অশনি সংকেত বনাম আকালের সন্ধানে: সত্যজিতের থিসিসের বিপরীতে মৃণালের অ্যান্টিথিসিস

1
740

লিখেছেন । বেলায়াত হোসেন মামুন

১৯৪৩ সালের দুর্ভিক্ষ অখণ্ড বাংলার বুকে এক গভীর ক্ষত হয়ে আছে। যুদ্ধ নয়, খরা নয়, নয় কোনো প্রাকৃতিক দুর্বিপাক, তবুও বাংলার লক্ষ লক্ষ মানুষ কেবল অনাহারে পথে-প্রান্তরে মরে গেল। একে ‘পঞ্চাশের মন্বন্তর’ নামে ডাকা হয়। কারণ, ১৯৪৩ সালটি বাংলা সনের হিসেবে ১৩৫০ বঙ্গাব্দ ছিল।

বলা হয়, এই দুর্ভিক্ষে বাংলার প্রায় ৫০ লক্ষ মানুষ প্রাণ হারিয়েছে। আজ বহু গবেষক প্রমাণ করেছেন এই হত্যাকাণ্ড পরিকল্পিত এবং মনুষ্যসৃষ্ট ছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের হাজারও ডামাডোলে বিশ্ব এই হত্যাকাণ্ডটিকে এক প্রকার ‘ওভারলুক’ করেছে। এর কোনো বিচার হয়নি। হয়নি কারও কোনো সাজা।

ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ঔপনিবেশিক শাসনে সেকালের পরাধীন ভারতবর্ষ এর কোনো প্রতিকার করতে পারেনি। ব্রিটিশ সরকারের নির্দেশে বাংলার খাদ্যশস্য, বিশেষ করে ধান ও চাউল মজুদ করে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করা হয়। জেলায় জেলায় ধান-চাউল বহন, বিক্রির ওপর ইংরেজ সরকারের বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। যাতে করে ধান ও চাউল পরিবহন করা না যায়, সে লক্ষ্যে নদীতে নৌকা এবং পথে গরু বা মহিষের গাড়ি জব্দ বা ধ্বংস করা হয়।

অশনি সংকেত-এর শুটিংয়ে ববিতাকে দৃশ্য বোঝাচ্ছেন সত্যজিৎ

১৯৪২ বা ১৯৪৩-এ বাংলায় খাদ্যশস্যের কোনো অভাব ছিল না। উৎপাদনও স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু ইংরেজ সরকারের পরিকল্পিত মজুদদারি আর লুন্ঠনে বাজারে ধান-চাউলের সংকট তৈরি হয়। এই সংকটে ধান-চাউলের কারবারিরাও বাজারকে অস্থির করে তোলে। তাদের অতি মুনাফার লোভ আর ধান-চাউলের চোরাকারবারির কারণে সাধারণ নাগালের বাইরে চলে যায় চাউল। অবস্থা এমন দাঁড়ায় যে, টাকা দিয়েও বাজার হতে চাউল কেনা সম্ভব হচ্ছিল না। ফলে হাহাকার তৈরি হয় চাউলের। সে হাহাকার গণমৃত্যুর কারণ হয়ে ওঠে। বলা হয়, ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের এই মজুদদারি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিল না। এও ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ইংরেজ সরকারের এক ‘যুদ্ধ কৌশল’। আর এই ‘কৌশলের’ উদ্ভাবক হলেন তৎকালিন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী উইন্সটন চার্চিল। দুঃখজনক হলো, বাংলার নিরীহ মানুষের ওপর এই গণহত্যার জন্য পৃথিবী চার্চিলকে বিচারের মুখোমুখি করতে পারেনি। ৫০ লক্ষ মানুষের মৃত্যুর দায় নিয়েও চার্চিল এক বিশ্বযুদ্ধ বিজয়ী ‘বীর’ হিসেবে আজও নন্দিত।

পরিহাস হলো, বাংলার মানুষ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শত্রু বা মিত্র কোনো পক্ষেই ছিল না। যুদ্ধে সরাসরি কোনো পক্ষ না নিয়েও বাংলার মানুষকে অনেক বড় মূল্য চুকাতে হয়েছে। বিশ্ব এই ভয়ঙ্কর হত্যাকাণ্ডকে ভুলে গেলেও বাংলার মানুষের সামষ্টিক সমাজ চেতনায় এ এক অমোচনীয় ক্ষতচিহ্ন। বাংলার গ্রাম, শহর আর কৃষিভিত্তিক সমাজ ও অর্থনীতিতে এই দুর্ভিক্ষ বহুমুখি ছাপ রেখে যায়। এর প্রভাবে পরবর্তী কয়েকটি দশকে অখণ্ড বাংলার সামাজিক-রাজনৈতিক অবয়ব আমূল বদলে যায়।

বাংলার গ্রামীণ লোকজ পালা-গাথা থেকে শুরু করে গণচেতনার গান, কবিতা, গল্প-উপন্যাস বহু কিছুতে ‘পঞ্চাশের মন্বন্তর’ বা ১৯৪৩-এর দুর্ভিক্ষ প্রবলভাবে উপস্থিত আছে। এই দুর্ভিক্ষ নানাভাবে উপস্থিত আছে চলচ্চিত্রেও। বাংলা ভাষার চলচ্চিত্রের দুই কীর্তিমান স্রষ্টা একাধিক চলচ্চিত্রে ‘পঞ্চাশের মন্বন্তর’কে উপস্থাপন করেছেন।

১৯৪৩ সালের দুর্ভিক্ষের প্রেক্ষাপটে সত্যজিৎ রায় ১৯৭৩ সালে নির্মাণ করেন অশনি সংকেত এবং ১৯৮০ সালে মৃণাল সেন নির্মাণ করেন আকালের সন্ধানে। অবশ্য ১৯৪৩-এর প্রেক্ষাপটে মৃণাল সেন ১৯৬০ সালে বাইশে শ্রাবণ নামে আরেকটি চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন।

মৃণাল সেনের বাইশে শ্রাবণ-এর গল্প মূলত এক গ্রামীণ দম্পতির জীবনের টানাপড়েন উপস্থাপন করে। বাইশে শ্রাবণ-এ গল্পের অন্যতম উপকরণ হিসেবে ১৯৪৩-এর দুর্ভিক্ষ হাজির হয় এবং শেষ পর্যন্ত প্রাত্যহিক জীবনে অভাব ও ক্ষুধা কীভাবে মানুষের চরিত্রের মৌল কাঠামোর রূপান্তর ঘটায়, তা মৃণাল সেনের বিষয়বস্তু ছিল। বাইশে শ্রাবণ-এ দুর্ভিক্ষই প্রধান প্রেক্ষাপট নয় এবং দুর্ভিক্ষকেন্দ্রিক জীবন বাস্তবতাও নয় বাইশে শ্রাবণ-এর গল্প। তবু এ কথা আমরা মনে রাখব যে, মৃণাল সেনের বাইশে শ্রাবণ আক্ষরিক অর্থে প্রথম ‘মৃণালীয়’ মেজাজ ও চিন্তার চলচ্চিত্র।

বাইশে শ্রাবণ-এর আগে মৃণাল সেন আরও দুটি চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন। সে দুটি চলচ্চিত্রে [রাত ভোর (১৯৫৫), নীল আকাশের নিচে (১৯৫৯)] মৃণাল সেনের চলচ্চিত্রিক সত্তার বৈশিষ্ট্য সেভাবে উপস্থিত হয় না। অতএব, বাইশে শ্রাবণ মৃণাল সেনের জন্য যেমন গুরুত্বপূর্ণ নির্মাণ, তেমনি তা আমাদেরও মনে রাখবার বিষয়।

তবে তা আজকের আলোচনার প্রধান উপাদান নয়। আজকের আলোচনার প্রধান উপাদান সত্যজিৎ রায়ের অশনি সংকেত-এ [১৯৭৩] সত্যজিৎ ‘পঞ্চাশের মন্বন্তর’কে কীভাবে দেখলেন আর মৃণাল সেন তাঁর আকালের সন্ধানেতে [১৯৮০] আকালকে কীভাবে দেখলেন ও দেখালেন।

আকালের সন্ধানের শুটিংয়ে স্মিতাকে দৃশ্য বোঝাচ্ছেন মৃণাল

১.

এ আলোচনা শুরুর আগে একটি বিষয়ের মীমাংসা করে নেওয়া যাক। বিষয়টি নিয়ে অহেতুক এবং অকারণ প্রচুর বাহাস-বিবাদ ঘটতে দেখা যায়। অথচ এই বিবাদ হওয়ার কথা নয়। বিবাদটি হলো, সাহিত্য থেকে চলচ্চিত্র নির্মাণে নির্মিত চলচ্চিত্রে সাহিত্যের গুণ বা দোষ বিচার। এটি প্রথমেই মীমাংসা হোক যে, সাহিত্য যখন তা বই বা গ্রন্থে থাকে, কিন্তু সাহিত্য থেকে যখন কোনো চলচ্চিত্র নির্মিত হয় তখন তা ‘চলচ্চিত্র’ কতটুকু হলো– সেটাই বিবেচ্য বিষয়। নির্মিত চলচ্চিত্রে সাহিত্যের বইয়ের পৃষ্ঠা খোঁজার কোনো অর্থ হয় না।


সবকিছু
গ্রহণ করার
পর চলচ্চিত্র এক
অনুভূতিময় ‘সময়’ হয়ে ওঠে

চলচ্চিত্র এমনই মাধ্যম যে, তা অনায়াসে সবকিছু আত্মসাৎ করে নিতে পারে। সকল শিল্পের সকল উপাদান চলচ্চিত্র গ্রহণ করে। সবকিছু গ্রহণ করার পর তা আর কোনো লিখিত গল্প থাকে না, থাকে না অভিনয়, থাকে না কেবল গান বা গানের সুর, থাকে না স্থাপত্য অথবা উন্মুক্ত রাজপথের অবারিত স্পেস অথবা মুক্ত আকাশের শূন্যতা। সবকিছু গ্রহণ করার পর চলচ্চিত্র এক অনুভূতিময় ‘সময়’ হয়ে ওঠে। এই ‘সময়’ তখন নিজেই বিভিন্ন মেটাফরিক অর্থে ভিন্ন ভাষায় রূপান্তরিত হয়ে যায়। তাকে তখন বিচ্ছিন্ন করে সাহিত্য-কাব্য-স্থাপত্য-নাট্য বা সঙ্গীতের পৃথক পৃথক ফর্মে খুঁজতে চাওয়াটা অনর্থক এবং তা চলচ্চিত্রবিদ্যার দৃষ্টিতে চলচ্চিত্রভাষার রসাস্বাদনে কারও অক্ষমতা হিসেবেই বিবেচনা করা হয়।

এই গড়ে ওঠা জমাটবদ্ধ অথবা সচল ‘সময়’ যদি মানুষকে সময়াতীত কোনো অনভূতি সঞ্চারে সক্ষম হয়, তবেই তা চলচ্চিত্র হয়ে ওঠে। আর একবার যা ‘চলচ্চিত্র’ হয়ে ওঠে, সেখানে কেউ সাহিত্য খোঁজে না। কারণ, সাহিত্য তখন ‘চলচ্চিত্রের ভাষায়’ লীন হয়ে যায়। আদতে চলচ্চিত্রে সবকিছুই লীন হয়ে যায়। এই ‘লীন’ হতে পারাই কিছু ‘হয়ে’ ওঠা। আর যিনি মানুষের শিল্পকলার সব উপাদান গ্রহণ করেও সবকিছু ‘লীন’ করে একখণ্ড সচল ‘সময়’ তৈরি করতে পারেন, তিনিই গুণী চলচ্চিত্রকার। চলচ্চিত্রকারের সবচেয়ে শক্তিশালী গুণ, সে ‘সময়’ নির্মাণ করতে পারে। চাইলে সময়কে ভাঙ্গতেও পারে। সময়কে নিয়েই চলচ্চিত্রকারের কাজ। আর সময়ের অনন্ত প্রবাহে সময়ের চেয়ে শক্তিশালী কিছুই থাকে না।

অতএব, আমরা চলচ্চিত্র দেখতে বসে চলচ্চিত্রে সাহিত্যের দোষ বা গুণ বিচার করতে চাই না। এমনকি আমরা চলচ্চিত্র দেখতে বসে কাহিনিকার সাহিত্যিককেও খুঁজতে চাই না।

কেননা, যখন কোনো একজন চলচ্চিত্রকার কোনো গল্প-উপন্যাস-সংবাদপত্রের খবর অথবা কোনো সত্য ঘটনা অবলম্বন করে কোনো চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন, তখন আদতে তিনি তাঁর ওই নির্মিতব্য চলচ্চিত্রের কাহিনিতে বা ঘটনায় নিজের ‘বক্তব্য’ খুঁজে পান। আর ওই বিশেষ সাহিত্যকর্মে নিজেকে অথবা নিজের বক্তব্যকে খুঁজে পাওয়ার মধ্য দিয়ে তিনি সাহিত্যকে ‘নিজের’ করে নেন। আর তাই তার নির্মিত চলচ্চিত্রে যদি কোনো সাহিত্যিক অথবা সাংবাদিক ‘সাহিত্য’ খোঁজার চেষ্টা করেন, তবে তিনি ভুল করবেন। কারণ, কোনো সাহিত্যকর্মই সত্যিকার অর্থে অনুবাদযোগ্য নয়; রূপান্তর তো অসম্ভব।

আমরা যখন কোনো অনুবাদিত সাহিত্য পড়ি, তখন আমরা ‘অনুবাদ’ই পড়ি। মৌলিক লেখা পড়ি না। যেমন কবিতার অনুবাদ হয় না, তেমন করেই অনুবাদ হয় না কোনো ভাবের। স্থানান্তর মানে হলো এক স্থান লোপ করে অপর স্থানে নেওয়া। তেমনি রূপান্তর মানেই হলো কোনো এক রূপের বা বৈশিষ্ট্যের বিলোপ করে ‘অন্য’ রূপ দেওয়া। ভাবুন একবার, লালন সাঁইজির কালামের [প্রচলিত মতে গানের] আসলে অনুবাদ সম্ভব? আর যদি হয়ও সে ‘কালাম’ কি আর লালনীয় রইবে?

ফরিদা পারভীন যেভাবে ‘মিলন হবে কত দিনে’ ‘গান’ করেন, তেমন করে তো কালামের ভজন করেন না লালন সাধক ফকির নহির শাহ। ফকির নহির শাহের কাছে যা কালামের ভজন, তা ফরিদা পারভীনের কাছে ‘লালনের গান’। অথচ দুটোই তো বাংলা ভাষাই। নয় কি? যদি বাংলাতেই তা এক না হয়, তবে বাংলা হতে ইংরেজি বা আরবি করে কি লালনের ভাব ও ভজন সত্যিকার অর্থে কাউকে অনুভব করানো যাবে? যায় না। এ হবার নয়। ভাবের জাহিরী অংশটুকুর আক্ষরিক অনুবাদ হতে পারে, কিন্তু ভাব ও ভজনের বাতেনি আকুতি যা সুর-স্বর আর ভক্তিতে প্রকাশিত হয়– তার অনুবাদ কখনও হয় না।

তাহলে বিভূতিভুষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের আম আঁটির ভেপু কি করে সত্যজিতের পথের পাঁচালী হবে? অথবা এইভাবে বলা যায়, যা সত্যজিতের পথের পাঁচালী, তা বিভূতিভুষণের আম আঁটির ভেপু নয়। শেষ পর্যন্ত দুটো আলাদাই। কেউ যদি সেলিম আল দীনের মঞ্চনাটক চাকা খুঁজতে মোরশেদুল ইসলামের চলচ্চিত্র চাকা দেখতে বসেন, তবে তা ভুলই হবে। কারণ মঞ্চনাটক আর চলচ্চিত্র চাকা এক নয়। দুটো সম্পূর্ণ আলাদা মাধ্যম।


চলচ্চিত্রে
গল্পের একটি কঙ্কাল
হয়তো খুঁজে পাওয়া যাবে;
কিন্তু তাতে সেই চলচ্চিত্রটি পূর্বের
উপন্যাস বা নাটক
থাকে না

চলচ্চিত্রে গল্পের একটি কঙ্কাল হয়তো খুঁজে পাওয়া যাবে; কিন্তু তাতে সেই চলচ্চিত্রটি পূর্বের উপন্যাস বা নাটক থাকে না। এটুকু বুঝলে ভালো হয়। কারণ আমরা চলচ্চিত্রের আলোচনা করতে বসে প্রায়ই সংকটে পড়ি এই তর্কে যে, নির্মিত চলচ্চিত্রটি কতটুকু ‘উপন্যাস’ হলো? আসলে প্রশ্নটি হওয়া উচিত, চলচ্চিত্রটি কতটা ‘চলচ্চিত্র’ হলো?

