্তাজের [মন্তাজ হবে সঙ্গীতের ছন্দের সঙ্গে– হামেশাই মিউজিক ভিডিওতে আমরা যা দেখি] সূত্র মেনে প্রতিটি কাট আসলে সঙ্গীতের দুটি লাইনের পরপর আসে। ঋত্বিককে যারা মাতাল বেহিসাবি শিল্পী বলে রোম্যান্টিসাইজ করেন– তাঁরা সম্ভবত কোনোদিনও এসব দেখবেন না– কী নিঁখুত প্রায় গাণিতিক দক্ষতায় যত্নের সঙ্গে এই আটটি শট বুনে দেওয়া আছে। প্রতিটা কাট একইসঙ্গে সুন্দর এবং ভয়ংকর– এ প্রসঙ্গে আমরা একটু পরেই আসব।

সুবর্ণরেখা
প্রথম প্যান: ১৮ মিমি ওয়াইড অ্যাঙ্গেল শট, দিগন্তরেখা ফ্রেমের দু’পাশে সামান্য বেঁকে থাকে [প্রথম শট]

প্রথম শটটি শুরু হয় ক্যামেরার একটি প্যান দিয়ে। গোটা সুবর্ণরেখা ছবিজুড়ে এবং ওনার সারাজীবনের প্রায় সব কাজজুড়েই ঋত্বিক এ রকম অসামান্য প্যান শট নিয়েছেন– যেখানে ফাঁকা বিস্তৃত ল্যান্ডস্কেপ খুঁড়ে ঋত্বিকের ক্যামেরা যেন ইতিহাসকে দেখতে যায়। এই শটটি ওয়াইড অ্যাঙ্গেলে প্যান– সম্ভবত আঠারো মিমি লেন্সে [সিনেমাটোগ্রাফারেরা আরও ভালো বলতে পারবেন, তবে ঋত্বিক নিজে এক জায়গায় সুবর্ণরেখায় ১৮মিমি লেন্স ব্যবহার করার কথা বলেছেন; বলেছেন তার চেয়ে নিচু লেন্স তখন ভারতবর্ষে পাওয়া যেত না]।


দিগন্তরেখা ফ্রেমের
দুই পাশে
সামান্য বেঁকে গেল

ওয়াইড অ্যাঙ্গেলে এ রকম ফাঁকা বিস্তৃত প্যান শট নেওয়াটা বেশ কঠিন ব্যপার; কারণ এই শটটিই ৩৫ বা তার উপরের লেন্সে নিলে ইমেজে কোনো ডিসটর্শন থাকত না– নিঁখুত একটি ক্যামেরা মুভমেন্ট মনে হতো। ঋত্বিক তা না করে ১৮’তে লেন্স রাখলেন; তার ফলে যা হলো– দিগন্তরেখা ফ্রেমের দুই পাশে সামান্য বেঁকে গেল। মনে রাখতে হবে, অত্যন্ত হিসেব করে এই লেন্স নির্বাচন; এই সিকোয়েন্সেই ঋত্বিক একাধিক মাপের লেন্স ব্যবহার করেছেন।

আমরা এইটুকু জিনিস আন্দাজ করতে পারি, ফাঁকা ল্যান্ডস্কেপ হলেও এই ধরনের ওয়াইড অ্যাঙ্গেল ডিসটর্শনে দর্শকের এক ধরনের বদ্ধতার অনুভব হয়; মনে হয় যেন জোর করে কেউ ল্যান্ডস্কেপের নির্দিষ্ট একটা জায়গায় আমাদের চেপে আটকে রেখেছে, যে মূলবিন্দুর সাপেক্ষে প্যানিংটি হচ্ছে [কম্পাস দিয়ে বৃত্ত আঁকার মতো করে ভাবুন, ৩৫’র উপরের লেন্সে এই অনুভবটি আসত না; কারণ সেখানে ১৮মিমির মতো ক্যামেরা কম্পাসের কাঁটার মূলবিন্দুতে না থেকে পরিধির বিন্দুতে থাকত] যে বদ্ধতা ছবির এই অংশে অত্যন্ত জরুরি।

প্রথম ক্যামেরা মুভমেন্টের শেষ ফ্রেম [প্রথম শট]

প্যানিংটি থামে এসে একটি মেয়ের লংশটে। হিসেব করে দেখুন, কী নিখুঁত মুভমেন্ট– কারণ, গানের ঠিক দুই লাইনের শেষ যেখানে, সেইখানেই ঋত্বিকের ক্যামেরা গানের প্রথম লাইনের সঙ্গে সঙ্গেই এসে থেমেছে। এইবার ক্যামেরা এগোতে শুরু করবে সীতার দিকে [ঠিক এ রকম জায়গা ছিল মেঘে ঢাকা তারার রবীন্দ্রসঙ্গীতের দৃশ্যে]– এবং এই অংশে ঋত্বিক ক্যামেরা দিয়েই যেন রিদমিক মন্তাজ করেছেন। এই দৃশ্যের বাকি অংশে শটের দৈর্ঘ্য হবে দুটি করে গানের লাইনের সমান– প্রথম শটটির দৈর্ঘ্য সেখানে চারটি লাইন। কিন্তু, তাও দুই-দুই করে বিভক্ত– যার ফলে ‘কাট’ না হলেও ভিজ্যুয়ালি দু’রকমের ছন্দ তৈরি হয়, দু’রকমের ক্যামেরা মুভমেন্টের জন্য।

প্রথম শটেই ক্যামেরা এগোতে শুরু করেছে: এডিট ছাড়াই রিদমিক মন্তাজ হচ্ছে [প্রথম শট]

ক্যামেরা এগোতে শুরু করে– ‘মোহন বীনা’ অংশ থেকে। খুব মন দিয়ে এই মুভমেন্ট দেখুন– আবারও ওয়াইড অ্যাঙ্গেল ডিসটর্শনের গায়ে কাঁটা দেওয়া ব্যবহার। ডলিতে বসানো ক্যামেরা এগোচ্ছে– সাধারণ লেন্সের ব্যবহারে তা সীতা এবং দূরের দিগন্তরেখার দিকে একসঙ্গেই এগিয়ে যেত। ভালো করে লক্ষ্য করলে বোঝা যায়, ক্যামেরা যত এগোচ্ছে, সীতার অবস্থানের সাপেক্ষে দূরের দিগন্তরেখাকে যেন পিছিয়ে যেতে দেখছি আমরা– লেন্সের মাস্টারস্ট্রোক ছাড়া এ জিনিস হয় না।

প্রায় মাটি ঘেঁষে ক্যামেরার মুভমেন্ট হচ্ছে– সঙ্গে ওয়াইড অ্যাঙ্গেলে সীতার সঙ্গে স্পেসকে, ল্যান্ডস্কেপকে ক্রমশ আলাদা করে দেওয়া– সীতার যত কাছাকাছি যায় ক্যামেরা, তত যেন বিষয়টি স্পষ্ট হয়। এই অংশটি সংলাপের মাধ্যমে কথা না বলে শৈলী দিয়ে [এক্ষেত্রে ভিজ্যুয়ালস] কথা বলার শ্রেষ্ঠতম উদাহরণ– আমরা ইতিমধ্যেই বুঝতে পারছি, সীতা তার স্পেস থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে; প্রিয়তম পুরুষদের একজনকে ত্যাগ করে অন্তরে [এবং বাহিরেও] ঋত্বিকের অন্যান্য চরিত্রের মতোই হয়ে পড়তে হবে উদ্বাস্তু।

এই গোটা আইডিয়াটি প্রকাশ করা ক্যামেরা মুভমেন্টের মাধ্যমে, লেন্সের মাধ্যমে, ডলি শটের গতির মাধ্যমে। এই অংশের বাহান্ন সেকেন্ড নাগাদ ক্যামেরা এসে থামে সীতার কাছে– অনবদ্য একটি পেইন্টিং তৈরি হয় যেন। সঞ্জয় স্যার এই ইমেজটিকেই মীরাবাঈয়ের সঙ্গে তুলনা করেছেন।

প্রথম শটের শেষ ফ্রেম: স্পেস আর চরিত্র আলাদা হয়ে যায়
দেখো ভোর ভঁয়ি বলার সঙ্গে সঙ্গে মুখ তুলে তাকায় সীতা [দ্বিতীয় শট]