তাই আমরা আমাদের আজকের আলোচনায় খুঁজতে যাব না বিভূতিভুষণ বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর অশনি সংকেত উপন্যাসে কী বলেছেন আর সত্যজিৎ রায় কী বানালেন। আমরা খুঁজব না অমলেন্দু চক্রবর্তীর কাহিনি কী ছিল আর মৃণাল সেন তাঁর চলচ্চিত্র আকালের সন্ধানেতে কী বলছেন?

আমরা আজ চলচ্চিত্র অশনি সংকেতকে সত্যজিতের নির্মিতি এবং সত্যজিতের বক্তব্য হিসেবেই দেখব, তেমনি দেখব আকালের সন্ধানেতে মৃণাল কী বলেন ও দেখান। এভাবেই আমরা বাংলা ভাষার এই দুই চলচ্চিত্রকারের চলচ্চিত্রে ‘পঞ্চাশের মন্বন্তরের’ মানুষ, সমাজ ও বাস্তবতার চরিত্র খুঁজব এবং বিচার করব।

এটুকু নিশ্চয়ই সকলে বোঝেন যে, সত্যজিৎ ও মৃণালের মতো সৃষ্টিশীল নির্মাতাগণ ভাড়াখাটা ‘চলচ্চিত্র পরিচালক’ নন। তাঁরা যখন কিছু নির্মাণ করেন, তখন তা তাঁদের ‘বক্তব্য’ হিসেবেই নির্মাণ করেন। সৃষ্টিশীল স্বাধীনতার ক্ষেত্রে তাঁরা আপস করেন না বলেই তাঁদের স্রষ্টাবৃত্তির এত কদর। আমরা তাদের এই স্বাধীন সত্তার গুণটিকেই আমাদের আলোচনার কেন্দ্রে রাখতে চাই। আর তাই তাদের নির্মিতির সাফল্য ও সীমাবদ্ধতাকে তাদের গুণের প্রকাশ হিসেবেই উল্লেখ করতে চাই।

অশনি সংকেত
ফিল্মমেকার । সত্যজিৎ রায়

২.

১৯৪৩-এর দুর্ভিক্ষের সময় সত্যজিৎ রায়ের বয়স ২২ বছর। তিনি তখন কলকাতায়। চাকরি করেন একটি বিজ্ঞাপনী সংস্থায়। ১৯৪৩-এর দুর্ভিক্ষের করুণ চেহারা শুধু পল্লীবাংলা দেখেছে, তা নয়। একমুঠো ভাতের আশায় লক্ষ লক্ষ মানুষ শত শত মাইল পায়ে হেঁটে মহানগর কলকাতায় উপস্থিত হয়েছিল। সেই লক্ষ লক্ষ মানুষের ক্ষুধার্ত মুখের আর্তনাদ আর হাহাকারের সাক্ষী মহানগর কলকাতা। সত্যজিৎ রায়ও এই সমকালের অন্যতম সাক্ষী।

এই দুর্ভিক্ষের পীড়া ও মড়কের ইতিহাস দ্রুত ভুলে যায় মানুষ। কেননা, এরপর উপমহাদেশ আরও বড় বড় বিপর্যয়ের মুখে পড়ে। দুর্ভিক্ষের মাত্র ৪ বছরের মাথায় ভারত ভাগ হয়ে যায়। বাংলাও ভাগ হয়ে যায়। শুধু ভাগই নয়; এই ৪ বছরে বাংলা ভয়াবহ সব সাম্প্রদায়িক হানাহানিতে রক্তাক্ত হয়। শরনার্থী হয় বিপুলসংখ্যক মানুষ। ইতিহাসে এত কম সময়ের মধ্যে এতগুলো ধাক্কা সামলে দুর্ভিক্ষের কথা স্মরণে রাখা কঠিন। আর তাই তা গল্প-কবিতা-গানে-উপন্যাসে এলেও চলচ্চিত্রে মোটা দাগে উঠে আসে না। চলচ্চিত্রে আসতে সময় নেয় পুরো ৩০ বছর।

১৯৭৩ সালে সত্যজিৎ রায়ের বয়স যখন ৫২ বছর, তখন তিনি নির্মাণ করেন অশনি সংকেত। আগেই বলেছি, অশনি সংকেত বিভূতিভুষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত সত্যজিতের চলচ্চিত্র। অশনি সংকেত-এর আগে সত্যজিৎ নির্মাণ করেছেন ১৯টি কাহিনিচিত্র, ৩টি প্রামাণ্যচলচ্চিত্র এবং ১টি স্বল্পদৈর্ঘ্য নির্বাক চলচ্চিত্র। অর্থাৎ সত্যজিৎ রায় তখন সম্পূর্ণরূপে পরিণত এবং বিশ্বব্যাপি প্রতিষ্ঠিত একজন চলচ্চিত্রকার।

অশনি সংকেত-এর গল্পের প্রেক্ষাপট গ্রামের। এ গ্রামের নাম ‘নতুন গাঁ’। এ এমন এক গ্রাম, যেখানে নিম্নবর্গের হিন্দুদের বাস। দুই-এক ঘর মুসলমানও এ গ্রামে দেখা যায়। তবে এ গ্রামে নেই কোনো ব্রাহ্মণ। এ গ্রামে নেই কোনো পাঠশালা, নেই কোনো বৈদ্য বা কবিরাজ বা চিকিৎসক। এ গ্রামে কেউ পড়ালেখা জানে না। এ গ্রাম, যাকে বলে ‘গণ্ডগ্রাম’, ঠিক তা-ই। এ গ্রামের মানুষ শুধু এই গ্রামটাইকে জানে। আর কিছু জানে না। সত্যজিৎ তাঁর ‘অশনি সংকেত’ চলচ্চিত্রে ১৯৪৩-এর প্রেক্ষাপটে এমনই এক গ্রাম দেখিয়েছেন।

এমন এক গ্রাম অখণ্ড বাংলার কোন প্রান্তে অবস্থিত, তা আমরা জানি না। তবে বেশ কিছু গ্রামে যাপনের লড়াই করে ব্রাহ্মণ গঙ্গাচরণ চট্টোপাধ্যায় ও তার স্ত্রী অনঙ্গ এ গ্রামে জীবন শুরু করে। মূলত অশনি সংকেত-এর গল্প এখান থেকেই যাত্রা করে।

নতুন গাঁয়ে যেহেতু একমাত্র ব্রাহ্মণ গঙ্গাচরণ এবং সে-ই গ্রামের একমাত্র শিক্ষিত মানুষ, তাই গঙ্গাচরণ একাধারে পুরোহিত, চিকিৎসক এবং শিক্ষক হিসেবে আবির্ভূত হন। এ আবির্ভাব যে অহেতুক, তা নয়। এতে তার রোজগার একটু বাড়বে, সে কারণেই এত ভূমিকায় অবতীর্ন হওয়া। অন্যদিকে, গঙ্গাচরণের বউ অনঙ্গ গ্রামের অন্যান্য মেয়েদের সঙ্গে দূরত্ব বজায় রেখেই সহজে মিশে যান। এই ‘দূরত্ব’টুকু বামনিদিদি হওয়ার কারণে, অর্থাৎ উঁচুজাত, মানে ব্রাহ্মণ হওয়ার সুবাদে সামাজিকভাবে সিদ্ধ হয়।

অশনি সংকেত-এর গল্পটি সাদামাটা এবং একরৈখিক। গল্পের সময়টা ১৯৪২ শুরু হয়ে ১৯৪৩-এর আগস্ট/সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বিস্তৃত। নতুন গাঁয়ে এসে উঠেছেন গঙ্গাচরণ। গ্রামের কৃষক ও গ্রামের মাতব্বর বলে পরিচিত ‘বিশ্বাস মশাইয়ের’ সঙ্গে আলোচনা করে পাঠশালা খুলেছেন। সময়ে-অসময়ে গ্রামের মানুষের চিকিৎসা করেন এবং পুরোহিত হিসেবেও কাজ করেন। ব্রাহ্মণ হিসেবে গ্রামে সকলের সম্মান ও শ্রদ্ধার পাত্র তিনি। সকলেই তাকে সম্মান করে এবং তিনিও সকলের কাছ থেকে তার ‘প্রাপ্য’ বুঝে নেন। তা কারও কাছ থেকে হোক মাছ, সরিষা, খেঁজুর গাছের রস অথবা ক্ষেতের আলু। নিজের উঠোনের পাশে সবজি চাষ করেন এবং বেশ গুছিয়ে নিচ্ছিলেন নিজের মতো করে। এভাবে এক প্রকার সুখেই দিন চলছিল গঙ্গাচরণের। মাঝে একদিন দূর এক গ্রামের ওলা ওঠা বা কলেরার প্রাদুর্ভাব হয়। সে গ্রামে গঙ্গাচরণের ডাক পড়ে পূজা-অর্চনা করে মন্ত্র দিয়ে ‘গ্রাম বন্ধন’ করার জন্য। সুযোগটি গঙ্গাচরণ বেশ কাজে লাগান। বউয়ের নতুন শাড়ি আর বেশ করে চাউল-ডাল, কলা-মুলো রোজগার হয়। কিন্তু বিপত্তি বাঁধে সে গ্রাম থেকে ফেরার পথে।


টাকা থাকলেও জিনিস পাওয়া
যায় না, এমন তো
কখনো শুনিনি

পথে দেখা হয় অন্য কোনো গ্রামের বাসিন্দা বৃদ্ধ ব্রাহ্মণ দীনবন্ধু ভট্টাচার্যের সঙ্গে। দীনবন্ধুর কাছে গঙ্গাচরণ জানতে পারেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কারণে জাপান বার্মা দখল করেছে এবং বার্মা থেকে মোটা চাউল আমদানি বন্ধ। অন্যদিকে ইংরেজ সরকার যুদ্ধে তাদের সৈনিকদের খাওয়ানোর জন্য চাউল মজুদ করছে। তাই বাজারে-গ্রামে চাউলের আকাল শুরু হয়েছে। কথাগুলো গঙ্গাচরণ শোনেন; কিন্তু অতখানি বিশ্বাস করেন না। পরে যখন একদিন কেরোসিন কিনতে গিয়ে দেখেন, কেরোসিন পাওয়া যাচ্ছে না; তখন প্রথমবারের মতো গঙ্গাচরণ ধাক্কা খান এবং অনেকটা স্বগোক্তির মতো করে বলেন, টাকা থাকলেও জিনিস পাওয়া যায় না, এমন তো কখনো শুনিনি!

এরপর ঘটনাসমূহ দ্রুত ঘটতে থাকে। বাজারে চাউল পাওয়া যায় না। গ্রামের চাউলের বড় ব্যাপারী বিশ্বাসও ধানের মজুদ গোপন করেন। চাউলের জন্য হাহাকার ওঠে, মানুষ অভুক্ত থাকতে শুরু করে। চাউলের খোঁজে দূর গ্রামে গিয়েও চাউল কিনতে পাওয়া যায় না। কারণ কেউ চাউল বিক্রি করতে চায় না। এর মধ্যে এক দুপুরে বৃদ্ধ ব্রাহ্মণ দীনবন্ধু ভট্টাচার্য গঙ্গাচরণের বাড়িতে এসে আহার করে যান। এতে আসন্ন দুর্ভিক্ষের পূর্বাভাস আরও প্রকট হয়ে ওঠে।

গল্পে গঙ্গাচরণের বউ অনঙ্গের অংশগ্রহণ ও বিস্তারও বেশ বড় স্থানজুড়ে আছে। নতুন গাঁয়ের মেয়েদের সঙ্গে অনঙ্গের ভাব অন্তরঙ্গ পর্যায়ের হয়। বিশেষ করে বন্ধুত্ব হয় গ্রামের এক কৃষক পরিবারের বধু ছুটকীর সঙ্গে। ছুটকী চটপটে, সাহসী প্রাণবন্ত তরুণী গৃহবধু। ছুটকীর সঙ্গে অনঙ্গ বউ নদীতে স্নানে যান; যখন অভাবের বিস্তার হয়, তখন মাটিআলু খুঁজতে বের হন; আবার কখনো অন্যের বাড়িতে ঢেঁকিতে পাড় দিয়ে কিছু চাউল রোজগার করে আনেন। অনঙ্গ বউয়ের জন্য ছুটকী হলো বন্ধু বা সখি। গল্পে এই ছুটকীর প্রতি আকৃষ্ট হয় ইটখোলায় আগত এক যুবক। যে যুবকের অর্থেক মুখ পুড়ে বিকৃত হয়ে গেছে।

চলচ্চিত্রের গল্পে অনঙ্গ বউ, ছুটকী ও গাঁয়ের আরেক গৃহবধুর সঙ্গে মাটিআলু খুঁজতে যখন একটু দূর জংলা ধরনের স্থানে যান। সেখানে অনঙ্গ বউ এক দূর্বৃত্ত পুরুষের আক্রমণের শিকার হন। আক্রান্ত অনঙ্গ বউকে ছুটকী এবং গাঁয়ের ওই গৃহবধু শুধু উদ্ধার করে– তা নয়, তারা হাতের শাবল দিয়ে আক্রমণকারী ওই পুরুষকে হত্যাও করে। এই সাহসী গৃহবধু ছুটকী পরে ক্ষুধায় পরাজিত হয়ে ইটখোলার মুখবিকৃত যুবকের সঙ্গে গ্রাম ছেড়ে চলে যায়।

অশনি সংকেত

চলচ্চিত্র অশনি সংকেত-এর গল্পে নতুন গাঁয়ের শান্ত সুন্দর পরিবেশে কীভাবে দুর্ভিক্ষ তার থাবা বিস্তার করে, তা দেখানো হয়েছে। গ্রামের প্রাত্যহিক সাধারণ জীবনের শান্ত চিত্রের মাঝে ক্ষুধা কীভাবে পুরো দৃশ্যপট বদলে দেয়, তার ঘনিষ্ট মানবিক নির্মাণ হয়েছে।

এ চলচ্চিত্রের চরিত্রগুলোর মধ্যে প্রধানত গঙ্গাচরণ এবং তার স্ত্রী অনঙ্গ বউয়ের দৃষ্টিকোণ থেকেই গল্প শুরু ও শেষ হয়। এছাড়া গল্প এগিয়ে চলে ছুটকী, বৃদ্ধ ব্রাহ্মণ দীনবন্ধু ভট্টাচার্য, নতুন গাঁয়ের ‘মাথা’ বিশ্বাস মশাই, নিম্নজাত বা ‘অস্পৃশ্য’ তরুণী মতির উপস্থিতি ও অংশগ্রহণে। এছাড়া ইটখোলার সেই আগুনে পোড়া বিকৃত মুখ যুবকও গল্পে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এরা সবাই একটি গ্রামে একটি নির্দিষ্ট সময়ের খণ্ড খণ্ড যাপনের মধ্য দিয়ে একটি অখণ্ড সময়কে প্রকাশ করতে চেয়েছে। আর এই খণ্ড খণ্ড দৃশ্যগুলোকে গেঁথে একটি গল্প বলতে চেয়েছেন সত্যজিৎ রায়।

সে গল্পটি আদতে কী?

এক তরুণ ব্রাহ্মণ দম্পতি, যারা একটি নতুন গ্রামে এসে বসতি স্থাপন করেছেন। একজন ব্রাহ্মণের যা সক্ষমতা, তাই দিয়ে তিনি নিজের ও তার পরিবারের জন্য জীবিকা, নিরাপত্তা আর সামাজিক মর্যাদা তৈরির চেষ্টা করেন। এতে তিনি স্বার্থপর ও সতর্ক আচরণ করেন। তিনি জানেন যে তিনি ব্রাহ্মণ, এটাই তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পুঁজি। তাই তিনি এবং তার স্ত্রী তাদের এই ব্রাহ্মণত্বকে সযত্নে সুরক্ষিত রাখতে চান। ব্রাহ্মণত্বের মর্যাদা ব্যবহার করে তিনি রোজগারের ফিকিরে পৌরোহিত্য, শিক্ষকতা, চিকিৎসকের কাজ শুরু করেন। এ সবই তিনি করেন; কারণ, তিনি উৎপাদন ব্যবস্থার অংশ নন। তিনি উৎপাদক শ্রেণি, মানে কৃষকের অন্নে বেঁচে থাকা পরজীবী বিশেষ। চলচ্চিত্রে এ আক্ষেপ গঙ্গাচরণের কন্ঠে শোনা যায়। তিনি নিজের চাষের জমি না থাকার আক্ষেপ করেন।

এই গঙ্গাচরণ চলচ্চিত্রের শুরু থেকেই ভীষণ সতর্ক স্বার্থপরতার আচরণ করেন। তার সামাজিক মর্যাদার পুরোটাই তিনি ব্যবহার করেন গ্রামের অশিক্ষিত, সাধারণ কৃষক ও শ্রমজীবী মানুষদের শোষণে। যা উপমহাদেশে উঁচুজাতের মানুষের হাজারও বছরের সামাজিক চরিত্র। কিন্তু সময় যতই গড়াতে থাকে, চলচ্চিত্রে গঙ্গাচরণ ততই মানবিক হয়ে ওঠেন। হয়ে ওঠেন ওই গ্রামের একপ্রকার ‘মোরাল অথরিটি’। ওই গ্রামের পীড়িত, বঞ্চিত মানুষের জন্য তিনি প্রতিবাদী হন। অভুক্ত কৃষকদের পক্ষ নিয়ে গ্রামের ‘মাথা’ বিশ্বাসের বিরুদ্ধাচরণও করেন। তিনি ‘মুচির মরা’ মতির মৃতদেহের সৎকারের ব্যবস্থার উদ্যোগ নেন এবং শেষে এই ঘোর দুর্ভিক্ষের সময়ে বৃদ্ধ ব্রাহ্মণ ভট্টাচার্যের দশ সদস্যের পরিবারেরও দায় নিতে তিনি তৎপর হন।

একজন স্বার্থপর ও শোষক ব্রাহ্মণের এই চারিত্রিক রূপান্তর অবশ্যই মানবিক, তবে স্বাভাবিক নয়। স্বাভাবিক নয় অনঙ্গ বউয়ের ওমন পবিত্র সতী সাধ্বী ইমেজ। স্বাভাবিক নয় নতুন গাঁয়ের সবচেয়ে সাহসী, চটপটে আর বুদ্ধিমতি গৃহবধু ছুটকীর ক্ষুধার জ্বালায় মুখপোড়া বিকৃত যুবকের হাত ধরে সংসার ত্যাগ এবং তার গ্রাম ছেড়ে যাওয়ার আগে অনঙ্গ বউয়ের আশীর্বাদের আশায় ষাষ্টাঙ্গ প্রণাম। যে অনঙ্গ বউ ছোঁয়াছুঁয়ির বিধিপালনের নিষ্ঠায় তার পরিচিত মুচিকন্যা মতির অন্তিমক্ষণে তাকে মুখে জল তুলে দিতে পারেন না। দৃশ্যত মৃতপ্রায় তরুণী মতির জন্য খাবার এনেও খাবারটুকু খাইয়ে দিতে পারেন না, সেই তিনিই ঘরত্যাগী ছুটকীর কাছে ‘দেবী’ হয়ে ওঠেন।


সমাজের
নারী ও পুরুষ–
উভয় ফ্রন্টে এই দম্পতির
মোরাল অথরিটি হয়ে ওঠাটা
নির্মাতা সত্যজিতের দৃষ্টিভঙ্গি ও
মনোভাব হতে পারে। আর
এ দৃষ্টিভঙ্গি ও মনোভাবের
বাস্তবায়নে তিনি এ
চলচ্চিত্রের
অন্যান্য চরিত্রগুলোকে
বামনাকৃতি করে রেখে দিয়েছেন

যদি পুরুষদের মধ্যে গঙ্গাচরণ হন সাহসী অভিভাবক, তবে তার স্ত্রী হিসেবে অনঙ্গ বউও কম যান না। ছবির শেষে এই ব্রাহ্মণ দম্পতির মানুষ থেকে ‘দেবতায়ন’ বিশেষভাবে লক্ষণীয় এবং বিচার্য বিষয়। সমাজের নারী ও পুরুষ– উভয় ফ্রন্টে এই দম্পতির মোরাল অথরিটি হয়ে ওঠাটা নির্মাতা সত্যজিতের দৃষ্টিভঙ্গি ও মনোভাব হতে পারে। আর এ দৃষ্টিভঙ্গি ও মনোভাবের বাস্তবায়নে তিনি এ চলচ্চিত্রের অন্যান্য চরিত্রগুলোকে বামনাকৃতি করে রেখে দিয়েছেন। তাদের স্বাভাবিক বিকাশ হতে দেননি। এ তর্ক কেবল আমার নয়। এ তর্ক মৃণালেরও। সে আলাপে আসব কিছু পরে।

তার আগে বলে নিতে চাই যে, অশনি সংকেত সত্যজিতের কাব্যময় দৃশ্যায়নে সমৃদ্ধ অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চলচ্চিত্র। এ চলচ্চিত্রের সম্পদ এর রঙের ব্যবহার। যারা এতকাল গালমন্দ করেছেন যে দুর্ভিক্ষ রঙিন কেন– তাদের প্রতি সম্মান রেখেই বলছি, এটা অনর্থক কথাই শুধু নয়, এ চলচ্চিত্রের ভাষায় অন্ধ লোকজনের অকারণ আহাজারি ছাড়া আর কিছু নয়।

সত্য হলো, অশনি সংকেত-এর রঙই এর আসল সম্পদ। সত্যজিৎ রায় ১৯৪২-১৯৪৩-এর বাস্তবিক প্রাকৃতিক পরিসর ফুটিয়ে তুলেছেন। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, সেই দুই বছর স্বাভাবিক বৃষ্টিপাত হয়েছে এবং প্রকৃতি স্বাভাবিক ও সুন্দর ছিল। ফুল ফুটেছে, প্রজাপতি উড়েছে এবং চারপাশে সব কিছু উজ্জ্বল সবুজই ছিল। খরা বা অনাবৃষ্টি হয়নি; তাই কোথাও প্রকৃতি ধূসর রঙ ধরেনি। এমন সুন্দর ঝলমলে প্রাকৃতিক সুন্দরের মাঝে ব্রিটিশ সরকারের পরিকল্পিত ও সৃষ্ট দুর্ভিক্ষ ঠিক ততটাই বিকৃত, যতটা ওই ইটখোলার মানুষটির পোড়া মুখ।

ইটখোলার মানুষটির ভেতরে তবু জীবনের স্পন্দন আছে; আছে ছুটকীর রূপ ও যৌবনের প্রতি বাসনা। কিন্তু দুর্ভিক্ষ প্রাণহীন, শুষ্ক এবং ভয়ঙ্কর। সবুজ সুন্দর প্রকৃতির মাঝে ক্ষুধার যন্ত্রণায় মানুষের বিবেক, মূল্যবোধ ও মানবিকতা দাবানলের আগুনের ভেতর খড়কুটোর মতো জ্বলে যায়। অশনি সংকেত-এ এই বৈপরীত্য কাব্যিকভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। দৃশ্যগত এই উৎকর্ষতাকে ‘সম্পদ’ না ভেবে একে এতকাল গালমন্দ করাটা মূর্খতা ছাড়া আর কি?

দুর্ভিক্ষের ৩০ বছর পর সত্যজিৎ রায় পরিণত বয়সে অশনি সংকেত নির্মাণ করেছেন। এ চলচ্চিত্রে সত্যজিৎ সমাজে ও মানুষের মাঝে মানবিকতার বীজ বপন করতে চেয়েছেন। ছবির অন্তিম দৃশ্যে হাজার হাজার মানুষের সিল্যুট অবয়বের ধেয়ে আসার বিপরীতে প্রত্যয়ী গঙ্গাচরণ ও অনঙ্গ বউ যেন লড়বার প্রতীকী উপস্থাপন। এই সুন্দর শৈল্পিক মানবিক বার্তার থিসিস সৃষ্টি করতে গিয়ে সত্যজিৎ যেসব বিষয় উহ্য রেখেছেন বা এড়িয়ে গেছেন বা আদতে দেখতেই পাননি বা দেখতে চাননি- তা আমরা একটু খুঁজে দেখতে চাই।

আমাদের এই খুঁজে দেখার উপকরণ হিসেবে আমরা হাজির করতে চাই সত্যজিতের অশনি সংকেত-এর সাত বছর পর নির্মিত চলচ্চিত্র আকালের সন্ধানেঅশনি সংকেত যা বলে, তার থেকে কতটুকু ভিন্ন কথা বলে মৃণাল সেনের আকালের সন্ধানে?

আকালের সন্ধানে
আকালের সন্ধানে
ফিল্মমেকার । মৃণাল সেন

৩.

বিস্তীর্ণ ধানক্ষেত। সুন্দর সবুজ। বাতাসে দুলছে ধানের সবুজ গাছ। ধানক্ষেতের পাশ দিয়ে ছুটে যাচ্ছে ঝকঝকে ট্রেন। লং শট থেকে ক্যামেরা একটু বাম দিকে প্যান করে। পিচঢালা পথ। গ্রামের। সে পথে সা সা করে ছুটে যাচ্ছে কিছু গাড়ি। গাড়ির ভেতর থেকে ভেসে আসছে সম্মিলিত কণ্ঠের গান।

‘হেই সামালো ধান হো
কাস্তেটা দাও শান হো
জান কবুল আর মান কবুল
আর দেব না আর দেব না
রক্তে বোনা ধান মোদের প্রাণ হো…’

পর্দায় ছুটে চলা পথের দৃশ্য। সঙ্গে গান। এর সঙ্গে ভেসে আসে একটি কণ্ঠ।
ধারাবর্ণনা।

‘৭ সেপ্টেম্বর ১৯৮০। কলকাতা থেকে একদল, সিনেমার একদল ছবি তুলতে চলেছে এক গ্রামে। গ্রামের নাম হাতুই। ছবির নাম…’ বলে থেমে যায় কণ্ঠস্বর। পর্দায় ভেসে ওঠে ছবির নাম– আকালের সন্ধানে

আকালের সন্ধানে মৃণাল সেনের ২০তম চলচ্চিত্র। প্রথম চলচ্চিত্র রাত ভোর [১৯৫৫] নির্মাণের পর আকালের সন্ধানে নির্মাণ করেন ২৫ বছর পর। ১৯৮০ সালে। মৃণাল সেন যখন আকালের সন্ধানে নির্মাণ করছেন, তখন তাঁর বয়স ৫৭ বছর। আকালের সন্ধানের আগে তিনি ১৯টি কাহিনিচিত্র নির্মাণ করেছেন। অর্জন করেছেন দুনিয়াব্যাপি খ্যাতি ও সম্মাননা। অর্থাৎ, সব দিক থেকেই আকালের সন্ধানে মৃণাল সেনের জীবনের পরিণত বয়সের চলচ্চিত্র। হয়তো এ কারণেই তিনি এ চলচ্চিত্রে প্রখরভাবে নিরীক্ষাপ্রবণ হতে পেরেছেন।

আকালের সন্ধানে একটি ‘ফিল্ম উইদিন অ্যা ফিল্ম’ কাঠামোর চলচ্চিত্র। অর্থাৎ এ চলচ্চিত্র হলো চলচ্চিত্র নির্মাণের চলচ্চিত্র। সাধারণ দর্শকের কাছে এ ছবির ধরনটা অনেকটা প্রামাণ্যচিত্রের মতো মনে হলেও এ আদতে কাহিনি চলচ্চিত্র। যেমন ধরুন, ছবির শুরুতেই যে বলা হচ্ছে, একটি চলচ্চিত্র নির্মাতাদল যাচ্ছে গ্রামে আকালের চলচ্চিত্র তুলবে বলে। সে গ্রামের নাম ‘হাতুই’। আদতে এটি বানানো তথ্য। আকালের সন্ধানে চলচ্চিত্রের শুটিং যে গ্রামে হয়েছে, সে গ্রামের নাম ‘সুখড়িয়া’। পুরো ছবিজুড়েই এ ধরনের বানানো ঘটনা আর বানানো ‘বাস্তবের’ মধ্য দিয়ে ছবিটি তৈরি। নিশ্চিতভাবে এটি দর্শকদের জন্য সহজপাচ্য চলচ্চিত্র নয়। তবে চলচ্চিত্রের গল্পবলায় এমন নিরীক্ষা সহজলভ্য কিছুও নয়। মৃণাল সেনের আকালের সন্ধানে সমগ্র ভারতীয় চলচ্চিত্রের মধ্যেই একটি ব্যতিক্রমী চলচ্চিত্র। আর বাংলা ভাষায় নির্মিত চলচ্চিত্রের মাঝে অবশ্যই ব্যতিক্রমতম।

কেন এ চলচ্চিত্র বিশেষ? এ বুঝতে হলে আমাদেরকে আকালের সন্ধানের গল্পটি আগে বলে নিতে হবে।
যেমনটি পূর্বে বলেছি, আকালের সন্ধানে ‘ফিল্ম উইদিন অ্যা ফিল্ম’ কাঠামোর চলচ্চিত্র। ১৯৮০ সালের সেপ্টেম্বর মাসে কলকাতার একটি চলচ্চিত্র নির্মাতাদল হাতুই নামের একটি গ্রামে যায় আকালের ছবি তুলবে বলে। এই আকাল ১৯৪৩ সালে ঘটা দুর্ভিক্ষ। যা বাংলায় ‘পঞ্চাশের মন্বন্তর’ নামে পরিচিত। বেশ কয়েকটি প্রাইভেট কার, মাইক্রোবাস নিয়ে শুটিংয়ের উদ্দেশ্যে দলটি একটি সিনেমায় কথিত হাতুই গ্রামে এসে উপস্থিত হয়।

আকালের সন্ধানে

বিশাল এক পুরোনো মন্দির কমপ্লেক্সের সামনে গাড়িগুলো দাঁড়ায়। আর গাড়ি থেকে হুড়মুড় করে নেমে আসে চলচ্চিত্রটির কলাকুশলী, নির্মাতাসহ সবাই। বেশ একটা হুল্লোড় হয়। যেন গ্রামে পিকনিকে আসা একদল মানুষ। এই হুল্লোড়ের মাঝেই ছবিটির চরিত্রগুলোর সঙ্গে আমাদের পরিচয় হতে শুরু করে।
এখানে বলে রাখা ভালো, যেহেতু ‘ফিল্ম উইদিন অ্যা ফিল্ম’ কাঠামোর ছবি, তাই এখানে সমান্তরালভাবে দুটি গল্প এগিয়ে যায়। একটি হলো যে গল্পটি এ ছবি করিয়েরা তুলতে এসেছেন। অর্থাৎ ১৯৪৩-এর সময়কাল। যখন বাংলায় দুর্ভিক্ষ হয়েছে। এ ছবিতে এই গল্পটির নির্মাতা ধৃতিমান বন্দ্যোপাধ্যায়। যিনি এই নির্মাতাদলের পরিচালক। বয়সে যুবক এবং বুদ্ধিদীপ্ত।