ঠিক ছাপ্পান্ন সেকেন্ডের মাথায় কাট। আবারও অনবদ্য একটি ক্যালকুলেশন– বন্দীশ বলছে ‘দেখো ভোর ভঁয়ী’– ঠিক একই সময় মিড শটে একটু একটু করে সীতা মুখ তোলে– দিগন্তরেখার সাপেক্ষে সীতার মুখের রেখা স্পষ্ট হয়। অনবদ্য কবিতা যেন: ব্যখ্যার অতীত অনুভব এই ছোট্ট ‘ঋত্বিকীয়-টাচ’। লক্ষ্যণীয়– এই ইমেজে কিন্তু দিগন্তরেখা ডিসটর্টেড নয়– ৩৫ বা তার উপরের টেলিফটো লেন্স ব্যবহার করেছেন ঋত্বিক, যে কারণে ইমেজও ডিপ ফোকাস নয়।

কিছুক্ষণ এই পেইন্টিংয়ে স্থিত থেকে সামনে থেকে সীতার ক্লোজ শটে চলে যাই আমরা। ইমেজের মিউজিকাল ছন্দটা দেখুন: লং [প্যানিং]– মিড– ক্লোজ। প্রায় ক্লাসিকাল নিয়মের শট স্কেলিং। অথচ ক্যামেরা প্লেসমেন্ট এবং দৃশ্যনির্মাণে কী মানের নাশকতা ঘটিয়ে চলেছেন। এই শটটিও প্রায় ক্লাসিকাল ক্লোজ শটের মতো করে তোলা– শ্যালো ফোকাসে প্রায় গোল্ডেন রুল মেনে।

এত নিঁখুত, প্রায় নিয়মমাফিক শট দেখে আমাদের একটু ইতস্তত লাগে– ঋত্বিক তো সাধারণত এ রকম শট নেন না। ওনার ক্লোজ শটও এ রকম নিয়মমাফিক হয় না।

পরবর্তী ‘সুস্থির’ ‘কনভেনশনাল’ শট– যা আদতে ধাক্কার জন্য প্রস্তুত করে [তৃতীয় শট]
পরবর্তী শটের তীব্র ধাক্কা: এক্সট্রিম লংশটে ওয়াইড অ্যাঙ্গেল ডিসটর্শন [চতুর্থ শট]

কিন্তু ঋত্বিক আমাদের প্রস্তুত করছেন পরবর্তী ধাক্কার জন্য। পরের শটটা দেখুন– ১ মিনিট ২৮ সেকেন্ডে। আড্রিয়ান মার্টিন এ রকম পাশাপাশি দুটো শটের এডিটিংকেই স্যাম পিকেনপাহ’র এডিটিংয়ের সঙ্গে তুলনা করেছেন– চাবুকের মতো– প্রায় ভিজ্যুয়াল চাবুকের মতো পরের শটটা যেন আমদের ধাক্কা দেয়। ১৮০ ডিগ্রি নিয়মকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে, শট স্কেলিংয়ের এতক্ষণের শাস্ত্রীয় নিয়মকে প্রায় ধাক্কা মেরে এক্সট্রিম লংশটে ওয়াইড অ্যাঙ্গেল ডিসটর্শনে হাহাকারের মতো এই শটটি আসে যেন– সামঞ্জস্য থাকে কেবল গানের সুরে তার সপ্তকের হাহাকারের সঙ্গে।

‘শতগুণ নিধি মম, জীবন ধন’– এই শটটি– এই লেখার সময়েও যেন বুকের ভেতর কী ব্যখ্যার অতীত অনুভূতি নিয়ে আসে– চলচ্চিত্রের ভাষায় শ্রেষ্ঠতম কবিতার একটি এই ইমেজটি। কীভাবে ব্যখ্যা করবেন একে? এলিয়টের ওয়েস্টল্যান্ড ভাবতে পারেন– ফাঁকা এরোড্রামে ডিসটর্টেড দিগন্তরেখা আর একা এক নারী– আর উনত্রিশ সেকেন্ডে আমাদের দেখা প্রথম শটের প্রায় কাউন্টারপয়েন্টের মতো করে নির্মাণ এই শটটি।