অন্য গল্পটি বা ছবির পুরো গল্পটি হলো মৃণাল সেনের গল্প। যিনি আকালের ছবি তুলতে আসা ধৃতিমানের এই নির্মাতাদলের পেছনে ক্যামেরা নিয়ে তাড়া করেন। তাদের সকল তৎপরতা, তাদের যাপন-আলাপ তিনি ধারণ করে চলেন। তিনি একইসঙ্গে একই ফ্রেমে ধারন করেন ধৃতিমানদের বানানো ১৯৪৩ সাল এবং বর্তমান ঘটমান সেপ্টেম্বর, ১৯৮০ সাল।

ফলে এ চলচ্চিত্র বহু অনুগল্পের সক্রিয় যাপনে এক বৃহৎ গল্পের আকার নেয়। বহিরাবরণে যা কোনো একটি গ্রামে কোনো একটি শুটিং দলের কয়েকদিনের গল্প বলে মনে হয়। কিন্তু কার্যত তা নয়।
আকালের সন্ধানের ধৃতিমানদের দলটি হাতুই গ্রামের এক জীর্ণ জমিদার বাড়িকে তাদের ক্যাম্প হিসেবে ভাড়া নেন। যে বাড়ি এককালে ‘লোক-লস্করে’ পরিপূর্ণ থাকত, সে বাড়ি আজ এক ‘গা ছমছমে’ জীর্ণশীর্ণ দালান মাত্র। এই বাড়ির ২৬টি ঘরের ১৭ জন শরিকের কাছ থেকে চাবি ও অনুমতি যোগাড় করে ধৃতিমানদের দল এখানে ক্যাম্প তৈরি করে। এখান থেকে শুরু হয় তাদের চলচ্চিত্র নির্মাণযজ্ঞ।

ধৃতিমানের দলের অভিনয়শিল্পীদের নিজেদের মধ্যে খুনসুটি, ছোটখাটো আড্ডা আর ইতিউতি ‘গ্রাম দেখা’মূলক ঘোরাঘুরির মধ্য দিয়ে ছবির কাহিনি গড়াতে শুরু করে। পরিচালক ধৃতিমান গ্রামের চারপাশ দেখতে বের হয়ে উপস্থিত হয় হরেনের বাড়িতে। হরেনরা তাঁতি পরিবার। ক্ষয়িষ্ণু অবস্থা। কোনো রকমে চলে ধরনের পরিস্থিতি। সেখানে হরেনের সঙ্গে ধৃতিমানের আলাপ। এই আলাপে জানা যায় হরেন গ্রামে যাত্রাপালার সঙ্গে কাজ করেছে। তার শখ অভিনয়-নির্মাণ। ছোট একটি পালার দল গঠন করার ইচ্ছে তার, কিন্তু গ্রামে তেমন আগ্রহী-উৎসাহী লোকজন না থাকায় সে হতাশ। সে বলে গ্রামে এখন ‘হিটলার-লেনিন-স্ট্যালিনের’ পালা চলে। পুরোনো দিনের রাজ-রাজড়াদের কাহিনি এখন কেউ দেখে না। তাই সে কলকাতা থেকে কার্ল মার্ক্সের জীবনী ধরনের একটি বই এনেছে। তার ইচ্ছে সে কার্ল মার্ক্সের চরিত্রে অভিনয় করবে। আর এখানেই তরুণ চলচ্চিত্রকার ধৃতিমান প্রথম ধাক্কা খায় বা চমকে ওঠে।

সুখড়িয়া বা হাতুই গ্রামে ধৃতিমানের এই চমকে ওঠার পর্ব ছবিজুড়ে চলতে থাকে। ধৃতিমান ‘গ্রাম’ বিষয়ক যে ধারণা ও বিশ্বাস নিয়ে গ্রামে এসেছে, তার সে ‘গ্রাম বিষয়ক ধারণা’ যে অনেকটা কল্পিত বা বানানো গ্রাম, তা ছবির অন্তিমে ধরা পড়ে। যাক সে আলাপ আরও পরে হবে। এখন ছবির বাকি গল্পটুকু বুঝে নিই।

আকালের সন্ধানে

ছবিতে ধৃতিমানের গল্পটি সহজ। ১৯৪৩-এর দুর্ভিক্ষের সময়ে সাবিত্রী ও মালতী নামের দুই নারীর গল্প সে ফুটিয়ে তুলতে চায়। মূলত সে সাবিত্রীর গল্প বলতে চায়। সাবিত্রী [স্মিতা পাতিল অভিনীত চরিত্র] এক চাষী পরিবারের গৃহবধু। ঘরে তার বৃদ্ধ শ্বশুর আছে, আছে স্বামী এবং এক শিশু পুত্র। সাবিত্রীর শ্বশুরের তিন বিঘা জমি আছে। সে জমিতে তাদের চাষবাস হয়। এই তাদের বেঁচে থাকার অবলম্বন। দুর্ভিক্ষের অভাবে মাঝে গ্রামের পুরোহিত ঠাকুর তাদের জমিটি ৫০ টাকায় কিনে নিতে চায়। তিনদিনের অভুক্ত থাকলেও কৃষক চন্দ্রচুড় [মানে সাবিত্রীর শ্বশুর] জমি বিক্রি করতে অস্বীকৃতি জানায়। একই রকম বেপরোয়া মেজাজে বৃদ্ধ পুরোহিত ঠাকুরকে বাড়ি থেকে তাড়ায় সাবিত্রীর স্বামী।

এভাবে তাদের কিছু দিন চলে। অভাব যখন আরও ঘনীভূত হয় তখন শাকপাতা খেয়ে থাকতে থাকতে দুর্বল শ্বশুর মারা যায়। সংসারে থাকে সাবিত্রী আর তার স্বামী ও শিশু সন্তান। এর মাঝে একদিন সাবিত্রীর স্বামী প্রচণ্ড জ্বরে আক্রান্ত হয়। শিশুটিও দূর্বল হতে থাকে। উপায়ন্তর না দেখে সাবিত্রী জীবন বাঁচাতে প্রতিবেশী মালতীর ঘরে যায়।

মালতীও গ্রামের গৃহবধু। অভাবের তাড়নায় মালতী দেহ বেচে। শহর থেকে আসা ‘কন্ট্রাকটর বাবুদের’ কাছে দেহ বেচে বেঁচে থাকে। একরাতে এই মালতীর ঘরে যায় সাবিত্রী। সাবিত্রীও দেহ বেচে। সে টাকায় কিনে আনে চাউল-তেল। কিন্তু এ পরাজয় মানতে চায় না সাবিত্রীর স্বামী। সে ভেঙ্গে গুড়িয়ে দেয় ভাতের হাড়ি, যে হাড়িতে সাবিত্রীর আনা চাউল চড়ানো হয়েছে। সে ছুঁড়ে মারে নিজের শিশুপুত্রকে এবং হয়তো নিজেও আত্মঘাতি হয়। বেঁচে থাকে সাবিত্রী। একাকী। সে আরও বহু শহরমুখি মানুষের মতো অভুক্ত মানুষের মিছিলে যোগ দেয়।

মোটা দাগে ধৃতিমানের বলবার গল্পটি এটাই। এর মাঝে গ্রামে মিলিটারি আসার দৃশ্য। আকাশে যুদ্ধ বিমানের মহড়া। গ্রামের বেকার মানুষের পত্রিকায় খবর পড়া এবং আকালের ভয়াবহতার আলাপ। রাতের আঁধারে চাউল পাচারের দৃশ্য এবং দুর্ভিক্ষপীড়িত মানুষের মুখ বা Faces of Famine খুঁজে বেড়ায় ধৃতিমান। এ হলো গল্পের এক অংশ।


ছবির সেট যে গ্রামে সে গ্রামের
মানুষ এবং তাদের জীবনের
নিস্তরঙ্গ প্রবাহে এই
শুটিং বড় ঢেউ
তুলে দেয়

অপর অংশ, যা মৃণাল সেনের জাগ্রত চোখ সর্বক্ষণ ধরে রাখে। সে চোখ ধরে রাখে সুখড়িয়া গ্রামের চলমান সময়ের সবটা। গ্রামের মানুষ, শুটিং এবং শুটিংয়ের শুটিং। অর্থাৎ যা দৃশ্যায়িত করছে ধৃতিমান তা-সহ পুরো ঘটমান পরিস্থিতি প্রতিক্ষণে ধরে রাখছেন মৃণাল সেন। ছবির সেট যে গ্রামে সে গ্রামের মানুষ এবং তাদের জীবনের নিস্তরঙ্গ প্রবাহে এই শুটিং বড় ঢেউ তুলে দেয়। কেঁপে ওঠে সমাজের হাড়জিরজিরে সকল সংস্কার আর শোষণের চিহ্নগুলোতে।

প্রথমত যে বাড়িতে ধৃতিমানদের ক্যাম্প। সে ক্যাম্পে অর্থাৎ জীর্ণ পুরোনো জমিদার বাড়ির শেষ বংশধরের শেষ সময়ের স্বাক্ষী হয় এ আকালের ছবির টিম। ক্ষয়িষ্ণু জমিদারির মতোই সে বৃদ্ধের মৃতপ্রায় অবস্থা। দশ বছর ধরে প্যারালাইসিস হয়ে শয্যাশায়ী। কিছুই অবশিষ্ট নেই তার। থাকার মাঝে কেবল আছে এই বাড়ির কিছুটা অংশ আর নিজের স্ত্রী। যে দেখে শুনে যত্নে রাখে বৃদ্ধ স্বামীকে। ছবির অন্তিমে এই বৃদ্ধার [গীতা সেন অভিনীত] বিষণ্ন মুখ একাকী বাড়িটির দোতলার বারান্দায় এক ফেলে আসা সময়ের চিহ্ন হয়ে রয়ে যায়।

এ ছাড়া আছে আরেক চরিত্র দূর্গা [অভিনয়ে শ্রীলা মজুমদার]। সে যেন ১৯৮০ সালের সাবিত্রী অথবা মালতী অথবা এমন আরও হাজার হাজার গ্রামীণ গৃহবধুর প্রতীক। সাবিত্রীর মতোই তারও এক স্বামী আর এক শিশু সন্তান। তারও অভাবী সংসার। স্বামী দূর্ঘটনায় এক হাত হারিয়েছে, তাই বেকার। ফলে গৃহবধু দূর্গা গ্রামের এবাড়ি-ওবাড়ি ছুটাছাটার কাজ করে, এর-ওর মুড়ি ভেজে অথবা ধান ভেঙ্গে অথবা গ্রামের হাটে কলা-মুলা-কচু বিক্রি করে কোনোক্রমে কায়ক্লেশে চলে যাচ্ছে দিন। সে ধৃতিমানদের শুটিং ইউনিটে দিনে ৭ টাকা মাইনে এবং একবেলা খাওয়া বা খোরাকীর বিনিময়ে ফুটফরমাশ খাটার কাজ করে। আর তাই সে গ্রামের আরও অনেকের মতো দেখার সুযোগ পায় ধৃতিমানদের বানানো ১৯৪৩-এর সাবিত্রীর জীবনের গল্পগাঁথা।

সাবিত্রীর জীবনের গল্পে দূর্গা খুঁজে পায় নিজেকে। সে ১৯৪৩-এর দুর্ভিক্ষের চিত্রে নিজের জীবনের গল্প খুঁজে পেয়ে সাবিত্রীর সাথে একাত্ম হয়ে পড়ে। সে আক্রান্ত হয়। সে বানানো গল্প আর জীবনের বাস্তবতার ব্যবধানের সীমানায় দ্বন্দ্বে ভোগে। দূর্গার এই দ্বন্দ্ব অজ্ঞাত থাকে না ছবি তুলতে আসা ধৃতিমানের। দূর্গার জীবনের বাস্তবতার সঙ্গে ১৯৪৩-এর সাবিত্রীর জীবনের মিল আকাল খুঁজতে আসা ধৃতিমানকেও নাড়িয়ে দেয়। আর তাই আকালের সন্ধানে ছবি শেষ হয় দূর্গাকে দিয়েই। কেমন করে? সে আরও একটু পরে আসছি।

ধৃতিমানের ছবির ইউনিটে মালতীর ভূমিকায় অভিনয় করবে যে তরুণী। সে দেবীকা। দেবীকা কলকাতা শহরের মেয়ে। আকালের সন্ধানের ছবির ইউনিটে সে অপ্রস্তত এবং অনিচ্ছুক মনোভাবে হাজির থাকে। প্রথমে সে ছবির পরিচালকের নিষেধ সত্যেও নিজের চুল ছাটে এবং ভ্রু প্লাক করে। এ নিয়ে পরিচালক তার প্রতি অসন্তুষ্ট হয়। এরপর ছবির ইউনিটের ম্যানেজার জয়ন্তের কথায় ‘অপমানিত’ বোধ করে সে ধৃতিমানের ছবির কাজ না করেই কলকাতায় ফিরে যায়।

মূলত দেবীকার ইউনিট ছেড়ে চলে যাওয়ার মধ্য দিয়ে আকালের সন্ধানের ছবির ইউনিট, বিশেষত পরিচালক ধৃতিমান হাতুই গ্রামের মানুষের সঙ্গে আলাপে প্রবৃত্ত হয়। আর এতে তাকে উৎসাহিত করে হাতুই গ্রামের হরেন। মালতীর ভূমিকায় অভিনয়ের জন্য দেবীকার রিপ্লেসমেন্ট হিসেবে গ্রামের এক ব্রাহ্মণের [মানিক চ্যাটার্জি] অষ্টম শ্রেণি পড়ুয়া কন্যাকে দেখতে যায় ধৃতিমান। সঙ্গে অবশ্যই হরেন। সে বাড়িতে গিয়ে ধৃতিমান যখন মালতীর চরিত্রটি ব্যাখ্যা করে, তখন চ্যাটার্জি রুষ্ট হন। তিনি একজন পতিতার চরিত্রে নিজের মেয়েকে অভিনয় করতে দিতে নারাজ। যদিও ধৃতিমান বলে যে এটা তো শুধু অভিনয়। তবুও মানিক চ্যাটার্জি অত্যন্ত বাজেভাবে প্রতিক্রিয়া দেখান এবং তাদেরকে বাড়ি থেকে একপ্রকার ‘তাড়িয়েই’ দেন। এ কথা গ্রামে গোপন থাকে না। ছড়িয়ে পড়ে।

সিনেমায় অভিনয়ের জন্য একজন মেয়ে দরকার– এমন প্রচারণা শুনে রাতের অন্ধকারে আরেক ব্রাহ্মণ পিতা আসেন নিজের মেয়েকে অভিনয়ে, ‘সিনেমায় নামানোর’ তদবির নিয়ে। পরিচালক তার কথা শোনে। চ্যাটার্জির বাড়িতে ঘটা ঘটনার কারণে সতর্ক ধৃতিমান তাকে বোঝায় যে চরিত্রটি একটি পতিতা মেয়ের। গল্প জেনে ব্রাহ্মণ পিতা তার নার্স মেয়েকে অভিনয়ে দিতে চান। কারণ তাদের আর্থিক অবস্থা খারাপ। আর মেয়েটি নার্সিং করে যে টাকা মাইনে পায়, তাতে তাদের সংসারে অসুবিধে ভীষণ। এসব শুনে ধৃতিমান ভোরে তার মেয়েকে নিয়ে আসতে বলে।

ছবিতে ভোরের দৃশ্যটি আর দেখায়নি। কিন্তু পরবর্তী সিকোয়েন্সে চ্যাটার্জির বাড়ির দাওয়ায় কাচুমাচু হয়ে বসে থাকা অভাবী ব্রাহ্মণের সামনে চ্যাটার্জির উত্তেজিত স্বর ও ভঙ্গিতে বুঝি যে, এই মেয়েটিকে ধৃতিমানের পছন্দ হয়নি। হয়তো তার চরিত্রের প্রয়োজনে যেমনটি দরকার, তেমনটি নয় সে। নিজের মেয়েকে সিনেমায় অভিনয়ের জন্য নিয়ে যাওয়ায় দরিদ্র ব্রাহ্মণ পিতাকে শাসান চ্যাটার্জি। পাশে স্নানরত আরেক ব্রাহ্মণ সুধন্য এতে ইন্ধন জোগায়। ফলে গ্রামের ‘সমাজপতি’ ব্রাহ্মণরা ক্ষেপে ওঠে। তাদের ক্ষেপে ওঠার কারণ হিসেবে যে ইস্যুটিকে তারা সামনে রাখে, সে ইস্যুটি আদতে একটি মুখোশ। এটি স্পষ্ট করে প্রকাশ করেন গ্রামের বৃদ্ধ হেডমাস্টার।

এই হেডমাস্টার একদিন হাজির হয়েছিলেন ধৃতিমানদের শুটিং দেখতে। সেদিন শুটিং হচ্ছিল ১৯৪৩-এর সাবিত্রীর শ্বশুরের তিন বিঘা জমি কিনে নেয়ার জন্য গ্রামের পুরোহিত ঠাকুরের কথপোকথনের। সে দৃশ্যের শুটিং দেখে হেডমাস্টার আশ্বস্থ হয়েছিলেন। তিনি পরিচালক ধৃতিমানকে বাহবা দেন এবং ১৯৪৩-এর গ্রামের পুরোহিত ঠাকুর চরিত্রের অভিনেতাকে বলেন, ‘আপনার মতো এমন লোক এ গ্রামে এখনো আছে।’

এ কথা শুনে ১৯৮০ সালের, মানে বর্তমানের গ্রামের এক ‘সমাজপতি’ ব্রাহ্মণ সুধন্য। সে রুষ্ট হয়। অস্বস্তিবোধ করে। এরপর থেকে সে ছবির বিভিন্ন দৃশ্যে গ্রামে এই শুটিং নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে চলে। কখনো হাটে। কখনো চ্যাটার্জির সঙ্গে ধৃতিমানদের আলাপের পশ্চাতে।

যখন গ্রামের আরও দুই একজন ‘সমাজপতিদের’ নিয়ে সুধন্য এবং মানিক চ্যাটার্জি ‘গ্রামের মেয়েদের বাজে কাজে ব্যবহারের উদ্দেশ্যে সিনেমায় নামাচ্ছে’ টাইপ নালিশ নিয়ে হেডমাস্টারের বাড়িতে আসে, তখন হেডমাস্টার তাদের এই অভিযোগকে আমলে নেন না। তিনি তাদের বলেন, এটা ভুল বোঝাবুঝি। তিনি ধৃতিমানদের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেন। কিন্তু তাতেও যখন এই ‘সমাজপতিদের’ অখুশি দেখেন, তখন তিনি বলেন, ‘আমি ভুলে যাইনি সে সময়ের কথা। এই যে সুধন্য, তুমি কীভাবে জলের দরে বাগদী পাড়ার কৃষকদের জমি কিনেছ, তা আমি ভুলিনি; এই যে মানিক, তুমি তখন ছোট ছিলে, তোমার কাকার ছিল তো মোটে একটা একচালা ঘর, কী করে তার এত জমি-জিরেত হলো– তা আমি ভুলিনি, যা তুমি ভোগ-দখল করছ আজ। আর সেইসব কথাই তারা ছবিতে দেখাচ্ছে। তাই আজ কোথায় তোমাদের লেগেছে, আমি জানি।’ এই বলে তিনি তাদের কাছ উঠে চলে যান। কিন্তু তাতে এই সমাজপতি ব্রাহ্মণেরা শান্ত হন না। তারা ধীরে ধীরে পুরো গ্রামকে ক্ষেপিয়ে তুলতে থাকেন।

আর এর ফলশ্রুতিতে হাতুই গ্রামে ধৃতিমানদের শুটিং বন্ধ হওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়। এই পরিস্থতিতে পুলিশ ডেকে শুটিং করা যায় কি-না তা আলোচনা হয়। গ্রামের বৃদ্ধ হেডমাস্টার আবার আসেন এই শুটিং ইউনিটের আলোচনার মাঝে। পরিস্থিতির চাপে এক রকম দিশেহারা সবাই ভাবে, হেডামস্টার মশাই হয়তো কোনো সমাধান দেবেন। কিন্তু তিনি আদতে কোনো সমাধান দেন না। তিনি কিছু প্রশ্ন উত্থাপন করেন।

তিনি বলেন, এ গ্রামে আর শুটিং হবে না। তিনি বলেন, গ্রাম আর শহরের মাঝের যে তফাৎটুকু, সেটা একটা বড় ব্যবধান গড়ে দিয়েছে। গ্রাম যদি অশিক্ষা-কুসংস্কার আর স্বার্থান্ধের জায়গা হয়, তবে শহরের আপনারাও তুলসি ধোয়া গঙ্গাজল নন। তিনি বলেন, আপনারা শহরের মানুষ, প্রিভিলেজড ক্লাস। আপনাদের চাপিয়ে দেওয়া বিচার ওরা (গ্রামের মানুষ) চিরকাল মানবে কেন?

মোদ্ধা কথা, বৃদ্ধ হেডমাস্টার প্রশ্ন তোলেন ধৃতিমানদের ‘বিশ্বাস’ নিয়েই। তিনি প্রশ্ন করেন, ধৃতিমান যে ‘বিশ্বাস’ নিয়ে হাতুই গ্রামে এসেছিলেনম সে বিশ্বাস কি এখনো আছে? ফলে ধৃতিমান যে দূর্ভিক্ষের চিত্র তুলতে এসেছিলেন সে দূর্ভিক্ষকে দেখার মনোভাব বা দেখার দৃষ্টিকোণই প্রশ্নবিদ্ধ করেন বৃদ্ধ শিক্ষক। ধৃতিমানও দ্বিধাগ্রস্ত হন। উত্তর খুঁজে পান না। আর তাই হাতুই গ্রামে শুটিং অসম্পূর্ণ রেখেই ধৃতিমানের দল শহরমুখি হয়। সিদ্ধান্ত হয় ছবির অবশিষ্ট কাজ কলকাতায় স্টুডিওতে বসে হবে। সেখানে কেউ বাধা দিতে আসবে না। পুলিশও লাগবে না।

এই ফেরার তাড়ার আগে সাবিত্রী বা স্মিতা পাতিলের একদিনের ‘দয়া’র সাত টাকা ফেরত দিয়ে যায় দূর্গা। কাজ না করে সে টাকা নিতে অপারগতা জানায়। যদিও তার ঘরে আকাল। তবুও সে তার মর্যাদার প্রশ্নে স্থির দৃঢ়তা দেখায়। আর তার এই দৃঢ়তায় কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে স্মিতা পাতিল বা সাবিত্রী।

আকালের সন্ধানে

ছবি শেষ হয় জমিদার বাড়ির শেষ পুত্রবধুর বিষণ্ন চাহনিতে। ছবি শেষ হয় ছবির কোনো অভিনেত্রীর ব্যবহৃত পন্ডস পাউডারের কৌটা হাতে গ্রামের কিশোরীর বিষণ্ন চাহনিতে। ছবি শেষ হয় সবকূল হারানো হরেনের বিধ্বস্ত জমিদার বাড়ির জীর্ণ থাম ধরে কাতর চাহনিতে। আর ছবি শেষ হয় একটি খবর দিয়ে। দূর্গার খবর।

দূর্গার শিশুটি মরে গেছে। স্বামী তিন দিন ধরে নিখোঁজ। দূর্গা একা। অন্ধকার পর্দায় দূর্গার মুখ ছোট হতে হতে হারিয়ে যায়। যেন দূর্গা স্মৃতি থেকে বিস্মৃতিতে হারিয়ে গেছে। যেমন হারিয়ে গেছে ১৯৪৩-এর লাখো সাবিত্রী বা মালতী। ১৯৮০ সালে হারিয়ে গেছে লাখো দূর্গা। হারাচ্ছে প্রতিদিন।

ছবিটি শুরু হয়েছিল একটি সংলাপ দিয়ে। সংলাপটি ব্যঙ্গ্যাত্মক। দ্রুতগামী শুটিংয়ের গাড়িগুলো যাচ্ছে হাতুই গ্রামের অভিমুখে। কালো ধোঁয়া উড়িয়ে। সে ধোঁয়া ওড়া গ্রামের পথে এক দুর্ভিক্ষপীড়িত মানুষের বক্রোক্তি। ‘বাবুরা এয়েচেন আকালের ছবি তুলতে, আকাল তো আমাগের সর্ব্বাঙ্গে।’


বিভিন্ন
ধরনে, বিভিন্ন
রূপে আকাল মানুষের
জীবনের বহমান বৈষম্যময় বাস্তবতা

এটাই অন্তিম কথা। এটাই শুরুর কথা। এই কথাটির প্রমাণেই মৃণাল সেন ‘ফিল্ম উইদিন অ্যা ফিল্ম’ কাঠামোর আশ্রয় নেন। তিনি ধৃতিমানের ১৯৪৩-এর দুর্ভিক্ষের বানানো বাস্তবতার বিপরীতে ১৯৮০-এর দুর্ভিক্ষের বাস্তবতাকে খাড়া করেন। তিনি এই চমৎকার কাহিনি চিত্রায়নে বলেন ‘আকাল সর্বক্ষণ বিরাজমান’। আকাল খোঁজার কিছু নেই। বিভিন্ন ধরনে, বিভিন্ন রূপে আকাল মানুষের জীবনের বহমান বৈষম্যময় বাস্তবতা।

অমলেন্দু চক্রবর্তীর কাহিনিতে মৃণাল সেন নির্মিত আকালের সন্ধানে একটি বহুমাত্রিক চলচ্চিত্র। এই বহুমাত্রিকতার দাবি মৃণাল নিজেই করেছেন। ছবিটি নিয়ে আমারও তেমনই অভিমত।

ছবিটি সময়ের সঙ্গে এক অদ্ভুত সংলাপ তৈরি করে। অতীত কখনো অতীত নয়; সে যেন প্রবিষ্ট হয়েছে বর্তমানে। আর বর্তমানও এমন যে, তা থেকে আঁচ করা যায় ভবিষ্যৎ। এবং আশ্চর্য এই যে আকালের সন্ধানে ছবিতে মৃণাল সেন অতীত ও বর্তমানের এই সংলাপ একই ফ্রেমে করেছেন। অতীতকে তুলে আনতে তিনি ফ্ল্যাশব্যাকে যাননি। তিনি অতীতকে বর্তমান দিয়ে প্রকাশিত করেছেন। আর বর্তমানকে করেছেন অতীতমুখি। ফলে আকালের সন্ধানের পুরো সিনেম্যাটিক টাইপ চেতনাপ্রবাহের ধারায় একটা লুপে আটকে গেছে বলে মনে হয়। কে যে সাবিত্রী আর কে দূর্গা? কে পুরোহিত ঠাকুর আর কে সুধন্য চ্যাটার্জি? এরা সবাই একটি অতিপ্রাচীন শোষণবাদী সমাজকাঠামোর পীড়নে আটকে পড়া মানুষ। এদেরই কেউ শোষিত তো কেউ শোষক। আর এরা কেবলই প্রতীকী চরিত্রমাত্র। বাংলার সকল গ্রাম আর গ্রামের মানুষই এই শোষণ-পীড়নের কাঠামোয় আটকে পড়া মানুষ। এদের মুক্তির বার্তা কী?

মৃণাল সেন তা বলেন নি। তিনি কোনো সমাধান দেননি। সমাধান দেওয়া শিল্পীর কাজও নয়। শিল্পীর কাজ প্রশ্ন করা।

আকালের সন্ধানে ছবিতে সেই প্রশ্ন মৃণাল সেন বহুমাত্রিক ভঙ্গিতে তুলেছেন। তিনি এই ছবিতে শিল্পীর গড়া ও তোলা ‘প্রশ্ন’কেও প্রশ্ন করতে ছাড়েননি। বহু প্রস্তুতি ও গবেষণার পরে ধৃতিমান যে কেবল একটি মনগড়া গল্প নিয়েই হাতুই গ্রাম খুঁজতে সুখড়িয়া গ্রামে এসেছেন, তা মৃণাল সেন স্পষ্ট করেন। এবং ধৃতিমানদের চলে যাওয়ার পথে তাকিয়ে থাকা হরেন বা দূর্গার কোনো দায় ধৃতিমানরা বহন করে না। অথচ আকালের সন্ধানে নির্মাণের এই যজ্ঞকর্মে আহুতি দেওয়া দুটি প্রাণ হলো হরেন এবং দূর্গা।

কী পেলো হরেন? চলচ্চিত্র নির্মাণের এই যজ্ঞে নিয়োজিত হয়ে গ্রাম ও পরিবারের কাছে নিজেকে ‘মূল্যহীন’ ও অপদস্ত করে। ধৃতিমানের বানানো চরিত্র সাবিত্রীর সঙ্গে নিজের জীবনের মিল খুঁজে পেয়ে আক্রান্ত দূর্গা। সেই মিলের বাস্তবতা বুঝেও ধৃতিমানরা কোনো ব্যবস্থা কি করে দূর্গার জীবন রক্ষার্থে? ধৃতিমানরা কি কেবল বানানো সাবিত্রীর গল্পই বলবেন? বাস্তবের সাবিত্রী বা দূর্গার জন্য তাদের কোনো সচেতন দায় নেই?

এমন শত প্রশ্ন তোলার সুযোগ রেখে মৃণাল সেন আকালের সন্ধানের ইতি টানেন।

কিন্তু চলচ্চিত্র আকালের সন্ধানের আলাপ ও সংলাপ কি কেবল কাল্পনিক হাতুই বা বাস্তবের সুখড়িয়া গ্রামের মানুষের সঙ্গে জড়িত। নাকি এই ছবির ‘ফিল্ম উইদিন অ্যা ফিল্ম’ কাঠামোর অন্তরালে মৃণাল আরও কোনো বাহাসে অবতীর্ন?

খুঁজতে হবে। খোঁজাটা ও বোঝাটা জরুরি।

আকালের সন্ধানে

৪.

পূর্বে যেমনটি বলেছি, আকালের সন্ধানে ছবিতে গল্প আছে দুটি। একটি ১৯৪৩ এর সাবিত্রী আর তার গ্রামের গল্প। অন্যটি ছবি করতে আসা ধৃতিমানদের সাথে ‘হাতুই’ বা সুখড়িয়া গ্রামের ১৯৮০ সালের বাসিন্দাদের মিথক্রিয়ায় ঘটা গল্প যা মৃণাল সেন ধারণ করেন।

যখন আমি সত্যজিৎ রায় নির্মিত অশনি সংকেত-এর সঙ্গে আকালের সন্ধানের সংলাপে প্রবৃত্ত হই। তখন আকালের সন্ধানের দুটি গল্পের পৃথক প্রয়োজনীয় কার্যকারিতা খুঁজে পাই। কী সেই সংলাপ?

অশনি সংকেত যে গল্প বলে, তা তরুণ ব্রাহ্মণ গঙ্গাচরণ ও তার স্ত্রী অনঙ্গ বউয়ের দৃষ্টিকোণ থেকে ১৯৪২ থেকে ১৯৪৩-এর কিছুটা সময় তুলে আনে। তার মানে, বাংলার আবহমানকালের সমাজ কাঠামোতে ‘সমাজপতি’ হিসেবে গৃহিত একটি ব্রাহ্মণ পরিবার হচ্ছে এই গল্পের কথক।

অন্যদিকে, আকালের সন্ধানে ছবিতে ধৃতিমান যে গল্পটি চিত্রায়িত করতে ‘হাতুই’ গ্রামে আসেন, সে গল্পটি এক কৃষক পরিবারের গল্প। মূলত তা এক নারীর দৃষ্টিকোণের গল্প। সমাজের ক্ষমতা কাঠামোয় যার তেমন গুরুত্বপূর্ণ স্থান নেই।

আকালের সন্ধানের মধ্যে ধৃতিমানের গল্পটি বিভিন্ন কোন থেকে বারবার অশনি সংকেত-এর গল্পকে চ্যালেঞ্জ করে এবং বাতিল করে দেয়।

অশনি সংকেত যে গ্রামীণ সমাজ কাঠামো এবং মানুষের যে পারস্পরিক সম্পর্কের বাতাবরণ দেখায়, তা ধৃতিমান বাতিল করে নতুন এক গল্প বলেন। ধৃতিমানের ১৯৪৩-এর গল্প অশনি সংকেত-এর গল্প থেকে শুধু যে ভিন্ন বার্তা দেয়, তাই নয়; ধৃতিমানের গল্প বলে অশনি সংকেত-এর গল্প এক বানানো কল্পকথা। ১৯৪৩-এর বাস্তবতায় অশনি সংকেত-এর নতুন গাঁ বলে যে গ্রামের উপস্থিতি, তা বাস্তবের বাংলার জনসমাজের চিত্র নয়।

কেন এমন সিদ্ধান্ত?