‘দুই দীর্ঘশ্বাসের মধ্যিখানে, মৃত্যু, আমি তোমাকে জন্মাতে দেখেছি’ [পঞ্চম শট]

আবার ক্লোজ শট আসে। আবারও প্রায় ক্লাসিকাল, শ্যালো ফোকাসে গোল্ডেন রুল মেনে যেমন ক্লোজ শট হওয়া উচিত। আমাদের মনে পড়তে পারে ভাস্করের লাইন– গদ্যে ব্যাখ্যা ছেড়ে কবিতায় আশ্রয় নেওয়া ছাড়া এই ইমেজ নিয়ে ভাবনার আমাদের আর উপায় নেই:
“দুই দীর্ঘশ্বাসের মধ্যিখানে, মৃত্যু, আমি তোমাকে
জন্মাতে দেখেছি”
— বলা বাহুল্য– দীর্ঘশ্বাস– মৃত্যু– দীর্ঘশ্বাস; এইভাবে শট তিনটিকে ভেবে নিন।

ঋত্বিকের সিগনেচার লো অ্যাঙ্গেল শট [দু’মিনিট চার সেকেন্ডের মাথায়, ষষ্ঠ শট]

পরের শট– দু মিনিট চার সেকেন্ডের মাথায়– এই প্রথমবার সীতার সমান্তরালে ক্যামেরা নেই, ঋত্বিকের অত্যন্ত প্রিয় লো অ্যাঙ্গেলে ক্যামেরা তাকে দেখছে। এই শটটিকে এই অংশের শেষ শটের সঙ্গে একসঙ্গে পড়ব আমরা– তাই পরের শটে চলে যাচ্ছি।

দু’মিনিট কুড়ি সেকেন্ডে সীতার ক্লোজ শট [সপ্তম শট]

দু মিনিট কুড়ি সেকেন্ড নাগাদ দেখুন– একদম সামনে থেকে সীতার ক্লোজআপে চলে গেছেন ঋত্বিক– সাউন্ডট্র্যাকে শুরু হয়ে গেছে ঝিঁঝির uncanny আওয়াজ। [ভোরবেলা ঝিঁঝির ডাক কেন, এসব ঋত্বিকের ছবির সাপেক্ষে অবান্তর প্রশ্ন। বাস্তব জীবনের সাউন্ড নয়, বরং শব্দের টেক্সচার অনুযায়ী, গুরুত্ব অনুযায়ী ঋত্বিক সঙ্গীতে যন্ত্রানুষঙ্গ অ্যারেঞ্জমেন্টের মতো করে সাউন্ড ডিজাইন করেন।]

দু মিনিট কুড়ি সেকেন্ড থেকে এই ইমেজটি লক্ষ্য করুন– আমি তো অবধারিত মিল পাই পথের পাঁচালীর দুর্গার সেই অনবদ্য ক্লোজআপের সঙ্গে। ইন্দির মারা যাওয়ার ঠিক পরে সামান্য নিচ থেকে তোলা দুর্গার ক্লোজআপ– দুর্গার উসকোখুসকো চুল উড়ছে হাওয়ায় [কমেন্টে এই ছবিটি দিয়ে দিচ্ছি]। এখানেও ক্যামেরা সীতার আই-লেভেলের সামান্য নিচে আছে, সঙ্গে উসকোখুসকো চুল ওড়ার অনবদ্য ইমেজ।

একে আমরা সত্যজিৎ-ঋত্বিক বাইনারি বাঙালি গোষ্ঠীর মুখে ঝামা ঘষে দিয়ে পথের পাঁচালীর কোটেশন হিসেবে পড়তে পারি– যেখানে প্রায় ইন্টারটেক্সচুয়াল রিডিং হওয়া সম্ভব। [সুবর্ণরেখার আরেক বিখ্যাত ট্রেনের ইমেজেও পথের পাঁচালীর ট্রেনের প্রায় কোটেশন আছে।]

শেষ শট, যেখানে ঋত্বিক সঙ্গীত কেটে দেবেন [অষ্টম শট]

এরপরেই, দু মিনিট আঠাশ সেকেন্ডে– আমার কাছে এই অংশের সবচেয়ে আশ্চর্য সেকশনটির সূত্রপাত। শেষ শট শুরু হয়, ষষ্ঠ শটের ফ্রেম নিয়ে। আশ্চর্যভাবে ‘মোরা দুখুয়া’– এ রকম একটা অপ্রত্যাশিত জায়গায় এসে আরতি মুখোপাধ্যায়ের এই গানকে ঋত্বিক কেটে দেন– সাউন্ডট্র্যাক ভরে যায় ঝিঁঝির ডাক দিয়ে।

উত্তর ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে রীতিমতো তালিম নেওয়া ঋত্বিক ঘটক যখন ওস্তাদ বাহাদুর খাঁ’র তত্ত্বাবধানে নির্মিত রাগ আশাবরী [সম্ভবত; এই বিষয়ে আমি সম্পূর্ণ নিশ্চিত নই] এভাবে মাঝখান থেকে কেটে দেন, তখন বোঝা যায় তাঁর পরিমিতিবোধের প্রকাশ– এবং তারসঙ্গে সিনেমার ভাষার তুরীয় সাবলাইম মোমেন্ট– ঝিঁঝির ডাকের সঙ্গে দূরের শিয়াল জাতীয় প্রাণীর ডাক– আর লো অ্যাঙ্গেলে ডলি আউট করে ক্যামেরা ফিরে আসতে চায় লং শটে।

এই শটটি নিয়ে আলাদা করে দুটো কথা বলা দরকার। প্রথমত সাউন্ড– আমি এখানে আবারও সত্যজিতের ছবির অনুষঙ্গ খুঁজে পাই [ঋত্বিকের অভিপ্রেত নাও হতে পারে]। সর্বজয়া মারা যাওয়ার সময় যদি ‘অপরাজিত’ ছবির সাউন্ডট্র্যাকটি লক্ষ্য করেন, তাহলে ঠিক এই শব্দই শুনতে পাওয়া যাবে– ঝিঁঝির ডাক, দূরে জঙ্গল থেকে শিয়াল জাতীয় প্রাণীর ডাক। এখানেও প্রায় নন-ডাইজেটিকভাবে সঙ্গীতের মতো করে ঋত্বিকীয়-টাচ’টি প্রথম জরুরি বিষয়।


ভোরের
আলো একটু
একটু করে ফুটে
ওঠার রিয়ালিস্ট ইমেজ
নির্মাণ করতে চাইলে ঋত্বিক
শেষ শটটিতে হুট করে আলো
বাড়িয়ে দিতেন
না

দ্বিতীয়ত, দেখুন কীভাবে এই শটে হুট করে এক্সপোজার বদলে গিয়ে আলো বেড়ে গেছে হঠাৎ অনেকখানি। একে ভোর হয়ে ক্রমশঃ আলো আসার যুক্তিতে পড়া যায়– তবে তাতে আমার সামান্য আপত্তি আছে। প্রথমত, ভোরের আলো একটু একটু করে ফুটে ওঠার রিয়ালিস্ট ইমেজ নির্মাণ করতে চাইলে ঋত্বিক শেষ শটটিতে হুট করে আলো বাড়িয়ে দিতেন না; বরং ছটি শটজুড়েই একটু একটু করে তা হতো। আর দ্বিতীয়ত, এর আগেই ষষ্ঠ শটে আমরা এই একই পজিশনে ক্যামেরা দেখেছি। ফিল্মমেকিংয়ের কারিগরি দিক সম্পর্কে সামান্যও জানাশোনা থাকলে বোঝা যায়, এই ষষ্ঠ আর অষ্টম শটটি একসঙ্গে তোলা; কারণ, একদম একই কম্পোজিশনে কেউ দুইবার আলাদা আলাদা করে ক্যামেরা বসায় না। সেই ষষ্ঠ শটের আলো কিন্তু বাকি শটগুলির সঙ্গে সামঞ্জস্য পূর্ণ আধা অন্ধকার।

আমার ধারণায় ঋত্বিক এখানে বাকি শটগুলোর থেকে এই শটটিকে আলাদা করে তুলে আনতে চাইছেন; বাকি শটের কন্টিনিউটিতে রাখতে চাইছেন না। সেজন্যই এক্সপোজারের র‍্যাডিকাল শিফট– আর সঙ্গীত বন্ধ করে সাউন্ডট্র্যাকের প্রকট শিফটের কথা নাই-বা বললাম।