এ সিদ্ধান্তের বহু কারণ আছে। মনে রাখুন সালটা ১৯৪৩। দেশভাগের মাত্র ৪ বছর আগে। পঞ্চাশের মন্বন্তর হয়েছিল পুরো বাংলায়। দুর্ভিক্ষের আঘাতে পুরো বাংলা নড়বড়ে হয়ে যায়। কিন্তু তবু বাংলার নিজস্ব সক্ষমতা তাতে খুব বেশি টলে গেছিল, এমন নজির ইতিহাসে দেখতে পাই না। কার্‌ এর পরের ৪ বছরে ব্রিটি,বিরোধী আন্দোলনে, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় এবং বাংলাভাগের মতো অপরিণত কর্মকাণ্ডে বাংলার জনতার উৎসাহ কোথাও কম দেখা যায়নি।

তো, অশনি সংকেত বাংলার গ্রামের যে চিত্রটি আঁকে, তা এমনই এক গ্রাম, যে গ্রামে কোনো বিদ্যালয় নেই, নেই কোনো পড়ালেখা জানা মানুষ, নেই কোনো চিকিৎসক অথবা কবিরাজ। এ এমনই এক গ্রাম, যে গ্রামের মানুষের ভূগোলের জ্ঞান এতটাই হাস্যকর য্‌ তারা সিঙ্গাপুর বলতে বোঝে মেদেনীপুরের পাশের কোনো গ্রাম।

অশনি সংকেত

এখানেই শেষ নয়। অশনি সংকেত-এর নতুন গাঁ এমনই এক গ্রাম, যে গ্রামে কেউ পত্রিকা পড়ে না। এ গ্রামের সর্বোচ্চ শিক্ষিত লোকটি হলো ‘বিশ্বাস মশাই’ এবং তার শিক্ষার দৌড় হলো বাল্যশিক্ষার ওই ‘পাখি সব করে রব রাত্রি পোহাইলো’ পর্যন্ত।

নতুন গাঁ হলো এমন গাঁ, যেখানে কোনো ভূ-স্বামী বা জমিদার নেই। অথচ বাংলায় তখনো জমিদারি প্রথা বিলুপ্ত হয়নি। নতুন গাঁয়ের সবচেয়ে সামন্ত লোকটি হলো একজন মোটামুটি সচ্ছল কৃষক, যাকে বড়জোড় জোতদার বলা যেতে পারে। এ গাঁয়ের মানে নতুন গাঁয়ের সমস্ত লোক আদতে কৃষক এবং তারা কৃষির উপরেই বেঁচে থাকে। তাদের সন্তানদের অক্ষর জ্ঞান দিতে গিয়ে পণ্ডিত গঙ্গাচরণ খেদের সঙ্গে বলেন, ‘বাংলার চাষা! লাঙ্গলের মুঠো চালাতে হাত আড়ষ্ট হয়ে গেছে, এ হাত চলতে লাগবে আরও ছ মাস।’

তো, এই যখন নতুন গাঁ তখন মৃণাল সেনের আকালের সন্ধানে ধৃতিমান দেখান, ১৯৪৩-এর গ্রামের চাষারা পত্রিকা পড়ে। খবর রাখে কক্সবাজারে ব্রিটিশ বিমান বাহিনির সঙ্গে জাপানি বিমানের যুদ্ধের এবং খবর রাখে নারায়ণগঞ্জের চাষাড়ায় দুর্ভিক্ষের ভয়াবহতায় এক মা তার শিশু সন্তানকে ফেলে চলে গেছে। সে শিশুর মৃতদেহ খাচ্ছে কুকুর শেয়াল। ধৃতিমান তার গল্পে বলেন গ্রামে স্কুল আছে। সে স্কুলে শিক্ষক আসে কলকাতা থেকে। ফলে ধৃতিমানের ১৯৪৩-এর আকালের গ্রাম আর অশনি সংকেত-এর গ্রাম পুরোপুরি পৃথক হয়ে যায়।

অশনি সংকেত-এ সত্যজিৎ পণ্ডিত গঙ্গাচরণ ও তার স্ত্রী অনঙ্গকে গ্রামের নৈতিক অভিভাবকে পরিণত করেন। আর ধৃতিমান তার গল্পে দেখান, ১৯৪৩-এর দুর্ভিক্ষে গ্রামের দরিদ্র কৃষকের জমি সামান্য টাকায় কিনে নিতে চায় পুরোহিত ঠাকুর। মানে সমাজপতি ব্রাহ্মণ। কিন্তু বাংলার কৃষক অভুক্ত থেকেও জমি বিক্রি করতে নারাজ।


মৃণাল সেনের
আকালের সন্ধানে
বক্তব্য অশনি সংকেত-এর
গল্পের বিশ্বস্ততাকেই খারিজ করে দেয়

তবে শেষ পর্যন্ত কৃষকের জমি এবং কৃষকের ভিটার কোনোটাই পুরোহিত ঠাকুরের কবল থেকে রক্ষা পায় না– যা মৃণাল সেন আকালের সন্ধানের ১৯৮০-এর বাস্তবতায় তুলে ধরেন। ১৯৪৩-এর আকালের বাজারে কৃষকরা অভাবের তাড়নায় জলের দরে নিজ চাষের জমি এবং ভিটেমাটি বিক্রি করে দিতে বাধ্য হয়েছে। আর সে জমির মালিক হয়েছে সমাজের ক্ষমতাকাঠামোয় শীর্ষে থাকা ব্রাহ্মণ পুরোহিতরাই। মৃণাল সেনের আকালের সন্ধানের এ বক্তব্য অশনি সংকেত-এর গল্পের বিশ্বস্ততাকেই খারিজ করে দেয়।

কার্যত সত্যজিতের অশনি সংকেত-এর নতুন গাঁ এবং দরিদ্র ব্রাহ্মণ ভট্টাচার্যের যে কষ্টের চিত্র, তা কৃষক সমাজের প্রতিনিধিত্ব করে না। অশনি সংকেত-এর গঙ্গাচরণের নতুন গাঁয়ের এবং ১৯৪৩-এর আকালের প্রেক্ষিতে ব্যক্তিগত স্বার্থান্ধ থেকে মানবিক হয়ে ওঠার গল্পটিও অনেকটাই ঠেসে সাজানো একটি গল্পই মনে হয়। এ গল্পের বিশ্বস্ততার সপক্ষে বাংলার গ্রামীণ সমাজের ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় না। বরং এখানে মৃণাল সেন তাঁর আকালের সন্ধানে যে গ্রামীণ বাস্তবতা ও ক্ষমতাকাঠামোর পরিচয় তুলে ধরেন, তা অনেকাংশে বাস্তবানুগ বলে প্রতীয়মান হয়। কিন্তু মৃণাল কি শুধু অশনি সংকেত-এর নতুন গাঁ এবং গঙ্গাচরণের অভিভাবক হয়ে ওঠাকেই বাতিল করেন, নাকি তিনি আরও সামনে এগিয়ে যান?

চলুন, আরও একটু দেখি।

অশনি সংকেত

৫.

অশনি সংকেত-এর সবচেয়ে ভয়াবহ চিত্র দুটি। একটি হলো মুচিকন্যা মতির মৃত্যু এবং অন্যটি চলচ্চিত্রে ছুটকীর আপাত স্বাধীনচেতা স্বরূপ নির্মাণের পরেও পেটের ক্ষুধায় ছুটকীর সমর্পণ। দেহ বিক্রি করে চাউল সংগ্রহ এবং অবশেষে ‘শহরের’ লোকের সঙ্গে গ্রাম ও সংসার ছেড়ে পলায়ন।

অশনি সংকেত-এ দুইজন নারীর উপস্থিতি কয়েকটি কারণকে প্রতিষ্ঠিত করে। মতির উপস্থিতি গঙ্গাচরণদের নতুন গাঁয়ে আসার আগের যাপন ও জীবনের সঙ্গে বর্তমানের যোগসূত্র প্রমাণ করে। কারণ, মতি অন্য গ্রাম থেকে নতুন গাঁয়ে দু’বার আসে। একবার সৌজন্য সাক্ষাৎ আর অন্যবার ক্ষুধার্ত মতি যেন মরে যেতে আসে অনঙ্গ বউ বা গঙ্গাচরণ দম্পতির কাছে। এই মুচিকন্যা বা ‘অচ্ছুত’ মতির চরিত্র কার্যত চিত্রনাট্যে কিছু তথ্য সরবরাহ আর অন্তিমে একটি ট্র্যাজিক মুহূর্ত তৈরিতে কাজে লাগে।

আর ছুটকীর উপস্থিতি যেন অনঙ্গ বউয়ের নতুন গাঁয়ে সামাজিকীকরণে কাজে লাগে। এছাড়া মতির মতোই ছুটকীও চলচ্চিত্রের গল্পে একটি ট্র্যাজিক মুহূর্তে তৈরিতে কাজে লাগে। যে ছুটকী প্রায় একাই আক্রান্ত অনঙ্গ বউকে রক্ষা করে এবং পিটিয়ে মারে অনঙ্গ বউকে ধর্ষণে উদ্যত অপরিচিত পুরুষকে। সে ছুটকীর ‘ক্ষুধা পেলে মাথা ঠিক থাকে না’, তাই ধরা দেয় ইটখোলার মুখপোড়া শহুরে লোকের ডাকে। সে দেহ দিয়ে নিয়ে আসে কিছু চাউল, যা দিয়ে হয়তো দিনকয়েক চলে। তারপর গ্রাম ছেড়ে একেবারেই পালিয়ে যায়।

সঙ্কট হলো, অশনি সংকেত-এ ছুটকী অথবা মতির পরিবারের কোনো দৃশ্য নেই। ছুটকী যেন এ গ্রামের একটি মেয়ে, আর মতি অন্য গাঁয়ের।

যে দুই নারী অশনি সংকেত-এর গল্পে এতটা গুরুত্বপূর্ণ, সে নারীদের জন্য আরও একটু যত্নের প্রয়োজন ছিল না? যে নারী স্বাধীনচেতা এবং লড়াকু তার সমর্পণের দৃশ্যে পৌঁছানোর আগে আরও একটু পরিসর তৈরি করা কি অনুচিত ছিল? কার্যত অশনি সংকেত এক কৃষি পরিবারের গৃহবধুর প্রতি অন্যায় আচরণ করেছে। বড্ড তাড়াহুড়োয় ছুটকীর বিষয়ে নির্মাতা সত্যজিৎ সিদ্ধান্তে পৌঁছে গেছেন।

আর এই ‘তাড়াহুড়ো’টাকেই ধৃতিমান, মানে মৃণাল সেন চিহ্নিত করেন তার আকালের সন্ধানেতে। এ কারণে ধৃতিমান তার বানানো গল্পে যাকে প্রধান চরিত্র করেন, সে তো আসলে সাবিত্রী নয়; ছুটকী। সে কৃষকের বউ।

সাবিত্রীও দেহ বেচে, তবে তার দেহ বেচা কেবলমাত্র ছুটকীর জবানের ‘ক্ষুধা পেলে মাথা ঠিক থাকে না’ ধরনের চাপল্যে নয়। অন্যদিক্‌ সাবিত্রীর দেহ বেচা চাউলে যে সংসারের হাড়ি চাপে, সে হাড়ির ভাত কি সহজে গলা দিয়ে নামে বাংলার কৃষকের?

সত্যজিতের অশনি সংকেত-এ অনঙ্গ বউ ছুটকীর আনা চাউল গ্রহণ করে না। কারণ অনঙ্গের দৃঢ় নৈতিক মনোবল। সে বলে ‘ও চাউলে আমার দরকার নেই’। কিন্তু সে চাউল ছুটকীর বাড়িতে কীভাবে গৃহিত হলো, তার হদিশটুকু সত্যজিৎ খোঁজেন না। যে খোঁজটুকু না থাকায় ছুটকীর সংগৃহীত চাউলে ছুটকীর পরিবারের লোকজনের প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায় না। আর এমন নিরুত্তাপ গ্রহণের মধ্য দিয়ে বাংলার কৃষক পরিবার যা হারায়, তা হলো সম্ভ্রম বা আত্মমর্যাদা।

বাংলার ‘চাষা’র হয়তো অনেক কিছু নেই; কিন্তু ইতিহাস বলে, বাংলার চাষার একটি বিষয় বড় বেশি আছে এবং ছিল। আর তা হলো আত্মমর্যাদারবোধ। নিজের স্বাধীনতার অহঙ্কার। যা সত্যজিৎ বুঝতে পারেননি। পারেননি বলেই তিনি ছুটকীর চরিত্রটির প্রতি আরও একটু যত্নশীল হননি। যদি হতেন, তবে মৃণাল সেনের আকালের সন্ধানে নির্মাণের প্রয়োজন হয়তো হতো না।

আকালের সন্ধানেতে সাবিত্রীর আনা চাউল গ্রহণ করে না তার অভুক্ত কৃষক স্বামী। রাগে সে হাড়ি এবং চুলা– দুটোই ভেঙ্গে ফেলে। আছড়ে মারতে যায় শিশু সন্তানকে। হয়তো নিজেকেও মারে বা মেরে ফেলে। কারণ, এই সম্ভ্রমটুকুই তার বাঁচার সম্বল। এটুকু হারালে তার আর থাকে কী?

অশনি সংকেত

৬.

অশনি সংকেত-এর এই নারী চরিত্র চিত্রায়ণের বিষয়ে আকালের সন্ধানেতে অদ্ভুত সমালোচনা দেখতে পাই। তা শিল্পীর মেকআপ থেকে শুরু করে চলচ্চিত্রে একটি চরিত্র যে আদতে একটি বড় কমিউনিটিকে প্রতীকীভাবে হাজির করে, সে বয়ান দেখতে পাই।

আশ্চর্য হই যখন দেখি আকালের সন্ধানের একটি চরিত্র মালতীর ভূমিকায় অভিনয় করতে আসা দেবীকাকে ১৯৪৩-এর আকালের গল্প তুলতে আসা পরিচালক ধৃতিমান বলেন, ‘শুধু টেকনিক জানলেই অ্যাক্টিং হয় না; হৃদয় চাই, অনুভূতি চাই, শ্রদ্ধা-শ্রদ্ধা-শ্রদ্ধা দরকার, বুঝলে? ওই যে শহরের বাবুটি, যুদ্ধের সময়ের কন্ট্রাকটর, একলা পেয়ে তোমায় কিনে নিয়েছে, তোমার যদি শ্রদ্ধা না থাকে, তাহলে ওই মহিলার যন্ত্রণা তুমি কী করে বুঝবে? কী করে ফুটিয়ে তুলবে? তুমি বুঝতে পারছ না, তোমার কতখানি দায়িত্ব? তুমি একটা নয়, হাজারটা মেয়ের কথা বলছো, একটা এন্টায়ার ক্লাসের কথা…।’

এই কথা ধৃতিমান কেন বললেন দেবিকাকে? কারণ দেবিকা করতে এসেছে ১৯৪৩-এর গ্রামবাংলার কৃষক রমণীর চরিত্র। কিন্তু এই চরিত্র করতে এসে পরিচালকের নিষেধ অমান্য করে সে নিজের ভ্রু প্লাক করে, চুল ছাঁটে এবং অভিযোগ করে– চাষী বউদের মতো মোটা কাপড় পড়লে তার গা কুটকুট করে।

এই যে দেবিকার চরিত্র। দেবিকা মানে দেবির মতো অবয়ব। সে আসলে কে? সে কি অশনি সংকেত-এর অনঙ্গ বউ নয়?