কিন্তু, এই র‍্যাডিকাল শিফটটা করে প্রাপ্তি কী হচ্ছে? ফ্র্যাঙ্কলি, আমি জানি না– কী কী ভাবে এই শিফট করা হয়েছে, তার কিছু সূত্র উপরে লেখা আছে। শৈলীর দিক থেকে এটা বোঝা যায়– প্রথম ডলি-ইনের উল্টোদিকে এই ডলি-আউট বসানো, যার ফলে এক ধরনের সামঞ্জস্যের নির্মাণ হয়েছে। ঋত্বিকের ছবির অন্যান্য এই ধরনের ডলি আউট প্রসঙ্গে ডিসকার্সিভলি নির্দিষ্ট চরিত্র থেকে মিথিক অনুষঙ্গে চলে যাওয়ার কথা বলা হয়; কিন্তু এখানে তাও হচ্ছে বলে আমি অন্তত কনভিন্সড নই। তাই শেষের এই প্রশ্ন রেখেই আমি এই দীর্ঘ লেখা শেষ করতে চাই, উত্তর কেউ দিতে চাইলে তাতেই এই ভাবনা সম্পূর্ণ হবে।

বোঝা যায়– এই ধরনের দৃশ্যে আমাদের যে অনুভবগুলি স্বাভাবিকভাবেই আসে, তাকে নির্মাণ করার প্রক্রিয়া ঋত্বিকের কাছে কতখানি প্রায় গাণিতিক। শৈলীর ওপর চূড়ান্ত দখল না থাকলে এ জিনিস হয় না; আবার একইসঙ্গে তুরীয় দৃশ্য নির্মাণ অনবদ্য বিমূর্ত ভাবনার জগতে নিয়ে আসতে পারে, যা যে কোনো শিল্পেরই শেষ লক্ষ্য।

এ লেখার শুরুতে প্রশ্ন করেছিলাম, শিল্প কীভাবে এই ভাবনার জগতে নিয়ে আসতে পারে। আমার ধারণা, আমি তারও উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করিনি; বরং আমার ভাবনাকে, ভাবনার ছন্দকেই লেখার আকারে প্রকাশ করে ক্লোজ-টেক্সচুয়াল রিডিংয়ের আনন্দ পেতে চেয়েছি। শিল্প, সবশেষে এই সাবলাইম আনন্দ দিতে পারে– যা তুচ্ছ গদ্যের শব্দে ব্যাখ্যার অতীত।


[সের্গেই আইজেনস্টাইনের মন্তাজ ভাবনা, সঞ্জয় মুখোপাধ্যায়ের লেখা ঋত্বিকতন্ত্র, মৈনাক বিশ্বাসের ঋত্বিক ঘটক সম্পর্কিত প্রবন্ধ Her Mother’s Son: Kinship and History in Ritwik Ghatak, অ্যাড্রিয়ান মার্টিনের ভিডিও লেকচার এবং তার ট্রান্সক্রিপ্টেড প্রবন্ধ Five Minutes and Fifteen Second with Ritwik Ghatak, (Misen en Scene in Film Criticism বই থেকে) ইত্যাদি লেখা এই প্রবন্ধ তৈরিতে সাহায্য করেছে।]

Print Friendly, PDF & Email
শেয়ার
শিক্ষার্থী, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়, পশ্চিমবঙ্গ, ভারত ।। ফিল্ম [ডিরেকশন] : আফটার আসিফা

2 মন্তব্যগুলো

  1. খুবই মনোজ্ঞ বিশ্লেষণ। পড়ে ভালো লাগলো , সমৃদ্ধ হলাম। শুধু একটি তথ্য যোগ করবো , রাগটি আশাবরী নয় – মিশ্র কাফি। কাফি , যদিও সূর্যাস্তের পরের রাগ কিন্তু এখানে কাফি ছাড়া কোনো সুর ভালো লাগতো না। ঋত্বিক , বাহাদুর জানবেন না তো আর কারা জানবেন ? ধন্যবাদ।

মন্তব্য লিখুন