অশনি সংকেত-এর অনঙ্গ বউ চরিত্রে অভিনয়কারী বাংলাদেশের অভিনেত্রী ববিতার ভ্রু প্লাক করা ছিল না? অশনি সংকেতজুড়ে তার মুখশ্রীতে কি একটু দেবী-দেবী লুক তৈরি হয় না?

তো, মৃণাল সেন কি এসব বিষয়কে নেহায়াত কাকতাল বলবেন? জানি না। কারণ, এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার জন্য তিনি আর আমাদের মাঝে নেই। কিন্তু এই প্রশ্ন কি কেউ তাঁকে কখনো করেনি? আশ্চর্য!

যাহোক, দেবিকাকে বলা এই কথাটুকুর মাঝে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, ‘তুমি একজন নয় হাজারটা মেয়ের কথা বলছ’ কথাটি। কারণ এই একটি কথায় একজন অনঙ্গ বউ, একজন ছুটকী, একজন মতি অথবা একজন সাবিত্রী, একজন দেবিকা কেবল একা একটি চরিত্র থাকে না। তারা সবাই প্রতীকায়িত হয়। সে বা তারা হয়ে পড়ে একটি সমগ্র সমাজের প্রতিনিধি। প্রতিরূপ। সে প্রতিরূপের নির্মাণে যত্নশীল না হলে তা অপমানজনক হয়ে পড়ে। আর এ অপমান কেবল ওই চরিত্রটির ক্ষেত্রে ঘটে, তা নয়। এ অপমান ঘটে কমিউনিটির সবার।

অতএব, একজন অনঙ্গ বউয়ের দেবিরূপ তৈরি করতে গিয়ে একজন ছুটকীর ‘সস্তা’ হয়ে পড়াটা কেবল কৃষক বধু ছুটকীর অপমান নয়। আর এ অপমানের জবাব দেওয়ার জন্যই হয়তো অশনি সংকেত-এর ৭ বছর পর আকালের সন্ধানের জন্ম হয়। আর আকালের সন্ধানের টেক্সটে লেখা হয় দেবিকার উদ্দেশ্যে ধৃতিমানের এ উক্তি। যা আদতে অন্য সবার জন্য শিক্ষণীয় এক বয়ান বা দৃষ্টান্ত হয়ে ওঠে।

অশনি সংকেত

৭.

অশনি সংকেত এ কার্যত গ্রামীণ সমাজের সামন্ত ব্যবস্থাকে এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। ১৯৪৩-এর গ্রাম হিসেবে এ ব্যবস্থাকে এড়ানোর ফলে গল্পের গ্রামটির অবস্থান একটি বায়বীয় পরিসরে হারিয়ে যায়। সত্যজিতের নতুন গাঁয়ের সামন্ত বলতে বোঝানো হয়েছে সচ্ছল কৃষক ‘বিশ্বাস মশাই’কে। কারণ তিনি গ্রামের ‘মাথা’। কিন্তু এ গ্রাম কোন বা কার জমিদারীর অন্তর্গত, তা উল্লেখ করা হয়নি। গ্রামের কৃষকদের ‘কর’ দিতে হয় কি না, তাও বোঝা যায়নি। এসব না থাকায় ব্রিটিশ শাসনামলের দুই’শ বছরে গ্রামীণ সমাজ কাঠামোর বাস্তবিক চরিত্র হারিয়ে গেছে। গ্রামীণ সমাজের সামন্ত শোষণের কোনো চিহ্ন ছবিটিতে নেই। কিন্তু এ রকম সামন্ত সিস্টেম এড়ানোর দোষ মৃণাল সেনকে দেওয়া যাবে না।

কারণ আকালের সন্ধানের মৃণাল সেন গ্রামীণ এই সামন্ত ব্যবস্থা এড়াননি। বরং তিনি যেমন ১৯৪৩-এর নতুন ছোট সামন্তের জন্ম এবং ১৯৮০-তে তাদের উত্তর পুরুষদের বিকশিত চেহারা দেখিয়েছেন, ঠিক তেমনি দেখিয়েছেন ১৯৪৩-এর বিশাল জমিদারি ব্যবস্থার রোশনাই থেকে তাদের পতনের ধারাক্রম এবং সেই পতনমুখি ধারাক্রমে ১৯৮০-তে এসে সেই জমিদার বংশের শেষ উত্তরপুরুষের একাকী, অসহায় মৃত্যু।

ইতিহাসের প্রতি এই সচেতন দায় আমরা অশনি সংকেত-এ দেখতে পাই না। বরং আমরা দেখি গঙ্গাচরণের অভিভাবক হয়ে ওঠার বিপরীতে কৃষক পরিবারের পুত্রবধু ছুটকীর অস্তাচলে গমন।
আকালের সন্ধানেতে মৃণাল সেন গ্রামীণ সমাজের সদাচলমান সামন্ত ব্যবস্থার একটি রেখাচিত্র তুলে ধরেন। তা যেন বংশ পরম্পরায় চলতে থাকে। পূর্বের জমিদারী ব্যবস্থা বাতিল হয়েছে বলেই যে গ্রামীণ সমাজে ‘সামন্ত’ চিন্তা বা কাঠামো মিটে গেছে, এমনটা মনে করার কোনো কারণ তিনি বিশ্বাস করেন না। আর এ কারণেই তাঁর ছবিতে মাস্টারমশাইয়ের মুখে গ্রামের বর্তমান ‘সমাজপতিদের’ পূর্ব ইতিহাসের উদ্ধৃতি করেন। যা সমাজপতিদের কাছে ‘পুরোনো কাসুন্দি ঘাঁটা’ বলে প্রতীয়মান হয়। কিন্তু এই ‘পুরোনো কাসুন্দি’ না ঘাঁটলে মৃণালের বর্তমান সময়ের সমাজচিত্র ফুটে ওঠে না। আর পূর্ণ হয় না গ্রামীণ সমাজের অচলায়তন বিষয়ে মৃণাল সেনের নিজস্ব থিসিসের কার্যচিত্র।

কিন্তু কথা হলো, এটুকুতেও কি মৃণাল থেমে যান? না; তিনি এতেই থামেন না। তিনি তাঁর আকালের সন্ধানেতে বাস্তবতার চিত্রায়ন বিষয়ে আরও গভীর স্তরে সন্দিহান হন। যা তাঁর এই ছবির ‘ফিল্ম উইদিন অ্যা ফিল্ম’ কাঠামোতে যাওয়ার কারণ বলে আমি খুঁজে পাই।

আকালের সন্ধানে

৮.

নব্য বাস্তববাদী চলচ্চিত্র নির্মাণে উপমহাদেশে কিংবদন্তি সত্যজিৎ রায়ের অশনি সংকেতকে প্রশ্নবিদ্ধ করে মৃণাল সেনের চলচ্চিত্র ‘আকালের সন্ধানে’। মৃণাল সেন প্রশ্ন তোলেন, “এতোদিন আমরা বড় গলায় চেঁচিয়ে এসেছি যে আমরা রিয়ালিস্ট, পারিপার্শ্বিক বাস্তবকেই আমরা তুলে ধরেছি আমাদের শিল্পমাধ্যমে, সত্যিই কি আমরা তা করতে পেরেছি? এবং পেরে থাকলে কতটুকু? অর্থাৎ শিল্পকর্মে কতখানি আমরা খাঁটি থাকতে পেরেছি এবং কোথায়, কোন মুহূর্তে, আমরা নিজেদের ঠকাতে শুরু করেছি অথবা গা-ঢাকা দিয়েছি তথাকথিত ‘শিল্প-সৌকর্যের’ আড়ালে?”
[দেখুন: মৃণাল সেনের চলচ্চিত্রগ্রন্থ ‘সিনেমা, আধুনিকতা’, জানুয়ারি ১৯৯২]

এই প্রশ্ন তোলার হকটা তাঁর আছে। কারণ তিনি অশনি সংকেত-এর বিপরীতে আকালের সন্ধানে দাঁড় করিয়েছেন। যে ছবির টেক্সট ও বক্তব্য অশনি সংকেতকে কেবল ক্রিটিসাইজ করে নিস্তার দেয় না। নিজেও হয়ে ওঠে নতুন এক টেক্সট। কিন্তু সে টেক্সটও তো মৃণাল সেন খারিজ করেন। করেন না?

যখন গ্রাম ক্ষেপে ওঠে বা গ্রামকে যখন ক্ষেপিয়ে তোলা হয়, তখন আত্মপ্রত্যয়ী পরিচালক ধৃতিমান গ্রাম ছেড়ে পলায়ন করেন। কেন করেন?

কারণ, ধৃতিমানও যে বয়ান নিয়ে শহর থেকে গ্রামে এসেছেন আকালের ছবি তুলতে, সে বয়ানও আসলে কল্পিত। বানানো। রোমান্টিক এবং ইমোশনাল। বাস্তব আরও প্রখর। সে প্রখরতার খর তাপ নিতে পারার আত্মপ্রত্যয় তরুণ পরিচালক ধৃতিমান বা তার দলের থাকে না। তাই তারা পালিয়ে যায়।


অশনি সংকেত-এর
১৯৪৩-এর ছুটকীর ‘ক্ষুধা পেলে
মাথা ঠিক থাকে না’ তাই দেহ বেচে,
আকালের সন্ধানের ধৃতিমানের
১৯৪৩-এর সাবিত্রী নিজের
স্বামী-শিশু সন্তানকে
বাঁচাতে দেহ
বেচে

অশনি সংকেত-এর ১৯৪৩-এর ছুটকীর ‘ক্ষুধা পেলে মাথা ঠিক থাকে না’ তাই দেহ বেচে, আকালের সন্ধানের ধৃতিমানের ১৯৪৩-এর সাবিত্রী নিজের স্বামী-শিশু সন্তানকে বাঁচাতে দেহ বেচে। আর ১৯৮০ সালের দূর্গা প্রচণ্ড অভাবের মাঝেও, নিজের শিশু সন্তানের অসুখের মাঝেও কাজ না করে স্মিতা পাতিলের দয়ার সাতটি টাকা নেয় না। ফিরিয়ে দেয়। এই দূর্গার চরিত্র, চরিত্রের নৈতিক শক্তি ও আত্মমর্যাদার অহংকার তো সত্যজিতের অজ্ঞাত। এই দূর্গা অজ্ঞাত মৃণালের ধৃতিমানের কাছেও। কিন্তু এই দূর্গাকে মৃণাল সেন ঠিকই খুঁজে নেন। আর তাই ধৃতিমানের সাজানো গল্পের ছক আর তার বহু গবেষণার তথ্য উপাত্তে ঠাসা প্রচণ্ড ‘বিশ্বাস’ চুরমার হয়ে যায়।

অশনি সংকেত-এ নতুন গাঁয়ের অভিভাবকত্ব গঙ্গাচরণের হাতে তুলে দিয়ে সত্যজিৎ তাঁর দায়িত্ব শেষ করেন, এর বিপরীতে মৃণালের ধৃতিমান দেখান যে গঙ্গাচরণরা ‘অভিভাবকত্ব’ গ্রহণ করেন না, তারা শোষণের প্রতিভূ– নয়া সামন্তের চেহারা নেন।

কিন্তু মৃণাল সেন ১৯৮০-এর বাস্তবতায় দেখান গঙ্গাচরণ বা পুরোহিত ঠাকুরদের উত্তর পুরুষরা কেবল গ্রামের জোত জমির মালিকানা গ্রাস করেননি, তারা গ্রামীণ সমাজকাঠামোর ক্ষমতাকেও হাইজ্যাক করেছেন। যে কারণে তাদের অতীত ইতিহাসের বা তাদের উত্থানের ‘পুরোনো কাসুন্দি ঘাঁটা’র কোনো প্রয়াসকেই তারা স্বস্তিতে থাকতে দেন না। আর তাই ধৃতিমানদের ‘হাতুই’ গ্রামে ছবি নির্মাণের কাজ অসমাপ্ত রেখেই তাদের শহরমুখি হতে হয়। সম্পদে ও ক্ষমতায় প্রতাপশালী একটি শুটিং ইউনিটকে গ্রাম ছাড়া করার ক্ষমতার কাছে ধৃতিমান বা দিপঙ্কর দে’দের ‘প্রতাপ’ কার্যত নস্যি। টেকে না।

আর এমন পরিস্থিতিতেই মৃণাল বৃদ্ধ মাস্টার মশাইকে দিয়ে বলান, পরস্পরের ভুল বোঝাবুঝির তত্ত্ব। শহর আর গ্রামের তত্ত্ব। আমরা ও তোমরা’র তত্ত্ব। যা অনেকটা তেল আর জলের মতো সবসময় পাথর্ক্য রেখে চলে।

আর তাই সত্যজিতের গ্রামবিষয়ক বোঝাবুঝি যেমন ভুল, তেমনি নির্ভুল নয় ধৃতিমানের গ্রাম বোঝা। আকালের সন্ধানেতে ধৃতিমানকে খাদে ফেলেই মৃণাল প্রমাণ করেন তিনি গ্রামকে কতখানি জানেন এবং বোঝেন। কিন্তু মৃণালের সে বোঝাপড়ার প্রকৃত বয়ান তিনি ছবিতে ব্যবহার করেন না। তিনি অস্পষ্টতা রেখেই ছবি শেষ করেন। কারণ তিনিও কোনো দায় নেন না দূর্গার। কেবল দূর্গার অসহায়ত্বের ‘খবর’ শুনিয়ে ছবি শেষ করেন।

এ বিষয়ে মৃণাল সেনের বক্তব্য শুনি। মৃণাল বলছেন, ‘রিয়েলিটির শারীরিকতা ও শিল্পীর রিডেম্পশন অব রিয়েলিটির মধ্যে কোথায় কখন, হয়তো জ্ঞানত, হয়তো-বা শিল্পীরই অজান্তে, একটা শূন্যতা বা ফাঁক দেখা দেয়। এবং শিল্পী তখন তাঁর শিল্প-চাতুর্যে (!) সেই শূন্যতার ফাঁককে ঢাকার চেষ্টা করেন নানাভাবে এবং সেই ভাব বা ভঙ্গিকেই আমরা বলে থাকি শিল্প-সৌকর্য। কথাশিল্পী তা করে থাকেন কথা খেলিয়ে, অঙ্কন-শিল্পী করেন রঙ ও তুলি বুলিয়ে আর ছবি-করিয়েরা করেন ক্যামেরার ব্যবহারে, শব্দের ব্যঞ্জনায়, ছবি ও শব্দের মিলনে ও বিরোধে। এবং অধিকাংশ সময়েই ভাবাবেগের উৎকট আতিশয্যে। অর্থাৎ তথাকাথিত শিল্পসুষমায় শূন্যতাকে আড়াল করে রাখেন।’
[দেখুন: মৃণাল সেনের চলচ্চিত্রগ্রন্থ ‘সিনেমা, আধুনিকতা’, জানুয়ারি ১৯৯২]

সন্দেহ নেই, খুব স্পষ্ট কথা। বারবার তিনি প্রশ্ন তুলছেন বাস্তবতাকে আড়ালের বিষয়ে। তিনি বলছেন, আমরা ‘শিল্প-সৌকর্যের’ বা ‘শিল্পসুষমার’ আড়ালে খর বাস্তবতাকে আড়াল করি। আর হয়তো এ কারণেই তিনি ‘ফিল্ম উইদিন অ্যা ফিল্ম’ কাঠামোর দারস্থ হয়েছেন। যাতে তিনি তাঁর বা অন্যের আড়ালকৃত বাস্তবতাকে উন্মোচন করতে পারেন।

পেরেছেন কী?

এটা খুব কঠিন প্রশ্ন। কারণ শেষ পর্যন্ত শিল্পকর্ম কিভাবে কোন দর্শকের ওপর কি প্রভাব ফেলবে তা বলা মুশকিল। সে কারণে একই ছবি দশজন দেখে দশ রকম মন্তব্য করেন।

পূর্বেই বলেছি মৃণাল সেনের আকালের সন্ধানে সহজ চলচ্চিত্র নয়। এ ছবির পাঠোদ্ধার তাই সবার পক্ষে সহজ বা সম্ভব, এমনটা আমি মনে করি না। কিন্তু এ ছবি সহজভাবে যে সত্য তুলে আনে, তা হলো বাস্তবতার প্রকৃত অবয়ব খুব জটিল আর বহুমুখি। যেমন বহুমুখি সম্ভাবনার ছবি আকালের সন্ধানে

অশনি সংকেত

৯.

পঞ্চাশের মন্বন্তরের চিত্র অশনি সংকেত কেন রঙিন, সে বিতর্কে মশগুল মানুষ কাউকেই আমি বলতে শুন নি বা কোথাও পড়িনি এমন কথা যে, আকালের সন্ধানে কেন রঙিন?

পূর্বেই বলেছি এ প্রশ্নে সত্যজিৎ রায় মৌখিক ও লিখিত– উভয় ফর্মেই যথাযথ উত্তর দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, দুর্ভিক্ষের সঙ্গে রঙের কোনো সম্পর্ক নেই। ১৯৪৩ দুর্ভিক্ষ প্রাকৃতিক খরার কারণে হয়নি। হয়েছে খাদ্য মজুদ করাতে। প্রকৃতি সেই ১৯৪৩-এ তার সহজ ও নিত্য রঙেই ছিল। সব স্বাভাবিক ছিল। শুধু মানুষের খাওয়ার খাদ্য ছিল না।

যথাযথ এবং নির্ভুল বক্তব্য। আর তাই এ প্রশ্ন ওঠে না যে, আকালের সন্ধানে কেন রঙিন। সত্যিকার অর্থে, অশনি সংকেত-এর রঙ অশনি সংকেত-এর সম্পদ। এবং তা সম্পদ বাংলাভাষার চলচ্চিত্রেই। অমন সুন্দর গ্রাম-প্রকৃতি আর কোনো বাংলাভাষার চলচ্চিত্রে আজো খুব বেশি আসেনি।

সতজিৎ প্রকৃতির স্বাভাবিক উজ্জ্বল রঙের বিপরীতে ক্ষুধার তীব্র কদর্যতার রূপ দিয়ে একটি বক্তব্য তৈরি করতে চেয়েছেন। মৃণাল সেন কি একেই বলছেন ‘শিল্প-সৌকর্যের’ আড়াল?

একই কথা কি প্রযোজ্য প্রায় দেবীরূপী অনঙ্গ বউয়ের সৌন্দর্যের বিপরীতে ইটখোলার ওই মুখপোড়া ‘শহুরে’ যুবকটি? অনঙ্গ বউ যদি ‘পবিত্রতার’ প্রতীক হয়, তবে মুখপোড়া যুবক মূর্তিমান কদাকার পাপ বা ১৯৪৩-এর দুর্ভিক্ষের সময়ের মেটাফর।

একই রকম মেটাফর দেখি মুচিকন্যা মতির মৃত্যুর পর তার মৃত খোলা চোখের স্থির বিগ ক্লোজআপের দৃশ্যের বিপরীতে শব্দে কাঠঠোকরা পাখির তীব্র ডাকের ব্যবহারে। মৃত্যু ও জীবনের এই বাইনারি অশনি সংকেত-এ বহুভাবে আছে। এই সহজ শৈল্পিক বাইনারি তৈরিই কি মৃণাল সেনের ভাষায় ‘শিল্প-সৌকর্যের’ আড়াল?

সত্যজিতের এই সহজ শৈল্পিক বাইনারির বিপরীতে মৃণাল আকালের সন্ধানেতে কী করেন?

মৃণাল ধৃতিমানের বানানো ‘বাস্তব’ সাবিত্রীর বিপরীতে দূর্গাকে দাঁড় করান। মৃণাল ১৯৪৩-এর বানানো ‘বাস্তব’ বাংলার গ্রামের বিপরীতে ১৯৮০-এর ‘বাস্তব’ গ্রামকে দাঁড় করিয়ে দেন। আর এভাবে তিনি প্রতিটি চরিত্র আর ঘটনার বিপরীতে আর একটি চরিত্র এবং প্রতিঘটনার জন্ম দেন। এমনকি যে হরেন ও দূর্গাকে তিনি ১৯৮০ সালের বাস্তবিক গ্রামের চরিত্র হিসেবে দেখাতে সচেষ্ট থাকেন, তাদেরও আড়াল ভেঙ্গে দেন। একটি দৃশ্যে হরেন ইচ্ছেকৃতভাবে ক্যামেরায় একাধিকবার ‘ফলস লুক’ দেন এবং ধৃতিমান একটি দৃশ্যে গাড়ি উঠতে উঠতে বলেন, ‘শ্রীলা উঠেছে?’

অথচ এই কথা ধৃতিমানের বলবার কথা নয়। কারণ দূর্গার প্রকৃত নাম যে ‘শ্রীলা’, তা ধৃতিমানের জানবার কথা নয়। কোনো দৃশ্যে হরেনেরও ক্যামেরায় ‘ফলস লুক’ দেওয়ার কথা নয়। এটা মৃণাল সেন করেন; কারণ তিনি যে এই চরিত্রগুলোকে দিয়ে অভিনয় করাচ্ছেন, সেটা প্রমাণ করতে চান। তিনি দর্শকের বাস্তবতা বোঝার সহজ প্রকরণকে বারবার চ্যালেঞ্জ করে তাদের মনে অস্বস্তি উৎপাদন করে চলেন।

মনে রাখতে হবে যে, আকালের সন্ধানের ধৃতিমানের বানাতে চলা গল্পটি মূলত অশনি সংকেত-এর সমালোচনা। আর ধৃতিমানের এই বানাতে চলা সমালোচনামূলক ‘গল্পকে’ মৃণাল সেন সমালোচনা করেন এবং বাতিল করেন ১৯৮০-এর গ্রামের চরিত্র ও ঘটনাবলি তৈরি করে।

এ কারণে এ কথা বলা সঙ্গত যে, আকালের সন্ধানে ছবিতে প্রথমে মৃণাল সেন অশনি সংকেতকে সমালোচনা করেন, এরপর অশনি সংকেত-এর সমালোচনা করে তিনি ধৃতিমানকে দিয়ে যে গল্প বানাতে চলেছেন, তার সমালোচনা করেন এবং সেটাকেও খারিজ করে দেন। কারণ ততক্ষণে তিনি নতুন এক বাস্তবতা হাজির করে ফেলেছেন। এবং এই নতুন বাস্তবতা আসলে খর বাস্তবতা।

এ কারণে যখন মৃণালের গল্পের পরিচালক ধৃতিমান পলায়ন করে তখন মৃণাল সে পলায়নকে থামাতে যান না। বরং এ পলায়ন যে আরেক সত্যিকারের ‘বাস্তবতা’ হাজির করে তা তুলে ধরেন বৃদ্ধ স্কুল মাস্টারের জবানীতে।

ধৃতিমানের বা তাঁর নিজের এই পলায়ন বিষয়ে মৃণাল সেন বলেন, “আকালের সন্ধানের নায়ক একজন শিক্ষিত চিত্রপরিচালক। ১৯৪৩-এর পুরো ইতিহাস বয়ে নিয়ে এসে দাঁড়িয়েছিল ১৯৮০ সালের এক দারিদ্র-লাঞ্ছিত পল্লীগ্রামে। ইতিহাসের বোধের সঙ্গে শিল্প-বোধের সমন্বয়ও হয়তো ঘটিয়েছিল। কিন্তু অতীত যখন বর্তমানে ঢুকে পড়ে চোরের মতো, কোনোরকম জানানি না দিয়ে, তখনই নায়ক বিচলিত হয়। এবং শেষ পর্যন্ত ‘রিয়েলিটি’ থেকে মুখ ফিরিয়ে পালিয়ে যায়।”


যে
দুর্ভিক্ষ
নিয়ে এত
আলোচনা, মৃত্যু,
ইতিহাস এবং ছবি নির্মাণ;
সে দুর্ভিক্ষ যে কোনো একটি
‘ইভেন্ট’ নয়, তা যে সদাঘটমান,
প্রাত্যহিক– এই-ই হলো মৃণালের অন্তিম থিসিস

যে দুর্ভিক্ষ নিয়ে এত আলোচনা, মৃত্যু, ইতিহাস এবং ছবি নির্মাণ; সে দুর্ভিক্ষ যে কোনো একটি ‘ইভেন্ট’ নয়, তা যে সদাঘটমান, প্রাত্যহিক– এই-ই হলো মৃণালের অন্তিম থিসিস। আর তাঁর এই থিসিস একটি ঐতিহাসিক ঘটনা হিসেবে চিত্রায়িত সত্যজিতের অশনি সংকেত-এর বয়ান বা থিসিসকে খারিজ করে দেয়।

এ প্রসঙ্গে স্মরণ করা যাক ইতালির নিও-রিয়ালিজমের প্রবক্তা জাভাত্তিনির একটি উক্তি। এটি ধার করলাম মৃণাল সেনের লিখিত সিনেমা, আধুনিকতা গ্রন্থ থেকে। মৃণাল সেন লিখছেন, ‘নিও-রিয়ালিজমের প্রাথমিক ও সার্বিক উদ্দেশ্য সম্পর্কে বলতে গিয়ে জাভাত্তিনি বলেন, to make things spectacular by their natural qualities, not by their exceptional qualities.’

এখানে জরুরি যা বলার, তা হলো, আকাল বা দুর্ভিক্ষকে কোনো ইভেন্ট হিসেবে দেখলে তা exceptional হয়। কিন্তু যদি বাংলার মানুষের বা দুনিয়ার মানুষের অভুক্ত থাকার, সর্বস্বান্ত হওয়ার মধ্য দিয়ে ‘হারিয়ে’ বোঝায় তবে তা কোনো exceptional ব্যাপার নয়। তা সর্বক্ষণ ঘটে চলেছে। তা natural বা প্রাত্যহিক প্রবাহ।

এই ধনবাদী দুনিয়ায় মানুষের অসহায় হওয়ার ঘটনা প্রকৃত অর্থে পীড়িত-লাঞ্চিত মানুষের নিয়তি এবং তা রুখে দাঁড়ায় এমন কোনো বাস্তবতা সমাজে হাজির নেই। আর এ কারণেই মৃণালের আকালের সন্ধানের যুবক পরিচালক ধৃতিমান প্রত্যয়পূর্ণ মন নিয়ে হাতুই গ্রামে গিয়েও সত্যিকারের বাস্তবতার মুখোমুখি হয়ে শহর অভিমুখে পালাতে বাধ্য হয়। আর মৃণাল তার এই পলায়ন এবং দূর্গার অসহায় হওয়ার খবর দিয়ে কার্যত চলমান সমাজের Natural ধরনকেই উপস্থিত করেন। আর এ কারণেই তাঁর আকালের সন্ধানে Spectacular হয়ে ওঠে। যা অশনি সংকেত হয় না বা হয়নি।

তাই বলছি, যদি অশনি সংকেত-এর বিপরীতে আকালের সন্ধানেকে রেখে বিচার করি; তবে তা সত্যজিতের ন্যারেটিভ বা থিসিসকে খারিজ করে। তাই অশনি সংকেত-এর বিপরীতে মৃণালের এ ন্যারেটিভ বা বয়ানকে অ্যান্টিথিসিস বলা যায়।

আর যদি অশনি সংকেতকে বাদ দিয়ে কেবলমাত্র আকালের সন্ধানে দেখি এবং বিচার করি, তবে আকালের সন্ধানেকে ‘বাস্তবতা’ নির্মাণের নয়া টেক্সট হিসেবে খুঁজে পাই আর তা মৃণালের এক শক্তিশালী থিসিস হয়ে দাঁড়ায়। আর এই থিসিসের কষ্ঠিপাথরে যাচাই করা যেতে পারে আরও অনেক চলচ্চিত্রের ‘বাস্তবতা’ বা ‘নয়া বাস্তবতা’র দাবিকে। হয়তো সে সব ‘দাবি’ পুনরায় নিরীক্ষিত হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে।

আকালের সন্ধানে

১০.

শেষ করার আগে। মৃণালের আকালের সন্ধানের আরও এক সমকালিন পাঠ হাজির করতে চাই। এই ২০২০ সালে যখন আমরা সবাই, পুরো বিশ্ব কোভিড-১৯ নামের এক ভাইরাসের আক্রমণে গৃহবন্দি। তখন আমরা এই পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের শহরে ও গ্রামে, প্রাসাদে ও রাজপথে, ফ্ল্যাটবাড়িতে অথবা মাটির ঘরে অপেক্ষা করছি কখন থামবে এই করোনা মহামারি। ঠিক এই সময়ে এই ঢাকায় ধানমণ্ডির মতো এলাকায় ফ্ল্যাটবাড়ির সামনে এসে কিছু মানুষ ডাকছে। বলছে, ‘খালাম্মা, একটু সাহায্য করেন’।

এই ডাক কেবল পুরুষের নয়। নয় শুধু নারীর। এই ডাক শিশুকন্ঠেও শুনতে পাই।

এই ২০২০ সালে যখন বাংলাদেশ উন্নয়নশীল একটি দেশ। যখন বাংলাদেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ বলে সম্মানিত। তখন এই ডাক বা ডাকতে থাকা মানুষের খাদ্যের অভাব কেমন করে ঘটছে?

এ তো ১৯৪৩-এর পরাধীন ভারতবর্ষ নয়। এ নয় ১৯৮০-এর পশ্চিম বাংলার সুখড়িয়া বা হাতুই গ্রাম। এ ২০২০-এর বাংলাদেশ। বাংলাদেশের রাজধানী– ঢাকা। তবে?

অন্তিমে, তাই বলছি মৃণালের উপসংহার। আকাল কোনো একটি নির্দিষ্ট তারিখের বাস্তবতা নয়। আকাল পীড়িত-লাঞ্ছিত মানুষের ‘সর্ব্বাঙ্গে’।

২৪ মে ২০২০, ঢাকা
Print Friendly, PDF & Email
শেয়ার
লেখক; চলচ্চিত্র নির্মাতা; চলচ্চিত্র সংগঠক। ঢাকা, বাংলাদেশ। সাধারণ সম্পাদক, ফেডারেশন অব ফিল্ম সোসাইটিজ অব বাংলাদেশ। সভাপতি, ম্যুভিয়ানা ফিল্ম সোসাইটি। নির্মিত প্রামাণ্যচিত্র : অনিবার্য [ পোশাক শ্রমিক আন্দোলন; ২০১১]; পথিকৃৎ [চলচ্চিত্রকার বাদল রহমানের জীবন ও কর্মভিত্তিক; ২০১২ (যৌথ নির্মাণ)]; সময়ের মুখ [জাতীয় অধ্যাপক মুস্তাফা নূরউল ইসলামের জীবন অবলম্বনে; ২০১৮]। সম্পাদিত ফিল্ম-ম্যাগাজিন : ম্যুভিয়ানা; চিত্ররূপ। সিনে-গ্রান্থ : চলচ্চিত্রপাঠ [সম্পাদনা]; চলচ্চিত্রের সাথে বোঝাপড়া; স্বাধীন চলচ্চিত্র আন্দোলনের ইশতেহার : বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ; চলচ্চিত্রকথা [তারেক মাসুদের বক্তৃতা ও সাক্ষাৎকার; সম্পাদনা]। পরিকল্পক ও উৎসব পরিচালক : নতুন চলচ্চিত্র নতুন নির্মাতা চলচ্চিত্র উৎসব

১টি কমেন্ট

মন্তব্য লিখুন